বড়গল্প- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(রুপকথা লাইভে প্রকাশিত)

           কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা            


            যেন মা দেশটা একেবারে আলাদা। মা তুই এই অবেলায় ফোন করলি! শরীর ঠিক আছে? ধুস, আজেবাজে প্রশ্ন না করে আমার ভাললাগা অনুভুতির কথা শোন।' মা রজনী অফিস ফেরতা এসি বাসে উঠে বসেছে। ভিড় খুব বেশি নয়, বাস ছাড়বো ছাড়বো করছে। একজন সুদর্শন যুবক বাসে ভিক্ষা করতে উঠেছে। তার মুখ নিঃসৃত সুললিত বাণী কাহিল করে দিয়েছে রজনীকে। ফোনে কুন্দন তখনও বকবক করে চলেছে। কুন্দনের বক্তব্যে সারসংক্ষেপ হল নরওয়ে দেশটাতে কোনরকম তালাচাবির ব্যবহার নেই। হোটেলে চেক ইন করতে গিয়ে সে ম্যানেজারের কাছ থেকে চাবি চাইলে ম্যানেজার তাকে বলেছে এদেশে চাবি তালার কোন বন্দোবস্ত নেই। প্লেনে করে আসার সময় কেউ কোথাও তার পরিচয় জানতে চায়নি। মিউনিখে গিয়ে ঘটল এক অসম্ভব ঘটনা। সে দেশের এক নাগরিক সময় অভাবে টিকিট কাটতে না পের ট্রেনে সফর করেছে। ট্রেনে, প্লাটফর্মে কোন টিকিট চেকার নেই। আমারই কম্পার্টমেন্টে উঠে ছিল সে। মিউনিখে নেমে সে একটি টিকিট কাটল এবং সেটি আইনত পাঞ্চ করল।' 'ওরে তুই ছাড় এবার। আমি বাসে বসে আছি ভালো করে শুনতে পারছি না।' ওদিকে সুদর্শন যুবক চেঁচিয়ে বলে চলেছে- আমি বিকম অনার্স পড়ি। দাদারা দিদিরা আমাকে যদি তিনশ সত্তর টাকা দেন তাহলে আমি জওহরলাল এবং সীমা শ্রীবাস্তবের লেখা ফিনান্সিয়াল একাউন্টিং বইটা কিনতে পারি। রজনী বুঝে উঠতে পারে না কার কথা শুনবে। পুত্র নাছোড় আর পুত্র সম একজন ভিক্ষারত। 'জানো মা, নেদারল্যান্ডসের ঘটনা আরো মজার। আমি ডেন হাগ স্টেশনের বাইরে টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে একজন প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে একটা টিকিট কেটে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে চলে গেল। রজনী কারন জিজ্ঞেস করলে কুন্দন বলে, 'জার্মানি খুব নিয়মতান্ত্রিক আর নেদারল্যান্ডস লিবারেল উদারনৈতিক'। রজনী বলে, 'বাহ দারুনতো কিন্তু চাবি না থাকার নজির আমাদের দেশেও আছে।' 'দাদাভাই দিদিভাইরা আমার বইয়ের একশ কুড়ি টাকা আপনারা দিয়েছেন এখনও 250 টাকা উঠলে আমার পক্ষে বইটি কেনা সম্ভব।' রজনী কিছু দিতে চায় তাই তার চিত্তচাঞ্চল্য লক্ষণীয়। কুন্দন প্রশ্ন করে 'মা,বলোনা কোথায় দেখেছো?' মা, ' হিমালয়ে’ বলে ফোনের লাইন কেটে দেয়।' ততক্ষণে ছেলেটি কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। রজনীর মানসিক অবস্থান বুঝে নিয়েছে সে। রজনী এখন তার আক্রমণের লক্ষ্য। ছেলেটি বলে চলেছে-আপনারা ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য তাই আমার মতো গরিবের লেখাপড়ার ইচ্ছে বাঁধাপ্রাপ্ত হবে না এ আমার নিশ্চিত বিশ্বাস। আর মাত্র আড়াইশো টাকা। রজনী ইতস্তত করছে কত টাকা দেওয়া উচিত ভেবে। রজনী সঙ্গে ছেলেটির চোখাচোখি হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ব্যাগ খুলে 100 টাকার একটা নোট বের করে এগিয়ে দেয় সে। ছেলেটি হাত বাড়িয়েই ছিল। ঠিক সেই সময় অনীকের ফোন আসে। তড়িঘড়ি ফোন ধরতে গিয়ে রজনী কানেকশন কেটে ফেলে। ছেলেটা টাকাটা ততক্ষণে হস্তগত করেছে। ফের রিং বাজে রজনী ফোনটা স্পিকারে দিয়ে দেয় ভালোলাগায় তার মন ভরে আছে। গর্বিত ছেলেটি ফের ক্যাম্পেইন শুরু করে দিয়েছে- আপনাদের আশীর্বাদে আর মাত্র দেড়শ টাকা পেলে আপাতত আমি ভিক্ষাবৃত্তি থেকে নিষ্কৃতি পাব। 

অনীকের ইচ্ছা ছিল ছোটবেলার বান্ধবীর সঙ্গে হোলি কন্সপিরেসি দেখতে যাবে সেই জন্য ফোন করা। স্পিকার অন থাকায় অনীকের কানে যায় ছেলেটির ব্যাথিত উচ্চারণে ভিক্ষার সুর। অনীক বলে, 'রজনী দেখত ছেলেটির গালে কি একটা বসন্তের দাগ আছে?' রজনী হ্যাঁ বাচক উত্তর করলে অনীক জিজ্ঞেস করে, 'অরিজিন অফ ফিনান্সিয়াল একাউন্টিং বইটির জন্য 370 টাকা চাইছে কি ছেলেটি? রজনী অবাক হয়ে বলে,হু। অনীক বলে 63 নম্বর আর সাঁকরাইল মিনিবাসে ছেলেটিকে আমি দেখেছি। প্রথমবার 100 টাকা দিয়েছি। স্পিকার অন থাকায় পাশের একজন শুনতে পায়। সে রজনীকে কিঞ্চিত উত্তেজিত করলে। রজনী ফোনটা কেটে দিয়ে সটান ছেলেটিকে কলার ধরে100 টাকা ফেরত চায়। ছেলেটি থতমত খেয়ে বাস থেকে নেমে পড়ে। রজনীও পিছুপিছু গিয়ে ছেলেটির হাত ধরে ফেলে। ছেলেটি বলে দিদি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কোথাও যদি একটু বসা যায় তাহলে আমার ফেরেপবাজ জীবনের কথা আপনাকে বলতে চাই। কেন আমি এমন হলাম। রজনী বলে আমি কিছু শুনতে চাই না তুমি আমার টাকা ফেরত দাও। পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই অনীকের ফোন বেজে ওঠে রজনী ছেলেটি ঈঙ্গিতে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়াতে বলে। ফোনে অনীককে বলে, 'দাঁড়া তোর সাথে পরে কথা বলছি। আমি ছেলেটাকে ধরে ফেলে রেখেছি।'

              বাসস্ট্যান্ডের চায়ের দোকানে ওরা পাশাপাশি বসে। ছেলেটি শুরু করে ‘আমি বিকম অনার্স এ ভর্তি হয়েছিলাম। আগে হায়ার সেকেন্ডারিতে ফল খুব ভালো করেছিলাম বাবার ইচ্ছে ছিল আমি চাটার্ড একাউন্টেন্ট হব। আমারও তেমন ইচ্ছা ছিল।‘ এইটুকু বলে ছেলেটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ নামিয়ে নেয়। রজনী বলে আবার গল্প মারছো নাতো। ছেলেটি বলে আমার কি দরকার ছিল আপনাকে এতশত বোঝাবার। আমি আপনাকে আরামসে এড়িয়ে চলে যেতে পারতাম অথবা আপনার টাকা ফেরত করে দিলেই ল্যাটা চুকে যেত। আমি তা করিনি। আপনার মধ্যে থাকা বিশুদ্ধ আবেগের পরিচয় আমি পেয়েছিলাম। অনেক মানুষ আছেন যারা বাধ্য হয়ে আমাকে টাকা দেন, আপনি তেমন নয়। রজনী বলে ঠিক আছে ঠিক আছে আগে বাড়ো। ছেলেটি রজনীর অস্বস্তি বুঝতে পেরে বলে, 'বাবা অনেক সাধ করে নাম রেখেছিল অশেষ। অশেষ মিথ্যাচারে ডুবে গেছি আমি। যাহোক কলেজে পা দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই একসিডেন্টে আমার বাবা মারা যান। মা আর বড়দি এই আমাদের সংসার। লেখাপড়া শেষ হওয়ার আগেই  আমি বাধ্য হয়ে সাঁকরাইলের কেকের কোম্পানিতে চাকরি নিই। থাকা-খাওয়া মাস গেলে সাড়ে সাত হাজার টাকা মাইনে। সবাই মিলে একটা মোবাইল কেনা হয়েছিল। সময় ভাগাভাগি করে কর্ম অবসরে সবাই মিলে বিনোদনে ব্যস্ত থাকতাম। যে যার পসন্দ অনুযায়ী মজে থাকত। কেউ পর্নোগ্রাফি কেউ খেলা। রজনী জিজ্ঞেস করে তুমি কি দেখতে?  অশেষ বলে, 'ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, মেসি রোনাল্ডো। রজনী বলে, তুমি তো ভালো ছেলে। মাথা নিচু করে থাকে অশেষ। রজনী বলে, কি হলো? অশেষ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে আমি বিদিশার প্রেমে পড়েছিলাম। বিদিশাকে সাজাবার জন্য কসমেটিকস সানগ্লাস সাজপোশাকের আরো কত কিছু যে মোবাইলে খুঁজতাম। বিদিশার চাহিদাও বাড়তে থাকল। রজনী বলে, তুমি বিদিশাকে বোঝাতে না কেন? অশেষ বলে ছাড়ুন ওসব কথা, আপনি বলুন আপনাকে কে ফোন করেছিল?  ‘অনীক, আমার বন্ধু।‘ না না, প্রথমে যাকে শারীরিক কুশলতার কথা জিজ্ঞেস করলেন আমি তার কথা জিজ্ঞেস করছি। ‘ও বাবা তুমি সব শুনেছ? ও আমার পুত্র কুন্দন।‘ কোথায় সে এখন? কুন্দন লেখাপড়ার কাজে বিদেশে গেছে। অশেষ অবাক হয়ে বলে, বিদেশে লেখাপড়া করতে। কি বিষয় নিয়ে উনি পড়তেন? রজনী বলে সাইকোলজি, মানুষের মনের জটিলতায় ওরা আগ্রহ। রজনী বলে তুমি বিদিশার কথা কি বলছিলে। অশেষ বলে, না থাক। রজনী বলে, কোনো কথা রেখে ঢেকে বলবে এমন বাসনা নিয়ে তুমি কি আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলে। না তা নয়, বলছি মানুষের জানা উচিত নিজের বা বন্ধুর ক্ষমতার সীমা। টানলে রবারের মত ছিঁড়ে যেতে পারে সব কিছু। বিদিশার জন্য আমি আমার নিজের পরিবারে টাকার যোগান কমিয়ে দিয়েছিলাম। বিদিশার মা মেয়ের জন্য বাড়ি বাড়ি রান্নার কাজ নিয়েছেন। তার ইচ্ছা তিনি বিদিশাকে নার্সিং কলেজে ভর্তি করাবেন। বিদিশার ইচ্ছাই তার মনে এমন অভিলাষ জাগরিত করেছে। কষ্টার্জিত দু'লক্ষ টাকা কলেজে  জমা করতে হয়েছে অথচ লেখাপড়া শিকেয় তুলে বিদিশা এখন প্রেমে মশগুল। একপাশে নিজের মাকে শোষণ করছে অন্যদিকে আমার আবেগ নিয়ে খেলছে। রজনী জিজ্ঞেস করে তুমিই বা এই খেলায় তাল দিচ্ছও কেন। সব দোষ মেয়েদের উপর চাপিয়ে দিয়ে পরিত্রান পাবার চেষ্টা পুরুষের বহু ব্যবহৃত পথ। অশেষ কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে, তারপর বলে, আমি ওর রুপে মোহগ্রস্ত ছিলাম। ওকে আরো আরো সুন্দর দেখতে চাইতাম। সকলের যেন তাক লেগে যায় ওর সৌন্দর্যে। সব্বাই ঈর্ষা করবে আমাকে এই ভুল চিন্তার রাহুগ্রাসে বন্দি ছিলাম আমি। রজনী বলে, তারপর। অশেষ বলে, হেয়ারস্টাইল করতেই মাসে হাজার টাকা চলে যেত। তারপর লিম্ফ্যাটিক ম্যাসাজ স্কিনের জন্য কসমেটিকস। রজনী বলে, এতসব তুমি জানলে কি করে? বিদিশার শখের জন্যই আমাকে মোবাইল কিনতে হল। এখন আমি বুঝেছি পৃথিবীর বুদ্ধিমান মানুষ কেমন ভাবে গরীবকে বোকা বানায়। আচ্ছা আপনারা সচ্ছল, কুন্দন কে মানুষ করার ক্ষেত্রে কোনদিন অর্থ নিশ্চয় বাধ সাধেনি? না, মাধ্যামিক পাশ দেওয়ার আগে ছেলে বুঝতেই পারেনি বাবা-মা টাকা পয়সা আছে, রজনী বলে। রজনী হেসে বলে, না, বিষাণ মানে আমার স্বামী এবং আমি দুজনেই দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছি। আমরা দুজনেরই সম্যক উপলব্ধি হলো দারিদ্র না দেখলে, পরিশ্রম না করলে মানুষের চরিত্র গঠন হয় না। কুন্দন যখন ক্লাস টেন এ পড়ে সে তার বাবাকে যদি অসুবিধা না হয় তবে একটা বই কিনে দেওয়ার আর্জি জানিয়ে ছিল। সাথে বলেছিল, তোমাদের যদি অর্থনৈতিক অসুবিধে না হয় তবেই কিনে দিও। অসুবিধে থাকলে আমি লাইব্রেরী থেকে দেখে নেব। অথচ দেখো তুমিও দারিদ্র্যের মধ্যে মানুষ। অশেষ কিছুটা চুপ করে যায় তারপর বলে, এখানে উলটপুরান। বাবা মেয়ে সন্তানের প্রতি নজর না দিয়ে ছেলেকে উচ্চকক্ষপথে স্থাপন করতে সর্বোচ্চ ঢেলেছেন। আর আমি বিদিশার মতো আরও আরও বখে গিয়েছি। বাকরুদ্ধ  অশেষ হঠাৎই কাঁদতে থাকে। রজনী অশেষের মাথায় হাত বোলাতে থাকে।  ঠিক সেই সময় কুন্দনের ভিডিও কল আসে। 'কি গো, এখনও বাড়ি পৌছাওনি? বিদিশা বলে, দাঁড়া আলোতে কিছু দেখা যাচ্ছে না ব্রাইটনেস বাড়াই। হ্যাঁ, এবার বল। কুন্দন বলে দেখো হোটেলের ফ্রিজে 'রেডি টু ইট, স্টক', ব্যবহার করলে মূল্য দিতে হবে। মূল্যমান কেউ মেলাবে না। তুমি যা ডিক্লেয়ারেশন দেবে ওরা সেই মুল্য ধার্য করবে। রজনী বলে, তো, তুই পাগল হয়ে গেলি নাকি? ওসলো কেমন শহর তা না জানিয়ে ফ্রিজ খুলে দেখানোর মানে কি? অশেষ বলে ওঠে, বুঝেছি উনি বলতে চাইছেন হোটেল অথরিটি কিচ্ছুটি চেক করবে না একদম বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। কুন্দন বলে, মা, উনি ঠিক বুঝেছেন, ওনার পরিচয়। মোবাইল ঘুরিয়ে মা দেখায়, এই দেখ অশেষ। ওর সঙ্গে আজ আলাপ হলো।  অশেষ হেসে বলে- ভাগ্যের পরিহাস আরকি। রজনী বলে, বাবাই আমরা একদিন কি স্কাইপ করতে পারি? কুন্দন বলে, অবশ্যই।

                 রবিবার বিকেলে অশেষ এসেছে রজনীর বাড়িতে। বিষান কম্পিউটার খুলেছে। কুন্দন কে দেখা যাচ্ছে ওপারে। কথা শুরু হবে অশেষের জবানি দিয়ে।

 অশেষ- কুন্দন দা, আমি জানতে চাই নরওয়ের সামাজিক আবহের সংকেতে আপনি কেন এত উল্লসিত? 

কুন্দন- জীবনে এই অভিজ্ঞতা নেই বলে। অপু দুর্গা কেন অবাক হয়েছিল? এমন বিস্ময়কর সুন্দর যন্ত্রযান তারা কোনদিন দেখেনি, ঠিক কিনা।

অশেষ- ঠিক। কিন্তু এমনটা কি করে হতে পারল?

রজনী- এমনটা এদেশেও ছিল। 

বিষান- ঠিক, একবার আমরা ট্রেকিং করতে গিয়েছিলাম কুমায়ুন হিমালয়ে। আমাদের গাইড ছিল বলবন্ত সিং। আমরা আদর করে তাকে বল্লু নামে ডাকতাম। বল্লু একদিন বললো, বাবু হেমন্ত সিং আপলোগ ক্যা রুকস্যাকমেসে দারু নিকালকে পিতে হ্যায়। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, পাহাড়ের লোক এমনটা তো করেনা। বল্লুর কথায় ছিল হাতুড়ির ঘা। ও বলেছিল, হেমন্ত সিং ছয় মাস কে লিয়ে বরোদা গ্যায়া থা, চোর ব্যানকে লৌটা। 

রজনী- এমন অনেক উদাহরন আমি দিতে পারি। 

অশেষ- আমিও।

কুন্দন- বল বল। 

অশেষ- এই যেমন, তোমাদের মতো পরিবার কি নরওয়েতে পাব? সবাই একচোট হেসে নেয়। 

কুন্দন- আমি তোমার জীবন বৃত্তান্ত শুনতে চাই। তারপর আমার কনসালটেন্সি শুরু হবে।

অশেষ- আমি অশেষ। অক্ষম পিতার বয়ে যাওয়া ছোট সন্তান। দিদি বড়, বাবা পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, মা বেঁচে আছেন। বাবা-মার প্রচ্ছন্ন মদতে দিদি কে শোষণ করে আমার বড় হয়ে ওঠা। আমি চাঁদ চাই নি, তাই পাইনি বিষয়টা এমন ছিল। বাবা-মা চাইতেন ছেলে যেন অভাবের মুখ না দেখে কোনোদিন। বাবা দিনরাত পরিশ্রম করতেন। ছটবেলা থেকে লাই পেয়ে মাথায় উঠলেও লেখাপড়ায় আমি ভালো ছিলাম। আর থাকবো নাইবা কেন। ভালো টিউশনি পেয়েছি বরাবর। দিদি, কিছুই না পেয়ে কোনরকমে মাধ্যমিক পাশ দিয়ে হতোদ্যম হয়ে পড়ে। 

কুন্দন- বুঝলাম, তুমি কি জানো ভিক্ষাবৃত্তি আইনত অপরাধ। এমনকি দশ বছরের জেলও হতে পারে। 

অশেষ- আমাদের দেশে আইন মেনে কোন কাজ হয়? 

কুন্দন- তোমার কি মনে হয়, চাকরি পেলে এই কাজ তুমি বন্ধ করে দেবে?

অশেষ- নিশ্চয়।

 কুন্দন- চাকরি তো তুমি করতে। 

অশেষ- সম মাইনের চাকরি চাই।

কুন্দন- সাড়ে সাত হাজার টাকা তোমার কাছে তাহলে খড়কুটো ছিল বল।

অশেষ- অবশ্যই। পাঁচ হাজার পরিবারকে দিতে হতো। বিদিশার বরাদ্দ ছিল দুহাজার। উভয়েরই চাহিদা বাড়তে থাকল অগত্যা পেশার পরিবর্তন। 

কুন্দন- হঠাৎ কেন এমন পেশা বাঁচতে হলো?

অশেষ- যখন তরুণ-তরুণীদের দেখতাম ইউনিফর্ম পড়ে উচ্চ শিক্ষিত হতে যাচ্ছে যন্ত্রণায় আমার খুব ফেটে যেত। আমিও তো পড়তে পারতাম। কি ছিল না আমার?

কুন্দন- এই পেশায় কিভাবে তুমি এলে?

অশেষ- বিদিশাকে নতুন নতুন রুপে দেখতে আমি উন্মাদ ছিলাম। আমরা দুজনে একসাথে মোবাইল ঘাঁটতাম নতুন পণ্যসম্ভারে আমরা আক্রান্ত হতাম। বাজার, হরেক রকম পণ্যে বোঝাই। আধুনিক শিক্ষা হলো মানুষকে বাজারের টেনে নামানো। বিভিন্ন মানুষ আ্যকাডেমিক ডিগ্রি বোঝাই করে এগিয়ে চলেছে এই কাজ করতে। মোবাইল ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আপনার পছন্দের জিনিসের তালিকা আপনার কাছে হাজির করছে। মানুষ অংক কষে কম্পিউটারকে বলে দিয়েছে কিভাবে ভিখারি মানুষের কাছে চন্ডী দাসের খুড়োর মতো দোলাতে হবে কল। কারণ বড় বড় কোম্পানি সমস্ত অংকবিদের মস্তিষ্ক কিনে নিয়েছে। মানুষকে তার পছন্দের উপর নির্ভর করেই ভিখারি বানানো যায়। কুন্দনদা, তুমি বলছিলে না ভিক্ষাবৃত্তি আইন সঙ্গত নয়। সবাই চুপ মেরে গেছে। 

কুন্দন- কিন্তু সাড়ে সাত হাজার টাকার রিস্ক তুমি নিলে কি করে?

অশেষ- আমি জানতাম বাঙালি কামচোর জাত। গায়ে গতরে খেটে উপার্জন করতে পারে না। আর গায়ে-গতরে চাকরি বাজারে কিছু কম নেই। আমি যখন তখন এমনটা পেতে পারি। 

বিষাণ ফুট কাটে- তা বলে ভিক্ষাবৃত্তি!  

অশেষ- আমি ভিখারি নই। ভিখারি তাঁরা যাদের আমি ইমোশন বিক্রি করি। আমার আবেগ তাদের ছু্লে তাঁরা অর্থ দেন।

কুন্দন- জীবনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এমন ব্যবহার কোনদিন দেখিনি। শুধু প্রকাশ ভঙ্গিতে রকম্ফের নেই।  

অশেষ- ঠিক তাই, আমি প্রযুক্তির কাছে শিখলাম কেমন ভাবে চলতে হবে। দরকার হলে পালটাবো অন্য ভাবে বিক্রি করব আবেগ।  

কুন্দন- উহু, প্রযুক্তি নয়। আসলে মানুষ প্রযুক্তি বানিয়েছে। ধনী মানুষ জানে পণ্য বিলাসী কোটি কোটি ভিখারি তৈরি করতে পারলে বাজার চাঙ্গা হবে। 

অশেষ- ঠিক আর আমি চেয়েছি আবেগ হারিয়ে যাওয়া মানুষকে জাগিয়ে তুলতে।

রজনী- উহু, তুমি এই টাকা ঢালো বিদিশার জন্য, বাজারে। 

অশেষ- বিদিশার সঙ্গে বহুদিন আমার দেখা হয়নি। আজ ভাবছি যাব। দেখি ফেরে কিনা। 

কুন্দন- তোমার সঙ্গে আবারও বসতে হবে। পারবে সময় দিতে? অশেষ- মনে হয় না।

রজনী- সেকিরে এইজন্য তোকে ভালোবেসে ফেললাম?

                 রাতের খাবার খেয়ে অশেষ বাড়ি চলে গেছে। বিছানায় রজনী আর বিষান। বিষান রজনীর চিবুক ধরে বলে, তুমি সত্যিই জহুরী। রজনী বলে না হলে তোমায় খুঁজে পাই। বিষান রজনীর কপালে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে শুয়ে পড়ে।

                 আজ সোমবার। ভোর হতে না হতেই রজনী উঠে পড়েছে। দুবেলার রান্না করে রেখে অফিস যাবে সে। নাগাড়ে ফোনটা বেজে চলেছে, ধরতে পারছে না রজনী। ভাত নামিয়ে আঁচ কমিয়ে রজনী ফোনটায় দেখে ননদ মিঠুর মিসড কল। কল করলে ননদ বলে, দাদার ফোন তো কখনো বন্ধ হয় না। বারবার রিং করছি ফোন সুইচড অফ বলছে। আমি ভয় পেয়ে যাচ্ছি। ফোন রেখে রজনী আতিপাতি খুঁজতে থাকে বিষানের ফোন। কোথাও না পেয়ে উনুনের আঁচ বন্ধ করে রজনী মাঠে যায়। সকালবেলা রোজ নিয়ম করে বিষান মাঠে ব্যায়াম করে। রজনীকে দেখে বিষান বলে, আমি তো কাল রাতে কম্পিউটার টেবিলের ফোন রেখেছি। তারপর থেকে ফোনে হাতই দিই নি। রজনী বলে, তাহলে কি ফোন ডানা মেলে উড়ে গেল? সদ্য কেনা অ্যাপেলের ফোন, দু জনেরই মন খারাপ হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি বাড়িতে এসে ওরা কুন্দন কে ফোন করে। আলোচনায় ঠিক হয় ওরা মিসিং ডায়েরি করবে, কারণ বহু অফিশিয়াল তথ্য আজকাল ফোনে থাকে। বাড়ি থেকে চুরি হয়েছে বললে অশেষের নাম জড়িয়ে যাবে তাই অফিস যাওয়ার পথে হারিয়ে গেছে এই বলে ডায়েরি করা সহজ। বিষান বের হবে ঘর থেকে। রজনী দরজা বন্ধ করতে এসেছে। দরজা খুলে বিষান দেখে ছলছল চোখে অশেষ ওর আ্যপেল ফোন নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বিষান জিজ্ঞেস করে, কি হলো? বিদিশা পুরানো আ্যপেল চলবে না বলেছে? রজনী বলে, ছিঃ, আমরা তোকে ভরসা করেছিলাম। অশেষ, কাকুর হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে পালাতে চায়। তারপর ফিরে কাকিমার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, বিদিশা অ্যাপেলের সন্ধানে অন্য ঠিকানায় হানা দিয়েছিল। সেখানে ধর্ষিতা হয়ে গতকাল রাতে ট্রেনে গলা দিয়েছে। 



কৃশানু মিত্র 

                                           ……………………………….

Comments

  1. ভালো,আপনার ভাবনাগুলো বেশ নতুন।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ছোটগল্প - লাল কালো ইট।।

একগুচ্ছ কবিতা

কোন সে আলোর স্বপ্ন(কথায় ধারাবাহিক)