তিনটি ছোটগল্পে গাঁথা মালা(অনুস্বর)
গল্প এক
কুন্দনের সপ্তমী পূজা।
ছেলেটির নাম কুন্দন,সে প্রবাসী বাঙালি। চাকরি সূত্রে কুন্দনের বাবা সুদুর অতীতে বাড়ি ছেড়েছে। এখন ওরা কানপুরের পাকাপাকি বাসিন্দা। করোনার প্রকোপে কুন্দন গত বছর পুজোয় ঠাকুরদার কাছে আসতে পারেনি। দাদাদিদির আদরে থেকে পূজো দেখার আনন্দই কুন্দনের কাছে আলাদা। এ বছর আগে থেকে ঠিক করা ছিল যাই হয়ে যাক না কেন সে আসবেই। বৃষ্টি বাদলা এ বছর কিছুতেই বাংলার বুক ছেড়ে যাচ্ছে না। হঠাৎ পুজোর ঠিক আগে আবহাওয়ার বদল ঘটে। শরতের মেঘভাসি আকাশে এখন আলোর তুফান, গাছে গাছে শিউলির বন্যা। পঞ্চমীর দিন প্রিয় নাতিকে ফোনে দাদা জিজ্ঞেস করে, 'শরতের আকাশে আগমনীর বার্তা তোমার আগমন ঘটছে কবে'? নাতি বলে, 'সারপ্রাইজ'। ফোনটা রেখে একরাশ আনন্দ বুকে চেপে যেই না দরজা খুলে দাদা দাঁড়িয়েছে। কপালে ঢিপ করে একটা প্রণাম জোটে। চোখে খাটো দাদা আগন্তুককে মাথায় হাত দিয়ে অনুভব করে প্রিয় নাতির আগমন বার্তা। চেঁচিয়ে উঠে দাদা বলে, 'একেই বলে সারপ্রাইজ'।
ঠাকুমা কাকা কাকিমা ভাই বুবু সবার সাথে দেখা করে চানটান সেরে জিরিয়ে নিয়ে কুন্দন তার ঠাকুর দেখার পরিকল্পনা ভাঁজতে থাকে। কাকা প্রত্যুষ প্রথম থেকেই গররাজি, ঠাকুর দেখতে সে যাবেনা। সারাজীবন কলকাতায় অফিস ঠেঙিয়ে ছুটির মধ্যে কোলকাতার ভিড় ঠেলে ঠাকুর দেখা তার পোষাবে না। প্রিয় নাতির আবদার বিফলে যাবে দেখে দাদা অর্ডিন্যান্স জারি করে। প্রত্যুষ বাধ্য হয় রাজি হতে। কাকা সপ্তমীতে কুন্দনের সঙ্গী হবে। অষ্টমীতে ভাই বুবু।
সপ্তমীর দিন বেলুড় মঠ থেকে অটোয় করে দক্ষিণেশ্বর যাবে কুন্দনরা। এ বিষয়ে কাকার মত মেনে নেয় সে। সেখান থেকে মেট্রো ধরে খেয়াল খুশিমতো ওরা নামবে যেখানে-সেখানে। স্টেশন এর আশপাশ ঘুরে আবার পাতাল প্রবেশ কর। কাকার পক্ষে এটাই সুবিধা। করোনা বিধির গুষ্টির তুষ্টি করছে সরকার ও মানুষ। ওরা অটোর ভীড় লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। দুটো অটো ছেড়ে তৃতীয় অটোতে ওদের স্থান হয়। হলদে অটোর পেছনে লাল কালিতে 'রহিম' লেখা। কুন্দনের তীক্ষ দৃষ্টিতে যা এড়ায়না। ছুটতে থাকে অটো,বাঁ দিক থেকে সাঁ করে ওভারটেক করে একটা মোটর বাইক। অটোচালক বিড়বিড় করে কিছু বলে। অটোচালকের মুখের দিকে তাকাতে গেলে কাঁচের স্ক্রিনের তলার দিকে কুন্দনের নজর পড়ে। মাকালীর একটি বড় স্টিকার লাগানো আছে সেখানে। কুন্দন হঠাৎ প্রশ্ন করে, 'ভাই, এই গাড়ির মালিক কি আপনি'? চালক হ্যাঁ বাচক উত্তর করলে সে ফের বলে, 'আপনার দিনে কত রোজগার?' এই প্রশ্নে বিরক্ত হয় চালক। কাকা সামাল দিতে বলে, 'কিছু মনে করবেন না ভাই, ও উত্তরপ্রদেশে থাকে। কলকাতা সম্পর্কের ওর বড্ড কৌতুহল'। কাকার কথা কে পাশ কাটিয়ে কুন্দন ফের জিজ্ঞেস করে, 'আপনি পূজোয় ঠাকুর দেখেন'? আপাদমস্তক দেখে নিয়ে চালক বলে, 'আপনি ঠিক কী জানতে চাইছেন বলুনতো'? কুন্দন বলে, 'আজ আপনি আমাদের সঙ্গ দেবেন, মানে আমাদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাবেন'? অটোর বাকি যাত্রীদের একজন হঠাৎ করে বলে, 'কেন ওকে বকাচ্ছেন,পুজোর দিনগুলোয় ও বাড়তি রোজগার ছেড়েছুড়ে কেমন করে আপনার সঙ্গে যাবে'? অটোটা দাঁড়িয়ে পড়ে। একজন যাত্রী নামবে, অপেক্ষায়মান অন্যজন উঠবে। চালক ছেলেটি বলে, 'আমি যেতে পারি যদি আপনারা আমার ইচ্ছে অনুযায়ী ঠাকুর দেখতে যান'। এককথায় কুন্দন রাজি হয়ে বলে, 'তাহলে আমারও একটা শর্ত আছে। রাস্তায় সব খরচ আমার আর যদি কিছু মনে না করেন আজকের দিনে আপনার পেশা থেকে যা সম্ভাব্য আয় আমার থেকে তা নিতে হবে আপনাকে'। অটোযাত্রীরা অবাক হয় দুই পাগলের গল্প শুনে। কাকাও অন্য যাত্রীদের দলে যোগ দিয়েছে ততক্ষনে।
অটো দক্ষিণেশ্বরে থামে। চালক স্ট্যান্ডে গাড়ি না লাগিয়ে বলে, 'আপনারা দাঁড়ান আমি আসছি'। কাকা বলে, 'কী পাগলামি শুরু করলি?' কুন্দন হাসে কিছু বলে না। চটজলদি ওরা বেলগাছিয়া স্টেশনে পৌঁছে যায় মেট্রোরেলে। কাকা প্রত্যুষ ইঙ্গিতে কুন্দনকে বোঝাতে চাইছে অজানা অচেনা কার সঙ্গে এলি বলতো। চালক প্রত্যুষের ইঙ্গিত বুঝতে পারেছেনা এমন নয়। সে ও এই খেলাটা উপভোগ করছে। কুন্দন হঠাৎ অটোর নামে ছেলেটিকে ডাকতে শুরু করে। সামনে একটা বিরাট মসজিদ দেখে কুন্দন বলে, 'রহিম এই মসজিদের নাম কী'? না হেসে রহিম জানায়, 'মদিনা মসজিদ'। কুন্দন হয়ত অন্য কিছু ভাবছে।প্রত্যুষ ভাবে শালা, শেষমেশ মুসলমান পাড়ায় দুর্গাপূজা দেখতে আসা হল। কাকা যে উত্তরপ্রদেশের মানুষদের চেয়ে সংস্কারে খুব উঁচু নয় কুন্দন তা জানে। কুন্দন ছোট বেলা থেকে বাপ-মায়ের কপচানো ধর্মবুলি শিখেছে কিন্তু প্রয়োগে সে সাবধানী। অটোর পেছনে লেখা 'রহিম' শব্দ তাকে সাবধানী করে তুলেছে। বেলগাছিয়া সাবধানী ক্লাবের পূজো মন্ডপে ঢুকে কুন্দনরা হকচকিয়ে গেছে, অবশ্য যাওয়ার মতনই মণ্ডপ শয্যা। ঘরবাড়ির ভগ্নস্তূপে ধ্বংসের ইঙ্গিত। কুন্দনের মনে হয় খন্ডহরে প্রবেশ করেছে সে। হঠাৎ মাতাল বাঁশির সুরে, গ্রাম্য রাখাল বেশী কৃষ্ণ যেন ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠার সংকেত দিচ্ছে। কুন্দন নাছোড়, সে ব্যারিকেড পেরিয়ে শিল্পীর সাথে কথা বলতে চায়। ভলেন্টিয়ার্সদের অসদিচ্ছায় কুন্দনকে ইচ্ছের পায়ে বেড়ি পড়াতে হয়। বিপদ বুঝে রহিম মণ্ডপ থেকে তড়িঘড়ি ওদের বার করে আমনের অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে মঞ্জুর আহমেদ হাজির। রহিম, মনজুর সাহেবের সঙ্গে সবার পরিচয় করিয়ে আজ আচানক ঘটা বন্ধুতার গল্প শোনায়। মন্জুর সাহেব ওদের বোঝায় আমফান,যশ, করোনায় গোটা পশ্চিমবঙ্গ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। এই মন্ডপশয্যা তারই সাক্ষী। একে একে অনেকে ঢুকতে থাকে অফিস ঘরে। রফিক হামিদ টুবাই। কাকার সব গুলিয়ে গেছে ততক্ষনে। টুবাই বলে, 'দাদা, আমরা বিগত তিরিশ বছর ধরে হিন্দু-মুসলমানে পূজো রথ মহরমে সব কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছি'। মঞ্জুর সাহেব বলেন, 'টুবাই, ওইসব কথা ছাড়'। মন্জুর সাহেব কুন্দনের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলেন, ' শৈশবে অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে আমরা হিন্দু-মুসলমানে বড় হয়েছি। সেই পরিবেশের অভাব ছিল শহরে। তাই শহরে আসার পরে এই ভেদাভেদ কমিয়ে আনার চেষ্টায় আমরা সম্প্রদায়গত ভাবে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছি'। রহিম বলে, 'আব্বা, ঝুট বলবেন না একদম। আপনি না থাকলে অন্যদের সাধ্য কি ছিল'? কথায় কথায় চা-বিস্কুট এসে পড়ে। সবাই চায়ে চুমুক দিতে ব্যস্ত সেই ফাঁকে মঞ্জুর সাহেব হঠাৎ করেই চিন্তার জলে ডুব দেন। 'আব্বা', শব্দর মাহাত্য বুঝতে চায় কুন্দন। কুন্দন স্বভাব ডুবুরি। কৌতুহলী কুন্দনকে জীবনে বহু মূল্য চোকাতে হয়েছে এই কারনে। কথায় আছে না, 'স্বভাব যায় না মলে'।
মনজুর সাহেব কমিটির খাতায় খুব দ্রুত চিঠির আঙ্গিকে কিছু লিখে চলেন। কুন্দন উঁকিঝুঁকি মারলে রহিম তাকে মানা করে। ঝাড়া দশ মিনিট লাগে চিটিটা শেষ করতে। তারপর মুখ বন্ধ করে আটা দিয়ে চিপটে দেন মঞ্জুর সাহেব। চিঠিটা টুবাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে মঞ্জুর সাহেব বলেন, 'তুই আজ মুন্সীগঞ্জে এদের নিয়ে যাবি। এই চিঠিটা জমির ভাইকে দিয়ে বলবি আজ যেন জমির ভাই মুন্সিগন্জে এদের দুপুরের আহারাদির ব্যবস্থা করেন। টুবাই নিজের অস্বস্তি লুকিয়ে রেখে বলে, 'চাচা, বেফিকির থাকেন চিঠি ঠিক পৌঁছে যাবে'।
দলবল নিয়ে টুবাই মন্ডপে মন্ডপে ঘুরতে থাকে। রাস্তায় এক জায়গায় জটলা দেখে রহিম আর কুন্দন এগিয়ে যায়। প্রত্যুষ বাধা দিতে গেলে ঠুবাই বলে, 'এখানে ভলেন্টিয়ার্স আছে কিচ্ছুটি হবে না'। সত্যিই তাই, আমনের ব্যাজ লাগানো চারজন ভলেন্টিয়ার্স কোথাও ট্রাফিক কন্ট্রোল করছিল মাটি ফুঁড়ে তারা হাজির হন। উৎশৃঙ্খল অবোধ দুই আরোহীর রংবাজি ততক্ষণে থেমে গেছে। বয়সের ভারে প্রত্যুষ হাঁটাহাঁটি ধকল নিতে পারছেনা দেখে কুন্দন রহমত চাচার মসজিদে ওদের নিয়ে যায়। সেখানে জল বাতাসা খেয়ে আবার হাঁটা শুরু হয়। টালা পার্কে প্রত্যয়ের ঠাকুর দেখে ওরা ফের বেলগাছিয়া ফিরে আসে। কুন্দন লক্ষ্য রেখেছে সারাটা রাস্তা টুবাই কেমন আনচান করছে। টুবাই কিছু বলতে চায় অথচ বলে উঠতে পারছে না। টুবাইয়ের অন্তরে জমে থাকা জল প্রায় স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছে গেছে। কুন্দন সেফটি ভাল্ব খুলে টুবাইয়ের চাপ রিলিজ করতে দেহাতি ভাষায় বলে, 'আরে ইয়ার বোলো, ডর কিস ব্যাতকী'। এক নিশ্বাসে টুবাই বলে,'আজ গার্লফ্রেন্ডকে চাঙুয়ায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। আপনারা যদি ছুটি দেন তাহলে যেতে পারি'। টুবাইয়ের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে ওরা মেট্রোরেলের প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ে।
ট্রেনে উঠে বয়স্ক লোকেদের চেয়ারে বসে পড়েছে প্রত্যুষ। সামনে কুন্দন দাঁড়িয়ে। ভিড়ের মধ্যে রহিমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এপাশ ওপাশ তাকাতে তাকাতে কুন্দন পকেট থেকে চিঠিটা বার করে উল্টে পাল্টে দেখতে থাকে তারপর অতি সাবধানে লেই লাগানো লেফাফাটি খুলে ফেলে। নেহাতই অমনোযোগী হয়ে পড়তে পড়তে কুন্দনের চোয়াল হঠাৎ শক্ত হয়ে আসে।
আসসালামু আলাইকুম
জনাব জসীমউদ্দীন
........................................
.........................................
মুন্সীগঞ্জের কোঠাবাড়িতে থাকা সোনালীর কথা তোমার নিশ্চয় মনে আছে। মাসির রক্তচক্ষু দৈহিক অত্যাচার সহ্য করে সযত্নে ভ্রুণ রক্ষা করে দূর্গা এক ফেরেশতার জন্ম দিয়েছিল। সোনালীর ইচ্ছে অনুযায়ী এবং তোমার অনুরোধে নিঃসন্তান ভৈরব ঘোষের হাতে আমি সঁপে দিয়েছিলাম সেই শিশুকে। পালন করার দায়িত্ব নিয়েছিল ঘোষ পরিবার। সেই শিশু আজ আমাদের মহল্যায় টুবাই ঘোষ নামে পরিচিত। গত পঁচিশ বছরে তোমার সাথে এই নিয়ে আমার কোন বাক্যালাপ হয়নি। আজ টুবাই আমার পত্রবাহক। চাইলে তুমি সোনালীর সঙ্গে দেখা করাতে পার। রেড লাইট এরিয়ায় ওর জন্ম তাই ওর জাতপাত ধর্ম আজও সবার অজানা। সোনালী কোন ঘর থেকে এসেছে তার সম্যক ধারণা কারও নেই। এখন তোমার বিচারের উপর সবটুকু ছেড়ে দিলাম। টুবাইয়ের সঙ্গে বিকাশ যাবে। বিকাশ ব্রাহ্মণ সন্তান, ভট্টাচার্যী পরিবারে ওর জন্ম। দুর্ঘটনায় ওর বাবা-মার মৃত্যুর পর আমি ওকে মানুষ করি। আল্লাহতালা আমার পুত্র রহিমকে টেনে নেওয়ার পর বিকাশ আমার কাছে সন্তান স্নেহে বড় হয়েছে। ঝড়ের বেগে বাকি চিঠিটা শেষ করে কুন্দন।
বিকাশ তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে মুন্সীগঞ্জের পুজো দেখতে যাবে। তুমি দুপুরে ওদের আহারাদির আয়োজন করবে।
আশা করি ভালো আছো। আমাদের কুশল জেনো।
আমাদের জন্য দোয়া চেয়।
ইতি
মন্জুর আহমেদ।
কুন্দনের অবাক চোখের বিষ্ময়ে প্রত্যুষ নতুন কিছুর সন্ধান পেতে চিঠিটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। পড়ার আগে ঝুলে নেমে আসা চশমাটা প্রত্যুষ ঠিকঠাক চোখে বসিয়ে নেয়। ট্রেনে বসে থাকার সুবাদে ঝরঝরে হাতের লেখা চিঠিটা প্রত্যুষ নিমেষে বার কয়েক পড়ে ফেলে। কালীঘাট স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়েছে কারও হুশ নেই। রহিমের চিৎকারে ট্রেন থেকে নেমে পড়েছে কুন্দন। রহিম দেখে কাকা এখনো ট্রেনে বসে আছেন। মুহূর্তে, রহিমের হ্যাঁচকা টানে কাকা চিঠি সমেত হুমড়ি খেয়ে প্ল্যাটফর্মে এসে পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় চিঠিটা কাকার হাত থেকে খসে পড়েছে। রহিম সেটা ততক্ষনে কুড়িয়ে নিয়েছে। প্রত্যুষ তাড়াতাড়ি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে রহিম কে বিকাশ বলে সম্বোধন করতে যায়। কুন্দন অঘটনের আন্দাজ পেয়ে তাড়িঘড়ি নিজের একহাত কাকার মুখে চাপা দিয়ে কন্ঠরোধ করে। রহিম অবাক হয় কুন্দনের এ হেন আচরণে। সেই অবসরে কুন্দন চিঠিটা ছিনিয়ে নেয় রহিমের হাত থেকে। অবাক রহিম চেয়ে দেখে কুন্দন চিঠিটা মুহূর্তে ভাঁজ করে কুচিকুচি করে উড়িয়ে দিচ্ছে। স্টেশনে বড় পাখার হাওয়ায় কাগজের টুকরোগুলো এখন পাতাল বিলাসী। প্ল্যাটফর্মের ভিড় ততক্ষনে আলগা হয়ে এসেছে। ট্রেন ধীরে পাতাল প্রবেশ করে অদৃশ্য হয়ে যায়। দূরে লাল সিগন্যাল ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। রহিম আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে প্ল্যাটফর্মের পড়ে থাকা কাগজগুলো কুড়িয়ে জড়ো করতে।
.….........…...........
গল্প দুই
অষ্টমী পূজায় কুন্দন।
আজ বাবুর পালা, দাদাভাই মানে কুন্দনকে ঠাকুর দেখতে নিয়ে যাবার দায়িত্বে সে। বাবু দাদাভাইয়ের ভক্ত কিন্তু বন্ধুদের ছেড়ে দাদা ভাইয়ের সাথে গেলে কপালে জুটবে রঙ্গ-তামাশা। তাই কেবল অষ্টমী পুজো দেখানোর ভার নিয়েছে সে। হইহই করে ঘোরা আর দাদাভাইয়ের পকেট কেটে খাওয়া এই তার ইচ্ছা।
লিলুয়া বেলুড়ের পাড়ায় ঘুরে, তন্নতন্ন করে তারা ঠাকুর দেখতে থাকে। শরতের ছোট্ট বিকেল। প্রকৃতির ডেকে আনা অন্ধকারকে কমিয়ে দিয়েছে পুজোর আলোকসজ্জা। পোকা সেদ্ধ মানে না বাছা মটরের ঘুগনি খেতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়েছে ওরা। বাবু বলে, 'জয় মা দুগ্গা, তোমার পুজোয় করোনায় মেরো না যেন। কুন্দন খাচ্ছে আর মিটিমিটি হাসছে। ইঙ্গিতময় হাসিতে কুন্দন হয়ত বলতে চাইছে পূজোতো যা দেখছি পেটের। ঘুগনির পালা সাঙ্গ করে ওরা বড় রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে। হঠাৎই একটা 54 নম্বর বাস এসে দাঁড়ায় ওদের সামনে। উঠবোনা উঠবোনা করে ওরা শেষমেশ উঠে পড়ে। পুজোর যানজট মাড়িয়ে বাস চলেছে গজেন্দ্র গমনে। ভিড় তেমন বেশি নয়। এক্কেবারে শেষে ধারের সিট পেয়েছে কুন্দন। কোথাও আলোকমালা কোথাও বন্ধ কলের অন্ধকার পেরিয়ে ঢিমেতে তালে চলন। বিভিন্ন বয়সের কচি-কাঁচার একটা দল হেঁটে চলেছে রাস্তা জুড়ে। ড্রাইভার হর্ন বাজিয়ে ওদের সাবধান বাণী শোনালে ওরা রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ায়। কুন্দন ছোটবেলায় কানপুরের টেক্সটাইল কলোনির ভেতর দিয়ে গোধুলি বেলায় হাঁটার সময় এমন কলতান শুনতে পেত। অবাক হয়ে কুন্দন এমন কলতানে মুগ্ধ হয়ে যেত। ওদের মধ্যে দুচার জন বাসের দিকে আঙ্গুল তুলে অন্যদের দেখায়। বাসে চড়ার আকুলতা প্রকট হয় সেই চাওয়ায়। সামনের জন চেঁচিয়ে বলে,'ও কনটাকটার কাকু আমাদের পয়সা নেই বাসে চাপতে দেবে?' কন্ডাকটর ওদের হৃদয়ের কথা শুনতে পেয়ে বাস থামার ঘন্টি বাজায়। পিলপিল করে ওরা বাসে উঠে পড়ে। বাবু বলে, 'দাদাভাই, দেখো সকালবেলায় হাঁসঘর খুলে দিলে হাঁসের দল যেমন একে অন্যের ওপর লাফালাফি করে বেরোতে চায় এ যেন ঠিক তেমন'। কুন্দন হাঁসঘর দেখেনি কোনদিন সে আফসোস করে।
বাসের মধ্যে কিলবিল করছে ছেলের দল। ওদের মধ্যে কিছু ছেলে বাসের পেছন দিকে চলে এসেছে। বাসের চলমানতায় ওরা অস্থির। বাঁশের উপরের হ্যান্ডেলে হাত না পেয়ে ওরা এ ওর ঘাড়ে পড়ছে কখনো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য যাত্রীকে ধাক্কা মারছে। এক বসে থাকা মাঝবয়সী হঠাৎ খেঁকিয়ে ওঠে কারণ এক খুদে যাত্রী তার হাঁটু ধরে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করেছে। কুন্দন নিজে উঠে পড়ে সামনের দুই ক্ষুদে যাত্রীকে বসতে দেয়। তাই দেখে পেছনে কন্ডাক্টার ওদের কাছে ভাড়া চায়। খুদে দুজন অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। প্রায় জনা দশেক কচিকাঁচা জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন কাঁচুমাচু মুখে বলে, 'আমাদের নামিয়ে দাও'। যাত্রীদের অধিকাংশ চুপচাপ বসে শুনছে কিন্তু রা কাড়ছে না। একজন বলে,'একে ভাঁড়ে মা ভবানী তার ওপরে দান ছত্র'। কথাটা সত্যি করোনা যুগে অনেকে বাসে ওঠা বন্ধ করে দিয়েছে। কন্ডাক্টর বাস থামানোর ঘন্টি বাজায়। পেছনের গেটে থাকা ছেলের দল পিলপিল করে নেমে যায়। সেই দেখে সামনের গেটের ছেলেপিলেরা হুড়মুড় করে নামতে থাকে। প্রতিবাদী কন্ডাক্টার বাসের মধ্যে দিয়ে হেঁটে পেছনে আসে। ক্ষুব্ধ কন্ঠে সহকর্মীকে বলে, তোহর ঘরমে বাল বাচ্চা নেহি ক্যা'? পথরুদ্ধ করে বাস দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে থমকে থাকা সারি সারি গাড়ি চিল চিৎকার করছে। ড্রাইভার চেঁচিয়ে বলে, 'শালা, জলদি ফয়সালা কর,পাবলিক আমাকে খিস্তি করছে'। প্রতিবাদী জন ঝট করে নেমে পড়ে বাচ্চাদের এক এক করে চাগিয়ে বাসে তুলেছে দেখে সাহস পেয়ে বাকিরা কিলবিল করে গাড়ির মধ্যে উঠে পড়তে থাকে। বাস ফের চলতে শুরু করেছে। বীরদর্পে সামনের গেটের কন্ডাক্টর পেছনে হেঁটে এসে কুন্দনকে বলে, 'বাবুজি, কুছু যদি মনে না করেন তো এক বাত কহু'। কুন্দন সপ্রতিভ ভাবে বলে, 'কহিয়ে না?' 'আজ আপ ইন বাচ্চো ক্যা সঙ্গ পূজা ঘুমিয়ে'। বাধ্য সৈনিক যেমন হাঁ করে কমান্ডারের অর্ডার মানে ঠিক তেমনই কুন্দন কাজে নেমে পড়ে। দেশবন্ধু ক্লাবের আগে বাস দাঁড়িয়ে পড়েছে। নতুন বন্ধুদের নিয়ে হৈহৈ করে নেমে পড়ে কুন্দন মাঝে নতুন বন্ধুরা শেষে বাবু। জমে যায় পূজো, আইসক্রিম ফুচকার উপাচারে।
গল্প - তিন
কুন্দনের দুগ্গামা
নবমীর ভোর সকালে কুন্দন বেরিয়ে পড়েছে বাড়ি থেকে। মনের কোনে দীর্ঘকাল সে লালমাটির দেশে অসুর পুজো দেখার ইচ্ছে লালন করেছে। সকালের হাওড়া-মেদিনীপুর লোকাল। করোনার জ্বালায় ট্রেনের সিডিউল সব ঘেঁটে গেছে। ট্রেনে উপচে পড়ছে ভিড়। বসার জায়গা অবশ্য জুটে গেছে কুন্দনের। যাত্রী ফেরিওয়ালায় জমজমাট ট্রেন কম্পার্টমেন্ট। শশা কলা পিয়ারা আঙুর সেফটিপিন মাস্ক মশা মারার ইউক্যালিপটাস তেল দশ টাকায় মেবাইল ষ্ট্যন্ড কিছুরই অভাব নেই সেখানে। বাগনান থেকে লেন্ডি গেন্ডি নিয়ে উঠল এক পরিবার। মায়ের কাঁখে ছোট ছেলে। এক কন্যা সন্তান মায়ের হাত ধরে আছে। ভিড়ের চাপে ঘোমটা খুলে মহিলা বেসামাল বেআব্রু। লুঙ্গি পরা পুরুষ মানুষটার মাথায় কাঁধে শতচ্ছিন্ন ব্যাগ। সিঁড়ির মতো পাঁচ ছয় সাত বছর বয়সের তিনটে আধ ল্যাংটো ছেলে যেন উচ্চতা মেপে মেপে বানানো। ট্রেনের ভিড় ঠেলে তারা দৌড়ে বেড়াচ্ছে জানলায় জানলায়। ভদ্র যাত্রীগণের বিরক্তির কারন তারা। ব্যতিব্যস্ত নারী-পুরুষ কিছুতেই সরলপুঁটি গুলোকে বাগ মানাতে পারছে না। যেন হাঁড়ি থেকে ওদের অথৈই পুকুরে কেউ ছেড়ে দিয়েছে। কেউ বলছে, ভারতবর্ষ একদিন মুসলমান গুরু দেশ হয়ে যাবে। শালারা বছরের-পর-বছর বিয়চ্ছে। কুন্দন রেগে গিয়ে বলে, 'কি হচ্ছে এসব? অন্য একজন বলে, দুর মশায়, খেতে দিতে পারবে না যখন জন্ম দেয় কেন? হো হো করে হেসে ওঠে একটা দল। একটা ছোঁড়া বলে,সব কটা ক্যাপ ফাটা। সঙ্গের জন বলে, মোহাম্মদের কড়া নির্দেশ ক্যাপ পরা চলবে না। লুঙ্গি পরিহিত পুরুষ মানুষটি মুখ ফুটে কিছু বলতে চায়। বাচ্চা মেয়েটির হাত ছেড়ে, মা, ডান হাত বাড়িয়ে ওর মুখ চাপা দেয়। তারপর কাঁখের বাচ্চাটিকে নিমেষে মুখর এক যাত্রীর কোলে বসিয়ে দেয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সেই ব্যক্তি বাকি যাত্রীদের অট্টহাস্যে লজ্জা পেয়ে বীরত্ব দেখাতে বাচ্চাটিকে কোল থেকে ঠেলে নামিয়ে দেয়। মা দুর্গার মত জেগে ওঠেন রমণী। বাচ্চা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলে এই মেয়েটি শুধু আমার পেটে জন্ম নেওয়া। বাকি তিনটি জ্ঞাতি গোষ্ঠীর। আর কাঁখেরটি যাকে আপনার কোলে বসালাম তাকে পুকুর পাড় থেকে কুড়িয়ে পাওয়া। পরখ করে দেখলাম আপনারা কেমন ভদ্দরলোক। একটা কচি বাচ্চাকে কিছুক্ষণের জন্য রাখতে পারলেন না নিজের কাছে। আপনার কর্মে মনে হল, টেরি বাগানো সাজগোজ করা অমন কার্তিক কোনদিন যেন আমার কপালে না জোটে। আমাদের ছোটলোক জীবনই ভালো। অসুর নিয়েই আমি খুশি।
কুন্দনের শ্রবণে ঢাকঢোল কাঁসরঘন্টা একসাথে বেজে উঠলো, পরাণে ধুঁনুচি নাচ। বাচ্চাটিকে নিজের কোলে বসিয়ে সে দূগ্গামাকে বলল,চলো, আজ কৈলাশে যাব। জীবন্ত দুগ্গা আর অসুরের যৌথ জীবন দেখে আসব। আমার আর অন্য পূজায় কাজ নাই।
ওফ্ ! দাদা আমি বাকরূদ্ধ। তোমাকে আসসালামু আলাইকুম, নমস্কার।🙏💯💐💐💐💐💐
ReplyDeleteঅষ্টমীর অঞ্জলি নিবেদন করে প্রসাদ পেলাম একরাশ অনাবিল আনন্দ আর সুখ।
ReplyDeleteসকালটা ভরে গেল।
Deleteগল্পটা ভালো লাগলো।বাস কন্ডাক্টরের মানবিকতা মনে দাগ কাটলো।
ReplyDelete