ছোটগল্প- পুনর্জন্ম
পুনর্জন্ম
শীতের সকাল ,একটা ট্রাকসুট পিঠে ব্যাগ নিয়ে টিউশন পড়ে সাইকেল থেকে নামল ঋজু,খুব তাড়া আছে। মা ভাতের থালা নিয়ে প্রস্তুত। বাবা আর জেঠু অফিস যাবে বলে খাবার টেবিলে হাজির। ঘড়ির কাঁটা সময়ের হাজিরা মেপে জানাচ্ছে সকাল নটা বেজেছে। জেঠুর খেয়াল ছিলনা সে ঋজু কে জিজ্ঞেস করে,'আজ অবেলায় ভাত খাচ্ছিস বড়ো?' ঋজু স্কুল খোলার ঘটনা মনে করিয়ে দেয় জেঠুকে। খাবার টেবিলে, বাবা জ্যাঠার গম্ভীর আলোচনা জমে যায়- বেকার স্কুল খুলে পড়ুয়াদের সময় নষ্ট করা ইত্যাদি ইত্যাদি। ঋজু ভাত গলাদ্ধকরন করলেও অসার আলোচনা হজম করতে পারেনা। ঋজু মা কে বলে,' তাড়াতাড়ি দলা পাকাও। আমার সাড়ে নটায় হাজিরা।' বাবা বলে,'যাদের সন্তান স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছে তারাই স্কুল খুলতে মুখর।' জেঠু ঘাড় নাড়ে। ঋজু বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলে,'হীরক রাজা হোয়াটস আ্যপে জানিয়েছে স্কুল মাঠে প্রবেশ নিষেধ। ছয় ঘন্টা একটানা বসে থাকতে হবে ক্লাসে। আমরা প্ল্যান করেছি হেঁসো নিয়ে সক্কলে মাঠে নেমে পড়বো। জঙ্গল সাফ করে মাঠ পরিস্কার করবো।' বাবা বলে,' একদম নয়।'
জেঠু বাপি মিত্র পান চিবুতে চিবুতে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে অফিসে বেরিয়ে পড়ে। আনমনা চলনে বাপি নিবিষ্ট। আঁকাবাঁকা গলি পথ ছেড়ে, বাপি,পিয়ারী মোহন স্ট্রীটে হঠাৎ করে নেমে আসে। একরাশ ছেলেমেয়ের বেহিসাবি সাইকেল হঠাৎ বাপিকে আক্রমণ করলে সে কোনরকমে শরীর বাঁচায়। রুঢ় কিছু বলতে গিয়েও বাপি থমকে যায়। সরকারি অনুদানে পাওয়া সাইকেলে সচল জনা দশেক ফুটফুটে ইউনিফর্ম পরিহিত ছেলেমেয়ে। কলরবে মুখর পেয়ারীমোহন স্ট্রীট এই মুহুর্তে রূপান্তরকামী। জানকী বিলাসীর পরশধন্য হয়ে অহল্যা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নিজের মুখে লাগাম আঁটে বাপি। হইচই করতে করতে, "সমুখের পথ দিয়ে", উধাও হয়ে যায় পড়ুয়ারা। আবারও বাপি ডুব দেয় স্কুল খোলার ঔচিত্যর বিচারে।
সোজা পথে চলে গেছে, দু'পাশে ফ্ল্যাটবাড়ি মাঝখান বেয়ে। নাক বরাবর সোজা রাস্তা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। ডান দিকে বাপির গন্তব্য। ডাইনে গার্লস স্কুল বামে অন্য রাস্তা। ক্রিং ক্রিং ধ্বনিতে ব্যস্ত সাইকেল বাপির পাশ দিয়ে মোড় ঘুরবে। বাপিকে আজ সাইকেলে পেয়েছে। বাপি তাকিয়ে দেখে দুটো প্যাডেলের উপর চাপ দিয়ে সাইকেল আরোহী ছেলেটি উড়ান দিতে চাইছে। মনে পড়ে যায় ঝাঁকবেঁধে সাইবেরিয়ান সারস চিলকা পাখিরালয়ে উড়ছে। দলছুট একজন জলের ধারে শিকারমগ্ন। বাপি ক্যামেরা হাতে নেমে পড়েছে জলে। টুরিস্ট পার্টির নৌকা বালির চরে ঠেকে গেছে মাঝি এগোতে অক্ষম। তড়িঘড়ি বাপি হাফ প্যান্ট পরে নেয়। ক্যামেরা বাঁচিয়ে সন্তর্পনে জল কেটে এগিয়ে চলে। তার চোখ লেন্সে বন্দী। দলছুট সারসের মগ্নতাকে ছুঁতে হবে লেন্সের প্রতিবিম্বে। টের পেয়ে যায় চোরাশিকারি। দ্রুত ডানা ঝাপটিয়ে পাখিটি উড়তে থাকে। লক্ষ্যভ্রষ্ট দু-একটি শর্ট নিয়ে বাপি ক্যামেরা নামিয়ে রাখে। আকাশমুখী সারি সারি সারসের সঙ্গ প্রত্যাশী উড়ান বাপি মন ক্যামেরায় ছুঁয়ে ফেলে। ছেলেটিকে সাদা জামা সাদা প্যান্টের স্কুল পরিধেয়তে কি অদ্ভুত মানিয়েছে! ঠিক যেন যৌবনে দেখা সারসের একলা উড়ান। সঙ্গ পাওয়ার পিয়াসী তাগিদ। ক্ষণিক দাঁড়িয়ে হাঁটতে থাকে বাপি। পার হয়ে যাচ্ছে একে একে দোকানপাট। বন্ধুর চশমার দোকানে খরিদ্দার নেই। ছেঁড়া ছেঁড়া শরতের মেঘের মতো ভেসে চলেছে সাইকেল। বন্ধু সোমনাথ ঈঙ্গিতে বাপিকে দেখায় মেয়েদের উল্লাস। বাপি বলে, 'উদয়ন পন্ডিতের বন্ধ স্কুল হীরক রাজা খোলার দায়িত্ব নিয়েছে।' বন্ধু হাসে, বাপি নিজেই বুঝতে পারেনা স্বতঃস্ফূর্ত বেরিয়ে আসায় বাক্যবন্ধর অর্থ।
দুইশত গজ দূরে বেলুড় গার্লস স্কুল। গতি বাড়িয়ে দিয়েছে বাপি। অফিসের বাস ধরার তাড়া ওকে তাড়িয়ে নিয়ে চলে। ভাবনা চিন্তার বেড়াজালে একটু বেখেয়ালী বাপি। নিয়ম ভেঙ্গে রাস্তার অংশজুড়ে দাঁড় করানো মোটরবাইক কে সে দ্রুত এড়িয়ে যেতে চায় পেছনে তাকানোর অবসর নেই যে। এক ঝাঁক ময়ুরী সাইকেল নিয়ে উড়ছে নতুন আকাশে। তাদের দ্রুত চলনে ধাক্কা খায় বাপি। পাট ভাঙ্গা কালো প্যান্ট চাকার দাগে ধুলামলিন হয়ে গেছে। সজোরে ব্রেক কষেছে বাকি তিনসঙ্গী। সাইকেল থেকে নেমে পড়ে সক্কলে মাথা নিচু করে আছে। স্কুলের জানলা দিয়ে এক পড়ুয়া চেঁচাচ্ছে, ঐ সুমতি, স্কুল বসে গেছে তাড়াতাড়ি আয়।' নত মুখে থাকা মেয়ের দল উত্তর করতে পারছেনা। প্রাথমিক বিভ্রান্তি কাটিয়ে বাপির চোখে ঘনঘোর শ্রাবণ নেমেছে। মেয়েটি বলে, 'জেঠু লেগেছে না,আমাকে মাফ করে দিন।' বাপি ধরা গলায় বলে, 'না রে মা, আমি বুড়ো হয়ে গেছি।' মেয়েরা বুঝতে পারেনা জেঠুর কথার সারমর্ম। জেঠু ফের বলে ,'পাঠশালা কখনো উদয়ন পন্ডিত বা হীরক রাজার হয়নারে। পাঠশালা শুধুই পড়ুয়াদের। তোরা পুনর্জন্ম লাভ করলি। আমাকে মাফ করে দে তোরা।' দিদিমনির নিষেধের বেড়াজাল টপকে বেশ কয়েকটি মেয়ে জানলায় হাজির। নাম করে তারা ডাকছে, 'আয় সুমতি, পিয়ালী আয়না।' জেঠু চিৎকার করে বলছে, 'যা, যা তোরা। দেখছিসনা "ডাকছে আকাশ ডাকছে বাতাস"...।
নিজেকে nostalgic লাগছে।
ReplyDeleteখুব ভালো লাগল।
ReplyDelete"ডাকছে আকাশ ডাকছে বাতাস"... শেষ হয়েও হল না শেষ .. বেশ ভালো লাগলো
ReplyDelete