ছোটগল্প- জানকি দি
জানকি দি।
আমার সঙ্গে অফিস যেতেন রোজ। মুখটা হাসিতে পরিপূর্ণ। কোন ছোটবেলায় পড়া, "মূর্তিমতী করুণা", যেন বাস্তবে উঠে এসেছে। বয়স ধরা যাক সত্তর। না না সত্বর আসেনি, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এসেছে। ছেলেকে মানুষ করতে তাঁর সর্বস্ব নিঙড়ে দিতে হয়েছে। ছেলে যখন হোস্টেলে গেল জীবন তখন সাহারা মরুর শীতল রাত। সে সময়ে শুধুই অফিস আর ঘর। যদিও পথের বন্ধুদের প্রত্যক্ষ মদতেই তিনি বেঁচে ছিলেন। উৎসাহী সহযাত্রীদের কেউ জানতে চাইলে তিনি বলতেন, স্বামী কবেই দলছুট হয়ে পাড়ি দিয়েছে ভূলোকের বাধা কাটিয়ে। একা হাতে চাকরী-হেঁসেল-ছেলের লেখাপড়া সব সামলেছি আমি। রোজ শুনতে হত হাজারো গল্পের মনতাজ। নাতি নাতনি ঘরভরা সংসার। বাচ্চাদের চাহিদায় ঠাকুমার ঝুলি রোজ পূর্ণ হয়ে থাকে, অফিস ফেরতা কিছু না কিছু কেনা চাই। বৌমাটি তাঁর বড়ই সজ্জন নিজে হাতে বানিয়ে টিফিন দিত। কোন কোনদিন বৌমার হাতে গড়া মিষ্টি অফিস যাওয়ার পথেই আদরের সহযাত্রীদের কয়েকজনকে ভাগ করে দিতেন জানকিদি। রঙ্গন একবার জিজ্ঞেস করে, দিদি আপনার অফিসে অবসরের কোন নিয়ম নেই? দিদি বলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চাকরি করে যেতে হবে আমাকে। এই কোম্পানির আমি একজন মূল অংশীদার।
দিদি সাজগোজেও পরিপাটি। পাটভাঙা ইস্তিরি করা শাড়ি ছাড়া তিনি পরতেন না। রঙ্গন এক রবিবার আদ্যাপীঠের কাছে বন্ধুর বাবার স্মরণ সভায় গিয়েছে। আজকাল এই এক ঢঙ হয়েছে নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে ডেকেছিস, তো পেট পুরে খাওয়া! তা নয়, দিল হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে। প্যাকেটে কী আছে ভগবান জানে। চড়া পেট মেরে রঙ্গন প্যাকেট দোলাতে দোলাতে আশেপাশে খাবার হোটেলের খোঁজে যায়। না খেয়ে ফিরেছে বাড়িতে কিছুতেই বলা যাবে না। সার সার ভিখিরি বসে আছে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে যাবার রাস্তায়। ভিখিরি দেখলেই রঙ্গনের গা ঘিনঘিন করে। রঙ্গনের মনে হয় এরা কামচোর।ভিখারিদের পথ ছেড়ে রঙ্গন উল্টো পথ ধরে। সেখানেও এক দলছুট ভিখারিণী বসে আছে। এই সুযোগ প্যাকেটটা গ্যারেজ করতে হবে। দ্বিতীয়বার চিন্তা না করেই প্যাকেটটাকে ভিখারিণীর হাতে ধরিয়ে দেয় সে। ভিখারিণীর হাত আর মাথা একসাথে উঠে আসে খাবারের প্রত্যাশায়। চোখে চোখ মিলে যায় দুজনের। প্যাকেট আর হাতের ফাঁক তখনো বেশ কয়েক ইঞ্চি, স্থির হয়ে গেছে দুজনের চোখ। অস্ফুটে জানকিদি বলে, সীতাকে লঙ্কেশ্বর স্পর্শ করেছিল এই সন্দেহের কারণে ধরণীকে দু'ভাগ করে উনি পাতাল প্রবেশ করেছিলেন। এ আমার সামর্থের বাইরে। তাই পথই আমার সঙ্গী। শুধু পরিপাটি থাকার অভ্যেসটাই রয়ে গেছে যা।
*********
Comments
Post a Comment