বড়গল্প- একাকিত্বের আমি

                                     বড়গল্প 

                              একাকিত্বের আমি

             ব্রিজমোহন গাঙ্গুলী আর রামমোহন গাঙ্গুলী স্ট্রিটের মাঝে অবস্থিত বিজন পল্লী। বাসিন্দাদের মধ্যে সরকারি কর্মীদের আধিক্যই বেশি। পুকুর বুজিয়ে  জঙ্গল কেটে সাফ করে এখানে ওরা থাকতে শুরু করেছিলেন আশির দশকের গোড়ার দিক থেকে। গোটা পাড়ার মানুষজন একে অপরের সঙ্গে এঁটুলির মতো লেগে থাকত।  পাড়ার মধ্যমনি অনিতার পরিবার। শিক্ষাদীক্ষার কারনে পাড়ার সবাই অনিতার স্বামী পার্থ বাবুকে খুব সন্মান করত। বিকেল হলেই মেয়েরা বারান্দায় ছাদে যে যার বয়স অনুযায়ী মেতে যেত গল্পে। বিশ্বকর্মা পূজো দোল কোনো অনুষ্ঠান এদের হুল্লোড়ের ফর্দ থেকে বাদ পড়ত না। ঘুড়ি উড়ানো বা রংখেলা সারা হলে রাতে ভুরিভোজ হত সব্বাই মিলে। গোলটা বাঁধলো বরেনের বিয়ের পর।  প্রতিবেশী মুখার্জি পরিবার, সবিতাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিয়ের কাজ উতরে দিয়েছিল। সবিতা বরেনের মা, প্রতিদানে চোর আখ্যা দিয়েছিল মুখার্জিদের। এই ঘটনার পর পাড়ায় ব্রাত্য হতে হয়েছিল সবিতা এবং তার পরিবারকে। একমাত্র অনিতাই সকলের কাছে ভালো থেকে সকলের চোখ এড়িয়ে সবিতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা শুরু করেছিল। অনিতাই প্রথম চিঠি লিখেছিল  সবিতাকে। সবিতা উত্তর না করে নিজেকে সামলে নিয়েছিল।  সহজে কাউকে বিশ্বাস করা  সবিতার ধর্ম নয়। উত্তর আসছেনা দেখে আবারও শেফালির হাত দিয়ে অনিতা দ্বিতীয় চিঠি পাঠায়। পার্থবাবুর পরিবারকে সম্ভ্রম করার কারনে শেষমেষ নিমরাজী হয়েও সবিতা একটা চিঠি লিখেছিল।

প্রিয় অনিতাদি

                 আপনি কি সবার অলক্ষে আমার সঙ্গে আঁতাত করতে চান?  চিঠির ছত্রে ছত্রে আপনার ঔৎসুক্য  প্রকাশ পাচ্ছে। আমার মনে হয় বরেনের বিয়ের সময় মুখার্জিদের সঙ্গে ঘটা ঘটনার আঁচ পেতে আপনি উদগ্রীব। আমি জানিনা আপনার কোন উদ্দেশ্য এতে সাধিত হবে। যদি কোনদিন প্রকৃত বন্ধুত্বের আশ্বাস পাই তাহলে নিশ্চয় সব জানাবো। 

আপনার

সবিতা।

এর উত্তরে অনিতা লিখেছিল।

প্রিয় সবিতাদি

                 আপনি আমাদের চেনেন। আমরা চাইনা পাড়ার মধ্যে থেকে কেউ একা দ্বীপের মতো  বাঁচুক। ভুল ত্রুটি জীবনের অঙ্গ। এইভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা কাউকে আলাদা করে দেওয়া ঠিক নয়। যদি পুরনো বন্ধন কিছুটা দৃঢ হয় তার চেষ্টা লাগাতার চালিয়ে যেতে হবে। এই বই আমাদের কোন  বিশেষ উদ্দেশ্য নেই। এখন আপনি যেমন বুঝবেন।

ইতি

 অনিতা।

         পরবর্তীতে চিঠি চালাচালির মাধ্যমে সবিতা এবং অনিতার সখ্যতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এখন ওরা ভাব আদান প্রদানে রীতিমতো সাবলীল।  আপনি সম্বোধন কখন তুমিতে নেমে এসেছে দুজনের কেউ খেয়াল করেনি। এমনকি নিজেদের পরিবার নিয়েও নির্দ্বিধায় ওরা আলোচনা করত। 


সবিতা দি

                 তুমি ঝাঁসির রানী। কোথাও কোনদিন হার মাননি। এই পাড়ার মানুষজনের সাধ্য কি একঘরে করে তোমায় হারাবে। স্বামীকে যে কাঠপুতুল বানিয়ে রাখতে পারে সে মহীয়সী।  ট্যাঁশট্যাঁশ করে কথা বলত বলে বিয়ের পর দিলে মেয়েকে বরাবরের জন্য ভাগিয়ে। কোনদিন তাকে ফিরে বাড়ি ঢুকতে দাওনি। প্রিয় সন্তানকে অক্টোপাসের মত আঁকড়ে ছিলে তুমি। মনিদিপা যখন বউ হয়ে বাড়ি এল তখন ফুলশয্যার ঘরেও তোমার কর্তৃত্বে বরেন বেহাল ছিল। একেই বলে মাতৃস্নেহ। ছেলের সামান্য দায়িত্বও তুমি মনির হাতে তুলে দাও নি। বরেনও মা অন্ত প্রাণ। তুমি না চাইলে ওদের সন্তান, চতুর  আসত এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। তুমি চেয়েছিলে নাতি বরেনের মত মেধা সম্পন্ন ও চতুর হোক। চতুর বড় হয়ে মায়ের অসুখী জীবনের কারন বুঝতে চাইল। তুমি অখুশি হলে। মনি একদিন আমার কাছে এসেছিল। আমি জিজ্ঞেস করায় সে সোজাসাপটা বলল, আমি একজন নারী একজন নারীর যা যা চাহিদা থাকার কথা আমার সব আছে। বরেন আমাকে সব কিছু দিতে পারেনা। ও মা ছাড়া কিছু বোঝে না। লজ্জার মাথা খেয়ে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,তাহলে বাচ্চাটা এলো কি করে? মনি বলেছিল,ও তুমি বুঝবে না। ওই বাচ্চাটা আমার। চতুরের মানসিক গঠনে কোথাও বরেন নেই। আমি বললাম,শারীরিক ভাবে এল কি করে যদি বরেন তোকে ছুঁতে না পায়? আরও বলেছিলাম, সাত পাকে বাঁধা সম্পর্ক লালন করতে জানতে হয়। হারামজাদি মনি আমাকে কি প্রশ্ন করেছিল জানো? সে বলেছিল, তুমি বিবাহের প্রথম পাঁচ বছরে কাকুর সঙ্গে কবার শুয়েছিলে? আমি স্বামীকে কোনদিন কাছে পাইনি। সবসময় পুলিশ শাশুড়ি থাকে শোবার ঘরে। চতুর কোলে আসবে বলে বরেন কে দিয়ে আমাকে বিট করানো হয়েছিল। বরেন কোনদিন প্রতিবাদ করেনি। এই কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল আমি যে কেন সবিতা দি হতে পারলাম না। আগে তোমার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ত্ব পাতালে আমার ভাগ্য আজ এমন হত না। যাহোক একটু কায়দা কানুন শিখিয়ো যেন আমি অবিনাশ আর লাবণ্যকে ঢিট করতে পারি।

ইতি

অনিতা। 

         অনিতাদি 

               তোমার দেওয়া উপাধি আদতে শ্লেষ না অন্য কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। এই প্রথম মনে হল আমাদের নতুন করে গড়ে ওঠা সম্পর্ক কি ভুলের পথ হাঁটছে? তুমি কি সত্যি সত্যি আমাকে ভালবাস? দয়া করে আমার বিশ্বাসের সুযোগ নিও না। জান অনিতা দি, মাঝে মধ্যে আমার মনে হয় আমি নির্বোধ এক মা যে জানতেই পারল না সন্তান সুখ কাকে বলে? নিজের বিয়ের পর থেকেই আমি চেয়েছি আমার স্বামী রতন নামের নির্বোধ মানুষটিকে স্বামী নয়, আসামি করে বাঁচিয়ে রাখতে। সহস্রবার আমার ইচ্ছের হাঁড়িকাঠে ওকে বলি হতে হয়েছিল। আমার শরীরের প্রতিটি কোষের রক্ত চাঞ্চল্য ছিল বশীকরণের মাদুলি। রতন সর্বস্ব জলাঞ্জলি দিয়েছিল এই চৌম্বকক্ষেত্রে। নীতিবোধ,সাধারণ জ্ঞান বিবর্জিত একটা মানুষ হয়ে পড়ছিল রতন। আমি সংসারের প্রতিটা ক্ষেত্রে কায়েম করেছি রাজ্যপাট। ছেলের বিয়ে, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একটা রুপে আধখাওয়া মেয়ে যে কোনদিনই ছেলেকে বশীকরণ করতে পারবে না আমি তাকে ঘরে এনেছি। আমার ছেলে আমার রাখতে কঠিন নজরদারি বজায় ছিল। চাহিদা অনুযায়ী শারীরিক মিলনের সময় নিত্য আমার উপস্থিতি ওদের প্রেমের প্রতিবন্ধক ছিল। কি জানি মন কি ওভাবে বেঁধে রাখা যায়? এই আধখাওয়া আঁটকুড়োর বেটির প্রতি আমার ছেলের টান যদি দানা বাঁধ? বরেনকে ওর বাবার মত মেরুদন্ডহীন তৈরি করতে চেয়েছিলাম। আমার সামনে চোখ তুলে দাঁড়ানোর কথা কল্পনাতেও আনতে পারত না ও। সেই বরেন যদি শরীরী নেশায় ঘুরে দাঁড়ায় সংসার টলোমলো হয়ে যাবে। 

                 কিন্ত অনিতা দি, তোমার অসুখ কি নিতান্তই দুঃখবিলাস নয়? তোমার স্বামী পার্থবাবু রূপে পার্থবৎ নীতিগুণে ধর্মরাজ্য যুধিষ্টির। পুত্র সন্তানকে তিনি মানুষ করেছেন নিজের মত করে। তোমাদের সন্তান একজন প্রকৃত মানুষ। ঘর আলো করে এলো অবিনাশ লাবণ্যর কন্যা মনীষা। সে বাপ দাদু মায়ের ভাবনায় বড় হচ্ছে। তাহলে তোমার চিন্তাধারা কেন এমন দিশাহীন হবে? মাঝেমধ্যে মনে হয় যদি পার্থদার মত কেউ একজন আমার স্বামী হত, আমার জীবনে ঝাঁসির রাণী তকমার প্রয়োজন হত না। আমার পথে তোমার না চলাই উচিত। ভেবে দেখ।

ইতি

সবিতাদি। 

                 আজ অনিতার পালা সকাল থেকেই পার্থ চিলেকোঠার ঘরে। খসখস করে চিঠি লেখা সারা। শেফালির হাত দিয়ে যা পাচার হয়ে গেছে। 

সবিতাদি,

                 তুমি আঘাত পেলে আমি ক্ষমা প্রার্থী। তোমায় তকমা দিয়ে ছোট করার বদ মতলব আমার ছিল না। আমাকে তুমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পার। কোনদিন সময় এলে বুঝবে। আগের দিন যা লিখেছি তা আমার মনের কোণ থেকে উঠে আসা হুতাশ। সময় অভাবে ব্যখ্যা করতে না পেরে গতদিন শেষ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। তোমার ভুল ত্রুটি নিয়ে তুমি বলছিলে। আচ্ছা বলত দশ মাস গর্ভে ধারন করা সন্তান যদি বউয়ের কথায় ওঠে বসে কোন মা তা মেনে নিতে পারে। আমার এখন মনে হয় পুরুষ মানুষের নৈতিকতার প্রয়োজন নেই। এতে সংসারের অমঙ্গলের হয়। সংসার নারীকে ঘিরে আবর্তিত হওয়া উচিত। ছোটবেলায় আমার মা, বাবার অবর্তমানে সম্পূর্ণ পরিবারের রাশ নিজের হাতে ধরে রেখেছিল। জানিনা, হয়ত সে কারনে বাবাকে মৃত্যু বেছে নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। অথচ আমি পারলাম না। আমার পতিদেবতা, আমার আক্ষেপ হয় কেন তিনি দেবতা হতে গেলেন। তিনি অত্যন্ত সাধারণ মানুষ হলে পরিবারে আমার সত্যিকারের অস্তিত্ব থাকতো। আমি যে তোমার মত অবিনাশের ঘরে উঁকিঝুঁকি দেওয়ার চেষ্টা করিনি এমন নয় কিন্তু তোমার পার্থদার ভয়ে সেরকম কিছু করে উঠতে পারিনি। এখন আবার চাকরিতে অবসর নিয়ে তিনি বসে গেলেন। কি যে করি। বিভিন্ন কাজে অবিনাশের কাছে বহু মানুষ আসে। এখন আবার সন্ধ্যায় গানের আসর বসে। এতে আমার প্রাইভেসি বড্ড বিঘ্নিত হয়। আমার প্রাণে বাতাসের অভাব ঘটছে। সহ্য হয় না এই সব "হ য ব র ল", গান। পার্থর সায় আছে এইসব আড্ডাবাজি হুল্লোড়ে। এই জানো, সুরমা বলে এক সুন্দরী গায়িকা আসে ভারি মিষ্টি গলা তার। যদি একবার অবু মজে যায় তাহলেই লাগ ভেলকি লাগ। লাবণ্যর সব জারিজুরি খতম হয়ে যাবে।

                শেষ করলাম অবু এল বলে। 

অনিতাদি।

 

অনিতাদি

                 তুমি বলেছিলে, আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে তোমার পরিবারের মত আছে। এখন দেখছি তুমি নিজের পরিবারকে অন্ধকারে রেখে আমার সাথে পত্রালাপ কর। আমার অনুমান যদি সত্যি হয় যে কোনদিন এই চিঠি চালাচালি তোমার পক্ষে ভয়ঙ্কর হতে পারে। শেফালী মাগিটার থেকে তোমাকে সাবধান হতে হবে। সেদিন বলে, তোমরা কি এত লেখালেখি কর যা আমি ছাড়া আর কেউ জানতে পারবে না? রোজ কলাটা মূলোটা পাচ্ছে তবু হারামজাদি..। বলে কি জানো,তোমার হাত দিয়ে তবু কিছু গলে অনিতাদি বড্ড কৃপণ। হাত দিয়ে জলও গলে না। তুমি বাপু ওর হাতে মাঝেমধ্যে কিছু দিও। কিছু না পারলে ঠোঁট লাল করা পান বানিয়ে দিও। পাড়ার ছোঁড়া গুলোকে লাল ঠোঁট দেখিয়ে নজর কাড়বে বেটি। সেদিন তোমার লেফাফা হাওয়ায় দোলাতে দোলাতে শেফালি আসছিল। ঈশিতাদি কে দেখে শেফালি রঙ্গ তামাশা বাড়িয়ে দিল। দেখে তো ঈশিতাদির চক্ষু চড়কগাছ। বেশ কিছুদিন হল ঈশিতাদির সঙ্গে আমার বাউন্ডারি ওয়াল নিয়ে ঝামেলা চলছে। ঈশিতাদিকে কিন্তু একদম বিশ্বাস করবে না। পেট থেকে মুখে কথা টেনে বার করতে উনি ওস্তাদ। আচ্ছা এখন থাক ওসব কথা। তোমাকে বলি শোন, শুরু থেকেই তোমার সংসারের ধাঁচা আলাদা। কোনরকম অলক্ষুণে কিছু তোমার জন্য নয়। আমি যদি সংসারের লাগাম হাতে নাও তুলতাম তাহলেও আমার সংসারের মানুষজন কিছুতেই গুণে তোমার পরিবারের মানুষ জনের সমমান পেত না। তুমি সংসারের একজন হয়ে একদম নিজের মত বাঁচার চেষ্টা করো।  আমি তোমার ভাল চাই,  মনেরেখ।

তোমার 

সবিতাদি। 

সবিতাদি,

               তোমার পরিকল্পনার কথা জানতে চাইছি আর তুমি আমায় ভয় দেখাচ্ছ। শেফালী বিটলামি করলে পাড়ার ওর সবকটা কাজ মেরে দেবো। শেফালী কোথায় থাকে আমি জানি। ওর স্বামীর সাথেও আমার পরিচয় আছে। ওর পেছনে লেগে আছে অনেকে। ছোঁড়াগুলোকে আমি চিনি। কবে কাকে ও সঙ্গ দিচ্ছে সব খবর আমি পেয়ে যাব। বেচাল দেখলে দেব ঝাঁপি খুলে। কি সব লিখছি দেখ। ওদের আবার ঘর স্বামী!  যার তার সঙ্গে ঘর বসালেই হলো কিন্তু তুমি বুড়ি খুব সুবিধের নয়। আমার বরের দিকে তোমার নজর পড়েছে। আমি তো কোনদিন তোমার স্বামী দেবতার দিকে নজর দিইনি। বরং তোমার স্বামী ইতিউতি আমার দিকে  চাইত। অবশ্য তোমার চোখের নাগাল এড়ানো তার পক্ষে অসম্ভব। এতদিন পাশাপাশি আছি তবু মুখ ফুটে একবারও রতন দা, আমার সঙ্গে কোন কথা বললেন না। হয়ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল, যদি তোমাকে বলে দিই। 

             চুলোয় যাক ওই সব কথা। কিভাবে বরেন আর মনিকে ভাঙবে সেই পরিকল্পনার কথা জানিও। শেফালীকে এড়াতে যদি ফোনে কথা বলতে হয় তাতেও আমি রাজি। ছেলে আমাকে একটা নতুন মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছে তোমায় নম্বর দিলাম(৮৬২০৮৭৯৯২৪)। আমি কিন্তু ল্যান্ড লাইনেই ফোন করব। সন্ধ্যা সাড়ে আটটার পর টেলিভিশনে সিরিয়াল দেখা শেষ হলে  আমি মুক্ত।

ইতি

অনিতা।


হ্যালো, অনিতাদি 

             জবর খবর আছে। বরেনের অফিসের বস এসেছিল। নাম ইফতিকার। বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি হবে। ছিপছিপে মেদহীন শরীর। টানা চোখ আর লম্বা নাক। আমায় মাসিমা সম্বোধন করায় আমি কিঞ্চিৎ বিব্রত হয়েছিলাম। আচ্ছা বলত আমি কি এত ধেড়ে লোকের মাসিমা হতে পারি? তার ওপর নামে মুসলমান। যদিও বরেন পরে বলে ইফিতিকার দা ধর্মে হিন্দু। শখ করে উনি মুসলিম নাম বেছে নিয়েছিলেন। আমি বাপু ওকে দেখেই মতলব ভেঁজেছিলুম। গরু খাওয়ার গুণে ওরা পুরুষ হিসেবে খুব সক্ষম হয়। বরেনের অফিসের তিনটে শিফট চলে। যদি নাইট ডিউটিতে বরেন কে বেঁধে রাখা যায় তাহলেই কেল্লাফতে। যেমন ভাবা তেমন কাজ ইফতিকার আমাকে মাসিমা ডাকতেই আমি বললাম ইফটু তুমি আমাকে বৌদি ডাকলে আমার খুব মিষ্টি লাগবে। ওর ঠোঁটের ফাঁকে হাসি দেখেছিলাম। মাঝে মধ্যে চোরা চাহনিতে বিঁধছিলাম ওকে। ইফটু আমার হাত থেকে জলের গ্লাস নিতে এলে আমি ওকে ছুঁয়ে দিই। মনে হয় ইফটুও আঙুল দিয়ে আমায় ছুঁতে চাইছিল। ওর ছোঁয়া থেকে দূরে যাওয়ার ভান করে আমি ইচ্ছে করে  হাতের থেকে কাঁচের গ্লাস ফেলে দিলাম। তারপর নিখুঁত অভিনয়ে নিচু হয়ে ভাঙা কাঁচের টুকরো গুলো তুলতে লাগলাম। ইফটু নিচু হয়ে আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো। ওর অজান্তেই আমি দিলাম মাথা ঠুকে। অনিতা- তারপর? সবিতা-ও আরো কি কি দেখতে পেল তা পরে জানাবো। তবে এটুকু বলতে পারি আমার আর পার্থ দা কে লাগবে না। অনিতা- এই থামলে কেন বলো না আরো কি কি ঘটলো? তুমি ষাট  ছুঁইছুঁই ভুলে যেওনা। পড়লেই যখন একদম ধর্মের লক্ষণ গণ্ডি পেরিয়ে একজন মোছলমানের খপ্পরে! সবিতা- ষাট নয় ছাপ্পান্ন, এই জন্য তোমার আর কিছু হলো না। অনিতা- কেন কেন? সবিতা- আমি কি ওর সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করব নাকি। অনিতা- তবে? সবিতা-বরেনের নাইট ডিউটি পাকা করব। বরেন নাইট এলাউন্স পাবে। মনি রাতে একা। বরেন অফিসে, সোহাগী কালো মাগি রাতে আমসত্ত্ব ভাজবে। অনিতা- আর তুমিও বর টপকে ইফটুর সাথে কিতকিত খেলবে। সবিতা- বেহায়া কোথাকার নিজের সব ইচ্ছে গুলো অন্যর ঘাড়ে চাপানো? অনিতা-তোমার ইফটুকে একদিন দেখাবে?  সবিতা- তা দেখবে না, রস সকলেরই আছে। এই রাখলাম মনি এসে গেছে। 

             বেশ কিছুদিন পর পার্থবাবুর অবর্তমানে অনিতা ল্যান্ড লাইন থেকে ফোন করে। মনিদিপা ফোন তুললে অনিতা লাইন কেটে দেয়। অনিতা ফের কিছুক্ষণ পরে ফোন করে। ওপাশ থেকে মৃদু কন্ঠে সবিতা দি বলে আজ এত তাড়াতাড়ি, অসময়ে ফোন করলে কেন? মনি বাথরুমে গেছে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারব না। আজ থেকে ছেলের নাইট ডিউটি শুরু। অনিতা-মনি কিছু আন্দাজ করতে পারেনি তো। সবিতা- বিয়ের পনের বছর কেটে গেছে হঠাৎ আজ নাইট ডিউটি কেন এই প্রশ্ন ওর মাথায় আসা খুব স্বাভাবিক। তবে আমার পরিকল্পনা আন্দাজ করার মত বুদ্ধি ওর নেই। অনিতা গান করার ঢঙে- আমি জানি, হীরক রাজার শয়তানি। সবিতা- কি জানো বলতো দেখি? অনিতা- তুমি ইফটুকে মনির ঘরে ঢুকিয়ে দেবে। তোমার নাদুসনুদুস ছেলের চেয়ে পল্টনের ঘোড়া অনেক শক্তিশালী। মনি যদি একবার তার স্বাদ পায়। কথা কেড়ে নিয়ে সবিতা বলে-এই মন্দ বলোনি তো। এটা আমার মাথায় আসেনি। কিন্তু এই টলটলে রঙের মায়া কাটিয়ে কেলে মনিকে ইফটুর মনে ধরবে এমন বিশ্বাস অমুলদ। অনিতা- তোমার তো শখ মন্দ নয়। আমি তো কখন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছি। এখন আমি শ্রেফ ঠাকুরমা, বুঝলে। বাথরুমের দরজার আওয়াজ পেয়ে চটজলদি ফোন কেটে দেয় সবিতা।

            বাইরে হালকা ঠান্ডা পড়েছে যদিও আজ আর বারান্দা থেকে নড়বে না অনিতা। অবিনাশ মা কে অনুরোধ করে ভিতরে আসতে। উত্তরে অনিতা বলে, আমার লোক দেখতে ভালো লাগে। তোমরা যাও আমি সময় মতো চলে যাব। অচেনা লোক রাস্তা দিয়ে গেলেই অনিতা হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে। শেষমেষ লম্বা ছিপছিপে টিকালো নাক নিয়ে ইফটু আসে। ওর দৃপ্ত চলনে অনিতা আন্দাজ করতে পারে, এই ইফতিকার। আগ বাড়িয়ে অনিতা নিজের চ্যাপ্টা নাক গলিয়ে ফেলে। সে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি বরেনদের বাড়ি খুঁজছেন? অবাক হয়ে ইফটু জিজ্ঞেস করে, আপনি কি করে জানলেন? এই প্রশ্নের উত্তর কি হবে চটজলদি বুঝতে না পেরে অনিতা বলে, না আগে, মানে একদিন দেখেছিলাম মনে হলো তাই। খটকা লাগে ইফটুর। মুখে প্রকাশ না করে এগিয়ে যায় ইফটু। বারান্দায় পায়চারি করতে থাকে আধবুড়ি অনিতা। 

         নিত্য ফোনের বিল মেটাতে পার্থর পকেটে টান ধরেছে। বাধ্য হয়ে পার্থ ফোনের অফিসে কমপ্লেন করে। ফোন কোম্পানি জানায় তারই প্রতিবেশী রতন ব্যানার্জির ফোনে নিত্য আপনার ল্যান্ড লাইন থেকে কল যায়। সেই জন্য গাদাগাদা টাকা আপনার পকেটে থেকে গচ্চা যাচ্ছে। বাড়িতে জিগেস না করে একদম কমপ্লেন করতে চলে এলেন, যতসব। যতসব কথাটা আহত করে পার্থকে। ফোনের অফিস থেকে ফিরে সে চেঁচামেচি না করে জিগেস করে, সবিতাদির সাথে তোমার কিসের এত কথা? অনিতা বলে,সারা জীবন যখন কৈফিয়ত দিইনি বুড়ো বয়সে এসে এত উত্তর আশা কোর না। দিতে পারব না। পার্থ অবাক হয় অনিতার কথার ধরনে। ফিরতি প্রশ্ন পার্থকে ততধিক আহত করেছিল, তোমার ছেলে কেন পড়শিদের সবিতাদির থেকে দূরে থাকতে উপদেশ দেয়? পার্থ বলে, নাহ, তোমার মাথাটা সত্যিই গেছে। অবু যদি অন্যরকম বলত তাহলেই আমি আশ্চর্য হতাম। তুমি ভাব সবাই ঘাসে মুখ দিয়ে চলে। পড়শিরা তোমাদের গোপন আঁতাতের খবর রাখে। ওঝা একদিন অবু কে ইঙ্গিত করেছিল। অনিতা ওঝা বলে, অবাক বিস্ময়ে থম মেরে যায়।

       নাটকের দৃশ্যকল্প গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ জানা যাচ্ছে না। ইফটুর আসা যাওয়া বেড়েছে। সবিতাদি কতটা ইফটুকে কাজে পেয়েছে জানা নেই তবে বছর তিন চারের  মধ্যে বরেন আর মনির বিবাহ বিচ্ছেদ নিশ্চিত হয়েছিল। বরেন আর মনির মধ্যে রীতিমতো হাতাহাতি শুরু হয়েছিল। পথ চলতি অবিনাশকে একদিন বাধ্য হয়ে রতন বাবুর ঘরে ঢুকে পড়তে হয়েছিল। অবিনাশ রেগেমেগে বরেন কে বউ পেটানোর কারনে পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেয়।  এইসব ঝামেলা দেখে রতন বাবু ইতিমধ্যে ইহলোক ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। দীর্ঘদিন কোর্ট কাছারী হওয়ার পরেও ফয়সালা না হওয়ায় বরেন মনি দু পক্ষই অবিনাশের সাহায্য চায়। হাজারো অর্থনৈতিক হিসেব-নিকেশ করে অবিনাশ দেখায় অন্তত ১২ লাখ টাকা না দিয়ে বরেনের মুক্তি পাওয়া উচিত নয়। বন্ধু-বান্ধব পাড়াপড়শির চাপে বরেন এই দাবিকে মান্যতা দিতে বাধ্য হয়। জিতে যায় সবিতা। এখন অনিতা মুক্ত। সবিতাকে সে যখন তখন ফোন করতে পারে। যদিও সবিতা একটু চুপ মেরে গেছে। অনিতা নাছোড়। এই অতিরিক্ত আগ্রহর টিআরপি বুঝেই বোধহয় বাঙলায় টেলিভিশন সিরিয়ালগুলো বানানো হয়।

        একঘেয়ে রিং বেজে চলেছে রোজ। দিন দিন ফোন ধরার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে সবিতা। সই দুঃখ পাবে ভেবে শেষমেশ একদিন সবিতা উদাসীন সুরে হ্যালো বলে। অনিতা বলে কি ব্যাপার গো ইফটু এসেছে? ইফটু এই বাড়িতে আসা বন্ধ করেছিল কারণ বরেন দিনদিন চতুর হচ্ছিল। অফিসে তার প্রমোশন হয়েছে। বরেনের কোন ভাবে মনে হয়েছে সে আর মনি মায়ের পাতা ফাঁদে ধরা পড়েছিল। ইফটু রঙ্গমঞ্চের একটি চরিত্র মাত্র। বরেন এখনও সঠিক বুঝতে পারে না কার সঙ্গে ইফতিকারের রসায়ন তৈরি হয়েছিল। অনিতা বলে, কি গো কথা বলছো না কেন? সবিতা বলে ভালো লাগছে না। এতটা না হলেই ভালো হতো। অনিতা- কতটা, সত্যি করে বলতো। তুমি কি ইফটুকে মনির ঘরে ঢুকিয়ে দিলে না মনি তোমাকে ইফটুর সাথে দেখে ফেললো? সবিতা- ভালো লাগছে না অন্য কোনদিন হবে। কেবল অন্যর ঘরে উঁকিঝুঁকি মারা, তোমার অবু, অবিনাশ যে অতগুলো টাকা খোরপোস দিতে আমাদের বাধ্য করল তুমি বাধা দিলে না কেন? অনিতা- খুব ফাটছে না? ডিভোর্স দেবে তোমার ছেলে স্ত্রী পুত্রর দায়িত্ব নেবে না? এ কি মগের মুলুক! সবিতা- দেখলে তো এককথায় আমাদের পিরিত কেমন চটকে গেল। বুঝলে অনিতা দি সংসারে কেউ কারো নয় তাই বলছি ব্যক্তিগত সব প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়ো না। আমি যদি তোমার একান্ত ব্যক্তিগত কিছু জানতে চাই, তুমি বলবে? অনিতা- জিজ্ঞেস করে দেখ। আচ্ছা,  বরেন কি তোমার অদৃশ্য সুতোগুলোর হদিশ পেয়েছে? সবিতা-  পেয়ে যাবে কোনদিন কিন্তু আজ তোমার স্বার্থপরতার কথা বেশি করে মনে হচ্ছে। নিজেকে ছাড়া কেউ কারো কথা ভাবে না। কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে  গা এলিয়ে দেয়ে ইজি চেয়ারে। তারপর কি মনে করে রিসিভারটা ফোন থেকে তুলে রেখে দেয়। অনিতা চুপচাপ বসে থাকে কিছুক্ষণ। নিজের মনে সে বলতে থাকে, ইস অবুর কথাটা না বললেই পারতাম। কিন্তু আমার অবুকে সরাসরি অভিযুক্ত হতে দেখে মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো। ঠিক আছে, দেখবো সবিতাদি আমাকে ছাড়া তোমার কেমন দিন কাটে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে বাড়ির কাজে হাত লাগাতে এগিয়ে যায় অনিতা। একটু চা খেলে মুডটা  ভালো হবে। রান্নাঘরে গিয়ে ষ্টোভের লাইটারে চাপ দিতে ধপ করে তরল গ্যাস জ্বলে ওঠে। চা বসাতে ফুরসত পায়না অনিতা কারণ নাগাড়ে ফোন বাজতে শুরু করেছে। কি করবে ভেবে না পেয়ে নিজের মনে বকবক করতে করতে অনিতা ফোন ধরতে এগিয়ে যায়। সব কাজ যেন আমার? মহারানী ওপরে এই অবেলায় গতর ফেলে শুয়ে থাকবেন আর আমাকে চা বানাতে হবে। রিসিভার তুলতেই ওপার থেকে ভেসে আসে সুললিত সবিতাদির কন্ঠ। জয়ের আনন্দে গলে জল হয়ে যায় অনিতা। রান্নার গ্যাস জ্বলে পুড়ে খাক হতে থাকে। 

           আজ অনিতার বড়ই আনন্দের দিন। বাড়িতে কেউ নেই শুধুই গল্প করে কাটানো যাবে। বরেন অফিসে বেরিয়ে গেলে সবিতা একা। যথাসময়ে ফোন বেজে ওঠে। খেজুরে কথা সারা হলে অনিতা রসের নাগর ভরাতে চায়। অনিতা- কি করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করলে? সবিতা- আবার এক প্রশ্ন? অনিতা- যদি জানাতে না চাও তো ফোন করলে কেন। এখন বলো আগের দিন তুমি ঠিক কি জানতে চেয়েছিলে? সবিতা- অতনুকে ঘিরে প্রতিবেশীরা যে আলোচনা করতো আমি সে ব্যাপারে জানতে চাই। অনিতা- অতনুকে আমি দেওর ডাকতাম। সবিতা- আমিও ইফটু কে বৌদি ডাকতে অনুরোধ করেছিলাম। সত্যি করে বলতো তোমার সঙ্গে অতনুর কোনও সম্পর্ক ছিল না? অনিতা কি বলবে ভেবে না পেয়ে চটজলদি বলে, ছিল। অনিতা আদতে একটা কাল্পনিক পরশের গল্পে সবিতাকে বধ করতে চায়। সবিতা বলে, চুপ মেরে গেলে যে বড়। অনিতা- কি আর বলব, এই প্রথম স্বামী ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি আমার ঠোঁট ছুঁয়েছিল। তবে এই শেষ অতনুকে আমি আর বাড়তে দেইনি। সবিতা- ও,তারপর বোধহয় ওরা এখান থেকে চলে গেল। অনিতা- ঠিক ধরেছ। সবিতা- দেখলে তো তুমি দিব্যি চেপে গেছিলে আমার কাছে। আমি কিন্তু কোনকিছু তোমার কাছ থেকে কিছু লুকাই না। ইফটু চাইতো আমার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক করতে।  আমি বলেছিলাম এই সম্পর্ক তখনই সম্ভব যদি তুমি মনির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারো। বিহ্বল ইফটু বলেছিল সে আবার হয় নাকি। অনিতা- তারপর। সবিতা- ইফটু তখন আমার প্রেমে পাগল। সে বুঝতে পেরেছিল তার আদরের বৌদিকে পেতে বৌমাই ভরসা। একমাত্র মনিই দিতে পারে লাইসেন্স। আমি চেষ্টা করতাম ওকে মনির ঘরে পাঠাতে। মনি খুব বিরক্ত হত। যখন বুঝতে পারলাম মনি মানবে না ইফটু কে জোর করতে বললাম। অনিতা- মনির কি মাথা খারাপ হয়েছিল!  এমন সুন্দর রাজপুত্র ছেড়ে..তারপর তারপর..। সবিতা- ইফটু আমার কথায় ওকে ঘরে ঢুকে জড়িয়ে ধরে চুমু দেয় আর ব্যাস। অনিতা- ব্যাস মানে? সবিতা- তোমাকে রসের গল্প শোনানোই আমার একমাত্র কাজ, না। তোমার অভিধানে সন্তুষ্টি বলে কোন শব্দ নেই। এখন আর বলতে পারব না। যা শুনলে তা আগে হজম করো। আদতে সবিতার দরজায়, কড়া নাড়ার শব্দ অনিতা টেলিফোনে শুনতে পেয়েছিল। মনে মনে অনিতা প্রতিজ্ঞা করেছিল সবিতার সঙ্গে মার্জিত শব্দ চয়নে নিজেকে বন্দি রাখবে সে। মুখ মিস্টি বিদায়ী বার্তায় অনিতা বাক্যালাপ শেষ করে।

            গ্রীষ্মে ছোট নাগপুরের মালভূমি যেমন মাইলের পর মাইল পড়ে থাকে। হলদেটে কর্কশ সূর্যের তলে ফুটোফাটা মাঠে তেমন চাতকের আর্তনাদ খেলা করে। সবিতার মনভুমে রক্তে আকীর্ণ মোরামের চড়াই উৎরাই। দূর থেকে যার সৌন্দর্য অপার। কিছুই ভালো লাগেনা সবিতার। অনিতাদির সঙ্গে কথা মানে কেউটে খুঁড়ে বার করা। বরেনের সঙ্গে যতটুকু কথা তা খাবার টেবিলেই সাঙ্গ হয়। সবিত বুঝতে পারছে যে কোন ছুতোয় বরেন তাকে ছোটবড় কথায় বিঁধছে। সবিতা কি নিজের কৃতকর্মে অনুতপ্ত? অনিতার তেমন মনে হয় না।  

          হঠাৎই একদিন আগ বাড়িয়ে ঈশিতা অনিতার সঙ্গে ঝগড়া বাঁধায়। ঝগড়ার হেতু ছিল বড় অদ্ভুত। ঈশিতার শিল্পী স্বামী বাড়ির কোন কাজকর্ম দেখভাল করে না। সংসার যাত্রায় তার মন নেই। অথচ পাশের বাড়ির অনিতার স্বামী পার্থবাবু একজন পারফেক্ট হাজব্যান্ড। সুন্দর করে উনি নিজের সংসারের সুতো বুনেছেন। প্রতিটি সংসারে যা একান্ত কাম্য। এই খেদ থেকে ঈশিতা একদিন চিৎকার করে বলতে থাকে, আমার স্বামী এবং পুত্র উভয়েই শিল্পী। তোদের মত আট ঘণ্টার কর্মী নয়। বাড়ির বাজার করো ঘর ঝাট দাও নর্দমা পরিষ্কার করো। দিন রাতের কাজের লোক যেন। পুরুষ মানুষ না ছাই সারাদিন বউয়ের পোঁদে পোঁদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুদিন আগে থেকে অনিতা লক্ষ্য করেছিল ইশিতার বাউন্ডারি ওয়াল বাড়ছে। অনিতার কাছে অস্বস্তির কারণ ছিল এই বারান্দা,যেখান থেকে অনিতা এবং সবিতা পরস্পরকে ইশারায় ইঙ্গিত পাঠাত। এদের গোপন সখ্যতা ঈশিতা ভালো চোখে দেখেনি। ঈশিতা কথার ঝাঁজে ঠারেঠোরে সবিতার দিকেও ইঙ্গিত করছিল। ইফটুর এখন অতীত কিন্তু ঈশিতাদি কেঁচো খুঁড়বেন এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিল অনিতা। তাই সে কোন কথা বলেনি। পার্থ বাবু  বিরক্ত হয়ে  অনিতার হয়ে মেয়েলি লড়াইটা লড়েছিল। ব্যস জিতে গেল ঈশিতা। সে বলতে লাগলো, দেখলে তো, পার্থদার মেয়ে হয়ে জন্মানো উচিত ছিল। আমার স্বামী পুত্রকে কখনো মেয়েদের মত কোন্দল করতে দেখেছ?

        ফোন করার ফুরসত খুঁজছিল সবিতা। গোটা ঘটনাটা তার জানা প্রয়োজন। ফোনে রিং বাজতেই অনিতা উৎসুক হয়। সে জানত সবিতাদি আজ তার খোঁজ করবে। কয়েক মুহুর্তের সুযোগে অনিতা ভেবে নেয় উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করলেই আজ সে সবিতার মুখে ঝামা ঘষে দেবে। ওপার থেকে প্রশ্ন ভেসে আসে আজ কি হলো গো, ঈশিতাদি এমন খেপে গেল কেন? অনিতা বলে,ঈশিতাদি ইফটুর সঙ্গে তোমার কেচ্ছা জানতে চেয়েছিল। আমি রেগে গিয়ে বলি তোমাকেও তো আমি পেন্টার মানে আঁকিয়ে রজত বাবুর সঙ্গে ঢলাঢলি করতে দেখেছি। অনিতা কল্পনার চোখে দেখতে পায় সবিতার ধবধবে সাদা চামড়া কেমন ললিত রাগে রঙিন হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক ধাক্কায় আচ্ছন্ন সবিতা কোন কথা বলতে পারেনা। কিন্তু একটু সামলে নিয়ে সে চিৎকার করে বলে কি, ইফতিকার সম্পর্কে বলেছে ঈশিতাদি। পেছন থেকে কর্কশ গলায় বরেন বলে হ্যাঁ, তাইতো বলা উচিত। অন্যায়টা কি বলেছে? হতচকিত সবিতার হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায়। বরেন বললে তুমি বাবাকে খেয়েছো,অফিসে আমার পরিবারকে বেইজ্জত করেছ। বিয়ের প্রথম দিন থেকে আমার আর মনিদিপার ভালোবাসার মাঝে দেয়াল তুলেছ। এমনকি সহবাসের সময়ও আমাদের স্বচ্ছন্দ হতে দাও নি, দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে এসেছ। তুমি কি মানুষ! আমি বুঝেছি ইফতিকার সাহেবের মত ভালো মানুষকে তুমি কিভাবে ভেড়ুয়া বানালে। তুমি ডাইনি সব কিছু করতে পার। তুমি সাহেবকে ভালবাসনি প্রেমের অভিনয় করে ঘুঁটি বানিয়ে ব্যবহার করেছ। বরেনের মুখ থেকে আসা উৎকট গন্ধে সবিতা নাকে হাত দিয়ে বলে, মদ খেয়ে কি সব যা তা বলছিস। ইফতিকার তোর বস আমি তার সাথে...। বরেন বলে, বেশ করেছি মদ খেয়েছি রোজ খাব এবার থেকে। হ্যাঁ, এই খামে ইফতিকার সাহেব তোমার সমস্ত কেচ্ছার ইতিবৃত্ত লিখে চাকরিতে ট্রান্সফার নিয়ে মুম্বাই চলে গেছেন। যাওয়ার আগে সত্য জানানোর জন্য খামটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। সবিতা বলে, বরেন তুই আমায়, আমায় অবিশ্বাস করছিস? বরেন উত্তর করে,তোমায় বিশ্বাস করতাম। তার চেয়েও বেশি বিশ্বাস করতাম ইফতিকার সাহেবকে। তাকে অবশ্য আজও বিশ্বাস করি। ছোটবেলা থেকে তুমি বাবাকে আমাকে নরম কাদার তাল বানিয়ে রেখেছিলে খুশি মতন যখন যা চেয়েছো তাই বানিয়েছ। মা বলে, বরেন, তুই একবারও ভেবে দেখলি না ইফটু কেন রাজি হল? নির্লজ্জ বেহায়ার মতো ইফটু বোলো না। ইফতিকার সাহেব বলো। সাহেব সত্য কবুল করেছিল। তুমি তাকে সিডিউস করেছো। অবিবাহিত মানুষ তোমার রূপে মোহিত হয়ে পড়েছিলেন। তুমি ওর সঙ্গে ফ্লার্ট করে মনির সঙ্গে অসদাচরণে বাধ্য করাতে চেয়েছিলে। মনি আমাকে বারবার এই কথা বোঝাতে চেষ্টা করেছিল। আমি নরাধম এমনকি ইফতিকার মনিকে বলেছিল সব মিথ্যা মিথ্যা খেলা। আপনার প্রতি আমার কোন আসক্তি নেই। আমি বৌদিকে পেতে চাই। এতে আপনার সুবিধেই হবে। ইফতিকার আরও বলেছিলেন, প্লিজ, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন আমি ওর চালে ওকেই মাত করব। মনি বলেছিল, স্যার, এই অনৈতিকতা আপনাকে মানায় না। সবিতা বলে, গল্পের গরু যে গাছে তুললি, তোর ছেলে কি ভুল দেখেছে? বরেন বলে, ওকে তুমি ইফতিকার সাহেবের অভিনয় দেখিয়ে ভুল বুঝিয়েছ। যতদিন আমাদের ডিভোর্সের খবর অফিসে আসেনি ততদিন সাহেব তোমার কাছে এসেছেন। তুমি মনিকে ফাঁসিয়ে প্রমাণ রেখে ইফতিকার সাহেবের সঙ্গে রঙ্গ করেছ। মনির আর চতুরের অবর্তমানে ইফতিকার সাহেব কে ডেকে নিয়ে গেছ বাড়িতে। সারা জীবনের জারিজুরি এমন সহজে নস্যাৎ হয়ে গেল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে সবিতা। ফোনের ওপারে অনিতা অবাক, কেচ্ছাকান্ডর সবটা শুনে নেয় সে। 

          সময় মত অনিতা ফোনে শুনিয়ে দিয়েছিল, সবিতার সব কেচ্ছাকান্ড তার জানা হয়ে গেছে। তারপর ফোন শোনাশুনি বন্ধ ছিল দীর্ঘ আট দশ বছর। মদ খেয়ে চুড়ান্ত মাতাল হওয়া বরেনের অভ্যাস হয়ে গেল। অফিস থেকে ফিরে মায়ের উপর অত্যাচার করত সে। কখনও মায়ের সামনে পয়সা দিয়ে কোন মেয়েকে ধরে এনে জৈবিক প্রবৃত্তি মেটাত। মা অন্য ঘরে চলে গিয়ে কাঁদত। বরেন হিড়হিড় করে মা কে টেনে এনে বলত,এখন দেখবে না? রাতে আমার ঘরে ঢূকে বসে থাকতে এখন কেন চোখ ঢাকছ। মনিকে তুমি একদিনের জন্যও ভাল থাকতে দাওনি। সবিতা বলতো,প্রতিশোধ নিচ্ছিস? মদের ঘোরে হো হো করে হাসতো বরেন। নেশা কেটে গেলে কখনও সখনও বরেন মায়ের কাছে আদর খেতে চাইত। তখন বরেন ছোট্ট শিশুর মত। সবিতা ভাবত একদিনের জন্যও যদি মায়ের আসন ফিরে পাওয়া যায় সেটাই সত্যি হবে ওর হারানো জীবনে। অদ্ভুত ব্যাপার, বরেন সাদা মুখে থাকলে কখনোই মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত না। তখন মা যা যা বলতো বরেন তাই শুনত। সবিতার হাতের রান্না খুব সুন্দর। বিভিন্ন স্বাদু পদের জন্য বরেনের আকুতি সবিতাকে অতীতচারি করে তুলত। দুধ যেরকম গরম হলে উথলে ওঠে আবার আঁচ কমিয়ে দিলেই থিতু হয়ে য়ায়। ফিরে মা হওয়ার চিরায়ত লিপ্সায় সবিতার আবেগ তেমন উথলে উঠে থমকে যেত। সবিতা সারাটা দিন নিজের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাস্ত থাকতো। মদের তুফান তুলে বরেন যখন ঘরে ঢুকত নিজের সঙ্গে চলা রণে ক্ষান্ত দিয়ে সবিতা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকতো। সত্যিই জীবন এক মায়া। একক কোন জানা সূত্রে একে বাঁধা সম্ভব নয়। বন্ধ দরজার ফাঁক দিয়ে যেমন আলোর বলিরেখা দৃশ্যমান হয়। সম্পূর্ণ  অন্ধকার বলে কোন কথা জীবনের অভিজ্ঞানে নেই। সব হারানো বরেনের চুলে সবিতা যখন বিলি কেটে দিত অপার্থিব সুখে বরেন ভেসে যেত। অবাক বরেন,কোলে মাথা রেখে চোখ তুলে মায়ের আনত চোখের দিকে তাকিয়ে থাকত। মাঝের পনেরো বছরের দুঃস্মৃতি কোথায় উবে যেত তখন। সবিতার জীবন তৃষ্ণা মরেও বেঁচে থাকত এমন আর একটা নতুন মুহূর্তের প্রতীক্ষায়।  

       একটা গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে পাশের বাড়ির থেকে। অবিনাশ দাড়ি কামাচ্ছে। ভোলেভালা অবিনাশ কেন যে দাড়ি কাটার সময় নিজেকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে রাখে তা সেই বলতে পারবে। যদিও প্রতিবার দাড়ি কাটার পরে কেউ না কেউ বলে, এ বাবা থুতনিতে দাড়ি লেগে আছে কি কাটলে গো। নিমগ্ন অবিনাশের প্রতিটি নতুন প্রচেষ্টা একই ভাবে বিফলে যায়। পৃথিবীর সমস্ত কলরব থেকে নিজেকে সরিয়ে আজ অবিনাশ দাড়ি কাটছে। নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবে সে। সিঁড়ি দিয়ে পার্থ তরতর করে নামতে থাকে। পার্থর চিৎকারে অবিনাশের সম্বিত ফেরে। হকচকিয়ে গিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করে,এত চিৎকার করছো কেন? পার্থ বলে, দাড়ি কামাচ্ছো না অংক কষছো? শুনতে পাচ্ছ না পাশের বাড়ি থেকে একটা আওয়াজ আসছে। শেভিং ক্রিমে ফেনীল অবিনাশের মুখমণ্ডল। অবিনাশ একছুটে নেমে যায়। তড়িঘড়ি পাশের বাড়ির গেট খুলে ঢুকে পড়ে সে। ভেতরের ঘরের দরজা বন্ধ। কাকু ক্ষীণ স্বরে বলে চলেছেন, ঈশি, দরজা খোলো আর এমনটি হবে না। তুমি দেখো আমি ঠিক বদলে যাব। বিরক্ত অবিনাশ, কাকুকে সরিয়ে দিয়ে বলে, কাউকে ডাকবেন তো। ততক্ষণে পার্থও পিছন পিছন এসে গেছে। পার্থর হাতে এক বিরাট শাবল। শাবল হাতে নিয়ে অবিনাশ দরজা ভাঙার চেষ্টা করতে থাকে। পার্থ প্রবল ভাবে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। একঘেয়ে সুরে ক্রন্দনরত অমিতাভ নিঃশ্চেষ্ট। এক সময় ভেঙে পড়ে দরজা। অবিনাশ দেখে যন্ত্রণারত কাকিমা চুল এলিয়ে খাটে শুয়ে আছে। তার মুখ দিয়ে গেঁজলা বের হচ্ছে। অবিনাশ কাকিমাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে দৌড়াতে থাকে। হাসপাতালে পৌঁছালে ডাক্তার অনুমান করেন উনি এ্যসিড খেয়েছেন। সাকশন চালু হয়ে যায়। কাকিমার পাকস্থলী থেকে বের হতে তাকে ঝাঁঝালো এ্যসিড। যন্ত্রণায় ছটফট করছেন ঈশিতা কাকিমা। ডাক্তারি আদেশে অবিনাশ যন্ত্রণা কাতর কাকিমাকে বিছানার মধ্যে চেপে ধরে রেখেছে। এত যন্ত্রণার মধ্যেও ঈশিতা,মাঝে মধ্যে চোখ তুলে অবিনাশকে দেখছে। অবিনাশের হাতে পাকস্থলী থেকে বেরিয়ে আসা এ্যসিডের তীব্র দহনজ্বালা। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার বাবু এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের নিরন্তর প্রয়াসে সুস্থ হয়ে ওঠেন ঈশিতা কাকিমা। বেশ কিছুদিন স্বামীপুত্র, কাকিমাকে ঘৃণার চোখে দেখতেন। তারপর সব থোর বড়ি খাড়া। শুধু অবিনাশ এবং পার্থ বাবু ঈশিতার অনুতপ্ত চোখে রাজকীয় সন্মান পেতে লাগলেন। 

                 অনিতার বাড়িতে ফোন আসা বন্ধ হয়ে ছিল। পার্থ লাবণ্য বেশ শান্তিতে আছে এখন। লাবণ্যকে সবিতার আর মাতাল বরেনের জন্য তরকারি বানাতে হচ্ছে না। বাধ সাধলো অনিতা কাকিমার আত্মহত্যার প্রয়াস। সবিতা পেয়ে গেল মুখরোচক আলোচনার সূত্র। সাঙ্গ হল অনিতার অতৃপ্তির আকাল।

                  নিশুতি শীতের রাত। অবিনাশ কাজের পাঠ চুকিয়ে কিনডেলটা বুকে নিয়ে আধপড়া উপন্যাসে চোখ রেখেছে। একটা ক্ষীণ জল্পনার শব্দ ভেসে আসছে। অবিনাশ ধ্যান না দিয়ে বইয়ের পাতায় ডুব দিয়ে আছে। শব্দটা বাড়ির নিচে এসে থেমে যায়। তারপর কঠিন গলায় একজন হেঁকে বলে, অবিনাশ দা একটু আসবে? বারান্দা দিয়ে অবিনাশ দেখে ভয়ার্ত কয়েকজন দাঁড়িয়ে। তার নাম ধরে যে ডাকছিল সে পাশের বাড়ির সমীর। হাবেভাবে সমীর অবিনাশকে কিছু ইঙ্গিত করলে পরিচ্ছদ পাল্টে দুড়দাড় করে অবিনাশ নেমে আসে। নিচে খাটে অবিনাশের মা লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। অবিনাশ ভ্রুক্ষেপ না করে বেরিয়ে যায় তারপর সবাই মিলে দৌড় দিয়ে পৌঁছায় বরেনদের বাড়ির সামনে। বরেন অবিনাশ কে দেখে বলে,কি ফ্যাসাদ বলত। মা বহুক্ষণ দরজা এঁটে বসে আছে। অবিনাশ বলে, দরজা ভাঙ্গো। অনেকে পুলিশ ডাকার কথাও বলতে থাকে। অবিনাশ এই সমস্ত উড়ে আসা কথায় পাত্তা না দিয়ে শাবল দিয়ে চাড় মারতে থাকে। অবিনাশকে দেখে সবাই হাত লাগায়। প্রবল ধাক্কায় ছিটকিনি ভেঙ্গে সব্বাই একসাথে হুড়মুড় করে ঘরের ভেতর মেঝেতে আছড়ে পড়ে। সবিতা কাকিমার ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখে চোখ পড়ে সবার। পাখায় দড়ি খাটিয়ে ঝুলছেন সবিতা কাকিমা। 

          হাসপাতালের মর্গে পৌঁছে যায় কাকিমার সাধের সুন্দর শরীর। গভীর রাতে অবিনাশ দলবল নিয়ে বাড়ি ফেরে। কাল ভোরসকালে কাঁটাপুকুর মর্গে হত্যে দিতে হবে। শীতের রাত দরজায় বউ লাবণ্য অবিনাশকে পীড়াপীড়ি করছে চান করার জন্য। অন্য সময় হলে মা এই কাজ করত। আজ তিনি লেপ মুড়ি দিয়ে দিব্যি ঘুমাচ্ছেন। মায়ের পাশ দিয়ে যাবার সময় অবিনাশের মনে হয় মাকে জানানোর প্রয়োজন আছে। অনিতা আর সবিতার লুকানো সখ্যতার কথা বাড়ির সকলে জানতো। অবিনাশ বিশ্বাস করত দুই বান্ধবীর সম্পর্কর গভীরতায়। অবিনাশ গুটিগুটি পায়ে মায়ের দিকে এগিয়ে গেলে মা লেপ সরিয়ে বলে, সব কাজ মিটে গেছে? অবিনাশ শুধায়, এ কথার অর্থ কি? মা বলে কিছু না। দাহকার্জ, পোস্টমর্টেম ছাড়াই মিটে গেল?  হতভম্ভ অবিনাশ মায়ের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে গুটিগুটি চানঘরের দিকে এগতে থাকে। 

          পার্থর বদরোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মত কবিতা বলা। ঘরে বাইরে কোন আগল থাকত না পার্থর। এই কারণে একা অবিনাশ ছাড়া পার্থর সঙ্গে কেউ রাস্তায় বের হতে চাইতো না। সুনীলের, "কেউ কথা রাখে না", কবিতাটি,পার্থর ভীষণ পছন্দের। সবিতাদি চলে যাওয়ার দিন দুই পরে পার্থ আপন খেয়ালে এই কবিতাটি আবৃত্তি শুরু করে। হঠাৎই অগ্নিশর্মা হয়ে অনিতা পার্থ কে বলে, এই কবিতাটি আমার অপছন্দের। দ্বিতীয়বার এই কবিতা উচ্চারিত হলে আমি লঙ্কাকান্ড বাঁধাবো। অবাক পার্থ বলে কি ব্যাপার বলতো, আমি এই কবিতা আজ প্রথম আবৃত্তি করছি না! হঠাৎ তোমার হলোটা কি? অনিতা বলে, অতশত জানিনা আমি শেষবারের মত জানিয়ে রাখলাম, মনে রেখ। পার্থ বলে, তোমার কোন অধিকারে আমি কোনদিন হস্তক্ষেপ করিনি। তুমি আমার কণ্ঠ রোধ করতে চাইছ কেন? কোন উত্তর আসে না অনিতার কাছ থেকে। 

              সেদিন রাতে চল্লিশটা ঘুমের বড়ি খেয়েছিল অনিতা। পুরো দুটো দিন নিঃসাড়ে কেটেছে।  ডাক্তার মিত্র অবিনাশের পরিচিত। হাসপাতালে শুয়ে থাকা প্রায় অচৈতন্য অনিতার পাশে দাঁড়িয়ে ডাক্তার অবিনাশকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের বাড়িতে  এমনটা হলো কি করে? অবিনাশ, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ডাক্তারের দিকে। অনিতা ঘাড় নেড়ে অশ্রুত স্বরে কিছু বলতে থাকে- সবিতাদি বলেছিলো, এ কাজ তোমার জন্য নয়। তবে আমাকে যেতেই হবে। আমার হাতে সময় বেশী নেই। সত্যি ওর কোন দোষ নেই, আমাকে বারবার মানা করছিল। ডাক্তার,ও ডাক্তার আমাকে একটা সুযোগ দেবে?  জানিনা কদিন বাঁচবো। বাকি দিনগুলো অবু আর লাবুর সঙ্গে সুন্দর করে সংসার করতে হবে। মায়ের মুখের কাছে কান পেতে অবু, জড়িয়ে যাওয়া প্রায় অশ্রুত ধ্বনি সমুহ প্রাণপণে শ্রবণে উপলব্ধি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

কৃশানু মিত্র। 

 

Comments

Popular posts from this blog

ছোটগল্প - লাল কালো ইট।।

একগুচ্ছ কবিতা

কোন সে আলোর স্বপ্ন(কথায় ধারাবাহিক)