ছোটগল্প- জীবন

জীবন 

কৃশানু মিত্র


ফূর্তিতে ছিল অজয়। সকাল হতে না হতেই তার মনে হলো আজ অফিসে নাটক। এই প্রথম তার পরিচালনায় নাটক হবে অফিসে। একটু টেনশন হচ্ছিল না এমন নয়। নাটকে নায়িকার মুখের গান "ঘরেতে ভ্রমর এলও গুনগুনিয়ে", নিজে গুনগুন করছে সে সকাল থেকে। এই গানের সুর তুলে আপিস যাবার জন্য বাস স্টপেজে পৌঁছে গেছে অজয়।  নাটকে যুযুধান দু'পক্ষের হিংস্র লড়াইয়ের হাস্যরসে দর্শক পাগল হয়ে যাবে এই কল্পনা করে সে নিজেই ফিক করে হেসে ফেলে। বাস এসে পড়েছে। চট করে বাসে উঠে সিটে বসে আবার সে গুনগুনিয়ে গান ধরেছে। 

      হঠাৎ কন্ডাক্টরের অশ্লীল চিৎকারে অজয়ের ছন্দপতন ঘটে। যুযুধান দু'পক্ষের বাক্যলাপ শুনতে থাকে অজয়। অজয় বুঝতে পারে যাত্রী খুচরো পয়সায় ভাড়া দিয়েছে। খুচরো টাকা কন্ডাক্টরের হাত থেকে পড়ে গড়িয়ে বাসের বাইরে চলে গেছে। সামনের স্টপেজে যাত্রী নেমে যাবে। দুটাকা একটাকার কয়েন দুটো বাসের উল্টো দিকে গড়িয়ে দৌড় লাগিয়ে অনেকদূর পৌঁছে গেছে। যাত্রী বলছে 'পয়সা তো তোমাকে দিলাম। তুমি যদি ধরে রাখতে না পারো। ধরে রাখতে যোগ্যতার দরকার।' কন্ডাকটার বলছে 'ঠিক সময় ভাড়া দাওনি কেন? টিকিট না কাটার ধান্দায় থাকা লোক নামার আগে ভাড়া দিতে বাধ্য হয়।' মোক্ষম আক্রমণে বাবু বেশি মানুষটি প্রচন্ড ক্ষেপে যায়। বাবু সুলভ মোড়কের বাইরে বেরিয়ে এসে যাত্রী মুখ খিস্তি করে। ঝগড়া অন্য দিকে মোড় নেয় কে আগে গালাগালি করেছে তার হিসাব কষতে থাকে দুজনে। গাড়ি রাজধানী এক্সপ্রেস হয়ে ছুটছে। যাত্রী তার গন্তব্য ছেড়ে দুটো স্টপেজ এগিয়ে গেছে তবু ঝগড়া থামছে না। কন্ডাক্টর, 'নাও খুচরো পয়সা ফেরৎ নাও পুরো ভাড়া দশ টাকার নোট দাও'। যাত্রী, 'বলছি না, আমার কাছে পাঁচশো টাকার নোট আছে তুমি খুচরা দেবে?'সুর হারিয়ে অজয়ের মটকা গরম হয়েছিল সে ভাবছিল দিই দুটোর মাথা ঠুকে। তারপর কি হতে কি হবে অফিস যেতে না পারলে নাটক বরবাদ হয়ে যাবে এই ভেবে থমকে যায় অজয়। কিন্তু ঝগড়া থামে না। অজয় মানিব্যাগ থেকে একশো টাকার পাঁচটি নোট খুঁজে বার করে যাত্রীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, 'দিন পাঁচশো টাকার নোট'। নির্বোধ বালকের মতো যাত্রী পকেট থেকে মানিব্যাগ বার করে ভাঁজ খুলে তার অলিগলি হাঁতড়ায়। কন্ডাকটার এগিয়ে এসে মানিব্যাগের দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেক কষ্টে যাত্রী খুঁজে পায় একটা দশ টাকার নোট। অজয়ের দিকে যাত্রী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। যাত্রীর মধ্যবিত্ত হাবভাব যেন কালো মেঘের আড়ালে সূর্যর হারিয়ে যাওয়া। অজয় পকেট থেকে চট করে দশ টাকার নোট বার করে কন্ডাকটরের হাতে দেয়। কন্ডাকটর বলে,'এ কথা আপনি আগে জানালে পারতেন।' তারপর অজয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, 'না বাবু, আপনার দশ টাকা পকেটে রাখুন। আজ সকাল থেকে দু ট্রিপ খেটে আমার আড়াইশো টাকার ব্যবসা হয়েছে। দশ টাকার ব্যবসা না হলেও চলবে। নিন দাদা আপনি অনেকটা এগিয়ে এসেছেন। সাত টাকা ফেরত দিলাম টোটো করে ফেরৎ যান। 


 জীবন নাটকে ঋদ্ধ অজয় ভাবতে পারেনা কোন নাটকের পরিচালক হবে সে। 

ফোন নম্বর- ৭০৪৪৫৪০৭৯৬।

Comments

Popular posts from this blog

ছোটগল্প - লাল কালো ইট।।

একগুচ্ছ কবিতা

কোন সে আলোর স্বপ্ন(কথায় ধারাবাহিক)