উপন্যাস-মাধবীলতার কাহিনী(কৌরব)

 মাধবীলতার কাহিনী। 


      এক 


      মাটি কামড়ে মাঠের বাইরে যাচ্ছে বল। ক্যাপ্টেন গগনের উইনিং স্ট্রোক। হাততালি দিয়ে নেচে উঠেছে মাধবী। গতবারের হারের বদলা নিয়ে তালতলার ক্যাপ্টেন,গগন ট্রফি নিয়ে গেল কলকাতায়। সঙ্গে নিয়ে গেল এক তরুনীর ভালোলাগা। এক বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকতে হবে গগনকে। গগন এই টুর্নামেন্টের জন্য মুখিয়ে থাকে। মাঠে গগনের বিক্রম দেখার জন্য হাপিত্যেশ করে থাকত অনেকে। এবার বাঙলা টিমে চান্স মিলেছে গগনের। তাই খেলার শুরুতে হাততালি দিয়ে গগনকে স্বাগত জানায় গড়পাড়ের দর্শক। গগনের সন্ধানী চোখ খুঁজে চলেছে বিশেষ কোন মানুষকে। 

            ট্রফি জেতার পর গগন পোডিয়ামে উঠে নির্নিমেষ চোখে মাধবীর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর পুরস্কার নিয়ে সরাসরি মাধবীর দিকে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে প্রাইজটা তুলে দেয় মাধবীর হাতে। 'এই পুরস্কার তোমার' গগন বলে। হতবাক মাধবীর, কেন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে গগন বলে, ' সারাটা বছর অন্য সব টুর্ণামেন্টে আমি ধেড়িয়েছি। শুধু গড়পার আমাকে ফেরায়নি। মাধবী জিজ্ঞেস করে, 'তাহলে বাংলা দলে স্থান পেলেন কি ভাবে?' গগন বল,' জানিনা।' মাধবী হাতে পুরস্কারটি নিয়ে নেড়েচেড়ে গগনকে ফেরত দিয়ে বলে- এটা ধরুন এর অমর্যাদা করবেন না এটা দলীয় পুরস্কার'। গগনের হুশ ফিরে আসে। সে পুরস্কারটা ফেরত নিয়ে বলে,'ইস আমি খেয়াল করিনি এটা বেষ্ট প্লেয়ার ট্রফি নয়। মাধবী হাসলে গগন ততধিক নার্ভাস হয়ে বলে,'আবার এক বছর পর আসব। জানিনা ততদিনে কী হবে? আর দেরী করা উচিত নয়। বলেই ফেলি আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।' ক্ষিপ্ত মাধবী বলে, 'অচেনা অজানা কাউকে শুধু রূপ দেখে যারা ভালবাসে আমি তাদের দলে নই।  আপনার খেলা ভালো লেগেছে মানে এই নয় যে আমি....থাক। ভালোবাসা অত সহজ বিষয় নয়।' চ্যাম্পিয়ন গগন কালো মুখ করে ফেরৎ আসে দলের অন্যদের কাছে। পাড়ার মানুষজন আলোচনা করতে থাকে সুন্দর সুপুরুষ গগনের কী নেই? মাধবীর নাক বড্ড উঁচু, মানুষের সাথে সুযোগ পেলেই সে খারাপ ব্যবহার করে।

            এহেন মাধবীর গ্রাজুয়েশনের পর প্রথম পরীক্ষাতেই চাকরি মিলে যায়। সন্দীপ নামের সাদামাটা একজন ছেলেকে ভালোবেসে ফেলে মাধবী। সন্দীপ মানুষ হিসাবে ভালো। বাবা মায়ের ইচ্ছা ছিল অনেক উঁচুতে নাড়া বাঁধা। কিন্তু স্বাধীন মেয়ের ইচ্ছায় বাঁধ দেওয়া গেল না। অসহায় বাবা-মা মত দেন বিয়েতে। ছুটতে থাকে নতুন জীবন। দুজনের চাকরি স্থল শহরের দুই প্রান্তে। দূরত্ব এবং অফিস টাইম ভিন্ন হওয়া স্বত্তেও বেরোবার সময় অভিন্ন। মাধবী একদিন সন্দীপকে বলে- আমার কাছে আট ঘণ্টার চাকরির বাধ্যতা অসহনীয়। সন্দীপ কারন জিজ্ঞেস করলে মাধবী জানায়- আমি তোমাকে ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকতে পারিনা। বহুবার সন্দীপ প্রত্যক্ষ করেছে এই অকপট ভাষ্যের সত্যতা। মাধবী এসপ্ল্যানেডের মুখ থেকে নিজের অফিসের দিকে চলে গেছে। হঠাৎ সন্দীপের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে পেছন ফিরতে জানান দিলে সে দেখে তার মাধু পেছু পেছু আসছে। সন্দীপের কপট ভৎসনায় মাধুর চোখ মুখ লাল হয়ে ওঠে। চারিদিকে বাস-ট্রাম লোকজন ছুটে চলেছে। মাধু সম্বিতহীন, সন্দীপের করকমলে ওষ্ঠ রেখা এঁকে দিয়ে তবেই ওর ছুটি। 

             বইতে থাকে সময়। নিবিড় অকৃত্রিম অনাবিল ভালোবাসার শারীরিক উন্মাদনায় দুজনের তৃপ্ত জীবন। প্রতিটি রাতের আকাঙ্ক্ষায় চাতকের প্রতীক্ষায় দিনাতিপাত করে মাধবী। ভালোবাসার শর্ত মেনে উভয়ের জীবনে আসে এক ফুটফুটে সন্তান সায়ন্তন। সায়ন্তন ওদের ভালোবাসায় কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বরং বেশিরভাগ সময়ই ওরা সায়ন্তনকে আদর করতে করতে নিজেরা শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতো। মাধবীর মনে হতো সন্দীপ বড্ড বেশি আগ্রাসী বড্ড বেশি ভালবাসতে পারে। ধীরগতিতে যেমন ফুলের প্রস্ফুটন ধরা যায় চলচ্চিত্রে। তেমনি মাধবীর কোষে কোষে ছড়িয়ে যেতে থাকে ভালোবাসার সৌরভ। শরীর যেন স্ফুটন উন্মুখ ফুল। কিন্তু দ্বন্দ্বহীন বয়ে যাওয়া জীবন নয়। সায়ন্তনের স্কুলে ভর্তির বিষয়ে যুযুধান দুই পক্ষ। প্রথম  জীবনে  দ্বান্দ্বিকতা প্রত্যক্ষ করে ওরা। সন্দীপ নিজের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে ছেলেকে ইংরেজি শেখাতে চায়। সে চায় সায়ন্তন ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি হোক ফ্লুয়েন্ট ইংরেজি বলতে শিখুক। মাধবীর ইচ্ছা কোন গভঃ স্কুলে ছেলেকে ভর্তি করবে সে। ইংরেজি বলা অভ্যাসের ফসল সেই মোক্ষ লাভের জন্য ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আজ সকাল থেকে দুজনে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত। সাপ ব্যাঙ কি রান্না করেছে মাধবীই জানে। তাতার মানে সায়ন্তনকে যিনি দেখাশুনো করেন সেই অনিমাদিকে বলে আধসিদ্ধ চাল ডাল পাকস্থলীতে পুরে একাকী মাধবী হাঁটা দিয়েছে অফিসের পথে। কুটোটি মুখে না দিয়ে অন্যমনস্ক চলনে সন্দীপও অফিস বের হয়ে যায়। যুক্তির বেড়াজাল টপকাতে টপকাতে আনমনে গলির মুখ থেকে বড় রাস্তায় নেমে পড়ে সে। মাল বোঝাই লরি হঠাৎ বাঁকের মুখে হাজির হয়ে সন্দীপের ভবলীলা সাঙ্গ করে উধাও হয়। শেষ হয় সাত বছরের সুখী গৃহকোন। 

                স্মৃতির নৌকো বেয়ে মাধবী মন দরিয়ায় পাল তুলে ভেসে চলে। নিজের বিচারেই সন্দীপকে হারানোর পাপবোধ চেপে যায় মাধবীর নিজের কাঁধে। শেষমেষ Saint-Denis স্কুলে ছেলে ভর্তি হয়। 

                মহাজাগতিক ঘূর্ণনে কেটে গেছে এক সহস্ত্র জোয়ার-ভাটা। তিলে তিলে জীবনের একমাত্র সাধনা তাতারের ভবিষ্যৎ নির্মানে কেটে যায় মাধবীর মনুষ্য জীবনের দীর্ঘ সময়। তাতার এখন পঁচিশের কোঠায়। তাতারের মানস জগৎ-মা কেন্দ্রিক। বড় হওয়ার সাথে সাথে সে লক্ষ্য করেছে তার মা মাধবী কেমন দুঃখ গুলোকে চাপা দিয়ে জীবন নদী সাঁতরাতে শিখেছে, নিজেকে বন্দী রেখেছে নিভৃত স্মৃতি চারণায়। একবার হরিদ্দ্বার বেড়াতে গিয়ে ছিল মাধবী আর তাতার। তাতার তখন সতেরো কি আঠেরো। দলের এক সদস্য মোহিত কাকু তার মায়ের সঙ্গে ভাব জমাতে ব্যাকুল হয়েছিল। মাধবীর সৌন্দর্যে যে কোন পুরুষ মোহিত হতে পারত। মাধবী চোখে তেমন কেউ কোনদিন ধরা পড়বে না এই ছিল তাতারের বিশ্বাস। কিন্তু মোহিত কাকুর রসিক মন কোথাও ছু্ঁয়েছিল তার মাকে কিশোরের চোখে যা এড়ায়না। মোহিত কাকু ভ্রমণ সারা হয়ে যাওয়ার পর বারবার খোঁজ নিয়েছে মাধবীর। মাধবীলতাকে খুব একটা আগ্রহী হতে দেখেনি তাতার। একদিন হঠাৎ করে তাতার মাকে জিজ্ঞেস করে, মা, মোহিত কাকু কেমন লোক?' অবাক মাধবী চট করে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে বলে, 'এ আবার কি প্রশ্ন মোহিত কাকু কেমন জেনে আমার কি লাভ?' তাতার বলে,'আমার কিন্তু বেশ ভালো লেগেছে ওনাকে।' মাধবী বুঝতে পারে ছেলে বড় হচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ দিয়ে তাতার চাকরি নিয়ে পুনে যাওয়া নিশ্চিত করে ফেলে। প্রাথমিক আনন্দ ঝেড়ে ফেলে তাতার মাধবীকে শুধায়, 'তুমি আমাকে ছেড়ে কি করে থাকবে? শেয়াল শকুন এর ক্ষুন্নিবৃত্তির থেকে কি করে আড়াল করবেন নিজেকে'? মাধবী ভাবে রাস্তাঘাটে তাকে নিয়ে নিশ্চয়ই কোন কথা শুনেছে তাতার। না হলে এমন কথা সে মুখে আনে কী করে।  মাধবী বলে, 'তুই দুশ্চিন্তা করিস না অসুবিধের পাহাড় ডিঙিয়ে তোকে মানুষ করেছি। মায়ের ওপর ভরসা রাখ।' তাতার বলে, 'আমি যাবার আগে তোমার বিয়ের বন্দোবস্ত করতে চাই। তুমি অমত কোরো না। অবাক মাধবীর চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে। ছেলের চোখে ধরা পড়ার আশংকায় তড়িঘড়ি কল ঘরে ঢুকে পড়ে মাধবী।

নির্দিষ্ট দিনে চাকরিতে যোগ দিতে পুনে চলে যায় তাতার। মাধবী ভেবেছিল সঙ্গে যাবে কিন্তু তাকে একা ফিরতে  দিতে রাজি নয় তাতার। তাতার এখন সকালে-বিকেলে মায়ের খোঁজ নেয়। 

           অফিসে মধ্য বয়সী বাঙালি ম্যানেজার এসেছেন। সায়ন্তন তার পছন্দের মানুষ। কাজ পাগল মন্দার মুখার্জিকে সায়ন্তন সম্মান করে। বয়সের বাঁধা কাটিয়ে মন্দার সায়ন্তনের বন্ধু হয়ে ওঠে। কথায় কথায় একদিন মন্দার বলে, 'সায়ন্তন তুমি একা বাড়ি ভাড়া করে না থেকে আমার ফ্লাটে এসে থাকতে পারো। সায়ন্তন বলে, 'স্যার, আমি একা থাকতে ভালবাসি। তাছাড়া আপনার পরিবার খামোখা আমার বোঝা বইতে যাবে কেন?' একরাশ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মন্দার জানায়,'আমি অবিবাহিত। মা-বাবা গত হয়েছেন। ভাই থাকেন সুদূর ক্যালিফোর্নিয়ায়। দেশ ছাড়বো না বলে আমি পুনেতে আটকে আছি'। পাততাড়ি গুটিয়ে সায়ন্তন হাজির হয় মন্দার স্যারের ডেরায়। যদিও মনটা একটু খচখচ করছিলো। মা এলে তাকে অন্যর বাড়িতে কি করে তুলবে সে ভাবনা  তাতারের মনে ফিরে ফিরে আসছিল। একসঙ্গে থাকতে থাকতে মন্দার সায়ন্তনের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। সায়ন্তন একদিন জিজ্ঞেস করে, 'স্যার, আপনি কি কারণে সংসার জীবন বেছে নিলেন না?' মন্দার বলে, 'এত গভীর প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে প্রথমে স্যার শব্দটিকে বর্জন করতে হবে বাবা। সায়ন্তন বলে, 'সময় লাগবে স্যার'। মন্দার হেসে উঠলে তাতার ও সুর তুলে হাসতে থাকে। মন্দার বলে, 'তাতার বাবু, এবার নিশ্চয় স্যারের বাঁধন ভেঙ্গে ফেলতে পারবে?' হতভম্ব তাতার স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে মন্দার কে বলে,'কী করে'? মন্দার টেবিলে রাখা বিশ্বাসঘাতক বইটা তুলে দেখায় যেখানে লেখা ছিল,আদরের তাতার কে মা। ডিগনিফায়েড এই মানুষটি তাতারের মনভূমি প্রথমদিনেই জয় করে নিয়েছিলেন। আজ তার কথায় পরমাত্মীয়তার আভাস পেয়ে তাতারের ভীষণ ভালো লাগে। 

                 তাতারকে একবার কোম্পানির কাজে চিনে যেতে হয়েছিল। কারিগরী দক্ষতায় চীনের দম্ভ বর্তমানে আকাশচুম্বী তা বলে রোবটিক্স, তাতার খুব অবাক হয়েছিলো! তাতার ভাবতেই পারেনি এমন বিষ্ময়কর অগ্রগতি তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশে ঘটা সম্ভব।  বিভিন্ন দেশের ডোমেস্টিক প্রয়োজন অনুসারে ডিজাইন করা রোবটের মেলা সেখানে।  মায়ের কথা মনে পড়ে যায় তাতারের। ঘুম থেকে উঠে ঘরদোর পরিষ্কার, কুকুরের যত্ন নেওয়া, পাকস্থলীর যোগানের ব্যবস্থা করে অফিস যাওয়ার আগে কুকুরকে ক্রেসে দেওয়া। অফিস থেকে ফিরে কুকুর নিয়ে বের হয়ে বাজার করা। মায়ের শতশত  কাজের বাধ্যবাধকতা এবং চরম একাকিত্বের আঁচ অনুমান করে তাতার ভাবে এমন একটি উন্নত রোবট যদি কেনা যায় তাহলে মাকে শারীরিক উপশম দেওয়া সম্ভব। চীন থেকে ফিরে তাতার মন্দার স্যারকে নিজের অভিলাষের কথা জানায়। মন্দার বলেছিল, 'জিয়াং জং মিঙ বিখ্যাত রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ার তুমি যদি বলো তাহলে কাজের নমুনা ভিডিও করে পাঠাব। উনি সঠিক মূল্যে আমাদের একটা রোবট ডিজাইন করে যোগান দিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে  লাখ পাঁচেক খসবে বড়জোড়। একেবারেই রাজি ছিল না মাধবী তবুও whatsapp-এ  পাঠায় ছোট-বড় কাজের নমুনা। অর্ডার প্লেস হয়ে যায় রোবটও ডেলিভারি হয় কোলকাতায়। মন্দারের ইচ্ছায় রোবটটির নাম রাখা হয় 'কেষ্টা'। প্রবাসে থাকলেও মন্দার ছোটবেলায় পড়া 'পুরাতন ভৃত্য' কবিতাটা ভুলতে পারেনি। তাতার ছোট ছুটিতে কয়েকদিনের জন্য কোলকাতায় আসে। কষ্টার্জিত রোজকার, ছেলে এমন ভাবে নষ্ট করেছে জেনে মাধবী ক্ষুব্ধ হয়। তাতার মুখে কিছু বলে না। মাকে বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রেখে কুকুর আর রোবট নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। নিশ্চিন্ত হাতে রোবট ধরে থাকে কুকুরের শেকল। সামনে গাড়ি বা মানুষে থাকলে রোবটের সেনসর টের পেয়ে যাচ্ছে সেই মতো কুকুরের শেকলে টান পড়ছে। রাস্তার কুকুরগুলো রোবটকে দেখে ভৌভৌ শব্দ করছে। রোবটের হাত থেকে ছিটকে বের হচ্ছে কুকুরের চেনা ফ্রিকোয়েন্সির বিষম শব্দ যা মানুষের কর্ণে অধরা কম্পাংক। দৌড়ে পালাচ্ছে নেড়ি কুত্তার দল। পাড়াপড়শীর নজরে পড়ে নতুনতর প্রযুক্তি। মাধবীর হাসি আর ধরে না। মাধবী স্বগোতক্তি করে যাক বাবা একটা সঙ্গী জুটলো। পরমুহুর্তেই তার মনে হয় সব কাজ চলে গেলে নিঃসঙ্গতার নিঃসীম অন্ধকারে ডুবে যাবে সে।

দুই 

             

                 পুজোয় মাধবীর লম্বা ছুটি। সে এসে হাজির হয়েছে তাতারের দুনিয়ায়। তাতারের মা কে সঙ্গে করে উঠেছে একটি বড় গোছের হোটেলে। মন্দারের বাড়ি থেকে যার দূরত্ব হাঁটাপথে মাত্র মিনিট পাঁচেক। তাতার মায়ের সাথে পুজোর ক'দিন থাকবে এমনই জানিয়েছে মন্দার কে। মন্দার তাতারকে বলে, 'মা কে পেয়ে আমাকে নিমেষে ব্রাত্য করে দিলে?' তাতার জানায় মাধবীকে এই কথা। নিঃসঙ্গ জীবনের আর্তি শুনে মাধবীর চটজলদি লোকটাকে ভালো লেগে যায়। পুজোর ছুটিতে কেষ্টাকে রেখে পুনায় আসতে মাধবীর কষ্ট হয়েছিল। ভুসির জন্যও মন আনচান করত মাধবীর। ভুষিকে অমিতের ক্রেসে রেখে আসতে হয়েছিলো। কেষ্টার পাওয়ার ব্যাটারি খুলে তাকে বিকল করে আসতে হয়েছিল। মাধবী যখন ঘর ছেড়ে বের হচ্ছিল তখন ভুসি নেই। কেষ্টার দিকে হঠাৎ তাকিয়ে মাধবীর মনে হলো কেষ্টার অসাড় চোখের পাতায় যেন ছলছল বারি ধারা। কেন যে বারবার পিছু ডাকে এই বাড়ি, কে জানে। এতদিন মাধবী ভেবে এসেছে সন্দীপের ভালোবাসায় সে এই গৃহকোণে বন্দি। আজ মনে হলো নাঃ, এই খাট জানলা দরজা ইট-পাথর ভুসি কেষ্টা কাউকে জীবনের মতো ছেড়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। ওদিকে আদরের তাতার অপেক্ষায়মান। মা কে পাহাড়-সমুদ্রর প্রেমারতি দেখাবে এই আশ্বাস দিয়ে সে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। 

             প্রথম দিন পুনায় পৌঁছে গড়িয়ে নিতে চেয়েছিল মাধ্যমিক দ্বিতীয় দিন সকালে গাড়ি ছাড়বে আজকের গন্তব্য সিংহগড় দুর্গ। তানাজি মালেশ্বরের বীরগাথায় বন্দী দুর্গের অপার সৌন্দর্য। কোন ছোট্টবেলা থেকে সন্দীপ তাতারকে তানাজির গল্প শোনাতো। এত কাছে থেকেও তাতার কোনদিন সিংহগড় দুর্গ দেখতে যায়নি। মনে সুপ্ত আশার বীজ বপন করা ছিল মায়ের সাথে সে দেখতে যাবে এই দূর্গ। সকাল ছটায় গাড়ি ছাড়বে এমনটাই কথা ছিল। মন্দার কাকুর ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে তাই তিনি যাবেন না। হোটেল থেকে বেরিয়ে লনে তাতার দেখে মন্দারকাকু হ্যাভারস্যাক নিয়ে হাজির। তাতারকে অবাক হতে দেখে মন্দার বলে,' বাদ দিতে চাইলে কি সব সময় বাদ দেওয়া যায়, কি বলুন ম্যাডাম?' মাধবী জানায়, 'আপনি তো নিজেই নিজেকে বাদ দিয়েছিলেন'। মন্দার সামনের সিট দখল করে বসে পড়েছে, পেছনে ওরা দুজন। মাধবী ভাবতে পারেনি পরিচয় পর্বটা এমন সুন্দর হবে। সে ভেবে চলে তার ছেলের ভাগ্য ভালোই। এমন একজন মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। মন্দার ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে পেছনের সিটে বসতে চায়নি নিজেকে একটু আলাদা রাখতে চেয়েছিল। তাতার চেয়েছিল সামনের সিটে সে বসবে কারণ হাতে তার দামী ক্যামেরা। যে যার নিজের মতন ভেবে চলায় গাড়ি যে কখন পাহাড়ের ধার ঘেঁষে ছুটে চলেছে তা খেয়াল করেনি কেউ। গাড়ির চালক গান চালিয়েছে টেপ রেকর্ডারে।  'মুসাফির হু ইয়ারোর',কিশোর কুমারের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর মাধবীকে ধাক্কা দিলে সে চোখ মেলে বাইরে তাকায়।  সহাদ্রির লাবণ্যে ভেসে যায় তার সকল ভাবনা। মাধবী বলে, 'বাবাই কি সুন্দর রে'। মন্দার এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। তিনি সহসা বলেন,' আমার মনে হচ্ছিল আমি কাবাব মে হাড্ডি হয়ে জুড়ে বসেছি। মাধবী বলে, 'দাঁড়ান দুচোখ ভরে দেখি। এখন কথা বলার সময় নয়। 

                 গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছে যায় সিংহগড় দুর্গ এখান থেকে প্রায় দেড় ঘন্টার হাঁটা পথ। সদ্য বর্ষাস্নাত সবুজের সমারোহে তৃপ্ত বনভূমি। পাহাড়ের পেটের ভেতর মেঘ কুয়াশার খেলা। দুর্গে পৌঁছতে হলে পাথুরে পিচ্ছিল পথ ধরে হাঁটতে হবে। মন্দার হাত তুলে বলে আমায় মাফ করো। আমি যতটা গাড়িতে যাওয়া যায় ততটাই যাব। আমার শরীরে আজ জোশ নেই। সিদ্ধান্ত হয় মন্দার আর মাধবী আপাতত গাড়িতে যাবে। সায়ন্তন এখান থেকে ট্রেকিং শুরু করবে। 

                গাড়ি পাথরের রাস্তায় লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে থাকে। মাধবী প্রশ্ন করে, 'আপনি তানাজি মালেশ্বরের ইতিহাস জানেন। 'না না ম্যাডাম, আমি ইতিহাসে কোনদিন রসকষ পাইনি' মন্দার বলেন। মাধবী বলে, 'জীবনেও যে পেয়েছেন তেমন কিছু তো তাতারের কাছে শুনিনি'। মাধবীর কথায় হো হো করে হেসে ওঠে মন্দার। গাড়ি বাঁক নিয়ে থামে। এখান থেকে হাঁটতে হবে। তাতার এখনো এসে পৌঁছায়নি। মন্দারকে মাধবী জিগেস করে, 'তাহলে আপনি কি যাচ্ছেন?' এলাম যখন চেষ্টা করে দেখি না হলে কপালে বেরসিক ষ্টাম্প পড়বে'। ওষুধ সঙ্গে আছে কিনা জিজ্ঞেস করে মাধবী হাঁটা লাগায়। নীচে দূরে বিন্দুবৎ তাতার কে দেখা যাচ্ছে। তাতারের পিঠের লাল হ্যাভারস্যাক আর টুপি দিগন্ত বিস্তৃত সবুজে জ্বলজ্বল করা একফোঁটা বিদ্রোহ যেন। 

               ব্যবসার কারণে মাঝেমধ্যে ছোট ছোট খুঁটি লাগানো দরমার ঘর। যেখানে গ্রাম থেকে আনা টাটকা সবজি বিক্রি হয়। শহরের মানুষ শনি-রোববার আসায় এই দুইদিন হাট জমজমাট থাকে। ভ্রমণ সারা হলে নামার পথে এলাকার মানুষ টাটকা সবজি কিনে নিয়ে যায়। অসুবিধে হচ্ছিল মন্দারের। সাহস দেখাতে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে। পাহাড় ভেঙ্গে সামান্য উপরে এসেই মন্দারের হাত-পা কাঁপতে থাকে। মাধবী ততক্ষণে অনেকটা এগিয়ে গেছে। মন্দার বাধ্য হয়ে আশ্রয় চায় সবজি ওয়ালার কাছে। সবজিওয়ালা জানতে চায় সঙ্গে কে কে আছে। অস্ফুট স্বরে মন্দার বলে,' এক ল্যাড়কা আওর উসকা মা'। সবজিওয়ালা রলে, 'জেনানা বলিয়ে না, ও তো পাহাড় মে আগে বড়ি'। ছোকড়া এক সহযোগী সবজিওয়ালার কথায় মাধবীকে ডাকতে যায়। মন্দার অনেকটাই কাহিল ওর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। মাধবী অচেনা অজানা জায়গায় মন্দার বাবুকে নিয়ে কী করবে বুঝে উঠতে পারেনা। সে ফোন করতে চেষ্টা করে তাতারকে, ফোন লাগে না। সহযোগী ছোঁড়া মাধবীর কাছ থেকে নম্বর নিয়ে ফোন করে। স্পিকার অন থাকায় নট রিচেবেল শব্দ নিস্তব্ধ পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে মাধবীকে বিভীষিকাময় পরিবেশ উপহার দেয়। তাতারের রক ক্লাইম্বিং ট্রেনিং ছিল। সে প্রথম থেকেই ঠিক করেছিল তানাজির ক্লিফ ধরেই সে পৌছবে দুর্গের টপে। এলাকার কিছু মানুষ  তাকে বিরত করে। ভিজে আবহাওয়ার রেশ থেকে যাওয়ায় ঘাস আর কাদামাটি পিচ্ছিল হয়ে আছে। তাতার নাছোড়।  হঠাৎ তাতারের খেয়াল হয় মায়েদের কথা। যদিও সে যা চেয়েছিল খেলাটা তেমনই চলছিল।   টপ এর কাছাকাছি পৌঁছে সে বুঝতে পারে অন্য নম্বর থেকে এসেছে বেশকিছু মিসডকল এলার্ট। ফিরতি ফোনে তাতার জানতে পারে ঘটনা। সে তৎক্ষণাৎ নেমে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। নেমে এসে তাতার দেখে, অসীম করুনায় তার মা মন্দারের মাথা নিজের কোলে স্থান দিয়ে জলপট্টি দিচ্ছে। সহযোগী সবজিওয়ালার সহায়তায় তাতার মন্দারকে গাড়ি পর্যন্ত তুলে আনতে সক্ষম হয়। আজ আর কারও হোটেলে ফেরা হলো না। বাড়িতে ফিজিশিয়ান ডেকে পরিচর্যা শুরু হয় মন্দারের। 

                 ছেলের কাছে এসে একান্তে সময় কাটানোর সমস্ত ইচ্ছা মন্দারের কারণে জলাঞ্জলি দিতে হয় মাধবীকে। অজানা অচেনা মানুষটা মাধবীর ছুটি দখল করে নিয়েছে। ডাক্তার নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ খাওয়াতে বলে মাধবীকে। এই রোগে মেপে জলের যোগান দেওয়ার দরকার। মায়ের ঘাড়ে  স্যারের দায় চাপিয়ে তাতার মনে মনে খুশি হয়। সে অফিসে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে বাড়ি আসত। মা খুব বকাঝকা করে বলতো, ' তুই ছুটি না নিলে আমি ট্রেনের টিকিট ক্যানসেল করে প্লেনে চলে যাব'। ছুটি নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তাতার ছুটির দরখাস্ত না দিয়ে ইচ্ছে করে স্যারের অসুস্থতার দিনগুলো কাটিয়ে দেয়। দিন সাত আটের মধ্যে মন্দার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। জ্বরের ঘোরে দু-একবার মন্দার অস্ফুটে মাধবীকে কিছু বলতে চেয়েছিল। রোগী এমন অসংলগ্ন কথা বলেই থাকে। মাধবী ইচ্ছে করে প্রশ্নহীন এড়িয়ে গেছে ব্যাথাতুর মন্দারের সকল কথা। পূজোর ছুটি কাটিয়ে মাধবীর ফেরার দিন এগিয়ে আসছে। তাতার বুঝে উঠতে পারেনা সপ্তাহখানেক নিবিড় হওয়ার সুযোগ তার মা কে জীবনে প্রকৃত নিবিড়তার সন্ধান দেবে কিনা। 

                 ঘটনাটা ঘটলো মাধবী যেদিন ফিরবে সেই দিন। দিনটা ছিল রবিবার বিকেলের ট্রেনে মাধবী ফিরবে। তাতার বাজারে গেছে। সদ্যস্নাতা মাধবী যেন যৌবনের প্রতিচ্ছবি। তার কপালে জমা বিন্দু বিন্দু জল যেন শাখা প্রশাখায় লেগে থাকা বর্ষণ উত্তর জাদুকরী সৌন্দর্য। মাধবী তার আজানুলম্বিত ভিজে চুল নিজস্ব অকৃত্রিম ভঙ্গিমায় ঝাড়ছে। মন্দারের কানে সেই সুর তুলো ধুনার ছন্দে বাজছে। আয়নায় ফুটে ওঠা প্রতিবিম্বে সদ্য প্রস্ফুটিত পদ্মর সৌন্দর্য।  আর অপেক্ষা করতে পারে না মন্দার তাকে কিছু একটা করতেই হবে। মাধবী তাতারের ঘরে থাকতো। তাতার এবং তার বস অন্যঘরে। দুটি ঘরের মাঝের দরজা সর্বক্ষণ ভেজানো থাকতো। আজ সকালে কোন  খেয়ালে মাধবী খুলে দিয়েছে দোর তা মাধবীই বলতে পারবে। করুণাময়ী মাধবীর শরীরে আজ ভিজে আগুনের ঝলক। মন্দারের আজন্ম বেঁধে রাখা শরীরের আগুন হঠাৎ আজ বিদ্রোহের আঁচে ঝলসে ওঠে। সটান বিছানা থেকে নেমে মন্দার মাধবীকে বলে, 'আমার জন্য আপনার করুনা ব্যতীত অন্য কোন অনুভব জমা হয়নি আশাকরি? আমি কি কেবলই  একজন শিশুতুল্য অসুস্থ মানুষ আপনার কাছে?' মাধবী হেসে বলে, ' আপনি যে শিশু নয় তার প্রমাণ পাইনি এখনও।' অসহ্য বুকের জ্বালা কখন যে মন্দারের ওষ্ঠে উঠে এসেছে বুঝতে পারেনি মন্দার। সে বলে,'প্রমান দিচ্ছি'। মধ্যপঞ্চাশেও বিপুল ক্ষমতার অধিকারী মন্দার তার বিশাল দুইবাহু বাড়িয়ে পাঁজাকোলা করে মাধবীকে বিছানায় তুলে নেয়। বাঁধা না দিয়ে আড়ষ্ঠতাহীন মাধবী নিজেকে ছেড়ে দেয় মন্দারের হাতে। তারপর সুর ছোটে বিস্তার আলাপ ব্যতিরেকে অনভ্যাস তানকারীর লয়ে। সুরভঙ্গ হতে সময় লাগে নি। মাধবীর দীর্ঘ অভুক্ত শরীরে সন্দীপের ছায়া সজীব আজও। ওস্তাদ গাওয়াইয়ার ঘন্টাভোর খেয়ালের মূর্ছনা শরীরে জেগে আছে তার। এতদিন পরে তার বুভুক্ষু শরীর চেয়েছিল সহাদ্রীর পৌরুষে ছারখার হতে। অথচ মন্দার যেন কেটে ফেলা মাধবীলতা। মাধবী বলে, 'আপনি ভালো মানুষ আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবেন না। সন্দীপ আমায় যে সুরে বেঁধে দিয়ে গেছে সেই সুর সাধা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। এই সত্য আমি অস্বীকার করতে পারব না। আমি এমন একজন মহিলা যে পুরুষের পরিচয় ছাড়া কাটিয়ে দিতে পেরেছি জীবনের কুড়িটি বছর। আশাকরি বাকি জীবনটাও কাটিয়ে দিতে পারব। আমি সত্যি কথা বলতে ভালোবাসি। আপনাকে ভবিষ্যতে মানসিক বিকারগ্রস্ত দেখতে চাই না। আমাকে ক্ষমা করবেন।'

                  প্রায় বারোটি আমাবস্যা গত হয়েছে তাতার বুঝে উঠতে পারেনি মায়ের মানসিক অবস্থান। না লেখা খোলা সাদা পৃষ্ঠা যেমন পড়ে থাকে মা কে তাতারের তেমন স্বাভাবিক মনে হয় অথচ পাতার উল্টো দিকে যেন কালি ঢেলে দিয়ে গেছে কেউ। হারিয়ে গেছে তার মন্দার কাকু। খেঁজুরে কথার মাঝে তাতার জিজ্ঞেস করে,'কি কাকু, আপনার ম্যাডামের কোনো খবর পেলেন?'  আমি ফোন করলে উনি কেবল আমার শারীরিক কুশলতার প্রশ্ন করেন।' বিষন্ন হাসিতে উত্তর দেয় মন্দার। হঠাৎ একদিন অফিস থেকে ফিরে কাকু বলেন আমি ইউএসএ যাচ্ছি। তাতার বলে, 'অফিসে যে মিশ্র স্যার যাবার কথা হচ্ছিল!' মন্দার কোন উত্তর করেনা।  তাতারের মনে হয় কাকু পরিস্থিতি থেকে পালাতে চাইছে। মায়ের উপর  তাতারের খুব রাগ হয়। মাকে তাতার কাকুর চলে যাবার খবর জানালে মা বলে, 'তুই আমাকে এইসব জানাচ্ছিস কেন?' চরকির চলনে কাকুর যাওয়ার দিন এসে যায়। অপরিপাটি অগোছালো আত্মভোলা এই মানুষটির বিদেশ যাওয়ার খুঁটিনাটি জিনিস সব তাতার গুছিয়ে দেয়। এই কমাস তাকে একা থাকতে হবে ভেবে কষ্ট পায় তাতার। 

                                 তিন 

              আজ অফিস থেকে ফিরে মাধবী প্রথমেকেষ্টার ব্যাটারীতে চার্জ দেয়। তারপর ভুসি সমেত কেষ্টা কে রাস্তায় বের করে দিয়ে স্নান সারে। যথারীতি কফির কাপে চুমুক দিয়ে একটু গড়িয়ে নেয় মাধবী। পাড়ার কুকুর ষাঁড় গরু সবাই এখন কেষ্টা কে চিনে গেছে। ভুসি জাতে নেড়ি তাই ভুসির যা একটু অসুবিধা হয়েছে। ভালোবাসার ইচ্ছে জাগলেও কোন পুরুষ কেষ্টার ভয়ে কাছে ঘেঁষে না। এই ভেবে মাধবী নিজের মনে একটু হেসে নেয়।  সন্ধ্যার পরিক্রমা সেরে বাড়ি ঢুকেছে ভুসি আর কেষ্টা। এরপর ডেলি রুটিন অনুযায়ী কেষ্টা আর ভুসির নাচ শুরু হবে। ভুসি মাধবীর পরনের কাপড় মুখে ধরে টেনে আনে। নিবু নিবু আলোয় চলেছে নাচ চাইনিজ গান 'নিচাঙ ইউই'র সুরে। বিভিন্ন বিখ্যাত বিদেশি ও চাইনিজ গানের সুর নৃত্যকলা কেষ্টার হার্ডওয়ারে প্রোগ্রাম করা আছে। হঠাৎ এই অবেলায় দরজার কড়া নড়ে ওঠে। বিহারী সিকিউরিটি এসে জানায়- এক সাহেব আপকা ঘর আনে মাঙতা। খুদকো নাম মন্দার বোস কহতে হ্যায়। উনকো ভেজ দু ক্যা?' খুব অবাক হয় মাধবী। মন্দার ইউএসএ গেছিলেন ফিরতে এখনো দিন পনের বাকি। গত তিন-চার মাস মন্দার ফোন করেনি। মাধবী ছেলের কাছে সব শুনেছে। মাধবী সিকিউরিটি কে বলে, 'মন্দার কে পাঠিয়ে দিতে।' ওদিকে ভুসি আর কেষ্টা নাগাড়ে  গানের তালে নেচে চলেছে। জমজমাট জলসা একটু হলেও হোঁচট খেয়েছে। মন্দার বড় আঠাশ ইঞ্চি ভি.আই.পি ব্যাগ নিয়ে অনাহুতর মতো ঢোকে মাধবীর ঘরে। ঝিকিমিকি নীল লাল মায়াবী আলোয় মাধবীর মুখ দেখে মন্দার মাধবীর ভালোমন্দ লাগার কূলকিনারা পায় না। মাধবী জানতে চায় মন্দার কি সরাসরি আমেরিকা থেকে? হ্যাঁ বাচক উত্তর পেয়ে মাধবী তাতারের ঘরে মন্দারের থাকার ব্যবস্থা কর দেয়। কেষ্টার দল তখনও নেচে চলেছে।

            মন্দার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলে মাধবী রাতের খাওয়া সেরে শুয়ে পড়ে। মাধবীর শোয়ার অভ্যাসে বদল এসেছে। কেষ্টা মাধবীর পাশে বিছানায় শুলে ওর সুইচ অফ করে মাধবী ওর গায়ে হাত দিয়ে শোয়। ভূসি মাধবীর পিঠের দিকে শরীরে শরীর লাগিয়ে শুয়ে। নিশ্চিন্ত নিস্তব্ধ রাত্রি বয়ে চলেছে নিজের মত। হঠাৎ ভুসির অচেনা চিৎকারে মাধবীর ঘুম ভেঙে যায়। মাধবী দেখে মন্দার জেগে বসে আছে পাশে। মাধবী ভুসিকে বুকে পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত করে। ভুসির ক্রোধ নিরসন হলে মাধবী বলে, 'মন্দার, আপনার শরীর জেটল্যাগে আচ্ছন্ন, শুয়ে পড়ুন। আমাকে আগামী কাল অফিস যেতে হবে। আগাম না জানিয়ে ছুটি নেয়া যাবে না।

              সকাল হতেই কেষ্টার হাতে বাজারের লিস্ট ধরিয়ে দেয় মাধবী। সটান কেষ্টা মনোনীত দোকানগুলিতে হাজির হয। দোকানদার কাগজ অনুযায়ী মাল কেষ্টার হাতে ধরিয়ে দেয়। অফিস ফেরতা মাধবী দাম দিয়ে আসবে। এরপর কেষ্টা মেকানাইজড ওয়াশিং মেশিনে বাসন কাপড় সব ধুতে থাকে। চা খেতে খেতে অবাক চোখে মন্দার তারই ফিরিস্তি অনুযায়ী ডিজাইন করা রোবটের কামাল দেখতে থাকে। মাধবী হেসে জিজ্ঞেস করে,'কি দেখছেন?'  ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে মন্দার বলে, 'মাধবী আর তার চেলার লম্ফঝম্প'। একটা আলতো প্রশ্ন মন্দারের দিকে ধেয়ে আসে, 'কতদিন থাকবেন?' 'ছুটির বাকি কদিন আমি যদি থাকতে পারি। তুমি বোধহয় জানো না আমার কোন সুজন কোলকাতায় থাকে না। তোমার সাথে সময় কাটাবো বলেই আমার কলকাতায় আসা। আমাদের এই কদিনের অভ্যাস যদি যৌথ যাপনে সম্ভাবনা তৈরি করে...। তোমার তাতার কিন্তু তেমন ই চায়।'  স্নানঘরে যাওয়ার আগে মাধবীর জিজ্ঞেস করে, 'তাতার আপনার বালিগঞ্জে আসার খবর জানে? গতকাল রাতে আমার সাথে কথা হলো কিছু বললো না তো'। মন্দারের কাছ থেকে উত্তর আসেনা।  স্নানঘর থেকে বেরিয়ে মাধবী মন্দারের ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করে। ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসে মন্দার দুহাতে মাধবীর হাতদুটো ধরে ফেলে বলে, 'আজ কি অফিসে না গেলেই নয়?' 'হাত ছাড়িয়ে টুকিটাকি প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিতে নিতে মাধবী বলে, 'আজ অ্যাকাউন্টস জমা দেবার শেষ দিন। কিছু মনে করবেন না। একদিন রেস্ট নিন। নেড়ি কুকুর ভুসি মাধবীর পায়ের কাছে আদর নাটিয়ে চলে যায়। কেষ্টা মালকিনের ব্যাগ নিয়ে হাঁটা দেয়। কমপ্লেক্সের গেট অবধি যাবে সে। মন্দার ভাবে একটা নেড়ি কুকুর আর যন্ত্রদানব মাধবীর জগৎ যেখানে মন্দারের ঠাঁই নেই। 

        অফিস থেকে মাধবী ফিরলে মন্দার জিজ্ঞেস করে, 'আমার কথা একবারও মনে হয়েছিল?' মাধবী বলে, 'নিশ্চয় আপনি কি করছেন কিভাবে সময় কাটাচ্ছেন?' 'আর কিছু...?' মাধবী বলে, 'হ্যাঁ, আপনাকে কতজন প্রতিবেশী দেখতে পেল। আপনি চলে যাওয়ার পর কতটা গুজগুজ ফুসফুস আমাকে নিয়ে চলবে সেই সাতকাহনের অনুমান।' মন্দার একটু ধাক্কা খেয়ে নিরুত্তাপ হয়ে বলে, 'তাহলে কলকাতা  এখনও কলকাতাতেই আছে বল। যাহোক তুমি পছন্দ না করলে আমাকে চলে যেতে হবে।' মাধবী বলে, 'আপনি আমার সন্তানকে নিজের কাছে টেনে নিয়েছেন আর আমি লোকলজ্জার ভয়ে আপনাকে দূরে ঠেলে দেব এমন শিক্ষা আমার নয়। মন্দার হাতে হাতে মাধবীকে কিছু কাজের যোগান দিতে এগিয়ে যায়। ভুসির যা পছন্দ নয়। আজকের সন্ধ্যায় ফ্ল্যাট আবার গান-বাজনা কবিতায় মাতোয়ারা হবে। কেষ্টা মাঝেমধ্যেই চাইনিজ গান বাজানোর ইঙ্গিত করছে কারণ সে  অন্য ভাষায় গান কবিতায় তাল দিতে অনভ্যস্ত। প্রতিবেশী সুষমা শুনেছে মাধবীর ঘরে কোন এক পুরুষ মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। সরেজমিনে তদন্ত করতে এসে মাধবীর বাক্যবাণে বিদ্ধ হয়ে সে বিদায় নিয়েছে। ভাঁটা পড়ে যায় মজলিসে। রাত কেটে যায় নিরুত্তাপ ঘটনাহীন। 

           পরেরদিন গড্ডালিকা প্রবাহে থোড়-বড়ি-খাড়া জীবন এগিয়ে চলে। আজকে কেষ্টা একটা ঘটনা ঘটিয়েছে। চাইনিজ সুরের ছন্দে ব্যালে ডান্সের ভঙ্গিমায় সে মাধবীকে বুকে টেনে নিয়েছে। ভুসির ভৌ ভৌ ডাকে নাচের ক্লাইম্যাক্স জমে গেছে। আর অ্যান্ড ডি তে কাজ করা বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক, ইঞ্জিনিয়ার মন্দারের মাথায় ঢোকেনা কিভাবে রোবটের এহেন আচরণ সম্ভব। রাত এগারোটায় খাওয়া-দাওয়া সারা হলে মাধবী মন্দার যে যার মত শুতে যায়। মাধবীর ডাকের অপেক্ষায় মন্দার চোখ বুঝে শুয়ে থাকে। রাতচরা মন্দার দিনে বাড়তি সময় ঘুমিয়ে শক্তি অর্জন করেছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মাধবী। অসহ্য নিশুতি রাত মন্দারের কিছুতেই কাটতে চায় না। চুপি চুপি এসে মন্দার মাধবীর পাশে বসে। মাধবী জানতেও পারেনা মন্দারের অবাধ্য হাত মাধবীর চুলে বিলি কাটছে। মাধবীর হেলদোল নেই সে ঘুমে কাদা। ধৈর্য হারিয়ে মন্দার শুতে যায় নিজের আশ্রয়ে। কিছুতেই আধবাকি রাতে মন্দারের আর ঘুম আসে না। বেশ কিছুক্ষণ পরে জানলায় ভোরের আলো ফুটে ওঠে। আজ মাধবী কেষ্টার পাওয়ার অফ করতে ভুলে গেছিল। মাধবী চোখ মেলে দেখে তার পাশে বসে আছে কেষ্টা। বিদ্যুৎ খেলে যায় মাধবীর শরীরে সে কেষ্টার দুটো হাত নিজের হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। দরজার ফাঁক দিয়ে এই ঘটনা মন্দারের চোখে পড়ে। 

           পরদিন রবিবার। মাধবী বলে,'মন্দার, কলকাতা ছেড়ে আপনি বহুদিন বাইরে। নিশ্চয় সল্টলেক নিউটাউন কিছুই চেনেন না? নতুন রূপে কল্লোলিনী কে দেখতে চাইলে আমরা বেরতে পারি।' মন্দার প্রথমে নিমরাজি ছিল। তারপর সে বলে, 'শর্তসাপেক্ষে যেতে পারি।' মাধবী  জানতে চায়, 'কি এমন শর্ত শুনি।' মন্দার বলে কেষ্টা নট অ্যালাউড।' রাজি হয়ে যায় মাধবী। ট্যাক্সি করে মাধবী, মন্দার আর ভুসি কে নিয়ে বের হয়। কেষ্টাকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাধবী বলে, ' মন্দার,ব্যাটারিটা খুলে দিন তাড়াতাড়ি। দিন দিন ওনার অনুরাগ বাড়ছে।' শেষ বাক্যটা মন্দারের মুড অফ করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। 

               মন্দারের স্কেটিংয়ে মুন্সিয়ানা দেখে অবাক হয় মাধবী। মনে পড়ে যায় আন্দামানের নীল দ্বীপে সন্দীপের সাথে স্নরকেলিং এর কথা। মাঝ সমুদ্রে গিয়ে মাধবীর বারণ না মেনে সন্দীপ সুংমিং স্যুট পরে হঠাৎ নেমে গেছে জলে। সুইমিং গাইডকে হয়তো সে আগেই বলে রেখেছিলো। ক্ষুব্ধ মাধবীও একটি সুইমিং স্যুট নৌকো থেকে ভাড়া করে নেমে পড়ে। মাধবী কিছুতেই এক যাত্রায় পৃথক ফলে রাজি নয়। ভুসি ও মজা পেয়ে গেছে, সে মন্দারের পিছু পিছু ছুটতে থাকে। এমন পশ ইকোপার্কে নেডি কুকুর নিয়ে প্রবেশ একটা অভিনব ঘটনা। সবাই অন্য চোখে দেখে। এইরকম দেখা গুলোকে অবজ্ঞা করার মধ্যে মাধবী রোমাঞ্চ খুঁজে পায়। ছেলে মেয়েদের একটা জোট হঠাৎ খেয়াল করে ব্যাপারটা। দলের এক মধ্যমণি বলে, 'Look look they have come with a fauckin street dog.' একটা মেয়ে হিহি করে হেসে ওঠে তার দেখাদেখি বাকিরা। ভিসু রাজকীয় চালে তাকালে নাক উচুঁ ছেলেমেয়েদের দল বাক্যি রহিত হয়ে অন্য দিকে হাঁটা দেয়। হাজারো আমোদে পরিপূর্ণ ইকোপার্ক। সুইমিং কায়াকিং জর্বিং। জর্বিং হল নতুন ধরনের খেলা। একটি স্বচ্ছ গোলকের ভেতরে ঢুকে পড়তে হবে। তারপরে খেলোয়াড় সেটা জলের ওপর গড়িয়ে নিয়ে চলবে। মন্দারের ভীষণ ইচ্ছে করছিল জর্বিং করতে। স্কেটিং কায়াকিং এর ধকলে সে রীতিমত পরিশ্রান্ত ছিল। মাধবী ক্যায়াকিংয়ের সময় দাঁড় ছেড়ে দিব্যি অলস আনন্দে চুপটি করে বসেছিল। মন্দার সাহায্য করতে বললেই মাধবী গাইছিলো," আমি ফিরবো না রে ফিরবো না...।" না ফেরার বার্তায় মন্দার কোথাও আশার আলো দেখছিল। মাধবীকে পরীক্ষা করার জন্য মন্দার বলে, 'তাড়াতাড়ি দাঁড় টানো আমার কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে।' মাধবীর মনে পড়ে যায় নেপালের কথা। পোখরার ফেওয়া তালে সন্দীপ আর ওর দা়ঁড় বাওয়ার গল্প। সবাই যখন মাঝিনৌকা নিয়ে দ্বীপে যাচ্ছে ওরা সাহস করে নিজেরাই স্রোতস্বিনী ফেওয়া তালে নাও ভাসিয়েছিল। পরিণতি হয়েছিল খুব খারাপ। ঘন্টাখানেক নৌকা বাওয়ার পর ওরা সেই তিমিরেই ছিল। নৌকা ঘূর্ণিতে পড়েছিল। পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার টুরিস্টরা ওদের দিকে তাকিয়ে বিশ্রীভাবে হাসছিল।  শেষমেষ ট্যুর কোম্পানির লোক অন্য নৌক এনে ওদের উদ্ধার করে। হাজার হলেও মাধবীর নারী মন। খিদে পাওয়ার গল্প শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার দুটো হাত কাজে লেগে পড়ে। দাঁড় ধরে মারো টান, ক্যায়াক এগোতে শুরু করে। নিমেষের মধ্যে সন্দীপ মন্দার, মন্দার সন্দীপ হয়ে যায় মাধবীর কাছে। ক্যায়াক তীরে পৌঁছলে মাধবী বলে,'চলো,খেয়ে নেয়া যাক।' মন্দার বুকে বল পায়। সে ভাবে নিছক বিনোদন নয় এই ভ্রমণ। 

                 কাফে একান্তে, এক অনবদ্য রেস্তোরাঁ। মন্দার স্থান মাহাত্ম্য দেখে ঢুকে পড়ে সেখানে। 'একান্তে' হাউসবোট রেস্তোরাঁ যেখানে বিভিন্ন আমিষ,নিরামিষ পদ পাওয়া যায়। কেন জানিনা আজকে ভিড় কম থাকায় একান্তে বসার জায়গা পেয়ে যায় ওরা। হরেক রকম খাবারের আয়োজন সুগন্ধী ভেটকি, কাসুন্দি মুরগী, একান্তে কষা মাংস গন্ধরাজ মটন কষা, কাঁকড়া চিংড়ির মালাইকারি। মন্দার বলে,'নাঃ,ভিনদেশে থেকে মাছ খাওয়া প্রায় ভুলে গেছি। আজ 'জলে মাছে' কাটাব জীবন। মাধবী হেসে ফেলে। পাকস্থলীর ভোজন ক্ষমতা না বুঝে অর্ডার করে  ফেলে মন্দার। হৈ হৈ করে খাবার এসে টেবিলে হাজির হয়। গোগ্রাসে খেতেখেতে মন্দার মাধবীকে বলে, ' খাও খাও এখনো অনেক খেলা বাকি।' মাধবীর হঠাৎ মনে পড়ে গোপালপুর পান্থনিবাস হোটেলে, সন্দীপ, কাঁকড়ার প্রিপারেশন খাওয়ার সময়ে ঘটা দুর্ঘটনার কথা। মন্দার তখন সবে কাঁকড়ার দাঁড়াগুলো ভাঙছে। খেতেখেতে কথা বলতে গিয়ে মন্দার কান্ডটা ঘটালো। এলার্জির কারণে সন্দীপকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল মাধবীর সে কথা খেয়াল আছে। সে দৌড়ে গিয়ে বাঁ হাতে মন্দারের পিঠে কিল মারতে থাকে। শরীর সেরে উঠলে মন্দার বলে, 'ভাগ্যিস বিষম খেলাম'। মাধবীর ঠোঁটের কোনের হাসি লুকিয়ে ফেলে। পেট পুরে খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম দরকার। তিনজনে বিশ্রাম নেয় গাছের তলায়। মন্দার আর মাধবী নরম ঘাসে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। ভুসি ওদের দেখাদেখি চার পা তুলে ঊর্ধ্বমুখে তাকিয়ে কুঁইকুঁই করতে থাকে। মাধবী বলে, 'অতঃকিম?' মন্দার বলে, 'জর্বিং'। মাধবী বলে, ‘আপনি যান’। মন্দার বলে, 'না, একসাথে'। মাধবী বলে' 'জনসমক্ষে একসাথে জর্বিংয় করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মন্দার নাছোড়। শেষমেষ ওরা যায় ট্যুর অপারেটরদের হাতে ধরা থাকে ভুসি। স্বচ্ছ গোলকের মধ্যে এ এক মজার খেলা। গোলকের ভরকেন্দ্র পরিবর্তন ঘটলে গোলক গড়াতে থাকে। যদি সামনের দিকে ভরকেন্দ্র এগিয়ে যায় তাহলে সামনে, তেমনই পেছনে,  দুপাশে বল একই ভাবে গড়ায়। মাধবীর অভিজ্ঞতা নেই জর্বিং করার। সুর তাল মিলিয়ে দুজনে একসাথে আগুয়ান হতে পারছে না। ফলস্বরূপ টলমল করছে গোলক। ব্যালেন্স রাখতে না পারলেই পপাত ধরণী তল। যৌথ জর্বিং এর অসুবিধা হলো যে কোনো সময় যে কেউ আহত হতে পারে। মন্দারের জর্বিংয়ের অভিজ্ঞতা আছে। সে ব্যাপারটা জানে। গোলক ফুলিয়ে ঢাউস আকার নিতেই মাধবী আছাড় খায়।  মন্দার প্রাণপণে দাঁড়াবার চেষ্টা করে শেষমেষ সমর্থ হয়। পরক্ষনেই মাধবীর দোলাচলে মন্দার আছাড় খায়। জর্বিং গোলকে দুজনের শরীর জড়ামড়ি করে পড়ে থাকে। মাধবীকে পড়ে যেতে দেখে ভুসি রেলিংয়ের ধার থেকে চিৎকার করতে থাকে। তার ইচ্ছা জলে নেমে মাধবীকে সাহায্য করা। লজ্জায় লাল হয়ে যায় মাধবী। সে রেগে গিয়ে মন্দারকে বলে, 'আমি চুপচাপ স্থির হয়ে বসে আছি আপনি সামনে চাপ দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলুন।' বাধ্য ছেলের মতো মন্দার সামনে চাপ দিয়ে বল এগিয়ে নিতে চাইলে পেছনের পা ব্যালেন্স হারায় মন্দার মাধবীর শরীরে ফের আশ্রয় নেয়। মাধবী, মন্দারকে সরিয়ে নিজে চেষ্টা করতে গিয়ে পদস্খলন এড়াতে পারেনা। মন্দার যেন এই আশায় বসে ছিল। পাকা ফলের মতো মাধবীকে টপ করে সে লুফে নেয়। একই জায়গায় গোলক ঘুরতে থাকে এগোতে পারে না। স্বচ্ছ বলের ভেতর থেকে মাধবী ঈশারা করতে থাকে যাতে অন্যরা সাহায্যে এগিয়ে আসে। হই হুল্লোড়ের মাঝে কেউ কাউকে দেখার নেই, লজ্জা অবনতা মাধবীর অন্তর এই উপলব্ধিতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। খেলায় খেলায় মন্দার শরীরে শরীর মিশিয়ে দিতে চাইছে। মন্দারের শারীরিক আকুতি মাধবীকে স্পর্শ করছে না। সবকিছুর নির্দিষ্ট সময় আছে।  মন্দার সেই যে মাধবীকে আঁকড়ে ধরে আছে সে বাঁধন উন্মুক্ত হচ্ছে না কিছুতেই। বরং মন্দারের হাতের আঁটুনি বজ্র কঠিন হতে থাকছে। মাধবী কঠিন স্বরে বলে,'কি হচ্ছে, ছাড়ুন'।  মন্দার আরও আরও কঠিন হতে থাকে। একান্তে এমন হলে একরকম, সর্বসমক্ষে, মাধবীর ক্রোধ বাড়তে থাকে। লৌহ কঠিন শৃংখল সহসা আলগা হয়ে যায়। শিথিল হয় বাহুডোর। মাধবী মন্দারের 'সুমতি' হওয়ায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। চেত যাওয়া ঘুড়ির মতো মন্দারের শরীর নেতিয়ে গেছে। মাধবীর সুবিধা হয় সে আস্তে আস্তে বল এগিয়ে নিয়ে চলে সামনের দিকে। হঠাৎই মন্দারের অসুখী মুখের দিকে  নজর করে মাধবী। নিমেষে মাধবীর বোধগম্য হয় গোটা ব্যাপারটা। মাধবী ভুসিকে মুক্ত করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলে। মন্দার ছন্দ হারিয়ে বেসুরো বেতালা।

               ঘরে ঢুকে মাধবী নিজের জায়গায় একটু গড়িয়ে নেয়। মন্দার বাথরুমে ঢুকে নিজেকে পরিষ্কার করে আরামকেদারায় গা এলিয়ে দেয়। বদমাইশ ভূসিটা মন্দারের জামা কামড়ে ধরে টানতে থাকে। মন্দার বুঝতে পারে না ভুসির মতিগতি। বাধ্য হয়ে কেদারা ছেড়ে ভুসির পেছন পেছন এসে সে বুঝতে পারে কেষ্টাকে চার্জ দেওয়ার আবদার জানাচ্ছে ভুসি।   একটা যন্ত্র কিভাবে কুকুরের বন্ধু হয় মাথায় ঢোকেনা মন্দারের। কেষ্টার শরীরে ব্যাটারিটা ফিট করে মন্দার কেষ্টাকে চার্জ দেয়। তারপর ভুসি কে আদর করতে করতে বলে, 'এতক্ষণ তো বেরিয়ে এলে এবার একটু রেষ্ট নাও।' আদরে বাঁদর ভুসি তাকিয়ে থাকে মাধবীর দিকে তার ভাবটা এমন যাও তোমাকে আমার আর লাগবে না। মাধবী ভাবে সত্যি, ভুসির অভিমান হওয়ার স্বাভাবিক। কেষ্টার আগমনে আমার অনেক কাজ কমে গেছে ভুসিকে সঙ্গ দেওয়ার কাজও প্রায় নেই।         আজকের আউটিংয়ে ভুসি কে সে একদমই সময় দেয়নি। সবাই যে যার মতো বিশ্রাম নিতে থাকে।  হঠাৎই রোবটের চার্জিং প্লাগ ফ্ল্যাশ করে ওঠে। ইঞ্জিনিয়ার বাবু এগিয়ে গিয়ে দেখেন ঘন্টাখানেক হয়ে গেলেও কেষ্টার চার্জ যা ছিল তাই। এটা সেটা করতে থাকে মন্দার লাভ হয় না কোন। মাধবী বলে, 'আপনি কেষ্টার অপারেটিং সুইচটা অফ অন করে দেখুনতো।' অপারেটিং সিস্টেম অফ অন করতেই ডান হাত দিয়ে কেষ্টা মন্দারের বুকে প্রবল ধাক্কা মারে।  এমন অসভ্য বন্য যন্ত্রদানব কোনদিন দেখেনি মন্দার। মাধবী ভাবে নিশ্চয়ই ইলেকট্রিক্যাল কানেকশন কোথাও শর্ট হয়েছে। মন্দার ততক্ষনে বিছানায় আশ্রয় নিয়েছে মাধবী এগিয়ে এসে মন্দারের বুকে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। মন্দার ছোট্ট হেসে বলে, 'কেষ্টা লা জবাব'। মাধবী কথা পাল্টিয়ে  বলে, 'আজকের পরে আর একটা দিন আপনি থাকবেন। আজ রাত আমরা রবীন্দ্রনাথের বেহাগে যাপন করব। 

                    মন্দার একটু মজা করে বলে, 'তাহলে তোমার কেষ্টা বিকল। কেষ্টার মধ্যে পুরে দেওয়া আছে কিছু চেনা বিদেশী সুর আর চিনের দেশজ মাটির সুর। তাহলে আজ রাতে কেষ্টার নটরাজ হওয়া হলো না। মাধবী হেসে বলেন আপনি তো আছেন। মন্দার বলে, 'আমি তেমন নাচতে পারি না তবে তুমি বললে..।' 'থাক থাক আপনাকে আমি আর এই বুড়ো বয়সে রবীন্দ্র নৃত্য শেখাতে পারবো না।' গলার স্বর ঘন করে মন্দার বলে, এতোখানি ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও আমি কি একটাও তুমি শোনার যোগ্য হয়ে ও.উঠিনি?' মাধবী বলে, 'সন্দীপ আর আমার বাবা ছাড়া কোন পুরুষ মানুষকে আজ অবধি আমি, তুমি বলিনি। খেয়াল করে দেখবেন এমনকি রিকশাচালকেও আমি আপনি বলি।' মন্দার বলে, 'এতটা ঘনিষ্ঠ হয়েও এই দেওয়াল তুলে রাখার মানে কি? কোন উত্তর না দিয়ে চা বানাতে চলে যায় মাধবী। চায়ের ট্রে হাতে ফিরে মাধবী মন্দারের চা পট থেকে কাপে ঢেলে সঠিক পরিমানে চিনি মিশিয়ে  কেষ্টাকে বলে,' তুমি কি ভুসিকে ঘুরিয়ে নিয়ে আনবে?  না থাক, আজকে বরং সন্ধ্যাটা গানে গানে কাটুক।' মানুষের জীবনে ভালোলাগা খারাপ লাগা স্রোতস্বিনী নদীর মত জোয়ার ভাঁটায় মিশে থাকে। চায়ে সঠিক পরিমান চিনি মেশানোয় যে পড়ে পাওয়া মৌতাত এসেছিল তা মুহূর্তে বিস্বাদ লাগে মন্দারের। 

                  "আমার জ্বলেনি আলো", দেবব্রত বিশ্বাসের সুরগম্ভীর গম্ভীর গায়কীতে গমগম করে ওঠে ঘর। এই গানের সঙ্গে নৃত্য ভাবনা মন্দারের অনুভবে অবাস্তব ছিল। মাধবী যেন বোধেরও দুয়ার খুলে দিয়েছে তার। ভুসি চুপটি করে বসে আছে। সুরমুর্চ্ছনায় কুকুর এমন মুগ্ধ হতে পারে ভাবতে পারেনি মন্দার। একাকীত্ব মানুষের জীবন ছন্দ কেড়ে নেয়। মাধবীর অদ্ভুত জীবনীশক্তি। একাকিত্বের বৃত্ত রচনা করে সে নিজের মতো  বাঁচতে পারে। কেষ্টা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হাত-পা নাড়ছিল নৃত্যরত মাধবী ছন্দের ফাঁকে কেষ্টাকে নৃত্যের ভঙ্গিমায় শামিল করেছে। কারিগরি শিক্ষার উচ্চে প্রতিষ্ঠিত এক মানুষ অবাক নয়নে প্রত্যক্ষ করে রোবটের মানবিক আচরণ। তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ খুলে বসে বর্ষিয়ান  মন্দার। ভারতবর্ষের চেয়ে চিন আড়াই ঘন্টা আগে চলে অর্থাৎ এখন চীনে রাত সাড়ে নয়টা, চুলোয় যাক নীতি। ইমেল চলে যায় ঝিয়াং জং মিঙের কাছে। ওদিকে তখন "মেঘ বলেছে যাব যাব" র মূর্ছনা। তাকে উদ্দেশ্য করে মাধবীর বলা কথা শুনতে পায় মন্দার, 'কী করছেন ল্যাপটপে?'  চীন থেকে একটা ছোট্ট উত্তর আসে মিনিট পনের পর- আমাদের উৎপাদন পৃথিবীর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাজার দখল করেছে। বিশ্বগ্রাসী গ্লোবালাইজেশন  ড্রাইভ পৃথিবীর প্রান্তিক সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে পারেনি এখনও। আমাদের কোম্পানির রিসার্চের একটা অংশ হলো ক্রেতার কাছ থেকে পুনরায় উৎপাদন ক্রয় করা অথবা এক্সচেন্জ মূল্যে নতুন মাল বিক্রয় করা। আমরা লক্ষ্য করেছি আফ্রিকার ল্যাতিন আমেরিকা ভারত বর্ষ থেকে ফেরত আসা রোবটের বিহেভিরিয়াল প্যাটার্নে পরিবর্তন আসছে। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি রোবট সাম্বা ডান্সের ছন্দ শিখে নিয়েছে। তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ বন্ধ করে, "জাগরণে যায় বিভাবরী" সুরে নৃত্যেরত হয় মন্দার। "মরি মরি", কথাটার সঙ্গে মাধবীর ওষ্ঠ রহস্যময়তার মিশেল ঘটিয়ে ঝিলিক মেরে হাসে। মন্দারের শরীর ছন্দময় হলেও মনোজগৎ হাসির ব্যাখ্যয় পরশপাথর খুঁজে চলে।

                   আজ বুধবার মাধবী, মন্দারের সৌজন্যে অফিস ছুটি নিয়েছে। মন্দার চেয়েছিল সে আর মাধবী কোথাও গিয়ে সারাদিন নিজেদের মতো নিভৃতে কাটাবে। মন্দার একটু বেড়ে খেলে। সে বলে, 'ভুসিকে ক্রেসে রেখে এলে ভালো হয়।' কেষ্টা কে নিয়ে মাধবী বের হবে না এ সত্য তার বোঝা হয়ে গেছে। মন্দারের ইচ্ছায় সায় দেয় মাধবী। অতীতে মাধবীর বন্ধু-বান্ধবেরা তাকে একলা পেতে চাইতো। ভুসিও মাধবীকে একলা পাওয়ার জন্য কেষ্টাকে ল্যাঙ মারতে দ্বিধা করত না। এবার ভুসির কপাল মন্দ তারও ঠাঁই হয়নি দলে। মাধবী বলে, ‘আমরা একটা ক্যাব বুক করে মাধবপুর যাব। মন্দার মাধবপুরের রহস্য জানেনা সে মাধবপুর সম্পর্কে জানতে চায়। মাধবী বলে, 'আপনি সিটি অফ জয় পড়েছেন? 'দোমিনিক লাপিয়ের স্টিফেন্স কোভলস্কি?' মাধবী অমন উত্তরে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, 'আপনি উপন্যাস পড়েন?' ‘ইংরিজির কথা নয় বাদই দিলাম বাংলাদেশের সব নামী লেখকের বিখ্যাত উপন্যাস আমার পড়া ম্যাডাম।' মাধবী বলে আপনার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া মুশকিল। তবে আজ আপনাকে সরাসরি উপন্যাসের দুনিয়ায় নিয়ে যাব। মন্দার বলে, 'একটু যদি আভাস দাও।' মাধবী বলে,' নো স্যার, চোখ নয় মন বেঁধে নিন যাত্রাপথের সৌন্দর্য থেকে আপনাকে বঞ্চিত করব না।'ভুসিকে ক্রেসে রেখে এসে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়। মাধবী বটলড ওয়াটার খেতে পছন্দ করে না। কেষ্টা কর্পোরেশনের সাপ্লাই করা খাবার জল ফিল্টারে ঢালছিল। মাধবী কাজের ফাঁকে কেষ্টার কাছাকাছি পৌঁছালে জলের বালতি ফেলে দিয়ে সে মাধবীকে জাপ্টে ধরে। মাধবী আদর করে বলে, 'আরে ছাড় আমি তো বরাবরের জন্য যাচ্ছি না সন্ধ্যাবেলা ফিরে আসবো। কেষ্টার স্বয়ংক্রিয় রিসেপ্টর চটজলদি মাধবীর টেক্সট ডিকোড করে বডি ল্যাঙ্গুয়েজে উত্তর পাঠায়, 'আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে'। মাধবী কিছু বলতে যাওয়ার আগেই মন্দার কেষ্টার পাওয়ার অফ করে ব্যাটারি খুলে নেয়। স্থির হয়ে যায় কেষ্টা। মাধবী বড় নরম মনের মানুষ। সন্দীপের মৃত্যুর সেন্টিমেন্ট এখনও সে মুছে ফেলতে পারেনি কোনদিন পারবে তেমন বিশ্বাসও  নেই তার। আজ কেষ্টার জন্য তার মন কেঁদে ওঠে। 

                 গাড়ি কোনা হাই রোডের পথ ধরেছে। সাঁইসাঁই সরে যাচ্ছে মাধবীর চেনা পটভুমি,ইট-কাঠে সাজানো ঘিঞ্জি শহর। ফুরফুরে মেজাজে আছে মন্দার। প্রকৃতি তার হৃদয়ের আগল খুলে দিয়েছে। 'মাধবী, তোমায় সত্যি বলছি আমি জীবনে ভালবাসার মত মেয়ে পাইনি।' মন্দারের এমন কথায় মাধবী বলে-"এমন মানব জনম আর পাবে না", অথচ দেখুন আমি পেয়ে হারালাম। মন্দার কোনো উত্তর না করে চুপ মেরে যায়। আলমপুর ধুলাগড় পাঁচলা ছেড়ে ছুটে চলেছে গাড়ি। ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে রাস্তার সাদা মার্কিংগুলো। বোয়ালিয়া ঢোকার মুখে মেঠো পথে চরে বেড়াচ্ছে হাঁস। মান্দার গান ধরেছে- "Country Roads take me home।" মাধবী এর আগে মন্দারের গলায় গান শোনেনি। গানের উদাসীনতা সঠিক সুরমাধুর্যে ধরেছেন মন্দার। গাড়ি বাঁদিকে টার্ন নিয়ে সোজা রাস্তায় ঢুকে পড়ে। রাস্তার শেষ প্রান্তে ডানদিকে আইকডের গেট। আগে থেকে বলে রাখা ছিল। ওদের সৌজন্যে খুলে যায় মূর্তিমান স্টিফেন কোভলস্কির দুনিয়া। মন্দার এখনো সঠিক ঠাওর করতে পারছে না। দেশজ উপাদানে তৈরি মাটির বাড়ি শিল্পীর নিষ্ঠায় বানানো বেতের দরজা-জানলা। সাজান ফুল ফলের বাগান মোহিত করে দেয় মন্দার কে। ঢালু নিচু চালের ঘর মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়। আধুনিক ইলেকট্রনিক সাজসরঞ্জাম বর্জিত ঘরে কেউ যেন শীতল ছায়া বিছিয়ে রেখেছে। আধো অন্ধকারে চেয়ারে বসে আছেন বৃদ্ধ এক সাহেব। মন্দার মাধবীর দিকে ফিরে তাকালে মাধবী মৃদু হাসে। সাহেব সন্দীপের মৃত্যুর কথা শুনে মাধবীকে ফোন করেছিলেন তারপরও মাধবী বহুবার এসেছে এখানে। সন্দীপের মৃত্যুর পর প্রশ্নের ধুম লেগে ছিল যেন। বিরক্ত মাধবীর কাছে ফোন আসা মানে নতুন বিড়ম্বনা। অথচ সাহেবের ফোন তার ব্যথার দুনিয়ায় স্নেহের পরশ ছড়িয়ে দিয়েছিল। কী যে হালকা লাগছিল তার। সাহেব বলেন,'সন্দীপ আমার একজন প্রকৃত বন্ধু ছিল। নিজেকে সে লুকিয়ে রাখত লোকচক্ষুর আড়ালে। অনেক সাহায্য করা সত্ত্বেও কোনদিন নিজেকে প্রকাশ করত না সে।' তারপর মন্দারের দিকে তাকিয়ে মাধবীকে সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, 'ওনার সঙ্গে তো পরিচয় করালে না?' সলজ্জ ভঙ্গিমায় মাধবী মন্দারের দিকে তাকিয়ে বলে, 'মন্দার, ইনিই হলেন রক্তমাংসের গ্যাস্টেন দয়ানন্দ। আপনার চলচ্চিত্রে দেখা  কোভলস্কি।' মন্দার ভাবতে পারছিল না এই অলৌকিক মোলাকাত কী করে বাস্তবে সম্ভব! ফ্যালফ্যাল করে সে গ্যাস্টন সাহেবকে দেখছিল। মাঝেমধ্যে সে  মাধবীর দিকে কৃতজ্ঞতায় নয়নে তাকাচ্ছিল। কথা না বাড়িয়ে মাধবী আশ্রম দেখাবার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। এই আশ্রমের আশ্রমিকরা মাধবী কাছের মানুষ। গান-বাজনা আবৃত্তিতে মেতে ওঠে ওরা আশ্রমিকদের সাথে। তারপর দমিনিক দাদা দমিনিক দিদির বাড়ি দেখে দামোদরের পাড় ধরে  হাঁটতে হাঁটতে  মার্কোসদার সঙ্গে দেখা হয় মাধবীর। উনি বলেন, 'তোমরা এসো আমি উপাসনা ঘর খুলে রাখছি।' নদীর জল এসে বাড়ি মারছিল পাড়ে। গাছের তলায় নৌকো বাঁধা আছে। অপর পাড়ে ধূসর শ্যামপুর। তেরচা ভাবে পারাপার করছে নৌকা। এমন অলস উদাসী দুপুর বহুদিন আসেনি মন্দারের জীবনে। ঝপ করে নদীর ধারে বসে পড়ে মন্দার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে মাধবী। মন্দার ডান হাত বাড়িয়ে মাধবীকে ঝটকা মেরে নামিয়ে আনে নিজের সমতলে। মাধবী দুই হাটুতে ভর দিয়ে শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নদীর জলে। মাধবীর মনে সন্দীপের সঙ্গে কাটানো মাধবপুরের ব্যাথা মিশ্রিত দুপুরগুলির স্মৃতি। একবার এই ঘাট থেকে ওরা দুজনে ঝাঁপ দিয়ে দামোদর পেরিয়েছিল।  মার্কোসদা নৌকো নিয়ে চলে ছিল পাশে পাশে। মাধবী খুব রেগে গেছিল মার্কোসদার ওপর। হঠাৎ মন্দার মাধবীকে সাঁতার জানে কিনা জানতে চাইলে। মাধবী, সন্দীপের সঙ্গে সাঁতরানোর গল্প বললে। ঝিম মেরে যায় পরিবেশ। কাকলি মুখর সুরে বন্দি থাকায় মাধবী খেয়াল করেনি কখন ওর বাঁ হাত মন্দারের মুঠোয় বন্দি হয়েছে। এই অপার্থিব পরিবেশের চাহিদায়  মাধবী হয়ত হাত সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতে পারেনি হঠাৎ  ভালোলাগা মাধবীকে গ্রাস করছিল। 

                    বহুক্ষণ উপাসনা গৃহে মার্কোস দা অপেক্ষারত। মার্কোসদার পুরনো স্মৃতির কথা  মনে পড়ে যায়। তার পাগলি দিদিটা কে সে চেনে। কোথাও কাউকে খুঁজে না পেয়ে মার্কোস নদীর পথ ধরে। দূর থেকে আনমনা দুই চখাচখিকে দেখে মার্কোস ফিরে যায়। প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে দূর গঙ্গায় চলা স্টিমারের ভেঁপু বেজে ওঠে। ভেসে আসা শব্দে মাধবীর চেতনা ফেরে। অনেকটা সময় বয়ে গেছে। মাধবী ঈশারায় মন্দারকে উঠতে বলে। দুজনে জোরকদমে হাঁটা দেয় উপাসনা গৃহের দিকে।

                   ফেরার সময় মন্দার গ্যাষ্টন সাহেব কে কথা দেয় এই সংগঠনের ভার বইতে সে পিঁপড়ের কাজ করবে। সাহেব বুঝতে পারেন আশ্রমিকদের অসহায় কান্না মন্দারকে ছুঁয়েছে। আজকের আবেশ চিরকাল বুকে নিয়ে বাঁচবে মনে মনে শপথ নেয় মন্দার। গাড়িতে বসে মন্দারের মৌতাত দেখে মাধবী একটা কিং সাইজ সিগারেট চায়। মন্দার ধরিয়ে দিলে লম্বা একটা টান দিয়ে মাধবী বিষম খায়। মন্দার মাধবীর পিঠে ঘুষি মারতে থাকে। রাগান্বিত স্বরে মন্দার বলে, 'অভ্যাস নেই শুধু রুস্তমি।' নির্নিমেষ চোখে মাধবী মন্দারের দিকে তাকিয়ে থাকে। কেটে যায় আরও কয়েকদিন মিশ্র ছন্দে। 

            চার 

                   আজ রাতে বিদায়ী ট্রিট। মাধবী অত্যন্ত যত্নসহকারে নির্ভেজাল বাঙালিয়ানায় রাঁধছে। কচুরলতি, মুগডাল,ধোঁকা, মোচার ঘন্ট,চিংড়ি মাছের মালাইকারি আর ভাপা ইলিশ। জোগাড়ের ভুমিকায় কেষ্টা আর মন্দার বোস। ভুসি এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছে। মন্দার বলে,' আজ একটু শ্যাম্পেইন চলবে নাকি?' মাধবী রাজি হয়ে যায়। কেষ্টাকে আজ ফুল চার্জ দেওয়া আছে। সে সুযোগ পেলেই ইংরেজি গানের সঙ্গে তিড়িং বিড়িং নাচছে। ভুসি দুই ঠ্যাং তুলে তথৈবচ। ডিম আলো মোহময় পরিবেশ। মন্দার দু পাত্তর শ্যাম্পেইন ঢেলেছে। নেশার ঘোরে রহস্যময়ী মাধবী গলা মিলিয়ে ইংরেজি গান গাইছে। দুচোখে মন্দারের নিবিড় দৃষ্টি রুপালি আলোয় রুপবতী মাধবীর অচেনা চোখের মদিরা পান করছে। মন্দার মাধবীর কাঁধে হাত দিয়ে বলে, 'লক্ষ্মীটি, আজ একটা রিকোয়েস্ট রাখবে?' মাধবী উত্তর করে, 'বলে ফেলুন'। 'আজ রাতে আমি তোমার সঙ্গে শুতে পারি?' মাধুরী মাথা নেড়ে বলে, 'পারেন'। একটু বিশ্বাসে ভর করে মন্দার বলে, 'নেশার ঘোরে কথা দিলে নাতো'। মাধবী হাসে। আহার সেরে একটা সিগারেট ধরিয়ে মন্দার নিজের গল্প শুরু করে। তার বড় হওয়া সংগীত শিক্ষা বাগ্মিতা এমনকি নির্বান্ধব জীবনে বইয়ের ভূমিকার কথাও বলতে ছাড়েনা। একসাথে ঘর বাঁধতে হলে পরস্পরকে জানা প্রয়োজন এই ভেবেই হয়ত। মন্দার বলে চলে- আমার ছোটবেলায কেটেছে বাঁকুড়ায়। আমার মা-বাবা বাঁকুড়া কলেজে পড়াতেন। ছেলেমানুষ হতো ঠাকুমার কাছে। ঠাকুমা বাংলা সাহিত্যের এক রসিক পাঠিকা। তার ধ্যান-জ্ঞানে বাংলাভাষা। তিনি দশম শ্রেণী অবধি পড়েছেন। সংসার জীবনের বাইরে লেখাপড়া নিয়ে থাকতেন তিনি। বাবা-মা বরাবর আমাকে সমাজ বিচ্ছিন্ন করে রাখায় বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু ঠাকুমার প্রতাপে আমি দুনিয়াদারির রাজা হয়ে উঠছিলাম। মাধবী জিগেস করে, 'আপনি কখনো প্রেমে পড়েননি?' না তবে গ্রামের এক, থাক সে গল্প।' 'থাকবে কেন?' মাধবীর প্রশ্নে একটু লজ্জিত অপটু বাক্যে মন্দার বলে, 'আমাকে তখন লালটুশ দেখতে ছিল। গ্রামে এক বন্ধুর বাড়িতে তাকে ক্রিকেট খেলব বলে ডাকতে গিয়েছিলাম। বন্ধু তপসের মা ও পিসি ঘরে ছিল। তপসের পিসি আমাকে ডেকে ঘরে নিয়ে যায় তখন আমি চোদ্দ  কি পনের বছরের কিশোর।' মন্দার একটু সময় নেয়। মাধবী জিজ্ঞেস করে, 'তারপর'। তারপর তপসের মা এসে হাজির হন। ওরা আমাকে পাঁজাকোলা করে বিছানায় তোলে। পিসি তপসের মা কে বলে,'কী বুঝলি, তোকে বলেছিলাম না? 'তারপর বুকের উপর শরীরের চাপ দিয়ে পিসি আমায় ধরে রাখে। আমি চিৎকার করতে গেলে মুখে হাত দিয়ে চেপে ধরে। কাকিমা ততক্ষনে আমার হাফ প্যান্টুল খুলে উলঙ্গ করে ফেলেছেন। বলতে বলতে মদিরার নেশায় মন্দার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। মাধবীও মন্দারের মাথায় হাত বোলাতে থাকে। পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে মন্দার বিছানা ছেড়ে উঠে মিউজিক সিস্টেমে ব্লুটুথ এ্যটাচ করে। হালকা আলাপে মধুবন্তী বাজতে থাকে। মন্দার বলে, 'নি সা গা মা পা নি সা/ সা নি ধা পা মা গা রে সা। গান্ধার কোমল আর কড়ি মধ্যম’। মন্দার সুর ধরে কাহা  মানা করোঁ সখীরে অব। 

মাধবী বলে,'আপনি বরং সন্তুরের সঙ্গে বন্দিশ টি নিজে গান।' কেউ কোনদিন খেয়াল গাইবার অনুরোধ করেনি মন্দারকে। চটজলদি মন্দার তানপুরা ডাউনলোড করে সন্তুরের সুর সি শার্পে মেলায়। মন্দার বিলম্বিতে বিস্তার শুরু করলে মোহিত হয়ে মাধবী শুনতে থাকে। মাঝে মাঝে সমে পড়লে তাল ঠুকতে থাকে মাধবী। ঝাড়া পঁয়তাল্লিশ মিনিট গেয়ে ক্লান্ত মন্দার মাধবীর কাছে জল চায়। মন্দার জানতেই পারে না গোটা খেয়ালটা মাধবীর মোবাইলে বন্দি হয়েছে। মাধবী বলে, 'সন্দীপ গান শোনাতে ভালবাসত। কিন্তু এমন দীক্ষিত সঙ্গীত শোনার ভাগ্য তার কোনদিন হয়নি।' সন্দীপের কথা শুনে মন্দারের খারাপ হয়। কিন্তু দীক্ষিত শব্দটা মন্দারের মন ভরিয়ে দেয়। মাধবী জিজ্ঞেস করে, 'এটা কি বিষ্ণুপুর ঘরানায় গাওয়া।' মাথা নেড়ে মন্দার হ্যাঁ বলে। শতেক দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে  হাত পা ধুয়ে মন্দার বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে। মাধবী স্পিকারের সঙ্গে ব্লুটুথ কানেক্ট করে দেয়। গমগম করে স্পিকারে বাজতে থাকে  মন্দার এর গাওয়া বিলম্বিত। চমকে উঠে মন্দার মাধবীর দিকে ফিরে তাকায়।  তারপর দু'হাত সামনের দিক বাড়িয়ে লম্বা চুল সরিয়ে নিজের হস্ত যুগল মাধবীর পিঠে চুলের তলায় রাখে। রেকর্ডিং এর সঙ্গে গলা মিলিয়ে মন্দার গায় "বহত দিন পিয়া ঘর আয়ে/কাহে মানা করে সখী অব"। অব শব্দটায় সম। আলাপ চলেছে উদারা সপ্তকে। খাদের সুর মাঝে মধ্যে কোমল গান্ধার ছুঁয়ে নেমে আসছে। মাধবী শুয়ে আছে। সুরের ওঠাপড়ার সাথে মন্দারের ঠোঁট মাধবীর পায়ের পাতা থেকে উঠছে নামছে। মাধবীর কালোয়াতি গানের চল সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারনা আছে। সে জানে বন্দিশ কখন সমে পড়বে। ঠিক সেই মুহুর্তে মাধবী প্রেমের পরশ দেয় মন্দারের শরীরে। মন্দার বুঝতে পারেনি মাধবী তাকে এমন সাংগীতিক পরশ দেবে। খেয়াল গানের কোনো বাধা গৎ নেই। সে চলে নিজস্ব চলনে। মন্দার আগে যা গেয়েছিল সেই চল ছন্দ ভেঙে নতুন রুপ গড়তে চাইছিল। বিছানা ছেড়ে উঠে মন্দার প্লেয়ার অফ করে দেয়। মাধবী ক্ষুব্দ হয়। মন্দার খেয়াল করে দেখে ভুসি ঘুমিয়ে পড়েছে। কেষ্টার কোন সাড়া নেই যদিও তার বুকে সবুজ আলো জ্বলছে। গলার গুনগুন সুর উদারার নিষাদ ধৈবত হয়ে নামছে কখনও বা মুদারার গান্ধার ছুঁয়ে নেমে আসছে। প্রেমের পরশও সুরের সাথে সাথে মাধবীর শরীরে ওঠানামা করছে। মন্দার সদা সতর্ক, সে সম এড়িয়ে চলছে। সমের আন্দাজে মাধবী এগিয়ে এলে নিমেষে দূরত্ব রচনা করছে মন্দার। প্রেমাবেশে বিহ্বল মাধবী হতোদ্যম হয়ে ফিরে আসছে।  মাধবীর পদপঙ্কজ মন্দারের হাতে ধরা। সূর এখন উদারর ধৈবতে স্থির। মাধবী কোমল গান্ধার এর শ্রবণে ব্যাকুল। তার শরীর মন্দারের প্রাথমিক আহবানে দ্রুত সাড়া দিতে চাইছে। অর্ধশায়িত মাধবী মন্দারের চুলে বিলি কাটছে। মধুবন্তী কোমল গান্ধার ছেড়ে কড়ি মধ্যমে যাবে। পরপর দুটি মাইনর স্বরের সৌন্দর্য্যমহান মধুবন্তির উন্মাদনা প্রেমিক-প্রেমিকার রিক্ত শরীরে। মাধবী অস্থির হয়ে বসে পড়ে। মন্দার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে নাঃ। কোমল গান্ধারে প্রলুব্ধ করে সে ঋষভে নেমে আসে। তারপর হঠাৎ সুর কড়ি মধ্যম পেরিয়ে পঞ্চম আলতো করে ছোঁয়। সেতারের মত শুয়ে নিজেকে প্রতিরোধ করায়  চেষ্টারত মাধবী। সুর উদারা মুদারা নিষাদ গান্ধার মধ্যম পঞ্চম এই দুই অক্টেভে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাধবীর শরীর পাখি অনেকদিন পর ডানা মেলতে শুরু করেছে। আরোহে ধৈবত নেই মধুবন্তীর এই  এক সংকট। তাই হঠাৎ তার সপ্তকের ষড়জ ছুঁয়ে ধৈবত এ নেমে আসে সুর। ধৈবত একটু দাঁড়াতেই প্রথমবার ডানা ঝপটায় পাখি। পঞ্চম গান্ধার হয়ে নেমে আসে মন্দার। আজ মন্দার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আলাপেই খুন করতে চায় সে। খাটের পাশে রাখা ওয়ালেট থেকে একটা ক্যাপ্সুল বার করে খেয়ে নেয় মন্দার। মাধবী জানে রোজ রাতে প্রেশারের ওষুধ খেতে হয় মন্দারকে। আলাপের মন্দ্র সুরে অদ্ভুত মুন্সিয়ানায় মন্দার ইংরেজি কথা বসায়

"walk in your Rainbow Paradise

..............,

 I get so lost Inside Your eyes

 would you believe it "

উন্মত্ততায় মাধবী মধুবন্তীর সুর তাল তছনছ করে  রোমান্সের নতুন সুরে গেয়ে ওঠে- 

প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে 

মোরে আরো আরো আরো...।

মাধবীর হঠাৎ বিদ্রোহে মন্দারের সাধনায় বিভ্রান্তি আসে।সুরলয় সব তালগোল পাকিয়ে যায়। সে সাড়া দেয় নতুন গানের সুরে মাধবীর ছন্দে। মাধবীর মধ্যে সম্পূর্ণ বাস করার হঠাৎ নেশা প্রবল হয়ে ওঠে।  গভীর প্রত্যয়ে সে প্রবেশ করে মাধবীর শরীরে। নির্দয় ঈশ্বরের ইচ্ছায় নিমেষে শিথিল মন্দার মাধবীর বুকে আশ্রয় নেয়। মাধবী ভদ্র অথচ উঁচু দৃঢ় কণ্ঠে বলে, 'আমি আপনাকে মানা করেছিলাম।' মাধবীর বজ্র কঠিন স্বরের নমুনা দেওয়া আছে কেষ্টার রিসেপ্টরে। সে আড়মোড়া ভেঙে এগিয়ে আসে। মাধবী বুঝতে পারে কেষ্টা কিছু একটা ঘটাতে যাচ্ছে সে কেষ্টাকে বাঁধা দিতে যায়। কেষ্টা তেমন কিছু করে না। মন্দার কে হিড়হিড় করে টানতে টানতে অন্য ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসে। তারপর কর্তব্য পরায়ন হয়ে ব্যথা ক্লিষ্ট মাধবীকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। ভুসিও বিছানায় এসে মাধবীর গা ছুঁয়ে শোয়। বাকি রাতটা মন্দার জেগেই রাত কাটিয়ে দেয়। মাধবীর কান্নায় আজ সাহারা মরুভূমি জলচ্ছাসে ভেসে যাবে। নাহ, তবু মাধবী মন্দারকে ঠকাতে পারবে না। করুণা পাবার যোগ্য মানুষ মন্দার নয়। 

                      সকালে ময়লার গাড়ি এসে বাঁশি বাজিয়ে ডাকতে থাকে। ভোরের দিকে মন্দারের চোখ একটু লেগে গিয়ে ছিল। সে তাড়াতাড়ি উঠে প্রাতঃকৃত্য করে স্নান সেরে নেয়। বাঁশির ডাকে মাধবীও উঠে পড়েছে। মন্দারের জন্য সে ব্রেকফাস্ট বানাতে ব্যস্ত। সকাল থেকে মন্দার একটাও কথা বলেনি। মাধবী মন্দারকে ব্রেকফাস্টে ডাকে। নিস্তব্ধ গৃহকোণ কেষ্টার পাওয়ার অফ থাকায় সে বিকল। ভুসি কোন অদ্ভুত কারনে দিবা নিদ্রায় মগ্ন। শুধু মন্দারের দাঁত খাদ্যসামগ্রীর পেষনে উপর্যুপরি একঘেয়ে শব্দ তৈরি করে চলেছে। মন্দার নিজেও বিরক্ত হচ্ছে এমন শব্দে। নিস্তব্ধতা ভাঙতে মাধবী বলে আমি এয়ারপোর্টে যাব। খাওয়া সেরে হাত পা ধুয়ে মন্দার ড্রেস করতে থাকে। মাধবী বলে,'কি হল কোন উত্তর করলেন না যে?' মন্দার বলে, 'না, আর কখনো তোমাকে বিরক্ত করব না'। 

                     ক্যাব এসে দাঁড়ায়। ভুসি ঘুম থেকে উঠে এগিয়ে এসেছে। ওর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় মন্দার। ভুসিও গায়ে গা ঘষতে থাকে। শেষবারের মতো মাধবী কে দেখে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে মন্দার। গাড়ি বাঁক নিয়ে বড় রাস্তায় হারিয়ে যায়। মাধবী ঘরে এসে শিথিল প্রাণহীন কেষ্টাকে বুকে নিয়ে শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

                     রাতে তাতারের ফোন আসে,'জানো মা,মন্দার কাকু পুনেতে ফেরেনি। উনি নাকি দিন দশ বারো আগে দেশে ফিরেছেন।' অবাক হয় মাধবী, কোনরকমে ফোন রেখে নিস্তার পেতে চায় সে। মাধবী তার যন্ত্রণা তাতারকে কোনদিন বলতে পারবে না। 

    পাঁচ 

                    পেরিয়ে গেছে দশ দশটি বছর। মাধবীর শরীরে আগাম বার্ধক্যের করাল ছায়া। তাতার বিবাহ করে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে পুনেতে পাকাপোক্ত। ও, হ্যাঁ, কেষ্টা মারা গেছে। মন্দার চলে যাওয়ার পর কেষ্টার আউটপুট কমতে থাকে এবং কিছুদিনের মধ্যেই সে বিকল হয়ে যায়। মাধবী  বাধ্য না হলে তাতারের কাছে যায় না। মায়ের সুঠাম শরীর ভেঙে পড়ায় একবার জোর করে তাতার মাধবীকে নিজের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তার মাধবীকে দেখে হাজার রকম রক্ত পরীক্ষা করে খুঁজে পায় না কোন রোগ। বিরক্ত মাধবীর সেই শেষ তাতারের বাড়ি যাওয়া। 

                   মাধবীর অবসর যাপনের সময় এগিয়ে আসছে। অফিস থেকে ফিরে মাধবী একদিন একটা খাম পড়ে থাকতে দেখে বারান্দায়। গ্রামীণ পোস্ট অফিসে এখনো হলদে পোস্ট কার্ড পাওয়া যায়। হলদে চিঠির নস্টালজিক রঙে আশা মেখে থাকত সে সময়। মাধবী পোষ্টকার্ডটি তাড়াতাড়ি তুলে নিয়ে প্রেরকের নাম দেখে হতাশ হয়। নিতান্ত হেলচ্ছেদ্দা করে সে চিঠিটা খাটে রাখে। ভুসি এমন কাগজ কোনোদিন চোখে দেখেনি। সে কাগজের টুকরোটা মুখ দিয়ে কামড়ে ধরে। ভুসিকে এক থাপ্পড় মেরে মাধবী চিঠিটা পড়তে শুরু করে। 


মাননীয়া মাধবীদি

                       আপনি আমাকে চিনবেন না। আমার নাম নিকোলাস মিনজ। আমি বর্তমানে অনেকগুলো সামাজিক সংগঠনের যৌথ কর্মধারায় কনভেনরের কাজ করি। আমাদের কাছে উদ্যোগী সৎ পরিশ্রমী মানুষের ডেটাবেস আছে। মার্কোস দা অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে যা তৈরি করেছেন। এই ডেটাবেস জানান দেয় সংগঠনের প্রতিটি সমাজ মনস্ক মানুষের চাকরি থেকে অবসরের সময় এবং খবরাখবর। সেইমতো আমরা দেখেছি আপনি 2022 সালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করবেন। কথাগুলো একবগ্গা আমি লিখে যাচ্ছি অথচ  আপনার কুশল জিজ্ঞাসা করা হয়নি। যা হোক এবার মূল ঘটনায় আসি। পুরুলিয়া বলরামপুর থেকে দূরে একটি স্কুল আছে। যার নাম সব পেয়েছির দেশ। যৌথ সংগঠনের ব্যবস্থাপনায় স্কুলটি চলে। অঞ্চলের দিনমজুর জনমজুরদের ছেলেমেয়েরা ওখানে পড়ে। মাত্র জনা কয়েক পড়ুয়া নিয়ে স্কুলটি চালু হয়েছিল। আজ পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় শ ছুঁইছুঁই। বাচ্চাদের একজন মায়ের প্রয়োজন যিনি এডমিনিস্ট্রেটার হবেন না।। মায়ের আশীর্বাদের স্নেহছায়া নিয়ে যিনি হাজির হবেন ওদের কাছে। সাহেবের প্রথম পছন্দে আপনি আছেন। 

                     মৃন্ময় বোস নামে এক সহৃদয় মানুষ দীর্ঘ দশ বছরের প্রচেষ্টায় এই স্কুলকে আকার দিয়েছেন। সাহেব মৃন্ময় বাবুর সঙ্গে আলোচনায় বুঝেছেন সঠিক শিক্ষাব্রতীর সাহায্য ছাড়া এই পাঠশালা আজকের নালন্দা হিসাবে গড়ে উঠবেনা। তাই সাহেবের হয়ে আমি আবেদন রাখলাম।

                     মৃন্ময় বোসের ফোন নম্বর(৭৬২০৮৭৯৯২৪/৯৩২৬৫৪১০২৭)আপনাকে দেওয়া রইলো। আপনি আমাদের প্রস্তাবে রাজি থাকলে সরাসরি মিঃ বোস কে ফোন করে নিজের  ইচ্ছা প্রকাশ করবেন। তারপরে সাহেবের সঙ্গে কথা বলবেন।

ইতি

নিকোলাস মিনজ

কনভেনর যৌথজন

বাগনান।

                     সময়ের ফেরে মাধবীর অনেকগুলো ফোন অকেজো হয়ে গেছে। অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে অনেক নম্বরও। কিন্তু চিঠিতে লেখা কতগুলো চেনা ডিজিট মাধবীর মস্তিষ্কে সংকেত পাঠাচ্ছে। ছুটে গিয়ে মাধবী টেবিলে রাখা পুরানো ফোনের ডায়েরি খুঁজতে থাকে। মাধবীর অফিস ফেরতা ক্লান্তি আলুথালু চুল টেবিলে রাখা আয়নার চোখে ধরা পড়ে যাচ্ছে। ধরা পড়ে যাচ্ছে মাধবীর অস্থিরতা। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পরে একটা ডায়েরি মেলে। নম্বরটা খুঁজে পায় সে। মন্দারের নামের পাশে লেখা আছে নম্বরটা। মাধবী এই দশ বছরে বেশ কয়েকবার এই নম্বরে ফোন করেছে। ফোন বলেছে তাকে সুইচড অফ করে রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় নম্বরটি নতুন, মাধবীর অজানা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মাধবী কয়েক মুহূর্ত ভাবে। তারপর পাশের ঘরের দেওয়াল আয়নার কাছে গিয়ে হাজির হয়। হাতে তার হলদে চিঠিটা ধরা আছে। মাধবী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজের চোখ মুখ ঠোঁট দেখতে থাকে আয়নায়। তবলার গুলি খুলে নিলে ময়দান বা চামড়া যেমন কুঁচকে যায় মাধবীর নিজেকে ঠিক তেমন লাগে। মাধবীর চোখ দ্রুত ডানদিক বাঁদিক করে নিজের নিটোল দুই হাত পর্যবেক্ষণ করে। বয়সের কোনও ছাপ না পড়লেও সে অসন্তুষ্ট হয়। তার ভুরু একটু যেন কুঁচকে ওঠে। নিমেষে মাধবী শাড়ির উপরের অংশ খুলে ফেলে। উৎকণ্ঠায় মাধবীর মনে হয় কণ্ঠার হাড় ঠেলে বেরিয়ে আসছে। সে একে একে খুলে ফেলে  ব্লাউজ ব্রেসিয়ার। না, এখনো মাধবী সন্ধিগ্ধ।  সে সঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা তার শরীরী বেঁচে থাকার প্রকৃত সম্ভাবনার কথা। নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাবরণ করতে সময় নেয় না মাধবী। তারপর নিজের পেলব বুক আয়নায় চেপে ধরে। আয়নার তল বরাবর মাধবীর  নিরাবরণ শরীর ধীরে গড়িয়ে নেমে আসতে থাকে। হাঁটু ভাঁজ করে মাধবী এখন বসে। হাতে হলদে চিঠিটা ধরা আছে। গভীর অভিনিবেশে সে আয়নায় খুঁজে চলেছে কিছু। 

Comments

Popular posts from this blog

ছোটগল্প - লাল কালো ইট।।

একগুচ্ছ কবিতা

কোন সে আলোর স্বপ্ন(কথায় ধারাবাহিক)