ছোটগল্প মোর হৃদয়ের.।
নন্টে ফন্টে জৌগ্রাম থেকে আসা দুই দেবশিশু। শ্রমজীবী পাঠশালায় তারা এসেছিল অভিভাবক হীন হয়ে। শতেক ইচ্ছে নিয়ে ওদের বেঁধে ফেলার আয়োজন করেছিলাম আমরা। বাকিটা গল্প পড়লে জানা যাবে।
মোর হৃদয়ের গোপন বিজন ঘরে
মাধবীলতার মোটা লতানে ডাল উঠে গেছে ছাদে। তার ফাঁকে একটা ছোট্ট বাসা। মানুষের চোখের আড়ালে নজর পড়ে না কারও। নিচু গলায় কিচিরমিচির করে ডাকে বাসিন্দরা। একই গাছে আরো একটি বাসা আছে। সেখানে বাচ্চাগুলোর জ্যাঠা জেঠি থাকে। মনে বড় সাধ ফুরফুর করে উড়ে এসে তারা মাঝে মাঝে মধ্যে চক্কর কাটবে ভাই ভাইপোর বাসায়। চোখ ফুটতে না ফুটতে মৌটুসী ভাইয়েরা ঠিক চিনতে পেরে গেছে আত্মীয়-স্বজনদের। যে বাপ ওদের জন্ম দিয়েছিল চোখ ফোটার পর থেকে তার হদিশ মেলে না আর। হেলিকপ্টারের উড়ান দিয়ে ওদের ঠোঁটে খাবার গুঁজে দিত মা। বাসার মধ্যেই ঝটপট করত ওদের দুডানা। ওদের বড় সাধ ছিল মায়ের সঙ্গে উড়তে যাবে। একদিন মা ওদের বাসা থেকে ঠেলে বাইরে ফেলে দেয় হঠাৎ পড়ে যেতে যেতে দুডানা ঝটপট করেতে করতে ওরা ঠিক মায়ের আকাশে উড়তে থাকে। মা উন্মুক্ত আকাশে জিমনাস্টিক করতে করতে দেখে নেয় পোলা পানদের। অনাবিল আনন্দে ওরা মাঝে মধ্যেই এখন মাকে ছেড়ে আকাশে উড়তে যায়।
আজ ওদের এক নতুন অনুভূতি হয়েছে। বিশাল বড় একটা চিল ওদের দেখে হুস করে নেমে এসেছে। উপায় না পেয়ে ওরা দুটোয় মন্দিরের ঘুলঘুলির তে আশ্রয় নেয়। শিকার ফস্কে গেছে। চিল বেচারা বিফল মনোরথ হয়ে গাছের উপরে গিয়ে বসে। হঠাৎ করে কেন জানিনা মন্দিরের ঘুলঘুলি ওদের ভালো লেগে যায়। ওরা মুখ বাড়িয়ে দুপাশে দেখে নেয়। কোথাও চিল মামার অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে ওরা ফুড়ুত করে নিজেদের বাসায় ঢুকে পড়ে। সন্ধ্যে নেমে আসে। আজ ওর মা আসতে বড্ড দেরী করছে। অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ওরা ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়ালই নেই। ভোর হব হব চারপাশে মোরগ ডেকে উঠেছে। ধড়মড়িয়ে উঠে ওরা মাকে বাসায় খুঁজে পায়না। "কখন যে মা গেছে চলে", ওরা জানেনা। ভীষণ কান্না পায় ওদের। ওরা ঠিক করে এই বাসায় মাকে ছাড়া থাকা সম্ভব নয়। ওরা দুজনে মন্দিরের ঘুলঘুলিতে গিয়ে জোটে। মাকড়সা পিঁপড়ে পোকামাকড় খেয়ে মহানন্দে দিন চলে যায়। ফিকে হয়ে আসে মায়ের স্মৃতি। ফুরসৎ পেলেই জ্যাঠা জেঠিরা দেখতে আসে। এখন বেশ আনন্দেই আছে ওরা।
মন্দিরে সাপখোপ ধেড়ে ইঁদুর সবই আছে। এইয়া সাপ গুলো ইঁদুর খেয়ে দিব্য ছিল। এখন মন্দিরে ইঁদুরের আকাল। একদিন জ্যাঠা জেঠি এসে হাজির হয় খোপে, বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য বলতে থাকে। ওরা বোঝায় শান্তির বাসায় সাপ খোপ কিছুই নেই। একদিন জেঠা ছেলেপুলে সবাইকে নিয়ে হাজির হয় খোপে। মন্দিরের পুরোহিত এতদিন কিচ্ছুটি খেয়াল করেনি। জ্যাঠার পরিবারকে ঢুকতে দেখে পুরহিত জানতে পারে এক ঝাঁক পাখি হরি মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছে। পরদিন রাত থাকতে থাকতে বদমাশ পুরোহিত সিঁড়ি ভেঙে উঠে হাত ঢুকিয়ে খপখপ দুটো ছোট পাখি ধরে খাঁচায় চালান দিয়ে দেয়। দেবোত্তর নিয়োজিত পুরোহিতকেে গ্রামে থাকতে হয়। তার বাড়ি অনেক দূর। আজ তাড়াতাড়ি পূজা পাঠ সেরে খাঁচা দোলাতে দোলাতে বউয়ের কাছে হাজির হয় পুরোহিত।
বউয়ের আনন্দ আর ধরে না। ওদের ছেলেপুলে নেই। দেওর ভাজ ভাইপো ভাইঝি নিয়ে বাস। ওদের একটা টোল আছে সেখানে পড়তে আসে বাচ্চারা। সপ্তাহে একদিন পুরোহিত পাঠ দেয় বাকি দিন বউয়ের তত্ত্বাবধানে ক্লাস চলে। শোনা গেছে পুরোহিতের বউ নাকি বিএ পাস। মৌটুসি দুটোর স্বাধীনতা বলতে খাঁচার গরাদ টুকুর মধ্যে নড়াচড়া। পুরোহিত গিন্নির একদিন হঠাৎ ইচ্ছা হয় এগুলোকে লেখাপড়া শেখালে কেমন হয়। যেমন ভাবা তেমন কাজ পুরোহিত গিন্নি বই নিয়ে বকতে শুরু করে ওদের সাথে। নাওয়া খাওয়া ছেড়ে কাজে লেগে পড়েছে গিন্নি। সময় মতো খাবার খাওয়ানো জল খাওয়ানো চান করানো সব এখন ওর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ভালোবাসা দিয়ে সব কাজই আপন করে নিয়েছে সে। এক অদ্ভুত বিশ্বাসে চঞ্চল দুটি পাখিকে পুরোহিত গিন্নি বার করে আনে খাঁচা থেকে। ছোট্ট দুটো পাখি মুক্তির স্বাদ পেয়ে করুন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে গিন্নিমার দিকে। অনেকদিন খাঁচায় বন্দী থাকা ওদের ওড়ার ক্ষমতা একটু কমে গিয়েছে। তাই এক্কাদোক্কা খেলার মতো লাফাতে লাফাতে ঘুরে বেড়ায় বারান্দাময়। খায়-দায গান গায়, এমনকি বেড়ালছানা গুলোর সঙ্গেও ওদের ভাব হয়ে গেছে। ভীষণ খুশি হয় গিন্নিমা। পাখি দুটো এখন ওদের ভাব বুঝতে পারে। চই চই ডাক দিলে খেতে আসে। ধীরে ওদের ডানা গুলো সবল হয়ে আসে। বাড়ির এপাশে-ওপাশে ওরা উড়ে বেড়ায়। অন্য বাড়িতে গিয়ে চাল খুদ খেয়ে আসে। আশে পাশের কেউ কেউ ওদের নিজেদের ঘরের আরশোলা পোকা শিকার করতে দেয়। ওদের এই কাজ ভালো লাগেনা তবু ওরা ভয় পায় যদি গিন্নি মাকে নালিশ করে আর গিন্নিমা ওদের ফের খাঁচাতে ভরে দেয়। এখন আর গিন্নিমাকে চান করাতে হয় না। ওরা দুজনেই গিন্নিমার পুকুরে ডুব দিয়ে ফুড়ুৎ করে উড়ে বেরিয়ে আসে। অলস বেলায় ওরা সবাই দুটো পাখির খেলা দেখতে থাকে। গিন্নিমার টোলে ওরা প্রতিদিন নিয়ম করে পড়তে বসে। পড়ায় যে দুটোর খুব মন আছে এমন নয়। বড়টা তবু মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করে।
একদিন ভোরবেলা, আকাশ জুড়ে কালো মেঘের আগুন খেলা খুব জমেছে। গিন্নিমার ঘুলঘুলিতে ভয়ে ভয়ে ওরা আশ্রয় নিয়েছে। এই ঘুলঘুলি থেকে ওরা ধরা পড়ে গিয়েছিল। গিন্নিমা এখন খাঁচা তুলে রেখেছেন। ওরা কখনো খাটের তলায় থাকে কখনো বা রান্না ঘরের কোণে। এখানে-ওখানে বৃষ্টির ছাঁট আসায় ওরা আজ ঘুলঘুলিতে আশ্রয় নিয়েছে। মেঘের বাড়বাড়ন্ত দেখে ওদের মনে হচ্ছিল রাত্রি নেমে এসেছে। কিন্তু সূয্যিমামা হঠাৎ করে মেঘ ফাটিয়ে একচিলতে আলোয় আলোময় করে ঘুলঘুলি কোণ। চোখে খাড়া আলো পড়তে একটা মৌটুসী ফুড়ুৎ করে উড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয়টা ছুটতে থাকে ওর পিছু পিছু। সুদূর গগনে ফুড়ফুড় করে উড়ছে পাখি দুটো। ওদের উড়ান হঠাৎ করে গিন্নিমার চোখে পড়ে যায়। কেমন অস্বাভাবিক লাগে ওর। গিন্নিমা অবাক, তিনি ভাবতে পারছেন না এভাবে বেয়াড়া পাখি দুটো আকাশে উড়ান দেবে। শেখানো বুলি কপচাতে থাকেন গিন্নিমা। হুস করে দুটোয় নেমে আসে গিন্নিমার মাথার কাছে। দুই চক্কর কেটে ফের উড়ে গিয়ে অসীম আকাশে হারিয়ে যায় ওরা।
সেই রাত্রেই পুরোহিত বাড়ি ফিরে আসে। গিন্নির নিরবিচ্ছিন্ন কান্নার রোল হতবাক করে তাকে। সে অবাক হয়ে ভাবে বেচারীর ছেলেপুলে নেই পাখি দুটোই সম্বল ছিল। বেড়াল দুটো মুষড়ে খাটের তলায় শুয়ে আছে। থালা-বাসন এলোমেলো। ঘর আছে সংসার নেই।
পরদিন ভোর সকালে বেরিয়ে পড়ে পুরোহিত। মন্দিরে পূজা পাঠ করতে হবে তাকে। এক সপ্তাহ বউকে ছেড়ে থাকা। কি করে যে বউয়ের এই সময় কাটবে ভেবে আকুল হয় পুরোহিত। গিন্নিমা কিছুতেই কান্না থেকে নিস্তার পাচ্ছে না। সংসার কাজে তার একদম মন নেই। ইচ্ছে করে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে। সদর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে হঠাৎ দেখে হন্তদন্ত পুরোহিত সন্ধ্যেবেলায় ঘরে আসছে। গিন্নি সঙ্গে চোখাচোখি হতেই পুরোহিত দুইহাতে ঝোলা নিয়ে দৌড়ে গিন্নির কাছে আসতে চায়। অবাক গিন্নি তাড়াতাড়ি চোখ মুছে শঙ্কিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, 'তোমার আবার কি হলো?' পুরোহিত বলে, 'পেয়েছি গিন্নি, ওদের পেয়েছি ওরা মন্দির চত্বরে পতপত করে উড়ছে। ওরা হারিয়ে যায়নি।' গিন্নি অকৃত্রিম আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে পুরোহিতকে। 'চারি চক্ষুর ধারায় তিতিল বৃন্দাবনের রজ।'
Comments
Post a Comment