ছোটগল্প একটি সম্ভবনার অপমৃত্যু।

 একটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু 

ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছিল হঠাৎই মলয়ের ফোন।  এপারে অচেনা নম্বর দেখে মিলি গুরুত্ব না দিয়ে লাইনটা কেটে দেয়। নাছোড় ফোন বারে বারে বেজেই চলেছে। স্কুলের খাতা দেখতে ব্যস্ত মিলি সুইচ অফ করে দেবে ভেবে বাঁ হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নেয়। ঠিক সেই সময় টুং শব্দ করে একটা মেসেজ এসে ঢোকে। আমি মলয় ফোনটা তুলছো না কেন?  এখনকার ছেলেমেয়েরা সব্যসাচী। মিলির ফোন থেকে দুহাতে লেখা মেসেজ বিদ্যুৎ গতিতে টাইপ হয়ে ছিটকে সেন্ডারের কাছে পৌঁছায়। 'বাতাসকে দেখা যায় না চেনা যায়? আপনি মলয়, বুঝলাম। আপনাকে কোনদিন দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। চিনিব কি করে আপনার ফোনই বা আমি ধরতে যাব কোন কারনে?' উত্তর আসে আমি সেই মলয় যাকে তুমি বাসে রোজ হাঁ করে দেখো। আমার বিশ্বাস আমি তোমার অত্যন্ত পরিচিতদের একজন। খেলাটা বজায় থাকে। মিলি লেখে আমি স্কুলের খাতা দেখতে ব্যস্ত পরে ফোন করবেন। যদিও আমি সঠিক করে বুঝতে পারছি না আপনি কে? মিলি সঠিক করে বুঝে নিতা চায় ছেলেটির পরিচয়। এসএমএস এর গণ্ডি পেরিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে মিলির কাছে একটা ছবি ভেসে আসে। মিলির চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। এ সেই মানুষ যার জন্য মিলির চোখ বাসে উঠে ইতি-উতি চায়। আজ মিলি স্কুলে বের হয়নি। খাতা দেখার কারণেই তার ছুটি নেওয়া। ছেলেটিকে একদিন না দেখলে মিলির দিন ভালো যায় না। অনেকদিন ধরেই মিলি মলয়ের ফোনের আশা করছে যদিও সে জানে মলয়ের কাছে তার ফোন নম্বর ছিল না। তবু মিলির অলৌকিক আশা সহজে মরেনি। আজ হঠাৎ কি করে ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ে গেল মিলি তা বুঝতে পারেনা। আজ মিলিকে দেখতে না পেয়ে বন্ধু নয়নার কাছে মলয় সরাসরি মিলির ফোন নম্বর জানতে চায়। নয়না আন্দাজ করেছিল এদের দুজনের "হৃদয়ের গোপন ও বিজনও ঘরে" তরঙ্গায়িত ভাবের খেলা। নয়না টু শব্দটি না করে ফোন নাম্বার কাগজে লিখে মলয়কে দিয়ে একটু মুচকি হেসে ছিল। 

মিলিকে মলয় বলে আমি অফিসে নাগা মেরেছি। তুমিও ছুতো করে বেরিয়ে এস। মিলি সরাসরি না বলে দেয়। মিলি মা কে বলে রেখেছে সে খাতা দেখার জন্য ছুটি নিয়েছে। মলয় টেক্সট করে আমি কার্জন পার্কে অপেক্ষা করছি। মিলির হৃদয় আনচান করতে থাকে। সে হঠাৎই খাতা পত্র গুটিয়ে রান্নাঘরে মায়ের কাছে গিয়ে বলে, আমি স্কুলে যাচ্ছি হেডমিষ্ট্রেস ডেকে পাঠিয়েছেন। মা জানে তার পাগলি মেয়ে এমনতর। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার মা-বাবার পছন্দ করা পাত্র হেলায় সে না করে দিয়েছে।

               নাকে মুখে খাবার গুঁজে একটা ক্যাব বুক করে মিলি সোজা কার্জন পার্কে পৌঁছে যায়। ঝাড়া দেড় দু'ঘণ্টা প্রতীক্ষায় আছে মলয়। এই সময়টুকু সে ধীর নিশ্চল ছিল। সে বুঝে নিতে চেয়েছিল মিলির অন্তরের আকুতি। হন্তদন্ত মিলির চোখে পড়ে যায় কার্জন পার্কের সবুজ ব্যাকড্রপে লালশার্টে উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মলয়ের উপস্থিতি। কাছাকাছি এসে ধমকে সুরে মিলি বলে, ডাকলেন কেন? মলয় বলে,নাহলে কি আমি বুঝতে পারতাম অপরপ্রান্তে আবেশিত চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রাবল্য? মিলি ধরা পড়ে লজ্জায় লাল হয়ে যায়। মলয় বলে যা হোক জেতা হারার হিসেব কষে লাভ নেই, এখন চলো। 

প্রশ্নহীন চলায় ঘোর অবিশ্বাসী মিলি পা বাড়ায় মলয়ের সাথে। মলয় বলে, জানিনা কি করে শুরু করতে হয় তবে বছরখানেক বাসে দৃষ্টি বিনিময়ের পর মনে হয়েছে তোমার সাথে কথা বলা দরকার। আচ্ছা, তোমার কোন বক্তব্য আছে মিলি বলে ডাক এসেছে তোমার কাছ থেকে আমি আগ বাড়িয়ে কিছু বলবো না। কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটতে থাকে ওরা। গন্তব্য নির্দিষ্ট নয়। ওদের পদযুগল ওদের ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর নির্ভর না করে স্ব-ইচ্ছায় ওদের শরীরকে ইডেন গার্ডনের পাশের রাস্তা দিয়ে বয়ে নিয়ে চলেছে। কখন যে ওরা প্রিন্সেপ ঘাটে পৌঁছে গেছে খেয়াল করেনি কেউ। মলয় নৌকোয় চড়ার কথা জিজ্ঞেস করে। বিপুল কারিগরি শিক্ষার নিদর্শন হয়ে সামনে জেগে আছে দ্বিতীয় হুগলি সেতু। ঘাটে বাঁধা লাল হলুদ সবুজ নীল সজ্জায় বাহারি নৌকোর দল আশায় আশায় সময় গুনছে। কোন কথা না বলে ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নেমে  যায় মিলি। পেছুপেছু নামে মলয়। দরদস্তুর করে ওরা উঠে পড়ে একটা নীল নৌকায়। জল কেটে নৌকা এগিয়ে চলে। 

                ভালোলাগায় দুজনেই ভরে ছিল। ভালোলাগা থেকে ভালোবাসায় উত্তীর্ণ হতে মলয়ের বেশিদিন সময় লাগেনি। মিলি নিরুচ্চার থেকেছে মলয়ের মুখঃনিসৃত, 'ভালোবাসি' শব্দের কথ্য আবেগে। মাস পাঁচ ছয় সম্পর্কের বনিয়াদ। জোয়ারের চোরা টানে ভাসলেও মিলি বরাবর প্রতিরোধ রেখে গেছে। মিলির অকৃত্রিম গাম্ভীর্যের বিরুদ্ধে গিয়ে মলয় ফিজিক্যাল হতে পারে নি এখনও। এমনকি নিজের হাত ছুঁতেও মিলি মলয়কে অনুমতি দেয়নি মিলি।

        আজ দিনটা ছিল অন্যরকম ওরা ঠিক করেছিল মল্লারপুর যাবে। পাঁচ ছয় মাস মেলামেশার পরেও সম্পর্কের বুনিয়াদ এখনো তেমন গভীর হয় নি। পুরানো মন্দির, পাথর খাদানের জন্য বিখ্যাত মল্লারপুর আজ দেউচা পচামির উচ্ছেদের কারনে আলোড়িত। মল্লারপুর যাওয়ার ইচ্ছা কেন, মলয়ের এই প্রশ্নের উত্তর করেনি মিলি। নৃত্য পটিওসি মিলি নিজের শিল্পী পরিচয় জানাতে চায়নি মলয়কে। অখ্যাত মন্দিরগাত্রে খোদাইকরা নৃত্য ভঙ্গিমায় মিলি রসদ খুঁজে পায় নতুন সৃষ্টির। পাশাপাশি মলয়কে চিনে বুঝে নিতে নির্জনতাই কাম্য মনে করে সে। মলয়ের প্রশ্নের উত্তরে মিলি সরাসরি বলে, আমি দেউচা পাচামিতে চলমান আদিবাসী প্রতিরোধের সরূপ বুঝতে চাই। মলয় সঙ্গ তৃষায় বাধ্য হয়েছিলো ঠ্যাঁটা মেয়েটার কথায় মান্যতা দিতে। ভোরের বাসে ওরা রওনা দিয়েছিলো। মখমলের পিচ রাস্তা কেটে শহরের গণ্ডি পেরিয়ে বাস আগুয়ান।

             শক্তিগড়ের ল্যাঁংচা সহযোগে টিফিন সেরে বাসে ওঠার তোড়জোড় শুরু হলে ওরা ঘেরাও হয় একদল বৃহন্নলার দ্বারা। মিলি খুব মজা পায়। সে দলটিকে মলয়ের দিকে পাঠিয়ে দেয়। ওরা মলয়ের গায়ে মাথায় হাত বোলাতে থাকলে মলয়ের অস্বস্তি হয়। একটা একশ টাকার নোট বার করে মলয় নিষ্কৃতি পেতে চায়। নেত্রী বৃহন্নলা ,মিলির দিকে তাকিয়ে হাসলে মিলি চোখের ঈঙ্গিতপূর্ণ নির্দেশে ওদের জানায় মলয়কে পারলে যেন ওরা আরও বিরক্ত করে। মলয় মিলির ঈঙ্গিত ধরতে পেরে মিলিকে তাড়া করে। মিলি দূর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ের পাশে পড়ে থাকা মোরাম পথ দিয়ে দৌড়াতে থাকে। মলয় রণে ভঙ্গ দেয়। বৃহন্নলাদের অট্টহাস্যপূর্ণ ভাষ্যে ওরা নিজেদের অটুর জোড়ের সম্ভবনার কথা শোনে। 

      বাস আবার ছুটতে থাকে নিজের মতো। টু সিটারে জানলার ধারে মিলি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত। মলয় নিরন্তর চেষ্টা করে চলেছে খুনসুটি করার। চোখ পাকিয়ে মিলি মাঝেমধ্যে মলয়কে ভৎসনা করছে। মিলি বর্ষণস্নাত কাশফুল মলয়কে দেখালে মলয় বলে, আমি গ্রামের ছেলে। ওসব তুমি দেখ। ওদের এই খেলা বাসে চোখ এড়ায়নি অনেকের। কেউ কেউ ওদের সমালোচনা করতে আদিখ্যেতা শব্দটা ব্যবহার করে ফেলেছে ইতিমধ্যে।  মলয় গায়ে মেখে কিছু বলতে গেলে মিলি মলয়ের মুখে হাত চাপা দিয়ে মলয়কে থামিয়েছে। মলয় হেসে বলেছে, যাক বাবা তবুতো আঙুলের ছোঁয়া মিললো। 

           গাড়ি মহম্মদবাজার পৌঁছালে উভয়ে নেমে পড়ে। যাত্রা কোলকাতা থেকে শুরু হলেও নিরালা সফর সন্ধানী মলয় এখনও অতৃপ্ত। মলয়কে অফিসের কাজে মাঝেমধ্যেই এখানে ওখানে যেতে হয়। সে আগে থেকেই বাড়িতে না ফেরার বার্তা দিয়ে এসেছে। এতদুরে এসে মিলি কী করে ফেরার কথা ভাবছে মলয় তা বুঝতে পারে না। যাতায়াতেই সময় খেয়ে যাবে। মিলি মলয়কে অন্যমনস্ক দেখে জিজ্ঞেস করে, কি ভাবছেন মশায়? মলয় বলে, তেমন কিছু নয়। এত দূরে আসার কি মানে ছিল বলতো? মিলি বলে,জীবন কি সহজপাঠ্য,  বিনা আয়াসে আত্মীয়করণ করা যাবে?  মলয় বলে, আচ্ছা সত্যি করে বলতো তুমি এরকম একটা অজানা জায়গায় আসতে চাইলে কেন? মুচকি হেসে মিলি বলে, ক্রমশ প্রকাশ্য। বুঝতে না পেরে মলয় মাথা চুলকোতে থাকে।  

ওরা মোহাম্মদ বাজার পাথর খাদানে ঢুকে পড়েছে। ঘড়ির কাঁটা বারোটা পার করেছে। লরি বোঝাই হয়ে টনটন পাথর আসছে ক্রাশারে। গম ভাঙ্গানো কলের মতো পাথর পড়ছে উল্টানো পিরামিড আকারের ধারকে। বিপুল শব্দে গ্রাইন্ডার পাথর ভাঙছে। লম্বা কনভেয়ার বেল্ট স্টোনচিপ বয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে দূরে। ধুলো ধোঁয়া দূষণে মলয় নাজেহাল। মিলি অসুবিধে গায়ে না মাখলেও তার শ্বাসযন্ত্র উত্যক্ত এমন অপ্রাকৃতিক দুষণে। পকেট থেকে মাস্ক বার করে মলয় মিলিকে পরাতে চাইলে মিলি বাঁধা দেয়। পাশ থেকে এক আদিবাসী পুরুষ বলে, বহেন জি এইসা মত করো, পহেনলো। অগত্যা মিলিকে মাস্ক পরতে হয়। মিলির মন হঠাৎ ভালোলাগার নেচে ওঠে। মলয় বেখেয়ালি নয় এই ভেবে ওর ভালো লাগে। চোখের আলতো নজরে সে মলয়কে ছুঁয়ে দেয়। মলয় সোহাগের কারন জানতে চাইলে মিলি বলে,দেখলে না, আদিবাসী দাদা কেমন সহজাত সরলতায় বোন পাতালো। আমিও তো চাই সম্পর্ক পাতাতে মলয়ের এই কথা মিলি না শোনার ভান করে।

            কাজের ফাঁকে আদিবাসী রমণী গাছের তলায় বিশ্রাম নিচ্ছে। মিলি এগিয়ে যায় সেই দিকে। সুঠাম কালো শরীর। গভীর দুই চোখ। তীব্র নাসিকা  পর্বতসম জেগে আছে দুই সরোবরের মাঝে। মিলি পরিচয় জানতে চাইলে সে বলে দূরের দুমকা পাহাড়ে তার পরিবার থাকে। সপ্তাহান্তে যাতায়াত। বর্তমানে তার মরদ ধান কাটায় গ্রামে ব্যস্ত। চাষবাসের কাজ শেষ হলে সে পাথর খাদানে কাজ করতে আসবে। মেয়েটির নাম চিত্রা। মিলি চিত্রাকে জিজ্ঞেস করে এখানে কয়লা খনি বিরোধী লড়াইয়ে তুমি যুক্ত আছো? পরিবেশটা হঠাৎ করে পাল্টে যায়। চিত্রা কঠিন কন্ঠে বলে, আপনি কে। জানালে আপনি আমাদের কোন কাজে লাগবেন?  চিত্রার স্পষ্ট উত্তর মিলির ভালো লাগে। মিলি  দু দণ্ড কাটাতে চায় চিত্রার সঙ্গে। মলয় মিলিকে অমন খটোমটো পরিবেশ থেকে সরিয়ে নিতে চায়। মিলির সঙ্গ যে কোন কারনে কাটছাঁট হলে স্বাভাবিক ভাবেই মলয় ক্ষুব্ধ হচ্ছে। মিলি বলে, তুমি ঘাবড়াচ্ছ কেন ও তোমার সঙ্গে তো খারাপ ব্যবহার করেনি। করেছে আমার সঙ্গে। মলয় বাধ্য হয় চুপ করে যেতে। মিলি দু পা ছড়িয়ে সবুজ ঘাসের উপর থেবড়ে বসে পড়ে। চিত্রা আন্দাজ করতে পারে, মিলিরা সরকার পক্ষের কেউ নয়।  সরকার পক্ষের কেউ ওদের মানুষ বলেই মনে করে না থেবড়ে বসে পড়া তো দূর অস্ত। চিত্রা কথা বলা শুরু করে। মিলির ধারাবাহিক প্রশ্নের উত্তরে চিত্রা বলে চলে, বেনীয়া পুঁজির হাতে সামান্য লভ্যাংশের আশায় সরকার সবকিছু বেচে দেবে। প্রাথমিক ভাবে দেউচা পচামী আদিবাসী গাঁওতা এই লড়াই শুরু করেছিলো। মিলি, চিত্রাকে এই আন্দোলনে সে আছে কিনা জিগেস করলে সে বলে, কিউ নেহি। করিব করিব বিশ বরষ ইহা বিত গেয়া। রোজিরুটি ছোড়কর মেরেকো কঁহি যানা নেই হ্যায়।

দেউচা পাঁচামি কয়লা খনি বন্ধের দাবি নিয়ে রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে  বীরভূমের হরিণ সিঙ্গা দেওয়ানগঞ্জ এবং দেউচা পাঁচামি প্রস্তাবিত কয়লাখনি বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়ে আদিবাসী অধিকার মহাসভার সদস্যরা পায়ে হেঁটে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলো। এই কথায় অবাক মলয় দুরে থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করে,তুমি ছিলে পদযাত্রায়? গর্বিত চাহনিতে মাথা নাড়ায় চিত্রা। মিলি জিজ্ঞেস করে, তোমরা পারবে? আমাদের যে পারতেই হবে। খাদান গেলে খাব কি? চিত্রার শান্ত সমাহিত  উক্তির দৃঢ়তায় মিলির মধ্যবিত্ত চাওয়া পাওয়ার হিসেব নিকেশ গুলিয়ে যায়। চিত্রা বলে, আমরা তাদের ভয় করি যাদের জমি আছে। তারা নিঃসংকচে সরকারি টোপ গিলে জমি বিক্রি করে দেবে। মরবে ভূমিহীন মানুষ। মা অর্থাৎ পৃথিবীর ভাগাভাগিতে একদল জমিদার অন্যরা ভূমিহীন। সব  সমস্যা ভূমিহীন সবহারাদের। আরও একবার হোঁচট খায় মিলি। মিলির আবেগের আতিশয্যে অবাক মলয় চিত্রাকে জিজ্ঞেস করে, খনি হলে তোমরা কাজ পাবে। মানুষ দুষণের হাত থেকে বাঁচবে। আমরা দুষণ সিলিকোসিস সব জানি। একদিন এমন আসবে লিখাপড়া জানা মানুষও কাজ পাবে না। তুরা কি ভাবছিস খনিতে খেটে খাওয়ার কাজ পাওয়া যাবে?একজন সাধারন নারী কিভাবে লড়াইয়ের ময়দানে সমৃদ্ধ হয় বুঝতে পেরে মিলি পুলকিত হয়।

খাদান অঞ্চল ছেড়ে বেরোতেই একটা  বিক্রম অটো এসে ওদের সামনে হাজির হয়। ওরা মন্দির দেখতে যাওয়ার জন্য অটো বুক করে ফেলে। মলয় অটো তে পাশাপাশি বসতে চাইলে মিলি গানের সুরে বলে,"দাঁড়াও আমার আখির আগে"। মলয় বলে নির্জনক্ষণ, ঘনিষ্ঠতার সমানুপাতিক।মিলি বলে, তোমার অভিধানে শরীরী ঘনিষ্ঠতাই কি একমাত্র বিবেচ্য বিষয়।  মলয় উত্তর না করে চুপ মেরে যায়। সেই সুযোগে অটো চালক ছেলেটি গাইডের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আর থামতেই চায় না। মন্দির, মন্দিরের সেবায়িত, সেক্রেটারি কত একর জমি নিয়ে এই মন্দির প্রাঙ্গন মৌলাক্ষী মা কত জাগ্রত তার হাজারো রুপকথা সব তাকে জানাতে হবে। মলয় ফিসফিস করে বলে, ও হয়তো গাইডের কাজ করার জন্য টাকা চাইবে। সব টুরিস্ট স্পটে এমনই হয়। মিলি জিজ্ঞেস করে, ভাই,আপনি কি  এখানকার গাইড? ছেলেটি হেসে বলে, হ্যাঁ, আমি গাইডের কাজ করি। অমনি মিলি জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা ভাই মন্দির গাত্রে কোন নৃত্যশৈলীর ভাস্কর্য আছে আপনি বলতে পারবেন? ছেলেটি প্রশ্ন বুঝতে না পেরে আমতা আমতা করতে থাকে।  মিলি আগেই দেখে নিয়েছে ওদের গন্তব্য মলুটি এসে গেছে। ওরা ভাড়ার টাকা আর এক্সট্রা পন্চাশ টাকা দিয়ে ছেলেটিকে বিদেয় হতে বলে। বেচারা অটো চালক সম্পূর্ণ ট্রিপের দায়িত্ব পেতে চেয়েছিল বেশি বকেই মুশকিল হলো। দাঁড়িয়ে থাকা হতভম্ব  মানুষটির  মুখে  মলয় একটা সিগারেট ধরিয়ে দেয়। মিলি দূরে দাঁড়িয়ে হাসতে থাকে।

              মন্দির অঞ্চলে ওরা প্রবেশ করেছে। ইন্টারনেট ঘেঁটে মিলির সবই জানা হয়ে গেছে। মিলি সঠিক জায়গায় অটোটিকে ছেড়ে দিয়েছে। এখন মিলি অটো চালক গাইডের ভুমিকায় উত্তীর্ণ। সে শুরু করে, বাজবসন্ত রায় ছিলেন গরীব ব্রাহ্মন সন্তান। তখন গৌড়ের অধিপতি ছিলেন আলাউদ্দিন হুসেন শাহ। বাদশাহী সড়ক ধরে তিনি উড়িষ্যা থেকে বীরভূমের মধ্য দিয়ে ফিরছিলেন। দীর্ঘ সফরের পর বিশ্রামের জন্য ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে এই মলুটির কাছাকাছি কোথাও তিনি তাঁবু ফেলেছিলেন। সেইসময় তাঁর বেগমের অতিপ্রিয় একটি বাজপাখি সোনার শিকল কেটে পালায়। বেগমের নাওয়া-খাওয়া ব্ন্ধ। বাজপাখি ধরে এনে দিতে পারলে উপযুক্ত পুরস্কার দেবেন বলে ঢেরা পিটিয়ে ঘোষণা করেছিলেন হুসেন শাহ। বসন্ত রায় কোনওভাবে ধরতে পেরেছিলেন পাখিটিকে। তিনি তা বাদশার কাছে নিয়ে গেলে আলাউদ্দিন হুসেন শাহ খুশি হয়ে আদেশ দেন, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বালক বসন্ত রায় ঘোড়ায় চেপে ছুটে যতখানি ঘুরে আসতে পারবে, ততখানি ভূমি রাজা তাকে নিস্কর দান করবেন। বাদশা তাঁর কথা রেখেছিলেন, প্রায় ১৬ কিলোমিটার ব্যাসের এক বিস্তীর্নভূমি বালক বসন্ত রায়কে তিনি নিস্কর দান করেছিলেন। 'রাজা' উপাধিও তিনিই দেন। এই ছেলে পরিচিত হন রাজা বাজবসন্ত রায় নামে। তখন থেকে সেই যুবক বসন্ত 'বাজ বসন্ত' নামে পরিচিত হন। এই গল্প শুনিয়ে মিলি বলে, এমন ভালোবাসলে তবেই প্রেমিক হওয়া যায়। হেসে মলয় বলে, দিব্যি চেপে গেলে আসল কথাটা। কী, কী চেপে গেছি? মিলির কথায় মলয় বলে, ওর কতগুলো বেগম ছিল? মিলি খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলে, তোমারও চাই বুঝি। মলয় বলে, একটার যোগান হল না ঠিকমতো!

চাহিদা অনুযায়ী সেরকম কিছু না পেলেও মিলি আদিবাসী নৃত্য ফাগুয়া ডোমকাছের মুদ্রা কয়েকটি মন্দিরগাত্রে খুঁজে পায়। মন্দির কমিটির সেক্রেটারি মিলিকে এগুলি সনাক্ত করতে সাহায্য করে। মৌলিক্ষ্যা মা অর্থাৎ তারামায়ের দিদি এখানে পূজিত হন। বেশ কয়েকটি মন্দির বিগ্রহহীন। বিষয়টি মলয়কে নাড়া দেয়। মন্দির দেখে এয়ারবেস যাওয়ার পথে মলয় আবৃত্তি শুরু করে-

তিনি গেছেন যেথায়

 মাটি ভেঙে করছে চাষা চাষ। 

পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ 

খাটছে বারোমাস। 

মিলি পেছু থেকে এসে মলয়ের দোলাতে থাকা হাত ধরে গলা মেলায়-

 রৌদ্র জলে আছেন সবার সাথে

 ধুলা তাহার লেগেছে দুই হাতে । 

         রামপুরহাট থেকে দুমকা রোড ধরে সোজা জঙ্গলের পথ দুমকার দিকে চলে গেছে। মিলির ইচ্ছে হয় দূর দুমকা পাহাড় নিজেকে মিশিয়ে দিতে। হাতে সময় কম ফিরতে দেরি হয়ে যাবে। মলয়ের মনের কোনে রাত পার করে দেওয়ার ভাবনা জেগে ওঠে। সে মিলির ইচ্ছায় রসদ দিতে বলে, বাড়িতে ফোন করে না ফেরার বার্তা জানিয়ে দাও। মিলি নিজের ভাবনা রশিতে টান দেয়। এখানে আসার আগেই মিলি ইন্টারনেট থেকে সিদ্ধান্ত করেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নির্মিত এয়ারবেস দেখতে যাবে। এই কথা মলয়কে জানাতে মলয় বলে, অতঃকিম, দেবভূমে দেবীর কথাই পরিধানযোগ্য হোউক।  মিলি বুঝতে পারে মলয় নিজের ইচ্ছার আগুনে ছাই চাপা দিল। নতুন অটোয় নতুন পথ পরিক্রমা শুরু হয়। লাল রাস্তা ধরে খাদানের লরি স্টোনচিপ পিঠে বোঝাই করে করে নিয়ে যাচ্ছে। মিলির সোনার বরন ধুলার আস্তরণে কালচে মেরে গেছে। সার সার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে পথে। মলুটির বাসিন্দারা নিত্যদিন এই ট্রাফিক জামে অভ্যস্ত। পথের বাঁদিকে একটি বৃহৎ সরোবর। মলয় অটো ছেড়ে নেমে পড়ে। মিলিও তাকে অনুসরণ করে। ভাঙাচোরা পুরানো দিনের ঘাটে শ্যাওলার পুরু আস্তরণ। হ্রদের জল চাপা পড়ে আছে পদ্ম পাতায়। মলয় বলে লাল পদ্ম। মলয়কে মিলি তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করে লালপদ্মর প্রতিশব্দ কী, বলোতো? মলয় হাবার মতো চেয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল করে। মিলি বলে মধুসূদন পড়নি, মধুহীন কোরো নাগো তব মনঃকোকনদে। মিলি বলে হা করে দেখছো কি? মলয় বলে তোমার শরীরের রক্তিম আবেশে সরোবরের প্রতিবিম্ব। মিলি বলে যাক বাবা কাব্বি করা দেখছি তোমারও আসে। মুচকি হেসে মলয় ঝুপঝুপ করে শ্যাওলা ধরা সিঁড়ি বেয়ে পুকুরে নেমে পকেট থেকে শুকনো রুমাল বার করে জলে ভিজিয়ে নেয়। তারপর সে মিলির কাছে ফিরে আসে। মিলি প্রশ্নহীন মলয়ের দিকে চেয়ে থাকে। ভিজে নেকড়ায় মলয় মিলির মুখ মুছে দিতে দিতে বলে, কালীমা তোমার জন্য নয়। মিলির ভালো লাগছিল প্রতিটি মুহূর্ত। একই সাথে মিলি উপভোগ করছিল প্রকৃতির অনাদর। মলয়ের আন্তরিক যত্নে তার সায় আছে সে এমনটাই চায় কিন্তু হঠাৎ মলয় প্রশস্তিতে তার রাগ হয়ে যায়। ঠিক সেই সময় অটো চালকের ডাকে ওদের হুশ ফেরে। "রাস্তা ক্লিয়ার, আপনারা আসুন"। তড়িঘড়ি অটোয় উঠতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি হয়। মিলি রুষ্ট চোখে তাকালে মলয় বলে,রুদ্র মূর্তি ধরার আগে তুমি প্লিজ জানিও, আমি প্রস্তুত থাকব। মিলি হেসে ওঠে।

এয়ারবেসের কাছে গিয়ে অটো দাঁড়ায় ভাড়া না মিটিয়ে ওরা অটোচালককে অপেক্ষা করতে বলে। দুপাশের গহীন বনরাজি ঘেরা সান বাঁধানো বিশাল চত্বর। বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রশক্তির যুদ্ধবিমান নামা ওঠার কারণে প্রস্তুত হয়েছিল এই পোর্ট। 

               অটো তে আসার সময় সংক্ষেপে মিলি এই পরিত্যক্ত এয়ারবেসের ইতিহাস মলয় কে বলছিল, কিভাবে মিত্রশক্তির পক্ষে আই এ এফ আরাকানে জাপানি সৈনকে প্রতিরোধ করেছিল কিভাবে নর্থ থাইল্যান্ডে পর্যুদস্ত হয়েছিল ফ্যাসিষ্ট শক্তি। অবাক মলয় বলে আমরা আনাচে কানাচে পড়ে থাকা ইতিহাসের খোঁজই রাখি না। মিলি হেসে কবিতা আওড়ায়," দেখা হয় নাই দু চোখ মেলিয়া"। কথা শেষ না করে মিলি বলে চলে, ঝাড়খন্ড থেকে নকশাল আন্দোলনকারীরা এখানে এসে আস্তানা গাড়তো। এক কথায় এই এয়ারপোর্ট মরেও মরেনি। অনেক যুদ্ধের সাক্ষী হিসেবে  লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে। 

লম্বা রানওয়ে ছুটে চলেছে আদিগন্ত সবুজের বুক চিরে। মহুয়া কুল শিরিষ গাছেরা যেন এই মঞ্চটিকে কয়েক যুগ ধরে আঁচলের তলায় লুকিয়ে রেখেছে লোক চক্ষুর অন্তরালে। গ্রিস দেশের কোন প্রাকৃতিক রঙ্গমঞ্চ যেমন উদার এও তেমনই। মিলি নৃত্যের ভঙ্গিমায় একপাক চক্কর কেটে এসে মলয়ের সামনে দাঁড়ায়। মলয় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বলে-

(অর্জুন) আমি পার্থ। দেবী, তোমার হৃদয় দ্বারে প্রেমার্ত অতিথি। 

নৃত্যশিল্পী হিসেবে মিলির বরাবরের আকাঙ্ক্ষা ছিল খেলার মাঠের মতো একটা বড় মঞ্চে সে একাকী পারফর্ম করবে। অকষ্মাৎ মলয় যেন মিলির হৃদয়ের বার্তা পড়তে পেরে বিস্মৃত মিলিকে জাগিয়ে তুলেছে। এক আলোকবর্ষ গভীর দৃষ্টিতে বিদ্ধ মলয় আশা করে আরও কিছু কিন্তু মিলির হাতে সময় নেই। সে একাই চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যর  সবকটা চরিত্র করবে আজ। যে সুরের আগুন মলয় তার প্রাণে লাগিয়ে দিয়েছে তার থেকে মিলির মুক্তি নেই। সে গেয়ে ওঠে- গুরু গুরু গুরু গুরু ঘন মেঘ গরজে পর্বতশিখরে। এমনটা ঘটুক মলয় তা হতে দিতে চায় না। সে অভিনয়ে না হলেও গানে পটু। সে অংশ নিতে চায় চিত্রাঙ্গদা পালায়। 

 অর্জুন(মলয়) ও চিত্রাঙ্গদা(মিলি)

"অহো! কি দুঃসহ স্পর্ধা!"

উভয়ে "বেলা যায় বহিয়া, দাও কহিয়া"

হাতের ঈশারায় মিলি মলয় কে নাচতে বলে।

নৃত্যশৈলী মলয়ের আগ্রহের বিষয় ছিলো না কোনদিন। হাত নাড়িয়ে সে জানিয়ে দেয় অপারগতা। মলয় তার ভালোলাগা থেকে গেয়ে চলে।

 চিত্রাঙ্গদা(মিলি)"ওরে ঝড় নেমে আয়, আয়, আয় রে আমার".....

একের পর এক।

"বঁধু, কোন্‌ আলো লাগল চোখে। 

"দে তোরা আমায়/নুতন করে দে/ নতুন আভরণে। 

                    বর্ষার দিন, দুপুর গড়িয়ে বিকেলে পৌঁছতে এখনো দেরি থাকলেও আকাশে মেঘের ছোঁয়া। সবুজ বনরাজি কালো মেঘের আস্তরণে রোমাঞ্চকর। ঘর্মাক্ত মিলির শরীর বেয়ে জলের ধারা। গান হারিয়ে মলয় অবাক চোখে প্রেমিকায় নিমগ্ন। মিলি মঞ্চে মগ্ন ডুবুরি। হঠাৎই শুঁড়ি পথ ভেঙে ক্ষীণ আওয়াজ প্রকট হয়ে ওঠে। মলয় আগুয়ান হয়ে দৃশ্যান্তরে যায়। মগ্ন মিলি এখনও বেখেয়ালি। নিস্তব্ধ প্রকৃতিই আজ তার দর্শক শ্রোতা। যাক না মলয় অন্যখানে। যদিও চিত্রাঙ্গদার ভাবনা মলয়ের থেকে পাওয়া চোদ্দয়ানা। রে রে শব্দে তিন চার জন লোক ছুটে আসছে। সামনে এক আদিবাসী মহিলা যার দুহাত বুকে জাপটে ধরে আছে এক সারসকে।  মলয় অস্ফুটে বলে ওঠে, stork। ততোধিক বিস্ময়ে মলয় মিলির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বলে, মনে হচ্ছে মেয়েটি চিত্রা মুর্মু। নৃতরতা মিলি ছন্দ হারিয়ে নির্বাক দর্শক। চিত্রা জঙ্গল পার করে ততক্ষণে রানওয়ের শানে বসে হাঁফাচ্ছে। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে আন্দাজ করে মিলি রানওয়ের প্রান্তে পড়ে থাকা এক মাঝারি আকারের প্রস্তর খন্ড তুলে নিয়েছে হাতে। মিলির দেখাদেখি চিত্রাও ক্ষিপ্র বাঘিনীর মতো ফিরে দাঁড়িয়েছে। তারও দুই হাতে সম ওজনের দুটি প্রস্তরখন্ড। পাখিটা মেঝেতে শুয়ে করুণ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে বিনম্র। সজাগ মিলি। সে বুঝতে চাইছে কেন এমন হল। তিনজন পুরুষ দূরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাঁড়িয়ে আছে। চিত্রা জানায়, ওরা ইউডিসিএল ঠিকাদারের কর্মী। খনিজ সম্পদ যারা বাটোয়ারা করবে তাদের টেনিয়া। চাকরি বহাল রাখতে বন্যপ্রাণী মেরে আদিবাসী রমণী ধরে প্রভুদের ভেট দেওয়াই ওদের কাজ। আন্দোলনে যোগ দেওয়া আদিবাসী রমণীদের প্রতি ওদের আকর্ষণ বেশি। কথার মাঝেও মিলি সজাগ। শত্রুর প্রতি শ্যেন দৃষ্টি রেখে চিত্রা বলে চলে, আহত সারস পাখিটাকে পদ্মপুকুরের কাছ থেকে ধরে এনে আমি বাঁচাবার চেষ্টা করছিলাম। ওরা পাখিটাকে দাবি করে। আমি রাজি না হলে ওরা বলে, তাহলে তুই আর তোর পাখি দিয়ে আমরা রাতের ভোজ সারবো। মিলি পেছনে না তাকিয়ে মলয়কে বলে ভিডিও করতে। ওদের কথোপকথনের সুযোগে আততায়ীদের একজন পা বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে উদ্যোগী হয়। মিলি চিত্রাঙ্গদার রণরঙ্গিনী মূর্তি ধারণ করে। সে দীপ্ত কন্ঠে বলে ,"পুরুষের বিদ্যা করেছিনু শিক্ষা "। সাবধান, এক পা এগোলে মাথা ফাঁক করে দেব। ততধিক উৎসাহে চিত্রা দু পা এগিয়ে যায়। আততায়ীদের একজন গাছের আড়াল নিয়ে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে। চিত্রা টের পেয়ে মিলিকে বলে, সাবধান। মিলি নজর করে একটা ব্যবহার উপযোগী গাছের ডাল পড়ে আছে। হটোকারি হয়ে মিলি অন্য পথে গাছের আড়াল নিয়ে সন্তর্পণে লোকটির পেছনে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করে। আগুয়ান লোকটি গাছের আডাল ধরে এগোনোর ফলে মিলিকে দেখতে পায়নি। বাকিরা স্যাঙাতকে সজাগ করতে চেঁচাতে থাকে। ঠিক তখন চিত্রার হাত থেকে ছিটকে পাথর পড়ে লক্ষ্যে। ওরা ছিটকে কোনরকমে নিজেদের বাঁচায়। বাঁ হাতের পাথর ডান হাতে নিয়ে চিত্রা ফের তাক করলে বাকিরা পেছোতে থাকে। মিলির অস্ত্রের আঘাতে ততক্ষণে একাকী সৈনিক পপাত ধরণীতল। চিত্রা লাগাতার পাথর ছুঁড়ে যাচ্ছে যাতে অন্যরা ফিরে না আসতে পারে। শেষমেশ মিশন পরিত্যাগ করে বাছারা দৌড় লাগায়। ভুপতিত আততায়ী চিত্রা্কে কথা দেয় এমন কাজ সে আর করবে না। তাকে যেন পুলিশে না দেওয়া হয়। মিলি রাজি না হলে চিত্রা বলে, ছেড়ে দাও। পুলিশ চোর ভাইভাই, ও সবার কাছে বেইজ্জত হবে তাই ক্ষমা চাইছে। মিলিরা সন্তর্পণে সামনের দিকে তাকিয়ে পেছু হেঁটে রানওয়েতে ফিরে আসে। মিলি এতক্ষণ মলয়ের কথা ভাবেনি। পিছনে না তাকিয়েই মিলি জিজ্ঞেস করে, ভিডিও করেছো? চিত্রা যখন মানা করছে,ডায়রি করবনা তবে একটা থ্রিলিং ভিডিওত  লাগবে নিজেদের প্রমান করতে। কোন উত্তর আসে না। পেছনে ফিরে চিত্রা দেখে কেউ কোথাও নেই। সে এই তথ্য মিলিকে জানাতে ইতস্তত করে। এখনও উভয়ের চোখ সজাগ হয়ে তিনদিকে ঘুরছে। হঠাৎ অটোর শব্দে সচকিত হয়ে উভয়ে পজিশন নেয়। অটো সামনে এলে ওরা দেখে পেছনের সিটে মলয় বসে আছে। সে চিৎকার করে,মিলিকে অটোতে উঠে আসতে বলছে। মিলি ভাবতে থাকে সংকটের মুহূর্তে মলয় তাকে ফেলে চলে গেল!  পরবর্তীতে সে ভাবে, মলয় ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কারণ রাস্তায় পুনরায় শিকারীরা ওৎ পেতে আক্রমণে উদ্যত হলে একজন সঙ্গী পাওয়া যাবে। জলদি লোকালয়ে ফেরার উপলব্ধির কারনে মিলি চিত্রার কাছে মলয়ের বুদ্ধির তারিফ করে। মিলির ভাষ্যে চিত্রা রুঢ় কন্ঠে বলে, এই ডরপোক মরদ তোমার জন্য সহি না আছে আমি এ ধরনের লোকদের চিনি। মিলি ফ্যলফ্যল করে চিত্রার দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর চিত্রার কথার জবাব দিতে গিয়ে চুপ মেরে যায়। স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টায় মিলি দু পা এগিয়ে গিয়ে পাখিটাকে আদর করে কোলে নেয়। অটোতে উঠে মিলি চিত্রাকে উঠে আসতে বলে। চিত্রা অস্ত্র মানে বেশ কয়েকটি পাথর তুলে নেয় অটোতে। কোলে পাখি থাকা সত্ত্বেও মিলি লাঠিটা তুলতে ভোলেনি। লাঠিটা অটোতে ঠেস দিয়ে রেখে মিলি পাখিটাকে নিরন্তর আদর করে চলে। মলয় মিলির হাবভাব ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। অটোরিকশায় জায়গার অভাব থাকার অছিলায় মিলি মলয় কে অটো থেকে নেমে যেতে বলে। মিলির আদেশ অনুসারে মলয় নেমে যায়। মিলি অটো রিক্সা চালককে বলে, গাড়ি চালিয়ে এগিয়ে চল রাস্তায় শত্রুদের সাথে মোলাকাত হলে শহুরে বাবু আবার পালাবে। তুমি ফিরতি ট্রিপে ওকে নিয়ে এসো। 

             শানবাঁধানো রানওয়ে যুদ্ধ বিমানের আগুনে  ঘর্ষণের মৌতাত হারিয়ে মিইয়ে যাওয়া বিস্কুটের মত নেতিয়ে ছিল বহুদিন। আজ নতুন আঁচে তার শরীরে উষ্ণতার প্রলেপ। অতৃপ্ত আত্মায় যার পরনাই কিঞ্চিৎ স্বস্তির হাওয়া। পাশা খেলায় হেরে দ্রৌপদীরা চিরকাল পুরুষের চালে বিক্রি হয়ে যায়। এই দুই মহিলা পুরুষে ভরসা না রেখে প্রতিরোধ করলো। আবার হয়ত ঠান্ডা শীতের রাত ঝড় জল রোদে রানওয়েকে উপবাসে জেগে থাকবে হবে বহুদিন। মিত্রশক্তি সমাজ পরিবর্তনকামী বিপ্লবী এবং একক মানুষের লড়াইয়ের দিনলিপি লিখে চলাই যে তার কাজ।

                                  .....…..... 




……………………………. 

Comments

Popular posts from this blog

ছোটগল্প - লাল কালো ইট।।

একগুচ্ছ কবিতা

কোন সে আলোর স্বপ্ন(কথায় ধারাবাহিক)