বড়গল্প- লোভ।

 লোভ

গভীর জঙ্গল। খরস্রোতা নদীর জল ছুঁয়ে অকারণ নুয়ে পড়েছে সারি সারি গাছের ঝাড়। কলকল শব্দে বয়ে চলেছে নদী আধো অন্ধকার ছিঁড়েখুঁড়ে। পাখির কলতানে মুখর প্রকৃতি, নদীর চলার কম্পন বুকে ধারণ করে বাউলের মতো উদাসীন। এই প্রথম জঙ্গলের বাসিন্দারা সভা ডেকেছে। নেতৃত্বে দিচ্ছে শিম্পাঞ্জির হনুমানের দল। পারিষদদের মধ্যে বাঁদরের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। যতদূর চোখ যায় বৃষ্টি পায়ে পায়ে বেড়ে ওঠা মহীরুহর জোট আকাশের অধিকাংশ দখল করে রেখেছে। পরাশ্রয়ী লতাগুল্ম বেঁচে থাকার তাগিদে  বৃক্ষরাজির গায়ে লেপটে আছে। জঙ্গল কোন কারনে তটস্থ মেরে গেছে। কী এমন ঘটলো? যুগ যুগ আশ্রয়দান করে যাদের জীবন প্রবাহ বয়ে নিয়ে চলেছে,খাদ্য-স্বাস্থ্য বাসস্থানের সংকটমোচন করে যাদের বুকে ধরে রেখেছে সেই শিম্পাঞ্জি বাঁদর হনুমান কে সন্দেহের চোখে দেখছে গোটা পাদপ সমাজ! না, সেরকম কিছু ঘটেনি এখনো। কিন্তু, নদীর বাঁকের মুখে গাছপালা আগাছা সরিয়ে তৈরী আজকের সভা মন্ডপকে সন্দেহ চোখে দেখছে ডালপালা ছড়িয়ে থাকা গোষ্ঠী সচেতন মহাপতি সমাজ। সৃষ্টিলগ্ন থেকে দেখা যেত বনমুগ্ধকর খেচরের দল জোট বেঁধেছে মৃগ শাবকদের সঙ্গে। কপিকুল,শ্বাপদের গ্রাস থেকে আজীবন বাঁচিয়ে চলেছে তৃণভোজী পশুদের। হঠাৎ কী হতে চলেছে জঙ্গলমহলে! কেন অরণ্যর দিনরাত্রি আলোড়িত?

 

গত ভোরে দু-পেয়ে জানোয়াররা হাতে, কাস্তে কুড়াল নিয়ে ভোরের আলো হাজির হবার সাথে সাথে ছোট মাঝারি গাছ আগাছার মরণ ঘটিয়ে জঙ্গল সাফ করেছে। অনর্গল কথোপকথন চলছিল হন্তারকদের নিজেদের মধ্যে। মহিপাল শ্রেণি কিংকর্তব্য বিমুঢ় হয়ে স্বজাতির নিধন অবাক চোখে প্রত্যক্ষ করছে। জোর কদমে কাজ চলছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাফসুতরো হলো গোটা অঞ্চল। 

নির্দিষ্ট দিনে ন্যাড়া সভামঞ্চে জঙ্গল থেকে পায়ে পায়ে হাজির হলেন শ্বাপদ সম্রাট সিংহ। পেছনে হায়না হিংস্র কুকুরের দল। শিম্পাঞ্জি হনুমানদের আজ পোয়াবারো। সিংহের সিংহাসনের আনাচে-কানাচে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। হরিণ গাউরের দল বুঝতে পারছে না তাদের অধিকারের সীমানা। জেব্রা বেশ নিশ্চিতভাবেই সবার মাঝে উপবেশন করল। মিটিং জমজমাট। গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে দু একজন গেছে মিটিংয়ে। হনুমানদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। মুক্তমঞ্চের চারপাশে ডালে ডালে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা। নজর রাখছেও বলা যায়। শিম্পাঞ্জিরা জঙ্গল জীবনের অন্ধকার দূর করে দিতে নীতিনিষ্ঠ। তাই তারা রাজনৈতিক নেতাদের মতো ধ্যানগম্ভীর। বিশাল এক রোজউড গাছের নিচের ডালে দোল খাচ্ছে এক বৃদ্ধ হনু। এই গাছটার সঙ্গে তার নিবিড় সখ্যতা। জঙ্গলের বাচ্চা বুড়ো সবাই তাকে চাচা ডাকে। সে মঞ্চের সামনে যায়নি। স্বজাতিরা চাচাকে মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করে নদীর ধারে এত গাছ থাকতে সে কেন রোজউডের খাড়া মাথায় আশ্রয় নেয়? চাচা বলে,'এই গাছ থেকে প্রকৃতির খেলা দেখা যায়।' বন্ধুরা সবসময় ওর কথার মর্মোদ্ধার করতে পারেনা। ও আজ দলছুট কারন স্বজাতির হঠাৎ শ্বাপদ প্রীতি ওকে ভাবাচ্ছে। গাছেরা নিজেদের সাথে নিরন্তর কথা বলার চেষ্টা করে চলেছে। তরঙ্গে তরঙ্গে চলেছে বাক্যবিনিময়। চাচা পাদপশ্রেণীর ভাষা কিছুটা হলেও রপ্ত করতে পেরেছে এতদিনে। আজকে জঙ্গলের বাতাবরণ কেমন যেন গুমোট। হাওয়া চলাচল বন্ধ তাই গাছেদের ভাববিনিময় বন্ধ। কেবল বলা কথাই বুঝতে হবে জীবন ঠিক এমন সোজা পথে চলে না। গেছো চাচা অনুভূতি দিয়ে আন্দাজ করতে পেরেছে জঙ্গলি জানোয়ারদের ব্যবহারে মাতৃসমা বনশ্রেনী পিড়িত। মাতৃক্রোড়ের মতো বিটপশ্রেণি আজন্ম আশ্রয় দিয়ে তাদের রক্ষা করেছে। নাঃ, তাকে জানতেই হবে এই উষ্ণ আবহাওয়ার কারণ। লেজ নাড়া বন্ধ করে দিয়ে চুপ করে বসে থাকে সে। হালকা বাতাসে গাছেরা ভাববিনিময় শুরু করেছে বৃদ্ধর কর্ণকুহরে যা প্রবেশ করছে না। এত কম কম্পাঙ্কের শব্দ, নিজের শ্বাস প্রশ্বাস প্রায় বন্ধ করে কান খাড়া করে আছে চাচা। অবাক কান্ড চাচা টের পেতে শুরু করেছে। হঠাৎই এক শিম্পাঞ্জি ক্যাঁ ক্যাঁ ডেকে ওঠে। চি চি করে সানাইয়ের পোঁ ধরেছে এক নেতা হনু। সিংহ গর্জনে বনের রাজা জানিয়ে দেয় সবাইকে চুপ করতে হবে সভা শুরু হতে যাচ্ছে। রোজউড গাছে বসে চাচা শত চেষ্টা করেও  বুঝতে পারেনা গাছেদের আশঙ্কার কারন। শুরু হয়ে যায় মিটিং। 

করজোড়ে নমস্কার জানিয়ে শিম্পাঞ্জি জানিয়ে দেয় সভাপতি ঠিক করতে হবে মহারাজ স্বর্ণকেশর সিংহকে। সভা নিরুত্তাপ মেনে নেয়। সভাপতির অনুমতি নিয়ে সুবক্তা নেতা হনু শুরু করবে জংলী জানোয়ার দের ভবিষ্যৎ জীবনের ভালো-মন্দ নিয়ে পরিকল্পনার কথা। শিম্পাঞ্জি অবশ্য এ কথাও বলতে ভোলেনি, 'আপনাদের মতামতেই আশু সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ঘাবড়াবেন না সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক না হলে এই প্রস্তাব খারিজ হয়ে যাবে। আপনারা মুক্তকণ্ঠে নিজেদের প্রকাশ করবেন।' সন্নিকটে বসে থাকা এক কৃষ্ণসারের নাকে মাছি বসেছে সে বারবার মাথা দুলিয়ে মাছিটাকে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছে। বক্তা হনুর চোখ এড়ায়নি এই ঘটনা। সে চিল চিৎকার করে বলে, 'এটা কি হচ্ছে, না,বলছিস কেন তুই গণতন্ত্র চাসনা?'  কৃষ্ণসার কিছু বলতে গেলে একটা হায়না এমন বিশ্রী ভাবে তাকায় কৃষ্ণসার ভাবে শালা মাছি হয়ে জন্মানোই ভালো ছিল।

শুরু হয় কথোপকথন, নব্য হনু নেতা প্রথমেই হরিণের বিভিন্ন প্রজাতি কে বলে, 'তোমাদের অভাব-অভিযোগ আগে শোনা হবে, বলো'। সিংহ বনকুকুর শিয়াল সবাই সভা আলোকিত করে বসে আছে হরিণের দল রা কাড়তে সাহস পায় না। পাশে থাকা কয়জন মাথা নাড়িয়ে বলতে চায় তাদের কোন অভাব অভিযোগ নেই। ভয়ের চোটে দুই বলগা জোরে মাথা নাড়িয়েছে। ব্যাস সিংয়ে সিংয়ে ঠোকাঠুকি লেগে খটাখট শব্দে সভাস্থলের পবিত্রতা প্রায় নষ্ট হতে যাচ্ছিল। সিংহ ভুরিভোজ সেরে এসেছে তার খিদে নেই। সে কোন উৎসাহ না দেখালেও হৃষ্টপুষ্ট এক হায়না জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটেপুটে নেয়। হায়নার লোভী দৃষ্টি এড়ায় না বলগা পান্ডার। তার ঈঙ্গিতপূর্ণ নির্দেশে তাড়াতাড়ি অন্যজন মাথা নাড়া বন্ধ করে দেয়। জঙ্গল আবার থম মেরে যায়। নেতা হনু বলে,' তোমরা ভয় বা লজ্জা পেওনা খোলসা করে সব বল। জঙ্গলে তোমাদের ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে থাকতে হয় খাবার জোগান দিতে চরতে যেতে হয়, হয় না? ধূর্ত হায়না শয়তান কুকুরগুলোর খাদ্যতালিকায় তোমরাই তো সুস্বাদু প্রধান মেনু। প্রতিমুহূর্তে জীবন ধারণ করার যুদ্ধ কি কারও ভালো লাগে? অকারণে মাইলের পর মাইল মূর্তিমান যমের ভয়ে দৌড়াতে কেই বা চায়। বল আজকে তোমাদেরই বলার দিন।' হনুরা চিরকালই শ্বাপদের এক্তিয়ারের বাইরে। অনেকটা মধ্যবিত্তদের মতো,নিজে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আড়ালে থাকে সুযোগ পেলে অন্যকে হুল ফোটায়। কুকুর হায়না গুলোকে ঠারেঠোরে অপমান করতে ছাড়ে না। একটা হুমদো হায়না জিভ দিয়ে গা চাটতে থাকে যেন হনুমানের বলা কথা সে শুনতেই পায়নি। একে অপরের দিকে চেয়ে সোহাগ করছে কুকুরগুলো। সম্প্রদায়গত ভাবে জেব্রা শান্তিপ্রিয়। মাথা নেড়ে বলগা নেতৃত্বকে তারা জানিয়ে দেয় হনুমানের কথায় সায় দিতে। একটা চ্যাংড়া বলগা ফস করে বলে বসে, 'সব তো বুঝলাম স্যার, চরে খাব কি? জলঝড়ে সারাজীবন আমরা জঙ্গলে বাস করেছি। গাছতলা আমাদের মাতৃক্রোড়। এতদিন তো আমাদের খাওয়া থাকার অসুবিধা ছিলো না। হঠাৎ করে আমাদের অসুবিধে হবে কেন,আমাদের থাকার ব্যবস্থাই বা কোথায় হবে? আমরা জঙ্গল ছেড়ে কোথাও যাবো না।' 'ও,বসে খাবি ভালো লাগছে না? তোরা তো কুকুর হায়নাদের খাদ্য ছিলি। শিকার হয়ে মরে পড়ে থাকতিস। উচ্ছিষ্ট শিয়ালে টেনে নিয়ে যেত। এই গেছো হনুমানদের জন্য তোরা বারবার বেঁচে যেতিস। এখন দেখছি আমরা ভুল করেছি, অন্যায় করেছি। তোদের ভালো করতে নেই'। সইতে পারে না চাচা। রোজউড গাছের মাথা থেকে সভায় নেমে এসে নব্য নেতাকে সে বলে, 'এই হারামজাদা, তুই কি জঙ্গলমহলের ঠিকা নিয়েছিস?' প্রেসিডেন্ট সিংহ একটু ধমকের সুরে বলে,'আহ্।' চাচা বলে,'মহারাজ টেম্পার অন্যকে দেখিও। আমার কাছে জঙ্গলের রাজা হাতি। শৌর্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হয়েও বিনয়ের পরকাষ্ঠা।' সভাপতির অপমান দেখে নেতা শিম্পাঞ্জি বলে,'শোননি সিদ্ধান্ত হবে সবার মতামত নিয়ে এত রাগারাগি করছো কেন?' একটা ছানা অ্যান্টিলোপ বলে, 'বুঝেছি তোমরা কি আমাদের নজরবন্দি করতে চাও? তা হনুমান দাদা এতে তোমার স্বার্থ কী!' মিটিংয়ে চিতারা আসেনি হাতিদেরও ডাকা হয়নি। কারণ কেউ জানে না। খাদ্য-খাদক হওয়া সত্ত্বেও হাতিদের সঙ্গে গাছগাছালির সখ্যতা কারও অজানা নয়। হাত আছে এমন জঙ্গলি জানোয়াররা ঝুঁকি নিতে চায়নি। চিতাদের অনুপস্থিতির কারনও অনুমেয় নয়। মাংসাশী হওয়া সত্ত্বেও কেন ওরা অনুপস্থিত কেউ জানেনা। নেতা হনু এ্যন্টিলোপের কথায় ফ্যা করে হেসে উঠে বলে, 'তোরা চিরকালই শ্বাপদের নজরবন্দি। কবে মুক্ত হলি বাবা? এদিকে ওদিকে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াদৌড়ি, কি স্বাধীনতা? জঙ্গল মানে বড় খাঁচা। আরো বড় বিপদ। চিরকাল আমরাই তোদের বাঁচিয়েছি। অবশ্য ভুলে যাওয়ার অধিকার তোদের আছে'। চাচা নিজেকে ঠিক রাখতে না পেরে কম্পিত কন্ঠে চিৎকার করে বলে, 'চোপ রহো, একদম আমরা কথাটা ব্যবহার করবি না শালা কাল ক্যা যোগী। জঙ্গলের সম্প্রীতি নষ্ট করতে এসেছো?' চাচার প্রতিবাদে এক লহমায় মহিপাদপরা দোল খেয়ে নেচে ওঠে। পাতায় পাতায় জাগে শিহরণ। আজ আকাশচরাদের উড়ানে ধর্মঘট। কেউ বাসা ছেড়ে উঠতে যায়নি। কিচিরমিচির থামিয়ে সবাই প্রাণের তাগিদে মিটিংয়ে কান পেতে ছিল। হঠাৎ হাওয়া দোল দিয়ে যায় পক্ষীকুলের পরানে। একটা ধাড়ি ময়না ঝুপ করে নেমে এসেছে সাহসী আন্টিলোপের পিঠে। ওদের সখ্যতা সুজনে জানে। ময়নাকে প্রশ্রয় দিতে অ্যান্টিলোপ মিটিং ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে ইচ্ছে করছে ওর। তাহলে শারীরিক ক্ষমতাই সব নয় মিটিংয়ের সিংহের সামনে প্রতিবাদ করা যায়। আন্টিলোপের কথায় সহমত জানিয়ে বন্ধু ময়না বলে, 'আমরা, চাচাকে নেতা করে লড়াই করতে পারবোনা?' আ্যন্টিলোপ বন্ধু বলে, 'কিসের বিরুদ্ধে লড়াই আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না'। ময়না জানায় সে গাছেদের আলোচনা শুনেছে। দু'পেয়ে মানুষরা নাকি জঙ্গলমহলের দখল নিতে চাইছে। হনুমান শিম্পাঞ্জি এবং মাংসাশী সকল প্রাণীরা ওদের দালালি খাচ্ছে। দালালি খাওয়ার মানে অ্যান্টিলোপ ঠিক বুঝতে না পেরে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে, 'দালালি কথার মানে কী'? 'মানুষকে বিশ্বাস করে সারা জীবন বসে খাওয়া। গাছেদের আলোচনা শুনে আমি পাড়ি জমিয়েছিলাম নদীর ওই পারে। সেখানে কাক ছাড়া আর কোন পাখি থাকে না। কাকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে আমি জানতে পেরেছি সব। গল্পে কথায় আদর খেতে খেতে অ্যান্টিলোপ কখন যে অনেক দুরে চলে এসেছে দুজনের কেউই খেয়াল করতে পারেনি। হঠাৎ সবকিছু এলোমেলো করে একটি চিতা ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের উপর। ময়না কোনরকমে পালাতে সক্ষম হয়। মুহূর্তে উড়তে উড়তে ফের নেমে এসে ময়না মারণ উদ্যত চিতার চোখে ঠোক্কর মারে। রক্তাত্য হিংস্র চিতা ততোধিক আক্রোশে বন্ধুর টুঁটি ছিঁড়ে ফেলে। বন্ধু নিমেষে একদলা মাংসপিন্ডে পরিনত হয়। মৃতদেহের উপর চক্কর কাটতে থাকে মর্মাহত ময়না। বিস্ময়ের ঘোরে অবাক হয়ে সে দেখে বন্ধুর শরীর অভুক্ত ফেলে খুনি চিতা রাজকীয় চালে হাঁটা দিল। আজ ভর্তি পেটে জঙ্গলের নিয়ম ভেঙে চিতা খুন করল বন্ধুকে। জঙ্গল এমন নীতিহীন কোনদিন ছিল না। কেবলমাত্র ক্ষুধার কারণে শিকার করে সবলে। তাহলে কি পাহারা বসানো হয়েছে তাই চিতাদের মিটিংয়ে দেখা গেল না। শেষবার বন্ধুর রক্তাক্ত মৃতদেহর দিকে তাকিয়ে অশ্রুবর্ষণ করে দ্রুত উড়ানে ময়না পৌঁছায় পাদপ সম্রাট রোজউডের উঁচু ডালে। তারপর চিৎকার করে সে বোঝাতে থাকে তার অনুভব। চাচা মিটিং ছেড়ে তৎক্ষণাৎ গাছে ফিরে এসেছে। হঠাৎ চারদিকে অন্ধকার করে প্রচন্ড ঝড় তোলে বুড়ো রোজউড। সংগতে লহরা তোলে অন্যরা। নদীর উদ্যাম নৃত্য জলোচ্ছ্বাসে ছাপিয়ে দেয় দুকুল। আকাশ আঁধার হয়ে নেমে আসে বৃষ্টিধারা। পড়ে থাকে শূন্য সভাস্থল আর দূরে ময়নার বন্ধুর ভিজে জবজবে মৃতদেহ। 


ভোর না হতেই চাচা লাফ দিয়ে রোজউড গাছের শীর্ষে উঠতে থাকে। রোজউড বুঝতে পারে বন্ধুর কোন বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। মগডালে বসে চাচা চারপাশে নজর করে। বয়সের ভারে তার দৃষ্টিশক্তি খাটো হলেও অনুমানশক্তি এখনো প্রখর। নদীর অপর পাড়ে ওয়াচ টাওয়ারের ঢঙে উঁচু উঁচু অন্যরকম কী সব তৈরি হয়েছে। ভালো করে দেখে সে বুঝতে পারে তার স্বজাতি হনুর দল বিজাতীয় শিম্পাঞ্জিদের সাথে ঝড় থামার পর গতরাতে ওখানে আশ্রয় নিয়েছিল। চাচা তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমে নদীর ধারে গিয়ে বন্ধু কুমিরের পিঠে চেপে নদী পার হয়। সে বুঝতে পারে কুমিররা ষড়যন্ত্রের বিন্দু-বিসর্গও জানে না। ওরাইতো হনুমান শিম্পাঞ্জির নৌকো। চাচা হনু কুমির কে নিজের উপলব্ধির কথা জানায়। আশু বিপদের কথা শুনে শঙ্কিত কুমির বলে,  'আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে হনুমান আর শিম্পাঞ্জিদের পারাপার বন্ধ করে দেবো। কিন্তু আমি এখনো বুঝতে পারছি না ওরা কেন এইসব করছে। এতে জঙ্গলের লাভ কী?' অপর পারে মানুষের তৈরি আস্তানা দেখে চাচার চক্ষু চড়কগাছ। অবাক চাচা দেখে একতলা দোতলা প্রাণহীন গাছবাড়ি। গাছ কেটে বানানো। শিম্পাঞ্জি হনুমানদের আলাদা থাকার ব্যবস্থা। সূর্যদেব চাঁদি গরম করতে পারবেনা আবার ঝড় জলে ভিজতেও হবে না। বেশ কিছুদূর পর্যন্ত থাকার জায়গা বানানো। তারপর গাছপালা কাটা ফাঁকা প্রান্তরে কী সব যন্ত্র চলাচল করছে। বিকট তার আওয়াজ। গাছে নেই তাই গাছে গাছে যাওয়া সম্ভব না। চাচা লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে চলে। প্রথমে চোখে পড়ে হরিণ জাতীয় প্রাণীদের তারপর জেব্রা নীলগাই বুনোমোষের দরমা ছাওয়া শক্তপোক্ত থাকার জায়গা। একটা ছোকরা নীলগাই এগিয়ে এসে হনু কে শুধায়, 'কী কাকা, কী দেখছো? তুমি নদীর ওই পারে থাকো তাই না। তোমরা এখনো জংলি রয়ে গেলে!' পেট থেকে সবে পড়েছে তার বুকনি শুনে চাচার মাথা গরম হওয়ার জোগাড়। যথা সম্ভব শান্ত ৎেকে ওর পেট থেকে কথা বার করতে হবে। চাচা জিজ্ঞেস করে, 'তোমরা খাও কী, এত খাবার আসে কোত্থেকে?' কান মাথা দুলিয়ে নীলগাই বলে, 'কর্পোরেশন, সকালে যার যার ঘরের সামনে খাবার রেখে যায়। কি পরিষন? এত পরিষনি তো দরকার কি বাপু খাবার দেওয়ার! ' একচোট হেসে নীলগাই বলে, 'বলেছি না তোমরা মানুষ বনবে না। মানুষে এখানে তেল লোহা কপার আরও অনেক কিছু সন্ধান পেয়েছে। সেসব নাকি খুব মূল্যবান। জঙ্গল সাফ করে আমরা এইখানে থাকি। খাওয়ার অসুবিধে এক্কেবারে নেই। মানুষের রান্না করা খাবার খাই, খুউব সুস্বাদু। দূরে দেখো ঢালাও চাষ শুরু হয়েছে এরপর থেকে আমরা ক্ষেতের ফসল খাব'। চাচা বুঝতে পারে মানুষ এপারের জংলি জানোয়ার দের লোভ দেখিয়ে বশ করেছে এখন ওপারের মুর্খগুলোকে হাত করার চেষ্টা করছে। চাচা অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে চাষের ক্ষেত দেখতে যায় যেখানে গাউরে ঘাড়ে জোয়াল বেঁধে জমি চষানো হচ্ছে। বরদাস্ত হচ্ছেনা কিচ্ছুটি। কুমিরদের হাত করে দালাল গুলোর নদী পারাপার বন্ধ করার মন্ত্র দিতে হবে। তাহলে ওপারের দালালগুলোর প্রবেশ নিষেধ হবে এপারে,দেখাযাক। অনেক ধকল গেছে আজ। পরিশ্রান্ত চাচা গাছের উপরে উঠে ডাক দেয় জলচর কুমিরদের। দুপেয়েরা অত্যন্ত চালাক। এপাড়ের বাসিন্দাদের ধোঁকা দিতে নদীর পাড়ের গাছগুলো কাটেনি। হাজির হয় এক বিশাল জলযান। আকাশ থেকে নেমে এসে চাচা পিঠে চড়ে বসেছে কুমিরের। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কুমিরকে চাচা এপারের গল্প বলে কুমির অবাক হয়ে শোনে এবং কথা দেয় তার প্রজাতির সবাইকে বলবে যাতে ওপারের জন্তু জানোয়ারদের সাহায্য না করে তারা। কুমির চাচার কাছে জানতে চায় ওপারে তো শুধুই সুখ তাহলে ওদের পারাপারের প্রয়োজনীয়তা কি? চাচা বলে, সারাজীবন দুপেয়েরা ওদের বসিয়ে খাওয়াবে কথা দিয়েছে। মূর্খগুলো বুঝতে পারছে না  কার্যসিদ্ধি হলে ওরা জংলি জানোয়ার দের ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তখন ওপারের ওরা সাহায্য চাইতে আসবে'। কুমির বলে,' কিন্তু ওরা এখন কেন আসতে যাবে?' চাচা বলে, 'দালালি করতে,মানুষ ইদিকের জঙ্গলেরও দখল নিতে চায়। এইভাবে চলতে থাকলে জঙ্গল বলে আর কিছু থাকবে না'। কুমীর বলে,'ঠিক, কিন্তু জঙ্গলে কখনো গদ্দার রাজ চলেনি। আমরাও সবাইকে সজাগ করে দেব।' তার আশ্বাসের ভবিষ্যৎ কী কুমির যদি তা জানতো। 


বৃদ্ধ হনুচাচার সঙ্গী এখন বিদ্রোহী বলগা আর মিটিংয়ে সবার মাঝে বসা পণ্ডিতম্মন্য জেব্রা। প্রতিদিন তারা নিয়ম করে ওপারে যায় লুকিয়ে দেখে অপর পারের জীবনযাত্রা। একদিন ওপারের এক মা জেব্রা কে হা-হুতাশ করতে দেখা যায়। ওর দুই সন্তান মিসিং।  থানায় নালিশ জানাতে যাওয়ায় ইন্সপেক্টর খেদিয়ে দিয়েছে। থানার দায়িত্বে আছে কুকুর। কর্পোরেশনের চেয়ার পারসন সিংহ। মা জেব্রা সিংহের কাছে নালিশ জানায়। সিংহ বলে, 'ওপারে খুঁজে দেখ। ছেলে পুলে মানুষ করতে পারিস না স্বর্গ ছেড়ে হয়তো জঙ্গলে চলে গেছে। গাধা ঘোড়া পিটিয়ে কি মানুষ করা যায়? কুমির বন্ধু চাচাকে কথা দিয়েছিল গাধা জেব্রা হরিণ নদী পার হতে চাইলে সে মারবে না। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কুমিরদের আচরণে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা যায় ওরা আর রাজি হচ্ছে না চাচা আর তার সঙ্গী সাথীদের পারাপার করতে। একদিন নদী পার করার অঙ্গীকার করে একটা বলগাকে হজম করে দেয় কুমির। এই ঘটনার পর থেকেই কুমিরদের ওপর নজরদারি চলে। বোকা জেব্রা দেখতে পায় কর্পোরেশন রান্না করা মাংস গাছ তলায় রেখে যাচ্ছে। ভোর সকালে নদীর জল চিকচিক করে উঠলেই কুমিরের দল টপাটপ মুখে ভরছে স্বাদু খাবার। ছুট্টে এসে জেব্রা জানায় এই ঘটনা চাচাকে। চাচা ভাবে এখন ওপারে যাওয়ার লোক কার্যত সে একা। যদিও পাখিরা আছে। 'ঠিক আছে, তোরা এপারে থেকে আলোচনা কর। আমি প্রতিদিন রাত্রে ফিরে এসে তোদের নতুন অভিজ্ঞতা  জানাবো।' ' কিন্তু তুমি যাবে কিসে?' বলগার প্রশ্নের উত্তরে হনু বলে, 'নদীর পাড়ে টিক গাছের উঁচু মাথা থেকে লাফ দিয়ে ওপারের রবার গাছের ডাল ধরে নেমে পড়বো। জেব্রা বলে,'কাকা বুড়ো হচ্ছো।'  'চিন্তা করিস না বুড়ো হাড় ঠিক ভেলকি দেখাবে'। চাচার কথায় সবাই হেসে ওঠে। 

প্রহরী চিতারা নিজেদের কাজ ভুলে আড্ডা মারছে এক পুরুষ সদ্দারের ডেরায়। চাচা জুটেছে ডেরার ছাদে। ওরা চাচাকে দেখতে পায়নি। নিশ্চিন্ত আলোচনায় সদ্দার অন্যদের জানাচ্ছে ভোঁদা কুমিরের দল না জেনে নিজের মাংস খাচ্ছে। একজন জিগেস করে, 'মানে'? 'মানে আর কী, নদীর উজানে দুরে কুমিরের ডেরায় চোরাগোপ্তা হানা দিয়ে খতম অভিযান চালানো হচ্ছে। তারপর মানুষী কায়দায় রান্না করে পরিবেশন করা। ব্যাস কেল্লা ফতে কুমিরের দল ফিদা। একটা চ্যাংড়া চিতা চেঁচিয়ে বলে, 'সর্বনাশ আমাদের সঙ্গে এমন হবে না তো'? ধুস নদী বোজাতে হলে কুমিরদের  মারতেই হবে। নেতার কথায় অন্যরা আস্বস্ত হলেও মনের কোণে খচখচ করতে থাকে অনেকের। চ্যাংড়া আবার প্রশ্ন করে, 'নদী মরে গেলে কোন জল খাব আমরা?' 'জঙ্গলে জলের অভাব! এত বেশি ভাবলে চিন্হিত হয়ে যাবি। মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা পছন্দ করেনা।' চ্যাংড়া বলে,' আর জঙ্গল, সে কি প্রতিশোধ নেবে না?' চাচা প্রমাদ গোনে নিত্য নতুন গল্পের ঝুলিতে সে ভারাক্রান্ত। হঠাৎ চাচা দেখে দুটো দুপেয়ে, গোলগোল চাকায় চলা গাড়ি তে ধুলো উড়িয়ে এসে নামলো। মানুষকে সব প্রাণী ভয় পায় না।  চিতারা কিন্তু যে যার মতো ফেটে গেল। ফাঁকা মাঠে কেউ কোথাও নেই। চাচা লুকিয়ে লক্ষ করছে সবকিছু। আনমনে পেচ্ছাপ করতে করতে ওরা একে অপরকে বলছে,'মূর্খ শ্বাপদদের নিয়ে ভাবার কোনো কারণ নেই। হনুমান শিম্পাঞ্জি বেবুন ছাড়া বাকি সকলকেই চিতা খতম করে লুকিয়ে খাবারের যোগান দিয়ে যাবে। বাড়ির সামনে ঘাসজমি চষে তৃণভোজী পেট ভরাবে। হাতে পায়ে গাছে চড়া প্রাণীগুলোকে কতদিন ফলমূল যোগান দেওয়া যাবে সেটাই ভাবার। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপর পারের জঙ্গলের দখল নিতে হবে'। 

এখন চাচা আর একা নয়। দু'চারজন হনু শিম্পান্জিও সঙ্গী হচ্ছে। ওপারের খবর সংগ্রহে যাচ্ছে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে। চাচার কাছে শোনা খবর এপারে পৌঁছে দিচ্ছে অন্যরা। যেকোন উপায়ে হাতিদের কাছে খবর পাঠাতেই হবে। চাচার নির্দেশ ওরা মনে রেখেছে। ধাড়ি ময়না বলেছে হাতিদের পটাবার দায়িত্ত্ব সে নেবে। চাচা দু ঠ্যাঁঙা মানুষের কাছে লুকিয়ে শুনেছে হাতির পূর্বপুরুষের নাম ম্যামথ। প্রকৃতির প্রতিশোধে তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিল। যেমন কথা তেমন কাজ। চাচা,ধাড়ি ময়না ও তার স্যাঙাতদের জোগাড় করে ফেলে। হাতিদের সঙ্গে মিতা পাতাতে হবে। হাতির চওড়া পিঠে আদরে আদরে পোকা বাছার ছুতোয় খেলা চলে। মোটা চামড়া হলে কি হবে হাতি অত্যন্ত অনুভূতিপ্রবণ। পাখির আদরে সুড়সুড়ি লাগে তাদের গায়ে। তারা কথায় কথায় পাখিদের কাছে জানতে চায় আকাশের পরিচয়। জানায় তাদের ইচ্ছের কথা। তারা আকাশে উড়তে পারলে পাখির চোখ দিয়ে জঙ্গলকে দেখতে পারত। সুযোগ পেয়ে যায় ধাড়ি ময়না। সে বলে,'জঙ্গল থাকলে তো আকাশ থেকে দেখবে। নদীর ওপারে সব জঙ্গল কাটা পড়ে গেছে। তোমরা ওপারে গিয়ে স্বজাতির খবরা খবর নিয়েছো কোনদিন? এপারের জঙ্গলেও মানুষ হানা দিল বলে। মূর্খ জানোয়ারগুলো মানুষের খপ্পরে পড়েছে'। ময়না ওদের ম্যামথের গল্প শোনাতে ভোলে না। ময়না আরো বলে, 'আমরা জঙ্গলের ওপারে তেমন উড়তে যেতাম না। প্রকৃতি এপারে কোন অভাব রাখেনি। একদিন চাচা বলল আমরা যদি এখনই সচেতন না হয় তাহলে আমাদেরও একই দশা হবে। ঘটে যাওয়া সর্বনাশাকে প্রত্যক্ষ করতে আমি ওপারে গিয়ে ছিলাম। বিশাল ঘাসজমি আর দূরে সারি সারি কলা গাছ ছাড়া জঙ্গল বলতে ওপারে আর কিছুই নেই। ওপারে হাতির খাবার-দাবার বলতে স্রেফ কলাপাতা আর থোড়'। হাতি উপস্থিত অল্প কয়েকজনের সাথে কথা বলে,ময়নাকে বলে, 'তোরা বস, সবাইকে জানাতে হবে এই তথ্য।' হাতি ঠিলার ওপর উঠে চিল চিৎকার করে। জড় হয় গোষ্ঠীর বাকি সবাই। ওপারে যাওয়ার দল নির্বাচিত হয়ে যায়। 

আজ চাচা হনু একা নয় সঙ্গে হাতির পাল ধাড়ি ময়না বেচারা বলগা যেতে চাইলেও ওপারে যেতে পারে না। চাচার বারণ ওপারে চিতার দলটি সজাগ চোরাগোপ্তা আক্রমণ নেমে আসতে পারে। কুমিরের দল অবাক হয়ে দেখে হাতিদের লংমার্চ। ওরা বুঝে উঠতে পারে না এরা কেন এমন করছে। সম্প্রদায়গত ভাবে কুমিরের দল সুখী। রান্না করা মাংস এসে নামছে গাছ তলায়। গুটি গুটি পায়ে ডাঙায় উঠে খেয়ে ভাতঘুম। সারাটা দিন আলস্যে কাটে এখন আর নিজেদের মধ্যে খুনসুটি ঝগড়া মারামারি কিছুই নেই নিশ্চিন্ত জীবন। দলটা এখন তৃণভোজীদের ডেরার মধ্যে দিয়ে চলেছে। চাচা হাতিদের পরিচিত করে এখানের নতুন জীবন সম্পর্কে। অনন্ত ঘাসজমি হাতিদের বেশ মজা লাগছিল খুব একটা পোকামাকড় নেই। অনেকটা দুপেয়ে মানুষের পাম্প সু পড়ে হাঁটার অনুভব যেন। উল্লসিত হাতি বলে এ তো বেড়ে জায়গা ঘাস খেয়েই উদরপূর্তি হবে। চাচা হাতির পিঠে একটা চড় মেরে জিগায়, 'তোমরা ঘাস খেয়ে থাকতে পারবে তো? যদি পারো তাহলে আর এগিয়ে লাভ কি? আমাদের অবশ্য এগোতে হবে।' চুপ মেরে যায় হাতির দল। 

         বড় বড় লুডোর ছক পাতা ঘরের সামনে। ছক ঘিরে বলগা হরিন হনুমান শিম্পাঞ্জি ছ্ক্কা পুট চালছে। হঠাৎ করে মেঘের মতো হাতির দলকে দেখে ওরা কেমন ভেবলে গেছে। হনুমান আর শিম্পাঞ্জিরা একটু মেপে নিতে চাইছে অতিথিদের। এক গেঁড়েপাকা শিম্পাঞ্জি চেঁচিয়ে বলে, 'তোমরা অনুমতি না নিয়ে আমাদের শহরে এলে যে বড়। হাতিরা কিছু বলার আগেই ক্রুদ্ধ চাচা বলে, 'শহর মারাচ্ছিস, দুদিন আগে হুপ হুপ করতিস। মানুষের সঙ্গে মিশে নবাব হয়ে গেছো?' একটু হলেও ঘাবড়ে গেছে ওরা। কথা বলতে বলতে কখন হাতির শুঁড়ের নাগালের মধ্যে এসে গেছে   তাই কথা বাড়াতে সাহস পায় না। সবাই জানে হাতি খুব শান্ত জাত। টুপি পরানো সোজা কিন্তু রেগে গেলে তুলকালাম করে দেবে। ধাড়ি ময়না বলে,'তোদের দেশ কেমন জানতে এলাম। ঝগড়া করছিস কেন?' জেব্রা বুনো গাধাদের চোখে পড়ছেনা কেন, ময়নার এই প্রশ্নর উত্তর করতে গিয়ে ঠ্যাঁটা শিপান্জিটা রেগে যায়। পরিস্থিতির সামাল দেয় শেয়ানাবাজ এক হনু সে নীলগাইদের দলকে বলে তারা কেমন আছে জানাতে। সঙ্গে সঙ্গে নীলগাই বলে, 'আমরা খুব সুখে আছি। দিব্যি খাওয়া-দাওয়া ঘুমানো। সিংহী চিতা হায়না কুকুর এখন  কাউকে আমরা ভয় পাই না এক্কেবারে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। তারপরে রান্না করা খাবার দাবার বাড়ির দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে। জঙ্গলে চরে খাওয়ার হ্যাপা নেই। চাচা বলে, 'একদম দুয়ারে খাবার বল কিন্তু তোদের দুধ তোদের বাচ্চারা পায়?' থতমত খেয়ে যায় নীলগাই। আর ঠিক তখনই দেখা যায় ধুলো উড়িয়ে চাকাওয়ালা গাড়ি দল এপাশে আসছে। দুরে অচেনা হাতির পাল দেখে থমকে গেছে ওরা। walkie-talkie বার করে কী সব কথা বলতে লেগেছে। চাচা ওদের গতিবিধির ওপর নজর করছে। নাঃ, ওরা গাড়ি ঘুরিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল সে দিকেই ফিরে গেল। লুডো খেলা ফের চালু হবে। ছয় জনে সাপলুডো খেলা হবে। বাচ্চা মাঝবয়সী বুড়ো সবার দল আলাদা আলাদা। হঠাৎ খোকা শিম্পাঞ্জি চেঁচিয়ে ওঠে, 'আমাদের দলে দুজন কম কেন কৃষ্ণসার বলগা ওরা কোথায়? বেশ কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে অনেক দলেই খেলোয়াড় কম। এমন কেন হবে?' সাইডলাইনে বসা অতিরিক্তরা সুযোগ পেয়ে যায়। চাচা বয়সের অভিজ্ঞতায় অনুমান করতে পারে কিছু। হাতির পিঠে থেকে নেমে এসে ছোকড়া শিম্পাঞ্জিকে জিজ্ঞেস করে, 'কখনো খেলোয়াড় হিসেবে বাঁদর শিম্পাঞ্জির অভাব পড়ে, এরা সব যাচ্ছে কোথায়?' কোন সদুত্তর পায়না চাচা কিন্তু ছোকরা শিম্পান্জির মনের কোণে একটা কাঁটা বিঁধে যায়। 

হায়না শিয়াল বনকুকুরদের ডেরা পার হয়ে মহারাজের গুহা। হায়না কুকুরদের সামান্য হলেও অসন্তোষ আছে। অসন্তোষ মানে হিংসা, চিতাদের সঙ্গে আগে এমন বৈরিতা ছিলনা তাদের। এখন চিতাদের প্রহরার দায়িত্ব দিয়েছে দু ঠ্যাংয়ে মানুষে। এমনকি যে হাতওয়ালা বনমানুষ হনুমান  বুদ্ধি দিয়ে জংলি জানোয়ারদের মগজধোলাই করলো তারাও আর পাত্তা পাচ্ছে না। শিয়াল বরং মস্তিতে আছে এখন কারও এঁটো কাঁটা খেতে হচ্ছে না। যদিও স্বভাব যায় না মলে কেউ কেউ কুকুর হায়নাদের উচ্ছিষ্ট খেতে ছাড়েনা। ধাড়ি ময়না হায়নাদের জিজ্ঞেস করে, 'কি গো তোমরা সব কেমন আছো?' এই অঞ্চল থেকে ডানাওয়ালারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে হায়নাদের মাঝেমধ্যেই কান কট কট করে। নেতা হায়না কান নাড়িয়ে ময়নাকে নেমে আসতে অনুরোধ করে। ময়না এই সুযোগ খুঁজছিল। সুড়ুৎ করে ঘাড়ের উপরে উড়ে এসে বসে পড়ে কান চুলকাতে থাকে। আদরে যখন হায়না বাঁদর হয়ে যায় ঠিক তখনই ময়না প্রশ্ন করে,'তোমাদের সবকিছু ঠিকঠাক কোন বিষয়ে ক্ষোভ নেই?' হায়না বলে, 'আমি কিচ্ছুটি বলব না তুমি কান ভাঙাবে'। ময়না বলে, 'আরে বাবা আমাকে কিচ্ছুটি বলতে হবেনা তবে আমাদের পাড়ার হায়নারা পরিষ্কার বলে দিয়েছে চিতারাজ নেহি চলেগা'। 'এক্কেবারে খাস কথা বলেছে। আমরা কেমন বুদ্ধু বেনে গেছি। তোমাদের হায়নাদের এখনো বুদ্ধি আছে। আমার তো মনে হয় চিতারা হায়না কুকুর শিয়াল মেরে চালান দিচ্ছে। বাচ্চাদের কাছে শুনতে পাচ্ছি দিনদিন খেলার সাথী কমে যাচ্ছে।' হায়নারা এমন কথায় ময়না বলে, 'তোমরা সবাই মিলে চোরাগোপ্তা আক্রমণ করো চিতাদের। কুকুরদের সঙ্গে আলোচনা করো।' হায়না জানায় আমরা এমন ভাবিনি তা নয়। দীর্ঘ আলসেমি, শিকার ধরার জন্য দৌড়ানো লড়াই করার শারীরিক ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।' ওদিকে চাচা ময়নাকে হায়না কানে কানে কি বলছে শুনতে উদগ্রীব হয়। 'তা সিংহ রা কেমন আছে?' হায়না খ্যাক খ্যাক করে হেসে ফেলে। হায়নার হাসিতে যোগ দিয়ে ময়না ট্যাঁ ট্যাঁ করে ডেকে ওঠে। হায়না পুলকিত হয়ে জানায় সিংহের নাম ভোম্বল দাস হওয়ার বদলে  ছাগল হওয়াই বাঞ্ছনীয় ছিল। শালা খাচ্ছেদাচ্ছে আর ঘুমাচ্ছে। ঘুম ভাঙলে ম্যা ম্যা করে। হৃদকম্পন জাগানো ডাক এখন উবে কর্পুর'। 


বেশ কিছুটা ধুধু অঞ্চল। হাতির পাল দৌড়ে পার হতে চায়। ইটের স্তুপ পড়ে আছে। উপড়ে ফেলা গাছের খোঁটায় হোঁচট খেতে হচ্ছে ওদের মাঝে মধ্যে। মাঠের মধ্যে দিয়ে মাটির রাস্তা। পিচ পাথরের ঢালাই হওয়ার প্রস্তুতি চলেছে। দু-পেয়ে দের চাকা গাড়ি চলবে। ওদের নিজেদের পায়ের ওপর ভরসা নেই তাই জঙ্গলের জানোয়ার দের নিজেদের মতো অকর্মণ্য বানাতে চায়। চাচা বলে, ' দুরে দেখো হাতির দল সঙ্গে বুনো গাধা জেব্রাও রয়েছে দেখছি। পা চালিয়ে চলো।' কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ওরা। এপারে কর্মরত হাতিরা সাথীদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। ধাড়িটা যথারীতি উড়ে গিয়ে বসে এক কর্মী হাতির পিঠে। হাতিটা বলে, 'তোমাদের অভাব হাড়ে হাড়ে টের পাই। এখন দেওয়ালে গা ঘষা ছাড়া কোন উপায় নেই। দু ঠ্যাঙ ওয়ালা মানুষরা কাজের পরে পায়ে শিকল পরিয়ে দেয়।' 'তোমরা বিদ্রোহ করতে পারো না তোমাদের গায়ে তো এতো জোর'। 'শালারা গুলি চালায়। এই দেখ আমার পায়ে দগদগে ঘা। গুলির এমন ম্যাজিক ঘুম এসে যায়। বিদ্রোহ বিক্ষোভ সব মাথায় উঠেছে। বেশ কয়েকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। হাতিরা বিক্ষোভ জানানোর সাহস হারিয়েছে। এখন শুধু লগ বিম বয়ে মরা'। আশেপাশে কেউ না থাকায় হাতিরা বেশ চেঁচিয়েই উত্তর করছিল। চাচা দেখে ওয়াচ টাওয়ার থেকে দূরবীন দিয়ে কাজ দেখছে দু পেয়ে ঢ্যামনার দল। চাচা বলে,'অন্যদের দুয়ারে খাবার আর তোমাদের কোন শ্রম আইন নেই?' 'আমাদের গতর আছে তাই শৃঙ্খল আছে।' চাচা এর মানে জানতে চাইলে হাতি বলে, 'ওদের গতরে শুঁয়োপোকা তাই কী ঘটে চলেছে বুঝতেই পারেনা।' চাচা হঠাৎ করে কথাটা হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয় - ওরা একে অন্যকে খাচ্ছে অথচ জানতেই পারছে না। হাতিরা দুপাশে কান দুটো খাড়া করে অবাক হয়ে শোনে চাচার কথা। 'সহাবস্থান সখ্যতা আসলে সবটাই দেখাওট'। বুনো গাধার এমনতর বুদ্ধিদীপ্ত কথায় চাচা জিজ্ঞেস করে, 'তৃণভোজীরা তো কাউকে খাচ্ছে না।' চাচার এই  কথায় গাধা বলে, 'ওরা আপাতত ওপারের গাছ পাতা আর এধারে হওয়া ঘাস খাচ্ছে। হাতির পিঠে বোঝাই হয়ে নদীর ওপাড় থেকে আসছে খাবার। শালারা বসে বসে খেয়ে দৌড়তে ভুলে গেছে। একশ দিনের কাজও যদি পেত ব্যাটারা শরীরটা চাঙ্গা হতো।' চাচা বলে,' একশ দিনের কাজ মানে?' হাতি বলে, 'বুঝতে পারলে না একটু গতর নাড়িয়ে  উপার্জন মানে জঙ্গল সাফ করতে যদি আমাদের একটু সাহায্য করতো তাহলে শরীরটা অমন পড়ে যেত না।' চাচা সঙ্গীদের বলে, 'গাধা কে দেখলে অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ এক যোদ্ধা।' হঠাৎ ধুলো উড়িয়ে বিকট আওয়াজ করে ফেটে পড়তে থাকে ঝাঁকঝাঁক ধুলো বোমা। ময়না বলে,' কাজের ক্ষতি হচ্ছে। ভয় দেখাতে ঢ্যামনারা ফাটিয়েছে।' চাচা বলে, 'ওরা নিজেরাও ভয় পেয়েছে।'


এপারে চাচা সভা ডেকেছে। দালালদের গাছ কেটে বানানো সভামঞ্চে। তৃণভোজী সম্প্রদায়ের কেউ-না-কেউ হাজির। চিতারা কেউ আসেনি, কুমিররাও তথৈবচ। হাতিরা চিৎকার করে সভার নিয়ম-নীতিকে কলা দেখিয়ে মিটিং শুরু করতে বলে চাচাকে। চাচারও তর সইছিল না। সে বক্তৃতা শুরু করে দেয়। জঙ্গলে আজ পিন পড়ার আওয়াজ পাওয়া যাবে। গাছেরা বাতাস বন্ধ করে দিয়েছে পাখিরা কলতান। বয়সের বাঁধন সরিয়ে ফেলে দৃপ্ত কন্ঠে চাচা বলতে থাকে - কিভাবে দুপেয়ে মানুষ অধিকাংশ জংলি জানোয়ারকে মগজ ধোলাই করে জঙ্গলের দখল নিতে চায়। জঙ্গল নদী, এপার ওপার ঠিক যেন বিভক্ত সিন্ধু উপত্যকা। এপার-ওপারে দুশমনি। ওপারে অসংগঠিত শ্রমিক, মগজহীন পশুকুল, বৃত্তিতে খোচর হনু শিম্পাঞ্জি আর প্রহরায় থাকা সামাজিক পুলিশ চিতা। ওপারের সবাই বর্তমানে খাবারের স্বাদ দিয়ে পৃথিবী কে চিনতে চায় অনেকটা ঝাঁজ দিয়ে চেনা বাঙালির মতো। শ্রোতারা হেসে ওঠে। চাচা বলে- ওপারে এরই মধ্যে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। ছাদ আর জালের আড়াল দেওয়া ঘরে থাকছিল তৃণভোজীর দল। লুডো খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে তারা আলসেমিতে ঘরে শুয়ে থাকত। বাচ্চারা চরতে খেলতে এদিকে ওদিক বেরত। মানুষের চাকা গাড়িতে ভীতসন্ত্রস্ত তারা। দুপেয়ে মানুষের দল চাইত হরিণ অ্যান্টিলোপ সংখ্যা বাড়ুক। কারণ গোটা পৃথিবীকে খাওয়াতে হলে অনেক খাদ্যর প্রয়োজন। এই ব্যবসায় প্রচুর লাভ। হরিণের সমস্যা ভিন্ন। দীর্ঘ জীবনে মেয়ে হরিণ যৌবন অঙ্কুরোদ্গমের সাথে সাথে বারবার মা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা লালন করে মনে। স্বপ্ন পূরাণ না হলে সে নতুন পুরুষ খুঁজে নেয় এই ভাবেই তার বহু পুরুষ গমন। মানুষ অন্যর পরিবারে দেওয়াল তুলে দিয়েছে। আশানুরূপ জন্মহার বাড়ছে না। মেয়ে হরিণ জীবন যৌবনের তাগিদে ঢুঁ মারছে অন্য ঘরে কিন্তু বিধিবাম। পরিবারের অন্য সদস্যদের অলস অবস্থান আর নজরদারিতে স্ত্রী হরিণের মনের ইচ্ছা অন্তরীণ থেকে যাচ্ছে। জংলি জানোয়ার মানুষের মতো নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলতে চাইছিল তাই আড়াল পেয়েছে। বন্দী জীবনে আবডাল থাকেনা। স্ত্রী হরিণরা চাচার কথায় এপারের জন্য গর্ব অনুভব করে। মানুষ নিজেরা লড়াই করে পারবে না জানে। কৌশলে একে ওর পেছনে লাগিয়ে জঙ্গল থেকে সবাইকে উচ্ছেদ করতে চাইছে। ময়না বলে চাচা, 'আপনি একটু শ্রমিকদের কথা বলুন'। চাচা শুরু করতে যায় কিন্তু বাধ সাধে ওপার থেকে সাঁতরে আসা তৃণভোজী বুনো গাধার দল। ওদের গলায় শিকলের দাগ স্পষ্ট। চাচা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে তোমরা? গাধা বলে, 'কাল রাতে আমরা শেকল ছিঁড়ে পালিয়েছি। নদীর ধারে রাত্রে ছিলাম। ময়না ওপারে আজকের মিটিংয়ের কথা ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল। ওপারের প্রতিনিধি হিসেবে তাই আমাদের আগমন'। 

মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয় অঞ্চল ভিত্তিক পাহারা বসবে। হাতিদের ভূমিকা বন্যপ্রাণী বৃক্ষরাজি কে মানুষ আর তার লেজুড় বাহিনীর হাত থেকে বাঁচানো। ঘাঁটি এলাকায় চিতা কুকুর বাহিনী হায়নার প্রবেশ নিষেধ। সিংহী মামা অনুমত্যানুসারে প্রবেশ করতে পারে। জঙ্গলে পুরানো খাদ্য-খাদক এর নিয়ম এখন চলবেনা। মাংসাশীদের ভাতে মারতে হবে। পক্ষীকুলের পক্ষ থেকে ময়না টিয়া ইনফর্মারের দায়িত্ব নেবে কথা দিয়েছে। শ্রমিক গাধা, পাখিদের অনুরোধ করেছে যতটা সম্ভব তারা যেন ওপারে বীজ ছড়ানোর কাজ শুরু করে। ওপারে তৃণভোজীদের খাসজমিতে বীজ ছড়ালে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নতুন গাছ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে। অন্তর্ঘাতমূলক কাজের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। হনু শিম্পাঞ্জিদের বলে দেওয়া হয়েছে যদি নিজেদের পরিবর্তন না কর গাছেরা তোমাদের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত করবে। রোজউড গাছের চারপাশে আদিম ইন্দ্রজালিক নৃত্য চলে। গোটা জঙ্গল যেন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। চাচা এমনটাই চেয়েছিল দাসানুদাস হয়ে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ হয় না। 

খেলা হবে টি-টোয়েন্টি না আমেরিকা-আফগানিস্তান কেউ বলতে পারে না। টানটান উত্তেজনা দু তরফে। মানুষের বুদ্ধিতে ক্ষুরধার শক্তিশালী দলে চিতা ছাড়া কে কে আত্মিকভাবে শামিল বোঝা মুশকিল। চিতারা ভাবছে লড়াই বাধলে বেশকিছু তৃণভোজী নিকেশ করতে পারলে মানুষের লাভ। তারা হয়তো কিছু ইন্সেন্টিভ পাবে। হাতিরা প্রতিরোধ করলে বিপদ আছে। এপারের শ্রমিক হাতিরা যদি ওদের দলে জোটে তাহলে মরতে হবে অনেককে। বেজায় ক্ষেপে আছে হাতিগুলো। কলাগাছ খেয়ে হাতিদের জিভ কষে আছে। তার ওপর থোড়ের সুতো জিভে জড়িয়ে ওদের খাবার ইচ্ছা চলে যাচ্ছে। এমন গৃহযুদ্ধর কি খুব প্রয়োজন ছিল এমনও ভাবছে কেউ কেউ। নেতৃত্ত্বে চাচার আধিপত্য দেখে হিংসুটে হনুমান শিম্পাঞ্জির দল ভাবছে একবার ওপার দখল পারলে চিতাদের কর্তৃত্ব থেকে সরিয়ে ওরা ক্ষমতার সামনের সারিতে এসে দাঁড়াবে। জঙ্গলে নিদ্রাহীন প্রহরায় বিদ্রোহীরা। 


আজ সকাল থেকেই গুমোট। শীতের শেষে মাথায় ঝাঁকড়া পাতার বাহার নিয়ে টেরি বাগাতে প্রস্তুত গাছেরা হাতিরা নদীর ধারে পল্টন সাজিয়েছে। বেশ কিছুদিন পাখিরা বেশিরভাগ সময় হাতিদের পিঠে থাকছে। মাঝেমধ্যে ফুড়ুৎ করে উড়ান দিয়ে অপর পারে নজর করে ফিরে আসছে। অপরপক্ষের অবস্থান বুঝে নেওয়া জরুরি। চাচার রোজউড গাছের মাথায় বসে তীক্ষ্ণ চোখা একসঙ্গীকে ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছে কীভাবে নজরদারি করতে হবে। ধনুকের আকারে নদীর তীর থেকে হাতিদের সৈনসজ্জা। জঙ্গলের তৃণভোজীরা এই ব্যুহর মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। রাতের অন্ধকারেও পাহার বহাল যদিও তেমন কিছু চোখে পড়ছে না। 


চলতে থাকে বেশ কিছুদিন এইভাবে। জঙ্গলে রোদের তেজ বাড়ছে বাড়ছে। বাড়ছে যুযুধান এ পক্ষের ক্লান্তি। চাচা সাবধান বাণী শুনিয়ে যাচ্ছে নিরন্তর। অমাবস্যার অন্ধকারে মিটিমিটি জোনাকির আলো আর একঘেয়ে  ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। ঘুমিয়ে পড়েছে জঙ্গলমহল। দিনে ঢিল দিলেও চাচার রাত জেগে কাটাত। আজ ক্লান্তি ওদের পেড়ে ফেলেছে। গাছেদের রাতে একটাই কাজ  কার্বন-ডাই-অক্সাইড বিযুক্তিকরন, দিনে রান্না করে তারা ক্লান্ত। হঠাৎ রোজউড গাছের গোড়ায় ছেঁকা লাগে। কেমন অজানা পরশ। একটু চামড়া ওঠার জ্বলুনি এমন অনুভব তার কখনো হয়নি। ঝিমুনি ঝেড়ে ফেলে একটু বুঝতে চেষ্টা করে পাদপ সম্রাট। না তেমন কিছু না নিশুতি রাতে ঘুম ঘুম তারা জেগে আছে।আকাশের দিকে চোখ চেয়ে ফের নিমগ্ন হয়ে পড়ে সে  ভাবনার গভীরে। রোজউড গাছ সামান্যতম কেঁপে উঠলে চাচা টের পায়। পাদপ সম্রাট নিশ্চিন্ত তার, বন্ধু, চাচা যখন টের পাইনি তখন তেমন কিছু ঘটেনি। ঝিঁঝিঁদের বেসুরো গানে অভ্যস্ত জঙ্গল অন্ধকারে নিমজ্জিত। নিস্তব্ধতা চিরে আবার হঠাৎ বিশ্রি আওয়াজে ঝিঁঝিরা গান থামিয়েছে। ঘররর ঘররর....। নড়ে ওঠে রোজউড পায়ের গোড়ায় মাত্রাধিক্য জ্বলুনি। তরতর করে চাচা নেমে আসছে একতলার ডালে। লোহার বিদ্যুৎ করাত রোজউডের গোড়ায় চেপে ধরে আছে দু-পেয়ে শিম্পাঞ্জিরা। নদীর দক্ষিণ দিকে চাচাদের ডেরা উত্তরে নদী। নদীর ওপারে কামান বসেছে রাতারাতি। রোজউড গাছের চারপাশে কর্মরত শিম্পাঞ্জিদের নিরাপত্তা দিতে গোলাবর্ষণের আয়োজন। বিকট আওয়াজ টের পেয়ে একটা হাতি। এগিয়ে আসে গাছের দিকে। চাচা চিৎকার করে সবাইকে সরে যেতে বলে। হাতিকে এগিয়ে আসতে দেখে শিম্পাঞ্জিরা ঘাবড়ে গেছে। তাদের চিৎকার শুনে হনুমানেরা কামানে আগুন দিয়েছে। গোলা কামান থেকে ছিটকে এসে হাতির পায়ের সামনে আছড়ে পড়ে। দাঁতাল গোলার আঘাতে পায়ে প্রচন্ড চোট পায়। করাত চলছে অর্জুন গাছের ছাল ভেদ করে। ভেতর থেকে বেদম প্রতিরোধ করে চলেছে রোজউড। চাচা লাফিয়ে পড়েছে শয়তানের বাচ্চা শিম্পাঞ্জি গুলোর ঘাড়ে। ওরা সংখ্যায় বেশি। ওদের নখ দাঁতের হিংস্র আক্রমণে চাচা  ক্ষতবিক্ষত হয়। গোলা খাওয়া হাতি ছুটে আসতে চেষ্টা করে। আসার পথে নিরন্তর গোলাবর্ষণে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সে থেমে যায়। পাখিরা রাতের অন্ধকারে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। রবার গাছের একটা ডাল নেমে আসে চাচার কাছে। চাচা কোন রকমের ডাল জাপটে ধরে ফেলে। স্প্রিংয়ের মতো চাচা কে তুলে নিয়ে যায় রবার গাছ। কোনরকম গোলার নিশানা এড়িয়ে হাতি ধরে ফেলে এক শিম্পাঞ্জিকে। শুঁড়ে জড়িয়ে আছাড় মারতেই শিম্পাঞ্জির ভবলীলা সাঙ্গ। এবারের গোলাটা নেমে আসে হাতির শরীরে। যন্ত্রণায় কাতর দাঁতাল মুখ থুবড়ে পড়ে। ঘটনার ঘনঘটায় এতক্ষণ শিম্পান্জিরা থেমে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ করাত আবার চলতে শুরু করে। যন্ত্রণা কাতর রোজউড এই প্রথম দুলে ওঠে। সে ভেবেছিল সবাই সব কিছু সামাল দিতে সক্ষম হবে। নাঃ, আর বসে থাকা যায় না। বাস্তিলের পতন হতে দিলে চলবে না। ততক্ষণে শিম্পাঞ্জিদেরা বিদ্যুৎস্পর্শে রবার গাছের ছাল চামড়াও উঠতে শুরু করেছে। সাদা রস বেরিয়ে আসছে করাত বেয়ে। চাচা হাতিদের আহ্বান জানাচ্ছে এগিয়ে আসার জন্য। নিশানা এড়িয়ে আসার কোনো উপায় নেই। রোজউড গাছের মৃদু দোল ক্রমে বাড়ছে। শিম্পাঞ্জিরা অপটু হাতে কয়েক মিটার বেড়ের গাছটিকে সামাল দিতে পারছেনা। ভীষণ শক্তির প্রয়োজন এই দুলুনির মাঝে করাত ধরে রাখা। তড়িঘড়ি কাজ করতে গিয়ে করাতের ব্লেড ভেঙে ফেলেছে টিম শিম্পাঞ্জি। এই সুযোগে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝড় তুলেছে রোজউড। দেখাদেখি রবার গাছ হিল্লোল তুলেছে। একটা ডাল ভেঙে দুটো শিম্পাঞ্জির মাথায় পড়েছে পরপারে যাওয়া নিশ্চিত করতে। নাগাড়ে গোলাবর্ষণ করছে হনুর দল। এই সুযোগ হনুরা চাইছে আরও কিছু শিম্পাঞ্জিকে এপারে পাঠিয়ে দিতে। যদি শিম্পাঞ্জিদের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে দিয়ে এপারের দখল নেওয়া যায় তাহলে হনুরাই হিরো। গোলা নয় দোলা লাগিল বনে বনে। এলোমেলো ছন্দে দোল খেতে শুরু করেছে সারা জঙ্গল। বায়ুচাপের উত্থান-পতনে অজানা আভাস। অন্ধকারে শুকনো পাতা উড়তে শুরু করেছে। দক্ষিণা বাতাসে রাতের প্রবল ঝড়ের সংকেত। গোলার আগুনে অন্ধকার জঙ্গল আলোময়। শুকনো পাতা বাহারি রঙ্গিন। আঁধারে আলোয় হরিণের সন্ত্রস্ত চোখ ঝলসে উঠছে। সঙ্গীদের হঠাৎ পতনে শিম্পাঞ্জিরা ঘাবড়ে গেছে। চিৎপাত হয়ে থাকা বন্ধুদের দিকে করুণ ভাবে তাকিয়ে নিয়ে তারা ফের হাতে করাত তুলে নেয়। শিম্পাঞ্জিরা ভাবছে কেন যে মরতে মানুষের ফাঁদে পড়লাম এখন পথ অবরুদ্ধ। এগিয়ে চলা ছাড়া গতি নেই। হঠাৎ মিসফায়ার হয়ে গোলা এসে পড়ে রোজউডের গোড়ায়। শিম্পাঞ্জির দল ছিটকে পড়ে। আর দেরি করলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে। রোজউড ভাবে ওপারের বিস্তীর্ণ চাষ জমিতে ফসল ধরেছে। তার আগে পশু চারণভূমি। মানুষের বানানো রাস্তা গেছে চারণভূমির বুক চিরে। আরো দূরে কাটা পড়ে আছে জঙ্গলের জান মৃত বৃক্ষরাজি। শীতের শেষাশেষি অঞ্চল রুখাশুখা। রোজউড প্রলয়ের আহবানে দুলতে থাকে। ওক রবার গাছের শরীরে নটরাজ নৃত্য। ভয়ার্ত পাখিরা অন্ধকারে মাটিতে নেমে এসেছে। ডালে ডালে চলেছে কোলাকুলি। চাচা গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে বসে আছে সে যেন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। প্রাণে ভয় নেই এতোটুকু। এতক্ষণ গাছে গাছে ঠোকাঠুকি চললেও ঝড়ের আভাসে বোঝা যাচ্ছিল না কি ঘটতে চলেছে। রোজউড আর রবারের ঘর্ষনে হঠাৎ একটা বড় ফুলকির বাতাসে উড়তে থাকে। তারপর আকাশের তারাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে একের পর এক ফুলকি জন্ম নিচ্ছে। জোনাকির সঙ্গে ফুলকি মিলেমিশে গভীর অন্ধকারকে দ্বিধান্বিত করে তুলছে। ফুলকিরা ঝড়ের নিশানা ধরে ছুটে চলেছে উত্তরে। জোনাকির দলও পেছু পেছু আগুয়ান। ওপারে কামানে বসে থাকা হনুমানের দল কস্মিনকালেও এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি। এই মুহূর্তে নদী পেরিয়ে ফুলকিরা অপর পাড়ে আছড়ে পড়েছে। ফুলকি স্রোত দেখতে জল থেকে নাক তুলে বসে আছে কুমিরের দল। এপার যেন আগুনে ফুলকির ফ্যাক্টরি। রোজউডের মাথায় বসে চাচা দেখছে ঘাসজমি জ্বলছে। আগ্রাসী আগুন ছুটে চলেছে শস্য ক্ষেতের দিকে। দরমা বাঁধা তৃণভোজীদের ঘরে আগুন ছুঁলো বলে। অন্ধকার রাত দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। গদ্দার হনুমানরা বুঝতে পারছে না কি করা উচিত। অতিরিক্ত উতসাহে এপারে শিম্পাঞ্জি গুলোকে ততক্ষণে পিটিয়ে মারা শুরু হয়েছে। আগুন ছুটেছে পেছনে, সামনে অগুনতি প্রাণ, বাঁচার তাগিদে দৌড়াচ্ছে। নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। কৃষ্ণসারের শরীর বাদামি ভেলভেট আগুনে রঙের ছোঁয়ায় অপরুপ। প্রশ্ন একটাই পালাবে কোথায়? কথায় আছে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খাওয়া। প্রাণভয়ে চিতা হায়না কুকুরদের সাথে অন্যরা দৌড়াচ্ছে। ঝড় থামছে না হয়তো অনন্তকাল চলবে দৌড়। গাছেরা প্রতিশোধ না নিলে সভ্যতা লুপ্ত হয়ে যাবে। ম্যামথরা লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল তাদের কোন দোষ ছিল না। আজ যদি বলি,"আমরা মইরা যাই তোমরা বাইচ্যা থাকো", তাহলে জীবজগৎ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। লোভ অপরিসীম লোভের যুগান্তকারী হাওয়ায় জংলি প্রাণও বশ্যতা স্বীকার করেছে। আর নয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে দিকে দিকে।' মাতালের মতো কথা শেষ করে রোজউড গাছ টলমল করতে থাকে। চাচা যা ভেবেছিল তাই ক্ষতবিক্ষত মিজেকে লুকিয়ে রেখে ঝড়ের অনুশীলনে মাতোয়ারা ছিল রোজউড। করাতের ক্ষত আপন ভরে কখন সহস্রগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে পাদপ সম্রাট তা বুঝতে পারেনি। ধেয়ে আসছে অজানা কেউ রোজউড যাকে আগে বহুবার দেখলেও নিজের জীবনে তাঁর আশু অজানা ক্ষণ চিনতে পারেনি। চাচার চিৎকারে সজাগ জঙ্গলমহল প্রত্যক্ষ করে তাদের আশ্রয়দাতা, তাদের ভালোবাসা, তাদের থেকে দূরে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পতন ঘটে মহীরুহর। ভোরের আকাশে তখন আলো ধরতে শুরু করেছে। চাচা বলে,' যতদিন না তোমার শেখানো মন্ত্রে জঙ্গলমহল দীক্ষিত হচ্ছে ততদিন আমরা তোমার পুনর্জন্মের অপেক্ষায় রইলাম। 

Comments

  1. খুব ভালো লেখা।

    ReplyDelete
  2. আমি একদিন টেলিভিশন কিনতে দোকানে গেছিলাম। প্রথমে ওরা নিরন্তর চেষ্টায় আমাকে আমার পছম্দের বাইরে জিনিস গছাতে চাইলো। আমি বললাম আমাকে উল্টো বোঝালে আমি চলে যাব। তারপর ঘটলো আর এক ঘটনা। যে বিক্রি করল তার কমিশন অন্যে মেরে দিল। ওরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু করলো। আমার মনে হলো নির্লজ্জ পুঁজিবাদ এ আমাদের কোথায় নামিয়ে আনলো।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ছোটগল্প - লাল কালো ইট।।

একগুচ্ছ কবিতা

কোন সে আলোর স্বপ্ন(কথায় ধারাবাহিক)