Posts

নেশার রোজনামচা। অণুগল্প।

 নেশার রোজনামচা। কৃশানু মিত্র।       মনসা পূজায় উপোস দিয়েছিল বুধিয়া। ঝাপান মেলার আজ শেষ দিন। পূজা সেরে মুড়ি আলু খাবে বুধিয়া। প্রসাদ আনবে বর চন্ডীর জন্য। লখাকে দেবে বুকের দুধ। চন্ডী রাজবংশী, সাপের বিষ থেকে নেশা দ্রব্য তৈরী করে বেচে। বুধিয়া ভাবে, শহর থেকে বাবুরা ঝাপান মেলা দেখতে আসে, কোথায় সাপ খেলা দেখিয়ে দু পয়সার রোজগার করবে, তা', নয় সকাল থেকে চণ্ডী নেশা করে উদোম হয়ে পড়ে আছে। পুজোর দিন বুধিয়া রাগ ঝগড়া করেনি কারণ বুধিয়া মনসামায়ের পূজার আচার-আচরণে ত্রুটি মানতে পারবে না। ইদানিং চন্ডী, বুদিয়ার রণমুর্তি দেখছে। লক্ষীর ভান্ডার ঘরে আশায় বুধিয়ার মনে বল এসেছে। কাজকাম বন্ধ করে নেশা করলে চন্ডীর ভাগ্যে জুটছে গোবেড়েন। সে ঘর-দোর গুছিয়ে আচ্ছন্ন চন্ডীকে বলে যায়, সে যেন ঘুমন্ত লখার দেখভাল করে।        পুজো পাঠ সেরে, বাবুদের বাড়ি ঘুরে প্রসাদ নিয়ে বুধিয়া ঘর পানে যাত্রা করে। তার গলায় বাবুদের মনসা পালার গান- জয় জয় মা মনসা। মন ফুরফুরে।         ঘরের দাওয়ায়ে পা দেওয়ার আগেই সে পুত্র লখাইয়ের আকুল কান্না শুনতে পায়। চন্ডী তখনও...

ছোটগল্প- জানকি দি

 জানকি দি। আমার সঙ্গে অফিস যেতেন রোজ। মুখটা হাসিতে পরিপূর্ণ। কোন ছোটবেলায় পড়া, "মূর্তিমতী করুণা", ঠিক  তার প্রতিরূপ যেন। বয়স ধরা যাক সত্তর। না না সত্বর আসেনি, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এসেছে। ছেলেকে মানুষ করতে তাঁর সর্বস্ব নিঙড়ে দিতে হয়েছে। ছেলে যখন হোস্টেলে গেল জীবন যেন সাহারা মরুর শীতল রাত। তখন শুধুই অফিস আর ঘর। যদিও পথের বন্ধুদের প্রত্যক্ষ মদতেই তিনি বেঁচে ছিলেন। উৎসাহী সহযাত্রীদের কেউ জানতে চাইলে তিনি বলতেন, স্বামী কবেই দলছুট হয়ে পাড়ি দিয়েছে ভূলোকের বাধা কাটিয়ে। একা হাতে চাকরী-হেঁসেল-ছেলের লেখাপড়া সব সামলেছি আমি। রোজ শুনতাম হাজারো গল্পের মনতাজ। নাতি নাতনি ঘরভরা সংসার। বাচ্চাদের চাহিদা, ঠাকুমার ঝুলি যেন রোজ পূর্ণ হয়ে আসে ঘরে। অফিস ফেরতা কিছু না কিছু কেনা চাই। বৌমাটি তাঁর বড়ই সজ্জন নিজে হাতে বানিয়ে টিফিন দিত। কোন কোন দিন বৌমার হাতে গড়া মিষ্টি অফিস যাওয়ার পথেই আদরের সহযাত্রীদের কয়েকজনকে ভাগ করে দিতেন জানকি দি। রঙ্গন একবার জিজ্ঞেস করে, দিদি আপনার অফিসে অবসরের কোন নিয়ম নেই?  দিদি বলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চাকরি করতে হবে আমাকে। এই কোম্পানির আমি একজন মূল অংশীদার।   ...

ছোটগল্প - লাল কালো ইট।।

 লাল-কালো ইট। রমেশ রোজ দেখে, মেশিন থেকে বার হওয়া মাটির সঙ্গে বালির মিশেল হচ্ছে। তারপর পাথাই চাচাদের হাত ধরে ছাঁচে পড়ছে মিশেল মাটি। রমেশ লছমীকে একদিন জিজ্ঞেস করে, মা সব ইট একরকম দেখতে, তবে মানুষ কেন ভিন্ন রকম? লছমী উত্তর খুঁজে পায়না। ছেলেকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে, সে বলে, ইটের সব ছাঁচ যে মাপে এক। রমেশের মাথায় ঢোকে না মানুষের ছাঁচ কোথায় কিনতে পাওয়া যায়। সে বলে, মা বলোনা, আমার ছাঁচ তুমি কোথায় পেয়েছিলে? রমেশ ওর বাবাকে কোনদিন দেখেনি। রমেশ লছমী মুন্ডার ছেলে। উত্তর না আসায়, রমেশ বলে, বলো না, কোন পাথাই চাচা আমার ছাঁচ ঢেলেছিল। লছমী বলে, আমাকে বকাস না, হাতে অনেক কাজ। তাড়াতাড়ি মহল্লা ছেড়ে বেরোতে হবে।       মাস খানেক পরে শুরু হয়ে যাবে বৃষ্টির মরসুম। আজই বেশ কিছুদিনের জন্য রমেশদের অছিপুরের পাট চুকে যাবে। বছর তিনেক হল ওদের এমন উদ্বাস্তুর মত ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। কেন যে বারবার ইটভাটা ছেড়ে ওদের যেতে হচ্ছে তা' রমেশ জানে না। মা গোছগাছে ব্যস্ত, রমেশ খেলবে বলে গণেশদের  চালায় হাজির হয়। বিছানাপত্তর, দড়িদড়ায় বাঁধা পড়ছে সেখানে। গণেশ তার মায়ের সঙ্গে হাত লাগিয়েছে কাজে। গণ...

নাটক- চুল কাটতে বেলা গাল......।

 নাটক চুল কাটতে বেলা গেল.. [সেলুনের দেওয়ালের রং চটে গেছে বহুদিন। সারানোর পয়সা নেই কেশবের। সিমেন্টের পলেস্তারা জায়গায় জায়গায় খসে পড়েছে। টিমটিম করে আলো জ্বলছে ঘরে। বেঞ্চে একা বসে কেশব কাগজ পড়ছে। কাগজ কেনার ক্ষমতা হারিয়েছে কেশব। গত দিনের কাগজ চেয়ে আনে পাশের সাইবার কাফে থেকে। কেশবের সেলুনে এফ এম রেডিও সবসময় চলে। আজও তার ব্যতিক্রম নেই। রেডিও চলবে কেউ শুনুক বা না শুনুক।] ডাক্তার কৌশিক- কি ব্যাপার হে, এ যে বিলকুল গড়ের মাঠ!  ভিড় এড়াতে বেকার আমি ভর সন্ধ্যায় এলাম। কেশব-  স্যার বসুন, ভগবানের কাছে আমার জন্য একটু দোয়া করুন যেন দোকানে ভিড় হয়। আমি তাহলে নিঃখচায়  আপনার বাড়ি গিয়ে চুল দাড়ি কেটে আসব।  ডাঃ কৌ- কী যে পাগলের মতো বল, চাইলে তো, আমি নিজের জন্যই চাইতে পারি। চাইলেই যদি সব পাওয়া যেত। কেশব- আচ্ছা স্যার, আপনার আর চাওয়ার কি আছে? মস্ত দুটি গাড়ি,প্রাসাদপম বাড়ি। ছেলেরা বড় বড় চাকরি করে কাঁড়িকাঁড়ি টাকা আনছে। ডাঃ কৌ- কী যে বলো, কতশত জিনিস না পাওয়া রয়ে গেল জীবনে।  কেশব- , ডাক্তার কৌশিক রায়, বলছেন এই কথা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।  ডাঃ কৌ- কেশব, চাহিদার কি শেষ আছে? কেশব-:নেই...

একগুচ্ছ কবিতা

 সকলে উপোষী  অবসরের বাড়ি খুৃঁজতে চেয়েছিলে পালিয়ে যেতে চেয়ে দূরে, কাল পার হল সেই অনাদি চৌকাঠ  যেখানে জীবনযাত্রার শুরু বলা যায় কারণ  নাও বেয়ে আসার পথে তার সাথে পরিচয়  ভালোবাসা হয়ে যা মনে বিঁধে যায় তারপর লুকছুপ অন্তঃসলিলা ফুলকাঁটা রঙিন জীবন সকলের অমত পাড়িয়ে তুমি হলে রাজি সময় বলে দেবে জ্বলবে না নেভা আলো ভাসাবে জীবন, খেলা হোক বাজি। অপার যৌবন ঠেলে ভাসলে সুখ দরিয়ায় ফুটফুটে প্রাণ এল তোমার মাঝে আশার শিয়রে এল বান। তারপর শৈশবের খাত ধরে উল্টো পথে পিয়াসী চলা  দুজন দুদিকে তারি মাঝে বেড়ে ওঠে  নিস্পাপ ফুলের আদলে মহাপ্রাণ।  সম্ভবনার প্রোথিত বীজ অতিসার পেয়ে তরতরে পৌরুষ বোঝে না সার অতি মান নয় ভালো অতিদানে বলিদান হয় বলিরাজ। দ্বন্দ্ব দীর্ণ সেই মেয়ে সার্কাস খেলা চলে  আঁধারে, আল বেয়ে বেয়ে। সন্দিগ্ধ পুরুষ মাতে নিজের পরিধি তে সীতার আগুনে আয়োজন পরীক্ষার আদলে।  ভয় পাওয়া হরিণ যেমন  শিশুর প্রাণ বাঁচাতে শ্বাপদ শক্তিধর তেমন রমণী বদলায় নিজের পাখায়।  বদলায় দিন।  পুরুষ গুটিয়ে যায় সাপের বিবরে সঙ্গে নিয়ে যায় প্রাণধন শিশু  অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয় সম্ভবনার...

ছোটগল্প- নিম ফুলের মধু।

 নিম ফুলের মধু।         ঘরে বসে বড় স্ক্রিনে সিনেমা দেখার ইচ্ছে পৃথা মনের কোণে বহুদিন লুকিয়ে রেখেছিল। বারান্দা দিয়ে চোখ চলে যেত তমালের দশ ফুট বাই বারো ফুট ঘরে। ক্যাথড রে আজ অচল,পুরানো দিনের টেলিভিশন টেকনোলজি। "ঝিরিঝিরি বাতাস কাঁপে" দূরদর্শন ছেড়ে সুযোগ পেলেই পৃথা বারান্দা দিয়ে টিভি সিরিয়াল, "নিম ফুলের মধু", দেখত। তমালদের ঝাক্কাস টিভিতে নতুন টিভিতে। তমালের বউ রিয়া পৃথার খুব পছন্দের প্রতিবেশী। রিয়া এক বুক গর্ব নিয়ে হিসাব করে 'নিম ফুলের মধু', চালিয়ে জানলা খুলে অকথিত আমন্ত্রণ জানাত পৃথা বৌদিকে। নাঃ, রিয়া কোনদিন পৃথাকে ডাকেনি। সান্ধ্য কর্ম যথাসম্ভব তৎপরতায় সাঙ্গ করে বারান্দায় ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে হাজির হতো পৃথা। মধুর  সঙ্গে মৌমাছি সম্পর্ক সময়ে বাঁধা থাকত। সে সময়ের ভাগ কাউকে দিতে চাইতো না পৃথা। প্রতিবেশীরা বারান্দায় পৃথাকে দেখে গল্প করতে এগিয়ে এলে সে কিঞ্চিত বিরক্ত হত। নবীন আজ হঠাৎ করে নির্দিষ্ট সময়ের আগে অফিস থেকে ফিরে পড়েছে। চা-জলখাবার পরিবেশন করে পৃথা নিম ফুলের মধুকর হয়ে যথাস্থানে আসীন। এমন তো কোনদিন হয়না। নবীনের আগমনের সাথে সাথে শাশুড়িমা এবং...

বড়গল্প- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(রুপকথা লাইভে প্রকাশিত)

           কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা                         যেন মা দেশটা একেবারে আলাদা। মা তুই এই অবেলায় ফোন করলি! শরীর ঠিক আছে? ধুস, আজেবাজে প্রশ্ন না করে আমার ভাললাগা অনুভুতির কথা শোন।' মা রজনী অফিস ফেরতা এসি বাসে উঠে বসেছে। ভিড় খুব বেশি নয়, বাস ছাড়বো ছাড়বো করছে। একজন সুদর্শন যুবক বাসে ভিক্ষা করতে উঠেছে। তার মুখ নিঃসৃত সুললিত বাণী কাহিল করে দিয়েছে রজনীকে। ফোনে কুন্দন তখনও বকবক করে চলেছে। কুন্দনের বক্তব্যে সারসংক্ষেপ হল নরওয়ে দেশটাতে কোনরকম তালাচাবির ব্যবহার নেই। হোটেলে চেক ইন করতে গিয়ে সে ম্যানেজারের কাছ থেকে চাবি চাইলে ম্যানেজার তাকে বলেছে এদেশে চাবি তালার কোন বন্দোবস্ত নেই। প্লেনে করে আসার সময় কেউ কোথাও তার পরিচয় জানতে চায়নি। মিউনিখে গিয়ে ঘটল এক অসম্ভব ঘটনা। সে দেশের এক নাগরিক সময় অভাবে টিকিট কাটতে না পের ট্রেনে সফর করেছে। ট্রেনে, প্লাটফর্মে কোন টিকিট চেকার নেই। আমারই কম্পার্টমেন্টে উঠে ছিল সে। মিউনিখে নেমে সে একটি টিকিট কাটল এবং সেটি আইনত পাঞ্চ করল।' 'ওরে তুই ছাড় এবার। আমি বাসে বসে আছ...