কোন সে আলোর স্বপ্ন(কথায় ধারাবাহিক)
কোন সে আলোর স্বপ্ন
এক
বিপিন ও মন্টূ
সকালের জমজমাট বট তলার মোড়। গুনগুন করতে থাকা সাবলীল বিপিন একটু জড়োসড়ো হয়ে যায়। মন্টুর উপস্থিতি, ওকে মনে মনে চঞ্চল করে তোলে। মন্টু বুঝতে পেরে বলে,' গুম মেরে গেলি যে বড়? 'জড়তা কাটাতে, বিপিন আবার গেয়ে ওঠে 'তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা।' 'কে বে তোর সন্ধ্যার মেঘোমালা?' মন্টুর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই, বাতাসী রাস্তার মোড় ঘুরে ওদের সামনে এসে হাজির। বিপিনকে দেখে বাতাসী বলে, ' কি বিপিনবাবু আজ যে বড় শুকনো লাগছে আপনাকে, কোন গণ্ডগোল?' 'না, মানে আপনি রেনকোর্ট সিনেমার গান গুলো শুনতে বলেছিলেন না।' মন্টু নাকটা গলিয়েই ফেলে, সে বলে, ' তাতে শুকনো লাগার কি হলো?' 'হ্যাঁ তাইতো', বাতাসী বলে। হাসপাতালের সেই অভিশপ্ত রাত্রির পর, বিপিন এমনিতেই অস্বস্তিতে থাকে বাতাসীর সামনে। আজ মন্টুর কাঠিতে সে আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এলোমেলো বিপিন গুছিয়ে ওঠার আগেই বাতাসী নিজ নিকেতনে যাত্রা করে। মন্টু বলে, 'তুই তো জমে ক্ষীর হয়ে আছিস রে, শালা এই জন্য রোজ সক্কাল,সক্কাল বটতলায় ঠেক মারা। তোর কি কোন বয়সের বাছ বিচার নেই রে? 'লাজুক বিপিন বেফাঁস বলে ফেলে,'আমি কি প্রেম করতে যাচ্ছি, আর উনি ওরকম নন, ওনাকে আমি দিদি ডাকি।' মন্টু বলে, 'থাক থাক, অনেক হয়েছে, তোর মুগ্ধতায় আমি সব বুঝে নিয়েছি। শালা আমাকে ডজ মারা।' বিপিন বলে, 'ফালতু বকিস না, ওঁর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক, তাছাড়া ওনার হাজব্যান্ড এতো ডিগনিফায়েড না।' থাকথাক, হাজব্যান্ড মারাস না, এমন মাল ছেড়ে, গে হবে তুমি?' মন্টুর কথায় লজ্জাবনত বিপিন। থুতনি নেড়ে দিয়ে মন্টু গেয়ে ওঠে, 'কুছ বাত হে জিন্দেগি মে।'
একজন সরকারি হাসপাতালে জন্মেছিল, নরমাল ডেলিভারি, অন্যজন নার্সিংহোমে,সিজারিয়ান বেবি। একই পাড়ায় থাকতো ওরা, একজন খোলার চালে, অপরজন কোঠাবাড়িতে। বিপিনের বাবা কাঠমিস্ত্রি, পাড়ায় মানিকবাবুর কাজের খুব কদর, কাজের অভাব এক্কেবারে ছিল না বরং শরীরটাই তাল মেলাতে পারছিল না।কিছু অতিরিক্ত পয়সার যোগান চাই মানিকবাবুর, বিপিনকে লেখাপড়া শেখাতে হবে যে । নিজের শুধুমাত্র অক্ষর পরিচয় আছে, অথচ কত কঠিন কঠিন মাপ ধরতে পারে মানিক, ছোট্ট বিপিন অবাক হয়ে দেখতো বাপের হাতে কাঠের জাদু। একটার পর একটা কাটা খাপ মিশে গিয়ে নিপুন অবয়ব পেতো আসবাবে। সৃষ্টির নেশা বোধহয় রক্তে এমন ভাবে প্রবাহিত হয়! একদিন,বাবার অবর্তমানে তার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে, বিপিন একটা ব্যাট উইকেট বানিয়ে ফেলে। তা দেখে মানিকবাবু চটেলাল, ছেলেকে বলেছিল, 'তোকে ছুতোর মিস্ত্রি বানাবো বলে জন্ম দিইনি।'
বিপিনের মা মুচকি হেসেছিল, কারণ সাদামাটা বুদ্ধিতে সে বুঝেছিল,ছেলের অন্তত দুর্দিনে খাওয়ার অভাব হবে না। অবাক হয়ে বিপিন বাবাকে বলেছিল, 'ক্রিকেট খেলতে গেলে তো ব্যাট উইকেট লাগে।' মানিকবাবু বলেছিল, ' লাগেতো কি? আমায় বলতে পারতিস, আর গরিব লোকের ছেলে এত খেলার কি দরকার?’ বিপিনের কিছুই মাথায় ঢোকে না, সে মন্টুর এক ডাকে ব্যাট,উইকেট বগলদাবা করে মাঠে চলে যায়। মন্টু বাপ মায়ের একমাত্র সন্তান, ততদিনে এক সন্তান রেওয়াজ বাঙালি জীবনে চালু হয়ে গেছে। এমনকি গরিব মানুষও এক সন্তানে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।মন্টুর মা বাবা উভয়েই সরকারি চাকুরে। পাড়ার লোকের কথায়, মন্টুর বাবা বিজন বাবু, একেবারে মালামাল হয়ে আছে। নিন্দুকে হয়তো হিংসায় বলে।তবে সুন্দর বাপের রেখে যাওয়া কোঠাবাড়ি, ঘরে সুন্দরী বউ,বিয়ের আগে বউয়ের বাপ মরে যাওয়া চাকরি। মানুষের আর দোষ কি ? অথচ ছেলের খেলার ব্যাট উইকেট নেই। বিপিন বানালে তবেই খেলা, নয়তো চেলা কাঠ দিয়ে বল পেটানো । মাঠের ছেলেরা বলে, ‘মন্টুর বাড়িতে সবকিছু আছে কিন্তু ওর মা সবকিছু বারোয়ারি করতে চায় না। বাড়ির উঠোনে, কাজের লোকের সাথে, কেনা ব্যাট উইকেট নিয়ে খেলে। প্রথম ব্যাট উইকেটের স্বাদ পেয়ে বন্ধুরা খুব খুশি। আনন্দে পাঁজাকোলা করে বিপিন কে কোলে তুলে নেয়, হিপ হিপ হুররে ধ্বনি ওঠে। বিপিন ঠিক বুঝতে পারে না, কি এমন অলৌকিক কান্ড সে ঘটিয়েছে। বন্ধুদের শে বলে, ‘আমার বাবা, কত কিছু বানাতে পারে জানিস, আমি তো শুধু একটা ব্যাট বানিয়েছি।’ সবাইকে অবাক করে মন্টু বলে ‘তোর বাবা তো ছুতোর মিস্ত্রি,তাই ওরকম কাজ করতে পারিস। আমার বাবা সরকারি অফিসার।আমারওসব কাজ নয়। ভড়কে যায় সবাই, এমন কথা ওরা কোন কালে শোনেনি। মুখরা শৈল বলে, ‘কোনদিন তো দেখি নি কারো জন্য কিছু আনতে,ব্যাট, উইকেট লুকিয়ে রাখিস। স্কুলে নিজের টিফিন খেয়ে সবার কাছে হজমিগুলি চাস।’ অন্যরা প্রাণ খুলে হেঁসে উঠলে, মন্টু কাঁদো কাঁদো মুখে মাঠে বসে পড়ে। বিপিন, এগিয়ে গিয়ে মাথায় হাত বোলাতে গেলে, ঠেলে সরিয়ে দেয় মন্টু। বিকেলে নতুন ব্যাটে ফুলঝুরি ছোটানো রানের খেলা ওদের স্বপ্নে থেকে যায়। মন্টুর সাথে বিপিনের বন্ধুত্বে কোনো খাদ ছিলনা কিন্তু ছোটখাটো ঘটনাগুলোকে বিপিনের প্রতি বন্ধুদের ভালোবাসায় ওর আপত্তি আছে। মন্টুর মা, ব্যাট বানানোর গল্প শুনে, হেসে বলে, ‘বিপিনের ভাগ্যে, ওর বাপের পেশা লেখা আছে।’ মাঠের পোড়া ঘায়, একটু যেন মলমের প্রলেপে আরাম পায় মন্টূ। ঠিক তখনই মা বলে ওঠে ‘তুই সব প্রতিশোধ খাতায় নিবি। স্কুলে লেখাপড়া যেখানে ওর কোন উপায় নেই।’ মন্টু বলে, ‘কিন্তু মা, স্কুলে ওকে বন্ধুরা ভালবাসে।’ মা বলে ‘তো? ‘ না মানে, স্যারের ওকে নামে চেনে, পছন্দ করে।’ ‘কি করে হয় এমন তুই স্ট্যান্ড করিস ভালোবাসা পায় বিপিন ?’ মন্টুর বাবা বই থেকে মুখ তুলে নিয়ে বলেন, ‘ছাড়ো না, একটা বাচ্চা ছেলেকে কি সব শেখাচ্ছ?’ ‘তুমি চুপ করো, এই জন্যই তোমার জীবনে কিছু হলো না।’ ঝামেলা এড়াতে, আবার বইয়ে মুখ গোঁজে মন্টুর বাবা। মন্টু দুম করে বলে বসে ‘মা জানো, বিপিন কিন্তু লেখাপড়ায় ভালো, তাই স্যারের ওকে ভালবাসে।’ হঠাৎই ওর শিশু মনের সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়। কাঁটাঝোপে কুন্দফুল ফুটতে দেখে, বাপ একটু আশ্বস্ত হয়।
পরের দিন আবার যথারীতি বিপিন, মন্টুর বাড়ির নিচ ত্থেকে হাঁক পাড়তে থাকে,’মন্টু ও মন্টু, স্কুলে যাবি না।’ মন্টুর মন ছটফট করতে থাকে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে এক দৌড়ে সে নেমে আসে।দিব্যি ভুলে যায়, বিপিনের সাথে ঘটা, গতকালের ঘটনা। এই ভাবেই স্কুলের দিনগুলো ওদের বাড়িয়ে নিয়ে চলে।বদলাতে থাকে সক্কলে, কালের নিয়মে। পৃথিবীতে বিশ্বায়নের দামামা বেজে গেছে, সমস্ত কিছুর মধ্যেই ব্যবসা। মুক্ত বাজার, মুক্ত পৃথিবী, কাছা খুলে ডাকছে মানুষকে যৌনতার পাঠশালায়। বলছে- কোনো বাধা নেই, বদলে নাও সঙ্গী-সঙ্গিনী। শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত কর। বদলে যাচ্ছে এঙ্গেল সাহেবের পরিবারের ধারণা।বেওসায় বসতে লক্ষ্মী , মৃগয়া ক্ষেত্রে প্রয়োজন, সেই কারণে পরিবারের ধারনা পাল্টে পাল্টে দাও। একান্নবর্তী পরিবার ভাঙ্গে আপনি ,কোপনির সংসার গড়ে ওঠে। শ্লোগান হেঁকে বলে বেনিয়া ‘আপনার বাড়ি আপনার পরিচয়।’ কিন্তু কাটলো না পরিস্থিতি তাই বুলাদির আগমন। হোক এক পুরুষকে ঘিরে অনেক নারীর সম্পর্ক বা উল্টোটা, যদি এই বন্ধ্যা দশা কাটে। বাম আমলেও শুরু হয় স্কুল-কলেজের বেসরকারিকরণ, স্কুলে লেখাপড়া মাথায় ওঠে ।চতুর্দিকে প্রাইভেট স্কুলের রমরমা। সাতটা বিষয়, সাতটা প্রাইভেট টিউশন।মন্টুর জীবন পতাকা, পতপত করে উঠতে থাকে। ওদিকে নিজস্ব চেষ্টায় বিপিন এগিয়ে চলে নিজের মত। স্কুলের কয়েকজন মাস্টার এর সহায়তা করে। রসায়ন ক্লাস এ একদিন মোলের ধারণা দিচ্ছেন শিক্ষক, মন্টুর সব পড়া আগেই হয়ে গেছে, স্যার বিভিন্ন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন ক্লাসে, একুইরিয়ামের মাছের মতো টপ টপ গিলছে মন্টু,বমি করে চলেছে নিরন্তর মুখস্ত উত্তর। হঠাৎ, বিপিন জিজ্ঞেস করে, ‘স্যার, কার্বনকে কেন রেফারেন্স হিসেবে ধরা হয়েছে?’ প্রশ্নের অভিঘাতে স্যার একটু ঘাবড়ে যায়।উনি বলেন, ‘আমি ঠিক বলতে পারছিনা, একটু জেনে বলবো।’ মন্টু বলে, ‘এইসব আলতু ফালতু প্রশ্ন করিস কেন, এসব কি পরীক্ষায় আসবে নাকি ?’ স্যার বলেন, ‘না রে প্রশ্নটায় জান আছে। ’ মন্টু ধাক্কা খায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কার ভরবেগ যেন বেড়ে গেছে শত গুণ। আগে মান অভিমান ছিল, এখন তা ক্রোধে রূপান্তরিত হয়েছে। আবার যখন কোন স্যারের কাছে প্রশ্ন করে, বিপিন খোরাক হয়, তখন মন্টু অদ্ভুত আরাম পায় মনে। এমনই একদিন ইতিহাসের ক্লাসে বিপিন জিজ্ঞেস করে, ‘ইংরেজরা ভারতে এসেছিল বাণিজ্যিক কারণে, ভারতীয়রা ইংল্যান্ড যেতে পারত, যায়নি কেন?’ হতভম্ব ইতিহাস শিক্ষক, ভিরমি খেয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম প্রশ্নবানের তীক্ষ্ণতার। স্যার, বিপিনকে অবাক করে,জিজ্ঞেস করেন, ‘তোর বাবার পেশা কি?’ বিপিন উত্তর দেয় ‘আমার বাবা কাঠ মিস্ত্রি, আদতে উনি একজন শিল্পী, ওনার হাতে জাদু আছে।’ স্যার বলেন, ‘ও, ছুতোর মিস্ত্রি, কাঠের কাজ আবার শিল্প? তা জানিস,’ তোর বাবা ছুতোর হলেন কেন?’ বিপিনের বাবা ছুতোর বলে ওর কোন লজ্জা, নেই বরং প্রচ্ছন্ন গর্ব আছে, শিল্পী বলে।স্যারের প্রশ্নের উত্তর বিপিন খুঁজতে থাকে, সত্যিই তো কেন এই পেশা বেছে নেওয়া। মন্টু ভাবে বিপিন লজ্জায় মরে যাচ্ছে। ক্লাস শেষে বিপিনকে মন্টু বলে, ‘বাবাকে বলিস সামনের জন্মে যেন সরকারি কর্মচারী হয়।’ এমন ভাবেই শৈশবের সম্পর্ক বদলে যেতে থাকে।
ওদিকে হইহই করে মাধ্যমিক পরীক্ষা এসে ওদের ঘাড়ে চেপে বসে। বিপিনকে উঁচু নিচু সময় হাঁটতে হচ্ছে, বাবার বুকের ব্যাথাটা বেড়েছে, মাঝেমধ্যেই বাবার কাজে হাত লাগাতে হচ্ছে। চলেছে রাত জেগে পড়াশোনা, স্কুলের স্যারেরা সাধ্যমত সাহায্য করছে। মন্টুর মসৃণ জীবন, মাস্টার, মকটেস্ট বড়িয়া
যাপন। কোনো কমা, ফুলস্টপ নেই। মাঝে মধ্যে বিপিনকে কাছে পেলে, বিষয়ভিত্তিক কিছু উদ্ভট প্রশ্ন করে নড়বড় করে দিতে চায় সে।বিপিন ওসব নিয়ে মাথা ঘামায় না । কারণ বিপিনের সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা চেয়েও জীবনের পরীক্ষার গুরুত্ব অনেক বড়। পরীক্ষা পার হয় নিঃসাড়ে, দলে, দলে ছেলেমেয়েরা ছুটতে থাকে, বিজ্ঞান বিভাগের প্রাইভেট টিউটরের কাছে নাম লেখাতে। এ বিষয়ে বিপিনের কিছু করার নেই। ওকে এক বন্ধু বলে, ‘তুই, স্কুল চেঞ্জ করে নে। শান্তিসদন স্কুল উঠে যাবার জোগাড় ওখানে শিক্ষকরা শুনেছি স্কুলটিকে বাঁচাবার জন্য ছাত্রদের ভালোবেসে পড়াবার চেষ্টা করছেন। কেবলমাত্র পাঁচ, ছয় জন ছাত্র বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে, তাই গোয়ালঘরের শিক্ষা হয় না। মাস্টারদের প্রশ্ন করা যায়।’বন্ধুর কথা শুনে বিপিন দেখা করে স্কুলে। উৎসাহী হেডমাস্টার, বিপিনকে ভর্তি করানোর আশ্বাস দেন। বেরোয় মাধ্যমিকের রেজাল্ট,শতাংশ হিসাবে নব্বই নম্বর পেয়েছে মন্টু, বিপিনের ভান্ডারে আশি শতাংশ নম্বর জমা হয়। কিন্তু অংকে মেলে একশোয়, একশো। মানিক বাবুর ক্ষয় রোগ ধরা বুক, ফুলে ওঠে বিশ্বাসে, তাহলে পারবে ছেলে। ভর্তি হয়ে যায় যে যার মতন বিজ্ঞান শাখায়। মন্টু নাম্বার মেপে বড় স্কুলে ভর্তি হয়। যদিও ওই স্কুলে ভর্তি করতে মন্টুর মায়ের আপত্তি ছিল,কো-এডুকেশন হওয়ার কারণে। বাধা না মেনে মন্টু ওখানেই ভর্তি হয়, মেয়েদের সঙ্গে একসাথে পড়ার সুপ্ত বাসনা, মন্টু লালন করতো মনে মনে। সারা দিন কাঠ গুঁড়োর মধ্যে থেকে হাঁফ ধরে যেত মানিকবাবুর। অবস্থা আরো খারাপের দিকে গেলে বিপিন বাবাকে বলে, ‘তুমি বিশ্রাম নাও, আমি ঠিক চালিয়ে নেব।’ মানিকবাবু শুনতে চায় না, এই নিয়ে অশান্তি চরমে ওঠে। মা, ছেলের পাশে দাঁড়ায়। যদিও মা বুঝতেই পারেনা ছেলের পাশে দাঁড়ানোর মানে কি? আদরের ছেলেকে বলে, ‘তুই যাতে রাজি, আমি তোর পাশে আছি।’ কাশতে, কাশতে মানিক বলেন স্ত্রীকে, ‘এতদিন ধরে লালন করা মনের বাসনা, ছেলে আর মা এ মিলে ধুলিস্যাৎ করে দেবে?' অথচ শরীর সাথ দেয় না মানিকবাবুর ।বিপিনের বিজ্ঞান শিক্ষা, অদম্য ইচ্ছা এগিয়ে চলে,সঙ্গে বাবার কাস্টমার কে দেওয়া প্রতিশ্রুতির, মূল্য রাখার চেষ্টা।শান্তিসদনের শিক্ষাব্রতীরা সত্যই বিপিনকে সাহায্য করেছিল। মন্টু যখন বিখ্যাত কোচিং সেন্টারের নোটস নিয়ে জয়েন্ট পরীক্ষার ইঁদুর দৌড়ে ছুটে চলেছে ,বিপিন তখন কলেজ ষ্ট্রীটের ফুটপাত ঘেঁটে খুঁজে আনছে মণিমুক্তো।কি অবাকই না হয়েছিল বিপিন যখন এক বই বিক্রেতা বলেছিল, ‘বাবু,অরিজিনাল রেজনিক হ্যালিডের বই এর সংকলন হাতেগোনা, তোমার পড়া হয়ে গেলে আমাকে ফেরত দিয়ে যেও। আমি বিনিময় মূল্য দেব।’ বিপিন স্বভাবগত ইচ্ছায় জানতে চেয়েছিল কেন ? দরিদ্র ফেরিওয়ালা বলেছিল, ‘অনেকে তোমার মত মেধাবী, শুধু অর্থের অভাবে নতুন বই পড়তে পারেন না।’ অদ্ভুত ভালোলাগায় চোখের কোণে এক পশলা বৃষ্টি নেমে এসেছিল বিপিনের, ঠিক তখনই পিঠে হাত রাখে মন্টু, সঙ্গে এক পাল ট্যাঁশ গরু।মন্টু জিজ্ঞেস করে ‘কাঁদছিস কেন?’ নিজেকে সামলে নিয়ে
বিপিন বলে গল্পটা, মন্টু ছোঁ মেরে বইটা কেড়ে নিয়ে চোখ বোলায়, এই বইগুলোর তার সিলেবাসে নেই। নিতান্ত অবজ্ঞা ভরে বইটি ফেরত দিয়ে বলে,‘এইসব হাবিজাবি বই পড়ে জয়েন্ট এন্ট্রান্স ক্র্যাক করা যায় না।’ সময় এগিয়ে আসে ফরম ফিলাপ করার দিন। মানিকবাবু কোথা থেকে শুনেছেন জয়েন্টের ফরম ভর্তির সময় এসে গেছে, 2000 টাকা লাগবে, মনে মনে তিনি ভেবে রেখেছিলেন, বিপিনকে ইঞ্জিনিয়ার বানাতে হবে। মিস্ত্রির জীবন বড় লড়াইয়ের কোন স্বাচ্ছন্দ নেই। রাঁদা, বাটালি, করাত নিয়ে যুদ্ধ করার চেয়ে ঢের ভাল মগজাস্ত্রে বাজিমাত করা।আবার কাজের ক্ষেত্রে নিজেই যখন আবিষ্কার করেছেন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব, কখনো কখনো নিজেকে শিল্পী ভেবে পরম তৃপ্তি পেয়েছেন, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি কখনো মেলেনি ।শুধু এই কারণেই হয়তো তিনি চেয়েছিলেন পুত্রকে ভিন্ন পেশায় সচ্ছল দেখতে। বাবার কথায় বিপিন চটে যায় কারণ বাবা নতুন কাজ ধরে এডভান্স নিয়ে বিপিনকে ফ্রম ভরাতে চায়। নতুন কাজ মানে শ্রমঘণ্টার বৃদ্ধি, কে করবে এই বর্ধিত শ্রম? বাবা অসুস্থ, ঠিক সময় কাজ দিতে গেলে বিপিনকে হাত লাগাতে হবে, না হলে লাভের গুড় পিঁপড়েয় খাবে। কোনদিকে সামলাবো ভেবে না পেয়ে বাবাকে না বাচক উত্তর দেয় সে ।বাপ ছেলেতে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলে। মা পাশে থাকার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তিনি নীরব থেকেছেন। বিপিন বলে, ‘বাবা, শুধু ফরম ফিলাপ করলেই হয় না, প্রশ্নের প্রকৃতি জানতে মক টেস্ট দিতে হয়। সেখানে আরো দশ হাজার টাকা লাগবে। কতগুলো কাজের অ্যাডভান্স নেবে তুমি?’ কাশতে, কাশতে বাবা বলে, ‘ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষা তোকে দিতেই হবে।’ গুম মেরে যায় বিপিন। পরের দিন ছিল রোববার, সকাল বেলায় এক ভদ্র মহিলা এসে হাজির হন দুয়ারে, বলেন, ‘মানিকবাবু আছেন?’ ‘না, উনি কাজে গেছেন’, বিপিনের মা জানায়। ‘ওনাকে সময় করে একটু আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন, একটা ডাইনিং টেবিল বানাতে হবে।’ ভদ্রমহিলার কথা শুনে, বিপিন বাইরে এসে বলে, ‘আপনার নাম, ফোন নাম্বার দিয়ে যান উনি এলে জানিয়ে দেব।’ কিঞ্চিৎ ভেবে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে বিপিন। তারপর বলে, ‘চলুন, আমি গিয়ে মাপজোক করে আইডিয়া নিয়ে আসি।’ অবাক হয়ে যায় শান্তনা, কিন্তু মুখে কিছু বলেনা। ভদ্রমহিলা জানান তার নাম বাতাসী। যেতে যেতে উভয়ের পরিচয়পর্ব সাঙ্গ হয়। বাতাসী বলে,’ তুমি ডিজাইন বুঝে নিতে পারবে?’ এই প্রশ্নের উত্তরে বিপিন শুধু হাসে।বাতাসী, বিপিনের আত্মবিশ্বাস দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি লেখাপড়া করো?’ বিপিন কেমন দিদির স্নেহ খুঁজে পায় বাতাসীর প্রশ্নের মধ্যে, মনে হয় কতদিনের পরিচয়।অবশ্য এর অন্য কারণও আছে, একটা মানুষ পয়সা খরচ করে সৌখিন আসবাব বানাবেন, এরকম একটা আনাড়ি, মাপ নিতে যাচ্ছে উনি না বলতেই পারতেন। তার
বদলে নিজের বাড়ি পৌঁছে, অত্যন্ত বিশ্বাসের সাথে দাদার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। মাপজোক সারা হলে বাতাসীদি টাকা এডভান্স করতে চাইলেন। বাতাসী ও তার স্বামীর ততক্ষণে বিপিনের সব গল্প শোনা হয়ে গেছে। বিপিন টাকা নিতে অস্বীকার করলে, বাতাসীর স্বামী অর্ক বলে, ‘এই কাজ তোমার, কোন সময়ের চাপ নেই। কাজ থেকে ন্যায্য মুনাফা, তোমার পড়াশুনার কাজে লাগবে, তাই এডভান্স দিচ্ছি।’ বাতাসী বলে, ‘আমাদের একটা ডাইনিং টেবিল লাগবে, এক্ষুনি তা না হলেও চলে যাবে, তুমি ফুরসত বুঝে কাজ করবে।’ বিহ্বল বিপিন রাজি হয়ে যায়।
জমা পড়ে যায় এন্ট্রান্স ফর্ম। পরেরদিন স্কুলের এক শিক্ষকের বদান্যতায়, সমান্তরাল স্কুলে মক টেস্টের ব্যবস্থা হয়ে যায় কম পয়সায়। বিপিন বাপকে জানায় যে সে পরীক্ষা দেবে, টাকার যোগাড় স্কুলের শিক্ষকরা করে দিয়েছেন। জোরকদমে লেখাপড়া চলতে থাকে, পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে শিল্পীর নিপুণ দক্ষতায়, দিদির ডাইনিং টেবিল বানানোর কাজ চলতে থাকে। ওদিকে বাবার শরীর, খারাপের দিকে, মাঝেমধ্যে বাবার ধরা কাজগুলো টুকিটাকি সামাল দিতে হচ্ছে বিপিনকে।মানিক বাবুর ক্ষোভ দলা পাকিয়ে গলায় উঠে আসছে। চিৎকার করে স্বগোতক্তি করেন ক্ষণে ক্ষণে, ‘না, পারলাম না, ছেলেটা ছুতোরই হবে, শালা ছুতোরের বাচ্চা।’ গিন্নি রান্নাঘর থেকে বলে, ‘চুপ করো, শুনতে পেলে লেখাপড়া করার যেটুকু সময় পাচ্ছে তাও নষ্ট হবে।’ রবিবার গুলো বিপিনের সকাল থেকে দুপুর অবধি দিদির বাড়িতে কাজ করে। অর্ক, বিপিনের সাথে গল্প করতে ভালোবাসে। মাইকেল ফ্যারাডের গল্প বলে অর্ক।কিভাবে দপ্তরির দোকানে বই বাঁধতে গিয়ে,সেই বই পড়ে, বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী হয়ে গেলেন ফ্যারাডে। আসলে অর্ক নেড়ে ঘেঁটে দেখতে চায় বিপিনের ইচ্ছাগুলোকে। বিপিন অর্ক কে বলে, ‘আপনারা দুঃখ পাবেন শুনলে, বিজ্ঞান আমাকে চুম্বকের মতো টানে কিন্তু পরিবারের অভিকর্ষজ টান পরিমাপে অনেক বেশি, বিজ্ঞান শিক্ষার ইচ্ছে তাই মুক্তিবেগ পাবেনা। আমি শুধু বুঝে নিতে চাই, ইচ্ছে দিয়ে সময়ের চলার উল্টো স্রোতে জেতার সম্ভাবনা কতটুকু ?’ অর্ক, বাতাসীর বোধগম্য হয় না কথার অর্থ । বিপিন এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসছে তখন, যখন সরকার বেচে দিয়েছে পরীক্ষা ব্যাবস্থা প্রাইভেট সমান্তরাল স্কুলের হাতে । পাশ দিয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়া এ যুগে অসম্ভব। মেধা আর ইচ্ছাশক্তি দিয়ে কতটা সফল হওয়া যায় তা বিপিন বুঝে নিতে চায়। সমান্তরাল স্কুলে ভর্তি না হয়ে এই জয় সম্ভব নয়, এই সত্য চিরন্তন,তা সে ভুল প্রমান করতে চায় । অবাক হয়ে যায় মিয়াঁ বিবি, এইটুকু একটা পুঁচকে ছোঁড়া, ভেতরে পুষে রেখেছে একটা আস্ত হাইড্রোজেন বোমা! পরপর হার্ডেল গুলো এগিয়ে আসে, মক টেস্ট, প্রিটেস্ট। টেস্টের রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার দিনগুলো পার করে, চলে এন্ট্রান্স
পরীক্ষার জন্য রাতদিন এক করে পড়া। বাতাসী পরীক্ষার দিন হাজির ছিল টিফিন বেলায়, একান্তে দুজনে বসে আলোচনা হয়, লক্ষ্য ভেদের দিকে প্রথমার্ধে কতোটা এগিয়ে যাওয়া গেল। বিপিন আফসোস করে, একটা ভুল চিহ্নিত করতে পেরে। মন্টু একই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছে, তার ফুরসত নেই বিপিনের খোঁজ নেওয়ার। গোটা পরিবার উৎসাহে টগবগ করে ফুটছে। মন্টুর শরীরী ভাষায় হদিশ পাওয়া যায়না ওর অবস্থান। পরীক্ষার পালা সাঙ্গ হল, বিপিন লেগে পড়েছে বাতাসীদির টেবিলে। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে ওঠা, কল্পনার টেবিল স্ট্যান্ড গাছের আকৃতি নেয়। যেন বিশাল এক মহীরুহ ডালপালা নিয়ে টেবিল টপকে ধরে আছে। বিপিন, বাবা কোন শপ থেকে লেদ মেশিনের কাজ করায় তা জানে। বাবাকে লুকিয়ে বিপিন, ঘোষ শ মিল থেকে টারনিং এর কাজ করিয়ে এনেছিল। টেবিল উদ্বোধনের দিন ঠিক হয়ে যায়, বাতাসী নিজে গিয়ে নিমন্ত্রণ করে আসে মানিকবাবুর পরিবারকে। মানিকবাবু অবাক হয়ে যান, কিসের নিয়ন্ত্রণ বুঝতে পারে না। বিপিন মাকে বলে রেখেছিল, বাবাকে, কিচ্ছুটি না জানাতে। নির্দিষ্ট দিনে ওরা আসেন, ডাইনিং টেবিল সম্পর্কে বাতাসী, মানিকবাবু কে খাওয়া দাওয়ার আগে কিছু জানায়নি। সময়মত বাতাসী জিজ্ঞেস করে, ‘টেবিল টা কেমন দেখলেন , পারতেন এমন কাজ করতে?’ মানিক জানায়, ‘অপূর্ব,শিল্পীর নিপুনতায় তৈরী, শরীর খারাপের আগে হলে একবার চেষ্টা করে দেখতাম।’ বাতাসী বলে, ‘ এ আপনার কীর্তিমান পুত্রের ভাস্কর্য।’ ভালোলাগা-মন্দলাগা, তালগোল পাকিয়ে যায় মানিকবাবুর। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে, মানিক বাবুর কাশির দমক বাড়তে থাকে। তারই মাঝে অস্ফুট কান্না ভেজা স্বর, গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে, ‘তুই আমার কথা রাখলি না?’ বিপিন বলে, ‘রাখলাম তো, এই কাজটা না পেলে কি করে পরীক্ষা দিতাম?’ আশ্বস্ত মানিক বলে, ‘তোর হাতে জাদু আছে।’
পরীক্ষার পরে তিন মাস মন্টু রসেবশে থাকে, রঙিন বিশ্বাসের ফোলানো ফানুস উড়তে থাকে মন আকাশে। আজ ঔঁধ, কাল হুক্কাবার পরশু মোকামী। সঙ্গে কখনো মধুমিতা, মধুরিমা অথবা মৌমিতা। প্রতিটি শিশুর বড় বেলা, আদতে শৈশবের লালন পদ্ধতির বিকশিত রূপ। শৈশবে মা, শিখিয়েছে সব ভালো ছিনিয়ে নেওয়ার নাম জীবন। একই সঙ্গে অনেকের সাথে ডেটিং করার মধ্যে কোন অন্যায় খুঁজে পায়না মন্টু। একটা সময় পর্যন্ত লাটাই ছিল মায়ের হাতে, এখন আর কিছুই করার নেই।মাঝে মধ্যে শুধু মন্টুকে কুরে কুরে খায়,বিপিনের কাছে হেরে যাওয়ার পুরানো ক্ষত। একটু রেডবুল খেয়ে নেয় তখন।
মনের এলোমেলো গলি ধরে ছুটতে থাকে, ভাবনার স্রোত,শালা পারবে কোনদিন হুক্কা বারে আসতে। মধুমিতার মত ডবগা মাগী জুটবে কপালে?দুনিয়া মেরি জেব মে।
হায়ার সেকেন্ডারি রেজাল্ট বের হয়। আবার 90% নম্বর জোটে মন্টুর কপালে, বিপিন সেখানে
একটু পিছিয়ে পড়ে। মন্টু বিপিনের সাথে দেখা হলে বলে, 'কিরে, তোর রেজাল্ট এতোটা খারাপ হল?' বিপিন খুব সাধারণভাবে বলে,'হ্যাঁ, বাংলা,ইংরেজি ডোবালো।' 'অংকে কত পেলি?' মন্টুর এই প্রশ্নে বিপিন অপরাধী সুলভ আচরণে, মাথা নিচু করে বলে, ' একশো।’ জ্বলে যায় মন্টু, চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরাতে থাকে, 'দেখা হবে জয়েন্ট পরীক্ষার দৌড়ে', বলে হন্তদন্ত সে চলে যায়। এ নিয়ে বিপিনের তেমন ভাবার সময় নেই, বাবা হাসপাতালে দুবেলা ছোটাছুটি চলছে। অর্ক দা প্রায় অফিস ফেরত আসে হাসপাতালে, এই কদিনে বিপিনের পরিবার, কেমন নিজের হয়ে গেছে ওদের কাছে। এমন ই একদিন বিপিন অর্ককে শুধায়,' ডাক্তারবাবু সঙ্গে কথা বলার সময় তো আপনি ছিলেন, কিছু বুঝলেন?' সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার খুবই দক্ষ, বেশি কথা বলার সময় নেই তার। যতটুকু বুঝেছিল অর্ক,এই রোগের নাম কার্ডিওমায়োপ্যাথি, যার কোনো চিকিৎসা নেই, হার্ট ট্রানস্প্লান্ট ছাড়া। কিছু তো বলতেই হবে বিপিনকে। একটু দম নিয়ে, শ্বাসবায়ু নিঃসরণের ফাঁকে আলতো করে সে বলে, ' বিপিন, সামনে তাকাও।' বিপিন অর্কদার চোখে চোখ রেখেই বুঝতে পারে, বাবার জীবন প্রদীপ নিভু নিভু।
রাত তখন শৈশব থেকে কৈশোর এর পথে।একটা আরশোলা, কিভাবে মানিকবাবুর বিছানায় উঠে শরীর বেয়ে ঘুরতে থাকে। মানিকবাবুর আরশোলায় খুব ঘেন্না, দুর্বল হাত দিয়ে তিনি প্রাণপনে বিছানা থেকে পোকাটিকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করতে থাকেন। জায়গায় হাত পৌঁছায় না, উঠে বসে পড়েন মানিকবাবু। তেলাপোকা ততোক্ষণে চাদরের ভিতরে স্থান নিয়েছে।হাঁটু গেড়ে বসে চাদর ঝাড়তে চেষ্টা করে মানিক। দমে টান ধরে। হঠাৎই দমকা কাশির বেগে হাঁপানি বেড়ে যায় শত গুণ। কোন রকমের কাশতে, কাশতে চিৎকার করে নার্স দিদি কে ডাক দিতে চেষ্টা করে মানিক। রোগীর অবস্থা দেখে,দিদি ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনেন। কার্ডিয়াক মনিটর বেসামাল রিডিং দিতে থাকে।ওয়ার্ডময় ডাক্তারবাবু চিৎকার অনুরণিত হতে থাকে,' ইলেকট্রিক শক, হাই এনার্জি শক...।’ শক থেরাপি লাগু হয়, চমকে চমকে ওঠে মানিকবাবুর শরীর। ইলেকট্রিক শকের ধাক্কায় সাময়িক চলতে থাকে হৃদযন্ত্র।কিছুক্ষণ পর আবার নিস্তেজ হয়ে আসে শরীর।দূরাভাষ এ বিপিনের কাছে খবর পৌঁছায়,অসহায় বিপিন অর্কদার বাড়ি যায়। আজ বাতাসী একা, অর্ক অসুস্থ বাবাকে দেখতে গেছে। শুনে হতাশ হয় বিপিন। বাতাসী বলে,'ঘাবড়াচ্ছো কেন, আমি আছি তো।' খুব তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে নিয়ে, পাশের বাড়ির পড়শীকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বাতাসী বলে,'গাড়ি বার করো।' যখন ওরা হাসপাতালে পৌঁছায় তখনও মানিকবাবু যুঝে যাচ্ছে।'বিপিন কাঁচের জানলা দিয়ে বাবার শরীরে, শকের চমক প্রত্যক্ষ করে দুইহাতে মুখ ঢাকে। বাতাসী ওকে সরিয়ে নিয়ে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে হাজির হয়। সে কান্নাভেজা বিপিনের মুখমন্ডল দুহাতে ধারণ করে মাতৃস্নেহে। বিপিন কখনো, মা ছাড়া কোনো নারীর স্পর্শ,শরীরে অনুভব করেনি কোনদিন। তার কান্নাধারার দোলা থামতে না পেরে বন্যার আকার নেয়। শরীরটাও কেমন যেন এলোমেলো, বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ক্ষণিকের উত্তেজনায় আঁকড়ে ধরে বাতাসীদিকে। সেই মুহূর্তে হাসপাতালে মাইকে ঘোষণা হয় 'পাঁচ নম্বরের বাড়ির লোকজন এক্ষুণি দেখা করুন। আই.সি.সি.ইউতে।' ছিটকে সরে যায় বিপিন, হন্তদন্ত ছুটতে থাকে আই.সি.সি.ইউ এর দিকে। রাতের আকাশে তখন
আলো ধরেনি, বিপিন জানতে পারে তার বাবার মৃত্যুর খবর।
তারিখটা ছিলো 18 ই মে,বন্ধুরা সাইবার কাফেতে ইন্টারনেট ঘাঁটছে জয়েন্ট এর রেজাল্ট বেরিয়েছে। বিপিন শ্মশানের পথে হাঁটছে,।অবিরাম অশ্রুধারায় পথঘাট সব ঝাপসা, শুধু বলো হরি ধ্বনি কানে আসছে,সাদা চাদরে মোড়া ফুল ঢাকা শবদেহের অফ ফোকাস ছবি চোখে। হঠাৎ শব যাত্রীদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শোনা যায়, বাতাসী ফোন করে অর্ক কে জানাচ্ছে বিপিনের ইঞ্জিনিয়ারিং এর র্যাঙ্ক ৯৭৫। বাতাসী বিপিনের বাড়িতে শান্তনা কে শান্তনা দেওয়ার ফাঁক,ফাঁকে ফোন করছিলো কাফেতে। হঠাৎ করে একটা ফোন এসে বাতাসীর শরীরী ভাষা পাল্টে দেয়। অবাক শান্তনা কান্না গিলে নিয়ে, গভীর প্রত্যশায় তাকিয়ে থাকে বাতাসীর দিকে।কী জানি কী আশা তার ! বাতাসী শান্তনার অবাক দৃষ্টির উত্তর দেয়,বলে,'বিপিন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পেয়েছে।’ আশাহত স্ত্রী কঁকিয়ে উঠে বলে, 'কি হবে গো, ও তো নেই কার জন্য লেখাপড়া?' কি অদ্ভুত বিপিন যখন গুঞ্জন থেকে গুন্জরিত বাক্যবন্ধ শুনতে পায়,মায়ের কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায় ওর কান্নায়।
মন্টু বিপিনের বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও এদিকে মাড়ায় না, কারণ ও আবার পরাজিত হয়েছে। ও ৪৭১০ ,চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মান রাখতে পারেনি, ব্যাক গিয়ার দিয়েছে। বাতাসী আর অর্ক বিপিনকে লোন নিয়ে পড়ার কথা বললে বিপিন শুধায়, 'সংসার, তার কি হবে?' কোন উত্তর আসে না চট করে ওদের মুখ থেকে। বিপিন বলে,'গরিব লোকের আবার লেখাপড়া।' বাতাসী নিজেকে অতিক্রম করা আবেগ নিয়ে বলে 'আমি যদি চালাই।' মন কোন ব্যাকরণ মানে না, বিপিনের মনে কি করে যেন উদয় হয় হাসপাতালে রাত্রির কথা। নিজের শারীরীক উত্তেজনার উপস্থিতির কথা ভেবে ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করে তার ।সে ভাবে দিদি কি কিছু বুঝতে পেরেছিল? হঠাৎই দিদির পায়ের কাছে বসে পড়ে বিপিন, বলে, ' আপনারা অনেক করেছেন, বাকি লড়াই আমার।আমি প্রমাণ করতে পেরেছি আমি পারি, ভবিষ্যতেও পারবো।অর্কর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘গল্পের মাইকেল ফ্যারাডে কে মনে রাখবো, আমায় অন্ধকারে পথ দেখাবে।’
দুই
অভয়বীণা ও বাণী
তখন বড়বৈনান এক ছোট্ট রূপকথার গাঁ। বর্ধমান থেকে বাসে অঞ্চল অফিস, তারপর হন্টন। প্রায় দেড় ঘন্টার এই পথ কোথাও মোরাম মাড়িয়ে কোথাও বা আল ধরে হেঁটে চলা। নিত্যযাত্রীদের কেউ কেউ সাইকেল হাঁকিয়ে যায়। যাদের সে সম্বল টূকু নেই, দিনগত স্রমের পর হেঁটে চলা তাদের কাছে বাধ্যতা। এই গ্রামে জন্ম অভয়ের। প্রকৃতি প্রেমিক অভয় ইচ্ছে চলায় ভাসে। এই পথ তার কাছে প্রকৃতির সাথে আত্মীয়তার অচিনসূত্র। কখনো কখনো সে সপ্তাহ শেষে উল্টো রাস্তায় বাড়ি ফিরত। সেও আর এক রূপকথা ,জৌগ্রাম নেমে দামোদর মুন্ডেশ্বরী পেরিয়ে। বালির চরে কাশফুল জেগে থাকে আদিগন্ত। শরৎকালীন এই প্রাপ্তি অভয় কে বিভোর করে দিত। কিন্তু পড়ার চাপ রোজকার সময়কে বেঁধে নিয়েছিল। বিঘ্নিত হয়েছিল ওর আপন-মনে চলার আনন্দ। লেখাপড়ার জন্য অভয় কে শহরের কাছে আধা গ্রামে বাড়ি ভাড়া নিতে হয়েছিল। সপাক রান্না করে খেতে হতো তাকে। রীতিমতো লড়াই করে বড় হওয়া।
বাবা সজ্জন মানুষ জাতীয় কংগ্রেস করতেন। তখন কিন্তু হাওয়ায় বামপন্থা। কলেজে পা দিয়ে ভেসে গিয়েছিল অভয়। কিছু তরুণ টগবগে অধ্যাপক কলেজের বাতাবরণ একদম পাল্টে দিয়েছিল। বাবার রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনার জাল ছিঁড়ে ফেলতে দেরি লাগে নি দিলুর। দিলু অভয় এর ডাকনাম। ইচ্ছে ছিল অনেক কিছু কিন্তু পরিবারের সম্বল ছিলনা। ছোট বেলা থেকে স্কুলের এক মাস্টারমশায় ওকে ওর প্রতিভার কারনে স্বপ্ন দেখাতেন। তাঁর প্রেরনায় কিশোর মনে ঝরত কতই না রঙের খেলা। বিএসসি, এমএসসি, তারপর পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি কতই না আশার ফুলঝুরি। বাবা যে নিমরাজি ছিলেন তা নয়। বাবা চেয়েছিলেন দিলুর শিক্ষাক্ষেত্রে মেধাবী অগ্রগতি। পরিবারের যোগান আসতো কয়েক বিঘা জমি থেকে। দিলু লেখাপড়ার খরচের একটা বড় অংশ জোগাড় করত টিউশন পড়িয়ে। টিউশন বলতে মাস মাহিনা পঞ্চাশ পয়সা,যারা সে পয়সা দিতে পারতো না তাদের জন্য ধার্য ছিলনা কিছুই, যে যেমন পারতো আলু,কুমড়ো যোগান দিত। দিলুর চলে যেত, বাজার করতে হতোনা। উচ্চশিক্ষার পয়সার যোগান দেওয়া দিলুর বাবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। বিপরীতে সংসারের প্রয়োজন অর্থের যার অভাবে দিন গুটিগুটি পায়ে হাঁটছিল। তাই দিলুর জোরাজুরিতেই বাবা শেষমেষ হ্যাঁ বলে দেয়। স্কুল মাস্টার হওয়া অর্থাৎ শিক্ষকতা কে পেশা করার চেষ্টায় লেগে পড়ে দিলু। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ওকে চাকরির পরীক্ষা দিতে হতো। যাতায়াত খরচাও যথেষ্ট ছিল। কোনরকমে টেনেটুনে জোগাড় হতো সেই পয়সা। যদিও খুব বেশি দিন দিলু কে অপেক্ষা করতে হয় না। এক দগ্ধ দুপুরে ডাকপিওন এসে সরকারি চিরকুট ফেলে যায়। খাম খুলে অভয় জানতে পারে সে দুর্গাপুরের একটি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছে। যখন লম্ফঝম্ফ ইন্টার্ভিউ চলছিল মায়ের কাছে চাকরি ছিল অলীক ঘটনা। মা ছেলের ইচ্ছায় মদত দিয়েছিল তখন। এখন যখন দোর পেরিয়ে, অলীক ,বাস্তবতার রূপ পেল, ছেলের দূরে থাকার কষ্ট মেনে নিতে পারেনা মায়ের মন। দিলু বোঝাতে থাকে আমি বর্ধমানে পড়াশোনার সময় সপ্তাহে একবার বাড়ি আসতাম তার অন্যথা হবে না কোনদিন। দিলুর বাবা গিন্নির কষ্ট টের পেয়ে বলেন তুমি চিন্তা করো না আমার এক বন্ধু থাকে বর্ধমানের পালসিট গ্রামে,আমি ওখানে ঠিক দিলুর থাকার বন্দোবস্ত করে ফেলব। বাড়ির ছেলের মতই থাকতে পারবে দিলু সেখানে। মা নিশ্চিন্ত হন ছেলের অদেখা ভালো থাকার কল্পনায়। শুরু হয়ে যায় দিলুর নতুন জীবন।
প্রথমে একটু বাঁধো বাঁধো ঠেক ছিল দিলুর। দিলু মানে চিন্তাহরণ যার দিল আছে পরিস্থিতিকে নিজের কব্জায় আনতেবসে পারদর্শী। পরিবেশের তফাৎ বলতে শুধু মানুষ গুলো পরিচিতিতে ভিন্ন। কিন্তু মানসিকতায় অনেক মিল। বর্ধমানের এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম এর বেশি কিছু নয়। বড়বৈনান এর মত নিষ্কলুষ প্রকৃতির ছোঁয়া হয়তো এই গ্রামে নেই,কিন্তু সৌন্দর্যে অনাবিল এই গ্রাম। সেই জন্য খুব তাড়াতাড়ি দিলূ আপন করে নিতে পেরেছিল নতুন পরিবেশ। বাড়ির কর্তা কে মেসোমশাই আর গিন্নিকে রায়মা বলে ডাকতে শুরু করে দিলু। রায়মা আর বাড়ির কর্তা নিরব রায় উভয়েই ভালোবেসে ফেলে দিলু কে। দিলুর আগমনে রায় পরিবারের একটা সুবিধাও হয়েছিল। দিলু পড়াশোনায় ভালো হওয়ার কারণে পরিবারের দুইমেয়ের বিজ্ঞান শিক্ষার দায়িত্ব দিলুকে সমর্পণ করে বর্তে যায় ওরা। মেয়েদের মধ্যে বাণী বড় বীণা ছোট। বাণী সুন্দরী ,গৌরবর্ণা, বীণা শ্যাম বর্ণা মিতভাষী। বীণা কে অসুন্দর বলা যাবে না কারণ মানুষের সৌন্দর্য তার স্বভাবে, সম্পূর্ণতায়। বীণা কম কথা বলে, নিজেকে আড়াল করে রাখতে চায়। দিদির সৌন্দর্যর গুমরে আলোর ছায়া হয়ে থাকতে চায় সে। বাণী টিউশন পড়ার সময়, দিলুর মধ্যে থাকা সরল মানুষটাকে অবজ্ঞা করত,পড়ায় মন দিত না। দিলু অবসর সময়ে গ্রামের ছেলে ছোকড়াদের সঙ্গে হাডুডু খেলত। বাড়ির ছাদ থেকে বীণা অবাক বিহ্বলতায় দেখতো দিলুদার খেলা। চাষির ঘরে জন্মানোর সূত্রে ছোটবেলা থেকে লাঙ্গল, কোদাল চালানো দিলুর অভ্যাস। বলিষ্ঠ দু হাতের পেশী এবং কৌশলে অনায়াস দক্ষতায় হাডুডু মাঠে আক্রমণকারীকে ধরে ফেলত দিলু। বীণা বাড়ির ছাদ থেকে বাজিকর দিলুদার খেলায় আনন্দ নিত অথচ সবার মাঝে কিচ্ছুটি প্রকাশ করতোনা। বাণী অশিক্ষিত চাষার ছেলেদের সাথে খেলা একদম পছন্দ করতোনা। বীণা, বাণীর প্রকাশ্য সমালোচনায় রা কাড়তো না। রায় বাড়িতে বেশির ভাগ সময়ই মানুষজন আসতো। আড্ডা গল্পে জমজমাট ছিল রায় বাড়ি। বাণীর জন্য, ধনেমানে সম উচ্চতায় আসীন মানুষজন বিবাহের প্রস্তাব আনতেন। অনেকেই পরিবারে বাণীকে বউ করে আনাতে চায়। বাণীর ছোট্ট পৃথিবী,কুয়াশার আবরণে ঢেকে রেখেছিল ওর রূপ। এমন কি স্কুল মাস্টার, অফিস ক্লারক সবাই ছিল ওর রূপের পূজারী। গরবে মাটিতে পা পড়তো না বাণীর। দিলুও প্রথম দেখায় মুগ্ধ ছিল। একদিন পড়তে পড়তে বীণা জল খাবার আনতে গেছে, সেই ফুরসতে বাণী জিজ্ঞেস করে ‘ দিলু দা আমায় কেমন দেখতে? আপনি আমার মত সুন্দরী আগে দেখেছেন?’ দিলু ধাক্কা খায়,ভাবে আচ্ছা অহংকারী তো মেয়েটা। এতো তার অর্জিত ধনরত্ন নয়,বাবা-মার কাছে পাওয়া,উত্তরাধিকার সূত্রে। বাণী বুঝতে পারে না দিলুর গুম মেরে যাওয়ার কারণ।আবারো বলে সে, ‘ কি মশাই দেখেননি তো ?’ দিল ভেবেছিল বাণীকে কোনো আঘাত দেবেনা। কিন্তু বাণী নাছোড়, উত্তর না দিলে মৌনতায় সম্মতি পাবে। তাই বাধ্য হয়ে দিলু বলে ‘তুমি যদি ভালো গান করো বা ছবি আঁকো তা তোমার,যদি লেখাপড়ায় বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করো তাও একান্তই তোমার আপন। কিন্তু পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনায় আমার বিশ্বাস নেই। বাণী এমন দৃষ্টি হানে যার মানে ,মুখে তুমি যাই বলো বাবা, তুমি ফেঁসেছ।’ এই আলাপচারিতা বীণা শুনতে পায় দরজার আড়াল থেকে। বীণা বুঝতে পারে দিদি ভালোবাসার পড়েছে। ফোয়ারার ধারার মতো দিলুদার সমালোচনা আদতে দিদির ভাললাগা। বীণা জানতো দিদির সহজে কাউকে মনে ধরে না। কিন্তু মুখ ফুটে যখন দিলু দা কে জিজ্ঞেস করেছে নিজের সৌন্দর্যের খবর , দিলুদার কাছে ধরা না পড়লেও এই আর্তি বোঝা যায়। বীণা অবশ্য মুখে কিছু প্রকাশ করে না। বীণা দিদিকে চেনে। একবার দিদি যদি জানতে পারে যে সে বোনের কাছে ধরা পড়ে গেছে বীণার দফারফা হবে। যথারীতি বীণা পড়ায় মন দেয়। খিঁচরে গেছে দিলুর মানসিক জগতের অবস্থান। আজ আর তেমন জমে না দিলুর পাঠশালা। বীণা বলে, 'আজ থাক, আমরা বরং স্কুলের কাজ করি'। বাণী কিন্তু দিলুর উষ্মার কথা ধরতে ব্যর্থ হয়। কারণ আজ পর্যন্ত ওর দেখা দুনিয়ায় এমন কেউ নেই যে ওকে অবজ্ঞা করতে পারে। দিলুকে ও মনে মনে ভালোবেসে ফেলেছে কিন্তু হৃদয়ের চাওয়া আজন্ম লালিত ঔদ্ধত্যের কাছে হার মানে। ও চায় দিলুর সমর্পণ, সবাই যেমন। ভালোবাসার মানুষকে ভিখিরি বানাতে বাণী কুণ্ঠাবোধ করে না,এমনই জেদি সে। একদিন প্রসঙ্গক্রমে বাণী জিজ্ঞেস করে ‘দিলু দা আপনার জীবনের আকাঙ্ক্ষা কী, কিভাবে বাঁচতে চান আপনি?’ দিলুর উত্তর আসে ‘ আগে তুমি বলো’, বাণী বলে, ‘সুচিত্রা সেনের মত’। মাঝেমধ্যে মায়ের সাথে টকিতে সিনেমা দেখতে যেত দুই বোন৷ । সাড়ে চুয়াত্তর ওর ফেভারিট সিনেমা জানতে পেরে দিলু বলে ‘ তাহলে তো রামপ্রিতির খোঁজ করতে হবে’। আমার কথা যদি বলো আমি প্রকৃত আদর্শবাদী একজন শিক্ষক হতে চাই। যে প্রাণ ঢেলে শেখাতে পারবে ছাত্র-ছাত্রীদের’। নিজেকে সামলে বাণী বলে ,'না মানে..আমি । কথা শেষ করতে না দিয়ে দিলু বীণার দিকে চেয়ে বলে ‘তোমার জীবন সম্পর্কে কি ধারণা?’ বীণা কথা কম বলে সে মাথা নিচু করে জানায় ‘আমার আদর্শ সুফিয়া কামাল’। অবাক হয়ে দিলু জিজ্ঞেস করে ‘ তুমি ওর নাম শুনেছ’? বীণা বলে, ‘লাইব্রেরীতে পাওয়া এক অজ্ঞাতনামা প্রাবন্ধিকের লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছিল বড় হয়ে স্ত্রী শিক্ষায় নিজেকে নিয়োগ করব’। বাণী ফস করে বলে ফেলে ‘তোর তো বিয়ে থা হবে না তোকে ওই সবই করতে হবে। সৌন্দর্যের আড়ালে বাণীর কদর্য রূপ দিলুর চোখে ধরা পড়ে যায়۔ যদিও বাণীর সৌন্দর্যের প্রতি ওর ভালোলাগার নেশা রসদ মুহূর্তে মুছে ফেলা অভয়ের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
রায়মা বীণার হাতে দিলুর দেখভালের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিল। হয়তো এ ছিল মায়ের বাসনা, বাণীকে তো যে কেউ সেধে ঘরে নিয়ে যাবে। বীণার গতি যদি এমন ছেলের হাতে হয় তাহলে রুপের খোঁটা জীবনভোর হয়ত সইতে হবে না। খুব যত্ন নিয়ে বীণা এই কাজ করত। সকালের জলখাবার, টিফিন ,বিকেলের জলখাবার সবই ছিল বীণার দায়িত্বে। স্কুলে যাবার আগে দিলু স্নানঘর থেকে ফিরে এসে আজকের শ্রেণীকক্ষে কি আলোচনা হবে তার রূপরেখায় চোখ বোলাত। দুর্গাপুর থেকে ট্রেনে ফেরার পথে আগামী ক্লাসের বিষয়বস্তু ঠিক করতো এই ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। সকালে খাবার আগে দিলু যখন স্নানে যেত বীণা সেই ফাঁকে আসন পেতে রাখত। স্নান সেরে দিলু মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হলে বীণা গলা খাঁকারি দিয়ে জানান দিত,খাবার প্রস্তুত। বাক্যবিনিময় ছাড়াই দিলু আসন গ্রহণ করত। হয়তো দিলু ওই সময়টায় কাজের ভান করত,অপেক্ষা করত বীণার সুরেলা গলায় আহবানের। রোজকার অভ্যাসে আসনে বসে দিলু বলতো ‘তুমি এখানে বস,আরে এত ভাত দিয়েছো ,আমি কি খেতে পারি?’ বীণা সোঁ করে উঠে গিয়ে দরজার আড়ালে চলে যেত,লুকিয়ে দেখত দিলুর খাওয়া। দিলু ইচ্ছে করে মাঝেমধ্যে স্বগতোক্তি করত ইস আজ প্যাঁকাল মাছের টক টা ভালো হয়নি। রান্না করতেন রায়মা কিন্তু মাছের টক আর ঝাল বীণার হাতেই তৈরি হয় এ বাড়িতে। বীণার হাতের প্যাঁকাল মাছের টকের সুখ্যাতি পাড়াতেও আছে। বীণা আড়াল সরিয়ে বেরিয়ে এসে বলতো,‘ ইস খারাপ হয়েছে আপনাকে আজ খেতে হবে না।’ দিলু বলতো ‘খাবার কি ফেলে দেওয়া যায় খারাপ হলে। কিন্তু আড়াল থেকে লুকিয়ে দেখা এ স্বভাব ভালো নয়।’ বীণা লজ্জা পেয়ে যেত। একদিন দিলু সরাসরি জানায় খাবার সময় বীণা সামনে বসে থাকলে তার ভাল লাগবে। আরো জানায় সুফিয়া কামালের মতো মননে আধুনিক হতে হবে। বীণা পাত পেড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত দিলু অপেক্ষা করতো। থালা বাসন নিয়ে বীণা যখন উঠবে তখন ছোট্ট একটা দৃষ্টি বিনিময় হতো। ধীরে ধীরে মেয়েটার চোখ দুটো কালো হরিণ পানা লাগতে শুরু করলো দিলুর। এই ভাবে বেশ কিছু বছর ঘুরে যায়। বীণা, প্রিইউনিভার্সিটি পাস দিয়ে বাংলায় অনার্স নিয়ে বিএ পাস করেছে। চেষ্টা করে প্রাইমারি স্কুলে চাকরিও জুটিয়ে ফেলে বীণা। বাণীর লেখাপড়া বিশেষ এগোয়নি। বেশ কয়েকবার,বাপমার ইচ্ছায় পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ মাড়াতে না পেরে ক্ষান্ত হয়ে, এখন দিলু বধই তার একমাত্র ব্রত। লেখাপড়ায় ইতি টেনে সুযোগের অপেক্ষায় দিনগোনে বাণী। দিলু কে দেখলেই ও বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে ওর আকুতির কথা বোঝাতে চেষ্টা করে। হয়তো কোথাও ওর ভয় করে দিলুর নীতিবোধ কে,আবার বীণাকেও ও নেহাত হিসাবের বাইরে রাখতে পারেনা। কারণ মা যে দায়িত্ব বীণার ওপর দিয়েছে তাতে ওদের সখ্যতার যথেষ্ট সুযোগ আছে। কিন্তু নিচু হয়ে বাণী দায়িত্ত্ব নিতে পারে না। এরই মধ্যে একদিন বাণী খাওয়া শেষ হওয়ার মুখে ঢুকে পড়ে। বীণা অভ্যাসমতো থালা বাসন নিয়ে ওঠার মুখে, তার আনত চোখের অসীম চাওয়াকে অনুসরণ করছে দিলুর চোখের ভাষা। এই দৃশ্য দেখে ফেলে বাণী ছুটে চলে যায়। নাহ্ আর দেরী করা যায়না একটা হেস্তনেস্ত হওয়া চাই আজই,এক্ষুনি।
আজ শনিবার স্কুল থেকে ফিরে টিফিন সেরে বাবা-মার কাছে বড়বৈনান যাবে দিলু। বাড়ির বাইরে আমবাগানে অপেক্ষা করছে বাণী। বাগানের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা পথ ধরে দিলু আসবে স্কুল ফেরত। এক বিশাল মহীরুহ ফল ভারে নত হয়ে ঝুঁকে পড়েছে মাটিতে। অন্ধকার জমে আছে গাছের শরীরে যেখানে আলোর প্রবেশ নিষেধ। এমনই নিষিদ্ধ বাতাবরণ জরুরি ছিল বাণীর উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্য। দূরে দিলু কে আসতে দেখা যায়। চলনে মনে হয় আজ দিলুর তাড়া আছে। দূর নিকট হতে সময় লাগে না। দিলু ঘন অন্ধকারে কারো উপস্থিতি টের পায়নি। কাছে এসে পড়তেই সময় বুঝে বাণী হ্যাঁচকা টানে দিলু কে নিজের দিকে টেনে নেয়। আচমকা টানে দিলু বেসামাল হয়ে যায়। সম্বিৎ ফিরতেই দিলু দেখে বাণী সেজেগুজে ভরদুপুরে গাছতলায় দাঁড়িয়ে। বাণী বলে ‘দিলু দা কবে আমায় বিয়ে করবে, বুড়ি হয়ে গেলে?’ এত গভীর বিশ্বাস নিয়ে বাণী কথাগুলো বলছিল যেন বিয়েটা শুধু দিনক্ষণ ঘোষণার অপেক্ষায় আছে। চমকে ওঠা দিলুর মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত বেরিয়ে আসে, ‘আমি বীণা কে ভালবাসি?’ বজ্রপাতের আকস্মিকতায় নেমে আসে ভালোবাসি শব্দটা। বিদ্যুৎপৃষ্ট বাণীর গৌরবর্ণ মুখমন্ডল নিমেষে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। বাণী দুহাতে কলার চেপে দিলু কে নিজের বুকের ওপর টেনে আনে।ভাবটা এমন নিজের শরীরী অনুভব দিয়ে মুছে দেবে দিলুর ভালোবাসা। আলোর অভাবে স্যাঁতসেতে ঘাসজমি পিচ্ছিল হয়েছিল। বাণীর হ্যাঁচকা টান এবং দিলুর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় দুজনে দু দিকে ছিটকে পড়েছিল। খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে দিলু দাঁড়িয়ে পড়ে। বাণী তখনো মাটিতে পড়ে আছে। নিচু হয়ে তাকিয়ে দিলু বলে ‘ভালোবাসা শত যুদ্ধেও জেতা যায় না,প্রতিদিন সোয়েটারের মতো বুনতে হয়। আবারো বলছি ‘যা কিছু পড়ে পাওয়া তা সুন্দর নয়, সৌন্দর্য আহরণ করতে হয় , সেটাই সম্পূর্ণতা'। সময় নষ্ট না করে দিলু হাঁটা দেয় বাড়ির দিকে। ঘরে পৌছেই গোছাতে থাকে জিনিসপত্র প্রত্যেক সপ্তাহের মত। কিন্তু রায়মা দেখেন দিলু প্রথমদিনে আনা বড় ব্যাগটা আলমারি থেকে নামাচ্ছে। বুঝতে না পেরে তিনি জিজ্ঞেস করেন বাড়ি যাবে তো কিছু মুখে দাও আগে ,ওই ব্যাগ নামাবার কি প্রয়োজন'? দিলু বলে ' আমি আপাতত বাড়ি যাচ্ছি আর ফিরছি না'। ঘাবড়ে গিয়ে রায়মা জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন বাবা?’ দিলু বুঝিয়ে দেয় কথায়, সে নতুন বাসা ভাড়া নেবে, যেখান থেকে স্কুলে যাতায়াত করবে কিছুদিন। দিলু যে বীণা কে বিবাহ করতে আগ্রহী তা আড়াল করে না মায়ের কাছে। রায়মার আহত দৃষ্টি নিমেষে বদলে যায়। দিলু বলে ‘আমি বিবাহ সম্পন্ন করে নতুন বাড়িতে বীণা কে তুলবো, আপনারা প্রস্তুত হন। এক্ষুনি কেন এই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে তা পরে জানাবো’। রায়মা রমণীর বীক্ষণে কিছু আন্দাজ করতে পেরে কথা বাড়ায় না। চির অপরাজিতা বাণীর পরাজয়ের ভাঙাচোরা মুখ রায়মা কল্পনার চোখে দেখেন। বড় কষ্ট হয়, মন কেঁদে ওঠে, আবার আনন্দাশ্রু ধরে রাখতেও পারেন না। বীণার মতো রত্ন সঠিক মানুষের কাছে গচ্ছিত হবে এমন আশ্বাসে মায়ের মন ভরে ওঠে। দিলু চলে যায় রায় বাড়ি ছেড়ে। ঠিক পরের রোববার দিলুর বাবা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে রায় বাড়িতে। দিলুর বাবা-মা বাণীকে পাত্রী হিসেবে পছন্দ করেছিল কিন্তু দিলুর সিদ্ধান্তে টোল ফেলতে পারা যায় নি।
……............................
তিন
হাফ প্যান্ট বুবু
ছোট্ট মাটির গলিপথ,রাস্তার মুখ থেকে এঁকেবেঁকে পাড়ার দিকে চলে গেছে। বুবু সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে গুলি খেলছে দুপুর রোদ্দুর আড়াল করা এক চিলতে ছায়ায়। একটু আগে পাশের বাড়ির ছোট্টো ভায়ের জন্মদিনের খাওয়া দাওয়া প্রায় সাঙ্গ হওয়ার মুখে। অর্ডারি পান আনতে গিয়েছিল বুবু, পল্টন বাজার থেকে। হঠাৎ লেফট রাইট ছন্দে কয়েক পল্টন সি.আর.পি.এফ কে বুবু মার্চ পাস্ট করে আসতে দেখে। পান হাতে এক ছুট লাগিয়ে সে সোজা আমবাগানের দিকে যায় যেখানে দিলিপদা, তুলসিদা গাছ তলায় গুপ্তধন রাখছে।গুপ্তধন মানে মলটভ কক্টেল। ঘন আমবন, ছোটরাতো নয়ই, বড়রাও যেখানে দিনের বেলায় ঢুকতে সাহস পায়না,সেইখানে।দিলিপ দা বলে ‘সাকরেদ, কোন সমাচার?’ বুবু বলে ‘সি.আর.পি.এফ’। আঙ্গুল দেখিয়ে ওদের মার্চ পাস্টের হদিস দিয়ে সোজা পানের ঠোঙ্গা নিয়ে চলে যায় বুবু নিমন্ত্রন বাড়ি। সেনা আগমণ বার্তায় উপস্থিত মানুষজন চঞ্চল হয়ে ওঠে। নিমন্ত্রিতরা খেয়ে না খেয়ে ঘরে পালানোর উদ্যোগ নেয়। কখন কারফিউ ঘোষণা হবে কেউ জানেনা। বুবু নিশ্চিন্তে গলির মোড়ে পৌঁছে গিয়ে গুলি খেলায় যোগ দেয়। আঁট খেলায় খুবপারদর্শী বুবু। গাই পাচার খেলা চলছে। বুবু বিজয় কে বলে ‘সি.আর.পি.এফ আসছে।’পালপাড়ার গলি ধরে সম্ভবত ওরা আমবাগান যাবে, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাবেনা’। বিজয় বলে ‘তাতে কি?’ ‘তাতে এই যে ওদের সময় বেশি লাগবে’। অলস দুপুরের ছায়া ঘেরা রাস্তায় রোজ গুলি খেলার আসর বসে,পরপর তিন চারটে দল, আজও যেমন। বুবু সবার সাথে নিমেষে আলোচনা সেরে নেয়,সেনাদল কে দেরি করিয়ে দিতে হবে রাস্তা আটকে। পঞ্চুর বাবা ঝুট ঝামেলা পছন্দ করে না বলে ও চিরকাল একটূ সরে থাকে। পঞ্চু রাজি হয় না সাথে থাকতে। বিজয় ওকে ‘গদ্দার’ডাকে।পঞ্চু মুখ কাচুমাচু করে নিজের ভাগের গুলি নিয়ে বাড়ি চলে যায়। গদ্দার শব্দটা বিজয় বুবুর কাছ থেকে শিখেছে, বুবু শুনেছে বাড়িতে মিটিং চলাকালীন কেউ অনুপস্থিত কারও সম্পর্কে এই শব্ধবন্ধ ব্যবহার করে।ওরা অতীতে দেখেছে কোনও রাস্তার মুখে জটলা থাকলে পুলিশ সেই দিকেই ধাওয়া করে। বড় রাস্তার দিক থেকে বুটের আওয়াজ ভেসে আসে।যে যার খেলায় ব্যাস্ত। বুবুর দান আসছে, সে দু হাতে নিশানা করে, চোখের তীক্ষ্ণ নজর বাঁধা মারবেলে। ডাইনে পুকুর ছেড়ে গলির মুখে লেফট রাইট চলার মসৃণ ছন্দ বলে দিচ্ছে পথে কোনও বাঁধা পায়নি জওয়ানরা। সেন ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে সেনাদল গলির মুখে ঢুকে পড়ে। মার্চ পাস্টের রাস্তায় শিশু স্কোয়াডের ব্যারিকেড। সামনে থাকা জওয়ান বলে ওঠে ‘শ্যালও, ক্যা শোর মাচাকে রাখ্যা, তুমলোগো ক্যা ঘর নেহি হ্যায়?’ ভ্রূক্ষেপ না করে আঁট ছেড়ে দেয় বুবু,মারবেল ছিটকে পড়ে গাই তুলে নিয়ে ভাগে। ঠিক সেই মুহূর্তে পাছায় সপাটে পড়ে বুটের লাথি। উবুড় হয়ে পড়ে বুবু হাত,পা ছড়িয়ে। লাগেনি, খুব লাগার অভিনয় করে বুবু। তুলতুল বলে ‘ও পুলিশ কাকা, কাহে মারতা হায়, আমরা গুলি খেলতা হায়’।হেসে ওঠে সেনাবাহিনীর একজন। একটু হলেও মার্চপাস্ট থমকে যায়। বাচ্চারা জানে প্রতিটি মুহুর্ত দিলিপদাদের সময় করে দেবার জন্য কতটা জরুরি। ধীরে মিলিয়ে যায় লেফট রাইট শব্দ। পচা খেলা ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করছিল পাশের পালপাড়ায়। সেখান থেকে ফিরে সে বুবুদেরকে বলে জি.টি. রোডে উঠে গেছে পুলিশ। সেন ইন্ডাস্ট্রি থেকে বেরিয়ে আসে কালিঝুলি মাখা অশোক,বাপি, দুখে। রাম, শিবেন, নবীন আসে অন্য পথ দিয়ে। মুখর হয়ে যায় স্তব্ধ দুপুর নকশাল বাড়ি লাল সেলাম ধ্বনিতে। বুবুর শরীর জুড়ে কাঁপন নেমে আসে,ছোট্ট জীবনে ও হিরো মেনে এসেছে বাবাকে। বাবার জন্য কিছু করতে পেরেছে এই ভেবে ওর বুক গর্বে ফূল ওঠে। বন্ধুদের কারও হিরো রবিন দা, কারও বা তুলসি দা। ঠিক যেন মহাভারত কাব্য। কেউ কর্ণ কেউ অর্জুন।
বুবুর এই এঁচোড়-পাকা বর্তমান কে ধরতে ওর সাম্প্রতীক অতীতে চোখ বোলান দরকার। ছোটো বেলা থেকে বুবু বাপের গায়ে লেপটে থাকতো। বাপ কৃষ্ণ চোখে হারাতো ছেলেকে। শিয়াখেলায় কৃষ্ণ বাবুর দেশ, ফি সপ্তাহে যেতে হয় তাকে। ছোটবেলা থেকে মাতৃহারা কৃষ্ণ মানুষ পিসির কাছে। বিধবা পিসি শিয়াখেলায় থাকতেন। উনিই পরিবারের কর্ত্রী। কৃষ্ণরা পাঁচ ভাই দুই বোন। তিন ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে, তারা থাকে ভিন দেশে, যোগাযোগ প্রায় নেই দেশের সঙ্গে। পিসির ভরণপোষণের জন্য কৃষ্ণ রোজগারের সামান্য কিছু অংশ দিত। বুবু হাঁটিহাঁটি পা শেখার আগে থেকে কৃষ্ণ বাসে চড়ে দেশে যেত, বাসে খুব ভিড় হতো সেই সময়। যানবাহনের অভাবও প্রকট ছিল। তাই বুবুকে নিয়ে যেতে অসুবিধে হত। নতুন পথের সন্ধান পেয়ে ওরা মারটিন রেলে শিয়াখেলা যাওয়া শুরু করে। বুবুর কাছে সে এক রুপকথা,পিসি ঠাকুমার গল্পের মতো। কি সুন্দর সব স্টেশন।মশাট, মাকোরদহ, ডোমজুর, বড়গাছিয়া, হাওয়াখানা,পীয়াশাড়া। প্রতিটি স্টেশন যেন হট্টোমালার দেশ। ট্রেন ছু্টছে দুলকি চালে, পড়শির উঠোন দিয়ে,কখনও ঝমোরঝম কানা-দামদর পেরিয়ে।কোথাও ট্রাক্টর দাঁড়িয়ে ফসলের বোঝা কাঁধে নিয়ে,কোথায় দামাল ছেলে সাইকেল চড়ে স্বঘোষিত প্রতিযোগিতায় নেমেছে স্টীম-ইঞ্জিনের সাথে। বুকে যতক্ষণ বল ততক্ষণ লড়ে যাওয়া। হাওড়া থেকে ওঠায় ওরা সব সময় বসার যায়গা পেত। বুবু ট্রেনের জানালার ধারে বসতে খুব ভালোবাসত। যে দিকে ট্রেনের গতি সেদিকে মুখ করে বসার আনন্দই আলাদা। কৃষ্ণ ঠিক উল্টো দিকে বসতো। ট্রেন ছাড়ার আগে একজন ছিপছিপে লম্বা লোক এসে ওর বাবাকে বেশ কিছু প্যাকেট দিয়ে চলে যেত। প্রথম প্রথম বুবুর নজরে পড়ত না, ও অধীর অপেক্ষায় থাকত কখন হুইসেল বাজবে। নির্দিষ্ট স্টেশন এলে কৃষ্ণ প্যাকেট গূলো স্টেশনে আগন্তুক দের কাছে নামিয়ে দিত। আসতে আসতে অভ্যস্ত হয়ে যায় বুবু বাবার এই কাজের সাথে। স্টেশন আগন্তুকদের কেউ কেউ বন্ধুত্ত্ব পাতিয়ে ফেলে ওর সাথে। স্টেশন এলেই বুবু বাবাকে সাহায্য করার জন্য বলে উঠত ‘ওই যে তমাল কাকু, কাকু ও কাকু”।একদিন বুবু জিজ্ঞেস করে- বাবা তুমি যেমন যার যা দরকার পৌঁছে দাও, আমাদের কিছু দরকার হলে কে পৌঁছে দেবে? কৃষ্ণ বলে- সে তো ডাক পিওনের কাজ, আমি তো হেমন্তের অরন্যের পোষ্টম্যান। অবাক হয়ে উদাত্ত্য গলায় আবৃত্তি শুনতে থাকে বুবু। বাবাকে মাঝে মধ্যেই কবিতায় পেত। কে কোথায় আছে তার ভ্রূক্ষেপ থাকত না কৃষ্ণর। যখন বাবা কবিতা করতেন তখন চুপটি করে শুনত সে, বুঝতনা কিছুই। শুধু ছন্দের মোহে ভালোলাগা তৈরী হত। কবিতা শেষ হলে বুবু জিজ্ঞেস করল –বাবা ডাকপিওন কি? পিওন হল যে বা যারা চিঠি বিলি করে, ডাক অফিস হল গিয়ে যেখানে চিঠি জমা হয়। যার উদ্দেশ্যে চিঠি লেখা হয়েছে, পিওন তার ঘরে পৌঁছে দেয়। তোকে পোষ্ট অফিস দেখিয়ে আনব একদিন।ছেলের মনে উদ্রেক হয় এই প্রশ্ন,সেই কাজ বাবা কেন করে? কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করেনা। ওর স্বভাবের এক বিশেষ দিক হল দেখে বুঝে নেওয়া। বুবু বুঝত নিশ্চয় কারন আছে,হয়ত এই চিঠি সবার হাত দিয়ে দেওয়ার নয়। কৃষ্ণ ওকে খেলায় টেনে আনার চেস্টা করত ঘটনার থেকে চোখ সরানোর জন্য। যাত্রা পথে স্টেশনের নাম মনে রাখানো ছিল তার কৌশলের অঙ্গ। মজার সে খেলায় বুবু মেতে যেত,অদ্ভুত এক পদ্ধতির সাহায্য নিত সে,স্টেশনের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে শব্দবন্ধ সাজাতো,তারপর তাকে ডিকোড করে স্টেশনের নাম বলে দিত বাবাকে। বাবার কৌশল কাজে দিতনা কারন সে এঁচোড়ে পেকেছে,নিসিদ্ধ সবকিছুই তার জানা প্রয়োজন।বাবাকে বুবু ঘাবড়ে দেয় এই বলে এরপর সে স্টেশন কাকুদের নাম মুখস্থ করবে। বুবু শুধু জাঙ্গিপাড়ার তমাল কাকু কে চিনত। তমাল একদিন কৃষ্ণ কে বলে ‘দাদা আমি আজ বুবুকে নিয়ে যাব’। এই আব্দারের কারন জানতে চায় কৃষ্ণ। তমাল চেয়েছিল বুবু বড় হওয়ার পথে গ্রাম কে দেখুক,চিনুক। গ্রাম বাংলাকে না জানলে দেশকে চেনা যায়না।কৃষ্ণ তমালের কথায় আকৃষ্ট হয়ে বুবুকে জিজ্ঞেস করে ‘কিরে কি করবি?’ পাগল তো এক পায়ে খাড়া। সে মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। নেমে পড়ে ট্রেন থেকে বুবু। কৃষ্ণর ফেরার পথে জাঙ্গিপাড়া স্টেশনে তমাল বুবুকে ট্রেনে চড়িয়ে দেবে এমন কথা হয়। তমাল কাকুর হাত ধরে নেমে যায় বদমাইশটা,বাবাকে টাটা করে হাওয়া দেয় ভিড়ের মধ্যে। শিয়াখেলা পৌঁছলে পিসি বলে - গোপাল কই? কৃষ্ণ বলে আজ ওর এক বন্ধু বুবুকে নিয়ে গেছে জাঙ্গিপাড়া দেখাতে,খুব চটে যায় পিসি। বলে, ‘তোদের আর আসতে হাবে না,মাস গেলে মানি অর্ডার করে টাকা পাঠিয়ে দিস, তাহলেই হবে।’
জাঙ্গিপাড়া এই অঞ্চলের এক সমৃদ্ধশালী গ্রাম, অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্য এই গ্রাম কে ঘিরে গড়ে উঠেছে। শহর গ্রামের যোগাযোগের মাধ্যম জাঙ্গিপাড়া। প্রথমে বুবু তমাল কাকুর বাড়ি যায়। তমাল অবিবাহিত,এক বোন,বাবা মা, এই নিয়ে সংসার। মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার। সবার সঙ্গে পরিচয় পর্ব শেষ হলে বুবুও তার স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে সবাই কে আপন করে নেয়। তমাল কাকু বুবুর জন্যে খাবার কিনে আনতে যাবে ঠিক করে। মায়ের অনুমতি নিয়ে তমাল বেরিয়ে পড়ে। এই অঞ্চলের মাখা সন্দেশের খুব কদর বুবুকে খাওয়াতে হবে। বুবু চায় কাকুর সাথে বেরতে, কাকু তখন দৃষ্টির বাইরে। বুবু নতুন ঠাকুমা কে বলে, ‘তমাল কাকুর সঙ্গে আমি যাব।’ কাকুর বোন বলে, ‘কে তমাল কাকু, দাদার নাম তো মিলন।’ বুবু কিছু না বলে চুপ করে যায়। কচি মাথায় এইটুকু সে বুঝে যেতে পারল চিঠি আর ছদ্দ নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে অনেক রহস্যর জট। এরপর বুবু তমালকে শুধুই কাকু বলে ডাকা চালু করে।
মোটরবাইকে শুরু হয় যাত্রা, এঁকেবেঁকে পিচ রাস্তা, খানাখন্দ পেরিয়ে চলা। দুপাশে আদিগন্ত সবুজ জেগে আছে।ডানদিকে নেমে পড়ে কাঁচা রাস্তায় ভটভটী, আর একটু এগিয়ে গিয়ে স্কুলের গেট। কাকা বলে -অপুর নাম শুনেছিস? বুবু জানায় ‘সে আম আঁটির ভেঁপু পড়েছে, বিভুতিভুষনের লেখা।’ কথা শেষ করতে দেয়না মিলন,বলে- ‘এই স্কুলে তিনি পড়াতেন’। বুবু অপুরুপে দিদির হাত ধরে হারিয়ে যায় কোন সে বনে কোন বিজনে। ধাক্কা দিয়ে ওর হারিয়ে যাওয়া মনকে বেঁধে আনে মিলন। আরও অনেক কিছু দেখতে হবে যে। এত সময় দেওয়া যাবেনা। বুবু চড়ে বসে, ভটভট শব্দে আবার এগিয়ে চলা। ত্বরার মোড় ছেড়ে ডানদিক ধরে ওরা। বুবু ত্বরার মোড় নাম শুনে হেঁসে ওঠে, কাকার বাখ্যায় ও বুঝতে পারে পৃথিবী এমন কিছু নেই যা অর্থহীন।এবার ওরা রেনিকাড যায়,যেখানে বাঁধ দিয়ে নির্দিষ্ট খাতে বইয়ে দেওয়া হয়েছে দামোদরের থেকে কেটে নিয়ে আসা খাল। জলসেচের প্রয়োজনে এই খাল ব্যবহৃতহয়।আপস্ট্রিমে জল ধরা থাকে, শুখা মরশুমে জল ছেড়ে দেওয়া হয় চাষের কাজে।বুবু দেখতে পায় ক্যানেলের পাশে পড়ে থাকা রাস্তা সোজা জঙ্গলে গিয়ে শেষ হয়েছে।ছুটতে থাকে সে,একটু বেখেয়ালে ছিল মিলন। যখন নজর পড়ে, বুবু তখন অনেক এগিয়ে গেছে।ছুটতে থাকে পিছুপিছু মিলন।শেষমেশ ধরা পড়ে যায় বুবু, একটু চোখের শাসন করতেই বুবু বলে ‘আমি সাঁতার জানি।’জঙ্গলের বেষ্টনীর আবরনে লুকিয়ে আছে ফিসারিজ যা মিলনের ট্যুর প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বুবুর খামখেয়ালিতে তা দেখা হয়ে যায়। বদ্ধ জলায় কিভাবে মাছ চাষ হয় এবং সেই মাছ কিভাবে বিক্রি করে সমবায়, কিভাবে মেম্বার দের মধ্যে লভ্যাংশ সমবন্টন হয় তা জানতে পারে বুবু। জায়গাটা ভীষণই সুন্দর,এত কথা বুবুর ভাল লাগেনা সব সময়, ও এখানেও দুর্গা কে দেখতে পায়।কিন্তু ও করবে কি, এখন শরতকাল নয়। তাই মনেমনে কাশ বন খুজে নেয়। বাঁদিকে আঁটপূর স্কুল ছেড়ে এগিয়ে চলে ওরা।
একটু এগিয়ে ডাইনে ঘোষ বাড়ি, যেখানে রামকৃষ্ণ ঠাকুর নয়জন সন্ন্যাসি কে দীক্ষা দিয়েছেন, বিবেকানান্দ যাঁদের অন্যতম। বাবুরাম ঘোষ, যিনি দীক্ষিত জীবনে প্রেমানান্দ নাম নিয়েছিলেন, তিনি ঘোষ পরিবারের সন্তান। আঠারশ ছিয়াশি সালের চব্বিশে ডিসেম্বর আনুস্টানিক ভাবে ধুনি প্রজ্বলনের মাধ্যমে সন্ন্যাস গ্রহন করেছিলেন ওঁরা যা আজও উৎসবের দিন হিসেবে পালিত হয় এই পুণ্য স্থানে। ঘোষ বাড়ির পেছনে দীঘির অবস্থান, যার টলটলে জলে কথিত আছে বিবেকানান্দ স্নান করেছিলেন। পুণ্য প্রত্যাশী মানুষ আজও জল ছুঁয়ে ধন্য হতে চায়। বুবু তাকিয়ে থাকে দিঘীর অতল জলের গভীরে। যার সীমাহীন স্বচ্ছতা ওকে বুঁদ করে রেখেছে, ও ভাবে এমন করে যদি সব কিছু দেখা যেত! কেন এমন মনে হল তা বুবু জানেনা। মিলন কাকু তাড়া দেয়, বুবু ভাবে দূরছাই। একি স্কুলে লম্বু স্যারের পড়া মুখস্থ করে উগরে দেওয়া,একটু বসতে দেবেনা। মিলন এর মনে হয় বুবুর কথায় মন নেই, শুধু প্রকৃতি পর্যবেক্ষণেই নিজেকে বেঁধে রেখেছে। মিলন যেহেতু একজন শিক্ষক, সে চায় ঠেসে নিজের জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে মনিমুক্ত পুরে দিতে শুন্য ভাঁড়ারে। অগত্যা অনিচ্ছা সঙ্গী করে উঠতে হয় বুবুকে। আর একটু এগিয়ে গেলেই মিত্রবাটী। বাঘ ফটক পেরিয়ে ঢুকতে হবে। সদা জাগ্রত যক্ষ যেমন জেগে থাকে অস্টপ্রহর ধনকুবেরের দরজায়, বাঘও তেমন। দেখলে কেমন ভয়ভয় করে। ঘোষ আর মিত্তিরদের কুটুম্বিতা ছিল। বাবুরাম ঘোষের মাতুলালয় মিত্রবাটি। আজও পূজিত হয় দুই পরিবার সাধারনের চোখে। বাঘ মামাদের চোখ এড়িয়ে ওরা ঢুকে পড়ে প্রাঙ্গনে,ডান দিকে পুকুর মিত্তির বংশের নারী পুরুষের ব্যাবহারের জন্য,বাঁয়ে রাসমঞ্চ। একটু এগিয়ে গেলে গদাধরের মন্দির ছেড়ে সামনে মূল গোবিন্দ মন্দির যার সদর আগলানো। ঢোকার মুখে তিনশত বছরের বকুল গাছ ছায়া বিছিয়ে খাড়া হয়ে আছে, যার নিচে জিরিয়ে নেয় দর্শন পিয়াসী মানুষ। বুবু বলে ‘কাকা আমরাও একটু বসি না’,বসতে বাধ্য হয় মিলন। তারপর শুরু হয় পর্যবেক্ষণ। মুল মন্দির গাত্রে টেরাকোটার প্যানেল সজ্জিত।সাধারন মানুষ অত খতিয়ে দেখেনা, মিলন ভেবেছিল সময় নিয়ে বুবুকে সব দেখাবে, বোঝাবে।অন্য জায়গা গুলোতে তাই ওর একটু তড়িঘড়ি ছিল।কিছু দেখানোর আগেই বুবু চেঁচিয়ে বলে ‘মন্দিরে ইংরেজ পল্টন,দেখ কেমন ঘোড়ার ওপর বসে যুদ্ধ করছে।’মন্দিরের অত উঁচুতে চোখ পৌঁছয় না মিলনের,সে দু চোখের আলো হাতের তালুতে ঢাকা দিয়ে দেখার চেস্টা করে।মিলন মাথা নেড়ে বলে ‘মন্দিরগাত্রে ইতিহাস ধরা আছে। খোঁজ, আরও অনেক কিছু পাবি।’নিজের ভাবনা থেকে সরে গিয়ে মিলন বুবুকে ছেড়ে দেয় আবিস্কারের খেলায়।হিন্দু দেবদেবী,পুরোহিত কত কিছুই না আছে।বুবু কাকার দিকে চট করে তাকিয়ে নিয়ে আঙ্গুল দেখায় একটা পোড়ামাটির প্যানেলের দিকে। মিলন বুঝতে পারে, বুবু ওই শিল্পকীর্তি বুঝতে চাইছে।প্যানেলে থাকা মানুষজন আসলে মুসলমান চাষি, ধানের বখরা জমা দিতে এসেছে জমিদারের কাছে।বুবু জিগেস করে কাকা ‘এতদিনের পুরানো মন্দির, অথচ মনে হচ্ছে চাষিদের দাড়ি যেন আজই চিরুনে আঁচড়ানো।হেসে ফেলে মিলন। এক অদ্ভুত আনন্দে ভরে ওঠে মন।ছোটো হলে কি হবে, ছেলেটার এলেম আছে।বেশ কিছু সময় তন্ময় হয়ে এই খেলা চলে।মিলন ভাবে ছোঁড়াটাকে তাহলে মন্দির তৈরির দর্শন বোঝানো যাক।মিলন বলে ‘জানিস বুবু,বালক গদাধর আঁটপুরে এসেছিলেন চোদ্দ বছর বয়সে,এই মন্দির দেখে তিনি অবাক হয়ে যান।রাজা কৃষ্ণরাম মিত্র এই মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন বিখ্যাত শিল্পীদের দিয়ে। এই মন্দির গাত্র বহন করে সর্বধর্ম সমন্বয়ের দর্শন, যা অভিভুত করে বালক গদাধরকে। যিনি ভাবী জীবনে গদাধর নাম পরিত্যাগ করে রামকৃষ্ণ নাম গ্রহন করেন যা কৃষ্ণরাম নামের পরিবর্তিত অবস্থান এমনই কথিত আছে এই মাটিতে। তিনি`যত মত তত পথ’ দর্শনের প্রবর্তক,যা আজ বিশ্বখ্যাত। এমন ভারি কথার ওজন বোঝেনা বুবু। এর পর অনিন্দ্য সুন্দর আটচালার দুর্গামন্ডপ দেখে ওরা তাঁতঘর দেখতে যায়।আঁটপুর বিখ্যাত ছিল তার তাঁতের কারনে। ধনেখালি,রাজবলহাট এবং আঁটপূর এই শিল্পের প্রানকেন্দ্র ছিল, আজও যার হৃত-গরিমার অবশেষ টের পাওয়া যায়।একের পর এক তাঁত ঘর দেখতে থাকে ওরা।হাতে হাতে সুতো টেনে জমি তৈরি হচ্ছে শাড়ির।পাড়,আঁচল,জমি নিয়ে সম্পূর্ণতা পাচ্ছে একটা গোটা শাড়ি। রঙ্গিন সুতো মহাজনি পুঁজির হাত ধরে আসছে তাঁতির ঘরে।এত শ্রম দিয়েও ভাত কাপড়ের সংস্থান হয় না,দিনগত করজায় তাঁতি ডুবে যায়।বিশ্বকর্মা পূজায় রেল কারখানায় ঢুকে বুবু এইয়া বড়বড় মেশিন দেখেছে বন্ধ অবস্থায়।আজ চালু হ্যান্ডলুমে শিল্পীর সৃষ্টির নেশা ওর খুব ভাল লাগে।টিক টিক ছন্দে লূমের গান ওকে বিশেষ ভাবে টানে। ওর জীবনের সাংগীতিক আবহে হয়ত এই ছন্দর প্রভাব ছিল কোনখানে। মিলন কাকু নাগাড়ে বলে চলেছিলেন তাঁতের ইতিবৃত্ত, শ্রমিকের ধুঁকে মরার গল্প।এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে বুবু ফেরে কাকুর বাড়ি। জাঙ্গিপাড়া স্টেশনে রেলগাড়ি জল নেয় তাই অনেকক্ষণ দাঁড়ায় গাড়ি। ফেরার সময় মিলন কৃষ্ণবাবুর কাছে এই স্টেশনে বুবুকে ফিরতি ট্রেনে চড়িয়ে দেয়।ট্রেনে উঠে বুবু বিদায় জানায় মিলন কাকুকে।সারাদিনের ছোটাছুটি বুবুকে কাহিল করতে পারেনি এতটুকুও।বাড়তি উদ্যমে ও বাপের কাছে জানতে চায় বাবা, `যত মত তত পথ’ কী, আর তমাল কাকুর আসল নামই বা কী? পরীক্ষা করে নিতে চায় বুবু তার বাবাকে। প্রশ্নের ওজনে হেঁচকি ওঠে কৃষ্ণর। কিছুই আড়াল করতে চাননা কৃষ্ণ পুত্রের কাছ থেকে। যদিও তমালের নাম নিয়ে কৃষ্ণর মনটা খচখচ করছিল।কৃষ্ণ নিজের ব্যাখ্যায় ‘যত মত তত পথ’ এর গুরুত্ব প্রকাশ করে ছেলের কাছে। সে বলে ‘যারা ঈশ্বর বিশ্বাসী তারা বিভিন্ন ধর্মের হতে পারেন। সব পথেই ঈশ্বরকে পাওয়া যায়।এর জন্য ধর্মে-ধর্মে মারামারি কাটাকাটির প্রয়োজন নেই। রামকৃষ্ণের এই বাণী ধর্মের কারনে বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধ দর্শন।’ তিনি আরো বলেন‘ ‘ধর্ম আর বিজ্ঞান এর ব্যাখ্যা আমার কাছে আলাদা।’ ধর্ম যে অংক নয়, ধর্মাচরণ করে যে বস্তুগত কিছু পাওয়া যায় না তা বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে কৃষ্ণ চুপ মেরে যায়। বাবাকে চুপ করে যেতে দেখে উত্ত্যক্ত করতে থাকে বুবু। উল্টো প্রশ্ন করে বসে কৃষ্ণ বুবুকে, ‘তুই আগে কি কি দেখলি বল।’ বুবু ধারাবিবরণীর ঢঙে তার অনুভূতির কথা জানায়। বুবু বলে ‘বাবা আমি তাঁত ঘর দেখেছি। তমাল কাকু বলছিল তাঁতিরা খুব কষ্ট করে বেঁচে আছে। মহাজন না কারা টাকা ধার দেয়। তাঁত বানিয়ে শোধ করতেই সর্বস্ব চলে যায়। ওদের নাকি ভালো করে সারা বছর খাওয়া পড়াই জোটেনা।’ সুযোগ পেয়ে যায় কৃষ্ণ। বলে “বুদ্ধি করে বলতো দেখি এইখানে-যত মত তত পথ, প্রয়োগ করা যাবে?” কৃষ্ণর এই প্রশ্ন শুনে হাবার মতো তাকিয়ে থাকে বুবু। বাবা বলে, ‘সারাজীবন শ্রম দিয়ে যারা পণ্য উৎপাদন করে, তা কে পরিধান করে?’ আবারও বুঝতে না পেরে বুবু জিজ্ঞেস করে ‘পণ্য কি?’ উত্তর আসে ‘তাঁতের ক্ষেত্রে শাড়ি, মাঠে হলে ধান,গম।’ বুঝতে পেরে বুবু বলে ‘মা পরে জেঠিমা, পিসি দিদা, আরো অনেকে।’ ‘কিন্তু তাঁতির বাড়ির কোন মহিলাকে উৎপাদিত পণ্য পড়তে দেখেছিস?’ বুবু বলে, ‘হ্যাঁ, খুব ময়লা শাড়ি।’ ‘কেন ওদের গায়ে ওই শাড়ি দেওয়ার পয়সা নেই ভেবে দেখেছিস। আমরা কিনলে ওরা টাকা পায়। আর সেই টাকার বেশির ভাগ অংশ মহাজন নিয়ে চলে যায়, ওদের ভাগ্যে জোটে লবডঙ্কা। ঈশ্বর বিশ্বাসী সাধারন মানুষের কাছে ‘যত মত তত পথ’ হলো ঈশ্বরকে পাবার ভিন্ন ভিন্ন রাস্তা। মহাজনের থেকে যদি পণ্যের অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয় বল দেখি বুদ্ধি করে এমন কোন রাস্তা তোর জানা আছে।’ বুবু বলে ‘মহাজন কে টাকা না ফেরত দেওয়া।’ কৃষ্ণ বলে ‘মহাজন মালের দখল নিয়ে নেয় মাল তৈরি হবার পর।’ একটু চিন্তায় পড়ে যায় ছেলে, বাবার ঠোঁটের কোণে হাসি দেখে একটু রাগ হয় ওর। তড়িঘড়ি বলে ‘আমি হলে একঘুষি মেরে ঠান্ডা করে দিতাম।’এই উত্তরের সন্ধানেই ছিল কৃষ্ণ। সে বলে ‘রাইট মানে ফাইট, লড়াই। সমস্ত তাঁতীদের সম্মিলিত লড়াই একমাত্র মুক্তির পথ।’ চুপ করে যায় বুবু। কৃষ্ণ বলে ‘ধর্মীয় কোন দর্শন এই কারনেই খণ্ডিত,পৃথিবীর মানুষের প্রাথমিক প্রয়োজন বা চাহিদাকে সে বাখ্যা করতে পারেনা।’বুবু হিব্রুর মতো দুর্বোধ্য ভাষায় বাবার বক্তৃতা শুনে কি বুঝল তা সেই জানে। অসীম অন্ধকার ভেদ করে ন্যারোগেজ রেলগাড়ি ছুটতে থাকে ঝিকিঝিকি সুরে।
বুবুর অভ্যেস ছিল খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠা, তার পর প্রাতকৃত্য সেরে কাজে লেগে পড়া। এখন রাস উৎসব, বুবুদের পাড়ায় ঝুলন এর প্রতিযোগিতা হত। বুব, তুলতুল সবাই মিলে বুবুদের বাড়ি ঝুলন সাজাতো। গতকাল অনেক রাত পর্যন্ত ওরা ঝুলন সাজিয়েছে।আজ সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই বুবু দাঁত মেজে আবার কাজে লেগে পড়ার তালে ছিল।কিন্তু মা অঞ্জলির বকুনিতে তা সম্ভব হয়নি। অঞ্জলি ওকে বাধ্য করেছিল শুয়ে পড়তে। রেগে গিয়ে বিচ্ছুটা বিছানা পত্তর লন্ডভন্ড করে দিল, কৃষ্ণ তখন ঘরে নেই। অঞ্জলি রান্নাঘরে চলে গেছে। লন্ডভন্ড বিছানার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একতাড়া কাগজ। কোনদিন এমন পত্রিকা চোখে দেখেনি বুবু।পাতা উল্টাতে থাকে সে অনিচ্ছায়, ওর মনে হয় আনন্দবাজার পত্রিকাতো সবার সামনে পড়ে থাকে এ আবার কি কাগজ যাকে লুকিয়ে রাখতে হয়। প্রথম পাতায় লম্বা হেডিং-একটি গণতান্ত্রিক পার্টির প্রয়োজনীয়তা।তড়িঘড়ি পাতা উল্টাতে থাকে বুবু। আবারও এক অদ্ভুতুড়ে লেখা, বড়ো লাল হরফে – পাতি বুর্জোয়া দের করাল গ্রাসে পার্টি।পার্টিতে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।মা স্কুলে টিফিনের জন্য হাত খরচ দিত দিনে দশ পয়সা, তার থেকে কখনো বুবু ঝালমুড়ি খেত কখনো বা ঘটিগরম।পাঁচ পয়সার হজমি গুলি রোজ বাঁধা থাকত টিফিন মেনুতে।তাই পরিপাকে কোন আসুবিধে হতোনা তার।কিন্তু মগজে এতশত কঠিন বাক্য হজম করার বোধ এই বয়সে আশা করা,মরু ভূমিতে ছুঁচ খোঁজার সমার্থক।এগুলো যে নিষিদ্ধ কাগজ,সবার জন্য নয় তা বুঝতে ওর অসুবিধে হয়নি। মনে হয় এই পত্রিকা গুলি বাবা স্টেশনে স্টেশনে বিশেষ বিশেষ মানুষজনকে বিলি করে। পিসি ঠাকুমার কাছে যাওয়া কি তার বাপের অছিলা। তাড়াতাড়ি যেমনটি ছিল তেমন পত্রিকা বালিশের তলায় পৌঁছে যায় যাতে বাবা টের না পায়।আজ ও ছদ্মনামের গিঁঠ খুলতে পারে। হঠাৎ মিলন কাকুর কথা ওর মনে পড়ে। কেউ নিজের নামে এই কাজ করেনা নিজেকে লুকিয়ে রাখে।কোন অজানা ভয় আছে হয়তো কারও থেকে। বাবারও নিশ্চয় কোন ছদ্মনাম আছে।
কেটে যায় বেশ কয়েক মাস, একই ভাবে। মার্টিন রেলযাত্রা, চিঠি পাচার সবই ঠিকঠাক চলতে থাকে। এমনই এক নতুন মাস শুরু হয় রবিবারে, ওরা ট্রেনে চড়ে বসে। এখনো কেউ প্যাকেট হাতে আসেনি, কৃষ্ণ উসখুস করতে থাকে যা বুবুর চোখে ধরা পড়ে যায়। ঠিক ট্রেন ছাড়ার আগের মুহূর্তে এক কালো টুপি পড়া লোক জানলার কাছে এসে হাজির হয়। টুপিটা খুলে কৃষ্ণবাবুর দিকে তাকিয়ে মাথা নত করে জিজ্ঞেস করেন ‘আপনি অর্জুন বাবু?’কৃষ্ণ মাথা নেড়ে সায়দেয়।আগন্তুক বলে চলেন ‘আমি ট্রেনের গার্ড। আপনার জন্য চিরকুট আছে। ’চিরকুটটি খুলে এক নিমিষে পড়ে ফেলে কৃষ্ণ, একটু চিন্তিত মনে হয় তাকে। গার্ড সাহেব ততক্ষনে বাঁশি বাজিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছেন। বুবুর নজর বাবার চিন্তিত মুখে। ট্রেন স্টেশন ছেড়ে কিছুদূর যাওয়ার পর কৃষ্ণ বলে ‘আমরা মশাট স্টেশনে নেমে তারপর বাসে গজারমোড় হয়ে শিয়াখেলা যাব। ’বাবার কথায় বুবু আন্দাজ করে অজানা আশঙ্কার খোঁজ, মুখ ফুটে সে কিছু বলে না। কথামতো ভীড় বাসে কষ্ট করে পৌঁছায় শিয়াখালা। সেদিন রাতে আর ওদের ফেরা হয় না।বিছানায় শুয়ে বুবু জিজ্ঞেস করে ‘বাবা আমরা এভাবে এলাম কেন?’ বাবা স্বগতোক্তি করেন – আমাদের মাটিন রেলের পার্ট উঠলো।পার্টি আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে রেল শ্রমিকের মধ্যেকাজ করার।বুবু বুঝে যায় তার কল্পলোকের চাবি কাঠি খোয়াযাবে।
বুবু ঘোরা দোলা চড়তে খুব ভালবাসতো। সাঁইসাঁই ঘোড়ায় বসে লাট্টুর মত বনবন ঘোরা, মেলার চারপাশ দোকানপাট মানুষ জন কেমন পেছনে ছুটতে থাকে। সবকিছু ফেলে দৌড়ে চলা, ফিরে এসে আবার ছুঁয়ে হারানো, কি যে মজা। ঘুমের মধ্যে দোলায় বসে বুবু দেখে – মাটিন রেলপথের রূপকথা যেন মেলার মতো সরে সরে যাচ্ছে, কোন সেই প্রথমদিনের ভালোলাগা, প্রেম, অনেক দিনের স্মৃতি ছুটে চলেছে মাথার ভিতর দিয়ে। কষ্ট লাগছে বুকে। রেলপথ ছেড়ে সবুজ মাঠ কোন দিগন্তে গিয়ে মিশেছে যেন পৃথিবীর পরপার। বৃষ্টি ভেজা ক্ষেত, টোকা মাথায় লাঙ্গল হাতে বলদ দিয়ে জমি চষা। কই কেউ তো আর ফিরে আসছে না ? দোলার ওপর থেকে প্রানপণে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইছে বুবু ছেড়ে আসা সাতরঙা জীবনের মায়াবী পরশ। ঘুমের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে সে, যেখানে শুধুই সীমাহীন অন্ধকার।
….............................................
চার।
ছুটকির জন্মকথা
স্বভাবে দুজন দুরকম। দিলু তুবড়ির মতো রঙ ছড়ায়,বীণাপাণি নীরব নিরুচ্চার। কয়েক বছরের মধ্যেই দিলু, অভয় মাস্টার হিসেবে জনমানসে পরিচিতি লাভ করে। বন্ধুবান্ধব, বয়স, পেশার কোন বাছবিচার ছিলনা অভয়ের, তাই বিভিন্ন মানুষ আসত ওদের বাড়িতে। বীণা স্কুল ফেরত এসে চা মুড়ির জোগান দিতে দিতে পাগল হয়ে যেত কিন্তু বিরক্ত হতো না। বরং প্রচ্ছন্ন ভাললাগা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতো আড়াল থেকে। এই আড্ডার পথ হেঁটে রাজনীতি ঢুকলো ঘরে। কলেজ জীবনে যা অন্তরে প্রবেশ করেছিল, আজ মানুষের প্রয়োজনে তা পথের দিশা হিসাবে সামনে এসে দাঁড়ালো। খুব দ্রুত ওই অঞ্চলে অভয়চরণ ঘোষ সিপিএম পার্টির লেভি দেওয়া সদস্য থেকে নেতৃত্বে অভিষিক্ত হলেন। শনি,রোববার রাত পর্যন্ত চলত মিটিং। দফায়-দফায় কর্মসূচি সালিশি সভা। কত মানুষ অভয়কে কোর্ট মানতেন। সহজেই মীমাংসা হয়ে যেত অভয়ের হস্তক্ষেপে মানুষের ছোটখাটো সমস্যা। তখনও উনিশসো সাতাত্তর অনেক দূর, অবিন্যস্ত মানুষজন সবে এক ছাতার তলায় দাঁড়াতে শুরু করেছে। নিপু আসে অভয়ের কাছে মাঝেমধ্যে কাজের অবসরে। হরেক রকম আলোচনা চলে মাস্টারের বাড়ির পাঠশালায়। গ্রামের পরিস্থিতি,দেশের রাজনৈতিক গতি, প্রতিটি মানুষের ভালোমন্দ সবই ঠাঁই পায় সেখানে। মাস্টার পৃথিবীর বিভিন্ন্ দেশের স্বাধীনতা, মুক্তির গল্প শোনায় ওদের। নিপু বেশিরভাগ সময়েই শ্রোতা, বাগদী পাড়ার সীমা শুধু সমানে সমানে তর্ক করে যায় অভয়দার সাথে, নিপুর কাজ হল সেখানে থামা দেওয়া। নিপু নিজের ধারনা দিয়ে জানে এইসব শিক্ষিত ভাল মানুষ যদি চটে যায় তাহলে বিপদ। সেই নিপু বাগদী হন্তদন্ত হয়ে একদিন হাজির অভয়ের বাড়ি। খুব বিভ্রান্ত লাগছিলো ওকে,অভয় শুধায় ‘কি হয়েছে এত অস্থির লাগছে কেন?’নিপু, মজুমদারের ভাগচাষী,বাপ-দাদারকাল থেকে বংশ পরম্পরায় চাষ করছে ওদের জমি। নিপু বলে‘স্যার, 'পরিবার-পরিজন নিয়ে চাষ করে খাই। এখন মজুমদার আমাদের উৎখাত করতে চাইছে ওর জমি থেকে বলছে জমিতে শিব মন্দির হবে।‘অভয় জিগেস করে ‘জমিতে ফসল হয় না?’ নিপু উত্তর করে ‘বিঘা প্রতি প্রায় সাত, আট কুইন্টাল ধান হয়।’সে আরো বলে ‘চার ভাগের এক ভাগ দেয় আমাকে, বীজ সার আমার।’‘ এতো ঢুটিয়ে লাভ,তাহলে উৎখাত করতে চাইছে কেন?’নেপুর কথায় ফুটে ওঠে অসহায়তা, হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সে বলে ‘সকালে মাঠে গিয়ে দেখি এইয়া এক শিব মাটি ফুঁড়ে উঠেছে। চারপাশে আকন্দ ফুল ছড়ানো,মজুমদার বাবু পুরোহিত নিয়ে হাজির। আমায় দেখে বললেন ‘আমার স্বপ্নাদেশ হয়েছে। এ জমি আর চাষে দেব না।’‘আমি জমি চষে রেখেছি, এ কথা বলা সত্বেও উনি আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দূর করে দেন, মাঠে উপস্থিত সবার সামনে। হঠাৎ শিব ঠাকুরের আবির্ভাবে উপস্থিত মানুষজন খুব ঘাবড়ে যায়। বাক্যিহারা হয়ে যায় সক্কলে।' আশ্রমের জমি ছেড়ে নেপু চাষ করার অধিকার দেওয়ার কথা জানালে,মজুমদার বলেন ‘তোর মত ছোট জাতের লোকের পা এই পবিত্র জমিতে পড়ুক,তা আর আমি হতে দেব না।’ আমি বলি‘হুজুর এত বাগদীদের গ্রাম, তাহলে কার জন্য মন্দির হবে যদি কেউ মন্দিরে না আসতে পারে?’ মজুমদার‘বলে আমি মন্দির সংলগ্ন আশ্রম বানাবো যেখানে দেশ-বিদেশ থেকে লোকজন আসবে আশ্রম দেখতে। আশ্রম এ থাকার সুবন্দোবস্ত থাকবে বহিরাগতদের,আর তোর এত সব জেনে হবে টা কি? ওই ভিনদেশী মাস্টারের সঙ্গ করে তোর খুব চোপা হয়েছে না?' ‘কথা না বাড়িয়ে আমি এক ছুটে তোমার কাছে এলাম, মাস্টার তোমার পায়ে পড়ি কিছু একটা করো।’বাড়ির সবাই বুঝে নেয় মজুমদারের এমন আচরনের কারণ। কেন জমির মালিক দীর্ঘদিনের চাষীকে বঞ্চিত করতে চাইছে। পার্টির মানুষজনের কাছে ভাগচাষীদের আনাগোনাই ওদের আশঙ্কার কারন। মাস্টার বলে ‘করতে তো তোমাদেরই হবে , আমি সঙ্গে আছি এক্ষুনি সকলকে ডাকো, বল অভয় মাস্টার ডাকছে।’ নিপু বলে ‘সবাই মাঠে জড়ো হয়েছে। আমার সঙ্গে কথা কাটাকাটির সময় কেউ কোনো কথা বলতে সাহস পায়নি। শুধু সীমা বাগদি, হারুর বউ বলেছে মাস্টারকে ডাকতে।’‘চলো আমি যাচ্ছি’,অভয় বলে। বীণা চা খাওয়ার আর্জি করলে নিপু বলে ‘না গো দিদিমণি,চা পরে হবে, আগে বাঁচি।’ অভয় সাইকেল বার করে নিপুকে সামনে বসিয়ে রওনা দেয় মাঠে।
মাস্টার যা ভেবেছিল ঠিক তাই। বীণার কথা রাখতে গেলে মজুমদার পুজো পাঠ শুরু করে দিত। দিলু এক লাফে সাইকেল থেকে নেমে সাইকেল মাটিতে শুইয়ে রেখে ঘাড় এপাশ-ওপাশ ঘুরিয়ে নিয়ে বুঝে নেয় উপস্থিত জনতার পরিচয়। অধিকাংশই বাগদি পাড়ার লোক, বাকি দশ বারো জন মজুমদারের টেনিয়া। ক্লাস করানোর অভ্যেস থাকায় দিলুর মাইক লাগেনা। বাজখাঁই গলায় দিলু হেঁকে ওঠে ‘হারু, নবা,নিপু, সব কোদাল নিয়ে এসো। আমার হাতে কোদাল দাও একটা।’ মজুমদার ভয়ানক ঘাবড়ে যায় কিন্তু মুখে সাহস দেখিয়ে বলে ‘মাস্টার ভালো হবেনা কিন্তু, তুমি কদিন এসেছ এ গ্রামে?' যুগ যুগ ধরে গ্রামের লোকজনের ভালো-মন্দ মজুমদারবাড়ি দেখে এসেছে,তুম কোন ক্ষেত কা… ‘। কথা শেষ করতে না দিয়ে মাস্টার বলে ‘সেটা এবার দেখুন।’ কাল বিলম্ব না করে সে কোদাল হাতে লাফিয়ে নামে মাঠে, বাগদিরা ঘিরে ধরে মাস্টার কে। কিন্তু ভগবান শিবের শরীর স্পর্শ করতে হবে তাই কেউ মাঠে নেমে কোদাল ধরতে সাহস পায় না। মজুমদারের ভাড়াটে লোকজন বাধা দিতে গেলে ওরা শুধু আটকায় যাতে অভয় মাস্টারের গায়ে হাত না পড়ে। অভয় আজকের চাকুরীজীবী লোক নয়, তার শরীরে বল আছে,আছে ছোটবেলায় কোদাল চালানোর অভিজ্ঞতা। নিমেষে শিবের মানে পাথরের তলদেশে পৌঁছে যায় অভয়ের কোদাল। চারপাশে মাটি তুলে ফেলে কোপে কোপে। মজুমদার চেঁচিয়ে বলে ‘ভাল হচ্ছেনা কিন্তু আমি পুলিশ ডাকবো।’ দিলু চিৎকার করে বলে ‘ডাকাচ্ছি পুলিশ, ভণ্ডামি হচ্ছে না,আজ সবাই চাক্ষুষ করবে আপনার বুজরুকি। কাকা দিন বদলাচ্ছে, মেনে নিন।’ঢাঊস মাপের একটা কালো কুচকুচে পাথর বিশাল বপু নিয়ে জেগে ওঠে গর্তের ভিতর থেকে,মাস্টার যাকে একা নড়াতে পারছে না। কেউ শিবকে ছোঁবে না তাই এগিয়েও আসছে না। সীমা হঠাৎ ভিড় ঠেলে ‘সর সর’, বলে চিৎকার করে ওঠে। সীমা আরও বলে ‘মরদ হয়েছিস তোরা, দেখছিস না শিবতুল্য মানুষটা ঘাম ঝরাচ্ছে তোদের জন্য, আর তোরা দাঁড়িয়ে দাঁত কেলাচ্ছিস? কিছু মনে করো না মাস্টার এরা এরকমই। নিজের ভালোও বোঝেনা।’ কোথাও শিবতুল্য কথাটা ধাক্কা দেয় ওদের কলজেতে,নিপু নেমে পড়ে। সীমার খিস্তি খেয়ে আর কয়জন নামে সাথে। মজুমদার এতক্ষন খুব চেঁচাচ্ছিল ‘বুঝবি, ভগবানের শরীরে হাত লাগালি, মরবি শালারা, ঝাড়ে বংশে মরবি। মাস্টার একদিন ভেগে যাবে তখন তোদের একদিন কি আমার একদিন।’পাথরটা যখন প্রায় উঠে পড়ার মুখে, সবাই ততক্ষনে মজুমদারের আস্ফালনে ভয় না পেয়ে হাত লাগিয়েছে। ওদের শরীরে জোস এসে গেছে,মুখে হেঁইয়ো ডাক সব জড়তা কাটিয়ে দিয়েছে। দিলু নিমেষে পাথর ছেড়ে দিয়ে মজুমদারের পেছনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। টের পায়নি শয়তানটা। সীমা হঠাৎ বলে ‘মাগো মাটির নিচে ভিজে ছোলা।’ মজুমদার তখন একপা একপা করে পিছু হঠছে। মাস্টার তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে বলে ‘দেখো দেখো তোমাদের জন্ম-জন্মান্তরের রক্ষাকর্তা পালাবার চেষ্টা করছে, সবাই চেয়ে দেখ।’ মজুমদার খেয়াল করে মাস্টার তার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে। সামনের দিকে দুপা এগিয়ে যাবার চেস্টা করে সে। জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পড়েনি ডাকাবুকো মজুমদার। তার সাঙ্গাতের দল ভেগেছে, বাগদি পুরুষের একটা দল হেঁইয়ো হাঁকছে আর একটা মাস্টারের সঙ্গে ঘিরে ফেলেছে মজুমদার কে। সে এখন মাস্টারের বজ্রকঠিন মুঠিতে বন্দী। ‘মাস্টার ছেড়ে দাও বলছি।’ মজুমদারের কথার উত্তরে মাস্টার বলে ‘সে তো দেবোই, তার আগে সবাইকে জানাই আপনার কান্ড।শোনো হে সব্বাই শোনো - ছোলা জলে ভিজিয়ে রাখলে জল খেয়ে অংকুর বেরিয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠে তা সক্কলে জানে। যেটা জানেনা সাধারনে, সেটা হল দুষ্কর্মে এর ব্যবহার। শুকনো ছোলা স্ফীত হয়ে কেমন করে সযত্নে রাখা পাথরকে ঠেলা দেয়। ঠেলা খেয়ে ধীরে পাথর মাটির উপর জেগে উঠলে, কেমন করে মজুমদার বাবুর মত ধুরন্ধর মানুষ শিবের গীত গেয়ে মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নেয়। বন্ধুরা শোন - মজুমদার বাবু নিপুর মাঠে এইভাবে শিব জাগাতে চেয়েছিল, ওকে উচ্ছেদ করতে। কারণ নিপু কমরেড দের কাছে যাতায়াত শুরু করেছিল বেশ কিছুদিন ধরে। উনি বুঝতে পারছিলেন অন্যায় ভাবে অধিকার করা পিতৃ পুরুষের জমি মালিকানা চিরদিন ধরে রাখা যাবে না। যদি নিপুকে জমি থেকে হঠাতে পারা যায় যে কোন ইপায়ে তবেই তা সম্ভব, আর তাই এই আয়োজন।’এইবার দিলু মজুমদারকে সরাসরি বলে, ‘চার ভাগের এক ভাগ ফসল দিয়ে যে অন্যায় করেছেন আমরা এর প্রতিকার চাই। আপনার ওপরেই ছেড়ে দিলাম বাকিটা। আশাকরি শুভবুদ্ধির উদয় হবে আপনার। আর কোন রকম চালাকি করার চেষ্টা করবেন না।’ ওদিকে সীমার নেতৃত্বে বাকিরা শ্লোগান দিতে থাকে দিলু মাস্টার জিন্দাবাদ, অভয় বাবু জিন্দাবাদ, কমিউনিস্ট পার্টি জিন্দাবাদ। গমগম করে ওঠে মাঠ প্রাঙ্গন। হাত দেখিয়ে দিলু সবাইকে থামতে বলে। ‘তোমরা সবাই ছিলে, এ তোমাদের জয়।’
কৃষিজীবী মানুষের উত্থান দেখে জেলা নেতৃত্ব খুশি হয়। উজ্জীবিত হয় স্থানীয় নেতৃত্ব। ঠিক হয় একদিন এলাকা পরিদর্শনে আসবেন জেলা থেকে। মিটিংয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়। জনতার দরজায় দরজায় ঘুরে আঞ্চলিক নেতৃত্ব মিটিং এর কথা ঘোষণা করে। গরিব মানুষ দলে দলে যোগ দিয়ে মিটিং জমিয়ে দেয়। শ্রমজীবী মানুষের পার্টি, খেটে খাওয়া জনগণের কথা বলে-কিভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা প্রয়োজন তা জানান বক্তারা। শুধু শ্রমিক শ্রেণীর শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই, এই কথাটা হজম হয় না ওদের, নিপুতো প্রায় হারিয়ে ছিল চাষের অধিকার। মাস্টার এমন ভজোকটো কথা খুব একটা বলত না।খুব সহজ সরল ভাষায় সে বোঝাত আজকের প্রয়োজন। মিটিংয়ে মজুমদার এন্ড কোম্পানি ও হাজির ছিল। কোন কোন নেতাকর্মী কে দেখাও যায় মজুমদারের সাথে ফুসুর ফুসুর করতে। মিটিং শেষে শ্রদ্ধেয় নেতৃত্ববর্গ হাজির হয় অভয়ের বাড়ি। চাঁদের হাট বসেছে আজ বীণার ঘরে। একান্ত আলাপচারিতায় জেলা সম্পাদক বিশ্বম্ভরবাবু অভয়কে বলেন ‘এগিয়ে চলো কমরেড, সংগঠিত কর শোষিত মানুষকে,এগিয়ে চলুক জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব। শুধু একটা কথা মনে রেখো। বাস্তবে যা কিছু প্রয়োগ করবে ভাবনা স্তর থেকেই তা আলোচনা সাপেক্ষ হবে। পার্টি অনুমোদন করলে তবেই প্রয়োগে সামিল হবে। মনে রাখবে হঠকারিতা বিপ্লবকে পিছিয়ে দেয়।’ অভয় ভাবে এই পরিস্থিতিতে অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ কই? কিন্তু মুখে কিছু বলে না সে। কারণ সাধারন মানুষের উৎসাহে অন্য ভাবনা ভাবার তার ফুরসৎ কই আজ?
বীণা অন্তঃসত্ত্বা, উড়নচন্ডী মাস্টার যে বউয়ের খেয়াল রাখবে তার ফুরসত নেই। যদিও সীমা, দিদির খেয়াল সবসময় রাখে, সময় মতো হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া ওষুধপত্র খাওয়ানো সব সীমার তত্ত্বাবধানেই চলে। মাস্টার সবাইকে বলে দিয়েছে এখন থেকে কেউ আর বাড়িতে এসে চা জলখাবার চাইবে না। মাস্টারের কথায় কেউ কিছু মনে করে না, বাড়ি থেকে পিঁয়াজ,লঙ্কা, আলু সেদ্ধ এনে সবাই মিলে মেখে বিলি করে খায়। মাস্টারের বাড়ি ধীরে ধীরে অস্থায়ী পার্টি অফিসে পরিণত হয। বীণার ভালোই লাগে,মাঠের সেই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ওরা দিনের বেলায় কাজের ফুরসতে এসে আড্ডা মারে উঠোনে। বীণার প্রসবের দিন এগিয়ে আসছে। কখন কি হয়, তাই কেউ না কেউ থাকলে ভালই হয়। ওরা মাঝে মধ্যে খোঁজ নেয়। যেদিন প্রসব বেদনা ওঠে দিলু সেদিন স্কুলে। সবাই মিলে ভ্যানে তুলে ব্লক হাসপাতালে নিয়ে যায় বীণাকে। কাগজপত্র বীণা আগেভাগেই সীমাকে দেখিয়ে রেখেছিল, সীমা অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলে। ডাক্তার বলেন ‘ওনার স্বামী কই?’ সীমা বলে ‘উনি স্কুলে পড়ান, এখন নেই। আমরা দুর্গাপুর স্কুলে লোক পাঠিয়েছি খবর নিতে। আসতে আসতে ঘণ্টা দুই তিন লাগবে, আপনারা যা করণীয় করুন।’ ডাক্তার জবাব দেয় ‘সই লাগবে ওনার স্বামীর’, সীমা বলে ‘সে হবেখন, আগেতো চিকিৎসা শুরু হোক।’ ডাক্তার সীমার স্পষ্টবাদিতায় অবাক হয়ে যায়। ভাবে একটা গাঁইয়া মেয়ে প্রয়োজনে এত চোস্ত হতে পারে! তখনো উচ্চপদে আসীন মানুষজন এতটা বিষিয়ে যায় নি। সমাজে আজকের অবিশ্বাস সেদিন বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। যাহোক জন্মালো তিন কেজি শ্যামাকালো চোখ সর্বস্ব ফুটফুটে এক মেয়ে। নার্সের কোলে করে সে এলো বাপকে দেখা দিতে। হাসপাতালের বাইরে গোটা বাগদি পাড়া এসে জুটেছে। গৌরবর্ণ অভয় বিস্ফারিত নয়নে কন্যাসন্তানকে দেখছে আর ভাবছে বীণার সঙ্গে একান্ত মুহূর্তের সোহাগ ভালোবাসার কথা। বীণা যতবার বলতো ওর পুত্র সন্তান চাই, অভয় ততোবারই কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলতো আমাদের ঘরে কৃষ্ণকলি আসবে। ঠিক তোমার মতো। ‘ও মশায় কি ভাবছেন?’ নার্সের চিৎকারে ঘোর কাটে অভয়ের ‘দেখুন দেখুন, চোখের মণি যেন কালাচাঁদ, আকাশ কোঠরে ড্যাবড্যাব করে জ্বলছে।’ সীমা হো হো করে হেঁসে বলে ‘চাঁদ কালো আর আকাশ সাদা এ কেমন তুলনা?’ পিটপিটে কালো চাঁদ দেখতে দেখতে অভয় আবার ডুব দেয় আপন মাঝারে।
মেয়ের আগমনে কদিন স্কুল ছুটি নিতে হয়েছে মাস্টারকে। বাড়িতে কাজের অন্ত নাই, গ্রাম শুদ্ধ লোক একে একে হাজির হয় মাস্টারের বাড়ি, আসেন বীণার স্কুলের সহশিক্ষক, শিক্ষিকারা। অভয় সীমাকে বলে রেখেছিল ‘তুই বাবা সামলে দিস। আমার দ্বারা আপ্যায়ন সম্ভব হবে না।’ সীমা এমন একটা মানুষ কোনদিন দেখেনি, জাতপাত উঁচু-নিচু যার কাছে কোনদিন মান্যতা পায়নি সবার জন্য অবারিত ছিল এই বাড়ির দরজা। সানন্দে রাজি হয়েছিল সে এই দায়িত্ব পালনে। এই অঞ্চল থেকে একটু দূরে বৃহন্নলাদের বাস,ওরা হাসপাতাল থেকে ঠিকঠাক শিশুদের জন্মের খবর পায়। সীমা জানায় ‘দাদা আজকালের মধ্যে বাড়িতে হিজড়ে আসবে, আমি সব পারি কিন্তু ওদের সাথে ঝগড়া করতে পারবোনা, ওরা বড্ড মুখখিস্তি করে।’ দিলু বলে ‘ঠিক আছে,ও আমি ঠিক সামলে নেবো, ওদের সম্পর্কে কিঞ্চিত ধারণা আমার আছে।’ সীমা মুচকি হাঁসে। কোথাও দিলুর ওদের প্রতি একটু সহানুভূতি জমা আছে সীমা তা বোঝে। কেন সমাজ, সরকার ওদের প্রতি এত উদাসীন সে কারনে ক্ষোভও আছে দিলুর মনে। সত্যি সত্যি কোন বিকল্প পেশার ব্যবস্থা থাকলে এমন ভিক্ষাবৃত্তি করতে হতো না ওদের।
বাইরে রুমঝুম পায়েলের আওয়াজ জানান দেয় বৃহন্নলাদের আগমন বার্তা। দিলু তখন চানে গেছে, কি করবে ভেবে না পেয়ে সীমা চেঁচাতে থাকে ‘দাদা,ও দাদা, আপদরা এসে হাজির হয়েছে এখন আমি কি করি?’ দিলু বলে ‘তুই বীণা আর মেয়ের কাছে যা আমি দেখছি। ততক্ষণে বৃহন্নলা বাহিনী ঢুকে পড়েছে উঠোনে, ‘কইগো মেয়ে আন তাড়াতাড়ি, কেমন হল দেখি, নেখাপড়া করবে না নাঙ চরাবে?’ গামছা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে দিলু উঠোনে এশে হাজির। হিজড়েদের বাক্যি শুনে সবে চান করা ঠাণ্ডা মাথায় আগুন লেগে যায় দিলুর। দিলু বলে ‘বেরিয়ে যাও এই মুহূর্তে, না হলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দেবো।’‘হরি হরি, কইলাম টা কি যে এমন করছো?’ দিলু ওদের কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলে ‘কত টাকা নাও তোমরা মেয়ে হলে?’ একজন বলে ‘মাত্র পঁচিশ’ মুহূর্তে দিলু পকেট থেকে টাকা বার করে বলে ‘বিদায় হও এবার'। ওদের একজন বলে ‘বাসন্তী তোকে কথা কইতে বলেছি? ওমা, আমরা যাব কিগো,কন্যা না দেইখ্যা। আমরা কি ভিখ মাঙ্গা যে দূর থেকে ভিক্ষা দিয়ে বিদায় দেবে? ওটি হবে না মাস্টার। বউকে বল মেয়েকে নিয়ে আসতে।’ সম্মোহিত অভয় সীমাকে বলে ‘নিয়ে আয় মেয়েকে।’ কোল থেকে কোলে ঘুরতে ঘুরতে মেয়ে আসে সেই দশাসই চেহারার মাসির কোলে যার কটুবাক্য ক্রুদ্ধ করেছিল মাস্টারকে। ‘উলে বাবা লে, কি সুন্দর কি সুন্দর গড়ন, শরীরে এই বয়সে নদীর ঢল! এ মেয়ে অনেকের বুকে আগুন জ্বালাবে।’ ভেতরে ভেতরে জ্বলতে থাকে দিলু মাস্টার, মেয়েকে এক ঝটকায় টেনে নিয়ে সীমার কোলে দিয়ে কঠিন কন্ঠে বলে,‘তোমরা যাও এবার।’সীমা মেয়ে নিয়ে ঘরে চলে যায়। দিলু বুঝতে পারে না,ওরা চটাতে চাইছে ওকে। মাসি আবার বলে ‘যাব তো, আগে তোর বউকে দেখি, যে বিয়ালো তাকে দেখবো না বুঝি।’বীণা দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে হেঁসে বলে ‘কি দেখবে দেখো।’ মাসি বলে ‘হ্যাঁ রে ছলবলি, কী করে ভাগিয়ে ছিলিস এমন মরদ যার অমন দরদ? টাকা তো আমাদের বাঁচতে লাগে আমরা এই ভাবেই কামাই, বেশিরভাগ খচ্চরের পো মাল ছাড়তেই চায় না। তোর মরদ এমন নয়, ওর একটা মন আছে। আমরা ঢ্যামনা দের সঙ্গে ঢ্যামনামি করতে করতে এমন হয়ে গেছি রে। ও চাঁদ, রাগ করিস নি বাবা একবার বউকে বল তোর মেয়েকে কোলে করে আনতে। আমরা সবাই মিলে আশীর্বাদ করি।’ দিলুর বুকের বরফ গলতে শুরু করেছে ততক্ষণে। চোখের ইঙ্গিতে দিলু বীণা কে ঘরে পাঠায়। মেয়ে কোলে আসে বীণা। ওদের তিনজনের মাথায় হাত রেখে বলে জানকী ‘সাবধানে রাখবে মেয়েকে, অনেক নেখাপড়া শেখাবে। আমরা ভবিষ্যৎ দেখতে পাই, যেন মেয়ে বাপ মার নাম উজ্জ্বল করে,বড় বড় পাশ দিলে তবেই ওর খানকি দশা কাটবে। ভালো থেকো মা। ’দিলুকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলে ‘চল রে সবাই। ’সদরে পৌঁছে জানকী আবার ফিরে বীণার দিকে তাকিয়ে বলে ‘আবার বিয়স, ছিমুখ গুলো যেন ফের দেখতে পাই।’ রুমঝুম শব্দে ওরা বেরিয়ে যায়। মাস্টার ভাবতে থাকে বাঁচার সংস্কৃতি মানুষ গড়ার কারিগর। তবুও সংস্কৃতি কোথাও মানুষগুলোকে পুরোপুরি গ্রাস করতে পারে না, মনুষ্যত্ব অবিনশ্বর। সীমা চুপটি করে এতক্ষণ মজা দেখছিল, হা হা করে হেঁসে সে দাদাকে বলে ‘হিজড়ের আশীর্বাদ ও তুমি লাভ করলে,জীবনে আর কোন অভাব রইলনা তোমার।’
দিলু কিছু বলতে গেলে ওকে থামিয়ে দিয়ে বীণা বলে ‘জানো আমার কিন্তু ওদের বেশ লাগলো। তোমাদের নেতা বিশ্বম্ভরবাবু যদি এমন সহজ,সরল হতো,গরীব মানুষ গুলোর বড় ভালো হতো।’ আশ্চর্য হয়ে দিলু বলে ‘এ কেমন কথা, হঠাৎ করে এখানে বিস্বম্ভর বাবু এল কি করে? আর তুমিতো বিশ্বম্ভর বাবুর কথা শোনোনি, তুমি কি করে জানলে?’ স্বামীর কথার উত্তরে বীণা বলে ‘আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনেছি,আর সীমার সাথে আলোচনা করে বাকিটা বুঝতে অসুবিধে হয়নি।’ দিলু বলে ‘সীমা কি বলতে কি বলেছে আর তুমি কি মানে করেছো?’ বীণা বলে ‘বিশ্বম্ভরবাবু বললেন, এগিয়ে যাও কমরেড কিন্তু নেতৃত্ব অজান্তে কিছু করো না। এর মানে তুমি না বুঝলেও আমি বুঝি।’ ‘সত্যিই তো, নেতৃত্বকে না জানিয়ে বড় কোন কাজে হাত দিলে অন্যথা ঘটতে পারে। তখন কি সামলানো যাবে?’ দিলুর এ কথার উত্তরে বীণা বলে ‘এই কথার এই মানে নয, আমার মনে হয় মজুমদাররা এতদিনে খাল-বিল পেরিয়ে গঙ্গায় নোঙ্গর করেছে, এ তারি সাবধান বাণী? যাতে উপরওয়ালা কে জানিয়ে তুমি এগোও সর্বক্ষেত্রে।’ ‘তুমি পার্টি নেতৃত্বের সততায় সন্দেহ প্রকাশ করছো বহু পথ হেঁটে আজ ওনারা এই জায়গায়, ওদের ঝুলি বহু সংগ্রামের ফসলে পূর্ণ। আমার মতো অনেকে ওদের রোপণ করা বীজতলা। যা জানোনা তা নিয়ে কথা বল কেন? ছাড়ো এখন এসব কথা ভালো লাগছে না,খিদে পেয়েছে খেতে দাও।’ ঘুড়ির মতো উড়ছিল মন, লাট দিচ্ছিল ডাইনে বাঁয়ে।সুতোর টানে ঊর্ধ্বমুখী পতঙ্গ খাড়া ছুটতে চাইছিল নক্ষত্রলোকে। হঠাৎ মনোরম হাওয়ার বেখেয়াল চলনে চেত খেয়ে চাঁদিয়াল ধরাশায়ি হয়ে যায়। অনাবৃষ্টির মেঘ ছেয়ে ফেলে মনের কোণ।অভয়ের বুকে চাতকের প্রতীক্ষা। সীমা পুটকির কান্না শুনতে খুব ভালবাসে। মাঝেমধ্যে ওর নাক টিপে ধরে আর পুটকি চিল চিৎকার করে ওঠে। বীণা হঠাৎই সীমার বুদ্ধি কাজে লাগায়, উচ্চগ্রামে কেঁদে ওঠে ঘোষ দুলালী। দিলু সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সীমার কোল থেকে মেয়েকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে পরম আদরে বলতে থাকে ‘কি হয়েছে মা, কে মেরেছে? আমি বকে দেবো খুব বকে দেবো। হঠাৎ ঠাণ্ডা দমকা হাওয়া মেঘ সরিয়ে দিয়ে বৃষ্টি আনে। সবাই হেঁসে ওঠে উচ্চগ্রামে।
ছুটকি এখন একটু মানুষ পানা হতে লেগেছে। বীণা স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে। প্রথমে খুব চিন্তায় ছিল ওরা কার হাতে রেখে যাবে মেয়েকে। সীমা নিরসন করেছিল এই দ্বন্দ্ব। সে বলেছিল আমার বিধবা বোন রিতাকে এনে বাড়িতে রেখে দাও সারাদিন। আর কি, ঋতু আসে ওদের বাড়িতে, সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। দুপুরে মাঠে কাজের অবসরে এখনো অনেকেই আসে মাস্টারের উঠোনে খাবার নিয়ে। এ যেন ওদের ঘর, আর মেয়ে যেন ভূমিকন্যা। এই ভাবেই ছোটবেলা থেকে অনেকের কোলে পিঠে বড় হতে থাকে পুঁটকি। ওরা আলোচনা করতে থাকে মাস্টারদা নিশ্চয়ই অন্নপ্রাশন দেবেন। মাস্টার ইয়ার্কি করে বলে ‘আরে বাঘের বাচ্চার কি অন্নপ্রাশন হয়?’ নিপু বলে ‘দাদা তুমি না, এখন কি উত্তর দেই?’মাস্টার বলে‘ না তোমাদের অন্নপ্রাশন হয়েছে না আমার, তোমাদের ছেলেমেয়েদেরও তথৈবচ,তাহলে ছুটকির কেন হবে? গ্রামে শুদ্ধ পানিয় জলের বড়ো অভাব। বাগদি পাড়ার মানুষজন দূরে জল আনতে যায়। অন্নপ্রাশনের ছুতোয় বাগদি পাড়ায় একটা কল বসালে মানুষের সত্তিকারের উপকার হবে। সেদিন তোমরা খিচুড়ি বানাবে কলধারে আর সেখানেই পাত পেড়ে খাওয়া দাওয়া হবে। খিচুড়ির খরচা কিন্তু তোমরা সারা গ্রাম মিলে দেবে। আমি চাই বাপের অন্ন নয়,গাঁয়ের অন্নে আমার মেয়ের মুখে ভাত হবে।’ সীমা এসে জোটে কথার মাঝখানে, কথার লাগাম মাস্টারের থেকে কেড়ে নিয়ে বলে ‘অনেক হয়েছে, সব ঠিক ঠিক হবে আগে মেয়ের একটা ভালো নাম দাও তো। ’বীণা বলে ‘কৃষ্ণকলি’, রিতা বলে ‘দিদি ছুটকি যখন ঘুমায় থাকে তখন কি যে সুন্দর লাগে।’ সীমা বলে ‘ও মাস্টার দাদা, বলো না ভালো কথায় ঘুমানো কে কি বলে?’দিলু বলে ‘তন্দ্রা’, নবা বলে ‘হবেনি হবেনি, অমন ঘুমঘুম নাম চলবে নি।’ আপাতত মুলতুবি থাকল নাম রাখা, এই অছিলায যে বড় হয়ে কোন হাওয়া বইবে তা বুঝে নাম দিতে হবে। এখন যে যা পারবে সেই নামেই ডাকা হোক। দিলু বলে ‘জানো অন্নপ্রাশনের একটি উপাচার হল ভাগ্য নির্ধারণ।ছেলে বা মেয়ে হাত বাড়িয়ে বই ধরলে বিদ্বান হবে,ধান বা ধনসম্পদ হাতে ধরলে ব্যাবসায়ি হবে,এইসব অবৈজ্ঞানিক ধারণা আমার ভালো লাগেনা।’ হারু বলে ‘আমাদেরতো অন্নপ্রাসনই হয়নি। আমরা তাহলে হেঁসো, কোদাল ধরলাম কেন?’ হা হা করে হেঁসে ওঠে সবাই। ওদের কাছে এ এক খেলা তাই নিপু বলে ‘ওসব জানিনা ছুটকি কে খেলতেই হবে, এ আমাদের দাবি।’ গোমড়া মুখে মাস্টার কিছু বলতে চাইলে বীণা বুঝতে পেরে বলে,‘তুমি বেশী বকবক কোর না, জনমত যা চাইবে তাই হবে।’গাল খেয়ে চুপ করে যায় মাস্টার। সবাই অন্নপ্রাশনের ভাবনায় মেতে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই কল বসানোর তোড়জোড় শুরু হয়।খবর যায় পার্টিরঅন্দরমহলে, সেখানেও আলোচনা শুরু হয়। নিজেকে না পার্টিকে,কাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে অভয়? কানে এসেছিস এসব কথা, কিন্তু এসব নিয়ে বিশেষ কোন ভাবনা ছিল না অভয়ের। হইহই করে অন্নপ্রাশন হয়। টিউবওয়েল মানে চাপা কল যার উদ্বোধন করেন শ্রীমতি বীণাপাণি।
…………………
পাঁচ
বিপিনের একলা চলা
মানিকবাবুর মৃত্যুর পরপর একবার বাতাসী গিয়েছিল শান্তনার বাড়ি। কিরকম খাঁ খাঁ করত বাড়িটা মানিকবাবুর অবর্তমানে। বাড়িতে পা দিয়েই টের পাওয়া যেত ভয়ানক কাশির শব্দ।পরিচয়ের শুরুর পর্ব থেকেই বাতাসী চিনতে পেরেছিল কাশির আবহে জানান দেওয়া পরিবারের অর্থনৈতিক দৈন্যতাকে। এ যেন ঠিক পুরানো সাদাকালো ছবিতে দেখানো দুর্ভিক্ষ পিড়িত নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবার। বাংলা সিনেমার বেড়ে ওঠার দিন গুলোকে মনে পড়ে যেত বাতাসীর। এখন মানিকবাবু নেই,নেই কাশির অনুসঙ্গ, কি রকম ন্যাড়া ন্যাড়া লাগে সবকিছু। আশ্চর্য মানুষের ভাবনার চলাচল। মানিকের একটানা বিরক্তিকর কাশির খুকখুক শব্দে অতীতে অস্থির হয়ে যেত যারা আজ তাদেরই শুন্যতায় একঘেয়ে কাশির বাঞ্জনা। এরা যে বেঁচে আছে তা বুঝতে অসুবিধে হয় বাতাসীর। শান্তনা এমন বাক্যহারা করুন মুখে চেয়ে থাকে যে চলায় বাতাসী অভ্যস্ত নয়। কান্নাহাসির দোলদোলানির মধ্যেই বয়ে যাওয়া বাতাসীর স্বভাব। এখন কোনও কিছুই নতুন করে স্পর্শ করতে পারে না শান্তনা কে। বাতাসী বহু চেষ্টা করেছে,ফল ধরাতে পারেনি নতুন করে পুরানো গাছে। এক ধরণের পদার্থ আছে যা টানলে বাড়ে আবার আরোপিত বল সরিয়ে নিলে নিজের পুরানো স্থিতিতে পৌঁছে যায়, সেই মেটিরিয়াল শান্তনা নয়। চিরটিকাল মানিক বাবুর হাত ধরে কাটিয়েছে,হাঁফ ধরা বুক ভরসা করে আঁকড়ে ধরে। সে ভেবেছিল এমনি করেই দিন কেটে যাবে। ঢালাই লোহা যেমন শক্ত আথচ ভঙ্গুর শান্তনার চরিত্র অনেকটা সেরকম,বহু লড়াই লড়ে নিতে পারে যদি মানিক পাশে থাকে।একদিন জোর করে শান্তনা কে নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল বাতাসী একটা হালকা সাদামাটা মেলোড্রামা। শান্তনা সারাক্ষণ কেঁদেছিল শুধু। বাতাসী শান্তনা কে বলেছিল ‘দেখো কি বিপত্তি, তোমাকে আনলাম একটু সংসার ছেড়ে অন্য ভাবনার ভিড়ে বাঁচার ইচ্ছে জাগাতে। আর তুমি আরো আরো ডুবে গেলে দুঃখের সাগরে।’শান্তনা বলেছিল ‘এ জীবনে আমার বোধ হয় নতুন করে আর ভালো থাকা হবে না।’চুপ মেরে গেছিল বাতাসী ধীরে ধীরে বাতাসীর ও বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়। বিপিনের সঙ্গে বটতলার মোড়ে স্কুল যাওয়ার সময় দেখা হতো। বিপিন এখন নিজের কাজেই ব্যস্ত থাকে অর্কদের বাড়ি যাওয়ার তার ফুরসত নেই।এই ভাবেই বেশ কয়েক বছর কেটে যায় ।অর্ক বাতাসীর জীবনেও ফুরসত কম পালা করে রবিবার গুলো দুই বাড়ির দুই বাবা মাকে দেখতে যাওয়া।বয়স্কদের চাওয়া-পাওয়া মেটাতে সময় চলে যায় তাই সপ্তাহান্তে নিজেদের কাজ কিছুই হয় না ।অর্ক বাতাসীর যৌথ জীবনে এমন ই সুরেলা চলন যা নির্দিষ্ট তাল ছন্দে ওদের জীবনকে বেঁধে রেখেছে। এভাবেই শান্তনার পরিবারের স্বেচ্ছা নির্বাসন ওদের দূরে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল। একদিন সকালে বিপিন বলে ‘দিদি মা আপনাকে যেতে বলেছে অর্ক দা কে সঙ্গে নিয়ে।’বাতাসী বলে ‘কি সৌভাগ্য, তুমি থাকবে তো সেদিন?’ বিপিন মাথা নেড়ে সায় দেয়, ঠিক হয় দিনক্ষণ।
কথামতো দিনে, নিমাইএর ফেলে যাওয়া ঘরে ঢুকে অর্ক দেখে সেই অ্যাসবেস্টস চাল, লাল মেঝে, একশো ওয়াটের বাল্ব অথচ ঘর যেন লাবণ্যে মাখামাখি । অর্ক বুঝতে পারে না কারন ,কোন জাদু কাঠির ছোঁয়ায় মানুষ দুটির মনোজগতে এমন পরিবর্তন এসেছে তার নাগাল পায় না সে ।শান্তনা আপ্যায়ন করে ঘরে বসায় ওদের, অর্ক বলে ‘কি বৌদি কেমন আছেন?’ হেসে শান্তনা জানায় ‘ছেলে যেমন রেখেছে।’ বাতাসী ‘বলে তোমার তো ভরসা ছিল ছেলের ওপর তা সত্ত্বেও তুমি মরে বেঁচে ছিলে। দাদার মৃত্যু একটা বড় ঘটনা,আমি আশা করিনি তুমি আবার আগের মতো জীবন ফিরে পাবে। কিভাবে তুমি দুঃসময় কে পেরিয়ে এলে?’ উত্তর না দিয়ে শান্তনা হাসে শুধু। বাতাসীর চোখে পড়ে শান্তনার মাঝবয়সি শরীরে যেন সুখ পাখি বাসা বেঁধেছে ।অবাক হয়ে দেখতে থাকে বাতসী, এই নতুন শান্তনা কে সে কোনও দিন দেখেনি। গুটি পোকার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা নতুন প্রজাপতি যেন।শান্তনা রান্না ঘরে ঢুকলে বিপিনের সাথে গল্প জুড়ে দেয় অর্ক। বাতাসী, শান্তনার সঙ্গে রান্নাঘরে ঢোকে পিছু পিছু। কাঠের বোর্ড দিয়ে তৈরি সুসজ্জিত রান্নাঘরে ঢুকে বাতাসী দেখে আজকের আধুনিকতায় যাকে মডিউলার কিচেন বলা যায় ঠিক তেমন সুসজ্জিত। এই পরিসরে ওই শৌখিনতা মানায় না,কেন এমন রান্নাঘরের দরকার হল ? বাতাসী ভেবে কূলকিনারা করতে পারেনা। মুখে কিছু জিজ্ঞেস করেনা সে। শান্তনা, বাতাসীর অবাক চাওয়ার কারণ বুঝতে পেরে বলে ‘দেখো না ছেলে নিজের হাতের কাজ দিয়ে রান্নাঘর বানিয়েছে। আমি মানা করলে বলেছে জীবনে তো কিছুই পাওনি উপভোগ করো বাকি জীবনটা । এমন মরার মত বেঁচে থেকে কি লাভ ?’ বাতাসী খুব খুশি হয় মনে মনে বলে ‘আমি হয়তো তোমাদের নিজের লোক নয় তাই অনেক চেষ্টা করেও তোমায় জীবনে ফেরাতে পারিনি। ধন্য তুমি দিদি এমন সন্তান গর্ভে ধারণ করে।’ শান্তনা সলজ্জতা ঝেড়ে ফেলতে হঠাৎ বাতাসী কে এক অমোঘ প্রশ্ন করে বসে 'বিয়ের তো অনেকদিন হলো তোমার বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছে না কেন?’ বাতাসী অঞ্জলী মায়ের সাথে হওয়া অতীত আলাপচারিতার মুহূর্তে ফিরে যায় নিমেষে - স্কুল সেরে চটজলদি বাতাসী আজ বেরিয়ে পড়েছে। বাড়িতে পৌঁছে তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে খুশি মনে অঞ্জলীর ডাকের অপেক্ষা করতে থাকে। যদিও মায়ের ডাকের অপেক্ষা করার মতো ভালো মেয়ে সে নয়। তার ঘরে বসে থাকার আসল রহস্য হলো অর্ক ফিরলে একটু খুনসুটি করা। সারাদিন অর্কর কার ধ্যানে মগ্ন ছিল তার হিসেব নিকেশ সেরে মায়ের ঘরে যেতে চায সে। এমনটা ঘটে না অঞ্জলী নিজের ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলে, 'ওরে বেহায়া মেয়ে, বুবু আজ দেরিতে আসবে ফোন করে জানিয়েছে। অপেক্ষা করে সময় নষ্ট করিসনা আয় আমার কাছে।' হঠাৎ করে বাতাসীর মেজাজটা খিঁচড়ে যায়। কেন অর্ক এমন করলো এমনটাতো কথা ছিলো না। অঞ্জলী বাতাসীর মন পড়তে পেরে নিজেই এসে হাজির হয়ে ঝুপ করে বসে পড়ে মেয়ের ঘরে। কৃষ্ণ ফিরলে আলোচ্য বিষয়ে অঞ্জলীর কথা বলতে অসুবিধে হবে। অঞ্জলীর হাজিরার আবেশে বাতাসীর মনের জমে থাকা মেঘ উধাও হয়ে শরত আলোর বাঁশি বেজে ওঠে। চবুতরার কবুতর বকবক শুরু করে,'জানো মা, আমি আজ সারাদিন আমাদের বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছি। তুমি যদি অনুমতি দাও আমার মা-বাবা কেও সঙ্গে নিয়ে যাব। ওরা জীবনে কোনদিন কোথাও বেড়াতে যায় নি।' অঞ্জলী বলে, 'বেড়াতে যাওয়া পালিয়ে যাচ্ছে না রে পাগলী, আজ আমাকে একটা কথা দিতে হবে।' বাতাসী বলে, 'না, বেড়াতে যাওয়ার সাথে কোন শর্ত চলবে না। আমি যেমন ভেবেছি তেমনই হবে। আমরা মহারাষ্ট্র যাব। মাথেরান লোনাভালা দুধ সাগর আরও কত্ত কী? বৃষ্টিভেজা সহাদ্রী, কি যে সুন্দর আমি ছবিতে দেখেছি। জানো পঞ্চগনি পাহাড়ের মাথা থেকে ঝাপসা এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া যে নদীটা দেখা যায, তার নাম নীরা। মনে হয় সুনীল গাঙ্গুলী নীরাকে ওইখানে খুঁজে পেয়েছিল।' হাসতে হাসতে মাথা নাড়াতে থাকে অঞ্জলী। 'তুমি হাসছো কেন,যাবেনা মহারাষ্ট্র? আমি পুষিয়ে দেব, তোমার পছন্দের পুনেতে থাকবো কিন্তু হ্যাঁ মহাবালেশ্বর যেতেই হবে।' চিৎকার করে অঞ্জলী বলে 'তুই থামবি, হবেখন সব এখন আমি অন্য কথা বলব।' বাতাসী হতাশ হয়ে বলে,' ও তুমি তাহলে বেড়াতে যাবার কথা বলছো না।' যদিও মনে তার আশা জাগে মা মনেহয় বেড়াতে যাওয়ার কথা মেনে নিয়েছে। অঞ্জলীর,'বয়স কত হলো?' এই প্রশ্নে বাতাসীর চিন্তা জাল ছিন্ন হয়। বাতাসী মাথা নেড়ে বলে, 'দুই কুড়ি থেকে চার কম, কেন?' 'কেন বুঝিয়ে বলে দিতে হবে, এরপর বাচ্চা কোলে ঘুরলে বুবুকে লোকে ফাজলামি মেরে জিজ্ঞেস করবে এটা কি নাতি?' অঞ্জলীর অমনধারা কথায় বাতাসী হো হো করে হেসে উঠে বলে, 'তুমি না, আচ্ছা ঠিক আছে কথা বলব ওর সাথে। তুমি এসব নিয়ে এত ভেবোনা। তোমার ছেলে খুবই বুদ্ধিমান হয়ত নিজেই আমাকে জানাবে ওর ভাবনার কথা।' অঞ্জলী নিশ্চিন্ত হয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যায়। বাতাসী কিন্তু ভেসে চলে মায়ের ভাবানো পথে। ছোট্ট গোলগাল দুষ্টু একটা ছেলে, কোল ছাড়া হলেই চিৎকার করছে অথবা চোখ পাকিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বকা দিচ্ছে। বাপের মত লাজুক নয় সে আবার তীক্ষ্ণতায় যেন বাপের নমুনা কপি। আচ্ছা যদি ও বৃষ্টি ভেজা দিনে পিয়ারা গাছের টঙে বসে কোঁচড় ভরিয়ে পিয়ারা খায়, আমি কি বরদাশ্ত করব? উঁহু, আমি বীণা মায়ের মতো খুঁজে বেড়াবো না। আমি বরং অভয় বাবার মতো ছেলের বন্ধু হব। বাতাসীর শেষ স্বগোতক্তি শ্বাস বায়ুর সাথে বেশ জোরেই উচ্চারিত হয় যা ঘরে ঢুকতেই অর্ক শুনে ফেলে। অর্ক শুধোয় 'কার বন্ধু হবে তুমি?' চিন্তার রেশ কেটে গেলে লজ্জা পেয়ে বাতাসী দৌড়ে অন্য ঘরে পালিয়ে যায়। বাতাসীকে ডুব সাগরে ডুবে যেতে দেখে শান্তনার নিজস্ব ভাবনা পথ খুজে নেয় - বাতাসীর মতো এমন সুন্দর মানুষের শরীরে কোন খুঁত থাকতে পারে না। আবার অর্ক, সে তো এক পরিপূর্ণ মানুষ তার জীবন নিখুঁত, এর অন্যথা হলে ভগবানে বিশ্বাস হারাতে হবে। অতীত ভেঙ্গে জেগে উঠে বাতাসী চুপ মেরে যায়, বুকটা কেমোণ টনটন করতে থাকে। মিথ্যে কথা বলার অভ্যাস তার নেই। ছোটবেলায় বাতাসী মায়ের ঠ্যাঙানি এড়াতে মাঝেমধ্যে মিথ্যা বলেনি এমন নয়। শান্তনার প্রশ্নর উত্তর সবটা বাতাসীর জানা নেই, সে জোর করে গলা তুলে বলে ‘সন্তান ধারণ না করা আমাদের যৌথ সিদ্ধান্ত। আমরা ঠিক করেছি আমাদের রক্তের সন্তান জন্ম নেবে না।’ শান্তনা এই কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে গ্যাস উনুনে চাপানো চাটুতে মনোসংযোগ করে। একথা বলার সাথে সাথেই বাতাসী মনে ভাবে এই সংস্কার দর্শন আমি ছোট থেকে লালন করিনি, আমার ইচ্ছে ছিল বিয়ের পিঁড়ি তে কনে সেজে বসার, সাতপাক ঘুরে শুভদৃষ্টি সেরে মালাবদল করা। অর্ক জোর না করেও তার বিশ্বাসের দায় আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। সে বুঝিয়েছে কেন ধর্মীয় আচারের কারনে নীতি ভাঙ্গা চলেনা, আমি মেনেও নিয়েছি। একই ভাবে সে আমাকে বুঝিয়েছে সবাই রক্তের সন্তান গর্ভে ধারন করে। তুমি যদি দিনহীন কাউকে সন্তান স্বীকৃতি দিয়ে মানুষ কর তাহলে কেমন হয়? ওর ভাবনার রোমান্টিকতা ভীষণভাবে স্পর্শ করেছিল আমাকে,কাঁটা দিয়ে উঠেছিল আবেগে সারা শরীর। হঠাৎ ই বাতাসীর মনে হয়, অর্ক কী কিছু লুকাচ্ছে? কেন আমি জানব না কার ত্রুটির কারনে আমাদের সন্তান আসবেনা? অর্ক কি সব জানে? এটা ধরেই নেওয়াই যায় ও নিজের দোষ লুকিয়ে রাখার জন্য কৌশলের আশ্রয় নেয়নি। তাহলে কি আমার কোন ত্রুটি আছে? কৌশল মানে বিবাহের বেশ কিছুদিন পরেও যখন বাতাসী সন্তানসম্ভবা হল না তখন বাতাসী কে না জানিয়ে অর্ক নিজের ডাক্তারি পরীক্ষা করিয়ে নিয়েছিল। যা থেকে সে জানতে পারে সন্তান উৎপাদনে নিজের শারীরিক সক্ষমতার কথা। এই সত্য প্রকাশ না করে বাতাসী কে দিয়ে ওরকম প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেয় যে তাদের রক্তের সন্তানের প্রয়োজন নেই। এর কারণ বিয়ের বছর দুই পরে ঘটা আরেকটি ঘটনা। হঠাৎ করে একদিন রাতে বাতাসীর পেটে খুব ব্যথা হয়। সেই রাতেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিলো তাকে। ডাক্তার আপার লোয়ার আবডমেন ইউএসজি করে অর্ক কে বলে ‘গলব্লাডার স্টোন হয়েছে অপারেশন জরুরী। কিন্তু একটা বিষয় আপনার জেনে রাখা দরকার আপনার স্ত্রী কোনদিন সন্তান ধারণ করতে পারবে না। ওনার ইউটেরাস ইমম্যাচিওড।’ মনে মনে অর্ক চেয়েছিল বাতাসীর কাছে প্রমাণ করতে নিজের ইম্পটেন্সি। তাই নিজেকে পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। সেখানেও কোনো সাহারা না মেলায় বাতাসী কে চুক্তি করে বেঁধে ফেলতে চেয়ে ছিল এমন অদ্ভুত নিগড়ে। আজ হঠাৎ করে শান্তনার নরম খোঁচায় বাতাসীর সুপ্ত চাওয়া জেগে উঠলো। শান্তনার রাঁধাবাড়া ততক্ষণে সম্পূর্ণ দুজনে হাতে হাতে খাবার দাবার নিয়ে ঘরে ঢুকেছে যেখানে বিপিন আর অর্ক গল্পে মত্ত। বিপিন দু একবার রান্নাঘরে ঢুঁ মেরেছিলো কথার ফাঁকে। কিন্তু একমনে মাকে রান্না করতে দেখে সে ঠাওর করতে পারেনি আবহাওয়া। বাতাসীদি কে কয়েকবার দেখা দিয়ে নজর কাড়তে বিফল হয়ে বিপিন অর্কদার কাছে ফিরে গেছিল। ঘরে পা দিয়ে নিজেকে ছাপিয়ে বাতাসী অর্ক আর বিপিনের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় ‘কী মশাইরা, এমন গল্পে মশগুল ছিলেন যে ভিতরে যেতে পারলেন না?’ অর্ক কিছু বলেনা উপযাজক হয়ে বিপিন বলে ‘আমি দুবার গিয়েছিলাম আপনি তো খেয়ালই করলেন না।’ বাতাসী কিছু বলতে গিয়ে থমকে গিয়ে অর্ক কে বলে ‘ভেতরে গিয়ে রান্নাঘরটা একবার দেখে এসো।’ অর্ক বলে ‘তার চেয়ে বরং তুমি এই ঘরটা খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ কর, আবিষ্কার করার চেষ্টা কর নতুন কিছু।’ অর্কর কথায় ঘরের আনাচে-কানাচে চোখ চালাতে শুরু করে বাতাসী। প্রথম যে জিনিসটা ওর চোখে পড়ে সেটি রবীঠাকুরের একটি কাঠখোদাই মূর্তি। হঠাৎ করে বাতাসী ফিরে যায় সেই সকালের স্কুল যাওয়ার মুহূর্তে। যেদিন বিপিন বিহ্বলতা নিয়ে কবুল করতে বাধ্য হয়েছিল ‘মায়াবন বিহারিনী হরিণী’র সুরে সে মশগুল ছিল। যার রেশ ধরে ঠেস দিতে মন্টুর কৌতুক ও মনে পড়ে যায় বাতাসীর। আগে কখনো ভাবেনি আজ ভেবে অবাক হয় বাতাসী, বট তলার মোড়ে দাঁড়িয়ে কেউ কেন মায়াবন বিহারিনী গাইবে? কিন্তু মায়াবন-বিহারিণী গাওয়া আর সত্যিকারের রবীন্দ্র প্রীতি জন্মানো এক নয়। তাই শেষমেষ বাতাসী জিজ্ঞেস করেই ফেলে ‘বিপিন তোমার রবীন্দ্র ভজনা আমার অজানা ছিল। কী করে রবি ঠাকুর তোমাকে এমন করে ডাক দিল যার কারনে তুমি এমন শিল্পকর্ম সৃষ্টি করতে পারো?’ বিপিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে কথা না বলে। তার নিস্তব্ধতা খোঁচাতে থাকে বাতাসীকে। বাতাসী জানতে চায় উত্তর । বিপিন মেধাবী অংক, বিজ্ঞান ও সাহিত্যে তার বুদ্ধিদীপ্ত অগ্রগতি প্রমাণিত সরকারী সিলেবাসে। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য বাংলা সাহিত্যের সিলেবাস এর ওজন এমন ভারী নয় যা সাহিত্যে ভালোবাসা জাগাতে পারে। খুব স্বাভাবিক কৌতুহলে বাতাসীর এই প্রশ্ন। শেষমেষ বাধ্য হয় বিপিন উত্তর দিতে কারন অর্কদাও রীতিমতো পেড়াপিড়ি করছিল। সে জানায় ‘নিচু ক্লাসে পড়েছিলাম - এক দিন ভাবে ফুল উড়ে যাব কবে/ যেথা খুশি সেথা যাব ভারি মজা হবে। সেই মুহূর্ত থেকেই ভালো লাগা আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার জীবনের কল্পনার প্রথম আশ্রয় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আজ আমার জীবনে যে পরীক্ষিত সফলতা তার বীজ কিশলয়ের পাতায় প্রোথিত ছিল। অর্কদার বিভিন্ন গল্পে আমি উজ্জীবিত হয়েছি কিন্তু শেষ কয়েক বছর আমাকে রবীন্দ্র অনুরাগ যিনি শতগুণে বাড়িয়ে দিয়েছেন ….।’ অবাক হয়ে শুনছিল স্বামী-স্ত্রী বিপিনের কথা। হঠাৎ বিপিন হোঁচট খেলে ওরাও থমকে যায় । এ যেন হঠাৎ করে দ্রুত গতিতে চলা যান ব্রেক কষেছে । অর্ক জিজ্ঞেস করে ফেলে ‘তার কারণ কি, কে সেই কারণ?’ আরেকবার মাথা নিচু করে বিপিন জানায় ‘তার রবীন্দ্র প্রীতির কারণ ‘বাতাসীদি।’ লজ্জায় লাল হয়ে যায় বাতাসী। অর্ক কিছু কম আশ্চর্য হয়নি। বিপিন ওদের আর ধোঁয়াশায় রাখতে চায়নি। সে বলে ‘আমি যখন আপনাদের বাড়িতে কাজ করতে যেতাম তখন দিদির মিষ্টি কন্ঠের গায়কী আমাকে মুগ্ধ করে। ওনার গলায়- আমারে তুমি অশেষ করেছ বা দূরদেশী সেই রাখাল ছেলে আমাকে রাঙিয়ে দিয়ে গেছিল। আজ আমি তাই আদ্যান্ত এক রবীন্দ্রপ্রেমী.’ চুপ করে যায় দুজনে ।অর্ক প্রথম কথা বলে নিস্তব্ধতা ভেঙে ‘জানো বাতাসী, বিপিন মাইকেল ফ্যারাডের একটা কাঠের মূর্তি বানিয়েছে।’বাতাসী বলে ‘কই আমাকে তো কিচ্ছুটি দেখাও নি তোমার অর্ক দা বুঝি খুব প্রিয় তাকে সব কিছু ঘুরিয়ে দেখানো হয়ে গিয়েছে এর মধ্যে।’বিপিন মুচকি হাসে, শান্তনা বলে ‘বাতাসী, তোমরা জানো না তোমরা ওর জীবনে কি?’ শান্ত্বনার এমন গভীর কথায় বাতাসী চমকে যায়। বাড়ি ফেরার পথে দুজনে আলোচনা করে তল পায়না শান্তনার জীবনে পরিবর্তনের উৎসমুখের সন্ধান ।
এখনো হাফ পাতলুন
দেওয়ালে দেওয়ালে স্লোগান, ছন্দের বন্যা। একটা টুপি পরা গোলগাল চ্যাপ্টা মুখ চেয়ে আছে আকাশ ভরে। পাশে লাল কালিতে লেখা ‘চীনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান। চীনের পথ, আমাদের পথ।’ কিরকম একটা লেফট-রাইট মার্কা গন্ধ নেশা ধরায় বুবুর হৃদয়পুরে।এই ছন্দে কল্পিত দল নিয়ে হাঁটতে থাকে সে। আনমনা ভাবনায় কল্পনার লাল ইউনিফর্ম চড়ে বসে নিজেদের গায়ে। লাল কেন? হয়তো রতনদার গলায় ‘আমাদের প্রিয় রং লাল’ শুনে বুবু মোহাবিষ্ট ছিল। স্বপ্নের মিছিলের অগ্রভাগে বুবু সদা জাগ্রত প্রহরী, পচা সবার পিছনে। মাঝে টুলটুল, মনি, পাগলা আর বিজয়। পাঁচু অদূরে ভ্যাবলা হয়ে দেখছে ওদের। স্কুলের মালি,স্বপন কাকা, দেখে বুবু পিঠে ব্যাগ নিয়ে বাড়ির পথে না হেঁটে আনমনে উল্টো দিকে যাচ্ছে।স্বপন কাকা বুবুর মাথায় একটা ছোট্ট টোকা মেরে জিজ্ঞেস করে ‘এই পাগলা, এদিকে কোথায় যাচ্ছিস?’তাইতো! চমকে ওঠে বুবু।স্বপনকাকার হাতের নাগাল এড়িয়ে সে এক ছুট দেয় বাড়ির দিশায়। বাড়ি পৌঁছে স্কুল ব্যাগটা বিছানায়ছুঁড়ে ফেলে মায়ের কাছে হাজির হয়।মা জিজ্ঞেস করে ‘কিরে! আজ যে এত দেরী হল?’উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করে বুবু ‘মা, ও মা, বলোনা টূপিপরা লোকটা কে?’মা বলে ‘আচ্ছা পাগল তো। কোন টুপি পরা লোকটা?’ ‘আরে বাবা! দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা কালো ছবি। উনিই কি চীনের চেয়ারম্যান ? কেমন অং বং চং নাম!’হতবাক অঞ্জলি, গুম মেরে যায়। পুলিশ, সি.আর.পি.এফ কাউকে ছাড়ে না। যদি রাস্তায় ছেলের বেফাঁস কথায় বিপদ এসে হাজির হয় ঘরে।ওর বাপতো মরবে চাকরিটাও যাবে। খেতে না পেয়ে মরতে হবে আমাদের। অঞ্জলিকে চুপ মেরে যেতে দেখে একটু সময় নিয়ে পাগলটা বলে ‘তুমি যতটা ভাবছো আমি ততটা বোকা নই।’
আজ শনিবার বাবা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। ঘরে ঢুকেই কৃষ্ণবাবু টের পায় অঞ্জলি ছেলের কাছ থেকে কিছু গোপন করতে চাইছে। বাবা উত্সাহ দেখিয়ে বুবুকে জিজ্ঞেস করে ‘কি জানতে চাস বল?’ ছেলে ফস করে বলে ‘চেয়ারম্যান মানে কি?’কৃষ্ণবাবু বলে ‘কোথাকার, কি চেয়ারম্যান?’‘ওই যে দেওয়ালে লেখা, চীনের?’, বুবু বলে। কথা শেষ করতে না দিয়ে বাবা বলেন ‘চীন দেশের প্রধান কে ওই নামে ডাকা হয়।’ চীন কতদূর জিজ্ঞেস করায় কৃষ্ণবাবু ম্যাপ নিয়ে বসে পড়েন বুবুকে বোঝাতে। বুবু বুঝে নিয়ে বলে ‘ওরে বাবা সে তো অনেক দূর, সেখানকার চেয়ারম্যান আমাদের দেশের চেয়ারম্যান হতে যাবে কেন?’চটজলদি কি উত্তর দেবেন ভেবে না পেয়ে কৃষ্ণ বলেন ‘উনি খুব ভালো মানুষ, ওঁর দেখানো পথে হেঁটে যদি আমাদের দেশকে অমন সুন্দর করতে পারি, ওনাকে তাই আদর্শ মানা। দেওয়ালে দেওয়ালে কীর্তিকাহিনী লিখে তারই আয়োজন।’‘কেমন সুন্দর বাবা, চীন দেশ?’ এই প্রশ্নের উত্তর কি দেবেন ভেবে পায়না কৃষ্ণ।কি হলে দেশ সুন্দর হয় এও জানতে চায় ছেলে। কৃষ্ণ জর্জরিত হয় প্রশ্নবানে, কিছুতো উত্তর দিতে হবে। কৃষ্ণ বলেন ‘ওদেশের লাল সেনা সি.আর.পি.এফের মতো রাজার লোক নয়, সাধারন মানুষের রক্ষাকর্তা। ওই দেশে সবাই খেতে পায়।’ বুবু বলে ‘যেন বাবা আমি ঠিক করেছি আজ বিকেলে লাল জামা পড়ে, লাল সেনা হয়ে, সবাইকে নিয়ে লেফট-রাইট খেলবো। শুধু বিজয়ের লাল জামা নেই। ওকে বলেছি লাল এর মতো কোন রঙের জামা পরতে।’ বাবা হেসে বলে ‘এটা কি নতুন খেলা?’ ‘আবার গানও করব।’ বুবুর উত্তরে বাবা বলে ‘কী গান আবার?’ ‘তোমরা যে গান শেখাও নতুনদের -আজ মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দুটি দল। প্রথমটায় কৃষ্ণ বাবু ইয়ার্কির ভাষায় বলে ‘চাঁদু গেয়ে শোনাও তো দেখি’। কচি, সুরেলা গলায় দৃপ্ত ভঙ্গিমায় বুবু গেয়ে ওঠে-‘কোন দিক সাথী কোন দিক বল কোন দিক বেছে নিবি তুই।’ কৃষ্ণ বাবু এবার সত্যিই ঘাবড়ে গিয়ে বলেন রাস্তায় এইসব করিস না। পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে।’ অবাক হয়ে বুবু বলে ‘গান গাইলেও পুলিশ ধরে?’ বাবা হেঁসে বলে ‘ওরাতো রাজার পুলিশ।’ পিসি ঠাকুমার কাছে ভালো রাজার কত গল্পই না শুনেছে বুবু, ও জিজ্ঞেস করে বাবাকে ‘আমাদের দেশের রাজা বদমাশ কেন?’ বাবা বলে ‘রাজা কখনও ভাল হয় না বাস্তবে, রূপকথায় হয়। তুই“আমরা সবাই রাজা” গানটা শুনেছিস রবি ঠাকুরের?’‘শুনেছি তো, কিছু বুঝতে পারিনি।’ কৃষ্ণ বলে ‘এর মানে হল সবার পেটে ভাত কাপড়ের যোগান আর শিক্ষার ব্যবস্থা করা। দেশের প্রধান যিনি তার একমাত্র কাজ হবে এই সবের জোগান দেওয়া।’ কৃষ্ণর এই কথার প্রত্যুত্তরে বুবু বলে ‘চীন দেশের মতো?’ বাবা বলেন ‘যা এবার খেলতে যা।’ বুবু বলে ‘ বাবা, মাও-রাজা ঘোড়ায় চড়ে?’ বাবা হেসে ফেলে এবার।‘মাঠে যা, তোদের এইসব যেন খেলতে না দেখি?’
বুবু চলে গেলে অঞ্জলি বলে ‘হ্যাঁগো,ওকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দাও।’ কৃষ্ণ বলে ‘তুমি ওর শৈশবের গাঁথুনি নড়বড়ে করে দিতে চাও?’ মানুষের শরীরের মতো মনও হয়তো অজস্র কোষের সমাহারে গঠিত যার পরতে পরতে বিভিন্নতা। কৃষ্ণ আগুনে-রাজনীতির লোক হয়েও বারণ করছে ছেলেকে নকশালবাড়ি খেলতে, আবার স্ত্রী কে আশ্বস্ত করার সময়ও টের পাওয়া যাচ্ছে দৃপ্ততার অভাব। অঞ্জলি পরিচিত কোন কমরেডের দেওয়া পাইপগান অবলীলায় পেটিকোটে লুকিয়ে রাখতে পারে আবার মায়ের ভীরু মন একইসাথে ছেলেকে বোর্ডিং হাউসে পাঠাতে চায়। সন্তান বোধহয় এমনই যাকে পৃথিবীর সমস্ত ঝঞ্জা থেকে আড়াল করে রাখতে চায় প্রাণ।
বুবুর কাছে বন্ধুরা সময়ের হিরোদের গল্প শুনতে চাইতো। ঠাকুমা, পিসিমার কাছ থেকে শোনা ঠাকুরমার ঝুলি, রামরাবণ,হনুমানের বীরগাথা ওদের এখন পানসে লাগে।জ্যান্ত হিরোদের যখন রাস্তায় বেরোলেই চোখে দেখা যায়।জীবন এখন এক জীবন্ত রূপকথা, রাজা হরিশচন্দ্রর সত্যবাদিতা টুলটুল নস্যাৎ করে দেয় মুহূর্তে। ঠাকুমা কে সে বলে ‘পারবে ক্যাবলাদার মতো তিন ডিগ্রি সইতে?’ ঠাকুমা অবাক ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে প্রাণাধিক নাতির দিকে। পুঁচকে ছোঁড়ার বচন বড়ই অদ্ভুত লাগে ঠাকুমার। তিনি নাতি কে বলেন ‘ক্যাবলাতো মিছে কথা বলে পুলিশকে,সব জেনে কিছু জানিনা বলা ঠিক?’ টুলটুল বলে ‘মা বায়স্কোপ দেখতে যাবার কথা আলোচনা করছিল জমুনা পিসির সাথে তুমি বাবাকে বললে বউমা বাড়ির ঝি এর সাথে সিনেমা দেখতে যায়।’ থমকে যান প্রবীণা। ছোঁড়ার বাঁদরামি বার করতে হবে, নিজের আকাশচুম্বি ইগো নিমেষে চুরমার হয়ে গেছে। কিন্তু এত সাহসিতো ছিল না টুলটুল, ওর বাপকে জানাতে হচ্ছে। টুলটুলের বাবা
বাড়িতে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুমা ছেলেকে জানায় ‘ওকে যেন বুবুদের বাড়ী যেতে না দেওয়া হয়।’
কত রকম আজগুবি গল্পে ওরা নিজেদের তৈরি করে মনে মনে। আমিও ছোটনদা হব। দু হাতে পিস্তল নিয়ে গোটা পুলিশ বাহিনীর বুক চিরে বেরিয়ে আসব ।আর ওদের সেই সময়ের কথক ঠাকুর বুবু। মনি,পচা সবাই উন্মুখ হয়ে থাকতো কবে বুবুর বাবা মিটিং করবে তার অপেক্ষায়। মধ্যে এই বোধ জন্ম নিচ্ছিল ভেতরে ভেতরে, সব কথা সবার মাঝে প্রকাশ করতে নেই। কমরেডরা চাইতো বুবু যেন আলোচনার সময় ঘরে না থাকে। মাঝে মধ্যেই বুবুরা পাইকপাড়ায় মামার বাড়ি যেত, সেইসময় জোরদার মিটিং চলত ওদের বাড়িতে। বুবু তাই একদম মামার বাড়ি যেতে চাইতোনা। বন্ধুদের কাছ থেকে সে জানতে পারত ওদের না থাকার সময় ঘটে যাওয়া মিটিঙের খবর।‘ মামার বাড়ি ভারী মজা’,বড় আদরের উষ্ণতা তুলনায় শিতল লাগত। মদন ভীষণ রোম্যান্টিক। সে খোয়াব দেখত বুবুকে ঘিরে, সে ভাবত বুবুর জীবনের রাজনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলার পাঠশালা এই ঘর। মদনের ইচ্ছাতেই স্থান পেত বুবু মিটিঙে কখনো সখনো। পার্টি কমরেডদের ধারণা ছিল বুবুর কারণেই মিটিং এর আলোচনা সাত কান হয়,এতে বিপদের সম্ভাবনা বাড়তেপারে।বিভিন্ন সময় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে আলোচনা চরম পর্যায়ে পৌঁছাত। বুবু এর মধ্যে কখনোই খুঁজে পেত না অভিযোগ প্রতি অভিযোগে কোন শত্রুতা আছে। স্লোগানে, দেওয়ালে,খতমে,বিপ্লব কু-ঝিকঝিক তুফান মেল যেন হাওয়া কেটে এগিয়ে চলেছে। বুবু দেখত শেষমেশ আলোচনায় ওর বাবাই ছিল শেষ কথা। এই নিরুচ্চার মেনে নেওয়া বুবুর মতে খুব জরুরী, ক্লাস রুমে যেমন শিক্ষকের কথা মেনে নিতে হয় ।
খুব বেশি দিন সুখ বসন্তের দখিনা বাতাস সুখ পরশে রোমাঞ্চিত করতে পারেনা সময়কে। আকস্মিক কালো মেঘ বয়ে আনে ভয়ঙ্কর কালবৈশাখী, আকাশের বুক চিরে নামে বিজলীর ঝড়। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় গোটা পৃথিবী। এমনই এক মিটিংয়ে বুবু বুঝতে পারে দলে ফাটল ধরেছে। মিটিং এর মধ্যে বিশুকাকা সরাসরি বলে ‘দাদা আপনাকেতো বন্দুক নিয়ে ঘুরতে হয়না,আপনার চাকরিও অটুট থাকে। ঝামেলা বাড়লেই আন্ডার গ্রাউন্ড।আমরা শালা সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে আপনাদের ফাই ফরমাশ খেটে জীবন বাজিরেখে মরবো, আর আপনারা দিব্বি থাকবেন,এমনটা হতে পারেনা। বিপ্লবেরস্বার্থে, জনগণের স্বার্থে আপনারা যা বোঝাবেন আমরা আর তা গিলবো না।’বুবু জানে না বাবার মাঝে মাঝে হারিয়ে যাওয়ার রহস্যময়তার কারন। মা বলত‘বাবা রেলের কাজে গেছে।’ মাঝে মাঝে অবাক হতো সে অফিসের কাজে কেউ এতদিন যায়? আজ বিশু কাকুর কথায় কেমন খটকা লাগে। বাবা আর মদন কাকুর দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে কারও মিল খাচ্ছেনা, অন্য কথা বলছে বাকিরা। মদনকাকু বলে‘তোমরা যারা অবিভক্ত পার্টির মেম্বার তারা চিরকাল বিপ্লবভীরু,খতমে অবিশ্বাসী।’অবিভক্ত পার্টি, ভীরু, এত্তরকম কথার কচকচি বুবু বুঝতে পারেনা। ওভাবে কেন মদনকাকু রবিনকাকু,তুলসীকাকুদের ভীতু বলছে। রবীনকাকু ওর কাছে কর্ণ সমতুল্য। বুবুর মাথামুণ্ডু গুলিয়ে যায়। জীবনে এই প্রথম খতমের রাজনীতি ওর অভিধানে শব্দগত ভাবে ঢুকে পড়ে। যদিও খতমের অভিযান ও প্রত্যক্ষ করেছে দূর্গাপূজার দশমীর দিন সকালে। ক্যাপ ফাটানো রিভলবার একহাতে আর অপর হাতে নাটবল্টু নিয়ে বুবু ইয়ুথ স্পোর্টিং ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়েছিল। মনি তখন হঠাৎই খেলনা রিভলবার তাক করে গুলি ছোটায় বুবুর দিকে। বুবুনাট-বল্টুচার্জকরে, কিন্তু ফাটে না। মনির অট্টহাসিতে রাগ হয়ে যায় বুবুর, হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে খুঁজতে থাকে চার্জ না হওয়া নাট-বল্টু। ঠিক সেই সময় মনির চিৎকারে মাথা তুলে দেখে এক সাদা পোশাকের পুলিশ কাতরাচ্ছে মাটিতে পড়ে। দুজন অচেনা লোক দৌড়ে পালাচ্ছে বড় ময়দানের দিকে, হাতে ভোজালি। হতভম্ব বুবু বুঝতে পারেনা পুলিশ কাকার অন্যায়। উনিতো একটা লাঠি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন প্যান্ডেলের সামনে!
কাকা আর সি.এম. দুটি দল,কাকার পক্ষে বেশিমানুষ সি.এম.এরপক্ষে কেবল বাবা আর মদনকাকু। আপন বোধ দিয়ে সে বোঝে সি.এম. খতমের রাজনীতির স্রষ্টা।খতম করা হবে খারাপ লোকেদের যারা গরীবকে ঠকায়। এতে দোষ কোথায়, রঘু ডাকাততো ডাকাতিকরেগরিবদের সাহায্য করত ? আর যদি সব চোর ডাকাত লুটেরা শেষ হয়ে যায় তাহলে তো গরিব লোকেরই ভালো। বিশুদা বলে ‘এইভাবে ঠগ বাছতে গাঁউজাড় হবে।’এর মানে বুবু করে এইভাবে সবমানুষ শত্রুতে পরিণত হবে। আর সব্বাইকে নিকেশ করা মুর্খামি।নিজের প্রশ্নর উত্তর বুবুই দেয় । বেশির ভাগ মানুষ তো খারাপ নয়, খারাপ লোকতো সংখ্যায় কম? ওর বন্ধুদের মধ্যে তেমন খারাপ কাউকে ও খুঁজেই পায়না। পাঁচু নিজের বাবার কথা মেনে ওদের সঙ্গে থাকে না ঠিক কথা, কিন্তু খেলার সময় খেলতে আসে। ইদানিং সে আর আসছেনা, আসবে কি করে? বিজয় ওকে এমন ভাবে গদ্দার বলল,ও কোন মুখে আসবে? কিন্তু ও দেখেছে যখন কেউ মার্বেল হেরে যায়,পাঁচু তাকে ধার দেয়। কখনো সখনো দিয়েও দেয় মার্বেল একেবারের জন্য। মিটিংয়ে বসে কিছুক্ষণের মধ্যেই বুবু বুঝতে পারে ওর বাবার পক্ষে কমরেডদের সংখ্যা প্রায় নেই।শুধু মদনকাকু বাবার সমর্থনে বিতর্কের সওয়াল এগিয়ে নিয়ে চলে। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর কৃষ্ণ বলে ‘আসলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তোমরা ভয় পেয়েছ তাই মতবাদের আড়ালে আশ্রয় নিতে চাইছো। প্রত্তুতরে চেঁচিয়ে উঠে রবিন বলে, ‘ নেপাল, শিবেনের মত লাফাঙ্গারা মরে আপনারা নিরাপদে থেকে জান।‘ সব পেয়েছির দেশের স্বপ্ন অলীক
বাক-বিতণ্ডায় আবহ বদলে যাচ্ছে। অনেকের চোখেই হিংসার নখদাঁত অনুভব করা যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে ওঠে বুবু। বাপের প্রত্যক্ষ অপমান সহ্য করতে না পেরে কাঁদতে কাঁদতে একছুটে স্কুল মাঠে পৌঁছে যায় সে, যেখানে সাথীরা ফুটবল খেলছে। সাথীরা মিটিং এর কথা জানতো।এও জানতো যে বুবু আজ খেলতে আসবে না। বুবুকে হঠাৎ মাথানিচু করে পাঁচিলের ওপর বসে থাকতে দেখে শিকেয় ওঠে ফুটবল। কেউ কেউ পাঁচিলের ওপর ওর পাশে বসে, বাকিরা নিচে দাঁড়িয়ে। কাছাকাছি থেকে সব শুনতে চায়। টুলটুল বলে‘ কিরে, কিহয়েছে? ’ঝড়বৃষ্টির আগে বাতাসের গুমোট ভাব যেমন এক লহমায় ওলট-পালট হয়ে যায় দমকা হাওয়ায়,বুবুর কান্না রুদ্ধ কণ্ঠস্বর চোখের প্লাবনে ভেসে বন্ধু দের সব জিজ্ঞাসা কে নস্যাৎ করে দিয়ে বলে, ‘সবার আর রাজা সাজা হল না।’ গভীর হতাশায়, বাপের অপমানে কণ্ঠস্বর বুজে আসে। একটাও কথা বলতে পারেনা আর।অজস্র প্রশ্ন ওর কানে ভেসে আসতে থাকে,ও কোন উত্তর করেনা শুধু বুঝতে পারে সব পেয়েছির দেশের স্বপ্ন অলীক।
সেদিনের বাক বিতন্ডা অবশ্য থেমেছিল বুবুর কারণেই, মদন বলেছিল ‘দেখলি,তোদের প্রকাশ ভঙ্গিমা একটা শিশুর মনকে কেমন নাড়া দিয়ে গেল।’ মিটিং সেরে মদন সোজা স্কুলমাঠে হাজির হয়। মদন বুবুকে খুব ভালোবাসে, কিন্তু শুধুমাত্র এই কারণে সে স্কুল মাঠে যায়নি। তার জানতে ইচ্ছে করছিল নিজেদের, বুবুর আয়নায়। কিছুই না বুঝে এমন একটা মারমুখী, জম জমাট মিটিং ছেড়েকান্নাভেজাচোখেকেউপালাতেপারে তার প্রকৃত কারন জানতে চায় সে।ওর মনে হচ্ছিল বুবু বাপের অপমান সইতে পারেনি।তার অনুমান ঠিক, বুবু মাঠেই এসেছে,স্কুলগেটের ঘোরানো দরজায় পাক দিয়ে ঢুকে পড়ে, মদন লম্বা ফালি আঙিনা ধরে হাঁটতে থাকে । প্রথমেই তার চোখে পড়ে দল ছুট পচার আনমনা ফিরতি চলা। মদন কাকুকে দেখে পচার উদগ্রীব জিজ্ঞাসা – বলোনা কাকু গরীব মানুষের কি রাজা সাজা হলোনা?’ বুবুকে খোঁজার সব প্রয়োজন মিটে যায় মুহূর্তে। নিজেকে খুব ছোট মনে হয়, নিজের চিন্তা ধারার ওপর মদনের প্রচ্ছন্ন গর্ব নিমেষে ভূলুন্ঠিত হয়। শিশু চেতনার স্ফটিক তুল্য স্বচ্ছতা শিল্পীদের কাছে স্বাভাবিক হলেও, আগুনখোর বিপ্লবীদের কাছে জটিল, দুর্বোধ্য। স্কুলের চাতালে থম দিয়ে বসে পড়ে মদন,শূন্য ভাবনা হীন সময় বয়ে চলে।
সিংহরায় দের রোয়াকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পাগলটাকে দেখে বুবু, হিহি করে হাসে। সেও বুবুকে দেখলেই হাসিতেই প্রত্যুতর দেয়,এমনটা ক'দিন ধরে চলেছে। কখনও সখনও বুবু দাঁড়িয়ে পড়ে ওর সামনে, হিহি, হাহা, হিং টিং ছট গল্প চলতে থাকে নিজেস্ব ভাষায়। যেখানে ওর বয়সের সকলে পাগলকে দেখলে ভাঁড় মারে। বুবু থাকলে বন্ধুরা পাগলকে উত্ত্যক্ত করতেপারেনা, বুবু রাগ করে। পাগলকে ক্ষেপালে সেও তাড়া করে ছুটে যায়। পোঁটলা পুঁটলি রেখে,কম্বল গায়ে উঠতে উঠতে বদমাইশরা পগারপার। বুবুর সঙ্গে বন্ধুর আজ কথা হয় না। বুবুর তাড়া আছে,মা রান্না চাপিয়ে বুবুকে হলুদ আনতে পাঠিয়েছে । তাই ফুরসত পায় না সে পাগলের সঙ্গে গল্প করার। লাফাতে লাফাতে বুবু দোকান চলে যায়।দোকানে একটু ভিড়ছিল, দেরি হয়ে যায় তাই। ফিরতি পথে বুবু চাতালের দিকে চেয়ে দেখে পড়ে আছে লোটাকম্বল,পাগলহাওয়া। এদিক ওদিক তাকিয়ে ঠাওর করতে পারে না পাগলের অবস্থান একটু এগিয়ে এসে দেখে একটা জটলা। বড়ো সড়ো লম্বামাথা ওয়ালা লোকেরা আলোচনায় ব্যস্ত। কিভাবে, কেন ওরা ওকে তুলে নিয়ে গেল? বুবু বুঝতে পারেনা পাগলটাকে কেউ তুলে নিয়ে যেতে পারে। চলতে থাকে বিভিন্ন মানুষের টীকা, টিপ্পুনি। আলোচনা থেকে বুঝতে পারে পাগল আসলে নাকি পুলিশের চর। মেলাতে পারেনা নিজের ভাবনা বড়দের সাথে।অতিরিক্ত উৎসাহে একজনকে জিজ্ঞেস করে ফেলে‘ জেঠু ও জেঠু,ওরা কী করবে পাগলা কাকুকে নিয়ে?’ খেঁকুড়ে লোকটা বলে ‘তুই এখানে দাঁড়াসনা, যাযা, ওর গর্দান যাবে।’ কান্না পেয়ে যায় বুবুর, মনে পড়তে থাকে সব দুর্বোধ্য ভাষায় ওদের ভাবের আদান-প্রদানের কত্তগল্প। বুবু আবার জিজ্ঞেস করে‘কারা গর্দাননেবে?’ বুবু এতই আনমনা, ও প্রশ্ন করার আগে নিজেকে জিগেস করেনি। সব্বাই জানে দিনে-দুপুরে ও পাড়ার লোকেদের এ পাড়ায ঢোকার সাহস নেই,তবু ক্যাবলার মত বুবু প্রশ্নটা করেই ফেলে। পুলিশের সঙ্গ ছাড়া ওপাড়ার লোক এ পাড়ায় ঢুকতে পারেনা । খেঁকিয়ে উঠে সবজান্তা জেঠু বলে‘তোর কিহবে জেনে,এ পাড়ায় কাদের জোর তোর জানা নেই? তোর বাপেরতো দহরম-মহরম তাদের সাথে।’ পাশ থেকে একজন বলে,‘বলাই দা, কি হচ্ছে ও আমাদের বুবু। তুমি না কোনদিন মানুষ হবে না।’বুবু ভাবলো সেদিন যে ওরা খতম অভিযান বাতিল করার কথা বলল ।তাহলে কিমদন কাকু এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত? বাবা নিশ্চয় জানে, বাবাকিরাজি হয়েছে খতমে? কিলবিল করতে থাকে মাথার মধ্যে শতেক প্রশ্ন। হাতে হলুদের প্যাকেট পকেটে নিয়ে বাড়ির বদলে সে ছুটে রেলগেটের দিকে চলে যায়। রেলওয়ে পুলিশকে বলে ‘কাকু আমি কি ভিতরে যেতে পারি, আমার বাবার সঙ্গে খুব দরকার?’ মুখ চেনা থাকায় পুলিশ কাকু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। দুড়দাড় করে সে কাঠের সিঁড়ি লাফিয়ে উপরে গিয়ে হাজির হয়। খুঁজে পায়না বাবাকে। ফেরার পথে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় বাবার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। তিনি জানতে চান বুবুর আসার কারন? বুবুকে আমতা আমতা করতে দেখে নিজেই বলেন ‘কৃষ্ণবাবু আজ অফিসে আসেননি’।বুবু একটু চিন্তিত হয়ে খেলার মাঠ ছেড়ে,পুকুর পাড়ের বাঁশ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ধীর পদক্ষেপে হাটতে থাকে।হঠাৎই শুকনো পাতার খসখস শব্দে অনেকের আগমন বার্তা টের পেয়ে চুপটি মেরে লুকিয়ে পড়ে সে ঝোপের আড়ালে। দুরদাড় লাফিয়ে পালাচ্ছে সারিসারি চেনামুখ। তাদের একজনকে বলতে শোনা যায় কৃষ্ণদা যদি হাজির না হতো আর বাকওয়াস না বাড়াত তাহলে মাল খালাস হয়ে যেত এতক্ষন। আগে এই দুটো মালকে সাবাড় করে দিতে হবে। বুবু অবাক হয়ে শুনতে থাকে। ওরা চলে যাওয়ার পরেও সে বেশ কিছুক্ষণ বাঁশঝাড়ের অন্ধকারে বসে থাকে। কোন দুজনকে সাবাড় করার কথা ভাবছে ওরা, বাবা আর মদন কাকু নয়তো।ধুস তা কি কখনো হয়। একসঙ্গে কত সময় কাটিয়েছে ওরা। মন থেকে মুছে ফেলেতে চায় নিজের ভুল ভাল অনুভব। তবু কোথায় যেন কাঁটার মত বিঁধতে থাকে। যে আনন্দ ওকে আপ্লুত করে দেয় তা হলো বন্ধুর বেঁচে থাকা। এক মিশ্র অনুভুতির স্তরে ও বিচরণ করে। ওরা কেন খতম করতে গেল,খতম রাজনীতির বিরোধী হয়ে, আর বাবা কেন খতম আটকাবে? বাবা তো খতমের পক্ষের লোক।তবে তার খুব আনন্দ যে তার বাবার হস্তক্ষেপে বন্ধু বেঁচে গেছে। তার মানে তার বাবা আগে ভাগে আঁচ পেয়েছিল বিপদের, সেইজন্যই অফিসে ডুব মেরেছে।
বুবু যখন কিছু বুঝতে পারে না তখন ভীষণ ভাবে দুহাতে মাথা চুলকাতে থাকে। অংক করার সময় যখন খুব মাথা চুলকায় ওর বাবা ওকে জিজ্ঞেস করে ‘কিরে কিছু ঢুকছেনা মাথায়?’সেদিন যারা মিটিংয়ে খতম বিরোধী ছিল তারা আজ খতমের পক্ষে,আর বাবা যে কিনা খতমকে বিপ্লবের অঙ্গ বলে মনে করত সে আজ খতম রুখতে ব্যস্ত। ওলট পালট ভাবনা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বুবু কখন যে জনপদে ঢুকে পড়েছে খেয়াল নেই। খেয়াল পড়ে যখন হাত পকেটের মধ্যে চলে গিয়ে গুঁড়ো হলুদের স্পর্শ পায়। নিজের মনেই বলে উঠে এইরে মা তরকারি উনুনে চাপিয়ে রেখেছে। ছুট মারে বাড়ির দিকে। একটু দূর থেকে এসে দেখে দোরগোড়ায় বেশ কিছু পড়শী কাকিমা, পিসিমা মায়ের সাথে গল্প করছে। মায়ের গল্পে মননেই। উদগ্রীব ভাবে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে। বুবু কাছে আসতেই অঞ্জলি বলে ‘তোরা কি আমায় বাঁচতে দিবিনা?’ বুবু বুঝতে পারে এই ক্ষোভ শুধু তার ওপর নয়,বাপও আছে এর মধ্যে। পাশের বাড়ির কাকিমা হঠাৎই মারতে উদ্যত অঞ্জলির উন্মত্ত হাত দুটি চেপে ধরে ফেলে। অঞ্জলি নিরন্তর ধ্বস্তাধস্তি করে চলে নিজেকে বাহু বেষ্টনী থেকে উন্মুক্ত করার প্রচেষ্টায়। জটলার ভেতর থেকে একজন বলে ওঠে ‘পাগলটাকে পুলিশ ভ্যান থানার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মনেহয় ও পুলিশেরই চর ছিল। নাহলে এত যত্ন করে পুলিশ ও কেনিয়ে চলে যাবে কেন?’ অঞ্জলীর বাহুপাশ আপনা থেকেই আলগা হয়ে আসে। সাথে সাথে ছেলের প্রতি রোষও ঝিমিয়ে ঠান্ডা মেরে যায়।
অনেক রাতে বাড়ি ফেরে বাবা। কৃষ্ণ-চিন্তায় ছটফট করছিল অঞ্জলি। বুবু বুঝতে পেরে মাকে বলে ‘বাবা আজ অফিস যায়নি, তুমি জান?’ মা বলে ‘কি করে জানবো? কিছু কি বলে তোর বাবা? বিপ্লব না পিন্ডি, গরিব লোকের রাজ, যত্তসব, কিচ্ছুটি হবেনা। মাঝখান থেকে শুধু খুনোখুনি। ’এমন চঞ্চলতা মায়ের মধ্যে ছিল কোনদিন আগে টের পায়নি বুবু। মা হঠাৎ করে বুবুকে বলে ‘তুই কি করে জানলি?’ বুবু সকালের ঘটনার ধারাবিবরণী দেয়। অঞ্জলি হঠাৎ করে বুবুকে কাছে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলে। ঠিক সেই সময় কৃষ্ণ দরজায় টান দেয়। দরজায় শব্দের বিশেষ ঢং এ অঞ্জলি বুঝে নেয় এ তার মানুষ। সে তড়িঘড়ি ছেলেকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চায়। কিন্তু সে খেয়াল করেনি, বুবু তাকে জড়িয়ে চেপে ধরে আছে। সে বাঁধন খোলা সহজ নয়। ধরা পড়ে যায় দুজনেই কৃষ্ণর কাছে। জলে ভেজা টইটুম্বুর দুটি আঁখি কলস দেখে ছেলে ভুলানো ছড়ার বদলে কৃষ্ণ বলে ‘অবস্থা সুবিধের নয়,আমাকে কাল সকালে শেল্টারে যেতে হবে। ‘কথা কেড়ে নিয়ে বুবু বলে ‘বাবা জানো,আজ ওরা বলছিল দুজনকে খালাস করবে।’ কালবিলম্ব না করে ওরা তিনজনে সিদ্ধান্ত নেয়, কাল রাত ভাঙ্গার আগেই পেছনের দরজা দিয়ে চলে যাবে কৃষ্ণ। তাড়াতাড়ি খসখস করে মদনের উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখে ফেলে কৃষ্ণ কাকে দিয়ে খবর পাঠাবে তারও ইঙ্গিতদেয়। আর বলে ‘তোমাদের খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধে হবেনা, যথাস্থানে টাকা রাখা আছে। শুধু বাড়ি ভাড়ার টাকা..’ বলে একটু থমকে গিয়ে তাকায় অঞ্জলির দিকে। অঞ্জলি বলে ‘সে তুমি চিন্তা করো না আমার টিউশনির টাকা কিছু জমা আছে। সেই টাকা দিয়ে তিন চার মাস টেনে দেওয়া যাবে। দরকার হলে খান কয়েক টিউশনি নেব, খবর পাঠিও যদি অসুবিধা না থাকে। বুবু এই প্রথম বুঝতে পারে তাদের সংসারে অভাবের কারণ। বাবা যে মাঝে মধ্যেই শেল্টার না কোথায় যায় তখন মাইনেপায়না। তাই মাকে পড়াতে যেতে হয়। হঠাৎ করে মায়ের প্রতি বুবুর দরদ উথলে ওঠে। ছলছল চোখে বিছানায় শুয়ে কতক্ষণ জেগেছিল মনে নেই। ঘুমের আগল খুলে দেখে সে আরমা। বাবা কখন কাক ভোরে হাওয়া। অঞ্জলি সকালবেলা উঠে বুবুকে প্রথম যে কথাটা বলে তা হল ‘বাবা যে নেই কেউ যেন জানতে না পারে,আমরা সমস্ত কাজস্বাভাবিক ভাবে করবো। বাড়িওয়ালা গোস্বামীদাদুকে কিছুতেই জানানো চলবেনা। স্কুলে যেতে হবে নিয়ম করে। ব্যাপারটা জানা জানি হলে বলবি –বাবা অফিসের কাজে গেছে।’ বুবু এই প্রথম বুঝতে পারে মা কেবল সাহসী নয়, মা খুবই স্থিতধী এবং পরিস্থিতি বুঝে চলার ক্ষমতা রাখে।
বুবু এখন মায়ের বাধ্য ছেলে, মা যা বলে ঠিক তাই তাই করে । সকাল থেকে দোকান,বাজার সব। যদিও বাজার হাট বুবু আগে থেকেই করত। এখন শুধু এই কাজ নিয়মের নিগড়ে বাঁধা। ঠিক সময়ে স্কুলে যায়, ফিরে আসে। মাকে আর অনর্থক চিন্তায় ফেলতে চায়না সে। কিন্তু পরিস্থিতি,পরিবেশ,গোটাসমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। তার হাত থেকে মুক্তি নেই। বুবু চিরকালই স্কুলে যেত একা।বড় রাস্তার এপারে যেদিকে ওদের বাড়ি সেটা ছিল নকশাল পাড়া।স্কুল যাবার পথে বন্ধু বান্ধব ,যার সাথে দেখা হত,তার সাথে গল্প করতে করতে যাওয়া আড্ডাবাজ বুবুর স্বভাবে ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ও মানুষকে একটু এড়িয়েই চলছিল।আজ স্কুল যাবার পথে হঠাৎ বাবার অনুগত সেনাদের সঙ্গে দেখা। দিনের বেলায় একেবারে তাদের একটু বেসামাল লাগছিল। না, বেসামাল বলতে, মাতাল, যুদ্ধের নেশায়। মনে হচ্ছিল তারা যেন অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত। হয়তো কোন খবর আছে ওদের কাছে। ওদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে বুবুকে বলে‘সাবধানে যাস।’ অবাকহয় সে, এমনটা কোনদিন বলে নি কেউ। হয়তো হেঁসেছে, মাথায়হাত বুলিয়ে দিয়েছে,আদর করে একটা চড়ও মেরেছে কখনো সখনো। কিন্তু এমন গম্ভীর ভাবে সাবধান বাণী কোনদিন কেউ উচ্চারণ করেনি। স্কুলে পৌঁছে যথারীতি প্রার্থনা সংগীত গাওয়া শেষ হয়। যে যার ক্লাসে ফিরে গেছে। হইচই চলছে ক্লাসে, যতক্ষণ শিক্ষক-শিক্ষিকারা না আসে ততক্ষণই মজা। স্কুল নয়তো যেন মুক্ত আনন্দের ঝর্ণাধারা। দিদিমণি এসে ঢোকে ক্লাসে, সবাই দাঁড়িয়ে পড়ে। দিদিমণি সবাইকে বসতে বলে যেই চেয়ার টেনে নিয়ে আসন গ্রহণ করতে উদ্যোগী হন ঠিক সেই সময় বিকট শব্দে একটা বোমা আছড়ে পড়ে স্কুলের দেওয়ালে। এমন আচম্বিতে ঘটনাটা ঘটেছিল যে দিদিমণি চেয়ার শুদ্ধ উল্টে পেছন দিকে পড়ে যান। বোমের আগুনটা ঝলসে জানালা দিয়ে ঢুকেএসেছিল। যদিও কারোর কোনো ক্ষতি হয়নি। হতবাক দিদিমনির কিছু বোঝার আগেই নিমেষে মাথা নিচু করে জানলার কাছাকাছি পৌঁছে যায় বুবু। ওর দেখাদেখি আরও একটি ছেলে এসে দ্বিতীয জানলাটিও বন্ধ করে দেয়। এরপরই শুরু হয়ে যায় নিরন্তর বোমাবাজি। ওদের আন্দাজ বলতে থাকে দুপাশ থেকে বোমা এসে আছড়ে পড়ছে স্কুলের ওপর। দিদিমণিরা বলছেন এটা নাকি স্কু লদখলের লড়াই। ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক-শিক্ষিকা সবাই স্কুলের মাঝখানের উঠোনটিতে এসে জড়ো হয়েছে। যাতে কোন ভাবেই বোমা গুলির কোনো আঘাত কারও ওপর না আসতে পারে। বড় রাস্তার ওপারে সিপিএম পাড়া। তারা এ পাড়ার স্কুল দখল করতে এসছে। কয়েকজন পাকা ছেলে তিন তলার শ্রেণীকক্ষের জানলা খুলে পিছন দিকে তাকিয়ে এপাড়ার যোদ্ধাদের চিনতে চেষ্টা করছে। এপারে রথীন জেঠূ, নিতাই, বিকাশ হাজির বন্দুক, পাইপগান, মলোটভ ককটেল হাতে। বুবুর সঙ্গে এইসব যন্ত্রপাতির পরিচয় ছিল কারণ বহুদিন দিলীপদাদের কাছে এইসব দেখেছে। কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে রেখে ও কারুর পরিচয় জানায় না বন্ধুদের। নাগাড়ে ঘন্টা দুয়েক চলল লড়াই, কান্নার রোল পড়ে গেছে পড়ুয়াদের মধ্যে। দিদিমণিদের অবস্থাও তথৈবচ। বাবার পার্টির মিটিং এ বহুচর্চিত শব্দ শ্রেনীসংগ্রাম, বুবু এর মানে বুঝতে পারেনি কোনোদিন। একবার মদনকাকুকে জিজ্ঞেস করায় কাকুবলেছিল ‘সংগ্রাম মানে জানিস?’ওঘাড় নাড়ায় মদনকাকু বলেছিল ‘সংগ্রাম মানে যুদ্ধ। ’আজ এই তুমুল যুদ্ধের আবহে এক লহমায় পরিষ্কার হয়ে গেল ওর কাছে শ্রেণিসংগ্রামের অর্থ। শ্রেণিসংগ্রাম মানে হল ওপাড়ার পার্টি আর পুলিশের সঙ্গে এপাড়ার পার্টির লড়াই ওর এরকম ভাবনার যথেষ্ট কারণ ছিল। আজ প্রত্যক্ষ করতে পেরেছিল আজ লড়াইয়ে ময়দানে রাস্তার ওপারে অবস্থান নেওয়া সৈন্যদের মধ্যে পুলিশ সামিল ছিল। যুদ্ধ থামে কিছুক্ষণের মধ্যে। কারফিউ ঘোষণা হবে,থমথমে পরিবেশ। বড় দিদিমণি বলে‘যার যার বাড়ির লোক এসেছে তারা যাও। ’স্বপনকাকু এক এক করে অভিবাবকদের কাছে জমা দিতে থাকে পড়ুয়াদের। সিঁড়ির ওপর থেকে মাকে দেখতে পায় বুবু, এক ছুটে টুলটুল কে ডেকে এনে, স্বপন কাকু কেবলে, মার কাছে চলে যায় ওরা। রাস্তায় আসতে আসতে বুবু ভাবে ওর বাবার মতবাদে যারা বিশ্বাসী তারাই কেবল এইযুদ্ধের সেনানী। ওর মন খুব খারাপ হয়ে যায় এক সাথে এরা কোন কাজ করতে পারবে না এই ভেবে।
ঝড়ের গতিতে কেটে যাচ্ছে সময়। এখন কৃষ্ণর বাড়িতে কেউ আসে না। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে মতান্তর ঘটায় বহু কমরেড ধরা পড়ে গেছে পুলিশের হাতে অথবা একে অন্যের হাতে খুন হয়েছে। অন্তর্কলহ এড়াতে অনেকে পালিয়েছেন প্রবাসে। মন থেকে মেনে নিতে
পারেননি অনেকে এই ভাতৃহত্যার রাজনীতি। ঝিমিয়ে আসছে উত্তাল সময়। হঠাৎই রাতের অন্ধকারে, একদিন দরজায় করাঘাতের টুকটুক শব্দ। বুবু এবং অঞ্জলীর অত্যন্ত পরিচিত শব্দ সংকেত জানান দেয় মদনের আগমন বার্তা। অঞ্জলি দরজা খুলে দেয়। একরাশ হতাশা নিয়ে ঘরে ঢোকে মদন, বুবুর মদন কাকু। মদন বৌদির দিকে তাকিয়ে বলে ‘চললাম, ব্যাপক ধর পাকড় চলবে।’ অঞ্জলি বলে ‘তুমি এই অবেলায় এসেছ কেন, কেউ ফাঁদ পেতে রাখলে ধরা পড়ে যাবে যে?’ ‘বৌদি আপনাকে আর বুবুকে না দেখে আমি কোথাও যেতে পারিনি।’ দুপা এগিয়ে এসে বুবুর দিকে দুটো হাত বাড়িয়ে দেয়। বুবু একটু অভিমান নিয়ে পেছনে সরে যায়। বলে ‘কাকু, তুমি কোথায় যাচ্ছ? আর কোনদিন আসবেনা?’ মদনের কাছে কোন উত্তর নেই। অঞ্জলি বলে ‘বুবু এমন কথা বলতে নেই।’ আরো দুপা এগিয়ে গিয়ে মদন বুবুকে জড়িয়ে ধরে এক চিলতে কপালে ছোট্ট চুমু এঁকেদেয়। তারপর এগিয়ে চলে দরজার দিকে। চৌকাঠে পা দিয়ে জ্বলজ্বল চোখে ফিরে তাকায় মদন আরো একবার। ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এসেছে, আবেগ ক্লিষ্ট ধরা গলায় মদন কাকু বলে বুবুকে ‘কমরেড, মানুষের মত মানুষ হও। ।’ তারপর হারিয়ে যায় নিকষ কালো অন্ধকারে। বুবুর সাথে ওর মদন কাকুর এই শেষ দেখা।
সাত
ছান্দসির শিশুবেলা
শরীরে, বচনে মেয়ের বাড় খুব । প্রথম যে শব্দ টা পুটকি উচ্চারণ করেছিল সেটা, ‘মা’ । সীমা তে মা আছে, সীমাকে সে ছিমা বলতো। উঠোনে আসা পার্টির মানুষজন কথায় কথায় জিন্দাবাদ শব্দটা ব্যবহার করত। পোস্টার লেখা হতো লাল কালিতে, কি এক অদ্ভুত খুশিতে ওরা লেখার পর পড়তো - কমিউনিস্ট পার্টি জিন্দাবাদ, শ্রমিক ঐক্য জিন্দাবাদ। ওদের শরীরে জোস এসে যেত সেই সময়। সেই শব্দের আবেশে, ‘মা’ শব্দের বাইরে পুটকির প্রথম শব্দচর্চা ছিল, দিন্দাবাদ। দিলু প্রথমে শব্দ মাহাত্ম্য বুঝতে পারেনি, ও সাধারনের চোখে একটু ভোঁতা মাথার। বীণা বলে, ‘ভালো করে শোনো, তোমার বদমাশ মেয়ে কি বলছে?’ দিলু সোহাগ করে বলে ‘মা, আবার বলতো।’ মেয়ে অমনি চেচিয়ে উঠে বলে ‘দিন্দাবাদ।’ হোহো করে হেসে ফেলে মাস্টার, অদ্ভুত তৃপ্তিতে মনটা তার ভরে যায়।
পালসিট বড় ময়দানে গণনাট্য সংঘ নাটক করতে আসবে। পালার নাম তিতুমীর, উদ্বোধনী গান হবে গণ সঙ্গীত শিল্পীদের, তারপর নাটক। এই দস্যি মেয়েকে নিয়ে নাটক দেখা যাবে না। রিতা ঠিক করেছে, গান শুনে পুটকিকে মাস্টারদার জিম্বায় রেখে, সে পালা দেখতে যাবে। শুরু হয় অনুষ্ঠান। সেই মত পুটকি কে নিয়ে যায় রিতা। মাঠসংলগ্ন মন্দির চাতালে ওকে কোলে নিয়ে রিতা অনুষ্ঠান দেখছে। স্টেজে আগুন ধরানো গান হচ্ছে ‘নাম ছিল তার জন হেনরি। ’ মেয়ের হাত দুটো ছন্দে, তালে উঠছে, পড়ছে। রিতা লক্ষ্য করেনি কারণ গানের আগুন এই সন্ধ্যায় তাকেও ছুঁয়েছে । নতুন গান শুরু হবে, পুটকি কোল থেকে নেমে পড়তে চাইছে ।রিতা অদূরে মাস্টারদাকে দেখে, তার মনে হয়, মেয়ে বাপের কাছে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে।রিতা মেয়েকে নামিয়ে দেয়, সামনে লোকের ভিড়, পুটকি আর স্টেজ দেখতে পাচ্ছে না। বারবার রিতার দিকে তাকাচ্ছে, রিতা,ফের বুঁদ হয়ে গেছে অনুষ্ঠানে। পুটকি চিল্লাতে থাকে ‘অ,আ, উঁ। ’ রিতার সম্বিৎ ফেরে না। চিল চিৎকার করে পুটকি বাধ্য করে, রিতাকে ফিরে তাকাতে। রিতা বিরক্ত হয়, মন্দির চাতালে ওকে তুলে দাঁড় করিয়ে দেয়। জমজমাট স্টেজে তখন ‘এদেশ তোমার আমার আর আমরা ভরি খামার।’ দুহাত তুলে নাচচে পুটকি। হঠাত করে দিলু মন্দিরের দিকে তাকিয়ে দেখে, মন্দির চাতালে মেয়ের উন্মাদ নৃত্য। আহল্লাদে মন নেচে ওঠে মাস্টারের, ছুটে এসে পাঁজাকোলা করে মেয়েকে তুলে নিয়ে যায় । ভিড় কাটিয়ে, কোন মতে স্টেজে পৌঁছে নামিয়ে দেয় মেয়েকে। মূল গায়ক এগিয়ে এসে কুট্টি মেয়ের হাত ধরে নাচতে থাকে তালে তালে। বাপ মা দুজনে সেই দিনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে মেয়েকে ছন্দের শিক্ষায় শিক্ষিত করবে। আর ভালো নাম রাখবে ছান্দসি।
উজ্জ্বলা অঞ্চলের একজন নৃত্যশিল্পী, সে আসতো মাঝেমধ্যে অভয়দের বাড়িতে। বীণাপাণি তার পছন্দের মানুষ, বীণার শান্ত শীতলতা ওকে স্পর্শ করতো।কৃষ্ণ কালো রঙে যে অপার সৌন্দর্য আছে উজ্জ্বল বর্ণের উজ্জলতা তা উপলব্ধি করতো। বীণা,উজ্বলাকে একদিন ওর মেয়েকে নাচ শেখানোর ইচ্ছার কথা বলে। বীণা জানতে চায়, উজ্জ্বলা এই দায়িত্ব নেবে কিনা? উজ্জ্বলা চট করে কোনও উত্তর দেয় না,সে বলে," ঠিক আছে মাথায় রইল।"বীণা এমন উত্তরে খুশি হতে পারে না কিন্তু মুখে কিছু বলে না। হৈহৈ করে শারদ উৎসব এসে পড়ে, দরজায়, গ্রাম বাংলার আকাশে রঙের মেলা, মণ্ডপে মণ্ডপে কাঠামো তৈরীর কাজ প্রায় শেষ। এবার মজুমদার বাড়িতে পূজার উদযাপন বেশ বড়সড়, দুইশত বছরের আরাধনা একটু জাঁকজমক তো হবেই।বৈচিত্র্যর পূজো,গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফেরে কল্পিত আয়োজনের উড়ন্ত ফানুস।মজুমদার পরিবার ভেবে রেখেছিল, এমন খেল দেখাবে, ষাতে মানুষ ধন্য ধন্য করে। পার্টি কে দেখিয়ে দিতে হবে জনসমাবেশে কারা এগিয়ে। এই অদ্ভুত প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য,বিধেয় কিছুই খেয়াল করেনা অভয়।গ্রামে তেমন পুজোর বাড়াবাড়ি নেই, তাই মজুমদার পরিবারের জমজমাট পুজোতে,মানুষ গানে, গল্পে, আড্ডায় মেতে থাকুক এইটাই অভযের় চাহিদা।
আজ মহাসপ্তমী,সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান নাট্যমঞ্চে, শ্রীরামপুর থেকে ভাড়া করা সঙের দল আসবে। ছুটকি নতুন জামা পড়ে রিতার সঙ্গে বেরোবে । হঠাৎ করে উজ্জলার আগমন ঘটে । সে বীণাকে বলে,"বৌদি,আজ তোমার মেয়েকে নিয়ে আমি ঠাকুর দেখতে যাবো।" রিতা বেঁচে যায়, সে এখন চুটিয়ে আড্ডা মারতে পারবে ঠাকুরতলায়।মেয়ের কোন হেলদোল নেই,সে বার মুখো, সঙ্গে একজন হলেই হল। বেরিয়ে পড়ে দুজনে,একটু পরে ওদের সঙ্গে যোগ দেয় অরুণ।অরুণ ইঙ্গিতে উজ্জ্বলা কে প্রশ্ন করে,একে আবার জোটালে কেন? এই প্রথমবার উজ্জ্বলা আর অরুণ বেরোবে একসাথে। এতদিন মনে মনে,আভাসে ইঙ্গিতে,ইথার মাধ্যমে একজনের প্রেমের বার্তা, পৌঁছাতো অন্যর কাছে।এই বছরের পুজো ওদের কাছে অন্য স্বাদের। অরুণের ইচ্ছে ছিল মফস্বল শহরের পুজো দেখা। উজ্জ্বলা অতটা সাহসী হতে পারেনি,মনে অপার দ্বিধা দ্বন্দ্ব। প্রেমের উদযাপনে, প্রথম পূজার মাহাত্ম্য উজ্জ্বলা মেনে নিলেও বাধো বাধো ছিল আচারে।তাই হঠাৎ করে সে অভয়ের বাড়িতে ছুটে গিয়ে ছুটকি কে সঙ্গে নেয়।পায়ে পায়ে ওরা পৌঁছায় মণ্ডপে। মণ্ডপ সংলগ্ন নাটমঞ্চে হাজির শ্রীরামপুর থেকে আসা বিখ্যাত সঙের দল।পুজোর চৌহদ্দির মধ্যে থাকতে চাইছে না অরুণ, এখানে হাজির থাকলে পরিচিত মানুষের ক্ষুরধার দৃষ্টিতে বন্দী থাকতে হবে ।ময়দানে চাটাই পাতা আছে, সবাই হাপিত্যেশ বসে আছে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার অপেক্ষায়।উজ্জ্বলা ছুটকি কে নিয়ে ঝপ করে বসে পড়ে চাটাইয়ে,বাধ্য হয় অরুণ পাশে বসতে। ছুটকির আপত্তি ছিল বসে পড়ায় ও ভেবেছিল টহল দিয়ে বেড়াবে রাস্তায়, রাস্তায় ।কিন্তু হঠাৎই বিপুল কাঁসরঘন্টা, ঢাকের আওয়াজে ওর চোখ চলে যায় স্টেজে। সেখানে আবির্ভূত হয়েছে রংচঙে বাহারি ঢঙে,কলাকুশলীরা।প্রথমেই অমৃতলাল বসুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সংঘের দল ধীরু লয়ে গেয়ে ওঠে - হরেক বছর কপালপোড়া/ ভেঙে গেছে রসের ঘড়া/মিঠে কড়া সঙের ছড়া/ বাঁধতে হবে নতুন সাজে, রসরাজে।
জমে না তেমন, মন্ত্রলয়ে কান্না ভেজা মিনমিনে গান। ছুটকি কিন্তু কাঁসরঘন্টায় মজেছে । দর্শক আসন থেকে চিৎকার-চেঁচামেচি, হইহুল্লোড় ভেসে আসছে।একজন অতিরিক্ত উৎসাহে চেঁচিয়ে উঠলো 'শুকনো মিষ্টি কেন বাবা, রসের হাঁড়ি ফাটাও।'সঙ্গে সঙ্গে মাঠে হাসির রোল উঠলো।দলের কান্ডারী বাকিদের কিছু ইঙ্গিত করলেন।শুরু হলো বাবু,মোসাহেবদের ভড়ং গান,বাহারি অভিনয, জমজমাট তালে। ততক্ষনে নড়েচড়ে বসেছে দর্শক।চরিত্রদের হাস্যকর অঙ্গভঙ্গি ছড়ায় ফেটে পড়ে মাঠ চত্বর। ছুটকি উজ্জ্বল পিসির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে তাল মিলিয়ে হাততালি দিতে থাকে ।সবাই স্টেজমুখী,অরুন উশখুশ করছে,, তার না পরিবেশ ভালো লাগছে না জনসমাবেশ।
শ্যাম তুমি বাঁকা/ বাঁকা তোমার মন/কলসি কাঁখে আঁচল ওড়ে,ধুকপুকানি বুক ফুঁড়ে/জেনেশুনে হানছো বান কেলে মদন/ বাঁকা তোমার মন/ চুপটি করে কথা না কয়/জাপটে বুকে গাছের আগায়/উড়িয়ে বসন লাজের বালাই/ কাঁখের কলস গড়িয়ে পালায়/মানে না বারন/ বাঁকা তোমার মন।
নাটক ছলা-কলা অভিনয় জমে উঠেছে। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি,ঢলাঢলির রেশ মাঠে বাকিদের মধ্যেও, টক, ঝাল, মিষ্টি স্বাদে জমজমাট প্রাঙ্গন । নাগাড়ে সিটি বাজছে,মজুমদার ভাবছে শালা পকেটে রেস্ত থাকলে তবে তো তোর পেছনে মানুষ থাকবে।নাটকে যখন সবাই বুঁদ, তখন অরুণ উজ্জ্বলার হাতে হাত রেখেছে। এই প্রথম সে উজ্জ্বলাকে স্পর্শ করল। কেউ দেখে ফেলার ভয়ে উজ্জ্বলা হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়। ছুটকি বড়দের তালে তাল মিলিয়ে শরীর দোলাচ্ছে ।সন্তর্পনে অরুন দু'পাশে তাকিয়ে নেয়,কেউ দেখছে না।আলতো করে উজ্জ্বলার হাতে চুম্বন একে দেয় সে। উজ্জ্বলা হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। হয়তো চায়নি সে,প্রথম পরশের তৃপ্তির আস্বাদ মুহূর্তে ছিন্ন করতে। ততোক্ষণে নতুন ছড়া গানের মঞ্চ মুখর।
রাজ্য রথের চারটি চাকা /সেপাই পুলিশ মন্ত্রী টাকা/টাকার চাকা হলে ফাঁকা/রথখানিকে চলতি রাখা/দ্বন্দ্ব কিসের পেষাই় চলে/ শ্রমিক-কৃষক রক্ত জলে/ঘামের টাকা টাকায় ঘাম/ পড়বে রথে হ্যাঁচকা টান/এই দুনিয়ায় জাগছে কারা/ শ্রমিক-কৃষক সর্বহারা।
হঠাত করে মঞ্চে অঙ্গভঙ্গির বদল ঘটেছে, মানুষজন কেমন আচরণে বদলে গেছে। জনতার মধ্যে থেকে একজন, ‘ইনক্লাবই’, ডাক দিয়েছে।মজুমদার মঞ্চের ওপর উঠে ‘চোপরাও’’ বলে চিতকার করছে। কেউ বারন মানছে না।মজুমদারের এক স্যাঙ্গাত মঞ্চের বাতি নিবিয়ে দিয়েছে। হুটোপাটি করে মেয়েরা বাচ্চাদের জটলা থেকে নিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। অরুন আর দেরি করতে চাইছে না,এখান থেকে পালিয়ে যাওয়াই শ্রেয় । উজ্জ্বলা ছুটকি কে কোলে তুলে নিয়ে বুঝতে চাইছে ঘটনার গতিপ্রকৃতি। অরুণ আর সময় দিতে নারাজ। বাধ্য হয় উজ্জ্বলা প্রাঙ্গণ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে।
সপ্তমী সন্ধ্যায় উজ্জ্বলার ঝুলি কেবলমাত্র প্রেমাস্পদের প্রথম পরশে সীমাবদ্ধ ছিল না।সঙের অশ্লীল ছড়া গানের প্রতি ধারণার সম্যক পরিবর্তন ঘটেছিল,পেটের দায়ে রং মেখে নাচতে নামলেও, শিল্পীর প্রকৃত সত্তা অন্তসলিলা লুকিয়ে থাকে অন্তরালে। শিল্প হিসেবে নৃত্যকে, শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থানে বসানোর,গুমর কেমন নস্যাৎ হয়ে গেছে সঙের ঢঙে । যে কারণে বীণাপাণির কথায় রা কাড়েনি, ছুটকির শরীরী,অনায়াস তাল, ছন্দের সমাবেশ উড়িয়ে দিয়েছে মনের কোণে জমে থাকা স্থবিরতা। একদিন হঠাৎ করে উজ্জ্বলা বীণাপাণি কে বলে 'তোমরা ছুটকিকে নাচ শেখাবার প্রস্তুতি নাও।আমি দায়িত্ব নেবো।' মাত্র পাঁচ বছর বয়সে শুরু হয়ে যায় নাচের ট্রেনিং, উজ্জ্বলা অভয় মাস্টারের বাড়ি এসে শিখিয়ে যায়। বীণা ভেদ করতে পারে না রহস্যের বেড়াজাল, ,কিন্তু সে খুশি। মেয়ের শরীরী বিভাঙ্গ, হাতে শিখিয়ে দেওয়া মুদ্রা একে অপরের পরিপূরক। উজ্জ্বলা প্রথম শিক্ষকতা আস্বাদ চেটেপুটে নিতে থাকে।
আজ আর অরুণ, উজ্জ্বলার সম্পর্ক কারও অজানা নয। কলকাতায় অরুণের নৃত্যশিল্পী হিসেবে কিঞ্চিৎ নামডাক হয়েছে, কলকাতা এবং চন্দননগরে নাচের স্কুল চলছে।যদিও সেখানে অনেক বয়স্ক গুণী মানুষের মাঝে সে স্থান পেয়েছে। তাকে কেন্দ্র করে স্কুলের বেড়ে চলা, এমনটা নয়।নতুন স্কুলের অভিজ্ঞতা অরুণকে, নিজের অঞ্চলে এমন একটা শিক্ষাকেন্দ্র খোলার বাসনায় প্রলুব্ধ করে।তোড়জোড় শুরু হয়,শেষ-মেষ মন্দির কমিটি সহমত হওয়ার অরুন মাস্টারের নৃত্য শিক্ষার স্কুল চালু হয় গ্রামে।অরুণের চেষ্টায় শহর থেকে ভারতনাট্যম, মনিপুরী, ওডিসি নাচের শিক্ষক যোগ দেন স্কুলে। উজ্জ্বলা নৃত্যের শিক্ষা তার অরুণদার কাছ থেকেই পেয়েছিল। বেশ কয়েক বছরের চেষ্টায,উজ্জ্বলা, ছুটকি কে দ্রুপদী তান্ডব,মানে আন্দোলন ও ছন্দের সমাহারে শরীরী বিভঙ্গের পাঠ শেখাতে পেরেছিল।কিন্তু শিশু মনে গীতহীন নৃত্য সহজাত নয়,তাই উজ্জ্বলা বীণাকে প্রস্তাব দেয় 'আমি গোড়ায় জল দিলাম সাধ্যমত, এবার তোমরা ওকে অরুণোদয় স্কুলে ভর্তি করে দাও। ওখানে অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষক আছেন।'
বয়স তখন সবে মাত্র সাত , ছান্দসি নামে, মেয়েকে ভর্তি করে দেওয়া হয় নাচের স্কুলে। অভয়ের সাথীরা বাড়িতে নৃত্যরত ছান্দসি কে দেখেছিল, তাদের ধারনা হয়েছিল এ মেয়ে জাত শিল্পী হবে। পড়াশুনার চাপে ওর অন্তরে বেড়ে ওঠা শিল্পী মন যেন হারিয়ে না যায়। অভয় বলে ‘ওর স্বাধীনতায় ও বড় হবে।আমরা ওকে কোনো কিছুতেই বাধ্য করব না।’ হোলটাইমার মোহন বাবু এই কথা শুনে ভুরু কুঁচকে বলেন ‘গণতান্ত্রিকতা ভালো তবে তারও বয়স আছে।তোমরা কি ওকে জিজ্ঞেস করে নাচের স্কুলে ভর্তি করেছো ?’ অভয় বলে ‘না, কিন্তু ওখানে যেতে না চাইলে আমরা বাধ্য করতাম না ।ওর মন বসে যাওয়ায় আমরা বুঝেছি ওর ভালোলাগা তৈরি হয়েছে এই কদিনে। যদি লেখাপড়া করতে ও বেশি ভালোবাসে, তাই করবে।’ ঠিক তখনই বীণা ওকে নাচের স্কুল থেকে নিয়ে ফেরে। মেয়ে ছুটে এসে বাপকে জড়িয়ে ধরে বলে ‘বাবা, আজ একটা নতুন গান শিখেছি।’ বাবা শুধায় ‘কি গান রে, মা?’ মেয়ে গেয়ে ওঠে - সুদূর সমুদ্দুর, প্রশান্তের বুকে হিরোশিমা দ্বীপে আমি শঙ্খচিল। স্পষ্ট উচ্চারণে,শিশু গলার গানে উপস্থিত সকলে স্তম্ভিত,মুগ্ধ হয়ে যান।আমার দু ডানা ঢেউয়ের দোলায়, আমার দুচোখে নীল শুধু নীল। সকলে ওর গান ভিসুয়ালাইজ করতে পারে। চোখের সামনে দৃশ্যপট খুলে যায়,নৃত্যের ছন্দে। গান শেষ হলে অভয় বলে ‘এবার বলুন মোহন দা, ও যদি গীত কে নৃত্য ওপরে স্থান দিয়ে চর্চা করে এগিয়ে যায় আমি কি বাঁধ দেবো ওর ইচ্ছেনদীর চলায় ? পড়াশুনার ক্ষেত্রেও একইভাবনা প্রযোজ্য।’ কোন উত্তর আসে না মোহনদার কাছ থেকে।
আজ রবিবার নাচের স্পেশাল ক্লাস। রিতা পৌছে দিতে যায় মেয়েকে স্কুলে,এখনো কেউ আসেনি নাচ শিখতে।ভেবেছিলো ফিরতি পথে ও একটু আড্ডা মেরে আসবে সেগুড়ে বালি।রিতার প্ল্যান চৌপাট হয়ে যাওয়ায় রিতা রেগে বোম হয়ে স্বগতোক্তি করে ‘এই বড়ো মানুষের দোষ, কেউ সময় মেনে চলে না, কিছু যদি ঠিকঠাক থাকে?’ এখন উপায় নেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।মেয়ে তো এদিক ওদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে মন্ডপময়।পার্মানেন্ট মন্ডপ, সংলগ্ন দুটি ঘরে চলে নাচের ক্লাস। আরো একটা ঘর আছে যেখানে ক্লাবের অফিস বসে। এক্কেবারে শুনশান প্রাঙ্গণ কেউ আসেনি বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আনচান করতে থাকে রিতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাচের মাস্টার অরুণ দেব বাবু এসে হাজির হন। অরুন, অভয়ের বন্ধু, সরাসরি রাজনীতির সাথে ওর কোন যোগাযোগ নেই কিন্তু ওর কৃষ্টি দিয়ে অরুণ অভয়ের রাজনৈতিক ভাবনার পাশে থাকতে চায়।রিতা বলে, ‘কিগো দাদা বাবু, আপনি নিজেই সময় বেঁধে দিয়েছেন আর নিজেরই আসতে দেরি করলেন, মেয়ে রইল কখন আসব নিতে?’ রিতার উষ্ণ,কটুবাক্য সামাল দিতে ঘড়ি দেখে অরুণ বলে’ দু ঘন্টা পরে আয় না।’ চণ্ডীমণ্ডপের বিশাল চাতাল জুড়ে মেয়ে নাচের বিভঙ্গে গাড়ি চালাচ্ছে ভু উউউ.. । রিতা চলে যাওয়ার পর মাষ্টার ঘরে ঢোকে।বেলা গড়িয়ে পৌনে তিনটে এখনো কেউ আসেনি রিতার বিরক্তি অরুন কেও ছোঁয়। আজ তাড়াতাড়ি ক্লাস সেরে উজ্বলাকে নিয়ে ওর সিনেমা দেখার প্রোগ্রাম। রবিবারের দুপুর, ভেতো বাঙালি ভাতঘুম দেবেই,কোন মানে হয়! পায়চারি করতে থাকে অরুণ। মেয়ে মন্ডপের রেলিঙে থুতনি রেখে তখনো শব্দ গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে মুখে। বন্ধুর মেয়ে একা বাইরে খেলছে বারবার এসে দেখে যায় অরুণ।চা অরুনের একমাত্র নেশা, মন্ডপ ছেড়ে বেরিয়ে চায়ের দোকানে যায় সে। নিবারনের চায়ের দোকান চব্বিশ ঘন্টা খোলা।নিবারন মাস্টার কে বলে ’বসুন না একটু,ছেলেমেয়েরা কেউ এখনো আসেনি তো।’নিবারন কোনদিন মাস্টার কে বসতে বলে না,আজ ওরও হাত খালি। শিল্পীর ইজ্জতে লাগে চায়ের দোকানে আড্ডা মারতে। অরুন ফিরে আসে।মানুষের একাকীত্ব মানুষের শত্রু, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা। অরুণ মাস্টার এমাথা-ওমাথা করতে থাকে ঘরের মধ্যে। অস্থির হয়ে কখনো বসে পড়ে কখনো আবার হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ায়। নিরন্তর উদ্দেশ্যবিহীন পায়চারি চলতে থাকে। এক একটা সেকেন্ড যেন এক একটা দিন। আবারো একভাঁড় চা, দূর হয়না কর্মহীনতার বেতাল ছন্দ। মনে হয় ক্লাস না করে উজ্জ্বলাকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেই ভাল হত। অস্থির মন বিদ্রোহী হতে চাইছে, একাকিত্বের আঁচ, আর ছাই চেপে রাখা যাচ্ছেনা ।মানসিক গঠনে অরুণ চিরকালই দুর্বল, তাই কখনোই সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দেয়নি সে। জাগতিক ঘূর্ণির প্রচন্ডতা বাধ্য করল অরুন কে ঘর ছেড়ে আবারও বেরোতে। ঠিক সেই সময় ছান্দসি তাকিয়ে ছিল নাচ ঘরের দিকে। চোখাচোখি হতেই অরুণ হাতের ইশারায় ডাক দেয় তাকে ।মেয়ে মান্যতা না দিয়ে অন্য দিকে তাকালে,অরুণ হাঁক পাড়ে, নাচ শেখানোর অছিলায়। নাচের গন্ধে ভালোলাগার গাড়ি চালাতে চালাতে অরুণের কাছে সে ছুটে আসে। আজ ও প্রথম মোটরবাইকে চড়েছে, ভটভটির ছন্দে ও বাঁধা। অরুণের বুকেও এনফিল্ড মোটর সাইকেলের ধকধক শব্দ। মেয়ে ঘরে ঢুকতেই ওকে অরুণ সুদূর সমুদ্দুর এর হালকা ছন্দে ধীরু করে দিতে চায়। সাপের বাঁশি যেমন মন্ত্রমুগ্ধ করে অরুণের মুন্সিয়ানায় স্থির ,স্তব্ধ হয়ে যায় ছান্দসি।সেই সুযোগে অরুন ওকে নিজের কোলে এনে বসায়। খেয়াল পড়তেই কাকুর কোল থেকে উঠে পড়ার জন্য ছটফট করতে থাকে মেয়ে। আদর করে, একমাত্র বাবাই পারে ওকে কোলে টেনে নিতে। অরুণ বলে ‘নাচতে হলে গানের মানে বুঝতে হয়। তোকে এই গানটার সঙ্গে নাচের মুদ্রা, ছন্দ শেখানো হয়েছে কিন্তু গানের প্রাণভোমরা হলো তার গল্প, সেটা বাদ দিলে শিল্পের কোনো মানে নেই।’ছান্দসি অরুন কাকুকে পাগলের মতো হাবিজাবি বকতে দেখে অবাক হয়ে যায়।তারপর হঠাৎ করে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে একটু দূরে গিয়ে বলে, ‘তুমি গানটা শোনাও আমি এমনি এমনিই নাচছি।’ নিজের বিরক্তি গোপন করে অরুণ উঠে গিয়ে আলতো করে হাত ধরে ওকে নিজের কাছে টেনে আনে । জিজ্ঞেস করে ‘তুমি শঙ্খচিল মানে জানো?’মেয়ে কাক,চিল দেখলেও শঙ্খচিল বলে কোনো পাখির নাম শোনেনি। ঝপ করে অরুণের কোলের উপর বসে পড়ে সে জিজ্ঞেস করে ‘শঙ্খচিল কি চিলের থেকেও বড় ?’ অরুণের ঠোঁট তখন মেয়ের গাল স্পর্শ করেছে। মেয়ে বলে ‘কি গো, কিছু বলছো না যে,,শঙ্খচিল কত্ত বড?’ অরুণ বলে ‘অনেক, অনেক বড়।’ শক্ত দাড়ি ফুটতে থাকে মেয়ের গালে। মেয়ে চেঁচিয়ে উঠে বলে ‘আঃ লাগছে যে।’অরুন একটু হাল্কা দেয়,সেই সুযোগে, আলতো হাতের ছোট্ট ধাক্কায়, অরুন কাকুর মুখ ঠেলে সরিয়ে দেয় মেয়ে। স্বভাব সুলভ সরলতায় আবার সে জিজ্ঞেস করে ‘শঙ্খচিলের খুব শক্তি ,চিল ,বাজ পাখি সবার চেয়ে বেশি ?’ দুই হাত দিয়ে ওর কচি হাত দুটো লোমশ কঠিন হাতে নিয়ে অরুন বলে ‘খুব ,সুন্দর খুউব সুন্দর।’ হঠাৎই মেয়ের অরুণ কাকুকে খুব কাঠকাঠ মনে হয়।ও বুঝতে পারে না একটা রক্তমাংসের মানুষের কোল যা ওকে আশ্রয় দিয়েছে এতদিন, তা এমন লোহার মতো কঠিন হতে পারে কি করে ? কাকুর যন্ত্রবৎ আচরণে ওর কেমন ভয় হতে থাকে।পুরু ঠোঁট, উষ্ণ জিভ, মেয়ের গলাঘাড় বেয়ে নামতে থাকে পিঠের দিকে।এক ঝটকা দেয় ছান্দসি , আচমকা ধাক্কায় অরুন পেছনে হেলে পড়ে। দুপায়ের কাঁচির বন্ধনে তখনও আটকে আছে ছোট্ট মেয়ের শরীর ।ঠিক সেই সময় উজ্জ্বলার প্রবেশ ঘটে নাচ ঘরে।আচমকা উজ্জ্বলার আগমনে হতভম্ব অরুণ লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে উজ্জ্বলা অরুণের সামনে।অরুণ এমন এক ভঙ্গি করে যেন কেউ ওকে মারতে যাচ্ছে,পরমুহুর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে ‘এই মেয়ে, যা যা আমি কি তোকে কোলে রাখতে পারি?’ উজ্জ্বলা দেখে দুই পায়ের বেষ্টনী তখনও সাঁড়াশীর মতো আটকে ধরে আছে শিশুর কোমর। একটাও কথা বলেনি এতক্ষন উজ্জ্বলা, এক পা এগিয়ে গিয়ে ছান্দসির হাত ধরে টান মারে সে। হ্যাঁচকা টানে পায়ের বেড়ি খুলে আসে। ভয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া শিশু বলে ‘দেখনা পিসি ,অরুন কাকু নাচগান না শিখিয়ে কি সব করছিল।’আগুন ঠিকরে বেরোয় উজ্জ্বলার চোখ দিয়ে,বজ্রকন্ঠে উজ্জ্বলা বলে ‘ও কার মেয়ে জানা আছে তো ? একটা কথা যদি বাড়ি গিয়ে বলে, তোমার ভবিষ্যৎ কি সেটা তো পরের কথা, বাগদি পাড়ার একটা মার বাইরে পড়বে না, এই বোধ আছে তোমার?’ মুহুর্তের ঘটনা়য় উজ্জ্বলা ক্রোধান্বিত হলেও, অরুণ এবং নিজের ভবিষ্যৎ চিন্তা ওকে ব্যাকুল করছিল। উজ্জ্বল পুরো ব্যাপারটাকে কিভাবে সামলানো যায় তার ভাবনা ভাবছিল।হঠাৎই অরুণ বলে ‘তুমি আমার বাগদত্তা, আমায় ভূল বুঝোনা সোনা।আমি ওকে শঙ্খচিলের দুডানায় শান্তি সঙ্গীতের ব্যাখ্যা করছিলাম। তাই না ছাদসি?’ ছান্দসি চটজলদি উত্তর করে,’তুমি আমার গালে শক্ত দাড়ি ফুটিয়ে দিলেতো। তারপর ছুটে গিয়ে দেওয়াল আয়নাইয় দেখে এসে পিসি কে বলে,’এই দেখ লাল হয়েগেছে।’ অরুণ অস্বিকার করায় উজ্জ্বলা অস্থির না হয়ে ততোধিক গম্ভীর হয়ে যায় , মুখে একটাও কথা বলেনা।অরুণ কাকুতি মিনতি করতে থাকে। অবাক হয়ে ছান্দসি দেখতে থাকে দুজনের দিকে।উজ্জ্বলা বলে ‘অভয় দা আমাকে একদিন বলেছিল ভালো নাচ গান করতে পারলেই শিল্পী হওয়া যায় না শিল্পী মনুষ্যত্বের একটা স্তর। যে বুঝতে পারে তার শৈল্পিক অর্জিত দক্ষতা মানুষের কাজে লাগবে সেই শিল্পী।চললাম, তোমার নাচের ক্লাসে এই আমার শেষ আসা। তোমাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখতাম তার তুমি যোগ্য নও। এই মুহূর্তই সম্পর্কের শেষ নির্ঘণ্ট। তোমাকে চিনতে বড্ড ভুল হয়ে গেছিল।আজ এই শিশুকে একলা পেয়ে যা ঘটালে তা যেকোনো সময় আবারও ঘটতে পারে। তখন আমার কিছু করার থাকবেনা। তুমি আমার সাথে আর যোগাযোগের চেষ্টা করবে না কোনদিন।’ ‘চল রে মেয়ে’, বলে হাঁটা দেয় উজ্জ্বলা। যতক্ষণ এই কথাগুলো পিসি বলছিল ততক্ষণ অবাক হয়ে সে পিসির দিকে তাকিয়ে ছিল।ও বুঝতে পারছিল অরুণ কাকু বড়োসড়ো কোনো কান্ড ঘটিয়েছে।মায়ের কাছে দুস্টুমির জন্য বকুনি খাওয়ার চেয়ে যা হয়তো অনেক বেশি । পেটানির বেশ কিছুক্ষণ পর, মা জড়িয়ে ধরে আদর করতো। মায়ের এই পরাজয়ের স্বাদ চেটেপুটে নিত মেয়ে। কই পিসি তো তেমন আদর করলো না? ওর হঠাৎ মনে পড়ে যায় সীমা পিসির কথা।সীমা পিসি মাঝেমধ্যে ওকে কোমর নাচিয়ে নাটক করে দেখিয়ে বলে - তোর বাবা এমন করে মজুমদারকে বকেছিল, জানিস ? উজ্বলা পিসির রাগ যেন অনেকটা সেই রকম। মেয়ে এও ভাবে কি এমন করেছিল কাকু, এমনতো কেউ কোনদিন করেনি। সবাই যখন আদর করে তখনও কত্ত ভালো লাগে। সবাই পপি খাওয়ার জন্য ডাকে,গাল বাড়িয়ে দেয়, দূর থেকে গালে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় বেশ মজা লাগে ওর। খেলার সময় যখন কেউ এরকম করে তখন মাঝেমধ্যে বিরক্ত লাগে । কিন্তু অরুন কাকু কিরকম ঘেমে যাচ্ছিলো,আমায় পপি না চেয়ে নিজেই আমার সারা গায়ে পপি খাচ্ছিল,কেন? হয়তো ছান্দসি ব্যাপারটাকে এতটা গুরুত্ব দিত না। কিন্তু উজ্জলা পিসির কথা গুলো বড়ই অদ্ভুত, ‘এই আমার শেষ আসা’,মানে পিসি অরুণ কাকুর সঙ্গে কাট্টি করে দিল। হনহন করে চলতে থাকে উজ্জ্বলা পিসি। ওকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে চলে।ছান্দসি মনে ভাবে পিসিকে জিজ্ঞেস করে দেখলে হয।দেরি না করে সে জিগেস করেই ফেলে ‘পিসি ,তুমি বকছিলে কেন অরুন কাকুকে, কাকু কি করেছে ?’ ছান্দসি স্বভাবে হরবোলা,বকবক করা ওর অভ্যেস।নিঃসাড়ে তীর বেগে চলার ছন্দ ভঙ্গ হয় শিশুর প্রশ্নবাণে।উজ্জ্বলা স্বগতোক্তি করে - অরুণ এই অন্যায়, অসভ্যতা ছান্দসির সঙ্গে নয় আমার সাথে করেছে। ’ উজ্জ্বলা পিসির কিছু একটা বলছে বুঝতে পারে মেয়ে।আবারো কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য ছান্দসি তৎপর হয়ে ওঠে। প্রচন্ড চিৎকারে পিসি থামিয়ে দেয় ভাইঝিকে,রুদ্ধ কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলে ‘ও আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে।’ ‘কই কাকু তো তোমাকে কিছু করেনি?’ পাকা বুড়ির এমন কথায় থমকে যায় উজ্জ্বলা,বলে ‘তুই আমাকে বকাসনি থাম,বড় হলে সব বুঝবি।’বড় হয়ে গেল মেয়ে।কোথাও যেন ওর মনে হলো পিসি আর ওর জাত এক। ছোট্ট মেয়েটা ভাবছে, আমার সাথে যা করেছে কাকু তা পিসিকে আঘাত করেছে বেশি করে।পুরুষ জাত কে ভিন্ন করে দেখার দৃষ্টি বাসা পেল মেয়ের মনের গহীনে, শুরু হয়ে গেল ছান্দসির মেয়েবেলা।
আট
নতুন জীবন
মায়ে পোয়ে জমজমাট পরিকল্পনা সারা হয়ে গেল। অঞ্জলী বললেন ‘বাবা, তুই কি একবার অফিস কাকুদের সঙ্গে দেখা করতে পারবি?’ বুবু মাথা নেড়ে বলল হ্যাঁ, ‘আমি তো অনেক কে চিনি, তপন কাকু, শান্তি কাকু, সলিল কাকু। কাকে গিয়ে বলতে হবে, বলো।’ অঞ্জলী বলে ‘সলিল কাকুকে একবার বলবি আমি ডেকেছি।’ কথা অনুযায়ী বুবু চলে যায় অফিসে। যথারীতি সময় করে সলিল বুবুদের বাড়ি চলে আসে। সলিল রেল ইউনিয়নের একজন পদস্থ মানুষ। কৃষ্ণর প্রতি বিশেষ আগ্রহ এবং নিজস্ব রাজনৈতিক বাধ্যতার টানাপোড়েনে উনি কখন কৃষ্ণভক্ত হয়ে গেছেন তা নিজেই জানতে পারেননি? অবারিত দ্বার ঠেলে ঢুকে পড়ে সলিল। সমস্ত ঘটনা শুনে বৌদির দুঃখের সাথী হতে চান সলিল। অঞ্জলীর কাছে সলিল জানতে চায়, ‘গোস্বামী কে কি কারখানায় একটু টাইট দিয়ে দেবো?’ অঞ্জলি ঘাড় নাড়িয়ে না বাচক উত্তর করলে, সলিল বলে, ‘না ঠিক, এতদিন কৃষ্ণর অবর্তমানে কোন রকম রিপোর্ট খবরা-খবর হয়নি অফিসে। গোস্বামীর সঙ্গে সম্মুখ সমরে নামলে শয়তানটা অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কাছে চুগলি করে দিতে পারে। তারচেয়ে বরং ওর আয়ত্বের বাইরে চলে যাওয়াই শ্রেয়। প্রাথমিকভাবে হয়তো আপনাদের একটু অসুবিধে হবে। ওখানে ইউনিয়নের লোকজন আছে, কিছু নতুন কোয়ার্টার যার নির্মাণকাজ শেষের মুখে। সেখানে অ্যালটমেন্ট না পেয়ে মানুষজন জবরদস্তি থাকতে লেগেছে। প্রশাসন এলমেন্ট দিতে টালবাহানা করায় ইউনিয়নের মানুষজন সমর্থন জুগিয়েছে তাদের।’ অঞ্জলী বলে ‘দেখবেন, এখন তো একা বুবুকে নিয়ে থাকা। একটু প্রটেকশন চাই। সলিল বলে ‘একদম চিন্তা করবেন না। আমি আছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কয়েকদিনের মধ্যেই খবর এসে যায়। যাবার দিনক্ষণ স্থির হয়। চালু মাসের ভাড়ার টাকা দেওয়া আছে, অঞ্জলী ঠিক করে মাসের শেষে গোস্বামী বাবু কে জানাবে। এত তাড়াতাড়ি ঘটনাটা ঘটে যায়, বুবুর বন্ধুমহল জানতেই পারেনি। বাবার কাছ থেকে এই প্রস্তাব এলে বুবু কি ভাবতে পারত চলে যাওয়ার কথা?আশৈশব পড়শিদের ভালোবাসার লেনদেন ছিঁড়ে ও কখনো বেরিয়ে অন্য জায়গায় জেতে পারে তা অঞ্জলীও ভাবতে পারেনি। কিন্তু উপলব্ধির নিজস্বতা ওকে বাধ্য করল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে। হরিহর আত্মা টুলটুল শুধু জানে বিচ্ছেদের খবর। বুবু ও টুলটুল ঠিক করে নতুন বাড়িতে গিয়ে ওরা বেশ কিছুদিন একসাথে থাকবে। বুবু অঞ্জলীকে বলে ‘মা, ওমা, তুমি একটু টুলটুলের বাড়ি গিয়ে বল না?’ অঞ্জলী ছেলের কথায় টুলটুলের বাড়ি গিয়ে ওর মাকে সবকিছু জানায়। ওর মা বলে ‘ টুলটুল তো তোমারই ছেলে। নিয়ে যাও, কদিন থাকুক তোমাদের সঙ্গে।’ নির্দিষ্ট দিনে সন্ধ্যালোকে বন্ধুকে বগলদাবা করে ম্যাটাডোরে উঠে পড়ে বুবু। মা অঞ্জলী সামনে ঠাঁই পেয়েছে। ম্যাটাডোর স্টার্ট দেয় পেছনে ফেলে রেখে স্মৃতিময় অতীত। বিজয়, পচা, মনি এমনকি পাঁচু পর্যন্ত কাঁদছে গোপনীয়তার দাবি তুচ্ছকরে।
অন্ধকার পরিত্যক্ত ঘরে রাতের আঁধারে কিছুই দেখা যায়না। লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিটি ঘরে মোমবাতি, হ্যারিকেন জ্বালিয়ে রেখেছে ওরা। সলিল কাকু আগে থেকে আবহের আন্দাজ দিয়েছিল। টিমটিমে হারিকেনের আলোয় সবাই মিলে পরিষ্কার করতে থাকে নতুন বাসস্থান। টুলটুলের চোখের জল ততক্ষনে শুকিয়ে গেছে। নব আনন্দে মেতে উঠেছে ওরা। আঁস্তাকুড় সরিয়ে ঘরদোর বাসযোগ্য করার যজ্ঞে। সলিল বাবু হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করে ‘গোস্বামীর প্রতিহিংসার কথা তুই জানলি কি করে?’ বুবু জানায় ‘স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটা গুঁফো লোক আমায় ধাক্কা মারে। আমি পড়ে গিয়ে তাকিয়ে দেখি লোকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা গোস্বামী দাদুর দিকে চেয়ে আছে। আমায় লোকটা খ্যাঁকশিয়ালের বাচ্চা বলে গাল দিচ্ছিল।’ সলিল কাকু বলে ‘বাবা তোর তো খুব বুদ্ধি রে।’ হেঁসে ওঠে বুবু। মা বলে, ‘খুব হয়েছে, এখনও অনেক কাজ বাকি।’ দেওয়াল বেয়ে গাছের শাখা-প্রশাখা জানলা দিয়ে ঢুকে পড়েছে। বুবু টর্চ জ্বেলে আলো দেখাচ্ছে আর ছেনি হাতুড়ি দিয়ে একের পর এক ডালপালা ছেটে চলেছে টুলটুল। সলিল বলে ‘এক্কেবারে জন হেনরি।’ হেসে ওঠে সবাই, সীমাহীন অন্ধকার ফুঁড়ে কখন যে প্রভাত অমল আলো নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কেউ খেয়াল করতে পারেনি। ততক্ষণে ওদের পৃথিবী বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। এখন আশু প্রয়োজন জলের ব্যবস্থা করা। ছোটবেলা থেকেই অঞ্জলী মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে ছেলেকে, যেকোনো পরিস্থিতিতেই সে স্বাভাবিক থাকতে জানে। শুধু অনুভুত হয় বাবার অভাব। যদিও বাবা না থাকায় নিজের পায়ের উপর দাঁড়ানোর বিশ্বাস জন্ম নেয় ওর মধ্যে। বুবু বাসা বদল এর গল্প স্কুলের কাউকে জানায়নি। অঞ্জলী যদিও জানত যে গোস্বামী চাইলে মুহূর্তে সবকিছু খুঁড়ে বার করতে পারে। বুবু মাকে জিজ্ঞেস করে ‘গোস্বামী দাদু যদি সবকিছু কারখানায় জানিয়ে দেয়, তাহলে কি হবে?’ এই আশঙ্কা অঞ্জলী করেনি এমন নয়। তবুও ওর মনে হয়েছিল গোস্বামী আর কিছু করবে না। সে বুবুকে বলে, ‘দ্বিগুণ ভাড়ায় সে কারখানার আরেকজনকে বধ করেছে, এই জন্যই প্রাণপণে চাইছিলো আমাদের ভাগাতে। বাড়িওয়ালা চায় না ভাড়াটে বেশিদিন এক বাড়িতে এঁটুলি হয়ে থাকুক। সুযোগ জুটে গেল তোর বাবার আন্ডারগ্রাউন্ডে যাওয়ায।’
বেশ কিছুদিন পর অঞ্জলী বুবুকে জানায় ওর বাবার ফেরার সমাচার। বাবার অবর্তমানে বুবু নিজেকে নতুন জায়গায় জড়োসড়ো করে রেখেছিল। স্কুল ফেরত বাড়ি এসে এই কথা শুনতে পেয়ে সে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। অঞ্জলী জানতো কৃষ্ণর ফিরে আসার লগ্ন, কিন্তু মনে একটা ভয় কাজ করত। না আঁচালে বিশ্বাস নেই। বুবুর রাস্তায় প্রথম যার সঙ্গে পরিচয় তার নাম মুন্না। মুন্না বিহারী হলেও বাংলা কথা বলায় সে অত্যন্ত পটু। হাতে শিক আর চাকা নিয়ে সে মাঠে দাড়িয়ে ছিল। বুবুকে স্কুলে যাতায়াত করতে দেখত মুন্না, এগিয়ে এসে কখনো কথা বলেনি। আজ বুবু মাঠে এসে হাজির হওয়ায় মুন্না জিজ্ঞেস করে বুবুকে ‘তোর নাম কি, আমার নাম মুন্না, তুই চাকা শিক খেলতে জানিস?’ বুবু খুব অবাক হয়, কারন ও জানতো ওর নিজের মতো বাচাল পৃথিবীতে নেই। বুবু হেঁসে বলে, ‘এইতো পেয়েছি।’ মুন্না কিছু বুঝতে না পেরে বলে ‘কি পেয়েছিস? চাকা শিক?’ বুবু বলে ‘না,খেলার সঙ্গী। আমাকে একটু দেখিয়ে দে কি করে খেলতে হয়।’ বুবুকে ট্রেনিং দিতে থাকে মুন্না পিচ রাস্তায়। প্রথম প্রথম খুব অসুবিধায় পড়ে যায় বুবু, এমন খেলা কখনো খেলেনি সে আগে। মুন্নার দেখাদেখি চাকাটার পিছনে পিছনে ছুটতে থাকে সে, বেয়াক্কেলে চাকাটা হেলেদুলে নড়বড় করতে করতে ছোটে। কিছুক্ষণ ছোটার ছন্দে বুবু বুঝতে পেরে যায় মসৃণ চলার রহস্য। আর থামতে চায় না সে। ম্যাকিন্স লেন পেরিয়ে চার্চের গা বেয়ে যে ফালি রাস্তা স্টেশনের দিকে চলে গিয়েছে, বাঁক নিয়ে বুবু সেই পথ ধরে। একে একে সাইকেল, পথচারি মানুষকে টপকে যাচ্ছে সে। বন্ধুর গলার স্বর আর কানে আসছেনা, মুন্না এখন অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। হাতে চাকা শিক থাকলে আপনি গতি এসে যায়। হঠাৎ করে সামনে এসে পড়ে ঢালাই লোহা বয়ে নিয়ে চলা ঠেলাগাড়ি। বুবু স্বগতোক্তি করে ‘বোঝো ঠেলা’। ডাইনে মোড় নিলেই স্টেশন। একটু অসাবধানতায়, বুবু তীব্র বেগে আসা একটা মোটর সাইকেলের সামনে পড়ে যায়। এই রাস্তা কেবল পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট, মোটর চালিত যান এখানে নিষিদ্ধ। শিক বুবুর হাতে থেকে যায়, চাকা ছিটকে গিয়ে পড়ে কোয়ার্টার ঘেরা রেলিঙ্গের ধারের নর্দমায়। এক ভদ্রলোকের হ্যাঁচকা টানে বুবু তার শরীরে আশ্রয় নিয়েছে। মুন্না ততক্ষণে এসে হাজির হয়েছে সেখানে। মোটর সাইকেল আরোহী ধমক দিতে গিয়ে থমকে যায়। একটা বজ্র গম্ভীর স্বর জেগে ওঠে নিস্তব্ধতা খান্ খান্ করে। ‘আপনি এখানে বাইক চড়ে ঢুকেছেন কেন?’ বুবু গলার আওয়াজ শুনে অবাক হয়ে চেয়ে দেখে ওর বাবা ওকে কোলে টেনে নিয়েছে।
বুবু মুন্নাকে বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। মুন্নার বুবুর বাবাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কেন হয়নি তা সে জানে না। এতদিন ধরে বুবুরা এসেছে তবু ওর বাবার সঙ্গে কেনই বা দেখা হবে না, তা মুন্না বুঝতে পারেনি। হঠাৎ নিজের ভাষায় মুন্না কৃষ্ণ বাবু কে জিজ্ঞেস করে ফেলে ‘চাচা আপ কঁহি গ্যায়েথে?’ বাবাকে কিছু বলতে না দিয়ে বুবু বলে হ্যাঁ, বাবা অফিসের কাজে বাইরে গেছিল। মুন্না বলে ‘ঠিক আছে আমি চলি। তুই কাকুর সাথে আয়।’ মুন্না ছুটতে থাকে, সামনে শিক চাকা। বুবু বাপের হাত ধরে হাঁটতে থাকে। কৃষ্ণ বুবু কে জিজ্ঞেস করে `কিরে নতুন জায়গা কেমন লাগছে?' ও কিছু বলার আগেই প্রশ্নবান আবার বুবুকে আঘাত হানে। `তুই জানিস আমি কোথায় গিয়েছিলাম, মুন্না কে যা বললি সে তো ডাহা মিথ্যা।’ কৃষ্ণ একটু মেপে নিতে চাইছিলো ছেলেকে। ছেলে বলে ‘আজই মায়ের কাছ থেকে শুনলাম তোমার ফিরে আসার কথা। সেটা যে আজই ঘটতে চলেছে মা আমাকে বলেনি। আজই প্রথম আমি রাস্তায় বেরিয়েছি আর আজই মুন্নার সাথে প্রথম দেখা। ওকে এইসব জানিয়ে কি হবে?’ অবাক দৃষ্টিতে কৃষ্ণ তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকে। ছেলে যে বড় হয়ে যাচ্ছে সে বুঝতে পারে। এক একবার ফিরে ফিরে আসা আর নতুন করে ছেলেকে আবিষ্কার করা। পায়ে পায়ে ওরা ততক্ষণে কোয়ার্টারের সিঁড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছে।
এর আগে টুলটুল, পচা স্কুল ফেরত মাঝে মাঝে আসতো বুবুদের বাড়ি। তখন বুবু ওদের সঙ্গে রাস্তায় একটু আধটু বের হতো। এখন বাবা ফিরে আসার পরে এখানকার বন্ধুদের সঙ্গেই খেলতে বের হয়। মুন্নার হাত ধরেই নতুন বন্ধুত্ব হয় গজা, মানুয়া, রন্টু, বাবু, ধীরেন্দ্রদের সাথে। মার্বেল এর সাথে জুটেছে এখন ডাংগুলি, লাললাঠি, পিট্টু, আইস বাইস খেলা। রেল কলোনীতে মাঠের কোন অভাব ছিল না। বিভিন্ন মাঠে চলত বিভিন্ন খেলার ট্রেনিং। ওদের বাড়ির কাছেই হকি ক্লাব ছিল, ধীরেন্দ্র যেত ট্রেনিং নিতে। একদিন বুবুর শখ হয় হকি খেলা দেখবার। ধীরেন্দ্রকে বলতেই সে নিয়ে যায় ওর সঙ্গে। রেল হকি টিমের অনেকজন এই ক্লাবের সদস্য ছিল,আবার বেশ কয়েকজন ছিল নিয়মিত বাংলা দলের খেলোয়াড়। ধীরেন্দ্র বুবু সঙ্গে অনেকের পরিচয় করিয়ে দেয়। বিস্ময়াবিষ্ট বুবু এই প্রথম বাংলা দলের কোন খেলোয়াড়ের সঙ্গে পরিচিত হলো। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে বুবু দেখতে থাকে হকির জাদু। ধীরেন্দ্র পরিচিত করিয়ে দেওয়াতে প্লেয়ারদের চিনতে সুবিধে হচ্ছিল। প্রথম দিনই ইশতিয়াক হোসেন আর গুরমুখ সিংয়ের খেলায় মুগ্ধ হয়ে যায় বুবু। চলতে থাকে মাঠের পাশে বসে থেকে হকি চর্চা। ধীরে, দর্শক বুবু ভালবেসে ফেলে খেলাটাকে, মন মেতে যায় হকির মাধুর্যে। একদিন বিরতির সময়ে সে একজন খেলোয়াড় কাকুকে বলে ‘কাকু, একটু স্টিকটা দেবে? দেখব।’ কাকু দেখেছে বেশ কিছুদিন ধরেই ফুটফুটে ছেলেটা মাঠে আসছে আগ্রহভরে খেলা দেখছে। আনন্দের সঙ্গে কাকু বলে ‘বেটা, হকি খেলোগে?’ এগিয়ে এসে দু-চারটে স্কিল দেখিয়ে দেয় বুবুকে। যেকোনো কিছুই খুব সহজেই আয়ত্ত্ব করতে পারত বুবু। শুধু ক্লাসে ছবি আঁকতে দিলে কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং মিলত খাতায়। প্রথম দিনের অল্প কিছুক্ষণের কপি করা কসরত দেখে অনেকের ভালো লাগে। গুরমুখ সিং বুবুকে বাচ্চাদের সাথে খেলতে বলে, বুবু রাজি হয়ে যায়। প্রথম দিনের খেলা দেখে গুরমুখ ভেবেই বসে এ ছেলে চাইলে ভালো খেলতে পারবে। আপাতত কিছুদিন বাচ্চাদের সঙ্গে খেলুক তারপরে বুবু কে কিশোরদের দলে আনতে হবে। বাংলার হকি দলে রেল থেকে অনেক খেলোয়াড় জায়গা করে নেওয়ায় এই ক্লাবের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু রেজিস্টার্ড কোচিং ক্লাব হিসেবে এর অস্তিত্ব ছিলনা। গুরমুখ জানত যে এই কাজ তার পক্ষে সম্ভব নয়। ক্লাব কে দাঁড় করাবার জন্য চাই একজন উদ্যমী পুরুষ। গুরমুখ সহ খেলোয়াড়দের কাছে প্রস্তাব দেয় কিন্তু কি করে এই উদ্যোগ সফল হবে তা ওরা বুঝতে পারে না। হাতে হকি স্টিক পেয়েই বুবুর খেলার সাধ জেগেছে। বেটার আবদার মেটাতে কৃষ্ণ একটা হকি স্টিক কিনে দিয়েছে তাকে। পুরো দস্তুর চলতে থাকে প্র্যাক্টিস। ধীরেন্দ্রর মুখে শুনতে পায় বুবু খেলোয়াড় কাকাদের ক্লাব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার কথা। শয়তান বুবু কাকাদের বলে ‘বাবাকে বলো, ঠিক কোন না কোন একটা উপায় বেরোবে।’
পাড়ার জমাটি মেজাজ কিছুতেই কলোনিতে পাওয়া যায় না। এই প্রথম ওরা এমন পরিবেশে থাকা শুরু করেছে। কপাট বন্ধ করে দিলেই যে যার আলাদা, বাড়ির জানলা দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে গল্প, পরনিন্দা-পরচর্চা কিছুই সম্ভব নয়। অঞ্জলীর খারাপ লাগে সবচেয়ে বেশি। মানুষ একলা থাকার কথা ভেবে মনে মনে মহিমান্বিত হয়। মূর্তিমান অসময় যখন এসে হাজির হয়, স্বপ্নের সিঁধ কেটে তখন সে বিপদে কেউ তোমার পাশে নেই। হাহাকার করে ওঠে মন, ধু ধু মরু বালি রাশির মতো শুষ্ক মনে হয় জীবনকে। পুজোতে অঞ্জলীরা অষ্টমীর দিন দলবেঁধে অঞ্জলী দিতে যেত। নবমীর দিন যৌথ রান্নাঘর। রেল কলোনির পরিবেশে এ এক অবাক অসম্ভব কান্ড। অঞ্জলী ভাবে পুজোর কটা দিন পুরনো পাড়ায় গিয়ে হাজির হবে। কৃষ্ণ বাড়িতে ফিরলে অঞ্জলী জানায় তার ইচ্ছার কথা। কৃষ্ণ বলে 'বাঃ, অতি উত্তম।' বাঃ মানে কী বুঝতে না পেরে অঞ্জলী জিজ্ঞেস করে। কৃষ্ণ বলে 'দি আইডিয়া, দি আইডিয়া।’ অতৃপ্ত অঞ্জলী বলে ‘হেঁয়ালি ছেড়ে খুলে বলবে কি?’ ‘দুর্গা পুজো করবো।’ অবাক হয়ে যায় অঞ্জলী কৃষ্ণের কথায়। ঠিক সেই সময় মাঠ থেকে এসে ঢোকে বুবু। সে শুধু শুনেছে দুর্গাপুজো কথাটা। সে মাকে বলে ‘দূর্গা পূজার কেনাকাটা এত তাড়াতাড়ি কেন, কী কারণে?’ অঞ্জলী বলে 'না রে তোর বাপের কথা শুনেছিস, বলে কিনা দুর্গাপুজো করবে কলোনিতে।’ হা করে তাকিয়ে থাকে বুবু। মনের কোনে উড়ে আসা দুর্গাপূজার ঝকমকে রঙবাহারি আলো ঢাকের বাদ্যি আর ধুনুচি নাচের ছন্দে বুবু হারিয়ে যায়। নিজেদের পাড়ায় নিজেদের পুজো শুধু এটুকুই মনে থাকে। কৃষ্ণ বলে, 'বুবু, তোর হকি ক্লাবের মাধ্যমেই লিফলেট যাবে সবার কাছে। লিফলেট তৈরি হবে হিন্দি, বাংলায়। আরেকটা কাজ হবে এতে। ধর্মের ভাষার নিগড় মুছে যাবে।’ শেষ বাক্যটা যেন স্বগতোক্তি করল কৃষ্ণ। বুবু বলে ‘ঠিক বলেছ। কিন্তু হকি ক্লাবের কেউ গুরুদুয়ারা, মন্দির বা মসজিদ যায়, চার্চেও যায় জোনাথন কাকা।সবার আলাদা আলাদা ভগবান। দূর্গা পূজায় কি করে ওরা আসবে সবাই? কৃষ্ণ বলে ‘পূজো এখানে গৌণ, মুখ্য হলো যৌথ রান্নাঘর, আড্ডা, জলসা, নাটক।' নাটক হবে শুনে বুবু খুব খুশি। একদিন সন্ন্যাসীর তরবারি দেখেছিল স্কুল মাঠে। খুব ভাল লেগেছিল তার। বাবা বলে ‘সবার কাছে পৌঁছতে গেলে সব ভাষায় অনুষ্ঠান করতে হবে সেইজন্য জলসা আয়োজনের উদ্যোগ নিতে হবে। এখানে ভাঙ্গরা, ভোজপুরি, বাংলা, এমনকি বাউল, ফকিরি নৃত্যগীতের অনুষ্ঠান হবে। অঞ্জলী কিছু বলতে না পেরে অস্থির হয়ে উঠছিল, একধমকে বাপ বেটাকে থামিয়ে দিয়ে সে বলে ‘আমি পূজোর চারদিন শীলা, ইতু ওদের এখানে থাকতে বলব।’
কাজ শুরু হয়ে যায়। হকি ক্লাবের মাধ্যমে লিফলেট পৌঁছায় মানুষের ঘরে ঘরে। একটা নতুন উন্মাদনা খুঁজে পাওয়া যায় মানুষের মধ্যে। সঙ্গে ক্লাবের সভ্য সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রেজিস্ট্রেশনের পথও সুগম হয়। হিন্দিভাষী মানুষজন অনেকে কথা দেন যে পুজোর ছুটিতে তারা দেশে ফিরবেন না, যোগ দেবেন পুজোতে। এই কলোনির বহু কর্মী ড্রাইভার, গার্ড, যারা রেল পরিষেবার সাথে সরাসরি যুক্ত, তারা জানায় সময় সুযোগ বুঝে তারাও থাকবেন। ওদিকে নাটকের পরিচালক ঠিক হয়ে যায়। স্বপন বাবু রেল শিল্পে যুক্ত থেকেও তার শৈশবের আশ্রয় নাটক কে কোনদিন ছেড়ে দেননি। নাট্য আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ স্বপন রাজি হয়েছেন কৃষ্ণর অনুরোধে নাটক পরিচালনা করতে। কৃষ্ণ সময়োপযোগী নাটক রাজদর্শনের কথা জানালে উনি খুব খুশি হন। রিহার্সালও শুরু হয়ে যায়। বন্ধুদের নিয়ে বুবুও হাজির থাকে প্রতিটি রিহার্সালে। ফাইফরমাশ খেটে ওরা স্বপন জেঠুর চেলা হয়ে যায়। স্বপন জেঠু ওদের একেবারে নিরাশ করেন না। স্টেজে কতগুলো ঘোড়ার প্রয়োজন, যুদ্ধের আবহ তৈরি করতে, ওরা সেই দায়িত্ব পালন করবে। প্রথম জীবনে স্টেজে ওঠা, মানুষ বা ঘোড়া কি আসে যায় তাতে? নাটকের নেপথ্যে, আড়ালে থাকা মানুষজন মঞ্চে থাকা অভিনেতাদের চেয়ে কম কিছু নয়। একটা প্রযোজনার ক্ষেত্রে এই বোধ ওদের মধ্যে তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন স্বপন বাবু এই কদিনে। যদিও শয়তান গুলোর কাছে এ ছিল নিছক হুল্লোড়বাজি।
পুজোর ক'দিন কাটে অমলিন আনন্দে। বুবু সবকটা বন্ধুকে পুরনো পাড়া থেকে ধরে নিয়ে এসেছে। ওরা প্যান্ডেলে থাকে, প্যান্ডেলে খায়, প্যান্ডেলে শোয়া-বসে, প্যান্ডেলে গায়। বাড়ি ঘর যায় কেবল রাতে। বুবু চিরকাল এঁচোড়ে পাকা। সে বড়দের ঠেকগুলোতেও মাঝে মাঝে ঘুরে আসে। এর কারন শুধুই পাকামি নয়। একটু অন্যদের কাছে নিজের দর বাড়ানো, বন্ধুরা তেমনই বলে। বড়দের ঠেক গুলোতে একটা নাম খুব শোনা যায় - জর্জ ফার্নান্ডেজ। এমন নাম বুবু কোনদিন শোনেনি, ও প্রথমে ভেবেছিলো এরকম ক্রিশ্চানি নাম, জোনাথন কাকার কেউ হবে হয়তো। কিন্তু জোনাথন কাকার আত্মীয় পূজোতে কোন ভুমিকা পালন করবে? ফার্নান্ডেজ নামটা শুনলেই বুবু চুপটি করে দাঁড়িয়ে যেত, কী, আলোচনা হয় শুনবে বলে। কাকুদের কাছে গুপিবাঘা আর জর্জ ফার্নান্ডেজ সমর্থক। বুবু বুঝতে পারত জর্জ ফার্নান্ডেজের নামে ওরা মন্ত্রমুগ্ধ। পূজো ফুরিয়ে আসছে এই দুঃখবোধ বুবুকে কোনরকম কূটকচালির মধ্যে ঢুকতে দেয়নি। সে লুটেপুটে নিতে চেয়েছে প্রতিটা মুহূর্ত। গুরমুখ কাকার ছেলে মনমিতের সঙ্গে ভাঙড়া নাচের মহড়া থেকে শুরু করে দরবেশি গান শিখেছে। আনন্দ লহর চিরস্থায়ী নয় তাকে লয় প্রাপ্ত হতেই হয়। বিসর্জনের দিন এসে পড়ে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারকোল নাড়ু আর নিমকি। বাড়ি ফিরে বারান্দায় চোখ মেলে বিষন্ন আলোয় দেখা দেবীহীন পুজো প্যান্ডেল, বিজনে একাকী পড়ে আছে। বুবুর বুকটা হু হু করে ওঠে।
কৃষ্ণ বলে, 'কিরে ছ্যামড়া, গুম মেরে গেছিস যে বড়? পুজো আসে পুজো যায় কালের নিয়মে। আসছে বছর আবার হবে।' বুবু সটান জিজ্ঞেস করে, 'সত্যিই আসছে বছর আবার হবে? পুজোর এই পাঁচ দিন আমরা খুব আনন্দ করেছি। এমন ভাবে কটা দিন সকলের সাথে আড্ডা দেওয়া বড়দের কাছে ভালবাসা পাওয়ার অভিজ্ঞতা শিবতলার পূজোতেও ঘটেনি।’ কথা বাড়াতে না দিয়ে কৃষ্ণ জিগেস করে ‘নতুন কী কী দেখলি জানলি,এমন মনে হল কেন?’‘দরবেশি গান নাটক ভাংরা নাচ জর্জ ফারনান্ডেজ আরও কতকিছু।’ কৃষ্ণ বুঝতে পারে না ফারনান্ডেজ আবার কোথা থেকে এসে জুটল। এড়িয়ে গিয়ে কৃষ্ণ ফের বলে, ‘আর কিছু?’ মাথা চুলকে বুবু বলে,‘হ্যাঁ, বড়দের জটলা দেখলাম যেখানে আলাদা আলাদা দল করে ওরা কী সব আলোচনা করছিলো - একে অপরের হাত শক্ত করে ধরতে হবে। ‘তার মানে তুই শুধু বড়দের কথা গিলিস?’ বাবার এই কথায় বুবু লজ্জা পেয়ে যায় কিন্তু হতোদ্যম হবার ছেলে সে নয়। ধাঁ করে বুবু জিগেস করে বসে,‘ওসব ছাড়ো, আগে বল তুমি পুজো করার সিদ্ধান্ত নিলে কেন আর জর্জ ফারনান্ডেজই বা কে?’ কৃষ্ণ অস্ফুটে বলে - ফার্নান্ডেজ কে, আগামী সময় তার জানান দেবে। তারপর একটু সময় নিয়ে, ধ্যান গম্ভীর চিন্তিত মুখে বুবুর চোখে চোখ রেখে বলে 'ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রেল শ্রমিক। সামনে ঘোর দুর্দিন।'
নয়
জীবন পুরের পথিক
সাগর পাড়ে সারি সারি নারকেল গাছ যেমন সুনামির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, আট মে, ১৯৭৪ শ্রমিকে ধর্মঘটের সরকারি প্রতিক্রিয়ায়, রেল শ্রমিক তেমনই অচল অনড় থেকে যায়। গণতান্ত্রিক স্বাধীন দেশের মাটিতে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক নির্মাণের সংঘর্ষ। বুবুরা ততদিনে, আইনত কোয়ার্টারের অ্যালটমেন্ট পেয়ে গেছে। অনেক নতুন বন্ধুও হাজির নতুন জায়গায়। লোকো পাইলট গার্ডরা ঠিক করে রেল কলোনির যত পরিত্যক্ত বাড়ি আছে তা কিছুদিনের জন্য সাফ-সুরত করে রাখবে। পরিবার থাকবে বাড়িতে আর রেলকর্মী পুরুষরা পরিত্যক্ত বাড়িতে। মুন্না অশোক রাজিন্দর সব বন্ধুদের নিয়ে বুবু হাজির সাফাই অভিযানে। কৃষ্ণ স্যানিটারি ডিপার্টমেন্টকে খবর দেয়। ডিপার্টমেন্টের কর্মী বন্ধুরা খবর পেয়ে ওদের সাথে হাত লাগায়।বুবু জোনাথন কাকুকে জিজ্ঞেস করে, 'পুলিশ কেন ধরপাকড় করবে?' কাকু বলে 'ওস্তাদ,ওরা আমাদের ধরে নিয়ে গিয়ে যদি একবার রেল চালাতে পারে তাহলে সংবাদ মাধ্যম খবর দেবে রেল ধর্মঘট উঠে গেছে।আমরা মানসিকভাবে হেরে যাব।’ পুলিশের আগমনবার্তা আগেভাগে জানার প্রক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে বুবুদের বাড়িতেই মিটিং চলেছে। মাষ্টার দা বলেন, 'কই বাত নেহি, হ্যামি কারখানার সাইরেন ইউনিট টা খুলে নিয়ে চলে আসবো।' কারও মাথায় ঢোকেনা, বন্ধ কারখানায় পুলিশ প্রহরা ভেদ করে এমন কাজ কি করে সম্ভব। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে মাস্টার দা বলেন, ‘ফিকির ম্যাত কিজিয়ে, আর.পি.এফ লোগোক্যা সঙ্গ হ্যাম গ্যাঁজা পিতে হায়।’ তবু সংশয় থেকেই যায়, নেশাড়ু লোক মাস্টারদা, কখন কাকে আগাম মাষ্টার প্ল্যান জানিয়ে দেবেন।যদিও ওনার সততায় সবার অটল বিশ্বাস। টেকনিক্যাল কাজে অত্যন্ত নিপুন হওয়ায় শেষমেশ আর কথা না বাড়িয়ে ওনাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন ফেউদের ফাঁকি দিয়ে গোপনীয়তা মেনে সাইরেন লাগানো হবে কোথায়? আলোচনা চলতে থাকে সমাধানের আশু পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। মুন্না বুবুকে মাঠে খেলতে যাওয়ার জন্য ডাকতে এসেছে। সবার সামনে বুবু, হঠাৎ করে মুন্নাকে জিজ্ঞেস করে এই প্রসঙ্গে। মুন্না বলে, 'ধ্যাত তেরিকা, মসজিদ সে আচ্ছা জায়গা ক্যাসে মিল স্যেখতা? কাকা, মসজিদের জঙ্গলে কেউ ঢোকেনা, আমরা এরশাদের কাছে যাচ্ছি,একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে।’লেগে যায় রেলের সাইরেন মসজিদের অন্দরে। সাইরেন বাজিয়ে, পুলিশি আগমন বার্তা জানান দেওয়ার আয়োজন পাক্কা। দিনের বেলা গাড়ি গাড়ি পুলিশ ঠাওর করতে পারেনা কর্মীদের অবস্থান। সরকারি দালাল কিছু কর্মী,অফিসার পুলিশের লেজুড় হয়, তারা চেষ্টা করে পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর সন্ধানের।
এমনই এক নিশুতি রাতে সি রোডের ১২৮, নম্বর বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ।গ্রেপ্তার হন পরশুরাম বোস এবং কৃষ্ণ বাবু। কোমরে দড়ি বেঁধে, পুলিশ ভ্যানে তোলার ব্যবস্থা করে বন্দীদের। জোন ভাগ করে অবস্থান করেছিল পুলিশ যাতে পান্ডাদের সবকটাকে গাড়িতে তোলা যায়। বাড়ি হাটখোলা ফেলে রেখে বুবু অন্ধকারের বুক চিরে বেরিয়ে পৌঁছায় মসজিদের গলিতে । কাকপক্ষী যেখানে যেতে দিনের বেলায় ভয় পায়, সেখানে একা সাহসী বুবু বুক চিতিয়ে পৌঁছায়। এতটা আশা করতে পারেনি চামচার দল। হর্ন বাজতে থাকে পাগলের মত, নিঃসীম অন্ধকার কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে। কোয়ার্টার ছেড়ে দল বেঁধে মানুষ বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। মা অঞ্জলি, প্রিজন ভ্যানের তলায় শুয়ে পড়ে চেঁচিয়ে বলতে থাকে, 'আমার লাশের ওপর দিয়ে ভ্যান চালিয়ে তবেই বন্দীদের নিয়ে যাওয়া যাবে।' হতভম্ব পুলিশ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মেসেজ পাঠাতে থাকে ওপরওয়ালার কাছে। ততোক্ষণে রেল কলোনি জমজমাট।মানুষের হাতে হাতে শৃংখল তৈরি হয়ে যায়, বাধ্য হয় পুলিশ কৃষ্ণ বাবুকে ছেড়ে দিতে। পরদিন সভা করে ঠিক হয় পরিবার-পরিজন নিয়ে গা ঢাকা দিতে হবে সক্কলকে। মড়ক লাগলে গ্রামের মানুষ যেমন সবাই ঘর ছাড়ে, ঠিক তেমনই,কয়েক হাজার একর জোড়া রেল কলোনি, জনমানব শূন্য হয়ে যায়। এমনকি রাস্তার নেড়ি কুত্তা গুলোও অজ্ঞাতবাসে চলে গেছে। পড়ে থাকে শুধু গোলাম আর মালিকের কিছু পরিচিত মুখ। পরশুরাম বোসকে কিন্তু পুলিশ অন্ধকারে লুকিয়ে নিয়ে পালাতে পেরেছিল।
অঞ্জলির বাপের বাড়ি উত্তর কলকাতার পাইকপাড়ায়।বুবুরা সেই সময়ে মামার বাড়ি গিয়ে থাকতে শুরু করে। দিদা, বড়মামা এবং অন্য তিন মামা নিয়ে মামার বাড়ি সরগরম,সক্কলে অবিবাহিত। বড় মামার পরে ওর মা অঞ্জলি।বড়মামা বোহেমিয়ান জীবন যাপন করত,বুবুর খুব ভালো লাগতো এমন উদাসীন কাঙ্ক্ষিত জীবনচর্চা।কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা মনে মনে।ছোটবেলায় ফেলে আসা মামার বাড়ির দিন গুলো মাথায় এসে ভিড় করে বুবুর ।দিনের কাজ সেরে, দিদা নাগাড়ে উপন্যাস পড়ে চলতেন। বুবু দিদার মাথার পাকা চুল তুলে কাজের বিনিময় মুল্য পেত ৷ দিন প্রতি দশ পয়সা,বিকেল চারটের সময় আসতো ম্যাগনোলিয়া কোম্পানির আইসক্রিম গাড়ি।দিদার কাছে, আরো একশো পঞ্চাশটি পাকা চুল তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার করে, পনেরো পয়সা আদায় করে ম্যাগনোলিয়ার গাড়ির পেছনে ছুটতো সে। ধার থেকে যেত চিরকাল, শুধতে পারতোনা বুবু।কখনো অদ্ভুত সুর ভেসে আসতো মাটির বেহালায়,চলে যেত ফেরিওয়ালা। পেছন পেছনে ছুটতো বুবু। ‘মন ডোলেরে তন ডোলেরে’, কি অপূর্ব সুর তরঙ্গ। অথচ বাড়িতে এলেই সুর হারাতো সেই যন্ত্র,কান্না পেয়ে যেত বুবুর। বারান্দায় বসে, মামার বাড়ির স্মৃতি, ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে ওর মনে। হঠাৎ স্বপ্নের ঢেউ আছড়ে পড়ে বাস্তবের কুলে। একটা ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দে জেগে ওঠে বুবু। একজন অশ্বারোহী গলির মুখ থেকে ছুটে আসছে ওদের বাড়ির দিকে। এইয়া বড় তেজি বাদামী রঙের ঘোড়া। সদ্য আইভ্যানহ পড়া শেষ করেছে বুবু। যেন টেম্পলার ব্রাউন হাজির সামনে। বড় মামার ডাকে সম্বিত ফেরে বুবুর, একছুটে নিচে নেমে যায় সে। মা বলে,কোথায় যাচ্ছিস?'কোন উত্তর না দিয়ে,বড় মামাকে বলে, 'ঘোড়ায় চড়বো।' পাগলা লোকটা হ্যাঁচকা টানে বুবুকে তুলে সামনে বসিয়ে নেয়।অঞ্জলি দেখে খটাখট শব্দে ঘোড়া ছুটিয়ে গলির বাঁকে মিলিয়ে যায় ওরা। বুবু মামাকে জিগেস করে,' এ কাদের ঘোড়া?'মামা বলে মাউন্টেড পুলিশের।' 'পুলিশের ঘোড়া তোমায় কেন দেয়?' এ প্রশ্নের উত্তরে মামা বলে, 'এখন এসব প্রশ্ন রাখ, তারিয়ে উপভোগ কর গতি।’ সরে সরে যায় রাস্তার চালচিত্র তারই মধ্যে বুবুর মনে হয়, মা হয়তো এখনো ডেকে চলেছে - বুবু যাস না। ওর কি পিছু তাকাবার সময় আছে? ততক্ষণে ঘোড়া উঠে পড়েছে বিটি রোডে। বুবু জিগেস করে, 'আমরা এখন কোথায় যাব?’ আরও কতো কী যে বলে চলে আবেগে, সব কথা শোনা যায় না, হাওয়ায় ভেসে উবে যায়। মামা বলে, 'দেখ না কোথায় যাই।' শনশন হাওয়া কেটে ঘোড়া চলেছে,বুবুর ঝাঁকড়া চুল উড়ছে। টালার মস্ত ট্যাংক ছেড়ে বাগবাজার খাল ব্রিজ, ফুটপাতে হাঁটা লোকজন চেয়ে থাকে ওদের দিকে। বূবূ কেমন রূপকথার দেশে পৌঁছে যায়, নিজের মাথায় কল্পনার শিরস্থান,কোমরে কাল্পনিক তলোয়ার খাপ থেকে টেনে বার করে - ঘন জঙ্গলে সওয়ারি রাজা রিচার্ড দ্য থার্ড, সঙ্গে ভাঁড় ওয়াম্বা। উত্তেজনার বশে ওয়াম্বা নাগাড়ে রাজাকে বিরক্ত করে চলেছে। সে বলে ‘যদি একজন দস্যু এসে হাজির হয়,কি হবে?’রাজা রিচার্ড জানায় ‘দস্যুর পরিণতি মৃত্যু।’ আশঙ্কা কাটে না ওয়াম্বার, সে বলে, 'যদি দশজন আসে?' রাজা জানান তাদেরও একই পরিণতি,মৃত্যু। ওয়াম্বার পরাণে হৃত বিশ্বাস ফিরে এসেছে, তাহলে বেঘোরে মরতে হচ্ছে না। বুবু এই রকম রং বদলাতে ভালোবাসে,এখন সে রিচার্ড দ্য থার্ডের ভূমিকায়। মুখে প্রসন্ন হাঁসি, ভাবনায় রাজকীয় গরিমা। বড় মামা বলে, 'এই দেখ, শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়,ঘোড়ায় চড়ে কে বলতো?' বুবু বলে, ' সুভাষচন্দ্র।' হঠাৎই ঘন জঙ্গল, রাজার বেশ উধাও হয়ে গিয়ে মন জুড়ে সুভাষচন্দ্র হাজির হয়। টুংটাং শব্দে ট্রাম ছুটেছে, সেদিনের কলকাতায় আজকের যানজট কল্পনা করা যেত না।ঘোড়ার খুরের খটাখট শব্দে কলেজ স্ট্রিটের পথ ধরে ওরা। মামা বলে,' জানিস বুবু, ট্রাম একদিন ঘোড়ায় টানতো। যে রাস্তা দিয়ে আমরা প্রথমে এলাম তার নাম বিটি রোড। সুতানুটি গ্রামে বড়ো সড়ক ছিল না, গঙ্গার ধার বরাবর এই রাস্তা, ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল অবধি চলে গেছে। যেখান থেকে শ্যামনগর, জগদ্দল হয়ে উত্তরবঙ্গে যাওয়া যায়।’বুবু বলে, 'বড় মামা জানো,আমরা নৈহাটির উল্টোদিকে থাকি।' মামা বলে, ' তোর দেখছি মানচিত্রের হিসেব টনটনে।’ বুবু হেঁসে প্রশংসা এড়িয়ে যায়।ঘোড়ার নিপুন ছন্দে লাফিয়ে চলা পায়ের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকে যেন মামার কথা শুনতে পায়নি সে। হঠাৎই ঘোড়া গতি বাড়িয়ে দেয়,এমন গতিশক্তি আশ্চর্য করে বুবুকে। মামাকে সে জিজ্ঞেস করে,'ক্ষমতার একক হর্স পাওয়ার কেন, নাগাড়ে এত ছুটতে পারে বলে?' বড়মামা একটু ঘাবড়ে গিয়ে, আতিপাতি করে খুঁজতে থাকে নিজস্ব জ্ঞানভান্ডারে রাখা, ভাগ্নের প্রশ্নর উত্তর।ক্ষণিকপর বলে, 'হাঁ, তাইতো, জেমস ওয়াট সাহেব নিজের তৈরি ইঞ্জিনকে, বাজারজাত করতে গিয়ে বলেন - এই ইঞ্জিন,পাঁচটি ঘোড়ার শক্তির সমান।' সেই থেকেই অশ্ব ক্ষমতা শব্দের ব্যবহার বিজ্ঞানে।ওদিকে অশ্ব ততক্ষনে নিজস্ব ক্ষমতায় ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি পেরিয়ে বইপাড়ায়। অবাক বুবু ঘোড়ার পিঠে চড়ে পথের পাশে পড়ে থাকা ইতিহাসের নুড়িপাথর সংগ্রহ করে চলেছে। আজকের প্রেসিডেন্সির অতীত পরিচয় ছিল হিন্দু কলেজে যার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন রামমোহন। বুবু বাপের কাছে শেখা বুলি আউড়ে যায়, উনিতো ব্রিটিশদের দালাল ছিলেন। বড় মামা হেঁসে বলে, ‘ সমাজ যখন আকণ্ঠ ডুবে আছে ধর্মীয় কদাচারে, তখন ঈশ্বর নেই এই বাণী কে বিশ্বাস করবে? ধর্মশাস্ত্র দিয়েই কাটতে হবে কুয়াচার। নিতে হবে আইনি ব্যবস্থা,আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে সেই সময়কে ব্যাখ্যা করতে গেলে ভুল হবে। পৌঁছতে হবে সতীদাহ বাল্যবিবাহর যুগে যখন গোটা সমাজ ব্রাহ্মণ্যবাদের কবলে ডুবে আছে অন্ধকারের করাল গ্রাসে। বুবু চুপ মেরে যায়। মদন কাকুরা বলতো - পরাধীন দেশের প্রথম কাজ ছিল লড়াই করে ব্রিটিশ কে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া, তা না করে তথাকথিত মনীষীরা গা বাঁচিয়ে চলে গেছেন, এরা প্রকৃত মনীষী নন। বড়মামার কথায় বুবু বুঝতে পারছিল, রামমোহন, বিদ্যাসাগরকে লড়তে হয়েছিল, নিজের সঙ্গে এবং একই সঙ্গে কুসংস্কারে আক্রান্ত সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের কবলে থাকা ধর্মর বিরুদ্ধে। যদিও ব্রাহ্মণ্যবাদ কথাটির মাথামুণ্ডু বুবু কিছু বুঝতে পারেনি। সে শুধু বুঝেছিল সমাজের মূল শত্রু ছিল অশিক্ষা, যাকে সমূলে বিনাশ করতে না পারলে ভুগবে গোটা দেশ। বড় মামার ভাবনার পথ ধরে অর্কের মনের ঘোড়া ছুটতে থাকে নতুন দিশায়। ঘোড়া আপন ছন্দে মেডিকেল কলেজ ছাড়িয়ে ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি। অঞ্চল পরিচিতি জানার পর বুবু গেয়ে ওঠে 'আমি যামিনী তুমি শশী হে।' বড়মামা বলে, 'জানিস, এত সুন্দর আধুনিক সুরে বাঁধা গানটি, কবিয়ালের মুখে একেবারে বেমানান, কালের হিসেবে, ভাষায়। কবিয়াল ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক,তার সমাজ-ভাবনা ছুটতো তার গানের পিঠে চড়ে। তিনি ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত,ঈশ্বরবিশ্বাসী,বাংলাদেশের প্রেমে পড়া একজন বিদেশি। তার বিশ্বাস বিশেষ কোনো ধর্মের নিগড়ে ঈশ্বরকে বাঁধা যায় না।’ বুবু বলে, 'বড়মামা কেমন ছিল সে গান, একটু গেয়ে শোনাও না।'বড় মামা সুখেন্দু, উদাত্ত গলায় গান গাইতে পারতো। রাস্তায় ট্রাম, বাস চলেছে শুনতে পাওয়া যাবে না তাই ঘোড়ার চলার ছন্দ ব্যবহার করে দুলকি ঢিমা চালে দৃপ্ত কন্ঠে গেয়ে ওঠে সুখেন্দু, 'খ্রিষ্টে আর কৃষ্টে কোন তফাৎ নাই রে ভাই/শুধু নামের ফেরে মানুষ ফেরে/কেউ কথা শোনে না।'বড় মামার কাছ থেকে বুবু জানতে পারে, এন্টনি ফিরিঙ্গি জাতে পর্তুগিজ, বাবা ব্যবসা সামলাতে ছেলেকে এ দেশে পাঠিয়েছে। বুবু বুঝতে পারে না একজন পর্তুগিজ, ব্যবসা করতে এ দেশে আসা মানুষ, কিভাবে বাংলার মাটি, সংস্কৃতি ,গান ভালবাসতে পারে! সুরের কোন বৃত্ত নেই,যে কেউ তার রস নিতে পারবে, কিন্তু বাংলা গান গাওয়া, সর্বোপরি বাংলা ভাষায় গান লেখা ! বড়মামা দেখে বুবু বেশ কিছুক্ষণ চুপ মেরে গেছে, বুবুর ভেতরে চলা ভাবনাকে স্পেস দিতে সুখেন্দু চুপ মেরে যায়। কিন্তু সময় ঘোড়া থেমে থাকে না,সে তার নিজস্ব ছন্দে ছুটে চলেছে। এসে যায় হিন্দ সিনেমা,বাঁদিকে অক্রুর দত্ত লেন চলে গেছে। সুখেন্দু বাধ্য হয় বুবুর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। সে বলে, এই দেখ এইখানে আর এক অবাঙালি সঙ্গীতকারের ষ্টুডিও।জাতে পার্সি হলেও অন্তরাত্মায় তার ঘোর বাঙালিয়ানা।পন্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের আমন্ত্রণে, নিজের দেশ ছেড়ে এসেছিলেন,আর ফিরে যাননি। বুবু পাগলের মত খুঁজতে থাকে মনে মনে সেই ব্যক্তিত্বর নাম, যাকে সে চেনে না। সুখেন্দু জিজ্ঞেস করলে সে বলে ,'বড় মামা উনি কি সায়গল?' হেঁসে সুখেন্দু জানায়,'না, ওনার নাম ভি বালসারা।' পুজো প্যান্ডেলে, বুবু এক অদ্ভুত ধরনের বাজনা শুনেছে,যন্ত্র ও যন্ত্রীর নাম তার অজানা। মিঠে হিন্দি সুর এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত খুবই ভালো শোনাতো এই যন্ত্রে।বড়মামা,'বলেন উনি ইউনিভক্স যন্ত্রের সৃষ্টিকর্তা,যে যন্ত্রে হেমন্ত মুখার্জির গানে ওঁর বাজনা, অদ্ভুত সুরমাধুর্যের নিদর্শন। হেমন্ত মুখার্জীর অমর সুর - কঁহি দ্বীপ জ্বলে কঁহি দিল, এই গানে ওনার ইউনিভক্স শুনলে আজও মন ভরে যায়।' বুবু একটু গুনগুন করে শোনায় বড় মামাকে। বড়মামা বলে,' ওস্তাদ ভাগ্নে আমার।' তখন লেনিন সরণি, একমুখী রাস্তা ছিল না, ঘোড়া ডাইনে মোড় নেয়,বাঁদিকে জ্যোতি সিনেমা ফেলে এগিয়ে যায় ওরা।বুবু চোখ দিয়ে চেটেপুটে খাচ্ছে সবকিছু।বুবু এ আই টি ইউ সির অফিস দেখে, সুখেন্দুর কাছে জানতে চায় এর অর্থ। উত্তর আসে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সর্বভারতীয় অফিস এটি।পাল্টা প্রশ্ন ফিরে আসে।'ভারতবর্ষে রেল আন্দোলন কি এদের নেতৃত্বে ?' বড় মামা বলে,'সমর্থন আছে,কিন্তু রেল ইউনিয়নের সর্বভারতীয় আলাদা অস্তিত্ব আছে।'
সেদিনের ধর্মতলা বড়ই অমলিন,সুন্দর।ধুলো, ধোঁয়া, গাড়ির আজকের যন্ত্রণা ভাবাই যেত না। রাস্তা নাক বরাবর রাজভবনে গিয়ে ঠেকেছে ,বাঁয়ে মনুমেন্ট। প্রশ্ন আসবে জেনে আগেভাগে উত্তর নিয়ে প্রস্তুত সুখেন্দু। সে বলতে থাকে ‘ঐ যে সোজা রাজভবন, পলাশীর যুদ্ধে জেতার পর তৈরি হয়েছিল, আর এই রাস্তা তার পরেপরে তৈরী। নেটিভ দের অনুমতি ছিল না এই রাস্তায় পা দেওয়ার। ঘোড়া শহীদ মিনার পৌঁছায়।বুবু জিজ্ঞেস করে ‘বাবার কাছে শুনেছি অক্টারলোনি সাহেবের সম্মানে এই মিনার,কোন যুদ্ধের বার্তা বহন করে মনুমেন্ট?’ বড় মামা কিঞ্চিত দ্বিধান্বিত হয়ে বলে, ‘সম্ভবত নেপালের সঙ্গে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অক্টারলোনি সাহেব, সেই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তবে আজে এর অসীম গুরুত্ব। সরকার বিরোধী যেকোনো জটলা, আন্দোলন সবই এখানে ভাষা পায়।ঠাসা হয় মানুষের মনে, নতুন উদ্যমে বিদ্রোহী হওয়ার বারুদ।’ চটজলদি ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে, বুবু মামাকে বলে, ‘আমি একটু এদিক সেদিক ঘুরে আসি, তুমি এখানেই আছো তো?’ বড় মামা ততক্ষণ আরো অনেক ঘোড়সওয়ারদের সঙ্গে আড্ডায় মশগুল। চেঁচিয়ে সুখেন্দু বলে, 'বড় রাস্তায় যাবিনা, ময়দানে থাকবি।'কি যে খুশি হয় বুবু, চারিদিকে রঙের মেলা। কোথাও বিক্রি হচ্ছে বুড়ির মাথার পাকা চুল।কোথাও সাবান জলের বুদবুদ, হাওয়া কেটে অনন্ত আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। বয়স বাড়লেও বুবুর শিশু মনটা সজীব,মনে হয় যদি ওর জীবনধারা অমন বাঁধনহীন হত।এক একটা বুদবুদ বড় হতেহতে হঠাৎ করে ফেটে যাচ্ছে,খুব আফসোস হচ্ছে বুবুর। হঠাৎ করে বুবুর,ফুটবল মাঠে হতাশ মদন কাকুর কান্না মনে পড়ে। বুঝতে পারেনা স্বপ্নগুলো কেন এমন মিলিয়ে যায়। কেন ছোট ছোট বুদবুদগুলো মিলে একটা বড় গোল পৃথিবী তৈরি করছে না। যদি হালকা করে ,নলকাঠিতে হাওয়া দেওয়া যায়, তাহলে কি একটা বড় বুদবুদ তৈরি হতে পারে? ছুটে যায় মামার কাছে বলে আমাকে একটা সাবান বুদবুদ কিনে দেবে? মামা বলে,' আশ্চর্য, তোর এত বয়স হয়ে গেল, এখনো কচি বাচ্চার মতো সাবান বুদবুদ খেলবি?' পাশের থেকে একজন উঠে বলে,'ভাঞ্জা ,ঘাবড়াও মাত, হামভি তুমহারা মামা লাগতা হে।' দূরে ডমরুর শব্দ শুনে বুবু তাকায়, ভাল্লুক আর বাঁদরের নাচ দেখা যাচ্ছে। বুদবুদের কথা ভুলে, ছুটতে থাকে বুবু সেদিক পানে। কি যে অনাবিল আনন্দ। মাঠে সার্কাস দেখাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে একদল,ঢোল সহযোগে গান হচ্ছে। একটু ঘাস দেখে বুবু মাটিতে বসে পড়ে,বাঁশ খাটানো হয়ে গেছে দড়ি বাঁধা সম্পূর্ণ। এক লাফ দিয়ে একটি খুদে মেয়ে,দড়ির উপর উঠে বসে পড়েছে। ওর মাথায় সাজানো ঘটের সারি। ব্যালেন্সের খেলা দেখাতে দড়ির উপর দাঁড়িয়ে পড়েছে মেয়েটি।মসৃণ চলার শুরু,দুই হাত দুদিকে রেখে ভারসাম্য রক্ষা করছে সে।ঠিক মাঝামাঝি আসতেই, শহীদ মিনারের চূড়ার সাথে এক লাইনে এসে গেছে ওর মাথায় সাজানো ঘটের চূড়া। হঠাৎ করে বুবুর কেন জানিনা মনে হল,শহীদ মিনার আর খুদে মেয়েটির উচ্চতা সমান সমান। জড়ো হওয়া মানুষের হাততালিতে ওর চিন্তা স্রোত বিঘ্নিত হয়। একটা ধাতু নির্মিত চাকার নিচ থেকে ছুঁড়ে দেয় ওর মা।কি অদ্ভুত মুন্সিয়ানায় দড়ির উপর দিয়ে চাকাটি গড়াতে শুরু করে।বুবুর বড়ো রাস্তায় চাকা চালানোর অভ্যাস করেছে কিন্তু দড়ির ওপর! মেয়েটি জিমন্যাস্টিক করে নিচে নেমে এসেছে ততক্ষণে, ফোকটে বেশকিছু মানুষ সার্কাস দেখে হাঁটা দিয়েছে । মেয়েটির বুবুর সামনে এসে হাত পেতে দাঁড়ায়। বুবু বলে, 'আমায় এমন সার্কাস শেখাবে?' বাঁশ খোঁটার সামনে বসে থাকা মহিলা উঠে এসে বলে, 'ব্যেটা তুমলোগ বড়া আদমি হো,ইসব তুমহারা বস কা বাত নেহি হে।'কিন্তু বুবুর কাছে যে পয়সা নেই। বুবু মেয়েটিকে বলে, 'আমার সঙ্গে চলো পয়সা দেব।' বুবু সঙ্গে যেতে গেলে মেয়েটির অনেক পয়সা হাতছাড়া হয়ে যাবে তাই মেয়েটি যেতে রাজি হয় না। বুবু চটজলদি বড়মামার কাছ থেকে টাকা চেয়ে আনে। দলে থাকা পুরুষটি বিস্মিত হয়ে স্বগতোক্তি করে - একদম বুরবক ল্যাড়কা। মহিলাটি গালাগালি দিয়ে বলে,'তেরা জায়সা কই নেহি, আপনা ল্যেড়কি, আওরাত ক্যা উপর জি তে হো।’ তারপর দু পা এগিয়ে এসে বুবুর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মহিলা। অদ্ভুত ভালোলাগায় ভেসে যায় বুবু। আজকের দিনটা বড়ই নতুন ওর কাছে।
বড়মামার কাছে ফিরে এসে দেখে সেই লোকটা ঘোড়া থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে যে বলেছিল, 'সুখেন্দু সাব, আইয়ে,আপ প্রফেসর আদমি, ব্যাচেলার ভি হো আপকা সাথ এ কোন।' সুখেন্দুর কাছে জানতে পেরেছিল সবাই, বুবু ওর ভাগ্নে। ওরা এখন ছাতুর লৃট্টি খাচ্ছে, খাতির করে ভান্জাকে লৃট্টি খাওয়ার বিহারি মামার দল। লোটা থেকে জল দিয়ে মুখ ধুয়ে, ঢকঢক করে পান করে বড়মামা। ওদিকে সাঙ্গাতেরা খৈনী পাকানোয় ব্যাস্ত।বড়মামা একবার ঘড়ি দেখে, এক উর্দিপরা মাউন্ট পুলিশ বড় মামাকে এগিয়ে দেয় নেশার যোগান।বুবু অবাক হয়ে দেখে প্রফেসর মামা,নিশ্চিন্তে খৈনী চালান করে দিয়েছে যথাস্থানে।সুখেন্দু বলে, 'এবার উঠতে হবে আমাকে। না বলে, ভাগ্নাকে নিয়ে চলে এসেছি। ওর মা খুব চিন্তা করবে।' বুবু আবার ময়দানে আসার নিমন্ত্রণ পায়।ও এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে বড় মামার অশ্বচালনা শেখার রহস্য।বড়মামা বলে,'ফেরার সময় ট্রামে যাব।' ট্রামে উঠে বুবু বলে, ' দেখো আসার সময়ে ঘোড়া, ফেরার সময় ট্রাম, নাইবা চড়লাম ঘোড়ায় টানা ট্রামে।'হেঁসে বড়মামা বলে, 'ওদিকে বাড়িতে পিট্টি অপেক্ষা করছে।'যতটুকু জানা যায়, ততটুকুই সত্যি মানুষের জীবনে। নতুন সত্যি নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। অর্ক বড় মামাকে আগেও দেখেছে, কিন্তু এমনভাবে নয়। তার কাছে সুখেন্দু একজন ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে ছিল এতদিন। আজ ওর রোমান্টিকতা, অদ্ভুতুড়ে জীবনযাত্রা, আবার একই সাথে বিচিত্র মানুষের সঙ্গে মেশার ক্ষমতায় আকৃষ্ট হয় অর্ক। যা গ্রাস করে ওর অস্তিত্বকে। এমনকি সুখেন্দুর ব্যাচেলর জীবনের শৌর্যবীর্যও আজ অর্কর মনে কুয়াশার, মায়াবী আস্তরণ।
খুব তাড়াতাড়ি বুবু অর্ক হয়ে যায়। শম্বুক গতি, ইতিহাসের বরাবরের অভ্যাস। হঠাত স্থবিরতা ঝেড়ে ফেলে সময় যেন ছুটতে শুরু করেছিল। সময়ই সৃষ্টিকর্তা, শিল্প,দর্শন প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন নতুন মানুষ জন্ম নিচ্ছিল বাংলার বুকে। ওপার বাংলার ভাষা আন্দোলন তখন জয়ের পথ হেঁটে দেখিয়ে দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ ভাষা শহীদ, এপারে বিপ্লবী প্রেরণা। স্বপ্নের গুলবাগিচায়, গন্ধে মাতোয়ারা সদ্য প্রেমে পড়া নুরজাহান যেমন শ্বাস ভরে প্রেমরূপ সৌরভ শরীরে মেখে নেয়। অর্ক তেমন সময়ের চলার বাঁকে বাঁকে হাজির থেকে জীবনকে উপলব্ধি করতে থাকে। ঘাড়ের উপর দিয়ে ছুটে চলে কালের রথ।
বুবুদের বাড়িতে প্রত্যহ সকাল আসতো জিইসি রেডিওর ঘুম-ভাঙানিয়া গানে। কৃষ্ণ সকালবেলা ন্ব ঘুরিয়ে রেডিও চালিয়ে হাত ঘড়ি মেলাতো। তারপর শর্টওয়েভ মিডিয়াম বিবিধ ভারতীতে গানের ভেলায় ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলা। গান ভালোবেসে গানের খেয়ায় এভাবেই কাগজের নৌকা বেয়ে বুবু কৈশোরে মেতে গিয়েছিল। বেশ কিছুদিন হল বিরক্ত বুবুর হুতাশের নিশানা অল ইন্ডিয়া রেডিও। সুযোগ পেলেই বুবু বিবিধ ভারতী চালিয়ে খুঁজে চলেতো পছন্দের সব গান, বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে। নব ঘুরতো অথচ ওর পছন্দের শিল্পীর গান কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। অথচ বুবুর গানের প্রতি ভালোবাসার কারণ হলো সেই শিল্পী যিনি কখনো ভোরের সাবলীলতায় আলো ফোটান। কখনো বেদনা মলিন বিষন্নতায় অনাবিল। না, হৃদয় গাইছে না, "গাতা রহে মেরা দিল।" "মম চিত্তে নিতি নিত্যে"র ছন্দে কেউ নৃত্যরত নয় কারন বাজছে না সেই গান "ম্যায় হি ঝুমরু।" এ দিল বেচারা বনগিয়া স্যাচমুচ! বুবু ভেবে পায়না কাকে জিজ্ঞেস করে এর উত্তর পাওয়া যাবে। এই প্রশ্নের উত্তরে জানতে চাইলে লোকে ওকে পাগল বলবে। রেডিও স্টেশন তার খুশিমতো গান বাজাবে। ওর অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কৃষ্ণ এখন দেরী করে অফিস থেকে ফেরে। বুবু যখন মাঠে খেলতে যায় ওর সঙ্গে দেখা হয় না তার। বুবুও এখন একটু আগেই মাঠে চলে যায় কারন দুপুর আড়াইটে সাড়ে তিনটের বিবিধ ভারতির গান শোনা বন্ধ, পছন্দের শিল্পী নাই। আজ সকাল থেকেই অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। জলকাদায় হকি বল আটকে যাচ্ছে ছেলেরা রণে ক্ষান্ত দিয়ে জলকাদা মেখে আড্ডা মারছে। দূরে রাস্তায় কৃষ্ণকে দেখা যাচ্ছে হাত-পা ছুঁড়ে অফিস ফেরতা নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আসছে। মুন্না বলে,'দেখ বুবু, তেরা পিতাজি পাগলা গিয়া।' ঝম ঝম বৃষ্টির মধ্যে কৃষ্ণর আচরণে বাকিরা বুঝতে পারছে চাচা বহত গুস্যেমে হ্যায়। বাবা বাড়ি ঢোকার পরপরই ছেলে গুটি গুটি পায় ঘরে ঢোকে। অঞ্জলী আশ্চর্য হয়ে যায় বুবুর জলদি প্রত্যাবর্তনে। কৃষ্ণ ভিজে জামা কাপড় সমেত বাথরুমে ঢুকে গেছে। বুবু অঞ্জলীকে জিজ্ঞেস করে ঘটনাপ্রবাহ জানতে পারে। তার বাবা, " চিত্ত যেথা ভয় শূণ্য উচ্চ যেথা শির", আবৃত্তি করতে করতে ঘরে ঢুকেছে। বাথরুমে কল এর আওয়াজ ছাপিয়ে আবার উচ্চারিত হতে থাকে, " নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ ভারতেরে সেই স্বর্গে কর জাগরিত।"
একজন স্নান সেরে দরজা খুলে বের হবে আর একজন কাদা মাখামাখি হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে। মুখোমুখি দুজন, বুবুর চোখের জিজ্ঞাসা পড়তে পারে কৃষ্ণ। অন্জলী চিল চিৎকার করতে থাকে। সে জানে বাপ ব্যাটায় এবার বকম বকম শুরু হবে। কৃষ্ণর কথায় বুবু জানতে পারে,এমারজেন্সিতে অফিস টাইম বেড়ে গেছে। সংবাদপত্রের অধিকার খন্ডিত। " চিত্ত যেথা ভয় শূণ্য", পড়লে পুলিশ ধরবে। বুবু জিজ্ঞেস করে, 'আর কিশোর কুমার?' কৃষ্ণ বলে, 'হ্যাঁ, ওঁর গানও বন্ধ। আবার ভারতবাসী এক মহাকালের কৃষ্ণগহ্বরে নিমজ্জিত।'
ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল এমার্জেন্সি। কোর্টকে প্রভাবিত করে ইন্দিরা গান্ধী, চাণক্য সিদ্ধার্থশঙ্করের বুদ্ধিতে গনতন্ত্রকে কচুকাটা করে জরুরি অবস্থা জারি করে সারা ভারতবর্ষে। স্তব্ধ হয়ে যায় দেশের স্বাভাবিক অবস্থা।
দশ
রেলকম ঝমাঝম
রথিন দেখে স্টেশনে ট্রেন ঢুকছে অথচ অর্কদা নির্দিষ্ট কামরায় না উঠে অন্য কামরার দিকে হাঁটা লাগিয়েছে। অর্কদাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, শঙ্কর,ভেন্ডার এর দিকে। রথিন ডাকে ‘অর্ক দা ও অর্কদা।’ রথিন কে হাত দেখিয়ে অর্ক ভেন্ডারে ওঠে। রথিন নিজ কামরায় উঠে গিয়ে বন্ধুদের বলে ‘দেখ আজ তাসের টানে ফেঁসেছে অর্কদা।’নিশীথ মানতে না পেরে বলেন ‘না, নিশ্চয়ই কোনো ব্যাপার আছে।’ ২১০ ডাউন মেন বর্ধমান লোকালের নিত্য যাত্রী এরা। আসা-যাওয়ার অভ্যাসে, এরা একে অপরের বন্ধু, ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্যের প্রয়োজনে একে। দলবদ্ধভাবে অফিস যাত্রার নিত্যদিনের কষ্টকে এরা অনায়াস সাধনে ভালোবেসে লাঘব করে ফেলেছে। বৈদ্যবাটি স্টেশনে ফিরে আসে অর্ক নিজের কামরায়, নিজের মানে যে কামরায় ওদের রোজের চলা। আলাদা কম্পার্টমেন্ট মানে আলাদা ভাবনা, আলাদা চলা, আবার একই ট্রেনে সওয়ার হওয়ায় একসাথে চলা। আজ যেমন শংকর ভান্ডারী অর্ক কে ডেকে নিয়ে গেল। নিশীথদা ওর কাছে জানতে চায় ‘কেন শংকর তোমাকে ডেকে নিয়ে গেছিল?’অর্ক জানায় ‘ বৈঁচির সুশীল,ছেলের চিকিতসার কারণে ঘটিবাটি, সামান্য অধিকারে থাকা জমিজমা বিক্রি করে চেন্নাই যাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ছেলের জ্বর কমছে না প্রায় দুমাস হল।’ রথিন, অর্ক কী ভাবছে, কেমন করে গরিব মানুষ সুশীল কে সাহায্য করবে জানতে চায়। অর্ক জানায় ‘এখনো সে কিছু ভেবে উঠতে পারেনি। তবে এখানে এই চিকিতসা করা সম্ভব এই কথা জানিয়ে আমি সুশীলকে চেন্নাই যাওয়া থেকে বিরত করেছি। কাল যদি আপনারা আমার সাথে বি.সি.রায় হাসপাতালে যেতে পারেন সুবিধে হয়। ভেন্ডার এর কয়েকজনকে কে বলে দেখতে হবে, একটা দল হিসাবে গেলে ডাক্তার কথা বলতে বাধ্য হবে, বাচ্চাটির সঠিক শারীরিক অবস্থান জানা যাবে।’ সবাই জোটবদ্ধতাকে ভয় করে।’ নিশিথদা,রথিন রাজি হয়ে যায় অমর অন্য কাজের ছুতো দেখিয়ে এড়িয়ে যায়। হাওড়া স্টেশনে নেমে রথিন ছুটে গিয়ে শংকর,সুশীল আরো কয়েকজনকে ধরে আনে। ঠিক হয় সুশীল ছাড়াও আরো জনা ছয়েক ডেলি প্যাসেঞ্জার বারোটা নাগাদ হাসপাতালে পৌঁছাবে। অর্ক, সত্যবাদী যুধিষ্ঠির এমন কথা বলা যায়না, বৃহত্তর প্রয়োজনে সে অনায়াসে মিথ্যা কথা বলতে পারে। বন্ধুর প্রেস থেকে রাতারাতি ‘নাগরিক বন্ধু’ সংগঠনের একটি কার্ড বানিয়ে ফেলে সে। সুপারের সঙ্গে দেখা করতে হবে। হাসপাতালে এত জন মিলে ঢোকার উপায় নেই, সেটা সবার জানা। অর্ক বলে ‘সিকিউরিটি কে উপেক্ষা করতে হবে। আমি সামনে থাকবো পেছনে পেছনে আপনারা যাবেন কোন দিকে তাকাবেন না, শুধু আমাকে অনুসরণ করবেন।’ ওর কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা-ব্যাগ যা এই শহরে আঁতেল বুদ্ধিজীবীর পরিচয় বহন করে। আর বুদ্ধিজীবী মানে কেউকেটা। সামলাতে পারল না সিকিউরিটি, ‘স্যার, স্যার’ করে অর্কদের পেছনে দৌড়াতে থাকলো। অর্ক কয়েকবার ঘাড় ঘুরিয়ে কঠিন দৃষ্টিতে তাকাল শুধু। সিকিওরিটি ভরসা পেলনা প্রতিবাদ করতে। শেষমেষ মিথ্যা পরিচয়ের বানানো সাক্ষ্য,আই কার্ড, সিকিউরিটির হাতে দিয়ে জানালো, ‘আমরা সুপারের সাথে দেখা করব।’ সিকিউরিটি জানায় ‘সুপার ডাক্তারদের সঙ্গে মিটিংয়ে ব্যস্ত এখন আমি কিছু করতে পারবে না, একটু অপেক্ষা করতে হবে।’ আবারও একবার দৃষ্টিবানে বিদ্ধ হয়ে ঘাবড়ে গিয়ে,সিকিউরিটি তড়িঘড়ি ঢুকে গেল চেম্বারে। হাসপাতাল সুপারকে নাগরিক বন্ধু কার্ডটি দিয়ে দিল। সুপার সাহেব কার্ডটি উল্টে-পাল্টে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন এবং চালু মিটিং বানচাল করে দিয়ে ওদের ডাকলেন। আসলে অর্ক বেশ কয়েক বছর সরকারি চাকরি করার অভিজ্ঞতায় বুঝে নিয়েছে সরকারি মিটিং আদতে অশ্বডিম্ব প্রসব করে,তাই ওর এমন বেপরোয়া ভাব। সুপার কয়েকজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানালেন ‘এই হাসপাতালে চব্বিশ জন শিশুবিদ আছেন যারা স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, ভুভারতে যে কোনও হাসপাতালে, যা দৃষ্টান্ত স্বরূপ। আপনারা একদম চিন্তা করবেন না। যা দরকার আমাকে সরাসরি ফোন করে জানাবেন।’ দায়িত্বে থাকা চিকিতসকদের সাথে কথা বলে সবাই এমনকি সুশীলও সন্তুষ্ট হল। অর্ক ডাক্তারবাবুদের সাথে করমর্দন করে বেরিয়ে সিকিউরিটির কাছে গেল। রথিন একটু অবাক হল। অর্কদা বলছে ‘আমাকে ক্ষমা করে দেবেন, আপনার সাথে খুব খারাপ ব্যবহা্র করেছি, বাধ্যতা ছিল।’ সিকিউরিটি উত্তর করে ‘কি যে বলেন স্যার ,আমাদের কেউ মানুষ বলেই মনে করেন না। আপনি তো তবু এসে বললেন।’
গান-গল্প, চুটকি, খিস্তিতে জমজমাট থাকে রেল কামরা যেন চলমান জীবন। একসঙ্গে খেলার মাঠ, নাটক-সিনেমা, রাজনীতি কি নেই? নিত্য-নতুন ঘটনা তো আছেই। আজ যেমন, ভদ্রেশ্বর স্টেশনে এক কিশোর ভিক্ষে করতে উঠলো কামরায়। সংস্কৃতিমান অমরবাবু সর্বসমক্ষে বলে উঠলেন ‘যত্তসব, এদের কাজ দাও করবেনা, ভিক্ষাবৃত্তি করতে এদের খুব ভালো লাগে।’ কেউ কোনো কথা বলল না, অমর বাবু মৌনসম্মতি পেয়ে গিয়ে বললেন ‘আমার বাড়িতে কাজ করবি?’ কিশোরটি দৃপ্ত ভঙ্গিমায় বলল ‘হ্যাঁ।’ বাঙালি বাবুর তো চিত্তি চড়কগাছ। বুঝতে পেরে ছেলেটি বলল ‘আপনাদের কত দম আমি জানি,এবার বলবেন তো, চিনিনা জানিনা এমন উটকো ছেলেকে ঘরে নিয়ে যাব কি করে?’ ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে বন্ধু রমেন মুহূর্তে ছেলেটির প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেয়, বেরিয়ে আসে এলোমেলো অবস্থায় বেশকিছু খুচরো নোটের তোড়া। তারিয়ে তারিয়ে উল্টে পাল্টে দেখতে থাকে রমেন, মোট শতিন চারেক হবে। টাকার এলোমেলো বান্ডিলটা রমেনের কাছ থেকে অমর হস্তগত করে ছেলেটির উদ্দেশ্যে বলে ‘চুরি করেছিস আবার বড়োবড়ো কথা বলছিস?’ ছেলেটা তার অর্জিত ধন, কাকুতি মিনতি করে ফেরত পেতে চায়। অমর ছেলেটির নাগালের বাইরে নাচাতে থাকে টাকার তোড়া, সবাই হাঁসিতে ফেটে পড়ে। টাকা ফিরে পেতে ব্যর্থ হয়ে,অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে ছেলেটা। চড় চাপড় চললে ছেলেটা আপ্রাণ নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করে। কান্না রুদ্ধ গলায় আবারও বলতে থাকে, ‘টাকাটা দাও আমার ভিক্ষার টাকা, অনেক দিন ধরে জমানো, দাওনা।’ অমর কিছু বলতে যায়,রথিন অর্ক কে এগিয়ে আসতে দেখে অমর কে থামিয়ে দেয়। অর্ক কঠিন এবং স্পষ্ট উচ্চারনে বলে ‘অমর দা টাকাটা ফেরত দিন। ওর পকেটে কি করে টাকা এলো খোঁজ করছেন, কেউ যদি আপনার বাড়িতে কি আছে, কেন আছে জানতে চায়, আপনি তাকে মান্যতা দেবেন? ও সত্যি কথাটা মুখের উপর বলে দেওয়ায, আপনাদের সবার মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্টে লেগেছে বুঝতে পারছি। এমন কথা বলেন কেন যা রাখার মুরোদ নেই। এই বয়সের কিশোর যে আপনার আমার ঘরে জন্মালে লেখাপড়া করতো, সে কেমন আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থানে থাকা মানুষজনকে চিনে ফেলেছে দেখলেনতো। কত সহজে বলে দিল আপনার মুখের উত্তর,কোনো ভুল হয়নি ওর আন্দাজে।’ এতই চেঁচিয়ে কথাগুলো অর্ক বলছিল সবাই চুপ মেরে গেছিল। সম্মোহিত অমর বাবুর হাত টাকা সমেত পৌঁছে যায় ছেলেটির কাছে। টাকার তোড়া ফেরত নিয়ে,ছেলেটি অদ্ভুত এক করুণ দৃষ্টি দিয়ে তাকায় অর্কর দিকে। অর্ক তখন চকিতে ভাবের ঘোর কাটিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে। রিষড়া স্টেশনে ছেলেটি নেমে যায়। থম মেরে গেছে ট্রেন কামরা, অর্ক হারিয়ে গেছে নিজের মধ্যে, কেন এমন হয়! রথীন, নিশীথদা এরা তো ভালো মানুষ। যদি ছেলেটার একটা বড় দল থাকতো তাহলে কি এরা এমন করতে সাহস পেতো? বড় জোট একক মানুষের চরিত্র কে গ্রাস করে ফেলে। না হলে রথীন নিশীথ দা কোনমতেই অমর বাবুকে সমর্থন করত না। নিজের জীবনে এরা অত্যন্ত সৎ এবং পরোপকারী একই সঙ্গে জোটের আধিপত্য কায়েমে মনোযোগী। জোটের বিকাশ মানে একক মানুষের মৃত্যু। তার অনুভুতি ভাবনা কিছুতেই ঠাঁই পাবে না জোটের তত্ত্বে। আবার জোট মানে কখনো ব্যক্তি মানুষের ইচ্ছা এখানে যেমন। অমর বাবুর একটা ভুল কে সামাল দিতে গেলো সম্পূর্ণ রেল কামরা। গোষ্ঠী চেতনা পরোক্ষে সজাগ,ক্রিয়াশীল। আবার এও সত্যি জীবনে জোট বাঁধতেই হয় একক মানুষের শক্তি কি? অর্কর চিন্তাস্রোত জুড়ে সদ্য চষে ফেলা মাটির বুকে কেঁচোর কিলবিল। খেয়াল করতে পারে না সে কখন হাওড়া স্টেশন এসে গেছে, ট্রেন কামরায় শুধু নিশীথদা আর রথিন। অভিজ্ঞ নিশীথও হৃদপুকুরে ডুব দিয়েছিল। অনুজ প্রতিম অর্ককে সে শুধু ভালোবাসে না শ্রদ্ধা করে। আজকের ঘটনায় অর্কর সদর্থক ভূমিকা নিয়ে নিশীথের কোন দ্বিধা নেই। কিন্তু অর্কর কোমল মানবিক হৃদয় কোথাও নিজের অর্থনৈতিক অবস্থানে থাকা মানুষ জনের প্রতি ইস্পাত কঠিন। অমরের প্রতি হয়তো বিভিন্ন কারণে ওর প্রচ্ছন্ন রাগ ছিল যা আজ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে বেরিয়ে পড়েছে। ওর ভাবুক চোখ কিন্তু অন্য কথা বলছিল এ নিছক প্রতিহিংসা নয়। বয়সের দাবি অনুযায়ী প্রতিটি মানুষকে প্রয়োজনে জীবনধর্ম পালন করতে হয়। অর্কর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। রথিনের ডাকে সম্বিত ফিরে আসে দুজনের। কোন কথা হয়না নিজেদের মধ্যে, শুধু, যে যার নিজস্ব মোকামে বাক্যহীন চলে যায়। নিশীথ শুধু কানে কানে রথিন কে বলে যায়, ‘মেয়ে দেখ অর্ককে পাত্রীস্থ্ করার প্রয়োজন।
রথিন সবসময় ঠিকঠাক ওর অর্কদা কে বুঝতে পারে না। রথিন ভেবেছিল অর্ক আর ওদের সাথে কথা বলবে না, হয়তো এই কম্পার্টমেন্ট পরিবর্তন করবে। রথিন কোনমতেই অর্কদার বন্ধুত্ব হারাতে চায় না। পরদিন ধীর পদক্ষেপে অর্ক নির্দিষ্ট কোচের দিকে এগিয়ে এলে রথিন মানসিক শান্তি পায়। সকাল থেকেই রথিন কৌশল ভেবে রাখছিল,কাগজের একটা ছোট্ট খবর ওকে ভাবতে সাহায্য করেছিল। ও জানে অর্ক কে একমাত্র এই বাণেই জব্দ করা যাবে। অর্ক এতশত কিছুই ভাবেনি, গত দিনের ঘটনা সে দিব্যি ভুলে গেছিল। ট্রেনে উঠতে না উঠতেই অর্ককে রথিন খাতির করে ডেকে এনে বলে ‘বস বস একটা জবর খবর আছে।’ গতকালের ঘটনা মনে পড়ে যায় অর্কর,কথা না বলে শুধু চোখে তুলে তাকায় রথিনের দিকে। রথিন বলে ওঠে ‘ডাউন ২১০ বর্ধমান হাওড়া লোকালে এমন একজন আছেন যিনি আমাদের অর্কদাকে টেক্কা দিতে পারে।’ কেউই খেয়াল করেনি আজ খবরের কাগজের এই ছোট্ট খবরটা,‘মা – দুর্গতিনাশিনীর হাত ধরে রক্ষা পেল তেইশ কন্যা।’ মহিলা কম্পার্টমেন্টে বাতাসী নামে এমন একজন আছেন, যিনি দশভুজা রুপে অবতীর্ণ হয়ে অপহৃতা কিশোরীদের ঘরের ঠিকানায় ফিরে যেতে সাহায্য করেছেন। উনি ঠিক সময় বুঝতে পেরেছিলেন পুলিশকে না জানালে, পাচার হয়ে অন্ধকারের আশ্রয় পৌঁছে যেতে পারে এই মেয়েরা। রথিনের নাটকীয় বক্তব্যের ভারে নিশ্চিন্ত হয়ে বসা অর্ক একটু নড়েচড়ে ওঠে। রথিন বুঝতে পারে ওর টনিকে কাজ দিয়েছে। ভাগ্যিস বাতাসী না কে, এই ঘটনাটা ঘটিয়েছিল না হলে অর্কদা আমাদের ত্যাগ দিত। রথীন একটু বেড়ে খেলে। সে বলে, 'অর্ক দা, চলো দেবি দুর্গার সাথে দেখা করে আসি'। রথিন জানে অর্ক যেতে রাজি হবেনা, মেয়েদের ব্যাপারে অর্ক কেমন দরকচা। মেয়েদের অস্তিত্বই স্বীকার করেনা। সবাইকে অবাক করে অর্ক বলে, ‘চলো’। রথিনের মনে হয় শালা এতো পুট পড়ে সাপের মুখে পড়লাম। দমবার পাত্র যদিও সে নয়। স্বভাবে ফিচেল রথিনের অনেক মেয়ে বন্ধু ট্রেনে। পরের স্টেশনে নেমে লেডিজে উঠতে গিয়ে ঝুলন্ত মহিলাদের ধাক্কা আর গাল খায় ওরা। ভেতর থেকে পুজা দেখতে পায় রথিন কে, চীৎকার করে সে বলে 'রথিন দা, কাকে খুঁজছ?' রথিন সংক্ষেপে বলে। পুজার আদেশ পেয়ে দস্যি মেয়েরা উঠতে দেয় ওদের।
পুজা চেঁচিয়ে বলে, ‘মা বাতাসী, উঠে আসুন আপনা্র দর্শনার্থী এসেছে ভিন গ্রহ থেকে’। বাতাসী গল্পে মত্ত তাকে তুলে আনে কার সাধ্য। রথিন চুপ করে না থাকতে পেরে বলে, ‘ও হিরোইন দিদিমণি আসেন জলদি। আমাদের হিরো দাদাবাবু আপনার সাথে কথা বলতে চায়’। অর্ক বিরক্ত হয় অথচ কিছু বলতে পারেনা। হেঁড়ে পুরুষ কন্ঠ শুনে বাতাসী মুখ ফিরিয়ে তাকায়। তারপর পুজার ইঙ্গিতে উঠে আসে। শৈশবে নিজের দ্বিগুন বয়সী এক পুরুষে মুগ্ধ বাতাসী কয়েক যুগ পরে আর একজন পুরুষ মানুষ দেখল? নাকি পূর্বে, সদ্য প্রাপ্ত মেয়েবেলায় দেখা কোনও দ্বিপ্রহর ঢুঁ মেরে ঢুকে পড়েছে তার স্মৃতির দেওয়াল থেকে। একটা আবছা ছবি বাতাসীর মনে ভেসে আসে। কলেজের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছেলেটা, সাথে একপাল সমলিঙ্গের স্বজন। বক্তিমা গিলছে সব্বাই দীর্ঘ অনশন ভেঙ্গে। সেই একবারই দেখেছিল তাকে। তারপর বেশ কিছুদিন মেছো পাখির মতো সন্ধান করে ফিরত চোখ। কখন যে পুরানো বাড়ির রঙ্গিন পলেস্তারা খসে পড়েছে মনের দেওয়াল থেকে খেয়াল নেই তার। অর্কর প্রশ্নবান ছুটে আসতে থাকে বৃষ্টি ধারার মতো অথচ উত্তর আসেনা। পুজা বলে, ‘ওলো সই, মলি নাকি?’ হঠাত খেয়াল হয় বাতাসীর। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা না করে সরাসরি জিগেস করে, ‘আপনাকে কোথায় দেখেছি বলুনতো, বর্ধমান কলেজে?’ অর্ক জাণায় সে বর্ধমান কলেজ ফেস্টে দু একবার গেছে বটে তবে এইটূকূই যোগাযোগ কলেজের সঙ্গে। ওখানে তার অনেক বন্ধু ছিল। হাজারো কথা, ঝুলি থেকে থেকে বার করতে ইছে করছে বাতাসীর। অফিস যাত্রী ঠাসা ভীড় মহিলা কামরা তার কাছে যেন নির্জন সৈকত। অর্ক এখানে আসার কারন একটু হলেও গুলিয়া ফেলেছে। রথিনের বাতাসীকে বেশ মনে ধরেছে। সে এই সুযোগ কাজে লাগায়। বাতাসীর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘দিদি, অর্ক দা এখনো আদামড়া অবিবাহিত রয়ে গেল। আমরা বিয়ে দিতে অপারগ। হয়ত মনের মতো কেউ জুটছে না’। অর্ক কঠিন দৃষ্টিতে রথিনের দিকে তাকালে ফিক করে হেসে রথিন মাথা নিচু করে। অর্ক আর কথা বাড়াতে চায়না। তড়িঘড়ি বাতাসী কে তার কৃত কাজের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে পরের স্টেশনে নেমে পড়ে। বাতাসী কিন্তু মনে মনে রথিনকে সাধুবাদ জানায়।
এগারো
বিশ্বকর্মা বিপিন
বেশ কিছুদিন বিপিনের সঙ্গে নতুন কিছু মানুষকে দেখা যাচ্ছে। মাসে বার দুই তিন শ্রীরামপুরে এসে থলি ভরে মাল নিয়ে যায় তারা। কারবারি কাজ বলতে বিপিনের কেবল আসবাবপত্রর অর্ডার নেওয়া আর টাকা আদায় করা। বর্তমানে কারিগরেই কাজ সামলায়। সপ্তাহান্তে বিপিন অর্ডার মিলিয়ে কাজ পর্যবেক্ষণ করে। গুণমানে সমঝোতা করা সে পছন্দ করে না। মূল কারবারের বাইরেরও বিপিন যে কিসব অন্য কাজ করে চলে শান্তনা তার হদিশ জানেনা। নতুন কিছুর আন্দাজ পায় অচেনা কজনের আগমনবার্তায়। শান্তনা বিপিনকে কিছু জিজ্ঞেস করেনা। মানুষের মন বড় অভিমানী, যাকে সে পেটে ধরে আজন্ম লালন করেছে, তাকে সে প্রাণ খুলে জিজ্ঞেস করতে পারে না কিছু। শান্তনা মনে করে ছেলের উচিত খোলসা করে তাকে সবকিছু জানানো। এমনই চলতে থাকে দিন। অচেনা লোকেরা সব চেনা হয়ে যেতে থাকে। শান্তনা মদনপুরের শ্যামাদাস কে একদিন জিজ্ঞেস করে বিপিনের সঙ্গে তাদের কিসের এত কাজ। শ্যামা বলে, ‘তারা ট্রেনে হকারী করে, কেউ শিয়ালদহ সাউথ, কেউ নর্থ। বিপিন দা বিভিন্ন মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বানায় কারিগর লাগিয়ে। আমরা লোকাল ট্রেনে ফেরি করি সেই সব মাল’। শান্তনা অবাক হয়ে শ্যামাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো কিভাবে?’ শ্যামা বলে, ‘মাসিমা আপনাকে দাদা কিছু বলেনা?’ শান্তনা লজ্জা পেয়ে গিয়ে বলে, ‘না, তবে জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয় বলবে। আমি তেমন উৎসাহ দেখাই না’। বিপিন, শ্যামা বাদল অনন্তর চেয়ে বয়সে ছোটই হবে কিন্ত ওরা দাদা বলে ডাকে বিপিনকে। ফিরতি ডাকে বিপিনও সবাইকে দাদা ডাকে। পকেট থেকে শ্যামা একটা হুক বার করে শান্তনা কে দেখায়। শান্তনা জিজ্ঞেস করে,‘এটা কি’? কথা না বাড়িয়ে শ্যামা হুকটা হাতের চাপে দেওয়ালে বসিয়ে দেয়। হুকটা আটকে যায় দেওয়ালে। এভাবে দ্বিতীয় হুকটা প্রথমটা থেকে ফুট দশেক দূরে মাটির সমান্তরালে বসিয়ে দেয়। শান্তনা জিজ্ঞেস করে কি হবে হুক দিয়ে? শ্যামা কোন কথা না বলে একটা নাইলনের দড়ি ব্যাগ থেকে বার করে লাগিয়ে দেয়, তারপর বলে, ‘মাসিমা নিন যা খুশি শুকোতে দিন’। শান্তনা বলে,‘ভাই তোমার এমন দুটো হুক আমাকে দেবে আমি ব্যবহার করবো।‘ শ্যামা বলে, ‘দাদার তৈরি হুক ওনার থেকেই চান।‘ বিপিনকে আসতে দেখা যায়। শান্তনা চোখ টিপে শ্যামা কে চুপ করতে বলে। শ্যামা বুঝতে পেরে এক জোড়া হুক বিপিনকে আড়াল করে রেখে যায় শান্তনার ড্রয়ারে। বিপিনের সঙ্গে শ্যামাদাস বেরিয়ে যায়। হুকের তলায় রবারের প্যাড হাতের চাপে ভ্যাকুয়াম তৈরি করছে। পারিপার্শ্বিক বায়ুচাপে হুক আঁকড়ে ধরেছে দেওয়ালকে। অনেকটা ক্ষমতা ধরে ছোট্ট এই হুক। নির্দিষ্ট টেকনিক লাগে দেওয়াল থেকে খুলতে। প্রথম প্রথম শ্যামা ভেবেছিল এর তেমন কাটতি হবেনা, কিন্তু কম দামে অনেকের ঘরে প্রয়োজনীয় এই পণ্য পৌঁছে গেছে। প্রথম সাফল্যের পর বাজারে এলো পঁচিশ টাকার সৌরজগৎ, বাচ্চাদের কাছে মোটামুটি হিট। এরপর অঙ্কের খেলনা, বিভিন্ন রঙের ঘুটি দিয়ে অযুত অবধি সংখ্যা তৈরি করা যাবে। ফেরি করার আগে অনন্ত বলে,‘দাদা তুমি বেকার এ সব বানাচ্ছ এইসব জিনিষের কাটতি হবেনা।‘ বিপিন বলে,‘খান দশ বারো বানিয়েছি, যদি বিক্রি না হয় ফেরত দেবে।‘ বাদল বলে,‘এর সঙ্গে একটা রঙিন কলম গিফট দিলে বাচ্চারা নেবে।‘ বিপিন স্বগতোক্তি করে মাথায় সামুরাই, অবতার, মিকি মাউস বা ফ্যান্টম। বড়বাজার থেকে পছন্দ মতো কিনে ফিট করতে হবে, দ্যি আইডিয়া। সবাইকে অবাক করে বিপিন তারপর বাদলকে বলে, ‘বাদলদা, এই খেলনা বিক্রি করতে গেলে তোমাদের অংক শিখতে হবে’। অনন্ত বলে,‘এতো ভারি বিপদ ‘আমারা মাস্টারের ভয়ে লেখাপড়া শিখিনি আর তুমি বুড়ো বয়সে সেই অংক শেখাবে!’ বিপিন বলে, ‘তোমরা বিক্রির সময় যদি বোঝাতে না পারো তাহলে কি করে বিক্রি হবে?’ সংখ্যা তৈরীর খেলা, বাদল বাড়িতে অভ্যাস শুরু করে। বাদল বিপিনকে বলে,‘দাদা, ছেলে তোমার নেপচুন, পল্টূ আর অঙ্কর খেলায় মেতে গেছে। বিপিন একচোট হেঁসে বলে,‘একদিন তোমার বাড়ি গিয়ে ছেলের পরীক্ষা নেব। দেখবো রাতের বিভিন্ন সময় গ্রহ উপগ্রহের অবস্থান তোমরা কেমন বলতে পারো।‘ অপ্রস্তুত বাদল দাদাকে হাঁসার কারন জিগেস করলে অনন্ত জানায় Pluto, পল্টূ নয়। বিপিন বলে, ওই হল বোঝা গেলেই চলবে। অবাক চোখে শান্তনা তাকায় পাগলগুলোর দিকে।
দুলহা, শ্যামা দাসের বন্ধু। মহল্লায় সে হার দুল মেয়েদের মনিহারি জিনিস বেচে। নির্দিষ্ট সময়ে মেয়েরা কাজ বন্ধ করে দুল হার বিক্রেতার অপেক্ষায় থাকে। সবাই অজয়কে নাম ধরে না ডেকে দুলহা বলে ডাকে। প্রাথমিক লজ্জা কাটে অজয়ের দুলহা নামের ভিতর ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কথা বুঝতে পেরে। শ্যামা দুলহা কে প্রস্তাব দিয়েছিল কাঠের ফেলে দেওয়া অবশেষ থেকে মনিহারি জিনিসের চাহিদা কেমন হতে পারে সেটা জানার। দুলহার সদর্থক উত্তরে শ্যামা দুলহা কে বিপিনের কাছে আনে। আজ প্রথম বিপিন আভরণের ডালি তুলে দেয় দুলহার হাতে। দুলহা ভাবতে পারেনি বিপিনের সৃষ্টিশীলতার ব্যাপ্তি। দুলহা কাচের বাক্স দুলিয়ে বিপিনের ঘরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। শান্তনা দাঁড় করায় অজয়কে। কাঁচের বাইরে থেকে দেখে ওর পছন্দ হয়ে যায় হার দুল ক্লিপের সম্ভার। ন্যায্য দাম দিয়ে শান্তনা দুজোড়া দুল কিনে ফেলে। অজয় বাধ্য হয় পয়সা নিতে। দুটি দুল কানে পড়ে শান্তনা আয়নার সামনে নিজেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে থাকে। আজ রবিবার রান্নাবান্না দেরি আছে। সাতসকালে দুলহার আগমনে উঠে পড়তে হয়েছে শান্তনা কে। বিরক্তি ছিল তার চোখেমুখে। দুলহার অলঙ্কারের সমাহার তাকে শান্তি দিয়েছে। শান্তনা এখন আয়নার সামনে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে কানের দুলের ঠেকায় আপন শরীরী বন্দিশ। হঠাত করে দরজা ঠেলে নাটকীয় দৃশ্যে বাতাসীর প্রবেশ ঘটে। চুপটি করে বাতাসী শান্তনার ভালোলাগা আপন ব্লটিং পেপারে শুষে নিতে থাকে। শান্তনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ঘোষণা করে অলক্ষ্যে তাকে লক্ষ্য করছে কেউ। তড়িঘড়ি শান্তনা পেছনে তাকিয়ে দেখে তার সই বাতাসী। বাতাসী বলে,‘খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে। কানের দুলগুলোও খুব সুন্দর।’ লজ্জা পেয়ে শান্তনা বলে, ‘তুমি নেবে একটা?’ বাতাসী বলে,‘উহু,নিজের জন্য পছন্দ করে এনেছো সেখানে ভাগ বসাবো না।‘ শান্তনা বাতাসীর কথা না শুনে জোর করে এক জোড়া দুল তাকে পরিয়ে দেয়। আজ অর্ক নেই, জলদি জলখাবার বানানোর ঝক্কি নেই। বাতাসী শান্তনার সঙ্গে মেতে যায়। গল্পে সময় বয়ে যায়। শান্তনা বাতাসীকে খেয়ে যেতে বলে। বাতাসী শান্তনা কে রান্না-বান্নায় সাহায্য করতে থাকে। কাজ সারা হয়ে গেলে ঘরকন্নার কাজ করতে বাতাসী নিজের বাড়ি যায়।
বিপিন তার পাতালঘর ছেড়ে বেরোতে চায় না, কি যে তার এত কাজ। মায়ের পেড়াপেড়িতে আনমনা বিপিন চান করে খাবার টেবিলে বসে। খাবার টেবিলে তিনটি থালা সাজানো। টেবিলে থালার সংখ্যা বিপিনের দৃষ্টি এড়ায় না। স্বভাবসুলভ উদাসীনতায় মাকে বিপিন জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি তিনটে থালা সাজিয়েছ, আজ কে আসবে? শান্তনা ছেলের উদাসীনতায় তাল ঠুকে বলে,‘কেউ না, তুই বিয়ে থা করলে কুটুম আসত’। উৎসাহ না দেখিয়া বিপিন ডুব দেয় মনের আপন কোণে। ভাত দিতে শান্তনার দেরি হচ্ছে। বিপিন অস্থির হয়ে মাকে বলে, ‘প্রস্তুত হয়ে আমাকে ডাকবে তো। আমার কত কাজ ছিল।‘ ‘রাখ তোর যতসব ফালতু কাজ’। মায়ের এমন অবান্তর উত্তরে মুখ তুলে কিছু বলতে গিয়ে বিপিন দেখে বাতাসীদি দোর ঠেলে ঢুকছে। বিপিনের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় তিন থালি রহস্য। অবাক বিস্ময়ে বিপিন দেখে বাতাসীদি তারই তৈরি কর্ণভূষণে সুসজ্জিত। অথচ শান্তনা এক জোড়া দুল পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছেলের সে দিকে নজর নেই। বাতাসী বিস্ময়ের কারন চট করে বুঝে নেয় এবং বিপিনকে বলে মায়ের দিকে দৃষ্টি দিতে। বিপিন কথার মর্ম বুঝতে না পেরে বলে, ‘মাকেই জিগেস করুন আমি মায়ের দিকে দৃষ্টি দেই কিনা?’ বাতাসী হেঁসে ওঠে। বিপিন হকচকিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে অবাক চোখে দেখে মায়ের দু কানে তারই ডিজাইন করা দুল। মনটা ভালোলাগায় ভরে ওঠে। নিরাসক্ত জীবন থেকে শান্তনার বেরিয়ে আসা বিপিনকে পুলকিত করে। যদিও সঠিক কোন কারনে বিপিন বেশি পুলকিত মন তার আন্দাজ দিতে অপারগ। একটা কাঁটা কেবল খচখচ করছে বিপিনের মনে। শান্তনা নির্বোধ, বাতাসী কি বুঝলো সে ই জানে।
বারো
বাতাসীর হাবা কবি
গ্রামের এক প্রান্তে হাবার বাড়ি। ক্যানেলে ছিপ নৌকো চালিয়ে মাছ ধরে কোনরকমে দিন গুজরান করে সে। কয়েক কেজি কুচো চিংড়ি, চুনো মাছ মেলে কি মেলে না, তার ওপর তিন তিনটে পাকস্থলী বেঁচে আছে। হাবা এতই হাবা, লোকে ওকে দিনরাত ঠকিয়ে কম পয়সায় বা বিনে পয়সায় মাছ নিয়ে যায়। কামচোর, বদমাশ গুলো বসে থাকে কখন হাবা ফিরবে সেই আশায়। কখনো একটা বিড়ির বিনিময় সিকিপো মাছ নিয়ে নেয়, ওর দরদী পরান না বলতে শেখেনি। ন্যাংটো ছেলে নিয়ে ওর অভুক্ত বউ বসে থাকে অপেক্ষায়। হাবা ফিরলে মাছ বিক্রির টাকায় এক ছটাক তেল একটু চাল কিনে উনুনে রান্না চড়বে। বেলা বাড়তে বাড়তে বিকেল গড়ালে খাওয়া হয় ওদের, রাতের খাবার জোটে না। যেদিন লুকিয়ে-চুরিয়ে শকুনদের হাত থেকে বাঁচিয়ে ঘরে মাছ আনতে পারে বৌ বাচ্চার ভাগ্যে মাছ ভাত জোটে একটু-আধটু। বউকে আদর করতে গেলে সেদিন আর গাল খায় না হাবা। বিস্তর ঝামেলা বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে, জল শুকিয়ে খটখটে। গোড়ালি ডোবানো জলে মাছ তো দূর অস্ত ব্যাঙ্গাচিরও দেখা মেলে না। তখন বাঁধের পাড় ধরে হেঁটে গিয়ে মাছের সন্ধান করতে হয়। যদিও মাছের কোন গ্যারান্টি নেই, বড় কঠিন বেঁচে থাকা। বাগদিরা সাপ খেলেও হাবা কোনদিন সাপ খায়নি, কুঁচে খেয়েছে। একদিন বাঁধের জল থেকে খ্যেপলায় উঠল এইয়া এক ঢোঁড়া সাপ। হাবা ডাঙায় জাল ফেলে ছুট। ছোটবেলা থেকেই হাবার, সাপের চলনে এলার্জি, কেমন গা ঘিনঘিন করে ওর। হাবার কীর্তি দেখে নেপু হেসে খুন। সাইকেল রেখে সে এগিয়ে আসে। সাপ বেচারি জালে জড়িয়ে মড়িয়ে নিশ্চুপ হয়ে আছে। নেপু জাল ছাড়িয়ে সাপের মুখটা ধরে থলিতে ঢুকিয়ে নেয়। হাবা বলে,'জালে একদম মাছ পড়েনি।' নেপু বলে, ' হাবা পচুই খাবি?' হাবার চোখ কেমন চকচক করে ওঠে। মনে ভাবে বউ ছেলেমেয়ে না খেতে পেয়ে মরছে আর আমি পচুই খাব? নেপু হাবার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলে, 'চল, আজ আমাদের ঘরে মাংস হয়েছে। পচুই, ভাত মাংস খেয়ে বাড়ি যাবিখন।' হাবা বলে, 'আমার পরিবার? তাদের ঘটে যে কিছুটি জুটবে না।' নেপু বলে, 'সে কি আর আমি ভাবি নি, মালসায় করে তোর বউ বাচ্চার জন্য মাংস দিয়ে দেবো খন।‘ হাবা সাপটাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে উত্তর আসে,' ও তোকে চিন্তা করতে হবে না, রাতে আমরা খেয়ে নেবখন।' হাবার আনন্দ আর ধরে না। ঘরে ঢুকে নেপু হাবাকে বসতে দিয়ে বউকে হাবার শিকার জমিয়ে রান্না করতে বলে। খালি পেটে পচুই পড়ে হাবার শরীর নেশায় চনমন করছে। হিহি করে হেঁসে উঠে হাবা। কখনও গান ধরছে, কখনও গানের ফাঁকে হাউমাউ করে পরিবারের দারিদ্র্য অসহায়তার কথা বলে কাঁদছে। মজুমদারের নামে খিস্তিখেউড় চলতে থাকে দুজনের মধ্যে। লাল, ঘোলাটে দু জোড়া চোখে এক্কেবারে ‘মন কি বাত’। নেশার ঘোর কাটলে ভাত মাংস এসে যায়। চব্য চোষ্য খেয়ে, হাবা ছাঁদা বেঁধে নিয়ে চলে, আজ যে কার মুখ দেখে সে উঠেছিল?
সূর্যি মামা পাটে যেতে তখন খুব বেশি বাকি নেই। ঘরে পড়ে থাকা অভুক্ত ছেলে, গিন্নি হাবার বাপান্ত করছে। ঠিক সেই সময় হাবার প্রবেশ ঘটে নাট্যমঞ্চে,ভাঁড় হাতে। হাবাকে হি হি করে হাঁসতে দেখে বউ ফেলা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে চেলাকাঠ নিয়ে তাড়া করে। সেই দৃশ্য দেখে ছেলে ঘরের কোণে লুকিয়ে পড়েছে। হাবা দৌড়তে দৌড়তে ভাঁড়টা তুলে দেখাচ্ছে বারবার। 'কী, কী আছে ওতে, আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।' বউ চেঁচাতে থাকে। ছোটার গতি কমিয়ে হাবা বলতে থাকে 'গরম ভাত আর মাংস।' ভাতের আশ্বাসে শান্ত হয় বউ। গরম ভাত ততক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গেলেও ছেলেবউ তড়িবত করে খায়। গিন্নি বলে, 'ঠিক যেন, শোল মাছ।'
বিয়ের আগে হাবা,গোলগোল চোখ দিয়ে সীমাকে গিলতো। সীমা ডাকাবুকো মেয়ে, সে একদিন ক্যানেল পাড়ে নির্জনে ডাকে হাবা কে। সীমা আগে এসে দাঁড়িয়ে ছিল গাছ তলায়। হাবা ধীরু পায়ে পিছন দিক থেকে এগিয়ে আসে। সীমা হাবার আগমন বার্তা টের পায়নি। সচকিত সীমা হঠাৎ শুনতে পায় আদুরে গলায় হাবা বলছে, 'সীমা, তুই আমাকে বিয়ে করবি?' আবেগের ঠেলায় বোকা হাবা বুঝতে পারেনি সীমার হাতে একটা চেলাকাঠ আছে। সীমা বলে, 'হারামজাদা, পাগলের ঝাড়, ফের যদি আমার দিকে জুলজুল করে তাকাস, চোখ গেলে দেব। সে কি ছুট, একদমে ঘরে এসে হাঁপাতে থাকে হাবা। সীমার তখন একটু করুনাই হচ্ছিল,দশাসই হারুটা যে মনে বিঁধে আছে তার। মরদের মতো মরদ, কোন রকম নেশা ভান করে না, ঠিক খেটে খাওয়াতে পারবে।
বহুদিন কেটে গেছে, হাবা এখন বিবাহিত। প্রতিটি নতুন দিন ওর কাছে নতুন লড়াইয়ের প্রস্তুতি। অভয় মাস্টার গ্রামে এসে আনপড়, অশিক্ষিত দিনমজুর চাষিদের এককাট্টা করার চেষ্টা করছে। সীমা যেন অভয়ের ভাব শিষ্যা। মজুমদার অতীতের এই একরত্তি মেয়েটাকে সমঝে চলে। সীমা যেন জ্বলন্ত অঙ্গার। কতদিন মজুমদার চেষ্টা করেছে টাকা-পয়সা ছড়িয়ে এই মেয়েটাকে বিছানায় পেতে। সীমা মজুমদারকে ঘেন্না করত। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করত, কোনদিন যদি সুযোগ পায়, মজুমদারের লকলকে জিভ টেনে ছিড়ে আনবে। অসহায়তার সুযোগ নিয়ে কত মেয়ের যে সর্বনাশ করেছে মজুমদার। মাস্টার আসার পর এ তল্লাটে মজুমদারের রমরমা গেছে। সীমা বুঝতে পারতো মজুমদার ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় আছে, বেশ কিছু নেতার সঙ্গে ওর দহরম-মহরম। দলের সবাই মাস্টারদা নয়। হাবার বউটাও বেশ ডাগর ডোগর হয়েছে, প্রথম থেকেই সে মজুমদারের নজরে ছিল...। পার্টি সঙ্গে থাকায়, মানুষের সাহস বেড়েছে। মজুমদার তাই চট করে হঠকারিতা করতে চায়না। কিন্তু বেড়ালের পক্ষে কাশী যাওয়া সম্ভব নয়,মাছের যোগান তার চাই। মনটা সবসময় খচখচ করে, আড়াল থেকে হাবার বউয়ের দিকে সে নজর রাখে। হাবা একদিন বাঁধে মাছ ধরতে গেছে, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে হাবার অন্নর একমাত্র সংস্থান বাঁধের জলাধার। বাঁধ বরাবর মোটরবাইকের সওয়ার হয়ে রাজকীয় চালে চলেছে মজুমদার। হঠাৎ মজুমদারের দৃষ্টিগোচরে আসে হাবা, মোটর সাইকেল থেমে যায়। নয়ন বাইক ছেড়ে বাবুর আদেশে হাবার দিকে এগিয়ে যায়। হাবা হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নয়ন, হাবার গলায় গামছা দিয়ে হিড়হিড় করে টানতে টানতে মজুমদারের কাছে এনে হাজির করে। হাবা বলে, 'হুজুর, মাছ ধরছি।' 'এটা কি তোর অভয় মাস্টারের মুলক?' মজুমদারের এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবে হাবা বুঝতে পারে না। শয়তানটা বলতে শুরু করে 'বাঁধের দু'ধারে, যতদূর চোখ যায় সব আমার জমি। এখানে মাছ ধরতে আমার অনুমতি লাগে বুঝলি?' নয়নের দিকে চকিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে মজুমদার বলে, 'নয়ন দেখত, বাঁধে আর কারা মাছ ধরছে, সব ব্যাটাকে ধরে আন আমার কাছে।' বহুদিন ধরে মজুমদারের চামচাগিরি করছেন নয়ন। নয়ন সহজ ঈঙ্গিত, বুঝতে দেরি না করে পত্রপাঠ সরে পড়ে। মজুমদার বলে, 'দেখ হাবা, আমার দয়ার প্রাণ। তুই দুটো মাছ ধরে বেচে খাবি, এ আর এমন কি? কিন্তু জানিস তো, আমাকে সরকারি ট্যাক্স দিতে হয়।' হাবা কস্মিনকালে শোনেনি, বারোয়ারি বাঁধে মাছ ধরতে সরকারি ট্যাক্স লাগে। মজুমদার হাবা কে ভাবার সুযোগ না দিয়ে বলে, 'তোর টাকা নয় আমি সরকারকে দিয়ে মকুব করিয়ে দেবো। তুই কি দিবি বিনিময়ে?' হাবা অঙ্গভঙ্গি করে বলতে চায় আমার আছে কি? হাবার ভাব চটজলদি বুঝে গিয়ে মজুমদার বলে, 'আছে, আছে তোর অনেক কিছু আছে। ওরকম সোমত্ত বউ কে বেঁধে রেখে নেই বলতে নেই বাবা। শোন তোর বউকে আমার বাড়িতে কাজের লোক করে রাখবো। ভালো পয়সা পাবি, আর এরকম না খেয়ে দিন গুজরান করতে হবে না। মাছ ধরতে ইচ্ছে করলে ধরবি, আমার কত্ত পুকুর আছে মাছ ধরবি সেখানে।' হাবার গলার ভেতর দিয়ে শরীরের জ্বলন বেরিয়ে আসতে পারে না। অসীম যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে সে। মনে ভাবে খানকির বাচ্চা, জীবনে যদি কোনদিন সুযোগ পাই তোকে দেখে নেব।
হাবা সারা জীবন একটু দূরে দূরে থাকতে ভালোবাসে। ভালোবাসার কাঙাল একটা মানুষকে দূরে চলে যেতে হয় যখন সমাজ সামগ্রিকভাবে মানুষটাকে হীন চোখে দেখে। সীমা প্রত্যাখ্যান করলেও, সে হীন চোখে কখনো দেখেনি হাবাকে। বরং একটু মায়াই ছিল ন্যালবেলে লোকটার প্রতি। গ্রামের বাইরের কোন মানুষ গ্রামে এসে জুড়ে বসলে, হাবা তাকে সন্দেহের চোখে দেখত। শহর থেকে আসা নৃপেন মাস্টার শিক্ষার বড়াই করত মুখে, মানুষকে মানুষ জ্ঞান করতোনা। শালা, মজুমদারের সাথে জুটে মজুমদারের পরামর্শদাতা হয়ে গেল। শুধু খান্ডানি বউটার জন্য চাইলেও কপালে মেয়েছেলে জোটাতে পারেনি। বেড়ালের মত ছুকছুক করত সবসময়। অভয় গ্রামে আসার পর দুর থেকে মেপে নেওয়ার চেষ্টা করতে হাবা। একটু সন্দেহের কাজল চোখে থাকলেও চালচলনে অভয় কে তার খারাপ লাগত না। তবু হাবা কোনদিন যেঁচে এসে কথা বলেনি। অভয় বারবার বলেছে কি কমরেড চলো একটু আড্ডা দেওয়া যাক। হাবা ঘাড় নেড়ে হাওয়া, কোনদিন এগিয়ে আসেনি। নৃপেনের সাথে অভয়ের তফাৎ করেছিল সে সঙ্গ মেপে। অভয়ের সঙ্গী ছিল চাষাভুষ সাধারণ মানুষ। মনে মনে হাবা এমনও ভাবত, কি জানি বাবা গরিবগুরবো গুলোকে হাত করার এ হয়ত নতুন কোনও ছক। হয়ত অভয় মাস্টারও মজুমদারের লাগানো লোক। ভাবনার স্রোত নিমেষে দিক পরিবর্তন করে যেদিন নেপুর জমিতে মন্দির বানানোর কূটকচালি ভেস্তে যায়। সেদিন থেকেই হাবা অভয় কে মনে মনে স্যালুট জানায়। পরম অপরাধবোধ থেকে দেখা হলে হাবা হিহি করে হাসত। হাবার আচরনের এমন অদ্ভুত পরিবর্তনে অভয় হয়তো হাবার মনের ভেতর চলা দ্বৈরথ আন্দাজ করতে পেরেছিল।
অভয়ের বড় ইচ্ছে ছিল মেয়ে ইংরেজি শিখবে সিলেবাসের বাইরে। ইংরেজি শেখা মানে ওর কাছে সেলি, কিটস, বায়রন পড়তে পারা,শেক্সপিয়ার পাঠের লাইসেন্স পাওয়া। নিজে যে রসসাগরে সাঁতার দিতে সাবলীল, মেয়েকে সেই অমৃতকুম্ভর সন্ধান দিতে চেয়েছিলি সে। এক প্রবীণ অধ্যাপক কে অনুরোধ করেছিল অভয়। প্রথমে নিমরাজি হলেও প্রমথ বাবু ফেলতে পারেননি অভয়ের অনুরোধ, এসে হাজির হয়েছিলেন ওদের বাড়ি। বাতাসী বাধ্য হয় বিকেলে বাড়ি থাকতে, মাঠে খেলতে না পেরে সে রেগে কাঁই। প্রমথ বাবু ঈশ্বরভীরু। সংস্কৃত টোল পন্ডিতের মতো তার বগলে ছাতা,পরণে ধুতিপাঞ্জাবি। হেলতে-দুলতে চলার অভ্যাসে তিনি প্রাচীন। প্রথম সাক্ষাতে বাতাসী ব্যাঙ্গের হাসি হেসেছিল। অভয় গম্ভীর গলায় 'ছান্দসি' ডাক দেওয়ায় মেয়ে সচকিত হয়, বাপের এইডাক মেয়ের চেনা। চুপ মেরে গিয়েছিল সে। প্রমথ চ্যালেঞ্জটা নিয়ে ফেললেন, অবাধ্যতায় রশি বাঁধার চ্যালেঞ্জ। প্রথমে ভেবেছিলেন স্কাইলার্ক পড়াবেন, ভাবনা বদলে ফেললেন নিমেষে। কারণ স্কাইলার্ক এর স্বপ্নীল গানে, সুখ ও অসুখের দ্যোতানায় বিরাজমান সর্বশক্তিমানের অস্তিত্ব দিয়ে এ মেয়েকে বশ করা যাবেনা। এ অস্ত্র তুণে তোলা থাক। বহু অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ বৃদ্ধ মাস্টার ঠিক করেন এখন ক্যাসাবিয়াঙ্কাই উপযোগী। চটজলদি শুরু করেন প্রমথ বাবু। অবাক হয়ে শুনতে থাকে বাতাসী। প্রথমে ইতিহাস, তারপর কবিতার তরজমা। নাইলের যুদ্ধ, ১৭৯৮ সন, কমান্ডার জুলিয়েন যোশেফ পুত্র ক্যাসাবিয়াঙ্কাকে অনন্ত অপেক্ষায় রেখে যাচ্ছেন। সর্বগ্রাসী আগুনের লেলিহান শিখায় অগ্নিক্লিষ্ট সমুদ্রযান। আগুনের উষ্মার চেয়ে দৃঢ ক্যাসাবিয়াঙ্কা জানেনা তার পিতার মৃত্যুর খবর। প্রত্যাশা নিয়ে তার প্রত্যয়ী জিজ্ঞাসা বাবাকে, সে কি দায়িত্ব পালন করতে পারছে? হাঁ করে ড্যাবড্যাবে চোখে বাতাসী তাকিয়ে থাকে প্রমথ পণ্ডিতের দিকে। যেন জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সে, বাবার দেওয়া শপথ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে। জোসেফ আর অভয় তার কাছে এই মুহূর্তে একাকার। হঠাৎ সে কল্পচক্ষে দেখতে পায়, জাহাজের বিস্ফোরণ। কলকল জলস্রোতে বাবার আধপোড়া ঝলসানো দেহ, সমুদ্র বিহারী। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে, বাতাসী একছুট্টে মধ্যের পুকুর পাড়ে হাজির হয়। ঘাটে জলের অনাবশ্যক আলোড়ন তার অস্থির চিত্ততার সাক্ষ্য হয়ে তরঙ্গ তোলে। কৈশোর প্রাণ নিষ্ঠুর ধ্বংসলীলায় যখন ক্ষতবিক্ষত ঠিক সেই সময় একটা নিশ্চিন্ত কঠিন হাতের কোমল স্পর্শে ঘোর কাটে তার। ফিরে তাকিয়ে বাবাকে দেখে সে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একটা অস্ফুট আর্তনাদ বাতাসীর কান্নাভেজা গলা ছেড়ে বেরিয়ে আসে,'বাবা।' অভয়ের আকুল হাত দুটো, বাতাসীর পিঠের উপর ভরসার বাণী ছড়িয়ে দেয়, নিঃশব্দে। অভয় বুঝতে পারে বয়সের তুলনায় তার মেয়ে একটু বেশি পরিনত, যদিও আবেগে সেই ছোট্ট ছান্দসীই রয়ে গেছে। প্রমথ বাবুর বিস্ময়ের ঘোর কাটতে সময় লেগেছিল। শীতের সন্ধ্যা, হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল উদোম উঠোন বেয়ে ঘরে। আলোর রাজত্ব ভেঙে অন্ধকারের আগ্রাসনে সচকিত প্রমথ বাবু উঠে পড়েন। বাড়ির ভিতর ঘরে উঠোনে তার নজর পড়ে না কাউকে। অগত্যা, হাঁটা দেন বাড়ির দিকে। কনকনে শীতেও পরাণে দখিনা বাতাস বাঁশি বাজায়। অভিজ্ঞ শিক্ষকের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বিজয় মিছিল।
বাতাসী, উদাসী হাওয়ার মত বয়, কখনো ধীর, কখনো এলোমেলো। বহু চেষ্টা করেও তাকে সম্পূর্ণ মনোযোগী করে তোলা যায় না। প্রথম দিনের প্রত্যয় দ্বিতীয় দিনে নড়বড়ে মনে হয়। প্রতিদিনের মনোযোগ ধরে রাখতে উনি কখনো গান গাইতে বলেন, কখনো বা বাতাসীকে গানের ইংরেজি ট্রান্সলেশন করতে দেন। নাটকের প্রতি মেয়ের আকর্ষণ দেখে উনি নাটক পড়াতে শুরু করেছেন। বিভিন্ন পথে বাতাসীর চিন্তার জগৎ কে প্রসারিত করতে চাইছেন শিক্ষক, যার মাধ্যম ইংরেজি। মন এবং মনোযোগ সম্ভবত কোন পথে জেতা যায় কেউ জানে না। বাতাসী কিছুদিনেই বুঝতে পারে এই অকৃতদার মানুষটির অন্তর, বাতাসীর অবজ্ঞায় প্রতিনিয়ত কাঁদে। তবু বাতাসী নিজেকে বদলাতে পারেনা। জিদ ধরে নিয়ম করে আসেন প্রমথ বাবু, আশা ছাড়েন না।
হাবা প্রমথ বাবুর কাছেই মাছের সঠিক মূল্য পেত। একজন সজ্জন মানুষ হিসেবে প্রমথ বাবুকে হাবা খুব সম্মান করতো। হাবা একদিন কথায় কথায় প্রমথ মাস্টার কে জানায় অভয়ের প্রতি ওর দুর্বলতার কথা। প্রমথ পন্ডিত জানান রাজি থাকলে তিনি হাবাকে অভয়ের বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন। তেমনই একদিন হাবা আসে অভয়ের বাড়ি। অভয় নেই, কি করা যাবে, হাবা পড়ার ঘরে বসে থাকে। প্রমথবাবু সেদিন সনেট পড়াচ্ছেন। কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ ফ্রান্সের সমুদ্রতট দিয়ে হেঁটে চলেছেন, সঙ্গে কন্যা ক্যারোলিনা। অপূর্ব বালুচরি সোনা রোদ্দুর, কবির মননে জাগরূক অপার্থিব চৈতন্যের অনুভব। কবি কল্পনায় ক্যারোলিনা প্রকৃতির অঙ্গ হিসেবে ধরা দিচ্ছে। হাবা শুনতে শুনতে ফিক করে হেসে ফেলে। প্রমথ বাবু হাবার দিকে তাকালে,হাবা বলে, 'আমি যখন সন্ধ্যায় মাছ ধরে ফিরি তখন আকাশ জলে মিশে জলছবি হয়ে যায়। নিজেকে কেমন গাছের মতো লাগে, আলাদা করা যায় না।' বাতাসী ভাবে হাবাকাকা যা বলতে চাইছে, কবি কি তাই বোঝাতে চেয়েছেন! প্রমথবাবু বলে,'তুই থামবি?' বাতাসী বলে, দাদু, বকছো কেন? হাবা কাকার চোখ মন দুই আছে শুধু অক্ষর চেনা নেই।' অগত্যা চুপ করে যায় প্রমথ পন্ডিত। হাবা কিছু বুঝতে পারে না, শুধু ভাবে বাতাসী ওর কথায় গুরুত্ব দিয়েছে। হাবা একদমে বলে চলে, ‘সেখানে মজুমদার নেই, নেই তার সাঙ্গপাঙ্গদের ফটফটির আওয়াজ। সন্ধ্যার সময়ে আকাশের চিত্তির জলের বুকে। নীল আকাশে চুন রঙা মেঘ সবুজ কচুরিপানা মিশে কালো জলে যেন খাবি খাচ্ছে। খুকি! একদিন যাবে আমার সঙ্গে?’ এমন কেটেকেটে হাবা কথা গুলো বলছিল, প্রমথ বাবুও সবটা ঝেড়ে ফেলতে পারছিল না। বাতাসী হাবা কে চোখের ইশারায় সম্মতি দেয়, অধ্যাপক বুঝতেও পারেনা। তিনি আবার ডুবে যান কবিতার সমুদ্রে।
শনিবার স্কুল ছুটির পর বাতাসীর দেখা নেই, প্রমথ বাবুর আসার সময় হয়ে গেছে। বাতাসী যদিও মা কে বলে গেছে, দাদুকে অপেক্ষা করতে, একটু দেরি হতে পারে তার। পাশের পাড়ায় হাডুডু ম্যাচ খেলতে যাবে সে। স্কুল ছুটির পর সবার অলক্ষ্যে বাতাসী গ্রামের বাইরে যেদিকে দামোদরের ক্যানেল সেইদিকে সন্তর্পনে হাঁটা দেয়। হাবা নৌকায় অপেক্ষা করছিল। খুকি টলমল পায়ে উঠতেই দড়ি খুলে দেয় সে। ভাসতে থাকে বাতাসী, মুহূর্তে কাগজের নৌকো ভাসানো ছোটবেলায় ফিরে যায় স্মৃতির লাফদড়ি পিছনে হেঁটে। পুকুর ঘাট থেকে কাগজের নৌকো পাল তুলে পাড়ি দিয়ে অচিরেই ভিজে, জলডুবি হত। বাস্তবের জলযাত্রায় বাতাসী কল্পনা বিলাসী। এঁকেবেঁকে সবুজের বুক চিরে কলাবাগান পেরিয়ে চলে নৌকো, আকাশের দিকে দুই হাত তুলে তাকিয়ে থাকে সে। হঠাৎ খেয়াল হয় কাকার কথায় 'খুকি সাবধান, মাথা নামিয়ে ফেল।' বাতাসী দেখে বাঁশ বন নুয়ে পড়েছে জলের ফুট তিনেক ওপরে। তার নিচ দিয়ে ডিঙ্গা চলে তিরতির করে। বন্ধুদের সাথে এই পথ দিয়ে সাইকেল চড়ে ক্যানেলের পাশে পাশে ফিশারিজ পর্যন্ত এসেছে সে আগে। সেই ফিশারিজ বেশ কয়েক মাইল পেছনে হারিয়ে গেছে। দূর থেকে আলোছায়া রঙিন লাগে ফেলে আসা পথ। প্রমথ দাদু পছন্দ করেন না কালোয়াতি গান, তিনি রবীন্দ্রসংগীতের ভক্ত। মায়ের ইচ্ছায় বাতাসী রেকর্ড শুনে, পছন্দের রবি ঠাকুরের গান গায়। বাতাসীর গানের গুরুজি আবার রবীন্দ্র সংগীত পছন্দ করেন না। ওনার কথায় বাংলাদেশে এই গান দু'একজন ছাড়া কেউ গাইতে পারে না। আজ শ্রোতা হাবা কাকা। মনে মনে গুনগুন করছিল বাতাসী। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না সে। তার কন্ঠে প্রকৃতি এখন গান হয়ে জাগ্রত 'অরূপ তোমার বাণী'র সুরে। হাবা কম কথা বললেও ওর অন্তর্দৃষ্টি প্রখর। খুকির প্রাণখোলা গায়কীর ঝর্ণা ধারায়, কথার বাঁধ দিতে চায় না সে। গানের ছন্দে হাবার দাঁড় ছন্দময়, বাতাসী বুঝতে পারে কেন হাবা কাকা ঢিমেতালে নাও বাইছে। সংগীত মানুষের রক্ত স্রোতে মিশে থাকে। হাবা কাকার দিকে তাকিয়ে একটু হাসে বাতাসী। হাবা বুঝতে পারে, খুকির হাসি তার নাওয়ের ঢিমে ছন্দর প্রত্যুত্তর। কবিতার অভীষ্টে পৌঁছে গেছে নাও যেখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্য, বাংলার নদী নালায় আঁকা আকাশের চিত্তির বিচিত্তিরে বাঙময়। গান শেষ হলে হাবা শুধু বলে, 'তুমি বড় সুন্দর গাও। বুক ভরে শ্বাস পুরে দাও, ঐ জায়গাটা আরেকবার গাইবে?' ‘নিঃশ্বাস দাও পুরে?’ বাতাসী জিগেস করে। হাবার ঘাড় নাড়া সায় পেয়ে বাতাসী ফের প্রকৃতির সুরে সুর মিলিয়ে উদাত্ত কন্ঠে গেয়ে ওঠে - তেমনি আমার প্রাণের কেন্দ্রে....। স্তব্ধ হয়ে যায় সময়।
ওদিকে বীণার প্রাণ ওষ্ঠাগত, একে সন্ধ্যা অতিক্রান্ত অন্যদিকে প্রমথ মাস্টারের হুতাশ। সন্ধ্যা মেঘের শেষ সোনাকে ছুঁয়ে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায় বাতাসীর। যেহেতু খুকির তরফে ফেরার কোনো তাগিদ ছিল না তাই সূর্যি পাটে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল হাবা। খুকিকে দোর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে তবে বাড়ি যায় সে। মেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে চুপিচুপি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর। তাড়াতাড়ি জামা কাপড় ছেড়ে নিঃসাড়ে স্নান সেরে নেয়। রিতা বাড়ি গেছে এখনো ফেরেনি। সারাটা বাড়ি অন্ধকারে ডুবে আছে। সহসা পড়ার ঘরে ঢুকে মেয়ে দেখে খাটের ওপর ভূতের মত একটা অবয়ব। ভয় পেয়ে চিৎকার করতে গিয়ে সামলে নেয় নিজেকে। সুইচবোর্ড হাঁতড়ে আলো জ্বেলে ফেলে। ঝলমলে আলোয় দেখে স্থানুবৎ প্রমথ দাদু বসে আছেন। ঘন অন্ধকারে, এমন নিথর প্রাণহীন অস্তিত্ব নিয়ে কেউ অনন্ত অপেক্ষায় থাকতে পারে তা কল্পনার অতীত। ফেরার পথে বাতাসীর মনে হচ্ছিল লেখনি ছাড়া একজন কবির যা কিছু সম্পদ হাবা কাকার সকলই আছে। কবিতা শুধু লেখা পাতায় ধরা থাকে না, শুধু পাঠ করে আনন্দ মেলে এমনও নয়। কবিতা জীবনে চলা সংগীত, যা বাজে মন জুড়ে, দুঃখে সুখে। হাবা কাকার সঙ্গ না পেলে এই অনুভব জীবনে অধরা থাকতো। অধ্যাপকের চোখে জল, যার কোন কারন খুঁজে পায় না বাতাসী। একি হাবা কাকার কাছে পরাজয়ের গ্লানি? বন্ধুদের চোখে প্রেমের ভাষা, ঈর্ষা বাতাসী এখন পড়তে শিখেছে। এ চোখে যেন এই মুহূর্তে ঈর্ষারই প্রতিবিম্ব। গভীর অপমানবোধে দীর্ণ দাদু যেন ওর বন্ধুদের মত অবিবেচক। কিন্তু দাদু জানবে কী করে যে ও হাবা কাকার সঙ্গে নৌকো বিহারে গেছে? দাদু কেন বোঝেনা বাতাসী এমনই। মা-বাবা দুজনেই জানে ওকে। বাবা ওর চলায় সায় দেয়। মা ওর বয়ে যাওয়া আল দিয়ে আটকায়। গুরুজীও বলেন - ওকে ধরিলে তো ধরা দেবে না দেবে না। ওকে দাও ছেড়ে দাও ছেড়ে।’ এমন করে সত্য বুঝতে পারেনা প্রমথ মাস্টার। হাবার সঙ্গে কল্পিত দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ভাবটা এমন, ব্যাটা অশিক্ষিত, পড়ানোর সময় নৌকা বাওয়া? অভয় কে দিয়ে হাবাকে টাইট দেওয়ার কথাও ভাবেন তিনি। নিস্তব্ধতা ভেঙে বাতাসী এগিয়ে গিয়ে দাদুর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বাতাসীর হাত স্পর্শ করে প্রমথ। উৎফুল্ল বাতাসী নিজেকে চেপে রাখতে না পেরে বলে, 'জানো দাদু, আজ আমি আর হাবা কাকা তোমার প্রকৃতির কবির দেশে গেছিলাম। নীল, নির্জন আকাশের তলে প্রকৃতির অংশ হতে।' চটজলদি হাত ছেড়ে দাঁড়িয়ে ওঠেন বৃদ্ধ। ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে যাওয়ার আগে, ভিজে গলায় বলেন, 'আন্দাজ করেছিলাম। এবার থেকে তোমার হাবা কাকার কাছে ইংরিজি শিখবে, আমি তোমার বাবাকে বলে দেব।' বোকার মতো বাতাসী পরিস্থিতির জটিলতা হজম করতে চেষ্টা করে। সবটুকুর হদিশ না পেয়ে আনমনে পালতুলে ভেসে যায় ডিঙ্গি নৌকায়।
....................................
তেরো
বহু যুগের ওপার হতে
রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল পটভূমি থেকে পশ্চিমবঙ্গ খাড়া হয়ে দাঁড়ালো এক সুস্থির সময়ের সামনে। এসে গেল 1977, বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে গঠিত হল প্রথম বামফ্রন্ট সরকার। ঠিক পরের বছর অর্ক পদার্থবিদ্যায় অনার্স নিয়ে ভর্তি হল কলেজে। কলেজে এস.এফ.আইয়ের ছাতার তলে সদলবলে জুটছে ছাত্রছাত্রীরা, সেকি উত্তেজনা। অর্কর ইচ্ছে ছিল একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে পার্টির কর্মসূচি প্রত্যক্ষ করা। তাই ইউনিয়নে নাম লেখাতে দ্বিধা করেনি সে।
অর্কর কন্ঠ সম্পদে চৌম্বকত্ব ছিল। ছোটবেলায় রেল কলোনিতে বিহারী বন্ধুদের সংসর্গে বড় হওয়ার কারণে ঠোঁটস্থ ছিল কিশোর কুমারের গাওয়া হিন্দি গানের কলি। একই স্কুল থেকে পাশ দিয়ে বেশ কিছু ছেলে অর্কর সাথে ভর্তি হয়েছিল কলেজে, অতয়েব একসাথে জোটবেঁধে চলাফেরা। সহজেই ওরা কলেজের অন্যদের নজর কাড়তে পেরেছিল। একক মানুষ স্বাভাবিক নিয়মে জোটে এসে ভিড় করে। ফলত, "হাত ধরি ধরি, গোল বড় করি", ছোট জোট বড় হতে সময় লাগে না। অফ ক্লাসগুলোর সময় ক্যারাম পেটা নয়তো ক্যান্টিনে চা সহযোগে গান হুল্লোড় বাজি। বেশিরভাগ ছেলেই এস.এফ.আইয়ের মেম্বার, অথচ তারা ভেঁড়ে না সংগঠনের কাজ প্রচার অভিযানে। কেষ্টবিষ্টুদের নজরে পড়ে যায় নতুন গ্রুপের কোমর বেঁধে থাকা ছেলেদের দিকে। এমনকি দু চার জন মেয়েও জুটে গেছে ওদের দলে। কলেজ ক্যান্টিন চালায় বিষ্ণু, সে এই নতুনদের খুব পছন্দ করে। ওরা দলবেঁধে এলে চা বিক্রি তো বাড়েই, উপরিপাওনা গান-বাজনা, হইহল্লা। এমনই একদিন অর্ক গান ধরেছে 'মুসাফির হু ইয়ারও না ঘর হ্যায় না ঠিকানা।' সঙ্গে টেবিল বাজিয়ে তালের ঠেকা দিচ্ছে অন্যেরা। সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে ঢুকে পড়ে স্বয়ং ইউনিয়ন সেক্রেটারি গোপাল। অভিজ্ঞ চোখ চালিয়ে সে দ্রুত চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে নেয়। গান না থেমে চলতে থাকে নিজস্ব ছন্দে। গোপালের সঙ্গী-সাথীরা মজে ক্ষীর, কেউ কেউ ছন্দ মিলিয়ে ঘাড় নাড়াচ্ছে। একটু কেশে নিয়ে কর্কশ গলায় গোপাল বলে,'তোরা বাংলা গান জানিস না?' কথায় কোন উত্তর না দিয়ে অর্ক দুম করে ধরে ফেলে, 'শিং নেই তবু নাম তার সিংহ/ডিম নেই তবু অশ্ব ডিম্ব।' হঠাৎ করে হাসির রোলে উতরোল ক্যান্টিন ঘর। দোলা লাগে গোপালের মনে। সঙ্গীরা দেখতে পায় তাদের লিডারের চোখে হাসি। দুপক্ষই অন্য পক্ষকে জেতা হয়ে গেছে মনে করে আনন্দ পায়।
অর্ক কলেজ ইউনিয়নের টুকিটাকি কাজে অংশগ্রহণ করতে থাকে। বিশেষত গানের প্রয়োজনে মাঝেমধ্যেই ডাক পড়ে অর্কর। 'পথে এবার নাম সাথী' অথবা 'নিগ্রো ভাই আমার পল রোবসন', যে কোন মিটিং সুরে সুরে মাতিয়ে দিতে পারে অর্ক। গোপাল বুঝতে পারে অর্ক কে প্রয়োজনে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অর্কও ঠিক এমনটাই চেয়েছিল।
ছাত্রদলই আগামীর কথা বলবে, আগামী বলতে পার্টির ভবিষ্যতের কথা। সেই সময় কলেজগুলো ছিল ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির কারখানা। ছাত্র সংগঠন ভাবতে শুরু করেছিল অর্ক কে ঘিরে সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের বিকাশ হোক। অর্কর গায়কীতে নাটকীয় প্রত্যয় ওকে এই সুযোগ এনে দিয়েছিল। একদিন হঠাৎ করে গোপাল এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রমেশ এর কাছে সুযোগ এসে যায় জমির বর্গাকরণ প্রত্যক্ষ করার। গোপাল সেক্রেটারি হিসেবে কলেজে জরুরী মিটিং ডাকে। মিটিং এ সিদ্ধান্ত হয় গোপাল আর রমেশ যাবে। সঙ্গে অর্ক, আরও দু একজন। গোপাল ভেবেছিলো যদি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে কলেজকে অংশ নিতে হয় তাহলে অর্ক একাই একশ। বিভিন্ন কলেজ থেকে ছাত্রফ্রন্টের অনেকেই আসবে। সেইখানে বেইজ্জতি হোক গোপাল এমনটা চায় না। যদিও অর্ক উড়ে এসে জুড়ে বসায় অনেকের মনোক্ষুন্ন হয়। কি আর করা যাবে, বিধিবাম। কেন যে সবার গলায় কাকের বদলে কোকিল বসে না?
গোপাল রমেশ এর মাধ্যমে অর্ককে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানায়। অর্কবাবু তো এক পায়ে খাড়া। গোপালেরও সঠিক ধারণা ছিল না কেন মাঠে যেতে হবে, ক্ষেতে মাঠে কেন কোর্ট বসে? যা হোক দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যায়। চুঁচুড়া থেকে বাসে করে ধনেখালি যেতে হবে, তারপর ভ্যানে বেলমুড়ি স্টেশন হয়ে ট্রেনে হাজিগড়। স্টেশনে অপেক্ষারত ছিলেন বিকাশ সমাদ্দার। ট্রেন থেকে নামতেই গোপালকে তিনি হাত নেড়ে ডাকেন। গোপাল ওনার পূর্ব পরিচিত। বিকাশকে অনুসরণ করে মোরামের লাল রাস্তা ধরে চলতে থাকা। নিস্তব্ধতা ভেঙে গোপাল বিকাশ বাবুকে জিজ্ঞেস করে, 'কমরেড, এখানে মানুষের মধ্যে কিরকম উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে? ' বিকাশবাবু শর্টকাট রাস্তা ধরতে আলে নেমে পড়েছেন, সমানে সমানে কথা বলা যাচ্ছে না। একটু হেসে বিকাশবাবু পেছনে তাকিয়ে বললেন একটু রোসও, আমরা প্রায় এসে গেছি অভিষ্ঠে। তারপর নিজের চোখকে সম্বল করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এমন এক কল পার্টি বার করেছে। জোতদার এমনিতেই চিতপটাং, খতমের প্রয়োজন হবে না। সমাদ্দার অঞ্চলের মাঝারি মাপের নেতা, বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি। বিকাশবাবুর কথা অর্ক শুনেছে দাদাদের কাছে। কিন্তু অর্ক আশা করেননি স্টেশনে এসে স্বয়ং বিকাশবাবু ওদের নিয়ে যাবে। রমেশের কাছে অর্ক জানতে পেরেছিল গোপালের মামা সিঙ্গুরের এমএলএ। অর্ক দুইয়ে দুইয়ে চার করতে পেরেছিল। আল ছেড়ে ওরা ফের মোরাম রাস্তায় উঠে পড়ে। কালভার্ট এর উপরে অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় কোর্ট বসেছে। চেয়ার টেবিল পাতা রয়েছে চারিদিকে। দু পাশে ধুধু মাঠ, মাঝে জমজমাট রাস্তা। বাদী বিবাদী সাক্ষী লোকজন নিয়ে সে এক জীবন্ত রঙ্গালয়।
ভূমি দপ্তরের আমলা বসে আছেন চেয়ারে,কোর্ট শুরু হওয়ার প্রস্তুতিতে হাঁকডাক চলেছে। প্রথম কেস উঠবে। টুপি পড়া সরকারি কর্মী হেঁকে চলেছেন 'প্রসাদ মুখার্জি হাজির, প্রসাদ মুখার্জি।' ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসেন প্রসাদ বাবু। আমিনের নির্দেশে জমির দলিল পড়চা জমা করতে হয় তাকে। কোর্ট বলে, 'আপনি যে প্রসাদ মুখার্জি কোন নমুনা পরিচয় পত্র আছে?' প্রসাদ বাবু রেশন কার্ড দেখালে কোর্ট জানায় এই প্রমাণ যথেষ্ট নয়। এই অঞ্চলে ইলেকট্রিসিটি এসেছে বছর তিন চার, এ খবর কোর্টের অজানা নয়। ইলেকট্রিক বিল সঙ্গে আছে কিনা জানতে চাওয়ায় প্রসাদ বাবু একজনকে বাড়ি থেকে ইলেকট্রিক বিল আনতে পাঠায়। সেই ফুরসতে জনতাকে উদ্দেশ্য করে কোর্ট জানতে চায় প্রসাদ বাবুর পরিচিতি সম্পর্কে তথ্য। মোহাম্মদ শামীম যিনি প্রসাদ মুখার্জির জমি চষেন, তিনি এগিয়ে এসে কোর্টকে জানান, 'হ্যাঁ, হুজুর ইনিই প্রসাদ মুখার্জি, আমি এনার জমিতে চাষ দিই।' কাগজ আসার আগেই প্রসাদ মুখার্জি কাগজে কলমে চিহ্নিত হয়ে যান। আমিনও ততক্ষণে খতিয়ান, দাগ, মৌজা বুঝে জমির পরিমাণ লিখে ফেলেন। আমিন চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেন- উপস্থিত জনতার কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে কে কে প্রসাদ বাবুর জমিতে চাষ দেন এবং কার কাছে কতটা জমি ভাগ চাষে দেওয়া আছে? শামীম হাত তোলে। আরো দুজন হাত তোলে যাদের নাম সবুজ দাস ও মহঃ আসিফ। শামীম জানায়, 'হুজুর এরা কেউ ওনার ভাগচাষী নয়। আমি এবং আমার পরিবার এই খতিয়ানে ওনার একমাত্র ভাগচাষী। মারমুখী হয়ে যায় সবুজ আর আসিফ। হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম ঘটে। কোর্ট, পুলিশের সহায়তা নিতে বাধ্য হয়। হট্টগোল থামলে কোর্ট বলে, 'শামীম তুমি যে ভাগচাষী তার প্রমাণ কী?' শামীম জানায় 'হুজুর, এই জমি আমরা বংশ পরম্পরায় চাষ করছি। কাগজে কলমে প্রমান দিতে পারব না। এই অঞ্চল লোকেরা জানে, ভজিয়ে নিন।' কোর্ট বলে, 'তোমার পরিচিত কোন সাক্ষী থাকলে জানাও।' শামীম একটু পেছু হটে, তখনও প্রসাদ মুখার্জির প্রতিপত্তি গ্রামে যথেষ্ট, কেউ বাধ্য না হলে সাক্ষী হতে চাইবে না। আবার দীর্ঘদিন গ্রামের মানুষজন প্রসাদ বাবুকে মনিব মেনে এসেছে, গোলাম মালিকের এই সম্পর্ক ভেঙে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। পার্টির বেড়ে ওঠা প্রতিপত্তি, না খচ্চর প্রসাদের লাল চোখ, কোন দিকে যাবে সাধারণ মানুষ? প্রসাদ ততক্ষনে ইলেকট্রিক বিলের কপি জমা করেছে। কেউ যখন রা কাড়ছে না তখন প্রসাদের চোখের ইশারায় আসিফ বলে, ' দেখছেন হুজুর, কেউ ওর হয়ে সাক্ষী দেওয়ার নেই।' থম মেরে গেছে জনতা। এমন সময় কোর্টের অলক্ষ্যে বিকাশকে নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করতে হয়। তার ইঙ্গিতে পার্টিকর্মী বাবুল এনে হাজির করেছে শাহিদুলকে। শাহিদুল কে দেখতে পেয়ে প্রাণ ফিরে পায় শামীম। সে বলে, 'হুজুর, শাহিদুল আমার মাঠের ধান প্রসাদ মুখার্জির বাড়ি নিয়ে যায়, ও ভ্যান চালায়।' যেহেতু পার্টির লোক ওকে হাজির করেছে বুকে সাহস নিয়ে শাহিদুল বলে, 'হুজুর, শামীম এই জমি চাষ করে। আমি ফি বছর জমির ধান প্রসাদ কর্তার কাছে পৌঁছে দিই। সাক্ষ্য রেকর্ডের হয়।' ধান নিয়ে প্রসাদ বাবু কোন কাগজ দেন?' উত্তরে শামীম জানায় `না হুজুর।` প্রসাদ বলে, 'এই শালা বেইমান, তোকে কাগজ দিই না?' সবাই জানে প্রসাদ কাঁচা কাগজও কাউকে দেয়না। প্রসাদ সরাসরি আড়তে মাল চালান করে। কোর্ট শাহিদুলকে জিজ্ঞেস করে, তুমি বলতে পারবে আনুমানিক কত ধান যায় মাঠ থেকে?' শহিদুল বলে, 'দুই কুড়ি ভ্যান হবে হুজুর।' 'তুমি কি একাই তোল, না তোমার সাথে কেউ থাকে?` উত্তর আসে মহিদুলের কাছ থেকে। সে বলে, 'হুজুর শহিদুল মিয়া আমার আব্বা। আমি যাই ওনার সঙ্গে।' কোর্ট উপস্থিত জনতার কাছ থেকে রেকর্ড করিয়ে নেয় মহিদুলের পরিচয়। 'মহিদুল দুই কুড়ি মানে কি?' এই প্রশ্নের উত্তরে মহিদুল বলে, 'ভ্যানে বারোটা বস্তা ধরে হুজুর, ষাঠ কেজি ওজন বস্তা পিছু। দুই কুড়ি মানে চল্লিশ।' মইদুল জোয়ান ছেলে সে সাহস করে বলে ফেলে, 'স্যার এতো গেল আমনের কথা। আলু চাষ হয় শীতে, বিঘে প্রতি আশি প্যাকেট। অর্ধেক আলু কর্তা মশায়ের ঘরে যায়।' প্রসাদ চিৎকার করে বলে, 'শালা বিধর্মী, তুই কুলীন ব্রাহ্মণ এর পেছনে কাঠি করছিস! আমি কোর্টের কাছে জানাতে চাই শাহিদুল যে ভ্যান চালায় সেই ভ্যানও আমার টাকায় কেনা।' মহিদুল কোর্টের দিকে তাকিয়ে বলে, 'না হুজুর। চার টাকা মাসিক সুদে কর্তা টাকা ধার দিয়েছিলেন। এই শামীম মিঁয়া না থাকলে ভ্যানও কর্তার কাছে জমা দিতে হতো। আর কর্তা যে আসিফ মিঁয়াকে ভাগচাষী সাজিয়ে এনেছে সেও তো মোছলমান।' প্রসাদ মুখার্জী চুপ মেরে যায়। সেই সুযোগে কোর্ট বলে, ‘ধর্মীয় ব্যাপারে কোর্টের এক্তিয়ার নেই আর প্রসাদ বাবু ধর্ম তুলে কথা বলবেন না।` সবুজ হঠাৎ করেই চেঁচিয়ে উঠে বলে, 'স্যার, আমি যে প্রসাদ বাবুর কাছে ধান জমা দেই তার কাগজ আমার কাছে আছে।' কোর্ট প্রসাদ বাবুর সই করা কাগজ জমা নিয়ে সবুজকে বলে- তোমার কাছে বীজ সার কীটনাশক কেনার রসিদ আছে নিশ্চয়, সেগুলো জমা করো। কোর্ট জমি ফলন হিসাব করে কীটনাশক সারের ব্যবহার খতিয়ে দেখবে।' প্রসাদ মুখার্জীর পরিকল্পনা চৌপাট হয়ে যায়। কোর্ট তখন শামীমকে বলে, 'তোমার কাছে রশিদ থাকলে জমা করো।' লুঙ্গির খোঁটা থেকে গুটিয়ে যাওয়া কাগজ বার করে শামীম কোর্টে জমা করলে কোর্ট বলে `কত ফসলা জমি তোমার?` `হুজুর ধান ছাড়া আলু আর সবজি ফলাই। বিঘায় আট নয় কুইন্টাল ধান হয়।' আমলা বলে, 'যা জানতে চেয়েছি তার চেয়ে একটাও বেশি কথা বলবে না। এখন বল প্রসাদ মুখার্জি কে কত ধান দিতে হয়?' শামীম বলে, 'আধিয়ারা', ওর কথা কেড়ে নিয়ে প্রসাদ বলে, 'মিথ্যা কথা স্যার, ও মিথ্যা কথা বলছে।' কোর্ট বলে কিন্তু ভ্যান এর হিসাব যা শহিদুল আর মহিদুল দিয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে জমি হিসাবে মোটামুটি ফলনের অর্ধেক আপনার ঘরে যাচ্ছে। অথচ জমি সার কীটনাশকের এক পয়সাও আপনি ব্যায় করেন নি।' চোঙা ফুকে ঘোষণা হয় - লাগোয়া জমিতে চাষ করা মানুষ যদি কেউ থাকেন হাত তুলুন। আতিফুর এগিয়ে এলে আমিন তাকে ডেকে নেয় নিজের কাছে। আতিফুর পার্টি কমরেড, তার ভয়ডর কম। আতিফুরের পরিচয় উপস্থিত মানুষের কাছ থেকে জেনে নেওয়া হয়। আতিফুর একটু দীর্ঘ বক্তব্য রাখে। সে প্রমাণ করে দেয় যে শহিদুল, মহিদুল, এবং শামীম যা যা বলেছে সব ঠিক। এক আধপাগল ধান কুড়িয়ে খাওয়া মানুষ, শিবু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোর্টে এসে বলে, ’শহিদুল, শামীম আমার মা বাপ হুজুর। ওই হারামজাদা প্রসাদ আমাকে ধান কুড়াতে দিত না। জ্ঞাতি হয়ে ঠকিয়ে আমার সর্বস্ব লুঠ করেছিল।‘ অর্ক ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে গাঁয়ের একজন কে জিগেস করে জানে। প্রসাদের এক চামচা এগিয়ে গিয়ে শিবুর কলার ধরে। অকস্মাৎ এক পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব আলুথালু মহিলা ঝেঁটা হাতে প্রসাদ কে তাড়া করে। আতিফুর কোর্টের দিকে তাকিয়ে বলে, শিবুদার স্ত্রী। শিবুদার একটা কথাও মিথ্যা নয়। শিবুদার জমি পুকুর আত্মসাৎ করে প্রসাদবাবু হজম করে দিয়েছে। বচসা ততক্ষণে ধস্তাধস্তিতে পরিণত হয়েছে। কোর্ট পুলিশকে আদেশ দেয় ঝামেলা মেটাতে। আমিন ফিসফিস করে জজকে কিছু বলে। জজসাহেব ঘোষণা করে শিবুর সাক্ষ্য গ্রহন করা হবে। বিপদ দেখে প্রসাদ বাধ সাধে। প্রসাদ বলে, ’কোর্ট কি ডাহা পাগলের কথাও শোনে!’ কোর্ট জানায়- যে কেউ সাক্ষ্য দিতে পারে, কোর্টের সাবুদ চাই। বিপুল হর্ষে আমজনতা কোর্টের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। প্রসাদ মাঠ ছেড়ে হাঁটা দেয়। সারাদিন পরিশ্রম শেষে কোর্ট শেষপর্যন্ত আইনগত কাগজ তৈরি করে শামীমকে প্রসাদ মুখার্জীর বর্গাদার হিসেবে ঘোষণা করে।
অর্কর জীবনে এ এক অবাক করা অভিজ্ঞতা, একেই গণতন্ত্র বলা উচিত। ভূমিহীন কৃষকের সহজ মুক্তির অহিংস পথ অনুধাবন করতে পেরে অর্কর কিরকম ঘোর লেগে গেছে। গোপাল রমেশকে ইঙ্গিতে বোঝায় আত্মস্থ অর্কর মানসিক জগতের অবস্থান। রমেশ অর্কর পিঠে ছোট্ট একটা চাপড় মেরে জিজ্ঞেস করে, `কমরেড কিছু বুঝলে?' অর্ক কিছু বলতে পারেনা। অব্যক্ত আনন্দ দিয়ে নিজের বুকে বিঁধে থাকা খতমের রাজনীতির ঐতিহাসিক আবেশ সে মুছে ফেলতে চায়। গোপাল এমনই ভাব দেখায় যেন অর্ক একটা বাচ্চা ছেলে, ওকে ওরা হাত ধরে জীবনে প্রথম সার্কাস দেখাতে এনেছে। গোপাল বলে, 'দেখলি? বিপ্লব আমাশার পায়খানা নয় যে পেটে মোচড় দিলেই হবে। ধৈর্য ধরে সময় নিয়ে অপেক্ষা, এবং প্রয়োগে নিপুণতা, এই দুয়ের সমন্বয় হল বিপ্লব।' অর্ক বুঝতে পারে এই ঠেস তাকে উদ্দেশ্য করে। অর্কর মনে হয় ওর পরিবারের সাম্প্রতিক অতীত সম্পর্কে গোপালদা ও পার্টির নিশ্চিত জানকারি আছে। এই ঠেস অর্ক গায়ে মাখে না কারণ সত্যিই ওর মন আজ পূর্ণ কলস, পূর্ণ ঘড়া শব্দহীন, অকারণ বাজে না।
বাড়ি ফিরে এসে বাবাকে অর্ক বলে - কি দেখলাম, "জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না”। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কৃষ্ণ। ছেলের হৃদয়পুরে অভিমানের বাতাবরণ দেখতে পায় অভিজ্ঞ চোখ। সহানুভূতির সাথে কৃষ্ণ খোঁজ পেতে চায় সমুদ্র মন্থনে অর্কর পাওয়া মনি-মুক্তার হদিশ। উত্তর না দিয়ে অর্ক উল্টে প্রশ্ন করে বসে, 'বাবা, বলতো তোমরা কেন পার্টি ভাঙ্গলে, একবারও মনে হয়নি তোমাদের ইমম্যাচিউরিটি হাজারো প্রাণ কেড়ে নিতে পারে? অস্থির করে দিতে পারে সমগ্র সমাজটাকে।' কৃষ্ণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, 'জাস্টিফাই কর নিজেকে।' আবেগমথিত অর্ক সবটা জানায়। সঙ্গে এও জানায় এস.এফ.আই. যোগদান করে ও কোন ভুল করেনি। কৃষ্ণ বলে, 'আমি তো তোকে কোন সংগঠনে যোগদান করতে বারণ করিনি। তোর প্রশ্ন কি আমার কাছে না নিজের কাছে?' অর্ক বলে, 'তোমার কী কোনো উত্তর দেওয়ার আছে?' কৃষ্ণ বুঝতে পারে আজ আর অর্কর সাথে কথা বলে লাভ নেই। পথ চলার অভিজ্ঞতায় বুবু নিজেকে গড়ে তুলুক।
চোদ্দ
হাবা কাহিনী
গ্রামে বেশ কয়েকদিন হলো কিছু নতুন ছেলেছোকরার আমদানি হয়েছে। আচরণে, বেশভূষায় শিক্ষিত-মার্জিত। গ্রামের লোকজন ওদের সম্পর্কে এমনই আলোচনা করে। আগন্তুকেরা পাকা বাড়ির পথ মাড়ায় না, বাগদি পাড়ার ভেতরেই ঘোরাফেরা করে। অনেকের মুখে শোনা যায়, নগর প্রান্তে দূর জামালপুর গ্রামেও ওদের যাতায়াত আছে। এইসব শহুরে ছোঁড়ার দল দলিত, দিনমজুর মানুষদের সঙ্গে থাকা অভ্যাস করছে। বাগদিদের সঙ্গে ওদের একমাত্র মিল বিড়ির টানে। হারু, নেপু যেমন ওষ্টদেশ সূচালো করে বিডিতে চুমুক দেয়, সেইখানেটিতে ওরা বাগদিদের সাথে একাকার। শহরে মানুষের অনেকে গ্রামে মচ্ছব করতে আসে, ওরা ঠিক তেমন নয়। মচ্ছব চাইলে শহরে হাজারো উপাদান আছে, গ্রামে আসবে কেন? গ্রামের সাধারন মানুষদের মধ্যে ওদের সম্পর্কে এরকম বহু গুঞ্জন শোনা যায়। অর্থবান জনে বলতো বাগদি পাড়ায় ওরা এসেছে গরিবির সুযোগ নিয়ে মেয়েছেলে সঙ্গ করতে। টেরিকাটা, শহরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত গ্রামে এলে মানুষ বড় একটা বিশ্বাস করেনা। নৃপেনের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটেছিল। নৃপেন মাস্টার গ্রামে এসে মজুমদারের ফোঁড়ে বনে গেছিল। অথচ গ্রাম্য আতিথেয়তার অভ্যাসে প্রথম মোলাকাতেই মানুষ এদের গ্রহণ করেছিল অবিশ্বাস করে নি। কিন্তু এক আদ্দিন ঘরের ভাত খাইয়ে কাউকে পোষা আর দীর্ঘদিন ধরে থাকতে দেওয়ার বা থাকার মধ্যে ফারাক আছে। অসুবিধে মাথায় করে পোলাপানগুলো গ্রামে থেকে গেল। তেতাল্লিশ দুর্ভিক্ষের আগের বছর পোড়া কপাল নিয়ে হাবার জন্ম। মেপে দেখেলে হাবা এখন ছাব্বিশ সাতাশ। শহুরে ছোকরাদের সঙ্গে তার বয়সের ফারাক খুব বেশী হলে পাঁচ ছয় বছর, তাই বন্ধুত্ব মাপে গভীরতা পেয়ে গেল। মাঝে মধ্যে ওরা মাছ ধরতে যায় হাবার সপ্তডিঙা ভাসিয়ে। গভীর মেশামেশির সুযোগে হাবা গ্রামের মানুষজনের খবর দেয় ওদের কাছে। বিশেষ করে কয়েক ঘর রক্তচোষার হাঁড়ির খবর। মজুমদার, নৃপেন,টেনিয়া নয়নের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছোঁড়াগুলোর কাছে ছবির মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রমথ বাবু সেইজন যে অভয় মাস্টারের পর হাবাকে মান দেয়। এই ঘটনা জানাতেও হাবা ভোলে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একদিন হাবা ওদের বলছিল,'জান, শুধু আমি ছিলাম না সেদিন। গ্রামের লোকেরা সবাই খুব মজা করেছিল। অভয় মাস্টারের মেয়ে খুকির মুখেভাতে বাগদি পাড়ায় মানুষের জন্য চাপা কল বসেছিল। গ্রামের সব্বাই সেদিন এক হাঁড়িতে চালডাল ফুটিয়ে পুকুরপাড়ে পাতপেড়ে খেয়েছিল।‘ হাবা বোকার হদ্দ, নিজের বোকামির জন্য নেপুদাদের কথা না শুনে অনুরোধ ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল। ছেলেরা অবাক হয়ে হাবাকে দেখছিল। হাবার কল্পনায় টাইম মেশিনে চড়ে ফিরে গিয়েছিল ওরা সেই দিনটিতে। কল্পনা প্রবন হাবাকে গ্রামের কোন মানুষ চিনতে না পারলেও ছেলে ছোকড়ার দল ওকে ঠিক চিনেছিল। গ্রামে যে মানুষের পরিচয় হাবা, সেই মানুষ এই ছেলেগুলোর কাছে হরবোলা। সত্যজিতের চোখের জিজ্ঞাসু প্রশ্নের আন্দাজ পেয়ে, হাবা বলে চলে, 'আমি গ্রামের বাইরে থেকে আসা লেখাপড়া জানা লোকদের একদম বিশ্বাস করি না। এমনকি তোমাদেরও প্রথমে অবিশ্বাস করেছিলাম। লেখাপড়া জানা লোক মানুষ ঠকায়, মাছ কিনে পয়সা দিতে চায় না। আমার ছেলে না খেতে পেয়ে মরছে, আর যাদের আছে তারাই বেশি করে ঠকাচ্ছে। শালারা খুব হারামি। পরে বুঝেছিলাম অভয় মাস্টার অমন নয়। খুকির মুখে-ভাতের ভোজে যোগ না দেওয়ার জন্য আমার এখনও আপশোস হয়। কিন্তু লুকিয়ে দু'চারজনের সঙ্গে পচুই খেতে ছাড়িনি। সে অবশ্য ভোজের খাওয়া ছিল না। সেই ছোট্ট খুকি, বাতাসী যার নাম, সে কিছুদিন আগে আমার ডিঙ্গিতে চড়ে দূর বাঁধে, নদীর কিনারায় গেছিল। কি সুন্দর গান গায়। জলে আকাশের কিলবিল দেখে অবাক হয়ে গেছিল বাতাসী। অমনটা আমি রোজ দেখি, পচুই খেয়ে চুপ করে বসে থাকা ঝিম ধরা নেশার মতো। ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না একদম।' অশিক্ষিত এই মানুষটার প্রলাপ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল ছোকড়ার দল। হাবা যে হাবা নয়, ওর বোধের ঝুলি পূর্ণ, তা বুঝতে অসুবিধে হয়না ছেলেদের।
পার্টির মধ্যে ভাঙন ধরেছে, পার্টির দুই দলে বিভক্ত। লড়াইয়ের পক্ষে থেকে নতুন মানুষ ‘গ্রাম দিয়ে শহর’,ঘেরার পরিকল্পনায় হাজির গ্রামে। শহরের স্কুল-কলেজ ছেড়ে ছেলেমেয়ের দল গ্রামে আসছে এ খবর অভয়ের জানা ছিল। কিন্তু বাস্তবে নিজের গ্রামে তাদের মুখোমুখি হতে হবে এ সত্য বুঝতে পারেনি সে। গ্রামে এখনো কোনো অঘটন ঘটেনি। সীমাই প্রথম অভয়কে অবগত করেছিল। যদিও অজানা আশঙ্কায় পার্টি অফিস গুলো থমথম করছিল। বেশ কিছুদিন ধরে সীমা অভয়কে বলে আসছিল, নিজেকে দিয়ে পার্টির সবাইকে বিচার না করতে। সবাই নিজের নিজের অঞ্চলে রাজা, আবার রাজায় রাজায় যুদ্ধও আছে। মানুষের দাবি আন্দোলন থেকে বিশ্বাস অর্জন করে এমন ঠান্ডা মেরে যাওয়া উচিত হচ্ছে না। এমন চলতে থাকলে আজ না হোক অদুরে পার্টিকে অন্য শ্রেণির সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। এদের মধ্যে মধ্যবিত্ত ধান্দাবাজ তো থাকবেই, রক্তচোষা বড়লোকও দলে এসে জুটবে। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচল অভয়ের ছিল। সংসার ত্যাগ দিয়ে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার ইচ্ছে বা তাগিদ কোনটাই তার হয়নি। কারণ স্বভাবগত ভাবে অভয় জেতা বাজী লড়তে ভালোবাসে। সীমার কথায় আহত অভয় মনের ভাব লুকিয়ে রেখে হাসি মুখে বলে, 'লক্ষ্য রাখিস ওদের গতিবিধির ওপর, গ্রামের পক্ষে ক্ষতিকারক কিছু ঘটলে জানতে হবেতো।' সীমার উত্তরে অভয় জানতে পারে চালচলন, স্বভাবে ওরা মাটির খুব কাছাকাছি। ওরা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামে, মানুষের অন্তরে। গ্রামকে জানতে চাইলে বুঝতে হবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গুলোর বিন্যাস। জমিদার, মহাজন, চাষী ও দিনমজুরদের সামাজিক সম্পর্ক এবং তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। অভয় কে ওরা চেনে ভালো মানুষ হিসাবে। অভয় বুঝতে পারেনা এভাবে চটজলদি ওরা এত খবর পাচ্ছে কি করে? গ্রামকে জানতে তার নিজের এত সময় লেগেছে, অথচ..। কোনরকম চটজলদি ভাবনা বা কর্মফলের উপর কোনদিনই বিশ্বাস ছিল না অভয়ের। সীমা বুঝতে পারে না সত্যিই দাদাকে ও কতোটা ভাবাতে পারল। মজুমদার গোষ্ঠীও থেমে নেই। ভয় জমে বরফ হয়ে গেলে প্রয়োজনে গলবে না, ওদের বুকে চেপে বসবে। মজুমদার দ্বিমুখী শক্তির প্রতিদ্বন্দিতায় কতটা কাবিল তা নিজে মেপে নিতে চাইছিল। অভয়কে অস্থিত্বহীন করে দিতে পারলে এ বাজি ওর জেতা হয়ে যাবে। মজুমদারের বলে বলিয়ান রতনের গ্রামে দুই পুরুষের তেজারতি কারবার। সমগ্র পালসিট অঞ্চলে রতনের টাকা খাটে। টাকা উদ্ধারের দায়িত্ব মজুমদারের পোষা গুন্ডাদের, মাস মাইনে আসে রতন সাহুর ঘর থেকে। পরান বাগদির ঘর ছাওয়ার জন্য দুইশত পঞ্চাশ টাকা ধার নিয়েছিল রতন যা নাকি সুদে-মূলে তিন সহস্র দু'বছরে। সুদের দেড় হাজার টাকা রতনের পকেটে ঢুকেছে ইতিমধ্যে। রতন এখন ফসলের অর্ধেক চাইছে। পরানের নিজের জমি নয়, চুক্তি অনুযায়ী ধানের অর্ধেক জমির মালিককে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক রতন নিলে পরান খাবে কি? এবছর উদ্বৃত্ত ধান ফলেছে। উৎপাদনের আধাআধি যদি মেরে দেওয়া যায় মজুতদারি করা যাবে। বর্ধমানের একটা রাইস মিলে রতনের অংশ আছে। শুধু পরানের সঙ্গে নয় এমন অনেকের সাথেই ও একই পাশার দান চেলেছে। এই সমস্ত ভাগচাষী দল কেউই অভয়ের অঞ্চলের নয়। রতন বেশ কয়েক বছর অভয়ের গ্রামের টাকা খাটায় না। এতে ওই অঞ্চলের চাষীদের অসুবিধা হলেও তারা য়ুঝে যাচ্ছে কোনোমতে। অভয় পার্টির ওপর মহলের আদেশে পাশের অঞ্চল গুলোর দায়িত্বে থাকা কমরেডদের সাথে কথা বলে মীমাংসার উদ্যোগ নেয়। কোথাও কোথাও আলোচনা ফলপ্রসূ হয়, উৎপাদিত ফসলের পঁচিশ শতাংশ দিতে হবে যদি সার কীটনাশক মালিকের না হয়। ঘোষিত সুদের অর্ধেক হারে ঋণ শোধ করার সুত্র বের হয়। যা হোক শেষমেশ চাষিরা কিছু অনুদান পেল, বাঘের সঙ্গে বিবাদ করে কি জঙ্গলে বাস করা যায়। মজুমদারের টেনিয়ারা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করতে থাকে ওদের মনিবের মহানুভবতার কাহিনী। গ্রামে আগত ছোকরার দল সব খবর পেয়ে যায়। বাজারে একদিন হাবা কাকার সঙ্গে খুকির দেখা হয়। হাবা কাকা গর্ব করে বলে, 'জানিস রে মা,আমার সাথে একদল শহরে থাকা রাজপুত্রদের খুব ভাব হয়েছে। ওরা আমাদের গ্রামে এসে উঠেছে। শুধু আমাদের সুখ দুঃখের খবর নিয়ে ওদের শান্তি নেই, আমাদের সঙ্গে কাজ করে, থাকে খায়। ওদের মধ্যে সত্যজিৎ দাদাবাবু ঠিক যেন যীশুখেষ্ট। তোর সঙ্গে যা মানাবে না।' এই প্রথম বাতাসী হাবার ওপর রুষ্টু হয়। ওর মনে হয় হাবা কাকা যেন ওর জীবনের ঠিকা নিয়েছে। এতটা অধিকারবোধ বোধহয় কারও থাকা উচিত নয়। প্রমথ দাদু একদিন এমনই বলছিলেন, ওকে আশ্রয় দিলে গ্রাস করতে চাইবে। বাতাসীকে অন্যমনস্ক দেখে হাবা বলে, 'আরে মা আমি তো তোর সঙ্গে ফাজলামি করছিলাম।' ভাবনার তাল কেটে গেলে বাতাসী জিজ্ঞেস করে, 'ওরা এখানে কেন এসেছে? বাড়িতেও ওদের নিয়ে আলোচনা চলে।’ হাবা, হঠাৎ করে কি উত্তর দেবে ভেবে পায়না। কিছু তো বলতে হবে, হাবা তাই বুদ্ধি করে বলে, 'বেড়াতে বোধহয়, কয়েকদিন থাকবে, খাবে, নতুন জায়গা দেখে চলে যাবে।' বাতাসী বুঝতে পারে হাবা কাকা কিছু লুকাচ্ছে। যদি ঘুরতে এসে থাকে তাহলে গ্রাম্য জীবনে কেন নিজেদের জড়াবে। এদের জানতে বাতাসীও আগ্রহী, তাই ইয়ার্কি মেরে বলে, 'দেখিও তো কাকা কোলকাতার যীশুকে। হাবা বলে, 'বিকেলবেলা বাঁধের কালভার্ট পেরলেই ওদের দেখা পাবে। একদিন বেড়াতে বেড়াতে চলে এসো।'
নিতান্ত হেলাচ্ছেদ্যায়, স্কুল ছুটির পর হাঁটতে হাঁটতে লাল রাস্তার ধার ধরে কালভার্টে পৌঁছে যায় বাতাসী।একটু দূর থেকেই তিনজনের অস্তিত্ব বাতাসী টের পেয়েছিল। কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই বাতাসী এগিয়ে চলে। হাবা কাকাকে এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। হাবাও ওকে দেখতে পেয়েছে। বাতাসীর দিকে আঙুল তুলে হাবা কিছু বলতে থাকে। বাতাসী তখন মোরাম রাস্তায় ঢাল বেয়ে বাঁধের উপরে উঠছে। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সত্যজিৎ মাথা নিচু করে আছে। বিশেষ কাজে ওর গ্রামে আসা,অন্য কিছুকে সে তেমন গুরুত্ব দিতে চায় না। বাতাসী ওদের কাছাকাছি চলে এসেছে। হাবা কি করবে, কেমনভাবে বাতাসীর সাথে ওদের পরিচয় করিয়ে দেবে ভেবে কুল কিনারা পায়না। বাতাসী কাছে আসার সাথে সাথে বোকার মতো হাবা বলে বসে, 'খুকি, এই দেখ এরা কোলকাতা থেকে এসেছে, তোমার গল্প ওদের বলেছি।' একটু শরমের রঙ লাগলেও নিমেষে তা লুকিয়ে ফেলে বাতাসী বলে,'আমার আবার কি কথা, কী যে বলো না তুমি?' 'ঐ যে ডিঙি নৌকায় গাইলে - নিশ্বাস দাও পুরে।' হাবা কোনো আড়াল রাখতে দেয় না। সত্যি সত্যিই এবার লজ্জার আবীর ছড়িয়ে পড়ে বাতাসীর শরীর জুড়ে। হাবা না বুঝে হি হি হি করে হাসে। হাসির শব্দে মুখ তুলে তাকায় সত্যজিৎ। সরাসরি কালো ভ্রমর চোখে বন্দী হয় সত্যজিতের যুগল আঁখি। নির্নিমেষ, সময় বয়ে যায়। কারও পলক পড়ে না। জীবনের প্রথম একটা রাত নির্ঘুম স্বপ্নময় কাটে বাতাসীর। কোন স্বপ্নকে সত্যজিৎ প্রাধান্য দিল কিনা সেই জানে। বাতাসীর মনের গহীনে বাতাস ফুরফুর করে বয়ে যায়। প্রায় দিন বিকেলে বাঁধের কালভার্টের অমোঘ আকর্ষণে বাতাসী ছুটে যায়। কখনো চোখের পরশ দিয়ে ছুঁয়ে আসে তাকে কখনো হারায়।
স্কুল থেকে বাঁধ হয়ে দেরি করে ফেরা, প্রমথ মাস্টারের বকুনি, বেশ চলছিল দিনগুলো। হঠাৎ ঝড়ের এক ধাক্কায় লন্ডভন্ড হয়ে যায় সবকিছু। স্বপ্নের জাল ছিঁড়ে কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ায় বাতাসী আর বাগদী পাড়া। শুধু বাগদী পাড়া বললে ভুল হবে। পাশের গ্রাম ডুবনা, কাঁহার পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে ভয়ের হিমেল স্রোত। খালপাড়ে পাওয়া গেছে মজুমদারের মুণ্ডহীন দেহ। রতন সাহু ভেসে উঠেছে বাঁধের দরজায়, জোড়া খুন এক রাতে। কেউ বুঝতে পারে না কি করে সম্ভব হল এমন অসম্ভব কান্ড। উৎসাহী গ্রামের মানুষজন হাজির হয় ঘটনাস্থলে। মানুষের মনে একসাথে উৎসব মুখরতা, বিষ্ময় এবং অশুভ উদ্বেগের প্রবাহমান ত্রিবেণী ধারা। পুলিশ, কংগ্রেসী গুন্ডা আর খোঁচড়ে ভরে যায় গ্রাম। বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালাতে শুরু করেছে পুলিশ। সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে উঠতি ছেলেছোকড়াদের নির্বিচারে তুলে নিয়ে গিয়ে থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ করে। গ্রামে এমন কোন বাড়ি ছিল না যেখানে পুলিশ যায় নি। রক্তচোষার দল আর তাদের পল্টনেরা ভয় পেয়ে আরো বেশি আঁকড়ে ধরেছে পুলিশকে। পুলিশও সুযোগ নিতে ব্যবহার করতে থাকে এই সব মানুষজনকে। ইচ্ছে না থাকলেও কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ে খোঁচড় বৃত্তিতে। অদ্ভুত জটিল হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। 'একে রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর' হয়ে যোগ দিয়েছে ই.এফ.আর। চলছে মার্চপাস্ট যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বলতে যা বোঝায়। ছবির মত সুন্দর পাশাপাশি গ্রামগুলোয় দিনে রাতের নীরবতা। পার্টি অফিস গুলো ঝাঁপ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। কারণ. ই এফ.আর কাউকে বাদ দিচ্ছে না। সুযোগ বুঝে অস্তিত্ব বজায় রাখতে পার্টি কমরেডরা কখনো কখনো ঝাঁপ খুলছে সেখানে আলোচনার বিষয় খুবই নির্দ্দিষ্ট এমন হঠকারিতার মূল্য চোকাতে হবে শ্রমজীবী জণগনকে। ভেতরে ভেতরে প্রতিরোধের প্রস্তুতি চলেছে। পার্টির নিচুতলার কর্মীরা গুলিয়ে ফেলেছে কাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। চির শত্রুদের যারা নিকেশ করেছে যুদ্ধ কি শেষমেশ তাদের বিরুদ্ধে? মানে জমিদার, জোতদার বাদ দিয়ে এখন এই ছেলে ছোকড়াদের বিরুদ্ধে লড়াই! অভয়ের হিসেব নিকেশও সব তালগোল পাকিয়ে গেছে। আশু কর্তব্যের দিশা না পেয়ে অভয় ভরসা করতে শুরু করেছে উচ্চ নেতৃত্বকে। হাবা বেশ কিছুদিন হল ডিঙ্গি নৌকায় কোন সকালে ভেসে যায় আর সন্ধ্যায় মাছ নিয়ে ফেরে। হাবার কাছ থেকে সস্তায় বা বিনে পয়সায় মাছ নেওয়া লোকজন হাবাকে আর খুঁজে পায়না অথবা পুলিশের অনুশাসনে ত্রস্ত মানুষজন নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। হাবার পরিবারের রসনায় মাছের যোগান বর্তমানে বেড়েছে। যদিও কোন সন্ধ্যা রাত্তিরে জুটবে দুপুরের আহার কেউ জানেনা। বিরক্ত হয়ে বউ বলে, 'তুমি সাত সকালে বেরিয়ে সারাদিন কি করো ছোঁড়াগুলোর সাথে? আড্ডাবাজি দিনকে দিন বেড়ে যাচ্ছে। আমার হয়েছে মরন। সারাদিন মাছ ধরলে মাছ বেচবে কখন?' হাবা বলে,'এখন আর মাছ বেচবো না, পেটপুরে খাব।' 'বলি পয়সা না থাকলে চাল, তেল, নুন, লঙ্কা জুটবে কোথা থেকে?' হাবা চুপ করে থাকে কিছুক্ষন তারপর বলে,'গিন্নি তুমি,আশেপাশে একটু মাছ বেচতে যাবে আর আমি চুলা ধরিয়ে রাখবো।' বউ এমন কথা কোনকালে শোনেনি। হতবাক হয়ে বউ জিজ্ঞেস করে 'তোমার কি হয়েছে বলোতো?' হাবা কোনো উত্তর করে না। বউয়ের কঠিন চোখের ভৎসনায় হাবা বলে ওঠে, 'ছেলেগুলো নেই তাই বাঁধের জলে সারাদিন ভেসে থাকি।' 'আশ্চর্য, ওরা গেল কোন চুলোয়?' এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে ফেলা দুপুরের থুড়ি রাতের খ্যাঁটনের যোগান দিতে গেলেও মনের কোণে একটা খিঁচ থেকেই যায়। মজুমদার আর রতন খুন হওয়ায় আর একজন খুব খুশি হয়েছিল, সে সীমা। অভয়ের কাছে ওর ভালো লাগার খবর চেপে রাখতে না পেরে সে ঠারেঠোরে দাদাকে বুঝিয়ে দেয়, আমরা শুধু 'নিপাত যাক নিপাত যাক' শ্লোগান ঝাড়ি আর ওরা শ্রেফ নিকেশ করে দিল। পার্টিকর্মী নিম্নবর্গের মানুষ জন খুব খুশি হয়েছিল এই অ্যাকশনে। উচ্চ মহল থেকে নির্দেশ আসছিল,এ হঠকারিতা ভুল প্রয়োগ কৌশল। এর ফলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন পিছু হটবে। অভয়ের মুখনিঃসৃত বাণী শুনে সীমা বলে, 'তুমিও পাখি পড়ানো মন্ত্র কপচাবে আমি এমনটা আশা করেনি।' অভয়ও আশা করেনি সীমার কাছ থেকে এমন কথা শুনতে হবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভয় বলে, ‘ভুলে যাস না আমি তোকে তিলে তিলে গড়েছি’।
বেশ কিছুদিন,বাতাসী হাবা কাকার সাক্ষাৎ পাচ্ছেনা। একদিন বিকেল বিকেল ওর বাড়ি যায় বাতাসী। মনে ছিল সত্যজিতের খোঁজ পাওয়ার বাসনা। হাবার বৌ ফেলা, মাস্টারের মেয়েকে আদর করে ঘরে বসায়। কিছুক্ষণের কথাবার্তায় বাতাসী বুঝতে পারে হাবা কাকা ফিরতে সন্ধ্যা পার করে দেবে। গ্রামে ই.এফ.আর টহল দিচ্ছে তাই দেরি করতে চায়না বাতাসী। ফেরার আগে লজ্জার মাথা খেয়ে কাকিমাকে জিজ্ঞেস করে ফেলে বাতাসী, 'কাকা কি শহুরে ছেলেগুলোর সাথে আড্ডা মারছে, ফিরতে দেরী হবে? 'কাকিমা জানায় ওরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। পালিয়েছে কথাটা বাতাসীকে ধাক্কা দেয়। সে জিজ্ঞেস করে 'পালিয়েছে?' পালানো কথাটার ব্যঞ্জনা বাতাসীর বুকে বাজতে থাকে। অব্যক্ত যন্ত্রনা নিয়ে বাতাসী বাড়ির পথে হাঁটা দেয়। হাবা বাড়ি ফিরে এসে শোনে খুকি এসেছিল। খুকির সেদিনকার দৃষ্টি সবার মনে আছে। হাবা কষ্ট পায় খুকির কথা ভেবে। প্রথম প্রেম হারানোর যন্ত্রণা হাবার নিজের জীবনে ফিরে ফিরে বাজে। হাবা মনে ভাবে ওরা নিশ্চয়ই একদিন ফিরে আসবে। অন্তত খুকির জন্য ফেরা উচিত। হাবার বাড়ির দিকটা গ্রামের শেষ প্রান্তে হওয়ায় ভদ্রলোকেরা এ পথ মাড়ায় না। বাতাসীকে ওই দিকে যেতে দেখে প্রমথ বাবুর বুঝতে অসুবিধে হয়নি বাতাসী আজ হাবার বাড়ি যাচ্ছে। এমন গন্ডগোলের মধ্যেও প্রমথ ডিউটি করতে চলে এসেছেন। আজ আগেভাগে পৌঁছে গিয়ে পন্ডিত উত্তেজিত হয়ে বীণাকে বলেন,'বৌমা,বাতাসী যেন রোজ হাবার বাড়ি না যায়, হাবা ভালো লোক নয়।' বীণা প্রত্যুত্তরে জানায় 'আপনি কি নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চাইছেন?' মায়ের প্রশ্ন কানে নিয়ে বাতাসী চৌকাঠ পার হয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। একেই মেজাজ তিরিক্ষি, তার ওপর দাদুর লাগানি ভাঙানিতে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ হয় বাতাসী। সে সরাসরি মা কে জানায়, 'দাদু, আজ আমাকে হাবা কাকার বাড়ি যেতে দেখেছে। তাড়াতাড়ি এসে তোমাকে তাই নালিশ করেছে। মাস্টার দাদুর কাছে ইংরেজি পড়তে আমি ভীষণ ভালোবাসি। প্রকৃতির সাথে বাস্তবে একাত্ম হতে আমার অনেক বেশি ভালো লাগে। তাই হাবা কাকা আমার প্রকৃতির পাঠশালার অধ্যাক্ষ। এই সত্য মেনে নিলে কোন রাগ অভিমান থাকে না।' কথা না বাড়িয়ে মেয়ে সিধে চান ঘরে চলে যায়। বীণা স্বভাবসুলভ নীরবতা বজায় রাখে। প্রমথবাবু মাথা নীচু করে বসে থাকে ক্লাস শুরুর আশায়।
পনের
বাতাসীয়া লুপ
অফিসে নিত্য যাত্রা গল্পগুজব চলতেই থাকে। এরই মধ্যে ঘটে গেছে সেই কান্ড বাতাসী। তার দলবল নিয়ে হাজির হয়েছে ছেলেদের কামরায়। অছিলা হল, মহিলা কম্পার্টমেন্টে আড্ডাবাজি তেমন জমে না। অর্ক শৈশব কৈশোরের খিলান ভেঙে যৌবনে প্রবেশ করলেও জোটেনি নারীসঙ্গ, ছেলেদের গায়ে পড়া এমন মেয়ে সে আগে দেখেনি। অর্ক ভাবে এতদিনের ট্রেনে সহযাত্রা, বন্ধুত্ব কী কারনে একদিনে ছেড়ে আসা গেল! পরমুহুর্তেই অর্ক ভাবে এ নিয়ে তার ভাবার কথা নয়, অকারণে অন্যর কাজের হদিশ পেতে চাইছে সে। যদিও ভাবনা জলের মতো, উপর থেকে ঠিক সহজ পথে নিচে নেমে আসবে। অর্কর মনের অলিগলিতে চলতেই থাকে চোরাস্রোত।
স্বভাবজাত কারণে অর্ক নিজেকে সকলের মাঝে প্রকাশ করে না। রথীন ঠিক করে ফেলে অনুঘটকের দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। ঠারেঠোরে, অসতর্ক মুহূর্তে পড়ে পাওয়া অর্কদার বড় বেলার গল্প পরিকল্পিত ভাবে বাতাসী আর তার দলবলকে শোনাতে থাকে রথীন। বাতাসীদি হরবোলা, সর্বদা মুখে তার খই ফুটছে। এই সুযোগে রথীন বাতাসীকে অপ্রাসঙ্গিক যত প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। এই খেলায় যত না রথিনের গল্প শোনার আগ্রহ থাকে তার চেয়ে বেশি থাকে অর্ককে বোঝার ইচ্ছে। অর্কর ভাবগতিক দেখে রথীন বুঝতে পারে বাতাসীকে অর্কদা জানতে চায়। মাঝেমধ্যেই রথীন বাতাসীকে খুঁচিয়ে দেয়। বাতাসী মায়ের কাছ থেকে শোনা নিজের বিস্মৃত শৈশব- কৈশোরের গল্প একের পর এক বলতে থাকে। মনে গেঁথে থাকা আবছা ছবি অবয়ব ধারণ করে প্রকাশের নিজস্ব ভঙ্গিমায়। অবাক হয়ে উপস্থিত সকলে অনুভব করে কাব্যময় বর্ণনা।
ক্লাস ফাইভের একটি ছেলে গঙ্গাফড়িং ধরে এনেছে শ্রেণিকক্ষে। বাতাসীর নাম যে ছোটবেলায় ছান্দসি ছিল তা এতদিনে রেল যাত্রীদের জানা হয়ে গেছে। গল্প ছুটে চলে আপন ছন্দে। ছান্দসি ছেলেটিকে বলে, 'প্রীতম ছেড়েদে, পোকাটা মরে যাবে।' নৃশংস অঙ্গভঙ্গিতে প্রীতম সবুজ পোকাটি মারতে উদ্যত হয়। শিশু মন বড়ই অদ্ভুত। কেউ এই খেলায় আনন্দ পায়, কেউ পায় কষ্ট। ক্লাসের অন্য বাচ্চারাও প্রীতম কে বলতে থাকে পোকাটিকে ছেড়ে দেওয়ার কথা। প্রীতম হাসতে হাসতে বলে, 'ওর মরণ আজ আমার হাতে।' কিছু বোঝার আগে হাই বেঞ্চ টপকে উপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছান্দসি, একেবারে পিতমের ঘাড়ের উপর। ঘটনার আকস্মিকতায় গঙ্গাফড়িং প্রিতমের হাত ফসকে পালিয়ে যায়। প্রীতম এর সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে ছান্দসির ওপর। শুরু হয়ে যায় ধুমধুমার লড়াই। প্রচন্ড মার খেয়ে প্রীতম বড় দিদিমণিকে গিয়ে নালিশ করে। বড় দিদিমণি বীণাপাণি কে ডেকে পাঠায়। রোজ মায়ের হাত ধরে স্কুল থেকে ফিরত মেয়ে। আজ সটান স্কুল থেকে পালিয়েছে সে।
আজ অভয় ছুটি নিয়েছে স্কুলে যায়নি। উঠানে বসে অন্যদের সাথে নভেম্বর দিবসে উদযাপনের আলোচনার করছিল সে। দূর থেকে দেখা যায় বাতাসের উড়ান দিয়ে মেয়ে পুকুর পাড় ধরে আসছে। হাতে একটা ছড়ি আর পিঠে ব্যাগ। অভয় আঙুল তুলে হারুদের পুকুর পাড়ের দিকে দেখিয়ে বলে, 'ঐ দেখ।' হারু বলে, 'এমন এক শক্ত নাম রেখেছ মুখে আনতে ঢেকুর তুলতে হয়। দেখো কেমন বাতাসপানা উড়ে আসছে, ওর নাম বাতাসী রাখ দেখি।' অভয় নামটায় মাটির গন্ধ পায়। কিন্তু এখন এসব কথা ভাবার সময় নেই। নিশ্চয়ই স্কুলে মেয়ে কিছু একটা ঘটিয়েছে। ঝপ করে স্কুল ব্যাগ ফেলে দিয়ে বাপের কোলে বসে পড়ে দুলালী। বাবা জিজ্ঞেস করে, 'হাতে এটা কি?' 'মায়ের বেত, নিয়ে পালিয়ে এসেছি, মা ওটা আমার পিঠে ঠিক ভাঙত।' এক নিমেষে বাকি গল্পটা সেরে ফেলে ছান্দসি। গোটা গল্পটা শুনে হো হো করে হেসে ওঠে বাবা, 'বলে ঠিক করেছিস মা ,আমি তোর মা কে বুঝিয়ে ঠিক বলে দেবো।' সবাই হাঁ হাঁ বলা সঙের মতো তালে তাল দেয়। বীণাকে ফিরতে দেখা যায় অদূরে, হাতে চকচকে ছড়ি। মেয়ের নামে অভিযোগ করতে করতে বীণা ঢুকে পড়ে জটলার মাঝে। মেয়ে ততক্ষণে চম্পট দিয়েছে। বীণার কাছে সবাই শোনে মেয়ের স্কুল পালানোর গল্প। কিভাবে স্কুলের পাঁচিল টপকে পালিয়েছে, এমনকি শয়তানটা তার ছড়িটাও নিয়ে…। অভয় খুঁজতে চেষ্টা করে হদিশ পায় না ওর যৌবনে দেখা সুফিয়া কামালের। মা হলে কি এমন রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করতে হয়, অথচ মেয়ে ঠিক কাজই করেছে ঠিক সময়ে। ওই অবলা জীব প্রাণ হারাত যদি কয়েক মুহূর্ত দেরি করত মেয়ে। অভিযোগ শেষ করে হাঁপাতে হাঁপাতে বীণা বলে, 'মেয়ে কোথায়?' দিলু বলে, 'সবই বুঝলাম ,ছড়িটা কার বড়দির বুঝি? তুমি সুফিয়া কামাল না শুধুই কামাল? জানো না ‘জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর’। 'দিলু জানে, বীণাপাণি রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দে যুক্তি রহিত। তাই সে বিবেকানন্দের বাণী দিয়ে ঠান্ডা করতে চাইছে বউকে। বীণাকে কিছু বলতে না দিয়ে দিলু আবারও বলে, 'একজন বাতাসের বেগে ভাসতে-ভাসতে এলো, আর একজন ঝড়ের ক্রোধ নিয়ে, যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে সব। নেপু বলে, 'ও দিদি, তুমি খুকির নামটা বদলে দাও। আমরা ডাকতে পারিনা, হারুদার ওর নাম রেখেছে বাতাসী।' বীণা কোন উত্তর করার সুযোগ পায় না। হারু বলে, ’কথা দাও ছুটকির নাম বদল করবে আমরা কোন কথা শুনব না’। ঢেউয়ের মত কথার ধাক্কায় ক্রোধ বাড়ার বদলে বীণাকে অবসন্নতা গ্রাস করে। বীণা ধপ করে দাওয়ায় বসে পড়ে বলে, 'তোমরা কি, আমাকে আটকাবার জন্য পরিকল্পনা করেছিলে, আশ্চর্য?' সময়বুঝেই দিলু বলে, 'বীণা তুমি জানতে, তোমার মেয়ের কীটপতঙ্গের প্রতি জমে থাকা ভালোবাসার খবর? ওই একরত্তি ছোট্ট প্রাণীটার জন্য যে কোন বিপদের মুখোমুখি হওয়ার প্যাশন সকলের থাকেনা!' বীণার রাগ জল না হলেও সে কিছুটা ঠান্ডা মেরে গেছে। বীণা বলে, 'তা বলে ও প্রীতমের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে। যদি লেগে যেত, পরের ছেলে!' লাগার দরকার ছিল ওর। না হলে ছেলেটি বুঝতোনা অবলা প্রাণের যন্ত্রণা। যদি দরকার হয় আমি বড়দির সঙ্গে দেখা করব।' ততক্ষণে নেপু কাকুর হাত ধরে মেয়ে মায়ের সামনে হাজির। বীণা একটু কঠিন দৃষ্টি হানার অভিনয় করতে গিয়ে হেসে ফেলে, শয়তান মেয়েটাও হি হি করে হেসে ফেলে।
অভয় আর বীণা সিদ্ধান্ত নেয় প্রীতমের বাড়ি যাবে। একদিন বিকেলে সময় করে ছান্দসি কে নিয়ে ওরা হাঁটা দেয় মাঠপাড়ার দিকে। প্রীতমদের বাড়ির লাগোয়া মুদির দোকান, প্রীতমের বাবা যে অজিত তা জানা ছিলোনা অভয়ের। দোকানে খদ্দের নেই, কোনো রকমে চলে ওদের রুজি-রুটি। চলবে বা কি করে, এটা গরিব মানুষের পাড়া। ধার বাকিতে কারবার। অজিত ওদের আসতে দেখে দোকান ছেড়ে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসে। অবাক বিস্ময়ে অজিত জিজ্ঞেস করে, 'স্যার, আপনারা?" 'এখানে প্রীতম বলে একটা ছেলে থাকে?' উত্তরে অজিত জানায় প্রীতম তারই ছেলে। বীণা দিদিমনি অজিতকে বলে, 'আপনাদের সাথে একটু কথা আছে।' অজিতের বিষ্ময় বাড়ে বই কমে না। অজিত মনে ভাবে কি জানি বাবা ছেলেটা আবার কি করলো?' অজিতের সন্ত্রস্ততা অনুভব করে অভয় বলে, ’ঘাবড়াবেন না, তেমন কোনো ঘটনা নয়। আমরা একটু আপনাদের সাথে কথা বলতে এসেছি,'। ছান্দসি হাত ছাড়িয়ে ছুটে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে। এলোমেলো, ছড়ানো ছিটানো নিত্য প্রয়োজনের জিনিষপত্রে, অগোছাল গেরস্থালী মানী অতিথিদের চোখের আড়াল করতে চায় অজিতের স্ত্রী। দিলু বুঝতে পেরে দাওয়ায় পেতে রাখা চাটাইয়ে বসে পড়ে। মেয়ে ততক্ষণে ভেতরে গিয়ে প্রীতমকে ধরে এনেছে। মেয়ের মনে হয়েছে বাবামা তাকে প্রীতমের সাথে ভাব করাতে এনেছে। উদ্বায়ী শিশুমন স্কুলের ঘটনা মনে রাখেনি। প্রীতম একটু সময় নেয় বাতাসীর সাথে নতুন করে বন্ধুতায় স্বাভাবিক হতে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা মেয়ে মানুষের কাছে পিটুনি খাওয়ায় ওকে নিয়ে মশকরা করছিল। প্রীতমের জমে থাকা ক্রোধ তাই একটুও কমেনি। যদিও দিদিমণি স্বয়ং এসে হাজির হওয়ায় প্রীতমের মনের কোণে উথাল পাথাল চলছিল। বাবাকে দিদিমণি কিছু বললে ঘরেও পেটানি খেতে হবে। শুরু হয় কথোপকথন, নানা বিষয়ে। দোকান, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মাঠে চাষের খবর জানতে চায় অভয়। অজিতের পরিবার বুঝতে পারছেনা ওদের আসার কারণ। তেলেভাজা ভেজে আনে অজিতের স্ত্রী। জমিয়ে গল্পের সাথে মুড়ি, তেলেভাজা। চলে তৃপ্তির আড্ডা। অজিত বলছে চাষবাসের খবর খুব ভালো না। বিশেষ করে সার কীটনাশকের যোগান দিতেই রেস্ত শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ বছর নিজের দু বিঘা জমিতে চাষ ফেলেনি সে। দোকান সামলে, দিনমজুরি করাও সম্ভব হচ্ছে না। সামান্য কিছু শাকসবজি বউয়ের তত্ত্বাবধানে হয়। তাও শাক-সবজি যে নিজে নিজেই বিস্তার পাবে তার সম্ভাবনা কম। মাঠে পোকার আকাল হয়েছে। রাসায়নিক চাষে মাঠে পোকা বিলুপ্তপ্রায়, পরাগমিলন এর সমস্যা যথেষ্টই। এতক্ষণ বাচ্চা দুজনের ঘটে কিছু ঢুকছিল না। হঠাৎ আলোচনায় পোকার আমদানি হওয়ায়, ওদের স্মৃতিতে এসে যায় গত দিনের ঘটনা। প্রীতম জিজ্ঞেস করে বাবাকে, 'পোকা না থাকলে ফসল হবে না কেন?' হঠাৎ করে আলোচ্য প্রসঙ্গে পোকা এসে যাওয়ায় বীণা এবং অভয় দুজনেই আশ্চর্য হয়। এ যে মেঘ না চাইতে জল। কি করে প্রসঙ্গ আনা যায় সে ভাবনা ওদের মাথায় ঢুকছিল না। কিভাবে প্রীতমের সঙ্গে খেলাধুলা করা যায় ছান্দসি তখনও সেই ফন্দিফিকিরে ব্যাস্ত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে পোকা তার মাথায়ও কিলবিল করে ওঠে। সেও মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুরু করে। বীণা দিদিমণি সবিস্তারে আলোচনা জুড়ে দেয় বন্ধু পোকা কিভাবে মানুষের কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করে। উদ্ভিদ জগত পোকার কারণে বিস্তার লাভ করে। পশুপাখি আছে তাই মানুষ বেঁচে আছে। প্রীতম বলে, 'আমিতো আরশোলা, মশা মারতে খুব ভালোবাসি।' দিলু জিজ্ঞেস করে 'কেন, ওরা কি তোমার ক্ষতি করে?' 'তেলাপোকা দেখলেই আমার ঘেন্না হয়, আর মশা বড্ড কামড়ায়।' ছান্দসি অমন উত্তরে হেসে ফেলে। কথার ফাঁকে চা চলে আসে। বীণা আবার একবার প্রীতম কে খুঁচিয়ে দেয় প্রশ্নটা। অজিতের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। প্রীতম হঠাৎ চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে, 'গঙ্গাফড়িং, গঙ্গাফড়িং আমাদের বন্ধু না শত্রু পোকা?' প্রীতমের মনের ভেতরে একটা খেলা চলছিল। বীণা দিদিমণি তার বাড়িতে এসেছে এটা তার কাছে একটা গর্বের বিষয়। সে ভেবে রেখেছিল, কাল স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের মশকরার উত্তর দেবে। অজিতের দিকে তাকিয়ে অভয় বলে, 'কি অজিতবাবু বলুন গঙ্গাফড়িং বন্ধু না শত্রু?' ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে অজিত বলে, 'গঙ্গাফড়িং বন্ধুপোকা, পরাগ মিলনে সহায়তা করে।' ঘন্টাখানেক আড্ডা দিয়ে ওরা বাড়ির দিকে রওনা হয়। আসার আগে স্নেহভরে প্রীতমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
অর্ক গল্পের সরণী বেয়ে অতীতে ফিরতে চেষ্টা করে কিন্তু জীবনে ওর চলার পথে এমন কাব্যময়তার অভাব ছিল। বাতাসীর গ্রামে নিজের কাল্পনিক অস্তিত্বে যখন ও বিলীন ঠিক তখনই রথীনের কর্কশ স্বর শুনতে পায় সে, চটকে যায় ভাবনার পিন্ডি। কিন্তু রথীনের প্রশ্নে ছিল অর্ককে অন্যদের কাছে প্রকাশ করার বেদম ইচ্ছা। আগামী কাল অর্ক যেন অবশ্যই হাজির থাকে আপন অতীত নিয়ে এই নিদান দিয়ে ক্ষান্ত হয় রথীন। রথীনের গতকালের আদেশ মাথা পেতে নিয়ে পরের দিন অর্ক হাজির হয় অতীত রোমন্থনে। মিলিটারি পুলিশ, নকশাল, সিপিএম, কংগ্রেস, মলোটভ ককটেল, গুলি, দোনলা বন্দুক, অবাক বিস্ময়ে ঘেঁটে গেছে সবাই। গল্পের মধ্যে অবশ্য ফুটবল, হকি, টুলটূল, এসেছে সময় বুঝে। সমবয়সি অনেকে তেমন অতীত পাড়িয়ে এলেও অর্কর মতো এমন প্রত্যক্ষভাবে নয়। বাতাসী লুকিয়ে হাসে তার অতীত জীবনের ভালোলাগার মানুষটির সাথে অর্কর প্রকৃতিগত মিল পেয়ে। বুদবুদের মতো মুহূর্তের বেদনা বাতাসীর ঠোঁটের কোণে মিলিয়ে যায়।
সতেরো
পহেলায় বৈশাখী ঝড়
গ্রাম বাংলার লোকজ সংস্কৃতি সম্পর্কে বাতাসী ওয়াকিবহাল ছিল। সীমা পিসির সাথে ভাদু টুসু মকর পরব দেখার নেশায় সে ছোটবেলায় দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়িয়েছে। বর্ধমান জেলার আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলোয় পরবের মেলা। বাতাসী শৈশবের ঝুলি থেকে অর্কর সামনে মেলে ধরত নানা রঙের মেলার ছবি। অর্ক গ্রামীণ উৎসব মুখীনতায় ভাসতে চাইতো সে খোঁজ নিয়ে জেনেছিল মেদিনীপুরের গ্রামগুলোতে গাজনে জবরদস্ত মেলা বসে। বাতাসী কোনদিন মেদিনীপুরের গাজন দেখতে যায়নি, সেও যাবার জন্য উদগ্রীব ছিল। প্রত্যেক বছর কোন না কোন কারনে গাজন দেখতে যাওয়া ঘেঁটে গেছে। ওরা ঠিক করে চৈত্র সংক্রান্তি তে গাজন দেখে পয়লা বৈশাখ দীঘায় কাটিয়ে ঘরে ফিরবে। সংক্রান্তির দুদিন আগে শান্তনা আর বিপিন ওদের বাড়ি এসে হাজির হয়। বিপিনের অনিচ্ছায় শান্তনা ওদের আশু পরিকল্পনা সম্পর্কে বাতাসীকে অগ্রিম কিছু জানাতে পারেনি। বিপিন চেয়েছিল অর্কদা আর বাতাসীদিকে সারপ্রাইজ দেবে। শান্তনা ওদের পয়লা বৈশাখের নিমন্ত্রণ করে। বাতাসী যেতে অপারগ জানানোয় শান্তনা বলে, `বিপিন জীবনে একটা বড় কাজে হাত দিতে যাচ্ছে। তোমাদের ছাড়া এই অনুষ্ঠান অসম্পূর্ণ থাকবে।' বাতাসী ভাবে এতই যদি আবেগ তাহলে পরিকল্পনার স্তর থেকে কেন ওদেরকে জানানো হলো না। বাতাসী জানায় যে বেড়াতে যাওয়া স্থির হয়ে আছে তাই পহেলায় তারা বাড়ি থাকছে না। বিপিন একটা বড়সড় ধাক্কা খায়। সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে শেষমেশ হতবুদ্ধি হতে হবে এমনটা আন্দাজ করতে পারেনি সে। অর্ক লক্ষ্য করে বিপিনকে বিবর্ণ ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। শান্তনার বহিরঙ্গে বিকশিত লাবণ্য মুহূর্তে কেমন রাহুগ্রাসে মলিন হয়ে যায়।
বাতাসী অনড়। সে কবুল করিয়ে নিতে চায় এই আয়োজনের হেতু এবং তাদের আড়াল করার কারন। বিপিন কোন বছর পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে না। হঠাৎ কি এমন ঘটলো বাতাসী তল পায়না। বাতাসী ঠিক করে উঠতে পারে না কি করা উচিত। মায়ে পোয়ে চাতকের চোখে চেয়ে আছে বাতাসীর দিকে। বাতাসীর মুখের কপট গাম্ভীর্য বাকি তিন জনের উপলব্ধির বাইরে। অর্ক বলে, ‘বাতাসী, একবার ওদের দিকে তাকিয়ে দেখো। আমরা না হয় পহেলা বিকেলে ফিরি?' বিপিন একটু সাহস পেয়ে বলে, `না দাদা,কোন ওজর শুনব না। এ আমাদের অনুরোধ নয় দাবি। আপনাদের পহেলাতে থাকতেই হবে।`সে তো বুঝলাম, তোমরা আগে পূজা পাঠ করে দেবীকে তুষ্ট কর।' অর্কর এমন কথায়,`তথাস্তু', বলে মাটিতে বসে পড়ে বিপিন। বাতাসী আর ছদ্ম গাম্ভীর্য ধরে রাখতে না পেরে অর্ক কে গালাগাল করতে থাকে। সবাই বুঝে যায় তুষ্ট হয়েছেন দেবী। অর্ক নিমন্ত্রণের সঠিক কারণ জানতে চায়। শান্তনা জানায়, `বিপিনের বহু দিনের ইচ্ছে ছিল আসবাবপত্রের দোকান দেওয়া। ওর পরিশ্রমের টাকায় আমরা আজ সুখের মুখ দেখেছি। আপনাদের আশীর্বাদ ওর সঙ্গে না থাকলে ওর ভাবনা বাস্তবের ঠিকানায় পৌঁছতে পারবে না এমনই ওর বিশ্বাস।' বিপিন মায়ের মুখ নিঃসৃত অবিরাম বাক্যধারা থামিয়ে বলে, `মাত, আপনি পুত্রের ইচ্ছার সম্যক ব্যাখ্যায় অসমর্থ। আপনার পুত্র কেবলমাত্র নিছক একটি আসবাবপত্রের দোকান দিতে চাহে না। সে চাহে মানুষের মনের কোনে জমে থাকা অপ্রকাশিত অন্তলীন রঙের ফল্গুধারা মনের গহীন থেকে টেনে বার করে ঘরের আনাচে-কানাচ সাজিয়ে তুলতে।' বাতাসী আর গম্ভীর থাকতে না পেরে হেসে বলে, 'আমাদের ঘর যেমন?' বিপিন বলে `দেবী, আপনার ঘর আপন মনের মাধুরী মিশায়ে আপনারই সৃষ্ট গৃহকোণ। আমি সেখানে নিমিত্তমাত্র।' অর্ক জানায় `এখন ফাজলামি রাখ, আমরা সকাল থেকে উপস্থিত থাকব কথা দিচ্ছি।' বাতাসী ঘাড় নেড়ে এমন অঙ্গভঙ্গি করে যার মানে দাঁড়ায় অগত্যা।
নির্দিষ্ট দিনে রঙিন সাজে সেজে উঠেছে শান্তনার ঘর সংলগ্ন দোকান। কাগজের টিকলি ফুল-বেলপাতা মঙ্গলঘট পুরোহিতের আগমনের অপেক্ষায় বসে আছে। শিল্পীর পটুতায় বিপিন সাজিয়ে তুলেছে দোকান। বিপিন এখন আসবাবপত্রে কাঠের ব্যবহার করেনা। একলব্যর নিষ্ঠায় বাবার কাছে কাঠের কাজ শিখলেও বিপিন এখন অন্য উপাদানের ব্যবহারে শিল্পীসত্তাকে বৈচিত্র গামী করে তুলেছে। অভিজাত তকমা বজায় রাখতে কিছু মানুষ কাঠের আসবাবপত্র ছাড়া কিছু ব্যবহার করতে চায় না। কেবল ব্যবসা রাখার স্বার্থে নিকট মানুষের অনুরোধ সে ফেলতে পারে না। বেড়ে ওঠার সময় অর্কদার শেখানো বুলিতে বিপিনের কিঞ্চিত মগজ ধোলাই হয়েছে। বৃক্ষ পশু পক্ষী সবই নাকি প্রকৃতির অঙ্গ, বোঝো ঠ্যালা, উঁচু-নিচু কত পথ যে পেরতে হল এই বয়সে! ওই যে আসছেন উনি ফতুয়া পায়জামায় হেলতে-দুলতে। চোখটা একটু বড় করে বিপিন দেখতে চেষ্টা করে। না, ফোকাস গন্ডির সীমানায় আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। শান্তনা কাঁসার বাসন-কোসন গুছিয়ে রাখছিল। ছেলের কোঁচকানো ভুরুর চেয়ে থাকা অনুসরণ করে শান্তনা অর্কর আগমন বার্তা জানতে পারে। সে ও বাতাসীকে কোথাও দেখতে পায়না। ছেলের উদ্বেগ কাটাতে শান্তনা বলে, `অত চিন্তা করিস না। তারা খোঁজার ভঙ্গিতে দূরবীনে যাকে দেখতে চাইছিস তার মান ভেঙে গেছে সে ঠিক আসবে।' লজ্জা পেয়ে যায় বিপিন, ততক্ষনে অর্ক দোকানে পা রেখেছে। দোকানে ঢুকে অর্কর চোখে পড়ে যায় দুখানা সজ্জিত কাঠের প্যানেল। প্রথমটিতে খোদাই করা হিন্দু মুসলমান সাংস্কৃতিক মিশেলের ইতিবৃত্ত। দেশীয় সন কে মান্যতা দিতে কিভাবে হিজরী সন বদলে গেল আকবরের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজীর সুপারিশে। সম্রাট আকবর স্বীকার করে নিলেন কৃষিপ্রধান দেশের সন ফসল ঘরে তোলার দিন হিসেবে হওয়া উচিত। বিজয়ীর ক্যালেন্ডার মেনে চান্দ্রেয় মাস চাপিয়ে দিয়ে নয়। দ্বিতীয়টিতে প্রাদেশিক উপাচারের বিভিন্নতা তুলে ধরা হয়েছে। এক চুমুকে অর্ক পাঠ্য বিষয় বস্তু পড়ে ফেলে। বলে, `না, আমার জ্ঞানগম্যির পরিধির বাইরে ছিল ঐতিহাসিক পয়লা বৈশাখের গুরুত্ব।' আরো কিছু অর্ক বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সমরবাবুর আগমনে থমকে যায় সে। পরে পরেই অর্কর সহধর্মিণীর আগমন ঘটে, অর্ক একদমে নিজের কম্পিত ওষ্ঠাধর বন্ধ করে রাখে। বাতাসী আজ হালকা হলুদ জমি লাল পাড় শাড়িতে অঙ্গ রাঙিয়েছে। কপালে রক্তবর্ণ মঙ্গল গ্রহ। অর্ক চোখ ফেরাতে পারছিলো না। বকবক থেমে যাওয়ার এও এক কারণ। ধাঁ করে বাতাসী বলে বসে, `অমন করে দেখছো কী?' নিজেকে লুকাতে অর্ক অন্য দিকে চোখ সরাতে গিয়ে দেখে শুধু সে নয়, আরও একজন মোহিত হয়ে আছে। অর্ক ভাবে রংয়ের কি মহিমা দেশ-দেশান্তরে। একই রং সামাজিক ভৌগলিক পটভূমি অনুযায়ী গুরুত্ব ভিন্ন। এমন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হলুদ শাড়ি পরিবেশ উপযোগী যা বাতাসীকে সুন্দরতর করে তুলেছে। রঙের ভাষার সামাজিক গুরুত্ব মানুষ ছোটবেলা থেকে শিখে ফেলে। হলুদ রঙ মিশরে শোকের আবহে ব্যবহৃত হয়। মরুভূমি সবুজের পরিপন্থী। সূর্যের প্রখরতা আর হলুদ রঙ সমার্থক সেখানে যা গ্রাস করে সমাজের জীবিকা, কৃষিকাজ সমৃদ্ধি। হলুদ রঙ সেখানে অনাবৃষ্টিতে আবিলতার প্রতীক। অর্কর ভাবনা স্রোত চলতে থাকে, তার দৃষ্টিতে শূন্যতা যদিও সে আনমনে তাকিয়ে ছিল বিপিনের দিকে। বিপিন অর্কদাকে বলা দিদির কথা শুনতেই পায়নি অথচ সে খেয়াল করে অর্কদা তার দিকে তাকিয়ে আছে। বিপিন নিজেকে সামলে নেয়। বাতাসী সব্বাইকে এলোমেলো করে দিয়ে আনন্দ পায়। কিছুই বুঝতে পারেনি এমন শয়তানি করে সে শান্ত্বনার দিকে তাকিয়ে থাকে। নির্মল প্রশান্তি বিরাজ করছে শান্তনার শরীরে মনে। বাতাসী এমনটাই চেয়েছিল। সারা জীবন উদ্বেগ উৎকণ্ঠার আড়ালে মানুষটা কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। আজকের উদ্বেগহীনতা বাতাসীকে স্পর্শ করে। বাতাসী ভাবে খুব ভালো হয়েছে পহেলায় বেড়াতে না গিয়ে। সমরবাবুর সশরীরে হাজির হলেও নিজের উপস্থিতি দিয়ে অর্ক আর বাতাসীর নজর কাড়তে পারেনি। হঠাৎ করে বাতাসী সমরবাবু কে আবিষ্কার করে। বাতাসী শান্তনা দিকে যখন তাকিয়ে ছিল তখন শান্তনার চকিত চাহনি ব্যস্ত ছিল সমরবাবুর জীবন্ত উপস্থিতির উপলব্ধিতে। ফিচলামি করে বাতাসী সমর বাবুকে বলে, `এত বড় কর্মকাণ্ড বিপিন একা সামলাতে পারবে,আপনার কি মনে হয়?' মানিক বাবুর মৃত্যুর দিন সমরবাবুর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল অর্ক দম্পতির। সমর মানিকের বাল্যবন্ধু। হুগলি জেলায় কমলাপুর গ্রামে বাস। কমলাপুর শ্রীরামপুর থেকে দেড় ঘণ্টার পথ। মানিক যখন ব্যাবসা শুরু করবে তখন সমর বাবুই নিজের ট্যাঁক ভেঙ্গে যন্ত্রপাতির যোগান দিয়েছিল। অর্ক আরো একটু সরাসরি বলে `সমরদা, কিছু না মনে করলে বলি। এই দোকানের দায়িত্বভার আপনি গ্রহণ করলে বিপিনের খুব সুবিধে হতো। অবশ্য এটা আমার কথা। বিপিনের মত না নিয়েই জানালাম।' শান্তনা এই প্রস্তাব শুনে শতেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে ভিতরে পূজা পাঠে যায়। বাতাসীও সেইখানে জুটেছে ভাব গতিক বুঝতে। প্রথম দিনের পরিচয় বাতাসী জানতে পেরেছিল কমলাপুরের সমর বাবু দাদা বৌদির সংসারে থাকে। গ্রামে সমর টিউসন পড়ান। পিছুটান বলতে গ্রামের পাঠশালা আর ভাইপো ভাইঝিদের সান্নিধ্য। অর্কর প্রস্তাব বিপিনের ভাবনায় সুপ্ত ছিল। কাকুকে সরাসরি এই দায়িত্ব নিতে আহ্বান করায় সংকোচ ছিল বিপিনের। উনি নিজেকে বিপিনের কর্মচারী ভাবেতে পারেন। বিপিন সুযোগ পেয়ে অর্ককে বলে, `এমনটা হলে আমি সবচেয়ে খুশি হব। আমাকে ফ্যারাডের ভুতে পাইয়েছেন আপনি। এখন আপনাকেই আমার পথের হদিশ দিতে হবে।'
পাড়াপড়শি বহু মানুষের আগমনে জমে উঠেছিল দিনটি। সবাইকে অবাক করে দিয়ে দোকানে মন্টূর বাবা মা এসেছিল। মন্টূর মা এখন স্বছন্দে বিপিনকে মেনে নিয়েছে। ভাবটা এমন, সমাজে দোকানির মূল্য আর কতটুকু? মন্টূর বাবা খুবই সহানুভূতিশীল। তিনি অন্তর থেকে দেখতে চান শিল্পী বিপিনের উত্থান। কিন্তু বউয়ের ভয়ে কিছু বলতে পারেন না। মিলে যায় অর্ডার মন্টূর মায়ের করুণা আর বাবার শখে। অনেক মানুষই হাল খাতা করছেন। হৈ হৈ করে সময় বয়ে যায়, সারাদিন অর্ক বাতাসী দোকানে কাটিয়ে, বাড়ি যেতে চাইলে শান্তনা রাগ করে। সমরবাবুকে বেরিয়ে পড়তে হবে, রাত আটটার পর কমলাপুর যাবার বাস নেই। মা ছেলেকে বলে `ওনার জন্য তুই একটা রিকশা করে দিস।’ বিপিন বেরোবার আগে বাতাসীকে বলে যায় `আপনারা কেউ যাবেন না, পরামর্শ আছে।' অর্ক বলে, ‘গরমকাল একটু চানটান করে ফ্রেশ হয়ে নিলে ভালো হতো। আমি ঘুরে আসছি।' কেটেপড়ার উপায় নেই দেখে বাতাসী থেকে যায়। শান্তনার কথায় বাতাসী হাতে মুখে জল দিয়ে শরীর এলিয়ে দেয় বিছানায়। ক্লান্তির পরশে নিমেষে দুচোখ জুড়ে আসে। শান্তনা আড্ডা মারতে চেয়েছিল তার বদলে আনমনে সে বাতাসীর মাথায় হাত বুলাতে থাকে। চোখ খুলে বাতাসী মাঝে মধ্যে তার চেয়ে বয়সে বড় শান্তনা কে দেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। শান্তনার এতটা কাছাকাছি বাতাসী কোনদিন আসেনি। পরম চেনা গন্ধের আবেশে বাতাসীর মায়ের কথা মনে পড়ে। যেন পৃথিবীর সব মায়ের, কোলের গন্ধ একই রকম। হঠাৎ তার বুকটা মুচড়ে ওঠে। যন্ত্রণায় ঢেউ উঠে উদ্বেল হয় বাতাসীর বুক। ‘কেন এমন হবে? কি এমন কর্মযোগে আমার কোল খালি?' একের পর এক ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকে বুকে। আবার লগ্নভ্রষ্ট ঢেউগুলি কম্পাঙ্কের বিভিন্নতায় একে অপরের ওপর আছাড় খেয়ে প্রাবল্য কমিয়ে দিতে থাকে। বাতাসীর মনে ঘটনার ঘনঘটা। মন্টূর মা কি কোনদিন সার্বজনীন হতে পারবে! এই ভেবে বুকের জ্বালা একটু জুড়ালেও পরমুহূর্তে মনে হয় মন্টূর মায়ের তো স্বামী পুত্র নিয়ে সুখী গৃহকোণ। ক্ষণিকের মানসিক বিভ্রম মানুষকে কোন দিশায় ঠেলে নিয়ে যায় কেউ কি বলতে পারে। চিন্তার স্রোত বেয়ে বাতাসী নিজের গৃহকোণের ঠিকানায় পৌঁছে যায়। পরমুহুর্তেই লজ্জা পায়, মনে মনে ক্ষমা চায়। অর্ক তুমি আছো, তা সত্ত্বেও আমি নির্ধন? এমনটা কি করে ভাবতে পারলাম! শান্তনা বুঝতে পারে বাতাসী নিজের সঙ্গে কথোপকথনে সমাহিত। শান্তনার শীতল হাতের স্পর্শে বাতাসী আধো জাগরিত হয়ে ঘূর্ণির তলদেশ থেকে ভেসে উঠে বুক ভরে অক্সিজেন নিয়ে, আবারও তলিয়ে যেতে চায় ডুবুরির সাধে। শান্তনা বুঝতে পারে বাতাসী আবার তার কাছ থেকে ছুটি চাইছে। তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করে, `তোমার কিসে এত দুঃখ?' বাতাসী ধরা পড়ে গিয়ে লজ্জা পেয়ে যায়, অবসাদ ভেঙ্গে বলে `দিদি, তোমার অসুখের তুলনায় এ ব্যথা নগন্য।' ছোট্ট হাসিতে উত্তর দেয় শান্তনা `পৃথিবীতে সব দুঃখ বোধহয় চিরস্থায়ী নয়।' এমন দার্শনিক উক্তিতে হতভম্ব বাতাসী বান্ধবীর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।
একটু আগে পরে অর্ক আর বিপিন ঘরে ঢোকে। দুজনের বিহ্বলতায় উদগ্রীব অর্ক জানতে চায় – বৌদি, এতও খুশি, কারন কী? বাতাসী বলে ‘এমন সন্তান যার সে কি চিরকাল অসুখী থাকতে পারে?' ঠিক সেই মুহূর্তে বিপিন ঘরে ঢুকে বাতাসীর কথা শুনে সঠিক মুহূর্তের সন্ধান পেয়ে যায়। ভাবনার কথা, প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে বিপিন। শান্তনা ব্যাবসা সঙ্ক্রান্ত নতুন কিছু আলোচনার আন্দাজ পেয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে যাবার উদ্যোগ নেয়। বাতাসী টেনে তাকে বসিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে ওঠে। বিপিনের শরীরী ভঙ্গিমায় বাতাসী টের পেয়ে যায় ইঙ্গিত। বিপিন চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়েলে গোল টেবিলের আকার নেয় বৈঠক। বিপিন ঘোষকের ঢঙে বলে `আপনাদের দুজনকে সান্ধ্য মজলিশে অংশ নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমি একটা সিদ্ধান্ত নিতে চাই। অবশ্যই এই সিদ্ধান্তে কেবল একজনেরই অধিকার। যদি তিনি মনে করেন অন্যদের মতামত গ্রহণ যোগ্য তবেই বিবেচনা করবেন। আমি শুধু মতামত জানতে চাই।’ লম্বা-চওড়া বুকনিতে শান্তনা ভাবে কি জানি বাবা নতুন কী কী ঝামেলায় ছেলে জড়াতে চাইছে তাকে। অর্ক বলে,‘অত ভ্যানতাড়া না করে বলে ফেল বাবা।’ বাতাসী উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে থাকে। দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে বিপিন বলে, ‘আমি সমর কাকুর সাথে মায়ের নতুন সংসার করার প্রস্তাব দিচ্ছি।’ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় সব্বাই। শব্দহীন থাকে সক্কলে। শান্তনা বুঝতে পারে ওর মনের লেখনি ছেলে পড়ে ফেলেছে। একবুক কান্না নিয়ে সে দৌড়ে পালাতে চায়। মানিকের স্মৃতি বিজড়িত সহস্র দিন, সন্তানের সাথে একান্তে দিন যাপনের মধুময় স্মৃতি, মনের কোণে মাঝেমধ্যে জড়ো হওয়া সমরবাবুর এলোমেলো প্রতিচ্ছবি ছুটতে থাকে মাথার মধ্য দিয়ে। ইচ্ছে হয় দূরে একছুটে পালিয়ে যেতে। শান্তনার পথ আগলে বাতাসী ওকে নিজের শরীরে গ্রহণ করে। বাতাসী শান্তনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে `লজ্জা পেওনা, জীবনসত্যি মেনে নাও জীবন একটাই।’ কান্নায় ফুলে ফুলে ওঠে শান্তনা। শান্তনা বলতে চায় সামাজিক শাসন ঔচিত্যর কথা। মুখ থেকে একটাও শব্দ বেরোয় না।
আঠারো
বাতাসীয়া লুপ
পর্ব - এক
চলতে থাকে ট্রেন ট্রেনের ছন্দে,কোন হেলদোল নেই। দিনরাত্রির ছন্দের অভাব হয়না,তারা নিজের মতো নিরন্তর বয়ে যায়। শুধু মাঝেমধ্যে উঁচু-নিচু মালভূমি পথে হেঁটে চলা অথবা আচ্ছে দিন কালো দিনের দোলাচল। যদিও তেমন কোন ঘটনা ঘটেনি মাঝের এক বছর। খুব শান্ত, আপাত স্থির জলে ভেসে থাকা বাতাসীর না পসন্দ। মারের সাগর পাড়ি দিতে চায় সে। কখনো চূড়ায় সবার চোখের মনি হয়ে কখনো বা তরঙ্গের পাদদেশে, অগোচর। অর্ক জানে কালের নিয়মে নিয়ম ভাঙ্গে। এই ভাঙ্গন হঠাত করে হতে পারে অথবা দীর্ঘ সময় ধরে। ওর জীবনে যে পরিবর্তন আসছে জ্ঞানপাপী অর্ক তা লুকাতে চায়। কৈশোরে দেখা মামার রোম্যান্টিকতা এবং বাপের রাজনৈতিক হিরোইজমের মিশেলে অর্ক নিজেকে গড়তে চেয়েছিল। প্রেম-ভালোবাসা-বিয়ে এগুলোকে জীবনে কোরবান করে দিলে,পিছু টান থাকে না। তাই বাড়িয়ে নিয়েছিল বয়েস, বুড়িয়ে নিয়েছিল বললে ঠিক বলা হয়। কথা ফুরায় ভাবনা ফুরায় না,নটে গাছও মুড়ায় না। বাতাসীকে দেখার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যেতে চায় সে বারবার। উনুনের আঁচ যেমন খুঁচিয়ে দিতে হয়, রথীন তা জানে, কথার শিক দিয়ে সে প্রত্যহ খুঁচিয়ে যায় অর্ককে। এই এক বছরে বাতাসী, অর্কর পরিবার বাবা-মা, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান এমনকি অর্কর বাবা, কৃষ্ণ বাবু যে কাগজ পাকিয়ে সিগারেট খেতেন তাও জেনে ফেলেছে। বাতাসীর কাছে এ এক চ্যালেঞ্জ নিরেট খোলসের ভেতরে থাকা মানুষটাকে রক্তমাংসের প্রাণ হিসেবে টেনে হিঁচড়ে বাইরে বের করে আনতে হবে। নির্জীব সময় পেরিয়ে যাচ্ছে অথচ কিছুই ঘটছে না।
বাতাসী ঠিক করে আজ স্কুল কামাই দিয়ে অর্কর বাড়ি গিয়ে হাজির হবে। ভাবনা মতো একটা ট্রেন পরে আসে বাতাসী। নেমে পড়ে স্টেশনে। ভাঙ্গা মসজিদ কাজীপাড়ার কাছে কৃষ্ণ বাবু নতুন বাড়ি করেছেন। গ্রামে হিন্দু, মুসলমান একসাথে থাকে ঝুটঝামেলা নেই মনোরম পরিবেশ। কৃষ্ণ বাবুর অবসর-জীবন মনোরম কাটছে রাজনীতি থেকে বহু দূরে থেকে। যদিও নীতিতে এখনো অবিচল কৃষ্ণ। খাদিনা মোড় ছেড়ে বাঁক নিয়ে হেঁটে চলে বাতাসী। রিক্সার চলন এদিকে যথেষ্টই, নতুন লোক দেখলে ভেঁপু বাজিয়ে জিজ্ঞেস করে চালক। বাতাসী একই ভঙ্গিমায় অনেককে ফিরিয়েছে। হেঁটে চলতে ও বরাবর ভালোবাসে। নতুন জায়গা দেখতে হলে নিজের পায়ের উপর ভরসা করাই শ্রেয়। তার ওপর জায়গাটায় যদি নিজের থাকার পরিকল্পনা থাকে...। যদিও পালসিট, চুঁচুড়ার এই অঞ্চলের তুলনায় আজও অজ পাড়া গাঁ, তবু গাছপালা, জলাশয়ের অস্তিত্ব আছে এখানে। এক ভ্যানচালক আবার জিগেস করে, "দিদি কোথায় যাবেন?" কিঞ্চিত বিরক্ত হয়ে বাতাসী বলে, "আপনারা মেয়ে লোক দেখলেই এমন করেন?" লজ্জা পেয়ে, ভ্যানচালক মাথা নিচু করে এগিয়ে যায়। কষ্ট পায় বাতাসী, ভাবে ওরা পেটের জন্য জিগেস করে সব্বাইকে, আমি কেন ধৈর্য হারালাম। ভ্যানচালক না জেনেই ঢুকে পড়েছিল বাতাসীর স্বপ্নলোকে তাই এমন ব্যবহার পেতে হল তাকে।
অবশেষে দরজায় টোকা পড়ে। কৃষ্ণ বাবুর বাড়ি, অঞ্জলীর সাম্রাজ্যে নতুন মানুষের আগমন। ব্যস্ত হয়ে পড়ে অঞ্জলী। কৃষ্ণ তখন বুড়োদের মজলিসে আড্ডা মারতে ব্যস্ত। আজকের ফ্লাট বাড়ির বাসিন্দা হলে সেলস গার্ল বলে খেদিয়ে দিত। গৃহকর্ত্রী সমাদরে বরণ করে নিল ছেলের বান্ধবীকে। বিস্ময়ের শুরু আবার সেখান থেকেই জীবনে ছেলেকে মেয়েদের দিকে তাকাতে দেখেনি অঞ্জলী। লজ্জার মাথা খেয়ে সে শেষমেশ বাতাসী কে জিজ্ঞেস করে ফেলে, "তুমি ওর বান্ধবী?" একটু ঢোঁক গিলে বাতাসী বলে, ‘হ্যা, কাকিমা।’ বাতাসীর মৃদু সলজ্জ বহিপ্রকাশ আর অঞ্জলীর অতিরিক্ত আবেগ কাকি শব্দটিকে অশ্রুত রাখে অঞ্জলীর কানে। পড়ে থাকে মায়ের শব্দকল্প। প্রতিপ্রশ্নে অঞ্জলী বলে "তুমি মা ডাকতে চাও?" মুহূর্তের ঝড়ে উড়ে যায়, বাতাসীর অন্তরের সকল জড়তা। পেলব অনুভূতি গ্রাস করে বাতাসীর হৃদয়পুর। অঞ্জলী খেয়াল করে বাড়ির সর্বক্ষণের গার্জেন বাসন্তী কান খাড়া করে গিলছে সব কথা। মায়ের আদেশে অখুশী বাসন্তী বাধ্য হয় কৃষ্ণকে ডেকে আনতে যেতে। বাড়িতে এখনো দুপুরের রান্না শুরু হয়নি। রান্নার ভার অঞ্জলীই সামলায় এ বাড়িতে। কৃষ্ণ বাড়ি ফেরার আগেই বাতাসী অঞ্জলীর সঙ্গে কথা বলে রান্নাঘরের দখল নিয়েছে। ঘরে ঢুকে ওপেন টাইপ বড় রান্নাঘর বাঁদিকে। বাসন্তীর অসময় ডাকে কৃষ্ণ ফিরে এসেছে। রান্নাঘরে কে কাজে ব্যস্ত খেয়াল না করেই ঢুকে পড়ে কৃষ্ণ। অঞ্জলী তখন ছাদে গেছে শুকনো কাপড় তুলতে। বাতাসীর পরনের হালকা নীল শাড়ি। কাজ করার সময় কোমরে বেঁধে নিয়েছিল। হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে কৃষ্ণ, বাতাসীকে অঞ্জলী ভেবে ফস করে বলে ফেলে,"দেখি বুবুর বান্ধবীকে, কবে আসবে সারা জীবনের জন্য?" কথাটা শুনতে পেয়ে পিছনে তাকালে বাতাসীর সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয় কৃষ্ণর। সলজ্জ বাতাসী প্রণাম করে অর্কর বাবাকে। উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করা কৃষ্ণর অভ্যাস, স্বপ্নের দিনগুলো হারিয়ে, কবিতা, তার কন্ঠ থেকে বিদায় নিয়েছিল। আজ হঠাৎ নতুন সুরে বেজে উঠল তার উদাত্ত্ব কন্ঠ- "আজি এ প্রভাতে রবির কর.....।"
অঞ্জলী কখন নেমে এসেছে ছাদ থেকে দুজনের কেউ খেয়াল করে নি। সে দেখে কৃষ্ণর বুকে পরম স্নেহে বাতাসী আশ্রয় পেয়েছে। অঞ্জলী মিথ্যে করে চেঁচিয়ে বলে, "এই গেল গেল সব পুড়ে গেল, তোমরা কোনো গন্ধ পাচ্ছ না?" ওরা থতমত খেয়ে শশব্যাস্ত হলে অঞ্জলী হেঁসে বলে, "তোমরা আমাকে ফাঁকি দিয়ে পরিচয় পর্ব সেরে নিলে আমিও তোমাদের ঠকালাম।" দুপুরের পরিপাটি আহারে তৃপ্ত কৃষ্ণ বলে, "মা রে, তোর হাতে, রান্নার জাদু অর্কর ঠাকুমাকে মনে পড়িয়ে দিল। আর তোর নামের সুবাস, মন ভরিয়ে দেয়। নজরুলের দূর দ্বীপ বাসিনী শুনেছিস?" বাতাসী সলজ্জ ঘাড় নেড়ে মাথা নিচু করে। যা বাতাসী সুলভ এক্কেবারে নয়। কোথাও তো মাথা নত করতেই হয়। অঞ্জলী নিঃশব্দতা ভেঙ্গে সরাসরি বাতাসীকে জিজ্ঞেস করে,"কে কথা পাড়লো বুবু নিশ্চয় না। তোমার বাড়ি কোথায় বাড়ি থেকে কোনো আপত্তি হবেনা তো?" একরাশ প্রশ্নর উত্তর কোনটা থেকে শুরু করবে বাতাসী বুঝতে না পেরে,শেষ থেকে শুরু করে। প্রথম দেখা থেকে আজকের অবস্থান অবধি কবুল করে বাতাসী জানায়, "কেউ এখনও কথা পাড়েনি। অর্কর চোখের ভাষায় আমার বুঝে নিতে অসুবিধে হয়নি সবটা। আমিও বুঝতে পারছি অর্ক নিজে থেকে কিছু বলবে না তাই তোমাদের শরণাপন্ন হলাম।" অঞ্জলী বলে, "বাবা মেয়ে তো খুব গায়ে পড়া।" এটা যে শ্লেষ বুঝে নিয়ে সবাই হেঁসে ওঠে একসাথে। অঞ্জলী বলে, "ভালো করেছিস মা, না হলে ব্যাটা চিরকাল ফস্কা গেরো হয়ে থেকে যেত। ওকে দিয়ে কবুল করাতে হবে সবটা।"
উসখুশ করছে অর্ক। বুঝতে পারছে না বাতাসীর হঠাৎ ছুটির রহস্য। রথিন জানে অর্কদার চঞ্চলতার কারণ। কিন্তু কাঠি করতে বাঁধছে, সে চায় অর্কদার চঞ্চলতা বাড়ুক। কাঠি করলে বেঁকে বসবে। প্রত্যেকটি মানুষের ভাবনা গাড়ির একটা নিজস্ব পথ আছে। তার থেকে দূরে সরে থাকা প্রায় অসম্ভব। নিশিথের ভাবনা অন্য রাস্তায় হাঁটছিল। নিশিথ চাইছিল অর্ক আর বাতাসীর ব্যাপারে খোলাখুলি কথা বলতে। কী কথা বলবে ভেবে না পেয়ে ফস করে নিশিথ বলে ফেলে, "বাতাসীর না জানিয়ে ডুব দেওয়া উচিত হয়নি।" রথিন আদতে ফিচেল, তাই নিমেষে নিজের ভাবনা পথ বদলে ফেলে সে বলে,"কে বলল বলে যায়নি। অর্কদা সব জানে।" এতটা অসহায় অর্ক কে জীবনে হতে হয়নি। এই নয় যে সকলের মিলিত অট্টহাসি এর কারণ। অর্কর মনে হয় সে ধরা পড়ে গেছে, ওর অন্তরের আনচান, রথিন পড়ে ফেলেছে। শুধু রথিন কেন, কম্পার্টমেন্টের সবাই হয়ত ওর মধ্যে গজিয়ে ওঠা প্রেমের চারাগাছের মহীরুহ রুপ দেখে ফেলেছে। আজও এই বয়সে, ওর জীবনে প্রেম, স্বাভাবিক ঘটনা নয় অপরাধ। এই ভেবে যত দ্বিধা দ্বন্দ্ব কুণ্ঠা।
বাড়ি ফিরে বুবু অন্যদিনের মতো মার কাছে এসে বসে। বাসন্তী জলখাবারের যোগান দিতে রান্নাঘরে গেছে, সেই ফাঁকে অঞ্জলী বলে,"আর দেরী করা সম্ভব নয়। মেঘে মেঘে বেলা বেড়ে যাচ্ছে। তুমি বোঝনা?" মা যখন "তুমি", বলে ছেলেকে, তখন ছেলে জানে মায়ের বিশেষ কোনো আর্জি আছে। ছেলে সাত-পাঁচ ভাবতে থাকে কী এমন কথা যা তড়িঘড়ি বলতে হবে। মা বলে,"তোমার বাবার বাল্যবন্ধু অভয় বাবু মেয়ে মলয়াকে নিয়ে আজ চুঁচুড়া কোর্টে কাজে এসেছিলেন। মেয়েটিকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। আমার দেওয়া বিবাহের প্রস্তাবে অভয় বাবু সায় দিয়েছেন। আজ এক্ষুনি তোমার মতামত জানতে চাই।" অর্ক প্রশ্ন করে "চুঁচুড়ো কোর্টে এসেছিল, তোমাদের সাথে দেখা হলো কীভাবে?" অঞ্জলী বলে,"উনি ঠিকানা খুঁজে আমাদের বাড়ি এসেছিলেন। তুমি কথা ঘুরিয়ো না, যেভাবেই দেখা হোক সেটা মুখ্য নয়। তুমি বল, তুমি কি চাও। আমি ওদের জানিয়েছি, ছেলের সঙ্গে কথা বলে জানাবো। কারণ যদি ওর সাথে কারো ভালোবাসার সম্পর্ক থাকে আমরা ওকে বাধ্য করতে পারবো না। ওরা পরিবার হিসেবে খুবই ভালো। আমাদের মলয়া কে খুব পছন্দ হয়েছে। যাক বাবা আমাদের আর মেয়ে খো্ঁজার ঝামেলা রইলো না।" অর্কর কপালের বলিরেখায় চিন্তার ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। অঞ্জলীর নিজের প্রশ্নের উত্তর ছেলের দ্বিধাগ্রস্থ মুখমন্ডলের ভাষায় পড়ে নিতে সমর্থ হয়েছিল। "আমাকে একটু সময় দিতে হবে",বলে অর্ক তড়িঘড়ি খাবারের সন্ধানে রান্নাঘরে চলে যায়। মনে মনে মুচকি হাসে অঞ্জলী। মা আগেভাগে বাসন্তীকে বলে রেখেছিল, কোন কথা যেন সে না বলে। বাসন্তী চুপ করে থাকতে জানে না, সে বলে, "আমাদের বৌদিমণিকে খুব সুন্দর দেখতে।" আর যাবে কোথায়, সব ঝাল,অর্ক বাসন্তীকে ঝাড়ে।
পরদিন রথিন অর্কর উদাসী নয়নে খুঁজে পায় অভিমান আর নিশিথদা বিরহ। বাকিরা অর্কর প্রজ্ঞা, সততা, মানবিকতা এমনিই মন থেকে মেনে নিতে পারে না। শুধু ওকে ব্যবহার করে প্রয়োজন মতো। অর্কের প্রতি বাতাসীর অনুরাগ ওদের ঈর্ষান্বিত করে তোলে। রথিন এইসব বিবাহিত অবিবাহিত মানুষগুলোকে আবডালে কুকুরের সংগে তুলনা করে। পাগলা দাশুর মতো এরা কল্পনায় অর্ক সঙ্গে পাঞ্জা কষে। অর্ক নিজে কি ভাবছে তার আন্দাজ বাতাসী কিছুটা পেলেও অঞ্জলী মায়ের কারসাজি বুঝতে পারেনি সে। বাতাসী ভেবে মরে চিন্তাশীল অর্কর মনোজগতের দোলাচল নিয়ে। তাহলে কি সে যা আন্দাজ করেছিল তা ঠিক নয়। চোখে কনফিডেন্সের আতস কাঁচ দিয়ে অর্ককে সে ভুল পড়েছে? বাতাসীও পরিস্থিতির কারণে গুম মেরে যায়। রথিন আর চুপ করে থাকতে পারে না বলে ফেলে, "কেন যে দিদি অফিস কামাই করো?এই ট্রেন সফর আমাদের জীবনে তেলের খনি। এই জ্বালানি আমাদের সারাদিন কাজে শক্তির যোগান দেয়। কাল থেকে অবিরাম গুমোট আবহাওয়া চলছে আজও এর থেকে নিস্তার নেই।" সবাই হেসে ফেলে, কেউ ওদের খোঁচা দেওয়ার জন্য, কেউ সত্যি পরিস্থিতির তরলতা চাইছে। নিশীথ আর অর্ক আজ পাশাপাশি বসেছে। ট্রেন হাওড়া স্টেশনে ঢোকার মুখে। অর্ককে দেখা যায় নিশিথকে কানে কানে কিছু বলতে। প্লাটফর্মে নেমে নিশীথ রথিনকে বলে কিছু। রথিনের মুখে কালো ছায়া নেমে আসে। এমনি করে ভাবনা-চিন্তার দোলায় কেটে যায় বেশ কিছুদিন। স্পষ্ট অশান্তিতে ভোগে দুজনে, বাকিরা কিছু জানতে পারে না।
ওদিকে অঞ্জলী নিরন্তর চাপে রেখেছে ছেলেকে। রবিবার ফাইনাল কথাবার্তা হবে তাও জানিয়েছে। অনেক অসম্ভব কাজ অর্ক সহজে সমাধান করেছে। কি কারণে নিজের ভালোবাসার কথা জানাতে পারছে না এই জটিল অংক বুঝতে পারছে না কেউ। বাতাসী মনে মনে ভাবে আর নয়, একজন মহিলা নিজের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভালবাসার কথা কবুল করেছে, এবার অর্ক কে ভাঙতে হবে। ছোটবেলা থেকেই অর্কর পাওনার ঝুলি এমনিতে ভর্তি, ওকে মানুষের কাছে কিছু চাইতে হয়নি। নিজেকে নত করে ভালোবাসার কথা বাতাসী কে জানাতে হবে এ তার কল্পনার অতীত। লৌহ কঠিন পুরুষ অহং দেওয়াল তুলেছিল ওর বাসনার চারপাশে। কিছুতেই আজন্ম লালিত বিশ্বাস ছিঁড়েখুঁড়ে অর্ক বেরিয়ে আসতে পারছিল না। মায়ের হাতুড়ির নিরন্তর শব্দ, প্রতিমুহূর্তে নিদান হেঁকে চলেছে,”এখন আর দেরি নয়”। বাতাসীও মুখে আগল দেওয়ার শপথ নিয়ে ফেলেছে।
উনিশ।
অলীক সুখ
সীমা হাবাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল সেই কোন ছোটবেলায়। ছোটবেলার ভালবাসা উথাল পাথাল হাওয়ায় কেঁপে নিবু নিবু হয়েও আজ স্বরূপে বর্তমান। আচমকা কখনো সীমার সাথে দেখা হলে হাঁ করে সে হাবার মতই চেয়ে থাকে। মাঝ বয়সে এসে সীমা এই চেয়ে থাকা ভালো চোখে না দেখলেও অপমানে ফেরত করে না। বেশ কিছুদিন সীমা হাবার পাত্তাই পাচ্ছেনা মন আনচান করছে তার। এই চেয়ে থাকা হয়তো সীমার ভালো লাগতে শুরু করেছে। সীমা বুঝতে পারেনা সে কি কখনো হাবার পথ চেয়ে থেকেছে, না হলে তার এমন মনে হবে কেন? রোজ না হলেও প্রায়ই ওদের দেখা হত। মন বড় অকারণ আচরণ করে মাঝেমধ্যে। জীবনে কখনো যার ওপরে কোনো প্রাণের টান অনুভব করেনি তার জন্য বুকে করোনার হাঁসফাঁশ। টিকাকরণ ওষুধ, পথ্য নিয়েও এর থেকে মুক্তি নেই। একদিন সকালে মাঠে যাওয়ার আগে সীমা ঢুঁ মারে হাবার ঘরে, বাড়িতে পাওয়া যায়না হাবাকে। ক্যানেল পাড়ে গেলে সেখানেও হাবার টিকি মেলে না। অবাক হয় সীমা, কেন এমন করছে হাবা। এত সকালে কখনো তো ও বের হতো না। ব্যাটা ঘোর সংসারী হয়ে গেছে। বেশি মাছ পাওয়ার আশায় ভোরবেলা বেরিয়ে পড়ছে এখন। সাত পাঁচ চিন্তা করতে করতে সীমা ভাবে, রাত ফুরাবার আগে এসে একদিন হাবাকে ধরতে হবে। যেমন সংকল্প তেমন কাজ। পরদিন আলো ফোটার আগেই সীমার ঘুম ভেঙে যায়। হারুকে সে বলে, 'আমি মাঠে যাচ্ছি।' হারু ঘুম চোখে বলে, 'পাহারা আছে, যেওনা। পুলিশকে আমি একদম বিশ্বাস করিনা।' প্রত্যুত্তরে সীমা বলে, 'তুমি তাহলে চলো আমার সাথে।' আড়মোড়া ভেঙে হারু ,'ধুস' বলে, পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। পুলিশ সবার খোঁজ রাখে। সীমার জ্ঞানও টনটনে। সে জানে ওদের পার্টির কাছ থেকে পুলিশ এবং সরকারের কোনো ভয় নেই। পুলিশের কাছ থেকে বড় বিপদ আশার সম্ভাবনা তাই কম। এই বোধের উপর ভরসা করে হারুকে তোয়াক্কা না করে, দরজা দিয়ে সীমা বেরিয়ে যায়। পথে পুলিশের টিকিটি পাওয়া যায় না। হাবার জলে যাওয়ার পথ গ্রামের অনেকেরই জানা। পথ প্রান্তে এক বিশাল বপু মহীরুহর পিছনে সীমা নিজেকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকে। সীমা একটু বেশীমাত্রায় সাবধান। ব্যাটা যদি সীমার অস্তিত্ব টের পায় তাহলে পিঠটান দেবে।
নিশ্চিন্তে আপন-মনে চলেছে হাবা, মাঝে মধ্যে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে। হাবার প্রাণের ভেতরটা যে একেবারে আনচান করছে না এমন নয়। এ যেন নিজেকে নিশ্চিন্ততার আবরণে ঢেকে ফেলে বাইরে থেকে দেখার চেষ্টা। এই মুহূর্তে যদি মনে হয় কেউ দেখে ফেলতে পারে পরমুহূর্তে মনে হয় এই নিকষ কালো অন্ধকারে কে আসবে, কারও কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই? এমনই অসময়ে সীমা গাছের গুঁড়ির পেছন থেকে ঝপ করে বেরিয়ে হাবার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। হাবা, সীমাকে ঠাওর করতে না পেরে মুখ ফসকে বলে ফেলে 'আমায় ছেড়ে দাও আমি কিছু জানিনা।' সীমার ভয় মিশ্রিত উৎসুক কন্ঠ বলে, 'কি জানিস না তুই? বল,তোর কি হয়েছে। গতকাল তোর বাড়ি এসেছিলাম, তোর সঙ্গে দেখা হয়নি। এত সকালে বেরনো কোন কারনে? বাঁধভাঙা প্রশ্নর জোয়ারে হাবা বলে, 'সত্যি, মাইরি বলছি আমি কিছু জানিনা।' সীমা বলে, 'কী জানার কথা বলছিস তুই? আজ আমি তোকে ছাড়বোনা।' ভয় পেয়ে হাবা উত্তর করে,'আমি মারিনি, সত্যি বলছি আমি মারিনি।' বিস্মিত সীমা বুঝতে পারে হাবা মজুমদারের গল্পটা জানে। ভোরের আলো ফুটতে বেশি বাকি নেই। সীমা মনে ভাবে এত সকালে ওদের দুজনকে কেউ দেখলে গ্রামে রটনা হবে। দুজনেরই বিপদ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কাল ভোরে হারু জমির মালিকের সাথে দেখা করতে যাবে বর্ধমানে। তারপর বাজার থেকে বীজ সার কিনে ফিরবে। এই সুযোগে সে হাবার কাছ থেকে সবটা শুনে নেবে। খুব দৃঢ নয় আবদারের সুরে সীমা বলে,'কাল ভোরে তুই আমার বাড়ি আসতে পারবি? কেউ থাকবে না।' ভয়ের শূন্য দৃষ্টি দিয়ে হাবা যন্ত্রবত ঘাড় নাড়ে। সীমা ঘরপানে হাঁটা দেওয়ার আগে বলে,'কথা দিলি কিন্তু।'
আজ ভোর থেকে অভয় বিছানায় শুয়ে আছে। কোনদিন এমনটা হয়না। সকাল ছটা বাজলেই দাঁত মেজে সদরে গিয়ে বসে পড়ে সে। ক্ষেতমুখী কৃষক সাথীদের সাথে বাক্যবিনিময় করা তার অভ্যাস তারপর চা খেয়ে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া। কোনদিন চা এর আয়োজনে দেরি হলে, সদর থেকেই চিল চিৎকার,' কি গো চায়ের কতদুর?' তখন বীণা শশব্যস্ত হয়। আজ বেলা একটু বেশিই গড়িয়েছে। বীণা খেয়াল করেনি। হঠাৎই রান্নাঘর থেকে ঘড়ির দিকে চোখ পড়ে যায় বীণার, মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। মন এমনিতেই চঞ্চল বেশ কিছুদিন ধরে, রাজনৈতিক অস্থিরতার ঢেউ সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে যার থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছেনা। ওর স্বামীকে ঘিরে যে ছোট্ট শান্তির নীড় সেখানেও বিতর্কের জোয়ার। ঘড়ির কাঁটার ঘোড়দৌড় বীণার চঞ্চলতা বাড়ায়। রিতাকে চিৎকার করে ডাকার মধ্য দিয়ে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। বৌদির অমন ডাকে বিহ্বল হয়ে রিতা দৌড়ে অভয়দার ঘরে যায়। রিতার আর্তনাদে বীণা এসে দেখে বুকে হাত দিয়ে কাতরাচ্ছে অভয়। বীণার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।
ওদিকে সূর্যদেব ভোরের আলো ফোটাতে উদ্যোগ নিচ্ছেন। মানুষ কর্মব্যস্ত হবার তাড়নায় সকালের গড়িমশি ভাঙার চেষ্টায় যখন আকুল ঠিক তখন সীমার ঘরের দরজায় টোকা পড়ে। সীমা বুঝতে পারে গতকালের কথামতো হাবা এসে হাজির হয়েছে। হারু বেরিয়ে গেছে বর্ধমানের পথে। সীমা দোর খুলে দেয়, একরাশ হাওয়ার মতো ঘরে ঢুকে পড়ে হাবা। সীমা ওকে বসতে বলে। হারু ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথে সীমা আজ উঠে পড়েছিল। অধীর আগ্রহে হাবার প্রতীক্ষায় ছিল সে। নিমেষে চা বানিয়ে এনে সীমা নিজে নেয় এবং হাবাকে দেয়। সীমা, দাদা বৌদির মতো সকালে চা খাওয়ার অভ্যাস রপ্ত করে ফেলেছে। হাবা বাপের কালে সকালে চা পান করেনি। চায়ের ব্যবস্থা ওর ঘরে অবাস্তব কল্পনা। গভীর চুমুকের তৃপ্তিতে সন্ত্রস্ত হাবাকে একটু স্বাভাবিক লাগে সীমার। আজ সীমার অন্য কথায় মন নেই। দেরি হলে যদি কেউ এসে বাধ সাধে। ও তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে চায় জানার সবকিছু। তড়িঘড়ি সীমা প্রশ্ন করে, 'হাবা, তোর সাথে ওদের পরিচয় ঘটলো কি ভাবে?' হাবা গল্পের ছলে বলে, একদিন মাছ ধরতে যাচ্ছি- ওদের মধ্যে একজন, নাম সত্যজিত,হেঁসে জিজ্ঞেস করে আপনার নাম হাবা দা? আমি অবাক হয়ে যাই, জন্ম থেকে কেউ কোনদিন আমাকে তুই ছাড়া কিছু বলেনি তার আবার দাদা। আমি ঘাড় নেড়ে জানাই হ্যাঁ, উনি বলেন, ‘আমাদের মাছ ধরতে নিয়ে যাবেন? আমাদের ছোটবেলা থেকে শখ ছিল ডিঙ্গি নৌকায় ভেসে যাওয়ার’। আমি বললাম, ‘চলুন’, সেই শুরু, সেদিন সব মাছ ওরা পয়সা দিয়ে কিনে নিয়েছিল। অনেকদিন পর আমরা সবাই পেটপুরে মাছ ডাল ভাত খেয়েছিলাম। ওরা কেউ-না-কেউ প্রত্যেকদিন আমার ডিঙ্গি নৌকায় সওয়ার হত। কত গল্প বলতো, জানতে চাইতো আমার ছেলেবেলার কথা,বেড়ে ওঠার কথা। মাঝে মধ্যে আমার ঘরে এসে ওরা থাকতো। ওদের কাছে অন্য দেশের গল্প শুনতাম। একদিন সত্যদার বন্ধু মেঘদা জিজ্ঞেস করল, আমাদের এখানে সুদে টাকা খাটায় এমন মহাজন' আছে কি না? আমি এক নিঃশ্বাসে অনেকের নাম বলে ফেললাম। ওরা জানতে চায় আমি কোন কাজে কখনো সুদের টাকা ধার নিয়েছি কিনা। আমি বলি আমার টাকা কোন কাজে লাগবে। আমার চাল কেনার জন্য যা টাকা লাগে। আমি নিজে থেকে বলি এইখানে একজন বদমাশ জোতদার আছে। আমার বউয়ের প্রতি ওর নজর আছে। আমাকে ওরা মানুষ বলেই মনে করে না। মজুমদার ভেবেছিল ওর প্রস্তাবে আমি রাজি হব সে চেয়েছিল আমার ফেলা কে বাড়ির ঠিকে ঝি এর কাজে নেবে। এই প্রস্তাব আমি নাকচ করে দিয়ে বলেছিলাম। পয়সার বিনিময়ে আমি বউকে বেচব তেমন খানকির ব্যাটা আমি নই।'
ঝরনার মতো ঝরে পড়ে হাবার উচ্ছ্বাস। সীমা চুপটি করে বসে শুনতে থাকে। হাবা আবার শুরু করে- মেঘদা একদিন জিজ্ঞেস করছিল গ্রামের লোক এই সমস্ত জোতদার মহাজনকে ঘৃণা করে কিনা। আমি বলি অন্যদের কথা বলতে পারবোনা আমি যদি কোনদিন মজুমদারকে খাপে পাই দেখে নেব। সীমা ইশারায় হাবাকে ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে নিয়ে যেতে বলে। হাবা বলে ওদের কাছে শুনি ওদের পার্টির লোক কিভাবে বাংলার গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। ডুবনা, বাগদিপাড়া পালসিটের আশেপাশে গ্রামগুলোর দায়িত্বে আছেন সত্যজিতদা মেঘদা। পার্টির নির্দেশ অত্যাচারী জমিদার জোতদার মহাজনদের খতম করতে হবে। এই খতম অভিযান আমাদের নাকি জোটবদ্ধ করবে,পার্টি বেড়ে উঠবে গঞ্জে গ্রামে। ওরা কেউ এক জায়গায় থাকে না জায়গা বদল করে একছন নেয়।' সীমা বলে, 'একছন কি রে?' হাবা বলে জোতদার খতম। সীমা হেঁসে ওঠে। হাবা এড়িয়ে গিয়ে সীমার প্রশ্নর খেই ধরে বলে চলে ‘মজুমদার হয়তো বুঝতে পেরেছিল, তবে খুনখারাপি হয়ে যাবে এতটা আন্দাজ করতে পারেনি। ওরা ভাবতো এরা তোদের পার্টির মতো একটা পার্টি, গরিবের কথা বলে গরীবকে দলে টানার চেষ্টা করে’। সীমা অবাক হয়ে যায়। গ্রামে বোবা কালা হাবা সমার্থক ছিল। ওর চেতনার কী বিস্ময়কর পরিবর্তন। হাবা বলে চলে মজুমদাররা ভেবেছিল ওদের সুবিধাই হবে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যদি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়, তাতে ওদের সুবিধা। তোদের পার্টির কিছু নেতা মজুমদারদের পক্ষে আছে। একমাত্র অভয় মাস্টারকে কব্জা করতে পারলেই মজুমদার বাজি মাত করতে পারবে। তুই তো ভালোই জানিস নেতাদের। সীমা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। জানিস সীমা, সত্যদা আমার বউয়ের সাথে ভাই পাতিয়েছে। সীমা দেখে হাবার চোখ চকচক করছে আবেগে। মানুষ ভালবাসার কাঙ্গাল, শ্রমজীবী গরিব মানুষকে হৃদয় থেকে ভালোবাসা, সম্মান দিতে পারলে মানুষকে জিতে নেওয়ার মুহূর্তের বাজি। অভয়দার কাছে যা সম্ভব অন্যর কাছে তা অধরা।
সীমা এবার সেদিনের ঘটনা জানতে চায়। হাবার চোখ দেখে সীমা বুঝে যায় বাকিটুকু বলার ক্ষেত্রে হাবার দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। সীমা জানায় তার থেকে হাবার কোনো ভয় নেই সে মরে গেলেও হাবার কথা কারও কাছে কবুল করবে না। হাবা সীমাকে চেনে, বিশ্বাস করে। সীমা কোনদিন কোন অসৎ কাজ সমর্থন করে না, এমনকি জীবন দিয়েও সে কথা রাখবে এ বিশ্বাস হাবার আজও অটুট। শুধু বুকে বেঁচে আছে চিনচিনে ব্যাথা। হাবা সীমার ভালবাসার কাঙ্গাল ছিল একথা সে কখনও ভুলতে পারেনি। ফের শুরু করে হাবা - ঘটনার আগের দিন রাতে শ্মশান পেরিয়ে যে বটগাছ আছে সেখানে আমাদের মিটিং বসে। সিদ্ধান্ত হয় ভোরবেলা বাঁধের ধারের পোড়ো ঘরে আমরা লুকিয়ে থাকবো। কাকভোরে রোজ মজুমদার মোটর বাইকের পেছনে বসে এলাকা টহল দেয়। আমাদের সবাই মুখোশের মতো থলে পড়ে নেয় মাথায়। আগে থেকেই ঠিক ছিল মোটরবাইকে চালককে হত্যা করা হবে না, কিন্তু ও দেখে ফেলতে পারে তাই এমন ব্যবস্থা। আমার সঙ্গে গ্রামের দুজন আর সত্যদাদাবাবুরা পাঁচজন। একইভাবে রতন সাউয়ের জন্যও পরিকল্পনা তৈরি ছিল। আমরা অপেক্ষা করতে থাকি। দূর থেকে ফটফটির আওয়াজ শোনা যায়। আমরা ঠিকঠাক যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ি। সীমা হাত দেখিয়ে থামায় বলে,'বাকিটা পরে শুনছি, এখন বল তুই আজকে কি ভাবছিস?' ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায় হাবা। একটু থমকে গিয়ে বুঝে নিতে চায় সীমার প্রশ্নের ওজন। তারপর বলে যা হয়েছে ঠিক হয়েছে। রতন সাউ, মজুমদার জীবনেও শোধরাবে না। বরং সত্যদা যা বলে তার সার হল আরও সময় নিলে ভালো হতো। শহর থেকে আসা কমরেডদের নেতা সাজা ঠিক কাজ নয়। জনগণ নিজের নেতা নিজে তৈরি করবে এবং এককাট্টা হয়ে জাগবে। তবেই আন্দোলনের গড়ন জন..জন.... জনযুদ্ধর ছাঁচে ঘটবে। সীমা বলে, ‘ওরে থাম থাম। তুই কি সব মুখস্ত করেছিস’? হাবা বলে, ‘এতোবার শুনেছি মুখস্থ হয়ে গেছে শুধু ঐ জন আর যুদ্ধ একসাথে বলতে পারিনা। সীমার মনে প্রশ্ন থাকলেও সে নিজেকে সামলে নেয় যদি হাবার কথার ফোয়ারা থমকে যায়। হাবা ফের বলতে শুরু করে - সত্যদা বলে নিকেশের পরের হ্যাপা অনেক। রাস্ত যদি নখ দাঁত নিয়ে বাঘের মতো নেমে আসে তখন কি করে প্রতিরোধ করব?’ সীমা আর না পেরে হেসে বলে,'রাস্ত নয় রে হারামজাদা, রাষ্ট্র'।' হাবা বলে, 'ওই হল, এত শক্ত শক্ত কথা কি আমি কইতে পারি।' সত্যর কথা সীমা বুঝতে পারে, খতম অভিযানের পরবর্তীতে কী ঘটবে তার সম্যক ধারণা কারও নেই অভয় দা এমনই বলে। সীমা জিজ্ঞেস করে তোর গাঁয়ের সেনাদের খবর কি তারাও কি ফেরার? হাবা ঘাড় নাড়ে। 'মজুমদারের কাছ থেকে যে দুটো রিভলবার পাওয়া গেছে সেটাও সত্যদাদের জিম্বায়, কোন সাহসে ওরা থাকবে গ্রামে?' হাবাকে এত স্বতঃস্ফূর্ত হতে দেখে সীমা জিজ্ঞেস বলে,'তুইতো জলে জঙ্গলে থাকিস। কোন খবরই পাওয়া যায় না। ভয় শীতের মতো হাড় কাঁপিয়ে বুকে চেপে বসে থাকলেও গ্রামের মানুষ বেশ খুশিতে আছে জানিস তা?' হাবার চোখের প্রত্যয় সীমাকে বিস্মিত করে। সে ভাবে হাবা আশায় আছে ওর সত্যদার দলবল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ফিরে আসবে গ্রামকে মুক্ত করতে। হাবার কাছে সীমার জানতে ইচ্ছে হয় কিভাবে এতখানি গভীর বিশ্বাস হাবা অর্জন করলো? হাবা জানায়'ওদের সাহস আর ইচ্ছা নিয়ে আমার সন্দেহ নেই। কাঁচের দু'দিক দিয়ে দেখা যায়, ওরাও এমন। ওরা এখন নিশ্চয় অন্য কোথাও একই কাজে ব্যস্ত। হয়তো কেউ কেউ ধরাও পড়ে গেছে কিন্তু ভয়ে পিছপা হবার লোক ওরা নয়’।
হাবার আশাবাদের ছোঁয়াচ বুকে বেঁধে সম্মোহিত হয়ে বসে থাকে সীমা। তারপর ক্ষণিকের নীরবতা ভেঙ্গে হাবাকে বলে আসল ঘটনায় ফিরতে। হাবা ফের শুরু করে- কুয়াশা ভোরের আলোকে শুষে নিয়েছে। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে ফটফটির আওয়াজ। সকালে কোনও কারনে পাখিরাও চুপ। ফটফটির ধুকপুক শব্দ কাছে আসছে অথচ হেডলাইটের আলো কেমন ক্যেইলে গেছে। সকাল যেন শীতের চাদর উড়িয়ে মানুষের মতো লুকাতে চাইছিল। হাবার অগোছালো কথায় সীমা মনে মনে ছবি সাজিয়ে উপলব্ধি করতে চাইছে সবটা। সীমার মনে হচ্ছে সেদিন যেন সে ঐ মুহূর্তে হাজির ছিল। সীমা তাগাদা দেয় , 'তারপর তারপর।' ‘হঠাৎ বাঁক নিয়ে ফটফটি সামনে এসে হাজির হয়। প্রথমে একটা আধলা ইট পড়ে গাড়ির ওপর। ইটের আঘাতে হতচকিত চালক উল্টে পড়ে। আমরা বেরিয়ে এসে ওদের ঘিরে ধরি। মজুমদার আছড়ে পড়ে ছিল মাটির উপর। তাড়াতাড়ি চালক দাঁড়িয়ে উঠে বন্দুক বের করার চেষ্টা করে। আবার একটা থান ইট আছড়ে পড়ে ওর বুকে। হাত থেকে বন্দুক ছিটকে যায়। নিমেষে মেঘদা বন্দুক তুলে নেয় হাতে। বন্দুকের নল মাথায় ঠেকিয়ে বলে- যদি আর কোনদিন দালালি করতে গ্রামে ফিরে এসেছো, ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করে দেব। মজুমদারের চামচা মালিকের সামনে জেবন ভিক্ষা চায়। মেঘদা আরও বলে - কেউ যেন কিচ্ছুটি জানতে না পারে, যাও পালাও’। মজুমদার তখনও কপচাচ্ছে - সব কটা হারামির বাচ্চা কে দেখে নেব। সীমা জিজ্ঞেস করে,'মজুমদার তোকে চিনতে পারেনি।' হাবা বলে,' হ্যাঁ, আমার চলা দেখে ও বুঝে গিয়েছিল। আমাকে বলে 'বেজন্মার বাচ্চা, আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।' মজুমদারকে, কে সাবাড় করবে তখনও ঠিক ছিলোনা। বেজম্মা বলায় আমার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। কাতানটা অন্যর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ওর মাথা এক কোপে বাদুড় ঝোলা করে দিই, বাকি কাজ সেরে ফেলে দুই স্যাঙাত। তারপর লাশটা টেনে এনে ফেলে দিয়ে যে যার মতো হাওয়া দেই।' অবাক হয়ে শুনছিল সীমা। ওর কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না হাবা এমনটা ঘটাতে পারে! সীমা ওর অবিশ্বাসের কথা জানাতে গিয়ে দেখে হাবা তখনও হাঁফাচ্ছে। মাঘের কনকনে ঠান্ডায় দরদর করে ঘামছে হাবা।
সীমা চটজলদি নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে পড়ে এগিয়ে যায় হাবার দিকে। হাবার নিজেকে সন্ত্রস্ত লাগে, চোখের তারায় অসীম জিজ্ঞাসা নিয়ে সে দু পা পিছিয়ে যায়। সীমা দ্রুত হাবার দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজের হাতে আলতো করে হাবার ডান হাতটা তুলে নেয়। কি এক অজানা আবিষ্কারের নেশায় সীমা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার হাবার হাতটা উল্টে পাল্টে দেখতে থাকে। হাবা তখনোও হাঁফাচ্ছে। সীমার চোখের তীব্র চাহনিতে বিদ্ধ হাবা ভেবে পাচ্ছে না তার আশু কর্তব্য। সীমার আঙুল হাবার দক্ষিণ হস্তের তর্জনী মধ্যমা অনামিকা হয়ে বয়ে চলেছে। হাবার বুকের ইঞ্জিন গতিপথ বদল করে অন্য রকম ছুটতে চাইছে কিন্তু অতীত শৃংখলার নিগড়ে সে বাঁধা। সীমার ঠোঁট ততক্ষনে হাবার আঙুল ছুঁয়েছে। অস্ফুট উচ্চারণে সীমা বলে,'আমি তোকে চিনতে ভুল করেছি।' হাবার চোখে দু ফোঁটা জল ঝরে পড়ে। সীমা ভাবে কৃতকর্মের জন্য হাবার খেদ অনুশোচনা চোখের জল হয়ে ঝরে পড়ছে। হাবার মনের অবস্থান বোঝার চেষ্টায় সীমা যখন উদগ্রীব হাবার বুকের স্টিম ইঞ্জিন ততক্ষণে গতি বাড়িয়ে অন্য পথ ধরেছে। সীমার হাতে হাবা তখনও ধরা পড়ে আছে। ঠিকটা বুঝে নিতে সীমা ভুল করে না। হ্যাঁচকা টানে সীমা হাবাকে বুকে টেনে নেয়। আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ যেন এক পৃথিবী জল নিয়ে এক লহমায় আকাশ ফাটিয়ে নেমে আসবে। ঝর্ণা কলমের কালি যেরকম ব্লটিং পেপারে চারিয়ে যায় হাবার বুকের তোলপাড় জলপ্রপাত তেমনই সীমা, অনাবিল ভালবাসার কাগজে নিজের বুকে শুষে নিতে চায়। বিজ্ঞানে কি একটা কথা আছে ভরবেগের নিত্যতা সূত্র, উভয়ের বুকের কম্পাঙ্কে যেন তারই প্রমাণ। হাবার সাবলীল হাতদুটো সীমার মাথার চুলে বিলি কাটছে। সীমা চট করে ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে মুখ সরিয়ে নেয়। শরীরী এই কপট ভাষা হাবার চাহিদাকে তীব্রতর করে তোলে। পাগলের মত হাবার ঠোঁট দখল নিতে চায় সীমার ঠোঁটের। আতিপাতি করে হাবা সীমার বুকে খুঁজে চলেছে ভালোবাসার অমৃত কুম্ভ। অনাসক্তির ভান করে ক্ষণিক মাটিতে শুয়ে চরম তৃপ্তিতে ভালোবাসায় গলে গলে পড়ছিল সীমা। ওর শরীর ভাষায় হাবার কাছে লুটেপুটে নেওয়ার আহ্বান। হাবা তখন মত্তদন্তি। সারা জীবনের কল্পনাবিলাস, শরীরের প্রতিটি কোষে কোষে জমাট বাঁধা চাহিদা, এই প্রথম গলনাঙ্কে পৌঁছেছে। অধরা আকাশচরা হংসবলাকা আজ হাবার পিঞ্জরে বাস্তব। এই কল্পলোকের ঠিকানা ওর কাছে অলীক ছিল ও সীমাকে শুধায়, ‘আমি কি স্বপ্ন দেখছি?' সীমা হেঁসে উত্তর দিতে উদ্যোগী হয় আর ঠিক সেই সময়ে দোরে কেউ খটাখট শব্দ করে। শব্দর কর্কশতা হাবার কর্ণকুহরে প্রবেশ করতে পারেনি। প্রেমে মাতোয়ারা হাবা তার কৃত কর্মের স্বীকৃতি পেয়েছে সীমার শরীরি উতসবে। হাবা নিজের মতো বুঝতে পেরেছে সীমার এই আকুল চাওয়া কোন হঠকারিতা নয়। হারুর অন্তরের ভীরুতা আজ দাড়িপাল্লায় চড়েছে হাবার সাহসী পদক্ষেপে। দরজায় পুনর্বার ধাক্কা লাগে আগের চেয়ে শতগুণ তীব্রতায়। সীমা বুঝতে পারে যে দরজা ধাক্কাচ্ছে তার প্রয়োজনের ব্যাপকতা। চটজলদি সীমা নিজেকে গুছিয়ে নেয়। সীমা শুধু আন্দাজ করতে পারে না এত সকালে কে আসবে, তাহলে কি হারু! আলুথালু বেশভুষা তখন অনেকটাই স্বাভাবিক। হাবা আজ বেখেয়ালি যেন নিজের বাড়িতে আছে সে। সীমা কিছু বলার আগেই হাবা দোর খুলে দিয়েছে। সীমা ততক্ষণে লজ্জা নিবারণ করতে পারলেও শরীরে থেকে যাওয়া আদরের দাগ তার পক্ষে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। মেঝেতে তখনও হাবার ময়লা জামা সোয়েটার ছড়িয়ে আছে। হাবা দোর খুলে দেখে তার খুকি এসেছে। চকিতে হতভম্ব হাবা চুপ মেরে যায়। বাতাসী কি বলবে ভেবে উঠতে পারেনা। প্রাথমিক নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে হাবা বলে বাতাসী তুমি? এই প্রথম হাবা কাকার কন্ঠে বাতাসী ডাক শুনলো খুকি। সীমা ততক্ষনে হাবাকে সরিয়ে দোরের দখল নিয়েছে। ছোট্ট সময়ের ভেতর সীমা চেষ্টা করছিল স্বাভাবিক হতে,নিবিয়ে ফেলতে শরীরে খেলে যাওয়া অনন্ত রংয়ের তুবড়ি। সীমার চোখের জিজ্ঞাসা ফিরিয়ে দেয় বাতাসী ছোট্ট দুটি শব্দের উচ্চারণে 'বাবা অসুস্থ।' নিমেষে সীমার শরীরী হিল্লোল থেমে যায়। সীমা চিৎকার করে বলে,' হাবা, তুই দোর দিয়ে চলে যাস দাদা অসুস্থ আমি চললাম।' পথটুকু হনহন করে চলতে থাকে দুজনে। বাতাসী মাঝে মধ্যেই সীমার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। বাতাসীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে নিস্তার পেতে সীমা বলে, 'হাবা কে অনেকদিন ধরে দেখা যাচ্ছে না তাই ওর খবর নেবার জন্য ওকে আসতে বলেছিলাম।' বাতাসী জানে হাবা কাকা কাদের সঙ্গে মেশে। হাবা কাকা যে বিপদগ্রস্ত হতে পারে এও তার অজানা নয়, তা বলে এত সকালে হাবাকাকা হারু কাকার অবর্তমানে পিসির বাড়িতে আসবে! পরক্ষনেই মেয়ে আবার অন্যরকম চিন্তায় ডুবে যায়, হয়তো হারু কাকার সামনে এই কাহিনী শুনতে চায়নি পিসি। কিন্তু তাহলে হাবাকাকা উদলা গায়ে ছিল কেন? আবার এমন কিছু যদি সত্যিই ঘটত তাহলে হাবা কাকা অত সহজে দরজা খুলে দেবে কেন? সে তো পিছন দিক দিয়ে পালাতে পারত। সীমা পিসি আর হাবা কাকাকে নিয়ে কোনদিন কোন রটনা বাতাসী শোনেনি। গ্রামবাংলায় ঘটনাহীন রটনা ঘটনার স্বীকৃতি পায়। সত্যিই এমন কিছু থাকলে আমার চোখে পড়তো না এমনটা হতে পারে না, বাতাসী নিজের মতো ভেবে চলে। সীমাও ভাবতে থাকে ওদের নিজেদের দুজনের মধ্যে পুরনো ফেলে আসা চোরা স্রোত নিশ্চিত কোন বেদরদী চাদরে ঢাকা পড়েছিল এতদিন। না হলে পার্থিব ছোঁয়ার বিদ্যুত পরশে অকারণে শরীর ঝলসে উঠত না। হাবা কাকা এবং ফেলা কাকিমা বা হারু কাকা আর সীমা পিসি এদের ভালোবাসায় কি কোনো ফাটল ছিল? কোথাও কেউ কোনদিন নিজেদের জীবনে কোনও অতৃপ্তি প্রকাশ করেনি কখনো, তাহলে? তল পায় না বাতাসী। সীমা মনে ভাবে বাপ সোহাগী মেয়ের কি এমন হলো বাপের অসুস্থতার উদ্বেগ ঢেকে গেল নিরুত্তাপ ভাবনার অকাল মোড়কে। এই পরিবেশ এক্ষুনি ভেঙে ফেলা দরকার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সীমা বলে,'চিন্তা করিসনা আমি থাকতে দাদার কিচ্ছুটি হবেনা,দাদা ঠিক ভালো হয়ে যাবে।' আচমকাই আবেগ তাড়িত ভাষণে সম্বিত ফিরে পায় মেয়ে। সীমার হাতদুটো ধরে বলে 'তোমার কথাই যেন ঠিক হয় পিসি।' ছন্দ মিলিয়ে একই উদ্বেগে দুজনে পা মেলায় গন্তব্যে।
প্রতি বছরের মতো রেলযাত্রীদের শীতকালীন বাৎসরিক পিকনিক শিয়রে এসে হাজির। অর্ক এবছর মরশুমি মাতালদের এই উৎসব থেকে অব্যাহতি চেয়েছে। নিশিথদার কাছে ও নিজের অবস্থান জানিয়ে কেন অংশগ্রহণ করতে পারবে না তা বলেছে। ও মনস্থির করতে পারেনি,মা কে কি জানাবে। অঞ্জলী দিন বেঁধে দিয়েছে, রবিবারের মধ্যে অর্ক কে সিধান্ত জানাতে হবে। না,হলে অঞ্জলী অর্কর বিয়ের ব্যবস্থা নেবে। রথিন এই গল্প শুনে সরাসরি অর্ক কে বলে, 'ঠিক আছে,আমার মাথায় একটা পরিকল্পনা আছে, রবিবার রাত্রে তুমি মাসিমা কে জানিয়ে দেবে- বিয়ে তুমি করছ এবং নিজের পছন্দের নারী কে। রবিবার দিনেই যা হেস্তনেস্ত হওয়ার হবে। অর্ক লাজুক মুখে রথিনের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ভাবে নিশ্চয়ই ছিটেলটার মাথায় কিছু বুদ্ধি এসেছে। সে যেতে রাজি হয়ে যায়।
বাঁশবেড়িয়া হংসেশ্বরী মন্দির এর কাছে রথিনের জানা একটা ঠেক আছে,কোন ঝুট-ঝামেলা নেই। সারাদিন মন্দির দেখে কাটানো যাবে। বাঁশবেড়িয়া যাওয়া হবে শুনে অর্কর ভালো লাগে।নারায়ণ সান্যালের হংসেশ্বরী ওর সদ্য পড়া হয়েছে,বাড়িতে গিয়ে ভালোলাগার বিশেষ বিশেষ অংশগুলো একটু চোখ বুলিয়ে নেয় সে। নির্দিষ্ট দিনে সকলে হাজির হয় নির্দিষ্ট জায়গা মানে রথিনের ডেরায়। রথিন ভোর সকালে হাজির হয়ে গেছে সেখানে,প্রাতরাশ প্রস্তুত। এরপর ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কে কোথায় উধাও হবে কেউ জানে না। অর্ক প্রত্যেক বছরের মতো ব্যবস্থাপনায় থাকে এবার ওর মন উড়ু উড়ু। রথিন সবার অজান্তে মেয়েদের জন্য একটা ঘর ব্যবস্থা করে রেখেছিল,সময়মতো প্রাতরাশ পৌছে গেছে সেখানে। রথিনের পরিকল্পনা নিশিথ দা ছাড়া কেউ জানে না, আর জানে পিকনিকে উপস্থিত দুই কন্যা। তাসের জুয়া জমে গেছে, আজ বাঁধনহারা সক্কলে। মাতালদের গ্রুপ একটু দূরে নিভৃতে। অপকর্মের সাক্ষী রাখতে নেই এই ওদের আপ্তবাক্য।
নিশিথ উৎসাহীদের নিয়ে মন্দিরের দিকে হাঁটা দেয়। আজ অর্ক গাইড এর ভূমিকায়,ওর দু'জোড়া চোখে দুরবিন লাগানো সে প্লাটফর্ম থেকে সন্ধান করে ফিরছে এক জোড়া আয়ত চক্ষুর। রথিনের আখড়ায় বাতাসীর টিকিটি খুঁজে না পেয়ে অর্কর হতাশা বাড়তে থাকে। এখন উত্তর ভারতীয় মানুষজনের মতো রাম ভরসায় থাকা থুড়ি, রামরহিম এখানে রথিনের সমার্থক। শিক্ষক না হয়েও শিক্ষকতা অর্কর ভালোলাগা,আর ছাত্রী যদি হয় বাতাসী তাহলে তো কথাই নেই। মনে মনে অর্কর বাসনা হংসেশ্বরীর গুণকীর্তনে নারায়ণ সান্যাল কে ছাপিয়ে যাওয়া। কিন্তু কোথায় বাতাসী, সে যেন হংসেশ্বরী উপন্যাসের গঙ্গা। যার কোন হদিস খুঁজে পায় না অর্ক বাঁশবেড়িয়ায়। বাড়ির কাছে আরশিনগর অথচ এত কাছে থেকেও অর্কর দেখা হয়নি হংসেশ্বরী মন্দির। উপন্যাসের রাজা নৃসিংহদেবের গঙ্গা কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে তার হদিশ পেতে চঞ্চল হয় অর্ক। যেন সেখানে গেলেই বাতাসীকে পাওয়া যাবে। রথিনের মেজাজ বেশ ফুরফুরে কেউ জানে না কখন গিয়ে সে দু পেগ চড়িয়ে এসেছে। ইয়ার্কি করে রথিন জিজ্ঞেস করে’ অর্কদাকে,’কিছু খুঁজে পেলে?' অর্ক বোকার মতো দাঁড়িয়ে পড়ে। রথিন হো হো করে হেসে উঠে ডানলপ ঘাটের দিকে নিয়ে যায় সব্বাইকে। ঘাটে আবেশ এনে দেওয়া মনোরম শীতেল হাওয়া। মাঝ গঙ্গায় বিরাট চরা। ভটভটি নৌকো চরা কেটে হালিশহর পাড়ি দিচ্ছে। দলের অনেকে নৌকো চড়ে দ্বীপে নামার ইচ্ছে প্রকাশ করে। এই নিয়ে বাদানুবাদ শুরু হয়। ক্রমশই হতাশ হয়ে পড়ছে অর্ক। দূরের কোন শহরতলী থেকে এসে একটা নৌকো ঘাটে ভিড়লো। অর্কর মনের মনি কোঠায় হঠাৎ রাজা নরসিংহদেবের স্ত্রী ছোট রাণীমা এসে জুড়ে বসেন। তাঁর অন্তর্জলী যাত্রার দিন লাখও লোকের মেলা। তারও অনেক আগে ভ্রমের বশে রাণীমা সহমরণের সিধান্ত নিয়েছিলেন। রাণীমার লোলুপ স্বজনের দল মুখিয়ে ছিল তাঁর মৃত্যুর পর সর্বস্ব ভোগদখল করবে বলে। আজ অর্ক গল্পের পটভূমি থেকে স্মৃতি রোমন্থন করে চলেছে। ঘাটে দাড়ি-গোঁফে মুখ ঢাকা এক দীর্ঘদেহী বৃদ্ধ নেমে এলেন নৌকো থেকে। সাবধান করছে একজন, 'বাবা পিছল ঘাট সাবধানে নামুন।' বৃদ্ধ বলছেন, 'আমি ভিনদেশী নই গো, এই ঘাটের প্রতিটি ইট আমার চেনা। অর্কর চোখ উপবীত পরিহিত বৃদ্ধর দিকে নিবিষ্ট। সে আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না। জনসমাগমে লঞ্চঘাট সেদিনের বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। অর্ক কল্পনার চোখে ফিরে গেছে অতীতে। পুঁথি থেকে উঠে আসা বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ শংকরদেব সকল অতীত নিয়ে হাজির আজ এই ঘাটে। অর্ক যেন তাকেই প্রত্যক্ষ করছে। অর্ক দেখছে ধীরু পদক্ষেপে বৃদ্ধ শাস্ত্রবিদ দুই হাতে উপবিত ঘষতে ঘষতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছেন। ঘাটের উপর থেকে রথিন কে উদ্দেশ্য করে এক মহিলা কন্ঠ আবদার জানাচ্ছে নৌকো চড়ার। অর্কর উদাসীনতা রথিন বুঝতে পারে না সে ভাবছে, দাদার কী হল! ঝুপঝাপ পিছল সিঁড়ি ধরে নেমে আসছে মেয়েটা জলের কাছে। জোয়ার ভাঁটার জল শীতকালেও যাতায়াত করে থাকে। বর্ষার শাওলা রঙের সবজে বহিরাবরণ এই সময় ঘাটে অবর্তমান। ঘাটের পিচ্ছিলতা চোখে ধরা পড়ে না। নিশিথ চেঁচিয়ে থামতে বলছে মেয়েটাকে। মুহূর্তে ঘটে যায় পদস্খলন। তিনটি সিঁড়ি হড়কে মেয়েটি সোজা নেমে আসছে। রথিনের চিৎকারে অর্কর ধ্যান ভাঙ্গে। মুহূর্তে ডাইনে সরে এসে এক ঝটকায় অর্ক মেয়েটির হাত ধরে পতন রোধ করে। পতনের ভরবেগে সিঁড়ির প্রশস্ত চাতালে অর্ক ভূপতিত হয়। নিমেষে নিজেকে খাড়া করে অর্ক দেখে মেয়েটি আর কেউ নয় স্বয়ং বাতাসী। বাতাসীর শরীরী ভঙ্গিমায় চোট পাওয়ার ইঙ্গিত। অর্ক , ঘাটে বসার চাতালে বাতাসীকে উবুড় করে শুইয়ে দিয়েছে ততক্ষণে। কোমরে চোট লেগেছে বাতাসীর। কোমরে হাতের চাপ দিয়ে অর্ক বাতাসীকে বলছে, ‘আপনি প্রথমে ডানপা তুলুন তার পর বাঁ পা। কয়েক বার করুন ব্যাথা সেরে যাবে’। আড়ষ্টতায় বাতাসীর পা ঠিক মতো উঠছে না। ‘উঁহু হচ্ছেনা, সিধে, কোমরের জোরে পা তুলতে হবে।‘ অর্কর কঠিন হাতের স্পর্শে অন্য কোন ইঙ্গিত ছিলনা। কিন্তু প্রেমাস্পদের প্রথম পরশে তনু জ্বরজ্বর বাতাসীর চোট কোথায় যে উবে গেছিল সেই জানে। নিশিথ ধীর পদক্ষেপে অর্কর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। রথিন ক্ষণিকের তরে বাক্যহারা। নিশিথকে এগিয়ে যেতে দেখে হরবোলা রথিন অর্ক কে বলে, 'তুমি একটা আস্ত আহাম্মক, বাতাসীদিকে অবজ্ঞা করে বুড়োটাকে দেখছিলে? কিভাবে নজর কাড়তে হয় শেখ।‘ বাতাসী যত না চোট পেয়েছিল লজ্জা পেয়েছিল ততোধিক। নিশিথও অবাক হয়ে অর্ককে জিজ্ঞেস করে 'এত নিবিষ্টচিত্তে তুমি ঐ বৃদ্ধকে কেন দেখছিলে?' উত্তর না করে অর্ক হাতের ইশারায় সবাইকে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা নৌকায় উঠে পড়তে বলে। নৌকা ছেড়ে দিলে অর্ক বলে,’কালের গর্ভ থেকে উঠে এসে কাব্যতীর্থ আজ সকালে সটান হাজির হয়েছে ডানলপ ঘাটে আমার কাছে’। শুরু হয় হংসেশ্বরীর রূপকথা – ছোটো রাণীমার প্রেমিক পুরহিত শংকরদেব কাব্যতীর্থ বংশবাটির সাথে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে এই ঘাট থেকে সওয়ার হয়েছিলেন বারানসীর যাবার নাওয়ে। রাজা রামমোহনের ছিলেন যাত্রা পথের সঙ্গী। যাত্রা পথের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, নদীর পাড়ে অসহায় ভীত সহমরণে যেতে বাধ্য রমণীর ক্রন্দন, ধর্মীয় পৈশাচিক বর্বরতা থেকে জন্ম নেওয়া রামমোহনী দর্শন ও প্রত্যয় কাব্যতীর্থকে নতুন আলোর দিশা দেখায়। ওঁর আট কুঠরি নয় দরজা দিয়ে প্রবেশ করে নতুন ভুবন নব আঙ্গিকে। পুরানো ধর্মীয় ধ্যান ধারনা আঁস্তাকুড়ে ফেলে শেষ বয়সে কাব্যতীর্থ ফিরে এলেন শৈশবের আখড়ায়। নামলেন বংশবাটির এই ঘাটে। ঘাট থেকে এক প্রৌঢ়, শঙ্করদেব কাব্যতীর্থর সঙ্গী হয়েছিলেন। মন্দিরের খোঁজ জানতে চাইলে সেই প্রৌঢ় শুধান, 'কোন মন্দির?' দ্বিধান্বিত কাব্যতীর্থ জিজ্ঞেস করেন 'কেন, অনন্ত বাসুদেব মন্দির ছাড়া আরও কোন মন্দির আছে বংশবাটীতে?' কিঞ্চিৎ হেসে প্রৌঢ় জানান 'ছোট রানীমা শংকরীদেবী এখানে হংসেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন।' চোখ চকচক করে ওঠে বৃদ্ধ কাব্যতীর্থর। তাঁকে অনন্ত বাসুদেবের মন্দিরদ্বারে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নেন অপর বৃদ্ধ। নিশিথ বলে,’ ও এতক্ষণে বুঝলাম, তুমি ভাবের ঘোরে আসল শঙ্করদেবকে প্রত্যক্ষ করছিলে’। কখন যে ওরা নৌকো থেকে নেমে হাঁটা দিয়েছে কারও খেয়াল নেই। গল্পে মশগুল হল্লাপার্টি প্রবেশ করেছে বাসুদেব মন্দিরে। বাতাসীর পদস্খলনে রথিনের নেশা চৌপাট হবার যোগাড় হয়েছিল, এখন গল্পের টানে নেশা উবে কর্পুর। মন্দিরে এখন পূজা পাঠ চলছে। অর্ক মন্দিরের চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাকিরা নিমগ্ন ভক্ত। অর্ক ধীরে মন্দির চাতালে উঠে আসে। রথিন মদ খেয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে নি। পূজা পাঠ শেষ করে চরণামৃত দিচ্ছেন পুরোহিত। সকলে নিষ্ঠাভরে চরণামৃত পান করছেন অর্ক একটু দুরে দাঁড়িয়ে, নির্বিকার। সকলে বেড়িয়ে এলে গল্প আবার শুরু হয়- এমনই একদিন তিনি এসেছিলেন, চরণামৃত উপেক্ষা করায় তৎকালীন পুরোহিত জানতে চেয়ে ছিলেন আগন্তুকের ধর্ম পরিচয়। তাঁর কথায় তৎকালীন পুরোহিত জানতে পেরেছিলেন কাব্যতীর্থ শঙ্করাদেবের আসল পরিচয়। রামমোহনের সাহচর্য্য, অর্জিত প্রজ্ঞায় কাব্যতীর্থর ধর্ম সম্পর্কে ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল। তিনি পৌত্তলিক ধর্মবিশ্বাস বর্জন করে ব্রাম্ভ ধর্ম গ্রহন করেছিলেন। তাঁর আকুল মন মৃত্যুর আগে শৈশবের পূণ্যভূমি আর প্রাণাধিক প্রেমিকা শংকরীর ফেলে যাওয়া ইতিহাসের খোঁজ পেতে আকুল ছিল। কাব্যতীর্থ লোক মুখে জেনেছিলেন রাণীমার সহমরনে যাওয়ার খবর। সেই ভুল ধারণার নিরসন করেন মন্দিরের তৎকালীন কুলো পুরহিত। তিনি জানান রাজা নৃসিংহদেবের সাথে সহমরণে যাওয়ার ইচ্ছা রাণীমা প্রত্যাহার করেছিলেন। রানীমা বুঝতে পেরেছিলেন তাঁকে সহমরণে প্ররোচিত করতে চাওয়া আদতে রাজসম্পত্তি গ্রাস করার চক্রান্ত। শব যাত্রার পূর্বে কালেক্টরেটের অফিসে ঘোড়সওয়ার মারফত চিঠি পাঠিয়ে ইংরেজ ফৌজের সহযোগিতায় তিনি অব্যাহতি পান। দেশ গাঁয়ে তার নামে ঢিঢি পড়ে যায়। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পথে নিজেকে প্রমান করে ফের ছোটরাণীমা মানুষের মনের মণিকোঠায় তাঁর হারানো স্থান ফিরে পান। ছোটরাণীমার সংগ্রামের ইতিবৃত্তে মুগ্ধ কাব্যতীর্থ স্বগতোক্তি করেন ‘বিদুষী গার্গী’। প্রতিপ্রশ্ন ফিরে আসে পুরহিতের কাছ থেকে,’কিছু বললেন?’ ‘হ্যাঁ, মানে, উনি গত হলেন কিভাবে?' এতটুকু বলে চুপ মেরে যায় অর্ক। তর সইতে না পেরে বাতাসী বলে, ‘বলুন না অর্কদা, রাণীমার সঙ্গে কাব্যতীর্থর দেখা হয় নি?’ ছোট্ট হাঁসিতে বিদ্ধ্ব করে অর্ক ফিরে যায় অতীতে, মন্দিরের প্রবীন পুরহিতের ভাষ্যে,'অনাগত মৃত্যুর সাধনায় আজ ওনার অন্তর্জলী যাত্রা। একজন পুণ্যাত্মা মহতি মানুষের পরলোক যাত্রার সাক্ষী হতে আমিও সেই পথেই যাব এখন।' কুল পুরোহিতের কথা শেষ হতেই সংশয়দীর্ণ কাব্যতীর্থ ছিলা ছাড়া বাণের মতো রুদ্ধশ্বাস বেরিয়ে পড়েন গঙ্গা অভিমুখে যেখানে তাঁর শংকরী মৃত্যুর আবাহনে প্রতীক্ষারত।
মদের ঠেকে থেকে পিকনিক পার্টির কয়জন নেশার ঘোরে ঘুরতে ঘুরতে অনন্ত বাসুদেব প্রাঙ্গণে হাজির হয়েছে। মন্দির খিলানের সামনে অন্য সবাই নিবিষ্টচিত্তে অর্কর পৌরোহিত্যে গল্প শুনছে। ওরা দুর থেকে গাল পেড়ে বলছে,'এই শালা রথিন তুমি ঘুপ করে দু পেগ মেরে চুপ করে ভদ্র সেজেছো?' হৈ হৈ হাঁসির রোল উঠছে। শোরগোলে গল্প স্তব্ধ হয়ে গেছে। অর্ক পরিস্থিতি থেকে পরিত্রান পেতে হংসেশ্বরী মন্দিরের দিশা জেনে দলবল নিয়ে তড়িঘড়ি প্রস্থান করা উপযুক্ত মনে করে। গল্পের ঢেউ ক্ষণিকের জন্য থমকে যায়।
হংসেশ্বরী মন্দির যাওয়ার পথে বোতল বাজদের একজন বলে, পিকনিকে এসে তোমরা হরি কীর্তন শুনছিলে,বাবা?' অপর পক্ষ থেকে কোন রকম উত্তর না আসায় ওরাও একটু চুপ মেরে যায়। একটু বুঝে নিতে চেষ্টা করে ঘটানো গর্হিত কাজের ওজন। দলবল ততক্ষণে হংসেশ্বরি মন্দির চত্বরে প্রবেশ করেছে, অবাক স্থাপত্যে সকলের মুগ্ধতা দেখে, রথিন বলে, 'অর্কদা, ‘মন্দিরের নির্মাণ বৈশিষ্ট সম্পর্কে আমাদের অবগত করো।' মাতালের দলের একজন হো হো করে হেসে উঠে বলে,' কে রে লরেন এল নাকি,পেটে পড়লে দেখছি সবাই শুদ্ধ বাংলা আওড়ায়।' বাতাসী ডানলপ ঘাটের ঘটনার পর একটু হলেও চুপ মেরে গেছিল। গঙ্গার সাবলীল চলা যেন চড়ায় বেঁধে গেছে। ভাসমান ঘটনার মেঘ বাতাসীর মনাকাশের দিগন্তে উড়ে বেড়াচ্ছে। বাতাসী অর্কর মধ্যে একজন সহানুভুতিশীল মানুষকে আজ চাক্ষুষ করেছে কাটতে শুরু করেছে আবিলতা। নীতিবান কাষ্ঠবত নয়, একজন পূর্ণ মানুষ। বচসা এড়াতে অর্ক শুরু করে দেয় পিকনিক পার্টির অশ্রুত গল্পের পরিশেষ - ছোট রাণীমা একক সংগ্রামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এই মন্দির। নৃসিংহদেবের স্বপ্নে হাজির থাকতেন দেবী হংসেশ্বরী। নিজের অক্ষমতায় দেবী মন্দির নির্মাণে অসমর্থ নৃসিংহদেবের ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠা করতে অবিচল রাণীমা স্বামীর শুরু করা কাজের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে অসাধ্য সাধন করে ছিলেন। তেরোটি মিনার তেরোটি পদ্মের রূপ পেয়েছে। এর গর্ভগৃহ তন্ত্র-মতে মানবদেহের পাঁচটি কুঠরির সাথে সাদৃশ্য রেখে তৈরি। নিশিথ মন্দিরে নিবিষ্ট হতে পারছে না। সে বলে,' কিন্তু আমি যে শুনেছি রাজা নৃসিংহদেবের সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না ছোটরাণীমার।' অর্ক বলে,‘সম্পর্ক কথাটার ওজন বড্ড ভারী। কুড়িয়ে পাওয়া শঙ্করী,ব্রাহ্মণ জানার পর রাজা নৃসিংহদেব ছোট রাণীমার শরীরে ভালোবাসার পরশ দিতে রাজি ছিলেন না। বিবাহ পূর্বে এই সত্য রাজা জানতেন না। স্ত্রী সহবাস করতে না পারার যন্ত্রনা তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল দূর দুরান্তে। বিপরীতে যৌবনবতী নারী রাজনের প্রেমসোহাগ হারিয়ে দেবী স্বরস্বতীর কাছে আশ্রয় খুঁজে ফিরছিলেন। বিদ্বান শাস্ত্রজ্ঞ শংকরদেব কাব্যতীর্থ সেই ব্যক্তি যিনি রাণীমাকে দীক্ষা দিয়েছিলেন ধর্মীয় শাস্ত্রে। কাব্যতীর্থর শাস্ত্রীয় প্রজ্ঞা এবং হিন্দু ধর্ম মাহাত্মে বন্দী ছোটরানীমা কখন যে নিজের অজান্তে বাঁচার আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন সুপুরুষ কাব্যতীর্থর মনে সে খবর কেউ জানত না। বড় রাণীমার চক্রান্তে কাব্যতীর্থকে ছাড়তে হয়ে ছিল দেশ। বাতাসীর চোখ চকচক করছে। এমন একজন মানুষ যিনি অন্যর প্রেম সংকীর্তনে কাব্যময় অথচ নিজের জীবনে শুস্কং কাষ্ঠ! বাতাসীর কল্পনার কাব্যতীর্থ একজন প্রেমিক মানুষ, ছোট রাণীমার প্রেমের ফল্গুধারাও বাতাসীর কাছে দুর্বোধ্য নয়। বাতাসী শুধু বুঝে উঠতে পারছে না কোনটা আসল অর্ক। করুণ ছলছল চোখে অর্কর দিকে চেয়ে থাকে বাতাসী। অর্কর চোখ পড়ে যায় বাতাসীর চোখে। পাছে কথা হারিয়ে যায় তাই অর্ক আবার তড়িঘড়ি শুরু করে দেয় - শংকরদেব হন্তদন্ত হয়ে ছুটে চলেছেন নদীর দিকে। তিনি মৃত্যুর আগে একটিবার প্রাণাধিকা শঙ্করী কে দেখতে চান। জানাতে চান নিজের মনের ভাব। হয়ত জানতে চান শঙ্করীকে কেন মৃত্যুসুখ আলিঙ্গনের অপেক্ষায় সে এখনও বেঁচে? এক অলীক আশাবাদের আঁচে পুড়তে থাকেন কাব্যতীর্থ। জনসমাগমের কঠিন প্রাচীরে হতোদ্যম হন বৃদ্ধ শংকরদেব। মানুষজনের আলোচনার আভাস পেয়ে কাব্যতীর্থ জানতে পারেন শঙ্করীর এখনও চেতনা আছে। অসহায় বৃদ্ধ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মানব প্রাচীর ভেদ করার চেষ্টা করতে থাকেন। মাটি ফুঁড়ে এক বিধবা যুবতী রমণী ওঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। কল্পনায় পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে যান কাব্যতীর্থ। রূপে-গুণে এ যেন ঠিক ছোট রানী মা। তাহলে কি শঙ্করী চিরযৌবনা! বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে নিজের শরীরের উন্মুক্ত অংশ দু চোখে একবার পর্যবেক্ষণ করেন বৃদ্ধ। শরীরের অশীতিপর লোলচর্মে বিমর্ষ হয়ে কাব্যতীর্থ সামনে তাকান। বিধবা যুবতী এসে কাব্যতীর্থর পাদ স্পর্শ করে বলেন, 'সময় নেই গো ঠাকুর, তিনি যে আপনার জন্যই অপেক্ষা করছেন।' অবাক বৃদ্ধর নিথর শরীর সুন্দরী বিধবার সহগমনে উদ্দত হয়। গঙ্গার জলে দুটি পা ডুবিয়ে চোখ চেয়ে বসে আছেন রাণীমা। প্রাণের ঠাকুর স্বপ্নের চৌকাঠ ভেঙ্গে নেমে এলেন রাণীমার অন্তিম শয়ানে। বয়স কালে কাব্যতীর্থর সুঠাম হাতের প্রেমস্পর্শ ছোট রাণীমার কপালে জোটেনি। কিন্তু আজ যা জুটলো তা অভাগীর জীবনে কম কিসে? রাণীমার দুর্বল দক্ষিণহস্ত অশীতিপর বৃদ্ধ ধারণ করলেন নিজ হাতে। বিচ্ছেদ যন্ত্রণার জীবনমরু আজও মিলনে তৃষ্ণার্ত। পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ বয়সের সাথে মিলিয়ে যায়, কিন্তু স্মৃতি, ভালোবাসার স্মৃতি, চির অমলিন। হাজার চক্ষুর নিস্তব্ধ ভ্রুকুটির সামনে রাণীমার ঈশারায় কাব্যতীর্থ আপন কর্ণ রাণীমার ওষ্ঠে স্থাপন করেন। রানীমা অস্ফুটে বলে ওঠেন, 'ঠাকুর দাও তব বীজ মন্ত্র, দূর করে দাও যূগযন্ত্রণা। অজানা অমোঘ লোকে আমার যাত্রাপথ প্রশস্ত করো। পরপারে যেন তোমায় নিজের করে পাই। তোমার কন্ঠ হার আমার জপমালা হোক, আমার মর্তলোকের যন্ত্রণা মুছে দাও প্রভু।' কাব্যতীর্থ চোখ বুজে নিজের ওষ্ঠাধর স্থাপন করেন প্রাণাধিকার শ্রবণে। তাঁর অস্ফুট উচ্চারণে উদ্ভাসিত হয় শংকরী দেবীর সৃপর্ণ লোচন। শেষবারের মতো রাণীমার আঁখি যুগল ছুঁয়ে যায় জীবনবল্লভের অশ্রুসজল নয়ন। এমনি করে হাতে হাত চোখে চোখ রেখে ছোটরানীমা জীবন পথ পরিক্রমা শেষ করলেন।
গল্প শেষ করে অর্ক চশমা খুলে দু আঙ্গুল দিয়ে ভিজে যাওয়া চোখ মুছে নেয়। গলা বুজে এসেছে, আবেগের আচ্ছন্নতা ঝেড়ে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে সে। অর্ক বুঝতে পারেনা কিভাবে অন্যর দৃষ্টির থেকে নিজের পৌরুষ লুকিয়ে রাখবে। পলক মেলে অর্ক নিমেষে বুঝে নেয়, না,শ্রোতা সকল একটু বেশিই অস্বাভাবিক। মদ কি কান্নার আবাহনে অনুঘটক কিন্তু বাতাসী কই? আঁতিপাতি ঝাপসা দৃষ্টি দিয়ে অর্ক কোথাও বাতাসী কে খুঁজে পায় না। বাতাসী তখন একটু দূরে হাউমাউ করে কাঁদছে কোথাও লুকাবার দায় নেই তার। অর্ক বাতাসীর কাছে হাজির হয়। নিস্তব্ধতা খানখান করে বাতাসীর আকুল প্রশ্ন হতবাক করে দেয় সবাইকে,’বলুন না অর্কদা, কাব্যতীর্থ কী বললেন?’ অর্ক মন্ত্রবত উচ্চারণ করে,’ভালবাসি জান’।
.....
বাইশ
মুখোমুখি জীবন
অতীতে গ্রাম যেমন ছুটছিল এখন তেমন নয়। ঘরোয়া কোন্দল আড্ডাবাজি জটলা সব কেমন উবে গেছে। পুলিশি টহল ধরপাকড়ে তটস্থ গ্রামবাসী দিনগত কাজের সময়টুকু বাদ দিলে ঘরেই থাকে। মজুমদার রতন সাওয়ের চ্যালা চামুন্ডারা ফাঁকা জমি দখলের সুযোগ খুঁজছে। যে জাগবে সেই দাদা। নয়নের বড় সাধ ছিল মজুমদার হবে কিন্তু এ যে গ্রাম। জাতে আর ভাতে ছোট কাউকে মেনে নেওয়া এখানে অসম্ভব। পুলিশের সাথে নয়নের দহরম-মহরম আছে। পুলিশের সাহসে রণেভঙ্গ চামচার দল নয়নের নেতৃত্বে এবং কংগ্রেস গুন্ডাদের সমর্থনে এলাকা দখল এর ছক কষছে। অভয় সুস্থ হয়ে স্কুলে যোগদান করেছে বেশ কিছুদিন হল। গ্রামে ঘটে চলা সামগ্রিক ঘটনাবলী তাকে চিন্তিত করে তুলেছে। নয়নদের উৎপাতে তটস্থ সবাই। অভয় নিরন্তর ভেবে চলে কিভাবে হঠাৎ ঝড়ে উদ্ভ্রান্ত সময়কে গুছিয়ে তোলা যায়। দলের মিটিংগুলো ওকে সন্তুষ্ট করতে পারে না। সেখানে শুধু একই শব্দ বারবার ঘুরেফিরে আসে 'হঠকারিতা', অভয় মাস্টার রাজনৈতিক নেতাদের মাস্টারি তে কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়। মাস্টার ভাবে নিজেদের বিপ্লব বিমুখতা মার্কসবাদের মোড়কে পেশ করার নাম রাজনীতি। আমাদের লোকনীতির কথা ভাবতে হবে। মানুষ জনগন কী চায় তা এই ছেলে ছোকড়ারাও সঠিক বুঝতে পারেনি। সীমা অভয়ের কাছে সাবলীল। সীমা বলে,'আমি যা বুঝেছি নকশালদের লড়াই আমাদের কম্মো নয়। ওদের মারাত্মক ভুলগুলো থেকে ওরা শিখবে কিনা জানিনা আমাদের শেখা উচিত কিন্তু..। অভয় বলে- একদম এই কথাটাই আমি ভাবছিলাম। সীমা কথা কেড়ে নিয়ে বলে কিন্তু আমাদের পার্টির রকমসকম দেখে মনে হয় বিপ্লব ফিপ্লব সব ফালতু। যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে ছোঁড়াগুলো তাতে শ্রমজীবী মানুষের খিদে বেড়ে গেছে। আমরা যদি লড়াই লড়াই জিগির তুলে লড়াই ভাব বজায় রাখতে পারি তাহলেই কেল্লা ফতে।' অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে অভয় সীমার দিকে। সীমা বলে চলে ' আমার স্থির বিশ্বাস ওদের কাটা খাল ধরে ডিঙি বাইলে আমাদের পার্টি খুব তাড়াতাড়ি নকল শ্রমিক রাজ পত্তন করবে। নয়ন হারামজাদারা যা শুরু করেছে তার সুবিধাও আমাদের ভোট বাক্সে উঠবে। কংগ্রেসের দফারফা হতে শুধু সময়ের অপেক্ষা। বাংলা আমাদের আজ নয় কাল।' এত বড় আনন্দের পূর্বাভাস অভয়ের অসুখে ওষুধ পথ্যর কাজ করে না বরং সে বিষাদ মগ্ন হয়ে যায়। সীমার কথা মানতে অভয়ের মন অপারগ। অভয় বলে,’নয়ন ও তার দলবল জানে এই অঞ্চল থেকে নকশাল পন্থীরা উধাও হয়ে গেছে। পড়ে আছি আমরা, পুরোনো মাটির লোকেরা। আমাদের প্রতি মানুষের ভরসা বাড়বে কারণ কংগ্রেসকে মানুষ বিশ্বাস করে না।‘ সীমা বলে, ‘ঠিক তাই নয়নের দল অঞ্চল ভিত্তিতে আমাদের পুরানো প্রভাব কমানোর চেষ্টা করবে। এই অঞ্চলে অভয় মাস্টার সাধারণ মানুষের ভগবান যেভাবেই হোক তার প্রভাব কমাতে হবে। আমার শুধু এইটুকুই চিন্তা।‘
শীতের বিকেল মোলায়েম রোদ্দুর। পাটে যাওয়ার মুখে শুন্য খড়ের মাঠ যেন সোনা মেখে উদাস। অভয় ফিরছে দুর্গাপুর থেকে। স্কুল আজ জলদি ছুটি দিয়েছে,রুটিনে ক্লাস নেই। অভয় নিবিষ্টচিত্তে ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে প্রান্তরের তৃষ্ণায়। ঠিক শৈশবের বড়বৈনান যেন। এঁকেবেঁকে চলা মোরাম রাস্তার দু'পাশে খড়ের স্তুপ। মাঠ পড়ে আছে একাকী – কোনও সাধ নেই তার ফসলের তরে। রাজনীতি রণনীতির বাইরে জীবন অভয়কে এমন সুযোগ দেয়না বড় একটা। অন্য সময় সবুজ মাঠে হাওয়া দোলা দিয়ে গেলেও অভয়ের চকিত মুগ্ধতা মনের দেওয়ালে শুকিয়ে যায়। অসম বন্টনের ভাবনায় মনের কোণে জেগে ওঠে সারি সারি অভুক্ত মানুষের মুখ। আজ ফসল নেই মাঠে সে নান্দনিকতায় মাতোয়ারা। কেমন উদাস লাগে নিজেকে। এমন উদাসীনতা ওর স্বভাবে নেই তবু কেন অকারণ শূন্যতায় বারবার বুকটা হুহু করে উঠছে। একবার বুকে হাত দিয়ে নেয় অভয়। হাতের তালু দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে নিজেকে। অভয় আসলে একজন প্রেমিক। পৃথিবীর প্রেমরস আকণ্ঠ পান করে মাতাল সে। নেশা যখন হঠাৎ তাকে বুঁদ করে তখনও ব্যথা খেলা করে তার হৃদয় জুড়ে। উদাসীনতা কি যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষের পরম আশ্রয় যেখানে কল্পনা নান্দনিকতা বাস্তবএকাকার। না হলে অভয় বুকে হাত দিয়ে নিজেকে শান্ত করার প্রচেষ্টায় রত হবে কেন। কোন দুঃখ খেলা করে বেড়ায় ওর মনে? কেন আজ ও অশান্ত হয়তো সময় বলতে পারবে এর কারণ। সীমা যে অমনভাবে তার ভালবাসার পার্টির ছাল ছাড়িয়ে নির্মমভাবে বিকৃত রূপ প্রদর্শন করবে তা অভয় স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। অভয় দেখতেও চায়না ফিরে সত্যকে, সে ভয় পায় শিউরে ওঠে মনে মনে। অক্ষম হাত দুটো ওর বুকের ওপর খেলা করতে থাকে। কখন প্রকৃতি হারিয়ে গিয়ে নিকষ কালো অন্ধকার নেমে এসেছে ভুবনে চোখে ঠাওর করতে পারেনি সে। হঠাৎ সম্বিত ফেরে অন্ধকারের অজানা পরশে। অন্ধকার সন্ধ্যার মোলায়েম পরশ নয় যা মনে প্রশান্তি আনে। অন্ধকার রাত্রির মতো ভয়ঙ্কর। কেউ নিমেষে অভয়ের চোখে একটা কালো ঠুলি পরিয়ে দিয়েছে। হাত দুটো দিয়ে অন্ধকার সরিয়ে ফেলতে চেষ্ঠা করার আগেই চার-পাঁচজন অভয়ের হাত দুটো বেঁধে ফেলে। সে চিৎকার করতে চায় কিন্তু পারে না। দড়ির ফাঁস তার গলায় চেপে বসেছে। তার কণ্ঠরুদ্ধ। ফাঁকা ট্রেন কম্পার্টমেন্টে প্যাসেঞ্জার প্রায় নেই বললেই চলে। অভয় একটা সিঙ্গেল সিটে বসেছিল। সামনের বসার আসন ফাঁকা ছিলো। একটু দুরে কিছু নিত্যযাত্রী যারা তাসের নেশায় বুঁদ পৃথিবীর কোন উৎসব অনাচার তাদের কানে পৌঁছয় না। দূরে এক তরুণ এমন এক থ্রি সিটে বসে আছে যেখান থেকে কোনাকুনি অভয় কে দেখা যায়। ট্রেনে ওঠার পর ছেলেটির সাথে অভয়ের চোখাচোখি হয়েছিল। অভয় তাকে চিনতে পারেনি। কিন্তু ছেলেটি মাথা নত করে তাকে সম্ভ্রম জ্ঞাপন করেছিল। এই শরীরি আচরণ অভয় বুঝতে পারেনি সে প্রকৃতিতে মত্ত ছিল। ট্রেন খানা স্টেশনে ঢুকছিল। হয়ত অপারেশনটি ট্রেনেই সারা হতে পারত। সময়ের একটু হেরফের হয়ে গেছে। টিমটিম স্টেশন বাতিগুলো ধূসর কুয়াশার অন্ধকারে গুটিকয়েক অপেক্ষমান যাত্রীদের একমাত্র আশার আলো। ট্রেন থামার আগেই মাঝের কুপের দুজন টয়লেটে গেছিল। পিছন দিক থেকে তারাই অভয়ের মাথায় কালো ঠুলি পরিয়ে দিয়েছে। আততায়ীরা অভয় কে জনশূন্য স্টেশনে নামিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। আজই বাতাসী প্রথম বিবেকানন্দ কলেজে পড়তে গেছে। কলেজে নবীনবরণ বাতাসী সায়ান্সে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছে কলেজে। পদার্থবিদ্যা ওর ভালোবাসার বিষয়। প্রথম দিনের অনুষ্ঠান গান-বাজনা নতুন বন্ধুত্ব নিয়ে মাতোয়ারা ছিল সে সারাটা দিন। কথা ছিল বাপের সাথে ফিরবে বর্ধমান থেকে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাপের দেখা না পেয়ে বাতাসী ফিরতি ট্রেন ধরে। খানা স্টেশনে ট্রেন থেকে আরও এক জন নেমে পড়েছিল কেউ খেয়াল করেনি তাকে। সে ত্রস্ত পায়ে পেছন দিকে যায়। পেছনের কামরার জানালায় মুখ বাড়িয়ে সে কাউকে চাপা গলায় ডাকে। চুপ করে এক ছায়ামূর্তি নেমে আসে ট্রেন থেকে। হালকা চালে ট্রেন দৌড় শুরু করেছে ততক্ষণে। আততায়ীরা সামনের দিকে এগিয়ে গেছে কিন্তু লাইন পার হতে পারেনি কারণ ট্রেন গতি বাড়িয়ে ছুটছে। পেছনে অন্য দুজন গাছের আড়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে কেউ কিছু জানতে পারে না। দুরে জিআরপির একটা দল আগুন পোহাচ্ছে। মাঘের শেষ বেলায় শীত জাঁকিয়ে পড়েছে। দু'চারটে বন্দুক গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বন্দুকধারীদের কোন খেয়াল নেই। হয়তো বন্দুকধারীদের জন্যই পেছনের দুজন সন্তর্পনে সবকিছু নজর রাখছে। ঝমাঝম শব্দে ট্রেন পার হতেই স্টেশন চত্ত্বরে প্রেতপুরীর নিস্তব্ধতা। আততায়ীরা হ্যাঁচকা টানে মাস্টারকে মাটির ঢাল বেয়ে নামিয়ে আনে জমিতে। টানাহেঁচড়ায় মাস্টারের জামা প্যান্ট ছিড়ে যায়। ঢাল বেয়ে নামা গতির সাহায্য নিয়ে মাষ্টার প্রাণপণে নিজেকে মুক্ত করতে চাইলে তার ডান হাতের উপর ভোজালির কোপ নেমে আসে। ষণ্ডামার্কা একটা লোক চেঁচিয়ে বলে,'শালা, আজ তোর মৃত্যু আমার হাতে। এই লেলিনের কুত্তাটাকে গোডাউনে নিয়েছে চল আগে।' একটা তীব্র আলোর ঝলকানি আচম্বিতে নেমে আসে আততায়ীদের চোখে। ধাঁধিয়ে যায় সবার চোখ। অন্ধকারের আলোতে চোখ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ আলোর ঝলকানি ওদের বেসামাল করে দিয়েছে। প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় ওদের হাত চোখ আড়াল করতে হাজির। চমকের মুহূর্ত কাটিয়ে উঠে ওদের একজন হেঁকে ওঠে, 'কোন শালা, ছাল ছাড়িয়ে নেবো খানকির বাচ্চা।' অপরিচিত দুজন ঢালের ওপরে দাঁড়িয়ে, তাদের হাতে দুটি রিভলবার। অবলীলায় ছুটে আসে প্রথম জনের রিভলভার থেকে গুলি। নির্ভুল নিশানায় ভোজালি ধারির ডানহাত এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়। হাত থেকে ভোজালি খসে পড়ে। কিছু বুঝে উঠতে পারে না অভয়। শুধু টের পায় খেলাটা আর আততায়ীদের হাতে নেই। আরও দুটি গুলি ওদের কানের পাশ দিয়ে শনশন ছুটে যায়। দ্বিতীয়বার সত্য ফায়ার করেছিল। অভয় বাবু নিরাপত্তার কথা ভেবে ইচ্ছে করে শরীর লক্ষ্য করে বন্দুক চালায় নি সে। পড়ি কি মরি করে তাড়া খাওয়া কুত্তার মতো ওরা মাঠে নেমে ছুটতে থাকে। আলোর ঝলক তুলে নিশানাহীন আর একটা গুলি নিশুতি রাত খানখান করে ধাওয়া করে। শব্দের তীব্রতায় আছাড় খেয়ে পড়ে একজন। তার উপর হুমড়ি খেয়ে আর একজন পড়ে। দুজনে তড়িঘড়ি উঠে পড়ে আবার দৌড় লাগায়। সত্যরা ঢাল বেয়ে নিচে নামে। পড়ে থাকা ভোজালি তুলে নিয়ে মাস্টারের হাতে দড়ি কেটে ফেলে মুক্ত করে অভয়কে। সার্চ লাইটের আলোর ছোঁয়ায় অভয়ের চোখ মিটমিট করে স্থির হয়ে যায়। সত্য যত্ন সহকারে মাস্টারের হাত ধরে ঢাল বেয়ে উপরে তুলে আনে। রেললাইনের সমতলে এসে সার্চলাইট চটজলদি নিভিয়ে ফেলে। রেলপুলিশ মাল খেয়ে বুঁদ, ঘটনাপ্রবাহ তাদের নজরেই আসে নি। সত্য বলে, 'স্যার, একটা আপ ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে এখানে থাকা একদম নিরাপদ নয়।' সত্যর কথায় অভয় অপার বিষ্ময় নিয়ে জিগেস করে,'তোমরা আমায় চিনলে কি করে?' সত্য বলে, 'আপনি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে কামরায় উঠুন আমরা পরে যাচ্ছি।' অভয় রক্তাক্ত হাতে কাপড় জড়িয়ে অব্যক্ত যন্ত্রণায় কোনরকমে একটা ফাঁকা ট্রেন কামরায় উঠে পড়ে। ঘটনার ঘনঘটা অভয় কে বুঝতে দেয়নি ক্ষতর গভীরতা। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার মুখে ওরা উঠে পড়ে কামরায়। ব্যাগ থেকে তাড়াতাড়ি বের করে প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, গজ ব্যান্ডেজ আয়োডিন। অভয় অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। ওদের একজন বলে,'স্যার, আমি সত্যজিত আর ও মেঘ। আমাদের আসল নাম জানালাম আপনাকে। আমরা নকশালপন্থী বলে পরিচিত। পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে আমাদের। আপনাকে পালসিট পৌঁছে দিয়ে আমরা অন্যত্র যাবো। শুধু বাতাসী ছাড়া আমাদের নাম কাউকে বলবেন না। অবাক ঝুলি পূর্ণ হচ্ছে অভয়ের। অভয় ভাবে তার মানে বাতাসী কে ওরা চেনে। মুখ ফুটে কিছু বলতে চাইছিলো অভয়। ওকে থামিয়ে দিয়ে মেঘ বলে,'আমরা হাবাদাকে চিনি, মজুমদার নয়ন হারু সীমা কেউ আমাদের অচেনা নয়। আপনাকে যারা মারতে চেয়েছিল তাদের ঠিকানা আমাদের জানা। চুঁচুড়া ভদ্রেশ্বর অঞ্চলের কিছু লুম্পেন যারা নকশালপন্থীদের সাথে যোগ দিয়েছিল তারা এই ডামাডোলে বিপদ আঁচ করে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছে। তাদের দু'জনকে আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি আজ। সম্ভবত নয়নের ইচ্ছেতে ওরা আপনাকে মারতে উদ্যোগী হয়েছে। আমাদের আর একটু বিশদে জানতে হবে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে অভয় ওদের দিকে। সে কিছু বলতে চায় বুঝতে পেরে সত্য প্রশ্ন করে, 'স্যার, কিছু বলবেন?' অভয় মাথা নেড়ে বলে, 'এতদিন বৃথাই সময় নষ্ট করেছি, তোমাদের মতো পড়শীকে জানতে পারলাম কই? কিন্তু তোমরা বাতাসীকে কেমন করে চিনলে।' হেসে ফেলে সত্য বলে,'সে প্রশ্ন আপনার মেয়েকেই জিজ্ঞেস করবেন।'
রিকশায় বাড়ির দিকে এগোয় অভয় সঙ্গে একজন রেলকর্মী যিনি স্টেশনে কাজ করেন। বাড়িতে তখন বহু মানুষ জড়ো হয়েছে। না জানিয়ে এত রাত অভয় কখনো করে না। সীমা, বৌদিকে শান্তনা দিচ্ছে যদিও সীমার মনেও ভয়ের জমাট মেঘ। সীমা আজ দেখেছে অভয়ের বাড়ির সামনে দিয়ে নয়নের ডানহাত নেপাল বাইকে ফিরে ফিরে টহল দিচ্ছে। এমনটাতো ঘটে না কোনদিন। এ চত্ত্বর ওরা মাড়াতে সাহস পায় না। হঠাৎ এমন অদ্ভুত আচরণের কারণ কি। বুক ঢ়িপঢ়িপ করে ওঠে সীমার। তাহলে কি দাদার কিছু হয়েছে না হবার কোন ইঙ্গিত দিচ্ছে নেপাল। সীমা চঞ্চল হয়ে বেরিয়ে পড়ে। পুকুরপাড় ছেড়ে রাস্তায় উঠে এসে সে দেখতে পায় একটা রিকশা এগিয়ে আসছে এইদিকে। নজর করে সীমা দেখে সওয়ারী তার দাদা। সীমা দৌড়ে গিয়ে বৌদিকে জানায় দাদার আগমনবার্তা। বিধ্বস্ত অভয় ততক্ষণে হাতে ব্যান্ডেজ মাথায় আঘাত নিয়ে নামে রিকশা থেকে। অভয় ছিনতাই বাজদের গল্প বানিয়ে পরিবেশন করে এবং বলে কিভাবে সর্বস্ব লুট করতে দিয়ে সে নিষ্কৃতি পেয়েছে। সবাই সবকিছু শুনে চলে গেলে, অভয় বলে, 'বীণা আজ আমি বাতাসীর সঙ্গে ওর ঘরে শোব। বীণা খুব অবাক হয় কারণ একরাতও অভয় ওকে ছেড়ে থাকতে পারত না। বীণার মনে শঙ্কার মেঘ, হয়তো বাতাসীর কারণেই বাপের এই দুরবস্থা। জীবনে এই প্রথম একটা গোটা রাত বাপ মেয়ের সঙ্গে কাটাবে! বীণার উপস্থিতিতে অভয়ের মুখ থেকে টু শব্দ বেরোয় না। অগত্যা বীণা নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। আলাপচারিতার আন্দাজ না পেয়ে বীণার রাত নিদ্রাহীন কাটে। প্রশ্নের উত্তর চাই অভয়ের। মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে অভয়। বাবার অনেক জিজ্ঞাসা অনেক প্রশ্ন। বাতাসী অবাক হয়। বাতাসী আজকের ঘটনায় ভীত। ঘটনার নাগাল পেতে চায় সে। অভয় বাতাসীর প্রশ্নর পথ না মাড়িয়ে উল্টো প্রশ্ন করে, 'তুই মেঘ, সত্যজিৎ কে চিনিস?' বাতাসী থতমত খেয়ে বলে, 'কে, কোন সত্যজিৎ, ওরা কি তোমার এমন অবস্থার কারন?' একটু থেমে শান্ত অথচ স্পষ্ট উচ্চারণে অভয় বলে, 'নকশালপন্থী সত্যজিৎ।' বাতাসী প্রথম প্রশ্নর উত্তর না পেয়ে ফের বলে,ওরা তোমাকে... না না বিশ্বাস হচ্ছে না।‘ এরপর অভয় ঘটে যাওয়া সম্পূর্ণ ঘটনা বাতাসীকে জানায়। বাতাসীর মুখে অনাবিল নবান্নের সোনালী হাসির লুকানো ঝলকে প্রভাবিত হয়ে অভয় বলে 'ওরা আমাকে ভাবনা দিয়েছে।' জীবন দেওয়ার কথা অভয়ের কাছে গুরুত্ব না পেয়ে ভাবনা দেওয়া মুল হয়ে যাওয়ায় বাতাসী আর নিজেকে লুকিয়ে রাখে না, জানিয়ে দেয় ওদের সাথে নিজের বন্ধুত্ত্বর কথা। অভয় ভাবে এ কোন ঘরে সে বাস করে যার সাথে তার নাড়ির যোগ নেই। হঠাৎ মেয়ের উৎকণ্ঠাদীর্ণ মুখের উদাসীনতায় নজর পড়ে অভয়ের। বাতাসীর এই বদল, সত্যজিতের হাঁসি মাখানো কথা, 'আপনার মেয়েকে জিজ্ঞেস করবেন', অভয়ের মনজগতে তুফান তোলে। বাতাসী ওদের রাজনৈতিক দর্শনে আকৃষ্ট হতে পারে কি পারেনা। কারা রাজনৈতিক ভাবে শুদ্ধ এইসব ফালতু কথা সরিয়ে রেখে বাপের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সে ভাবে ছেলেগুলো বাঁচলে হয়। নিজের মৃত্যুকে ছাপিয়ে ছেলেদের ভবিষ্যত ভাবনায় ডুবে যায় অভয়। আশু কোন সমাধান না পেয়ে অভয় রেল ইঞ্জিনের ছন্দে শ্বাস নিয়ে চলে। বাতাসী বাবার বুকে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। আধো-জাগরিত তন্দ্রার ঘোরে’ কখন যে আঁখিপল্লব পূর্ণ নিমীলিত হয়েছে তা একমাত্র মেয়েই বলতে পারবে। বাবার চোখে ঘুম আসায় শান্তি পায় মেয়ে।
এক সন্ধ্যার ঝড়-বৃষ্টি ঘূর্ণি অভয়ের বয়স অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। শরীরে নয়, বয়স তো মনে বিরাজ করে। অভয় একটু দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। মেয়ে আজ কলেজ যাবে না। জেলা নেতৃত্ব খবর পাঠিয়েছে ওনারা অভয়কে দেখতে আসবেন। ওনারা আন্দাজ করছেন পার্টির কর্তৃত্ব নস্যাৎ করার পরিকল্পনায় এই আয়োজন আদতে ষড়যন্ত্র। অসহায় ভীত বীণা নেতাদের বলে,তাহলে নিষ্কৃতি দিন ওকে আর রাজনীতি করে কাজ নেই।‘ যে অভয় এতদিন মহীরুহর প্রত্যয় নিয়ে দাঁড়িয়েছিল বৃহত্তর সংসারে তাকে কচু গাছের মতো নুইয়ে পড়তে দেখা বীণার কাছে কল্পনাতীত। অভয়ও ভাবে তার এতদিনের লালিত বিশ্বাস তছনছ হয়ে গেছে এই ঝড়ে। তাকে কেউ হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে এমনটা কখনো ভাবেনি সে। এক পক্ষের ভালো মানে অন্য পক্ষের অসুবিধা। যাদের অসুবিধা তারা তো অন্য পক্ষকে নিকেশ করতে চাইবে এরমধ্যে অস্বাভাবিকতার অস্তিত্ব কোথায়। হয়তো এর চেয়েও বেশি কিছু আছে যা অভয়ের চেতনাকে পীড়িত করছে। নেতৃত্বর গম্ভীর আলোচনায় উঠে আসে নকশালপন্থাই বিপদের মুল কারন। এই প্রতি বিপ্লবীদের থেকে মানুষকে দূরে রাখাই কাজ। অভয় ঘটনার সার সংক্ষেপে যা গতকাল ব্যক্ত করেছিল তার চেয়ে একটাও অধিক শব্দ পার্টি নেতৃত্বকে জানায়নি। নেতৃত্ব খোলাখুলি জানায় তারা বিশ্বাস করছে না অভয়ের কথা। এক নেতা বলেন, ‘ছিনতাইবাজদের কাজই যদি হবে তো থানায় ডায়েরি করা হয়নি কেন? অভয় এবার বাধ্য হয় মুখ খুলতে- পার্টির যুদ্ধ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, আর আমি কোন গরীব ছিনতাইবাজের নামে রাষ্ট্রর পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাবো। যুক্তি হারিয়ে চুপ মেরে যান ওরা। আজ আলোচনা কেবল মা এবং মেয়ের সামনে হয়েছিল এমনকি সীমাকেও চলে যেতে হয়েছিল। নকশালপন্থার বিপদ সম্পর্কে দলের কর্মী বা আঞ্চলিক নেতৃত্ব যদি এখনও সাবধান না হয় তাহলে বামপন্থার বিপদ। এই বক্তব্য রেখে ওনারা প্রস্থান করেন। হাফ ছেড়ে বাঁচে অভয়।
বীণাকে সত্য জানানো অনুচিত এই ধারণা থেকে বাপ-মেয়ে কিছুই জানায়না। বীণার বিশ্বাস তার স্বামী কখনও অসত্য বলতে পারেনা। অথচ বাতাসী দেখে তার যুধিষ্ঠির পিতা বড়কর্তাদের কেমন সাবলীল মিথ্যায় ভরিয়ে দিল। আলোচনার সময় বাতাসীর বিহ্বল দৃষ্টির অর্থ অভয় হয়ত বুঝতে পেরেছিল। ওরা চলে যাবার পর অভয় মেয়েকে বলে, কাটাছেঁড়া করে বাস্তবের পর্যালোচনা করে শত্রু চিনতে হয়। আকাশে থুতু ছেটালে নিজেদের গায়েই এসে পড়ে। আর সত্য কখন কি কেউ বলতে পারে না।‘ বাতাসী জানায় সে সত্যদের সম্পর্কে যতটুকু জেনেছে তাতে এটুকু বলা যায় জীবন বাজি রেখে ওরা কিছু করতে চায়। ঠিক ভুল সময় বলবে। সে এও বলে সীমা পিসির কাছ থেকে সে শুনেছে নীতিহীনভাবে রাজ করার নাম রাজনীতি। অভয় বলে,'সে আবার কি, আমরা তো ক্ষমতার দুয়ারে প্রবেশ করতে পারিনি রাজার নীতির আমরা কি বুঝি। মেয়ে সীমা পিসির কাছে শেখানো বুলি কপচে দেয় - ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ শুধু সময়ের অপেক্ষা। মাস্টারের মানসলোকে বসত করা স্থিতিশীলতা পুরানো পাকা বাড়ির পলেস্তারার মতো খসে পড়তে থাকে। হু হু করে কেটে যায় সারাদিনটা। নাওয়া খাওয়া জীবনের অঙ্গ, মানুষ প্রতিটি দিনের এমন কাজের হিসাব মনে রাখেনা। অভয় আজকের দিনটিকে শুধু নাওয়া খাওয়া দিয়েই মনে রাখতে চায়। তাই সন্ধ্যাবেলায় রাতের খাবার খেয়ে দিনটাকে ভোলার ইচ্ছায় তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন ভোর গড়িয়ে রোদের মিঠেকড়া পরশ মশারীর ভিতর দিয়ে আছড়ে পড়েছে চোখে। মিটমিট আঁখিতারা জানলার গরাদ বেয়ে সদর পানে নৈব্যক্তিক চেয়ে থাকে। হঠাৎ হন্তদন্ত সীমার প্রবেশ ঘটে ঘরে। সীমার নামানো উচ্চারণে আজকের প্রথম খবরটা অভয় জানতে পারে। খাল পাড়ে জোড়া লাশ ভেসে উঠেছে। নেপাল আর নয়ন খাল্লাস।
তেইশ
যাত্রাশেষ
সন ১৯৮২, উত্তাল মেডিকেল কলেজগুলো। সরকারি হাসপাতালের অর্থোপেডিক আউটডোর হবার কথা। আউটডোর বয়কট করছে ক্ষুদে ডাক্তাররা যদিও রোগীদের কোনোও অসুবিধে হচ্ছে না। সমান্তরাল আউটডোরে চিকিৎসা চালাচ্ছে জুনিয়ার ডাক্তারা বিবেকের তাড়নায়। ওরা জানে ডাক্তারের কোন প্রয়োজন থাকে না রোগ না থাকলে। সত্যি সত্যিই ওরা হিপোক্রেটাস এর শপথ মেনে নিয়ে চিকিৎসা করবে এমনই আশাবাদে ভর করে ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করেছিল। বিভাগীয় প্রধান ডক্টর অমিত সরকার হাজির হয়েছিলেন ওদের বিদ্রোহী অবস্থান এর স্বপক্ষে। সরকারি সংগঠন ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ষুদে ডাক্তারদের বিরোধী অবস্থান নিল। পন্থা পথ দেখাবে এমন বিশ্বাস ছিল ক্ষুদে ডাক্তারদের অথচ সরকারি পন্থীরা নিজেদের বাদ দিয়ে সবাইকে পরিপন্থী ভাবল। যে আন্দোলন সরকারের গঠনের আগে পন্থা হিসেবে চিহ্নিত ছিল আজ তা প্রতিপন্থা। হাসপাতাল প্রাঙ্গনে যুদ্ধের বাতাবরণ। ধরপাকড় সত্বেও বিদ্রোহীদের হটানো গেল না সমান্তরাল আউটডোর বন্ধ হল।
কেন কিসের এই যুদ্ধ কিসের বিদ্রোহ? এর উত্তর পাওয়া যাবে ক্ষুদে ডাক্তারদের লিখিত বক্তব্যে। হাসপাতালে ইসিজি মেশিন এক্সরে মেশিন নেই। নেই প্রয়োজনীয় জীবনদায়ী ওষুধ, গজ-ব্যান্ডেজ। হৃদরোগী এলে রেফার করে দেওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। চিকিৎসকের কাছে মানুষকে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোনো গতি নেই অতএব লড়াই করে মানুষের দাবিকে প্রতিষ্ঠ করতে হবে। এ শুধুমাত্র চিকিৎসকের বাঁচা-মরার লড়াই কারন তারাই পদাতিক বাহিনী সামনে থেকে রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ একমাত্র তারাই করবেন। তাদের হাতে সরঞ্জাম না থাকলে কি দিয়ে যুদ্ধ হবে! রোগের সঙ্গে সম্মুখ সমরের বদলে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে যুযুধান দুই পক্ষ চিকিৎসক এবং রোগী। এই যুদ্ধ ছিল সরকারের বিরুদ্ধে পরোয়ানা। 'সরকার তোমাকে নির্দিষ্ট চিকিৎসা নীতি তৈরি করতে হবে। চিকিৎসা মানুষের অধিকার তা নিশ্চিত করতে হবে। একের পর এক মেডিকেল কলেজগুলোয় ছড়িয়ে পড়তে থাকে আন্দোলন। প্রথমে মেডিকেল কলেজ থেকে শুরু হয়ে আরজিকর হয়ে সারা বাংলায় পৌঁছে যায় ওরা। একে একে পৃথক কলেজের সংগঠনগুলো পরিণত হয় এক সংগঠনে নাম হয় এ.বি.জে.ডি.এফ। অল বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টর ফেডারেশন চুনৌতি দেয় সরকারকে। সরকার আন্দোলনকে প্রাথমিকভাবে মান্যতা দিতে না চেয়ে পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে। পন্থী সংগঠনগুলিও নেমে পড়েছে দমন-পীড়নে। সংগঠন হিসেবে 'যাত্রা' নজর রাখছিলো আন্দোলনের ওপরে। ওরা ভাবে খুব আশ্চর্য তো আমরা তো 'যাত্রার' পক্ষ থেকে এই কাজই করার চেষ্টা করছিলাম। কিছু নতুন ডাক্তার ছাড়া কেউ খুব আমল দিতে চাইছিল না আমাদের। এখন যখন চিকিৎসকরা আন্দোলনে শামিল তখন এই বিদ্রোহকে গণ আন্দোলনের চরিত্র দেওয়াই একমাত্র কাজ। নিজেদের অন্তরমহলে 'যাত্রা', এক আলোচনা সভা ডাকে। মত উঠে আসে আন্দোলনে শামিল হওয়ার। কথায় কথায় উঠে আসে প্রশ্ন কেন হচ্ছে এমন? রাজ্যে নিজেদের সরকার আসীন তাহলে কি আন্দোলনের মধ্যেই গন্ডগোল। নিছক অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া কে অন্য মোড়কে পেশ করছেন ক্ষুদে ডাক্তাররা। সরেজমিনে দেখা দরকার বিষয়টা। ধীরে চলা নীতি স্বীকৃত হয়। কর্মকাণ্ড ভাগাভাগি হয়ে যায়। অর্ক মেডিকেল কলেজগুলো যাতায়াত শুরু করে। পরিচিতি হয় বিভিন্ন আন্দোলনকারী চিকিৎসকের সাথে। বিনিময় হতে থাকে মত। অর্কর কথায় ওরা বুঝতে পারে, আন্দোলনের পাশাপাশি সামাজিক কাজগুলোয় চিকিৎসকদের অংশগ্রহণ থাকলে সাধারণ মানুষ আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। আবার গণ সংগঠনগুলিও চিকিৎসকদের আন্দোলন প্রচার করবে। একইসাথে হাসপাতালে আপৎকালীন পরিষেবা ঠিক রেখে গণসংগঠন গুলির কর্মস্থলে যাতায়াত শুরু করে ক্ষুদে ডাক্তাররা। কোন খবরই অজানা থাকে না পন্থীদের কাছে। খোঁজখবর শুরু হয়ে যায় কে অর্ক তার রাজনৈতিক পরিচয় কী? অর্ক কিন্তু ভেবেছিলো এই আন্দোলন থেকে সরকার পক্ষ শিক্ষা নেবে। বর্গার অভিজ্ঞতায় সে এই নিশ্চিন্ততা অর্জন করে ছিল। গণসংগঠন গুলি সরকার আর মানুষ এর মাঝখানে থেকে যোগাযোগের সেতু হবে। প্রসারিত হবে সরকারের কর্ম ধারা।
সকালবেলা রোজকার মতো দীপঙ্কর অনিমেষ বুকে দম নিতে বেরিয়েছে। এখানে চালু ব্রান্ড হল সেজদার বিড়ি। মাঠে-ঘাটে যারা কাজ করে বিড়ি তাদের একমাত্র বাঁচার আশ্রয় জ্বালানি বললেও ভুল হয়না। সদ্য জুটমিলের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। অনিমেষ খুব হতাশ। দিপু ওকে জাগিয়ে তুলেছে। যখন ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর বিশ্লেষণে এগিয়ে গেছে অনি তখন দিপু পিছিয়ে গেছে। দিপু কিছুতেই বুঝতে পারে না কি কারনে রামাদি অনিকে ডেকেছিলো। ছিদাম দা ঘটনার পরে দিপু কে বলেছিল, 'দাদাবাবু তোমাদের বাঁচাতে পারলাম না।‘ দিপুর বোধগম্য হয় না ওরা অনিকে ফাঁসাতে চেয়ে ছিল কেন? তবে কি অন্য সময় অনি যেত রামাদির কাছে! তাহলে রামাদি আমার হাত ধরবে কেন? অনির ওপর বিশ্বাসে হারিয়ে ছিল দিপু। তাই কোন পর্যালোচনায় সে রাজি নয়। অথচ রামাদিকে অবিশ্বাস করতে পারেনি সে। মানুষ নিজের অবস্থান থেকে যা দেখে তার সত্যতা নিজের কাছে সম্পূর্ণতা হিসেবে ধরা দেয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ঘটে চলা ঘটনা নিজের অবস্থানে থেকে ব্যাখ্যা করা মুশকিল। দিপু এখনো সত্যতার কাছাকাছি পৌঁছতে পারেনি। টুকিটাকি দু'চারটি কথা হচ্ছে অনির সঙ্গে মাঝে মধ্যে। তেমন গম্ভীর কিছু নয়। সম্পর্ক যেন একটু জড়তা মলিন। অনি অপরাধবোধ আর দিপু অবিশ্বাস নিয়ে পাশাপাশি একা। যদিও নিত্য কাজে তারা নিয়ম মাফিক। সবে দিপু সুখ টান দিয়েছে সেই সময়ে আট দশ জনের একটা গ্রুপ হাজির হয় সেখানে। একজন সটান এসে অনির কলার ধরে ফেলে বলে, 'চল', মন্ত্রবৎ অনি এগিয়ে যায়। ততক্ষণ দুজন দুই হাত ধরে দিপুকে হিড়হিড় করে টানতে শুরু করেছে। দিপুর চিৎকারে অনির ঘুম ভাঙ্গে। রীতিমতো ব্যায়াম করা শরীর অনির এক ঝটকায় ছিটকে ফেলে দেয় আততায়ীকে। বাকিরা গিয়ে অনিকে চেপে ধরে। 'শালা, রুস্তমি হচ্ছে? চল পার্টি অফিসে তারপর দেখছি। এই বদন দা কে তুলে আন তারপর যাত্রার ফুর্তি মারার ঘরে তালা মেরে দে।' লাইব্রেরী কৃষ্ণ বাবুর ঘরে বসলেও সবাই বদনদার বৈঠকখানা ঘরে আড্ডা মারত। অফিসের কাজ সেখানেই হত। অনি দিপু বদনবাবু সবাই হাজির হতে বাধ্য হয় পার্টি অফিসে। গণ আদালত বসবে।
অর্ক আজ সকালের ট্রেনে বাঁকুড়া গেছে মেডিকেল কলেজে দূত হয়ে। মেলবন্ধন চাই হাসপাতাল গুলোর মধ্যে। এই দাবিগুলো যদি সার্বিক মান্যতা পায় তারপর কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সার্বিক স্বাস্থ্য নীতির দাবি তুলবে। ওদিকে পার্টি অফিসে গণআদালত চলছে। সবাই মিলে দিপু অনি বদন দা এবং আরো অনেককে ঘিরে বসে আছে। নেতা গোছের একজন বলে, 'জোনাল সেক্রেটারি এলো বলে।' কোর্ট চত্বরে যেমন আনাচে-কানাচে উৎসাহি লোকজন ঘুরে বেড়ায় এ যেন ঠিক তেমন। তফাৎ শুধু চরিত্রে এখানে উপস্থিত প্রায় সবাই একটা দলের পরিচয় বহন করে। হাসপাতালের একটা গাড়ী এসে থামে। নামেন সুপার সাহেব। সম্পাদক মশায় এসে গেছেন। ওনারা একইসঙ্গে এলেন। কোর্ট আর সরকারি উকিল এক তরণীর যাত্রী। অর্থাৎ অভিযোগ বিচারের আগেই প্রমাণিত। অন্য পক্ষের কোনো স্বাধীনতা নেই নিজেকে অভিযোগ মুক্ত করার। শুরু হয় বিচারপর্ব প্রথমেই অভিযুক্ত হলো বদন বাবু। অলক আরও কেউ কেউ জেলার চুঁচুড়া হাসপাতাল এ প্রতিদিন যেত। সুপার জানালেন, 'হাসপাতালে চিকিৎসার পরিসেবা নষ্ট করছে এরা। উত্তপ্ত করছেন রোগে রোগীর পরিজনদের। জুনিয়ার ডক্টরস আন্দোলনকে এরা সাহায্য করছেন। দূষিত হচ্ছে রাজ্যের বাতাবরণ।' অভিযোগ আনতে গিয়ে সুপার সাহেব একটু বেফাঁস বলে ফেললেন - এদের পান্ডা অর্ক, তিনি কোথায়? আসলে সুপার প্রচন্ড রুষ্ট ছিলেন ওর ওপর। দীর্ঘ কয়েক মাস 'যাত্রার' চাপে প্রতিনিয়ত অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন হাসপাতালে ডাক্তার নার্স এবং অন্য কর্মীরা। ক্ষোভ গিয়ে পড়েছিল সুপারের ওপর কারণ উনিই প্রাথমিকভাবে যাত্রাকে এন্ট্রি দিয়েছিলেন। পন্থীরা অর্ককে আড়াল করতে চাইছিল কারণ ও এই মাটির ছেলে। শুধু তাই নয় এলাকার মানুষ অর্কর প্রতি সহানুভূতিশীল। তাই মেপেঝুপে এই আয়োজন অর্কর অবর্তমানে। অভিযোগ খন্ডন করতে বদন বাবুই প্রথম মুখ খোলেন তিনি বলেন, 'আমরা বিভিন্ন আঙ্গিকে মৌলিক কাজ করে পার্টিকেই শক্তিশালী করতে চেয়েছিলাম।' কোর্ট বলে, 'হ্যাঁ, তাইতো জুটমিলে মচ্ছব? নারী মাংস লোলুপের দল। কমরেডরা সদাসতর্ক প্রহরীর মতো না থাকলে জুটমিল বস্তি আজ বেশ্যাখানায় পর্যবসিত হত। আপনারা নিজেদের কী ভাবেন, যত্ত সব ট্রটস্কাইট। যদি কোনদিন দেখি পার্টির অনুমতি ছাড়া কোনো কর্মকাণ্ডে সামিল হয়েছেন তো আপনাদের ভিটে মাটি চাঁটি করে দেব। শোনো হে ছোকরা দল এখানে পড়াশোনার পার্ট এবার চোকাতে হবে। এই সাবধান বাণী যদি না মানো...।' অনিমেষ হয়তো প্রতিবাদ করত কিন্তু নারীঘটিত কেসে কুঁকড়ে গিয়ে সে কিছু বলতে পারেনা। বিচারপর্ব সমাধা হয়। মুখ নিচু করে সবাই চলে যায় যে যায় ডেরায়।
বেশ রাত হয় অর্কর ফিরতে। পরদিন মেশে গিয়ে সে জানতে পারে দিপু অনি কেউ নেই। ওরা বাড়ি ফিরে গেছে। বদনদার বাড়ি গিয়ে দেখে যাত্রার ঘরে তালা। বদনদার নাম ধরে ডাকতে থাকলে বদন দা বেরিয়ে এসে জানায় গতকালের কিসসা। অর্ক একরাশ হতাশা নিয়ে ঘরে ফেরে। কৃষ্ণ বুঝতে পারে কিছু একটা ঘটে গেছে। প্রথমে অর্ককে কিছু জিজ্ঞেস করতে কৃষ্ণ ইতঃস্তত বোধ করছিল। কৃষ্ণ চাইছিল অর্ক নিজে থেকে বলুক। হঠাৎই অর্ক বলে, 'বাবা, তোমার দর্শনের প্রফেসর কি বলতেন, মার্কস ইজম ইজ এ্য মিথ? কোন সমান্তরাল ভাবনা পন্থীরা মানবে না। পার্টির অস্তিত্ব এবং কর্তৃত্বই শেষ কথা।' বাবা বুঝতে পারে পাগল ছেলে আজ নিশ্চয় খুব ধাক্কা খেয়েছে। উনি বলেন, 'কেন এমন বলছিস?' অর্ক বলে তোমাদের আন্দোলনের সময় দেখেছি কিন্তু বুঝিনি। আজ আমার কাছে সবকিছু জলের মতো। তোমাদের পার্টি ভেঙেছিল কতৃত্ববাদের কারনে। ভুল সিদ্ধান্ত ঠিক বলে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমার শৈশবে আমি শুধু তোমাকে জানতাম। গভীর বিশ্বাস ছিল আমার বাবা কোন ভুল করতে পারে না। আজ বুঝেছি এই বোধ ভগবানে বিশ্বাসের সমান। তোমাকে আমি ভগবান মানতাম। অ্যাবসলিউট কোন কিছুতে বিশ্বাস করা আর ভগবানে ভরসা করা অপবিজ্ঞান তাই মিথ।' অর্ক কে বড্ড নড়বড়ে মনে হয় কৃষ্ণর। কি অদ্ভুত আজ যেন ছেলে বাপকেই চাঁদমারি ঠাউরেছে। কৃষ্ণ চুপটি করে বসে থাকে উত্তরহীন। 'বলো তোমরা কেন পার্টি ভেঙে ছিলে। একই উদ্দেশ্য নিয়ে একই দেশে এত শত কমিউনিস্ট পার্টি কেন? তুমি নয় পুরনো পার্টিতে ছিলে না কিন্তু তোমার পার্টিতে ভাঙ্গন এলো কি করে। কেন সিএম-এর কথাই শেষ কথা ছিল। গণতান্ত্রিকতার মোড়ক লাগিয়ে স্বেচ্ছাচার! হাজার হাজার তরুণের প্রাণ গেল, কখনো রিপেন্ট করেছ?' আর চুপ করে বসে থাকতে পারে না কৃষ্ণ। বলে, 'তুই বলতে পারিস দুই বাংলায় গর্ব করার মতো বিষয় কী কী আছে?' উত্তর দিতে পারে না অর্ক। কৃষ্ণ বলে, 'এক ভাষা আন্দোলন দুই নকশালবাড়ি। এই প্রথম প্রায় একই সময় দুই বাংলায় জেগে উঠেছিল জনগণ। বাঙালীকে এর আগে কখনো কেউ দলবদ্ধভাবে লড়াই করতে দেখেনি। ঢেউ উঠেছিল সাধারণ জীবনে। নকশালবাড়ি ব্যর্থ হতে পারে কিন্তু এর প্রভাব সমাজে যুগে যুগে ফিরে আসবে। নক্শালবাড়ির ভূত ধাক্কা দিয়ে যাবে মানুষকে অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে চিরকাল। আসবে নতুন উদ্যোগ। এই বর্গাকরণ যার জন্য তুই উত্তেজিত তার কারণও তেভাগা নকশালবাড়ি। কৃষককে উৎপাদনের বড় অংশর অধিকার দিতে হবে এই বোধের সংকুচিত রূপ হল বর্গাকরণ।' এক নিঃশ্বাসে এতগুলো কথা বলে ফেলে কৃষ্ণ পাশের ঘরে অঞ্জলীর কাছে যায়। অঞ্জলী অবাক চোখে তাকায় কৃষ্ণ দিকে। গলা নামিয়ে কৃষ্ণ বলে,'রাতে দুধের সাথে একটা ট্রাংকুলাইজার মিশিয়ে দিও। একটু বেশি চিনি দিয়ে যাতে ও বুঝতে না পারে।' চেটেপুটে খাওয়া যার অভ্যেসে সে কোনরকমে আধপেটা খেয়ে উঠে যায়। মায়ের পীড়াপীড়িতে দুধটুকু খেয়ে মশারির ভেতর ঢুকে পড়ে। চোখ বুজে আসে ঘুমে অথচ ফিরে ফিরে আসে এক অদ্ভুত ছবি অবচেতনে - বিরাট এক বদ্ধভূমি, হাজার হাজার হাভাতে মানুষের বিচার হচ্ছে। তাদের তীব্র কান্নার রোল করুন সংগীতের মূর্ছনা গাইছে 'মেঘ দে পানি দে ছায়া দেরে তুই', লাল জামা পরিহিত বিচারকমণ্ডলী প্রশ্ন করছে মেঘ ছায়া পানি দেবে পার্টি। কিছু চাওয়ার অধিকার তোমাদের নেই। যা পার্টি বুঝবে তাই হবে। মানুষজন সমস্বরে বলছে, 'আজ্ঞে আমরা কিছু চাইনি তো। আমরা গান গাইছি।' 'কে তোমাদের গান গাইতে বলেছে? একমাত্র গান যা গাইতে পারো তোমরা তা হল 'সবার উপরে পার্টি সত্য/তাহার উপরে নাই।' দলবদ্ধ জনগণ চেঁচিয়ে বলে, 'এই গান গাইতে পারব না।'কোর্ট ঘোষণা করে, 'মৃত্যুদণ্ড' সবাইকে হাড়িকাঠে দাও।' দূরে হাজার হাজার হাঁড়িকাঠ ফুলের মালায় সাজানো। টকটকে লাল জবা মন্দির থেকে আসছে। বন্দিদের প্রত্যেকের পিছনে পিছনে পুরোহিত। চোখের দূরবীণ লাগিয়ে ফেলে অর্ক। বিরাট ময়দান ছেড়ে দৃষ্টি গিয়ে পড়ে একক হাড়িকাঠে। অর্ক দেখতে পাচ্ছে জল্লাদ নয় পুরোহিতও নয় এত কাপালিক। কপালে গভীর লাল তিলক। নিমেষে দৃষ্টি ঘোরায় সে অন্য হাঁড়িকাঠে একই দৃশ্য চোখে পড়ে। দূরবীন অর্কর দৃষ্টি বাড়িয়ে নিয়ে চলে বিচারসভা মানে কোর্টের দিকে। একি! মহামতি কাল মার্কসের শ্মশ্রুগুম্ফো লাগানো বিচারক মহোদয়গণ। পরনে লাল আলখাল্লা মাথায় লাল তীলক। গলায় লাল জবা ফুলের মালা দুলছে। তার হাত থেকে দূরবীন খসে পড়ে। গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে অর্ক। নিশ্চিন্ত গভীর শান্তির আঁচলে।
আনমনা অর্ক
চব্বিশ
অলসদিন যায়, শৈশব-কৈশোরের উন্মাদনার লেশমাত্র যৌবনে বেঁচে নেই । শীতের শেষে পড়ে থাকা শুকনো পাতার মচমচ শব্দ একঘেয়ে সংগীত মলিন। আগামী বসন্তের কোন আভাস নেই প্রকৃতিতে। এক একটা মুহূর্ত যেন এক একটা বছর। সকালের আবাহনে রাত শেষের বার্তা ধরা পড়ে না। শরীরে অনন্ত ঘুমের নেশা। আলস্য যেন লেপের মতো শরীর মন জুড়ে অর্ক কে জড়িয়ে রেখেছে। ঘুম ভেঙ্গে জেগে ওঠার কোনো তাড়া নেই । এমন অচঞ্চল একাকীত্ব অর্ক কে কখনও ঘিরে ধরে নি আগে। বইয়ের তাক ধুলোর পলেস্তারায় ঢাকা। বইগুলো পাঠকের পরশের আশায় আশায় শীতঘুমে জড় পদার্থের আকার নিয়েছে। অথচ একদিন প্রতিটি বইয়ের সাদাকালো আঁক অর্কর ছোঁয়ায় ব্যঙ্ময় হয়ে উঠত। লেখকের সাতরঙা ভাবনা পাঠকের কল্পনায় বিকশিত হয়ে পৌঁছে যেত অন্যদের কাছে। অধীত জ্ঞান বন্ধুদের কাছে বিতরণ করে তবেই অর্কর শান্তি। বর্তমানে নির্বান্ধব অর্ক জ্ঞান অর্জনের তেমন কোনও তাগিদ খুঁজে পায়না। নিত্য রোমাঞ্চের দিনগুলি ভিজে স্যাঁতসেঁতে মেরে গেছে। কৃষ্ণর পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থান আজ অনেকটা ভালো। রেল ধর্মঘট রেল শ্রমিককে বহু কিছু দিয়েছে বিনিময়ে় হারিয়েছে শ্রমিকের লড়াকু মানসিকতা। দিনযাপনে মসৃণতা, রেল শ্রমিকের শরীরের পরতে পরতে। উইঢিবির বিস্তারে ক্ষয়িষ্ণু মহীরুহ যেমন। অঞ্জলীর ডাইনিং টেবিলে এখন আনন্দলোক থাকে,এই পত্রিকা রঙিন দুনিয়ার রঙদার খবরা-খবরের যোগান দেয় মানুষকে। জানালা দিয়ে আসা দখিনা বাতাসে আনন্দলোকের পাতা পতপত করে উড়ছে। অর্ক জীবনে প্রথম সিনেমা হলে গিয়েছিল ওর এক তুতো দাদার পাল্লায় পড়ে। সিনেমার নাম খুবসুরত। এক তন্বী সুনয়নার নায়িকার সাবলীল অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে মনে মনে, মন হারিয়েছিল সে। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে সেই নায়িকা অর্কর অবচেতনে ঘুরে বেড়াতো। স্বপ্নচ্যুতি ঘটলে অর্ক নিজের কাছে নিজে ভীষণ লজ্জা পেত। আজ হঠাৎ দুষ্টু বাতাস আনন্দলোকের পাতা উড়িয়ে অর্কর শরীরে বসন্তের অকৃত্রিম আয়োজনের ডাক দিল। অর্ক ঘুমঘুম চোখে হাজির হল আবছায়ায় কল্পলোকের চিত্রপটে। যেখানে খুবসুরত ছবির নায়িকা অকারণ হাজিরা দেয় ঘুমের মধ্যে। অর্ক লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে দখিনা বাতাস আড়াল করে বইটা তুলে নেয় নিজের হাতে। খোলা পৃষ্ঠায় নায়িকার অনাবৃত বক্ষ হিল্লোল, ঢেউ তোলে অর্কর মনে। অসহায় অর্ক বুকে চেপে ধরে বেআব্রু বেয়াদব বইয়ের পাতা। জৈবিক চাহিদার আগ্রাসনে চঞ্চলতা বিউহ্বল অর্কর শুভবোধ পরাজিত হয়। নায়িকার অশরীরী আলিঙ্গনে কল্প যৌনতায় মত্ত হয়ে যায় সে। বাঙালি বিবেক বড়ই সেকেলে অর্কও এর ব্যতিক্রম না। তার আত্মশ্লাঘা হয়,ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা আবেগ হঠাৎ করেই অপরাধবোধে উন্নীত হয়। ঝাঁঝরা করে দেয় অর্কর বর্ম। যে আড়াল চরিত্রগতভাবে অন্যদের চেয়ে ওকে শতেক যোজন দূরে রাখে সেই আড়াল আজ নিজের কাছেই খসে পড়েছে। স্বঘোষিত উচ্চারণে সে বিদ্ধ করে নিজেকে - না,আর কোনদিন এমন হবে না। ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ কে প্রাণপণে ছুঁড়ে ফেলে দিতে উদ্যোগী হয় । আর ঠিক সেই সময়ই মায়ের ডাক আসে। অর্ক ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে দাঁতের মধ্যে চালিয়ে দেয়। ছেলের গাত্রোত্থানের খবর পেয়ে মা আশ্বস্ত হয়। অঞ্জলী বুঝতে পারছে বেশ কিছুদিন ধরেই বুবু কেমন ঢিমে তালে নিজেকে বেঁধে নিয়েছে। অর্ক দাঁত মেজেই চলেছে। তার টুথব্রাশের বেখেয়াল বন্দিশ বত্রিশ পাটি দাঁতের সেবায় হাজির হতে পারছে না, একই দিকে রগড়াচ্ছে। অঞ্জলীর চিৎকারে অর্ক সম্বিত ফিরে পায়, উত্তর না করে মুখ ধুয়ে গুটিগুটি পায়ে সে হাজির হয় রান্নাঘরের দিকে। ছেলেকে দেখে অন্জলী গুল উনুনের আঁচে সশপ্যান চাপিয়ে দেয়। পিঁড়েতে বসে থাকা অঞ্জলী চেয়ারে বসা অর্কর নাগাল পায় না। মাথা উঁচু করে অবাক দৃষ্টিতে মা,ছেলের শূন্যতা পড়ার চেষ্টা করে। আগুনের আঁচে উনুনের ওপরে বায়ুর ঘনত্বের বিভিন্নতা। অঞ্জলীর চোখে অর্কর মুখ কেমন আবছা টলোমলো। গরম চা সশপ্যান ছেড়ে টেবিলের ওপরে কাপে আশ্রয় নিয়েছে। বিস্কুটের বয়াম নামিয়ে দিয়ে অঞ্জলি নিজের কাজে চলে যায়। আনমনে গরম চায়ে মুখ দিয়ে ফেলে অর্ক, ঠোঁট জিভ পুড়ে যায। বিরক্ত হয়ে চা বেসিনে ফেলে দিয়ে জামা কাপড় গায়ে চড়িয়ে সটান রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। অঞ্জলী দূর থেকে লক্ষ্য করে ওর এ হেন আচরণ।
কৃষ্ণর চাকরির মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। অঞ্জলী কৃষ্ণর কাছে তুলে ধরতে চায় ছেলের মানসিক বিভ্র্রমের কথা'। ছেলের প্রতি বাপের অগাধ আস্থা। সে বড় একটা পাত্তা দেয় না অঞ্জলীকে। অন্জলী বোঝাতে চায় মাস্টার্স করার পর অর্ক লেখাপড়ায় ইতি করে দিয়েছে,কর্মহীন জীবনের ফলে ও নিজের স্বভাব সুলভ চাপল্য হারিয়েছে। একটা চাকরি জোগাড় করলে হয়তো ওর জীবন আবার নতুন ছন্দে বাজবে। কৃষ্ণ অঞ্জলীকে বোঝায় ওর ভাবনা ওকে ভাবতে দিলে ভালো হবে,বাইরে থেকে চাপিয়ে দিয়ে লাভ নেই।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাজার মোড় হয়ে তরুণ সংঘ ক্লাব ছুঁয়ে অর্ক লাল রকে এসে হাজির হয। উদোম লাল রক রোদ্দুরের তাতে গরম। তিনজন রাজমিস্ত্রিরি আর জোগাড়ে চা পান করছে। অর্কর পরম আদরের আড্ডাস্থল বেদখল হয়ে গেছে। হবেনাই বা কেন বন্ধুরা সব যে যার কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত। কোথাও কোন শূন্যতা নেই। কেবল অর্কর হুতাশের কেউ খবর রাখে না। চলার পথে পাড়ার পরিচিত-জন খেঁজুরি করতে আসে,অর্ক হ্যাঁ না বাচক উচ্চারণে পাশ কাটিয়ে যায়। বোস ঠাকুমা পথ আগলে এসে দাঁড়ায় কিছুতেই তিনি অর্ককে যেতে দেবেন না। 'চাকরি-বাকরি করবি না, বিয়ে করবি কবে?' হাজারো প্রশ্নের অত্যাচারে অর্কর মুড আরও খিঁচড়ে যায়। না এই পরিবেশ ছেড়ে এক্ষুনি পালানো দরকার। হাঁটতে হাঁটতে সে এখন বড় রাস্তায়। চুঁচড়ো হরিপাল বাস এসে দাঁড়িয়েছে সামনে, উঠে পড়ে অর্ক। চুঁচড়া থেকে হরিপাল যাবার একমাত্র এখুনি বাস যাত্রী বোঝাই হয়ে যাবে। অর্ক জানলার ধারে বসে পড়ে। বাস ছেড়ে দিলে হরিপালের টিকিটও কেটে ফেলে। অল্প কিছুক্ষন চলার পর বাস মানুষে বোঝাই হয়ে যায়। চিৎকার-চেঁচামেচি হুল্লোডে বাস জমজমাট। একদল হাটুরে মাথার ঝাঁকা বাসের আংটায় ঝুলিয়ে বাসের ছাদে উঠে পড়েছে। মায়েরা কাঁখে বাচ্চাকাচ্চা মিয়ে মাটিতে বসে পড়েছে, কেউবা দাঁড়িয়ে লড়ে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় মশগুল। ভিনগ্রহ থেকে আসা অর্ক কে এসবের কিছুই স্পর্শ করতে পারছে না। আদিগন্ত সবুজ ধানগাছ হাওয়ায় দুলছে। বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে অর্ক। দেখছে কিনা সে নিজেও জানে না। বাসে ভিড় উপচে পড়ছে,অঞ্চলের মানুষ সবেধন নির্মনি একমাত্র বাসের গাদাগাদিতে অভ্যস্ত। অর্ক জানলার ফুরফুরে হাওয়ায় আরামে বসে আছে। ওর নজরে নেই বেদম বাস যাত্রার সঙ্কটের খবর।
ধানক্ষেত হারিয়ে যায় সারি বেঁধে থাকা গাছের আড়ালে। বাস রাস্তার সঙ্গে লম্বালম্বিভাবে গাছের বিস্তার। গাছের আড়ালে সরু লালমাটির সুরকি বিছানো পথ হঠাৎ করে ঢালবেয়ে উঠে এসেছে বড় রাস্তায়। এই পরিচিত চরাচরে শূন্যতার কোন স্থান নেই, সবই আপাত শূন্য। বেশ কিছুদিন ধরে চলা অর্কের মানসলোক শূন্যতায় পরিপূর্ণ। কোন অপূর্ণতা কুরে কুরে খাচ্ছিল অর্ককে? এর উত্তর অর্ক নিজেও জানেনা। চাওয়া পাওয়া এবং চাওয়া না পাওয়া এই দুইয়ের মিশেলে তৈরী হয়েছিল ওর শৈশবের বুনিয়াদ। আজ ওর চাওয়াই বিভ্রান্তির পথে দিশাহারা। অর্ক খুঁজেই পাচ্ছে না সামনের দিনগুলোয় ওর চলার রুট ম্যাপ। হঠাৎই গাছ ঢাকা রাস্তার মেঠো পথ দিয়ে সাইকেল নিয়ে উঠে আসে এক অবোধ দুরন্ত বালক। ড্রাইভার সজোরে ব্রেক কষেছে। হুমড়ি খেয়ে অর্কর ঘাড়ে পড়ে এক মহিলা যার কাঁখে ক্রন্দনরত সন্তান। সম্বিত ফিরে পায় অর্ক,জানলা দিয়ে গলা বাড়িয়ে সে ঘটনার আন্দাজ পেতে চেষ্টা করে। সাইকেলের সামনের চাকা দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। দূর থেকে, ছিটকে পড়ে যাওয়া বালকের শরীরী অবস্থার আন্দাজ পাওয়া যায় না কিন্তু এটুকু বোঝা যায় যে খুব বড় কিছু ক্ষতি হয়নি। চোট শরীরের তলার দিকে। স্বভাবসুলভ তৎপরতায় সে নেমে পড়ে। নামার আগে কাঁখে বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাকে নিজের সিটে বসিয়ে দেয়। একজন যাত্রী বলতে থাকে,'এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন বাচ্চাটিকে নিয়ে হাসপাতালে যাবেন ? বাসে় ফিরবেন না।' বাকিরা হেসে ওঠে। এই সমস্ত ফালতু কথায় পাত্তা না দিয়ে অর্ক ছুট্টে গিয়ে হাজির হয় বাচ্চাটির কাছে। ততক্ষণে পথচলতি কিছু মানুষ জুটে গেছে বাসের আশেপাশে। ছেলেটি উৎসাহী মানুষের বেষ্টনীতে ঘেরা। বেশ কয়েকজন ড্রাইভার এর কেবিনে উঠে ড্রাইভারকে নামিয়ে পেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজনকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায় 'টাকা ছাড় চিকিৎসার খরচ লাগবে।' জনজটের ভিতরে ঢুকে পড়ে অর্ক ছেলেটিকে দেখে বুঝে নেয় আঘাত লেগেছে পায়ে কোমরে হালকা চোট থাকতে পারে। প্রচণ্ড এক চিৎকারে কেবিনের সামনে জমে থাকা লোকজনদের প্রথমে সে সজাগ করে। তারপর ছেলেটিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় বাসের কেবিনে। ততক্ষণের ছেলেটির বাবা ঘটনাস্থলে এসে হাজির হয়েছে। ছেলেটির বাবাকে বাসে ওঠার অনুরোধ করে, অর্ক, ড্রাইভারকে বলে 'ভান্ডারহাটি হাসপাতালে চলুন যত তাড়াতাড়ি পারেন।' ভান্ডারহাটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে এখান থেকে চার কিলোমিটার এর দৌড। ড্রাইভার এমনিতেই অর্কর কাছে কৃতজ্ঞ কারণ অর্ক তাকে জনতার মার থেকে বাচিয়েঁছে। বাস যাত্রীদের মধ্যে যারা অর্ককে দু কথা শুনিয়েছিল তাদের একজন এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উল্টো সুর গাইছে। অন্যজন এখনো বলে চলেছে 'এ হলো গিয়ে শহুরে ছেলের আদিখ্যেতা।' অর্কর সিটে যে মহিলা বসেছে সে বলতে বাধ্য হয়, 'বাসের অন্য লোকজন, যখন নিজের ছানাপোনা মালপত্র সামলাতে ব্যস্ত ছেলেটা তখন রাস্তার ছেলের জন্য ঘাম ঝরাচ্ছে আর দেখ মিনষেগুলো কেমন খেউড় গাইছে, লজ্জাও করে না এদের।' মাঝবয়সী লোকটা ধমক খেয়ে থমকে যায়। ভিড় বাস হঠাৎ করে কেমন চুপ মেরে গেছে। ছেলেটির যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীরী ভাষায় নিথর হয়ে গেছে ওর বাবা। হু হু করে গতি বাড়িয়ে বাস তাড়াতাড়ি পৌঁছে যায় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে।
অর্ক আর বাসের কন্ডাক্টর পাঁজাকোলা করে ছেলেটিকে নিয়ে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভেতরে চাতালে শুইয়ে দেয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্র না ঘোড়ার ডিম বেশ কয়েকজন রোগী লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন কমপাউনডার গোছের লোক ওষুধ দিচ্ছেন। অর্ক কাউন্টারে গিয়ে ডাক্তারের খোঁজ করে। অঞ্চলের লোক অবশ্য ডাক্তারের খোঁজ কোনদিনই করে না, ওরা এই ব্যবস্থায় অভ্যস্ত। কম্পাউন্ডার মশাই একজন শহুরে ঝকঝকে তরুণকে দেখে বাইরে বেরিয়ে আসেন। একটা বাচ্চা ছেলেকে চাতালে শোয়ানো আছে। কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে কম্পাউন্ডার ছেলেটিকে চিত করে শুইয়ে বুঝতে চেষ্টা করেন। অর্ক এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে 'আপনি কি ডাক্তার?' উনি হেসে বলেন ডাক্তারকে আজ আর পাওয়া যাবে না।' অর্কর সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে উনি ছেলেটির সঙ্গেও কথোপকথন জারি রেখেছেন। ছেলেটির গোড়ালি হাতের মধ্যে তুলে নিতেই ছেলেটি চিল চিৎকার করে ওঠে। হালকা করে ওর গোড়ালির অংশবিশেষে হাত দিয়ে নিজের মনেই উনি বলেন 'ডিসলোকেশন।' তারপর অর্কর দিকে ফিরে তাকিয়ে বলেন 'আমি প্লাস্টার করে দিচ্ছি। যে কোনো মঙ্গল বুধবার আপনি এক্সরে করে নিয়ে আসবেন, সংশয় থাকলে ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। অর্ক রেগে গিয়ে বলে, 'এক্সরে না করেই প্লাস্টার, ডাক্তার বাবু ডিউটি ছেড়ে কি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে গেছেন? আমাকে ডাক্তারবাবুর নাম দিন, আমি স্বাস্থ্য দপ্তরে কমপ্লেন করব।' তরুণের উৎসাহে জল না ঢেলে দিয়ে কম্পাউন্ডার মশায় বললেন, 'কমপ্লেন অবশ্যই করবেন কিন্ত আগে প্লাস্টার করিয়ে নিন। হাড় ব্যাঁকাট্যারা জুড়ে গেলে পরিণতি ভালো হবে না।' অর্ক নিরুচ্চার ছেলেটির বাবার দিকে তাকায়। গ্রামে থাকা মানুষজন জানে কম্পাউন্ডার বাবুকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায। ছেলেটির বাবা নিশ্চিন্তে ঘাড় নেড়ে দেয়। টুকিটাকি প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিনে আনে অর্ক দোকান থেকে। ছেলেটির গোড়ালির প্লাস্টার ঢালাই হয়ে যায়।
এই প্রথম অনন্ত পাড়ুই মানে ছেলেটির বাবা মুখ ফুটে অর্ককে কিছু বলে - বেলা অনেক হলো আপনি কোথায় যাবেন? অর্ক কি বলবে ভেবে না পেয়ে বলে, 'আজ এখন আমার প্রধান এবং প্রাথমিক কাজ হল আপনাদের নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। একটা ভ্যান ডাকলে ভালো হয়।' অনন্ত একটু ইতস্তত করলে অল্প দূরে গিয়ে পকেট হাতরে দেখে যা আছে চলে যাবে। গতকাল বাড়ির ইলেকট্রিক বিল জমা পড়েনি পকেটের টাকা রয়ে গেছে। অনন্ত, অর্কর নির্দেশ পেয়ে ভ্যান ডেকে আনে। ইনজেকশন পড়ে যাওয়ায় ছেলেটির ব্যথা-যন্ত্রণা এখন যথেষ্টই কমে গেছে। তারও মুখে বুলি ফুটেছে, সে বুঝতে পারেনা এই লোকটা কে, কোথা থেকে জুটল এসে। স্বাভাবিক কৌতুহলে সে জিজ্ঞেস করে বসে 'কাকু, তুমি কে ?' যার জন্য সকাল থেকে ছোটাছুটি তার প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেয় অর্ক - বসুধৈব কুটুম্বকম, বুঝতে পারলি না তো? 'কেন বুঝতে পারবো না? আমাদের স্কুলের সংস্কৃত স্যার প্রত্যেকদিন বলেন।' অর্ক জানতে চায় এর মানে? উত্তর আসে ' তুমি আমাদের আত্মীয়।' অবাক অর্কর নিজের প্রতি করুণা হয়। মনে ভাবে শহরের মানুষ কত সহজেই অন্যকে নিজের থেকে নিকৃষ্ট মনে করে। মুখমন্ডলে জমে থাকা ক্লেদ ঝেড়ে ফেলে সে বলে,' আমি গোটা পৃথিবীর মানুষের বন্ধু হতে চাই। চুঁচড়ো তে বাস হলেও আমার ঘর হল গিয়ে বসুধা। কথা শেষ না হতেই ছেলেটি বলে,' তুমি কি যাযাবর?' উচ্চকিত কন্ঠে হেসে ওঠে অর্ক। ভ্যান রিক্সা ততক্ষণে ঘটনার উৎপত্তিস্থলে হাজির। যে ঢাল বেয়ে উঠে এসেছিল বিধান পাড়ুইয়ের সাইকেল সেখান দিয়েই নামতে হবে। অর্ক চালককে বলে সাবধান ঝাকুনিতে ওর পায়ে লাগতে পারে।
দু'মুঠো না খাইয়ে ছাড়বেন না পাড়ুই গিন্নি। কলমি শাক ডাল ভাত আর চাটনির আদরে অর্ক অভিভূত। অর্ক ভেবেছিল মাটি নিকানো ঘরের শীতলতায় একটু জিরিয়ে নেবে। অনন্ত আচমকা অর্ককে জিজ্ঞেস করে বসে, 'তুমি কোন কাজে যাবে়?' অর্ক ভাবে তাইতো, বেলা গড়িয়ে প্রায় বিকেল হতে চলল এমনটা কোনদিন হয়নি। যেখানেই যাক মাকে ফেরার সময় নির্দিষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া থাকে। ছোটবেলায় ফিরে ফিরে বাপের অন্তর্ধান পর্ব থেকেই মা একদম কাছ ছাড়া করতে চাইত না ছেলেকে। বিছানো চাটাই ছেড়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে অর্ক। অনন্তর দিকে তাকিয়ে সে বলে, 'যে কাজে বাড়ি থেকে বার হয়ে ছিলাম তা বেমালুম ভুলে গেছি। এক্ষুনি আমায় চুঁচুড়া ফিরতে হবে।' অনন্ত কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘুমিয়ে পড়া বিধানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে অনন্ত গিন্নিকে 'আসছি' বলে বেরিয়ে পড়ে সে। অনন্ত পেছু পেছু আসতে থাকে।
গোধুলি বেলায় ঘরে ঢোকে অর্ক, মা হাপিত্যেশ বসে আছে না খেয়ে। কৃষ্ণ দুপুরের খাওয়া অনেক আগেই সেরে ফেলেছে। চিন্তার বলিরেখা তার কপালেও স্পষ্ট। ঘরে পা দেবার মুহূর্ত থেকেই অঞ্জলীর বাক্যবাণে জর্জরিত অর্ক নিরুচ্চার থাকে। দুপুরের খ্যাঁটন হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলে অর্ক ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ -বাচক উত্তর করে। অঞ্জলীর ছেলেকে বুঝে নেওয়ার সকল ইচ্ছে ব্যর্থ হয়। ছেলে একবারের জন্যও রা কাড়ে না। দিন শুরুর অব্যক্ত যন্ত্রণা দিন বাড়ার সাথে সাথে উধাও হয়েছিল। মায়ের প্রশ্নর গুঁতোয় মনের অতল থেকে বুদবুদের মত ভেসে ওঠে সকালের অনুভূতি। কেমন বিষন্নতায় অর্ক ফের ডুবে যেতে থাকে। ঘরে ঢোকার সাথে সাথে বুবুর একমুখ প্রশান্তির খবর কৃষ্ণ পড়তে পেরেছিল। কৃষ্ণ ধরে নিয়েছিল আজকের কোন ঘটনার ঘনঘটায় বুবু পরিতৃপ্ত। তাই অঞ্জলীর প্রশ্নবানে কৃষ্ণ বিব্রত বোধ করছিল। একটু গলা তুলে কৃষ্ণ বলে,' থাক না, বরঙ বুবু তুই বল আজ কোথায় গিয়ে ছিলি কী ঘটলো সেখানে?' বাপের কথায় প্রসন্ন হয়ে বুবু শুরু করে আজকের ঘটনা। গল্প চলাকালীন অঞ্জলীর টিকা-টিপ্পনি পাশ কাটিয়ে যায় বুবু। কৃষ্ণর আগ্রহ এবং মধ্যস্থতায় গল্পর চলা থামেনা। অঞ্জলী ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে বাপের উদ্দেশ্যে বিষোদগার করে চলে। গল্প শেষ হলে কৃষ্ণ বলে, 'বাহ, ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত গুলো নিতে পেরেছিস বলে ছেলেটির চিকিৎসা হল। ফুট কেটে অঞ্জলী বলে,'ঠিকই, কিন্তু এর জন্য পকেটে মাল কড়ি থাকা প্রয়োজন। বাপের দেওয়া ইলেকট্রিক বিলের টাকাটা পকেটে পড়ে না থাকলে পরোপকার মাথায় উঠতো। অর্ক অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। কেমন অচেনা লাগে ওর অঞ্জলীকে। যার হাত ধরে জীবনে ভালোর পাঠ নেওয়া, সে কেমন বদলে যাচ্ছে। কৃষ্ণ ভাবে ছেলে নতুন উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পারে। এ যেন দক্ষিণ অলিন্দে দূষিত রক্তের প্রবেশ। এখুনি বদ রক্ত পরিশোধিত হওয়া উচিত। ছেলের এই ভাবনাকে বিরোধ না করে ওর ভুল ভাঙানোর দরকার। একটু গম্ভীর হয়ে কৃষ্ণ বলে,' বাবা তুই বুঝতে পারছিস না তোর মা বিয়ের পর কখনও সেই অর্থে সুখের মুখ দেখেনি। আমার চঞ্চল জীবন সংগীতে আদর্শ সংগত করেছিল সে। প্রাথমিকভাবে হয়ত কিছু না বুঝেই। আজ যখন পরিবারগতভাবে একটু সুখের মুখ সে দেখছে তাকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার স্পৃহা, কোন অন্যায় নয়।' কৃষ্ণর কথায় অঞ্জলী প্রসন্ন হয়। সে বলে, 'এতোখানি বয়স হয়ে,গেল চাকরি-বাকরি ভবিষ্যতের কোনো চিন্তা নেই। কেবল বাউন্ডূলে হয়ে ঘুরে বেড়ানো আমার একদম পছন্দ নয়। অর্ক ভাবে মানুষের জীবনে শীতল নিশ্চিন্ত চলার মোহ সকল আদর্শ ধুয়ে মছে সাফ করে দেয়। আজ পরিবারের স্রোতহীন চলায় মোহাবিষ্ট প্রত্যেকে। প্রতিমুহূর্ত নিরাপত্তার ভাবনা, গণ্ডি দেয় সৎ ভালো ইচ্ছা গুলোকে। কৃষ্ণ অর্কর নাগাল পেতে চায়। অর্ক নতুন করে ভাবতে শুরু করে।
..............................
অগস্ত্য মুনির আশ্রমে
পঁচিশ
এই এক নতুন ঝক্কি হয়েছে। অঞ্জলী লেগে থেকে ছেলেটাকে চাকরির পরীক্ষায় কিছুতেই বসাতে পারছেনা। অঞ্জলী জানে বেয়াড়াটা পরীক্ষা দিলেই পাস করবে ঘোড়াকে জলের কাছে জোর করে নিয়ে যাওয়াটাই কাজ। বাড়িতে বর্তমানে বুবু নিষ্কর্মা বসে আছে। অঞ্জলী প্রায়সই লক্ষ্য করতো ছেলে বিছানায় শুয়ে বারবার ঘড়ি দেখে। নির্ঘুম দুপুরগুলো কাটতো বারবার বাথরুম গিয়ে। মায়ের নজরে বন্দী বুবু মাঝে মধ্যে জাসুসি সহ্য করতে না পেরে দু-চার কথা বলে ফেলত। পরে আফসোস হলে মাকে জড়িয়ে ধরত। অঞ্জলী ফেউয়ের মতো পেছনে লেগে থাকত। সে বুঝতে পারত না ছেলের মনজগতে জমা ভাবনার ঘনঘটার কথা। প্রেমেটেমে পড়ে ল্যাঙ খেয়েছে বুঝতে পারলেও অন্জলীর মনে হত বুবু স্বাভাবিক। সে লক্ষ্য করেছে পাড়ার বেশকিছু মেয়ে বড্ড গায়ে পড়া স্বভাবের। বুবুর সাথে কথা বলতে পারলে তারা ধন্য হয়ে যায় অথচ বুবুর কোন হেলদোল নেই। স্কুল-কলেজের চৌহদ্দিতে তাদের সঙ্গে বুবুর কল্পিত প্রেমের সম্পর্কর কথা রটিয়ে সেইসব মেয়েরা আনন্দ পায়। অঞ্জলীর কানেও আসে এইসব গল্প। কোনটা যে সত্য অঞ্জলী গুলিয়ে ফেলে। বার কয়েক অঞ্জলী, এইসব গায়ে পড়া মেয়েদের বাবা-মায়ের কাছে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পাড়ার অন্য কোন পরিচিত ছেলের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে ইতিমধ্যেই হাজির হয়েছে। এমন এক মেয়ে বুবুর সামনে সরাসরি অঞ্জলীকে একদিন বলে, 'আপনার শেয়ানাগিরি আমি বুঝি।‘ মাকে এমন অপমানিত হতে দেখে বুবু কিছু বলতে চায় অথচ মায়ের তরফ থেকে কোন প্রত্যুত্বর আসতে না শুনে থেমে যায়। বুবু মা কে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। কেন সে চাকরির দিশায় যাচ্ছে না এটা মায়ের চিন্তার কারন হতে পারে কিন্তু এমন অদ্ভুত অলীক আচরণ মা কেন করবে! স্বভাব বিরুদ্ধ ভাবে বুবু অঞ্জলীকে তীব্র ভাষায় আক্রমন করে। অঞ্জলী কৃষ্ণ কে নালিশ করে। বুবুর ছোটবেলায় বেঁধে দেওয়া সুর আজও তার সপ্তকে বাঁধা। বয়স তাকে মুদারার কোমলতায় নামিয়ে আনতে পারে নি। কৃষ্ণ অঞ্জলীকে বহুবার এই সত্য বোঝানোর চেষ্টা করেছে যতদিন বুবু নিজের পথ নিজে খুঁজে না নেবে ততোদিন ওকে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করতে। আচরণ বদলাতে পারেনা অঞ্জলী। মায়ের মুদ্রা বোধহয় এমনই হয়।
এই অঞ্চলে নতুন যারা বাড়ি করে এসেছে তারা বেশিরভাগই রেল শিল্পের সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষ। কেউ ব্যান্ডেলে কাজ করে কেউ বা লিলুয়ায়। এদের ছেলেপিলেরা বেশিরভাগ রেলে লয়াল হিসাবে চাকরি পেয়েছে বাকিরা তোষামুদি করে। রেল আন্দোলনের সময় কাজে যোগদান করে কর্তৃপক্ষর নজর কেড়েছিল যে সব মানুষজন এরা তাদের সন্তান সন্ততি। রেল শ্রমিক এদের গদ্দার বলে সম্মোধন করে। বাপে বেটায় চাকরি করে বড় বড় বাড়ি হাঁকিয়ে এরা পড়শীর নজর কেড়েছে। অঞ্জলী কোন কারণে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়তো তা বোঝার মেধা কৃষ্ণর ছিল না। কৃষ্ণ ও বুবু দুজনে শুধু লক্ষ্য করতো অঞ্জলীর হুতাশ। বুবু অমন চাকরি পাবে না। লড়াকু শ্রমিক সন্তান কে কেউ ঐ চাকরি দেয় না। কৃষ্ণ বুবুকে বলতো,'রেলে কুলি গিরি করলে মাথায় মাল তুলে পয়সা নেবে।' হাওয়ায় ভেসে আসা বাপের কথা শ্রবনে পৌঁছালেও বুবুর মর্মে প্রবেশ করতো না। আদতে এটা ছিল লয়ালদের প্রতি কৃষ্ণর শ্লেষ।
জুট কাণ্ডের পর থেকে দীপু অনি বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। অর্ক বড় একটা ওদিক মাড়ায়নি। হয়তো ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা নিয়ে দিপু অনি খুব ব্যস্ত ছিল। এখন সব চুকেবুকে যাওয়ায় হঠাৎ করে একদিন হানা দিল অর্কদার ডেরায়। অর্ক একটু অবাক হয়ে গেছে, একটু কিন্তু কিন্তু ভাব ওর মনের কোণে লুকিয়ে। অনি এবং দিপুর কাছ থেকে অপরাধবোধ আশা করেছিল অর্ক। ওদের শরীরী ভাষায় যার লেশ মাত্র ছিল না। অনি বলে, 'কি চমকে দিলাম তো, একবারের জন্যও এলে না আমাদের ওখানে?' অর্ক আমতা আমতা করে কিছু বলতে গেলে অনি থামিয়ে দিয়ে বলে, 'ওসব ছাড়ো নতুন পরিকল্পনা আছে কাল যেতে হবে। আজ সাতসকালে সে জন্য ঢুঁ মারা। আমরা দিগম্বরপুর যাবো ঠিক করেছি তোমাকেও আমাদের সাথে যেতে হবে।' অর্ক বলে, 'নিছক বেড়াতে যাওয়া না অন্যকিছু?' অর্ক প্রশ্নের উত্তরে অনি বলে, 'দেখছো না নতুন নতুন বিশ্বায়নী শব্দ ভাসছে বাতাসে। মুক্ত বাজার, স্বাস্থ্য পর্যটন আমাদের প্রকল্পের নাম ধরে নাও রাজনৈতিক নাট্য পর্যটন।';বুঝতে না পেরে অর্ক হাবার মত তাকিয়ে থাকে। 'কাল সকাল ছয়টা, চুঁচুড়া স্টেশনে মোলাকাত', বলে, হাত নেড়ে ওরা চলে যায়। অর্কর একদম ইচ্ছে করছে না শরীরে জমে থাকা জড়তার মেদ কঠিন আকার নিয়েছে। চটজলদি যা গলিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। অর্ক ভাবে শয়তানগুলো কিচ্ছুটি না শুনে পিঠটান দিয়েছে। কি যে করবে সে বুঝে উঠতে পাড়ে না।
চুঁচড়ো স্টেশনে কথামতো দেখা হয়। অঞ্জলী রুষ্ট হয়েছিল ছেলের বন্ধুদের ওপর। কৃষ্ণ বলেছিল 'যেন শীতঘুম ঝেড়ে গাত্রোত্থান।' অকাল শূন্যতার বেড়াজাল অর্ককে জড়িয়ে ধরেছিল গত রাতে। আজ প্রথম সাক্ষাতেই হাজারো প্রশ্নের উত্তর চায় সে। অনি তখন চা খেয়ে সবে একটা সুখ টান দিয়েছে। মুখের উপর ধোঁয়া ছেড়ে সে জানায় 'যদি বলি মস্তিষ্কে তেল দিতে।' দিপু মিটিমিটি হাসছে। অর্ক কোন কথা বলছে না দেখে অনি আবার বলে, ঘা খাওয়া প্রেমিকের মতো তুমি মাইরি বৈরাগী হয়ে গেছে। বলোনা কোথায় ল্যাঙ খেলে? আমরা গুরুর জন্য পায়েও ধরতে পারি। রসালো আম খেয়ে আঁটি ফেলে দিলে গাছ হয়ে যায়। আমার গুরুর মতো এরকম সমর্থ রসরাজের জীবন এমন মাটি হয়ে যাবে? ' শিয়ালদা স্টেশন থেকে লক্ষ্মীকান্ত পুরের ট্রেনে উঠেছে ওরা। গাড়ি যত এগোচ্ছে ভিড় তত বাড়ছে। হকারদের হাঁকডাকে জমজমাট রেল কোচ। ওরা তিনজনের সামনে চারজনের পরিবার। বাদাম ডালমুট ঝুলছে ট্রেনের হ্যান্ডেলে। ফটাস জল এসে গেছে বিচিত্র শব্দ নিয়ে। গ্রামীণ শিল্প কারিগরি নিয়ে কোলা কোম্পানির সাথে অসম প্রতিযোগিতা। ক্যাম্পা কোক কেনার পয়সা যাদের নেই তারা সানন্দে ফটাশ বোতলে চুমুক মারছে। সামনের সিটে বসে থাকা পরিবারের মূল কারিগর দেখেও দেখছে না তার ছোট্ট ছেলেটা হা-পিত্যেশ করে তাকিয়ে আছে। ফটাশ ফটাশ শব্দে যাত্রীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে পানীয়। বাচ্চাটির দিদি বয়সে তিন চার বছর বড় হবে। সে ভাইকে ইশারা করছে মা বাবাকে বলার জন্য। মা ছেলের করুন আবেদনে সাড়া দিতে চাইলেও বাপ জানলায় উদাসীন। অনি বলে, 'অর্কদা চলবে নাকি?' অর্ক কোনদিন ফটাশ টেস্ট করেনি। সে ফটাশ ওয়ালাকে বলে, 'এই ভাই পাঁচটা জল দিন তো।' দিপু একটু অবাক হয়। ছিপি খুলে প্রথম দুটো বোতল এগিয়ে আসে। অর্ক হাত বাড়িয়ে ভাই-বোনের দিকে বাড়িয়ে দেয়। ছেলেটি হাতে বোতল ধরে ফেললেও দিদি দ্বিধান্বিত। সে ঠিক করতে পারছিল না কি করা উচিত। ছেলেটি মায়ের আঁচল ধরে টান দিয়ে দেখায় বোতলটা। ওর মা আগেই দেখে ছিল ছেলের আচরণে তার না দেখার ভান ছুটে যায় মুহূর্তে। বাচ্চাটা সটান সিটের ওপর দাঁড়িয়ে ওঠে। ছিপি খোলা বোতলটি মায়ের মুখে ঠেকিয়ে দেয়। দেখাদেখি মেয়েটি তার বাপকে বোতলটি বাড়িয়ে ধরে। গরিবি আত্মসম্মান বোধ ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছিল অর্ককে। এই নাজেহাল অবস্থা সহ্য না করতে পেরে অর্ক সিট ছেড়ে এগিয়ে যায়। অনি বলে,'অর্ক দা কোথায় যাচ্ছ?' অনির হাত ধরে চাপ দেয় দিপু অনি চুপ মেরে যায়।
স্টেশনে নেমে রামগঙ্গাগামী বাসে উঠে পড়ে ওরা। বসার জায়গাও মিলে যায়। ট্রেনের টুকটাক মুখ চলছিল তাই পেটে তেমন খিদে নেই। বাসে সিট রেখে চায়ের সন্ধানে ওরা হানা দেয় দোকানে। অর্ক আবারও একবার জানতে চায় গন্তব্য রহস্য। দিপু বলে, 'অগস্থ মুনির আশ্রমে যাওয়া হবে আজ।' ওদের কথার কূলকিনারা না পেয়ে অর্ক চুপ করে যায়। বাস যাবে গাব্বেড়িয়া গোপালপুর দক্ষিণবল্লভপুর জামাল হয়ে রামগঙ্গা। গুটি গুটি পায়ে চলছে বাস শহুরে রোগে আক্রান্ত গ্রামের বাস যাত্রা। চলতে চলতে অভিষ্টি লক্ষ বাবলাতলায় পৌঁছে যায় বাস। কিছু সময়ের জন্য জানলার ধারে বসে মূর্ত পৃথিবীর নান্দনিক আবহে অর্ক মহারাজের মন কল্পলোকে বিচরণ করছিল। ঘর থেকে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনার জড়তা এখন কেটে গেছে। একটু পা চালিয়ে এই ফের অর্ক জানতে চায়- একটা সত্যিকথা বলবি, সেদিনের সেই ঘটনা একটা নিছক চক্রান্ত না তোদের ইন্ধন ছিল এতে? এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে উভয়ের কেউ কোনদিন ভাবেনি। দিপু একদম চুপ মেরে যায়। অনি হাবিজাবি বকতে থাকে। দিপু রামাইয়ার প্রতি ওর আকর্ষণের কথা কবুল করতে নারাজ কারন ও নিজেকে সংযত করে নিয়েছিল। ঘটনা যা ঘটার তা অনির বোকামিতে ঘটেছে। দিপু ঠিক করে নেয় সে কোন কথা বলবেনা। অনি হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। অনি জানে অগস্থ মুনির আশ্রমে তাড়াতাড়ি কোনরকমে পৌঁছতে পারলে আপাতত মুক্তি। অর্ক বুঝতে পেরে বলে, 'বুঝলাম মৌনতা তোদের অপকর্মের সাক্ষী। কৃতকর্মের প্রমাণ হিসাবে সেদিন ইউনিয়ন যা দাখিল করেছিল তা অসত্য নয় এখন বুঝতে পারছি।' দিপু আর চুপ করে থাকতে পারে না মুখ খুলতে বাধ্য হয়। 'তুমি কোন প্রমাণের কথা বলছো, রামাদি একজন স্বাধীন মহিলা। আমরাও প্রাপ্তবয়স্ক সেদিন সেই সময়ে যদি আমি বা অনি রামাদির সঙ্গে কোন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তাম তাতে কার কি?' অনি সুযোগ পেয়ে গিয়ে খুল্লামখুল্লা বলে, 'ওরা কি ঠিকা নিয়েছে ওদের খাতায় নথিভূক্ত হয়ে তবে কাউকে আদর করতে হবে?' অবাক হয়ে অর্ক তাকিয়ে থাকে বুঝতে চেষ্টা করে কেন কার ভুলে অমন সম্ভাবনা কুঁড়িতে মুড়িয়ে গিয়েছিল। ঢেউয়ের মতো ধেয়ে আসা প্রশ্ন গুলো বুকের মধ্যে উথাল পাথাল আছড়ে পড়তে থাকে। নিরন্তর যে প্রশ্নগুলো সংকোচের গণ্ডি ভেঙ্গে ধেয়ে আসছিল শালীনতার বেড়া টপকে অর্ক তা হাজির করতে পারছে না ওদের কাছে। তবু মন চাইছে জানতে। ওকি ভুল মানুষ চিনেছিলো। এতদিনের অবসাদ অর্ক কে সংকীর্ণ করে তুলেছে। অর্ক কে চুপ করে থাকতে দেখে দিপু বলে, 'আজ তোমার মুক্তি নেই অর্কদা। তোমার বন্ধ ঝাঁপি খুলে ফেলো আমি অন্তত প্রস্তুত।' অনি ভাবে দিপু নিজেকে অনির থেকে আলাদা করতে চাইছে, দিপুর সাধু সাজার এই আয়োজন মিথ্যা করে দিতে হবে। অর্কর মনেও এই বোধ হয় তাহলে অনিমেষ দোষী। দিপু কিন্তু নিজেকে আলাদা করে নিতে চায়নি সে চেয়েছিল যে যার অবস্থান জানাক। অর্ক আর অনিকে চুপ করে থাকতে দেখে সে বলে,'শোনো তবে বলি, মিলে প্রথমদিন রামাইয়াদিকে দেখে আমার ভালো লেগেছিলো। ওরকম আনপড় সারল্য আবার নেতৃত্ব দেওয়ার সাহস আমাকে মুগ্ধ করেছিল। পৃথিবীতে এমন কোন পুরুষ মানুষ নেই রামাইয়াদিকে যার ভালো লাগবে না। তোমার নেতারাও হয়তো ওর উত্তাল যৌবনে ডুবতে চেয়েছিল পাত্তা না পেয়ে জাতক্রোধ। রামাদি কিন্তু কোনদিন কোন দূর্বলতা প্রকাশ করেনি যদিও আমার ধারণা ওর আমাদের প্রতি ভালোলাগা ছিল যদিও সেই ভালোলাগার দিশা মাত্রা সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। সেদিন হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে যাওয়ায় ও আমার হাত ধরে টেনে বার করে এনেছিল সেদিন না বুঝলেও আজ এর কারণ আমার কাছে জলের মত পরিষ্কার। রামাদি আগেই আন্দাজ করেছিল কিছু শেয়ানা জুট শ্রমিককে লাগানো হয়েছে আমাদের পেছনে। অনির মাথায় বাজ পড়েছে। স্পর্শসুখের বার্তা ওর কাছে অন্য সন্দেশ নিয়ে এসেছিল। ঘটনার তাৎপর্য আজ এই মুহূর্তে ওর কাছে জলবৎ তরলং। নিজেকে দিপুর কাছে লুকিয়ে ফেলার জন্য এখন আফসোস হচ্ছে। কিন্তু এখন তো নিজের অবস্থান জানাতে হবে কারণ ঝামেলার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সে। নিস্তব্ধতা ভেঙে অনি বলে আমি মোহগ্রস্ত ছিলাম। রামাদি কখনো আমার উৎসাহের উনুনে হাওয়া লাগায়নি। আমি আজও ওকে ভালবাসি। দিদি প্রেমিকা কমরেড কোন সত্তা আমার কাছে সত্য ব্যাখ্যা দিতে পারব না। হতাশ অর্ক স্বগতোক্তি করে এ আবার হয় নাকি।
একটা নতুন দুনিয়ায় এসে হাজির হয়েছে ওরা তিনজন। অনি পরিচয় করিয়ে দেয় আশ্রম এ থাকা কমরেডদের সাথে অর্ক আর দিপুকে। আশ্রম এর চারপাশে ঘুরে দেখে ওরা। অনিও প্রথম পূণ্যভূমে পা রাখল। আশ্রমের অধিবাসীদের প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের আত্মিক যোগ আছে। বাইরের মানুষজন প্রয়োজনে আসছে কথা বলছে। মাটির দেওয়ালে আঁকা রঙিন ছবির নান্দনিকতা মুগ্ধ করে অর্ককে। দেওয়ালের গ্রাফিতিতে পশুপাখি প্রকৃতির পাঠশালায় কর্মরত আশ্রমিক। ওরা স্নান সেরে লম্বা খাওয়ার জায়গায় হাজির হয়। নিজেদের চাষের টাটকা সবজি ডাল আর গরম ভাত। তরিবত করে খায় ওরা। প্রদীপ সরদার একজন গুরুত্বপূর্ণ আশ্রমিক। বয়স তাকে গুরুত্ব দিয়েছে ভাবলে ভুল হবে। আশ্রম প্রতিষ্ঠার শুরুর দিন থেকে উনি আছেন। শোয়ার ঘর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে প্রদীপ বাবু বলেন, 'একটু গড়িয়ে নাও। বিকেল বিকেল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সবাই আসতে শুরু করবে। শুরু হবে আজকের পালা।'
বাড়ীর বাইরে পা রাখলে অর্ক আর দুপুরে বিছানায় নিতে চায় না। বাকি দুজন বিকেলে নাটক শুরু হবে তাই নাসিকা গর্জন করে রিহার্সাল দিচ্ছে। আশ্রমের চৌকাঠ পেরিয়ে বেরিয়ে পড়ে অর্ক। ঝোপঝাড় অলিগলি পেরিয়ে ওঠে বড় রাস্তায়। নির্জন দুপুর ওর সাথে হেঁটে চলেছে আনমনে। কেউ বাড়ি চৌকাঠে বসে আছে খিলানে মাথা দিয়ে। কোথাও বাড়ির ঠাকুমা জেঠিমার মাথার উকুন বাছতে ব্যস্ত বাড়ির ছোট্ট মেয়ে। ভর দুপুরে শহরের লোকের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে মানুষজন। এমনই একজন আঙ্গুল দিয়ে অর্ককে নদীতে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেয়। রাস্তার ধারে বড় বড় লগ পড়ে আছে। সামনে উদাসীন মাঠ। লাঙ্গল দিচ্ছে চাষী। গলিপথ ছেড়ে অর্ক নেমে যায় আলপথে, দূরে গঙ্গা দেখা যাচ্ছে। নেশার মত চলতে থাকে সে। গ্রাম্য মানুষের একমাইল আদতে কতটা তা আন্দাজ করার তাগিদ নেই অর্কর। মানুষ সমান খেজুর গাছের সারি। তারই আড়াল নেয় সে। সামনেই আদিগন্ত নদী নাম যার মৃদঙ্গভাঙ্গা। এমন রোমান্টিক নদী জীবনান্দের দেশেই থাকা সম্ভব। সবুজ ঘাসের পাঠ ঝপ করে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে। ডাইনে খেজুর গাছ তলায় একটি মেয়ে কুকুরের সঙ্গে সখ্যতা পাতাবার চেষ্টায় দুই পুরুষ সারমেয়। মানুষের জীবন চর্চা ছেড়ে অর্ক হঠাৎপশু কুলের চিন্তায় বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু ঘুরে ফিরে অনি রামাইয়া দিপুর বাইরে বেরোতে পারে না সে। কিছুতেই নিজেকে বোঝাতে পারে না মানুষের মনের বিচিত্র গমন। বাঁয়ে মাঠ থেকে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে ছেলের দল। পেটকাটি ঘুড়ি সামনে বেয়ে যাওয়া একটা পালতোলা নৌকোর মাথায় লাট খাচ্ছে। অর্ক হঠাৎ করে 'আদরের নৌকোয়' উঠে পড়ে স্মৃতির ঘুড়িতে লাট খেতে খেতে। তখন সে ক্লাস সিক্সের ছাত্র। চার তলার ছাদ থেকে দূরে পতপত ঘুড়ি তুলে প্যাঁচ খেলছে। লাটাই ধরার সঙ্গী নেই। হঠাৎই বনিদি ছাদে উঠে এসে লাটাই ধরে। অর্ক ভাবে যাক এবার সমানে সমানে প্যাঁচ খেলা যাবে। ছাড়াছাড়ি প্যাঁচ পড়েছে। অর্কর সুতোর যোগান চায় বাঁ হাত দিয়ে। অনভ্যাসের লাটাই ধরা, লাটাইটা চেপে ধরে ছিল বনিদি। অর্কর বাঁহাতের আচমকা টানে সুতো ছিঁড়ে হাত থেকে ঘুড়িটা উবড়ে চলে যায়। কত সুতো! কান্না পেয়ে গেছিল বুবুর। কান্না থামাতে বনিদিদি ওর হাত ধরে নিজেদের চার তলার কোয়ার্টারে নিয়ে যায়। বাড়ি ফাঁকা, অর্ক রেগে গিয়ে বলে, 'তোমার জন্য আমার লাটাই খালি হয়ে গেল।' অদ্ভুত আচরণ করতে থাকে বনিদি। ‘কাঁদে না সোনাবুবু কাঁদে না',বলে অর্কর মাথা নিজের বুকে চেপে ধরে বনিদিদি। বুবু বলে,'আমি অত ছোট নাকি কাঁদবো, তুমি এখন ছাড়।' বনি বলে, ‘কিছু মনে করিস না, আমি ঘুড়ি লাটাই সব কিনে দেব। তুই শুধু এখন চুপটি করে থাক।' বনিদি কি যে করতে চাইছে তখন বুবুর মাথায় ঢোকেনি। দিপুর স্পষ্ট কথায় আজ অর্কর কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় বনিদির সেদিনের ইচ্ছে। হাঁ, ইচ্ছে করে সেদিন বনিদি লাটাইয়ে সুতো ছাড়ে নি। রামাইয়াদি কোন ইচ্ছায় দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল? হঠাৎ অর্কর সব রাগ গিয়ে পড়ে রামাইয়ার ওপর। রামাইয়া নিশ্চিত পার্টির এজেন্ট ছিল। দূরে আবছায়া বার্জ ভাসছে জলে। এইয়া গাছের মূল সমেত কাণ্ড ভেসে চলেছে ভাটার টানে। এক ঝাঁক কাক উৎপাটিত গাছে চড়ে দোল খেতে খেতে চলেছে সাগরের টানে। একঘেঁয়ে জীবন, রাজনৈতিক কূটকচালি ছেড়ে মানুষ কেন সন্ন্যাস নেয়। বাড়ি থেকে পালিয়ে না এলে অর্ক তার হিসেব নিকেশ করতে পারত না। হঠাৎ কর্কশ স্বরে কা কা করতে করে উড়তে থাকে কাকের দল। সাথে সাথেই জাহাজের ভেঁপু বেজে ওঠে। অর্ক বুঝতে পারে না ভেঁপুর শব্দ শুনে যদি কাকের ঝাঁক উড়ে যায় তাহলে সে কেন ভুল দেখল। প্রকৃতির অকৃত্তিম মাদকতায় সে হারিয়ে ফেলেছিল বিজ্ঞান বোধ। মন কি আলোর বেগে ছুটতে পারে,হয়তো। অর্ক ফের দেখে নিতে চায় প্রেমিক সারমেয় যুগলকে খুঁজে পায় না। অর্ক ভাবতে থাকে না অনি কিছুতেই রামাইয়ার সাথে অন্যায় কিছু করতে পারে না। তাহলে কেন মিছিমিছি সে দূরে সরে গিয়েছিল? অনি খুব আবেগপ্রবণ হয়তো সে ভেবেছিল রামাইয়া ওকে ভালবাসে। অনির মনে যদি পাপ বোধ থাকত তাহলে এই যাত্রায় সঙ্গী হতে ও কিছুতেই অর্ক কে ডাকতো না। প্রকৃতি সব কিছু ধুয়ে দিতে পারে। ওর মনের কোনে জমে থাকা বিষন্নতা হঠাৎ কেমন উবে যায়।
বেলা গড়িয়ে গেছে আপন গতিতে। অর্কর সময় থেমে গিয়েছিল। হঠাৎ খেয়াল হলে লাফ দিয়ে সে উঠে পড়ে। দীর্ঘায়িত খেজুর গাছের ছায়া নদীর বুকে টলমল করছে। অর্ক জলে নিজে ছায়াও দেখতে পায়। মানুষের মনে বিশ্বাসের স্তর ভেদ থাকে। যে ছায়া জলে টলোমলো শরীরে মনে সে এখন ধীর-স্থির। হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে সে। আর দাঁড়ালে অনেক দেরি হয়ে যাবে। 'একটু পা চালিয়ে ভাই', বাপের আওড়ানো কবিতা সম্ভার উত্তরাধিকার সূত্রে তার কাছে মাঝে মধ্যে হাজির হয়। হাঁটতে থাকে অর্ক। দোকানপাট দুপুরের ভাত-ঘুম ছেড়ে জেগে উঠেছে। চায়ের দোকানের উনানেও আঁচ উঠেছে। অর্ক দাঁড়িয়ে যায়। তেষ্টায় ছাতি ফাটছে গুটিগুটি পায়ে চায়ের দোকানের লম্বা বেঞ্চে আশ্রয় নেয় সে। দোকানি মাঝবয়সী মহিলা মিষ্টি হাসিতে জিজ্ঞেস করেন 'চা দেব’? উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে আবারও বলেন 'এদিকে কোথায় হোটেলে উঠেছেন?' অর্ক ঢকঢক করে তৃষ্ণা মেটায়। তারপর জানতে চায় দোকানির পরিবার-পরিজনের ইতিবৃত্ত। কথার ফাঁকে দোকানি ততক্ষণে জেনে ফেলেছে অর্করা অগস্ত্য মুনির আশ্রমে উঠেছে। 'আজ তো পালা আছে, আপনারা কি শহর থেকে পালা দেখতে এসেছেন?' অর্ক এ বিষয়ে অজ্ঞ সে কি বলবে বুঝতে না পেরে মাথা নাড়ে এবং ফিরতি প্রশ্নে জানতে চায় এখানকার মানুষের জীবিকা সম্পর্কে। মহিলা দোকানি ধরে নেয় শহরের খোকা তার জীবিকা সম্পর্কে জানতে চাইছে। সে বলে 'এই চায়ের দোকান আর চাষের মরশুমে জন খাটা। কোনরকমে সংসার ধুকে ধুকে চলে যায়।’ অর্কর মন চায় অনেককিছুর নাগাল পেতে কিন্তু বাঁধো বাঁধো ঠেকে। অর্কর প্রশ্নের আন্দাজ করতে পেরে মহিলা বলে, 'পাবে গো দাদাবাবু তোমার সব প্রশ্নের উত্তর পাবে। আজ মন দিয়ে পালা শুনলে।' এমন হিং টিং ছট উত্তরে সন্তুষ্ট না হয়ে চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে অর্ক উঠে পড়ে।
আশ্রম এ ফিরে এসে দেখে অনি দিপু উসখুস করছে বিড়ি খাওয়ার আশে। বয়ে আনা স্টক শেষের দিকে তাই তারা এনার্জি বাতাস জোগাড় করতে বের হবে। অর্ক আসার পথে আন্দাজ করে ওদের জন্য দু প্যাকেট ছোট কাকার বিঁড়ি জোগাড় করে এনেছে। নিশ্চিন্ত হয়ে ওরা প্রাঙ্গণে হাজির হয়। ভীড় জমতে শুরু করেছে। দিনও ঝপঝপ করে ফুরিয়ে গিয়ে সন্ধ্যাকে ডেকে আনছে। কুপির কম্পিত আলোকে অগস্ত্য মুনির আবক্ষ মূর্তি আলো-আঁধারিতে বিমুর্ত। দেখতে দেখতে প্রাঙ্গণের প্রায় হাজারখানেক মানুষ জড়ো হয় যার বেশিরভাগই মহিলা। স্টেজ বলতে গাছ তলার মাটি থেকে ফুট খানেক উঁচু চাতাল। আলো এসে পড়েছে চাতালে। গাছের আড়াল থেকে এসে হাজির হলেন মধ্য তিরিশের যুবা নাম সঞ্জয় গাঙ্গুলী। অর্করা সামনের দিকে বসে পড়ে। সঞ্জয়বাবু পরিচয় করিয়ে দেবেন অভিনেতা অভিনেত্রীদের সঙ্গে শহুরে মানুষদের। কী আর নাটক হবে, অর্ক তেমন আশাবাদী নয়। ওকে শুধু অবাক করেছিল জনসমাগমে মেয়ে মহলের উপস্থিতি। সঞ্জয়বাবু দুহাত তুলে মঞ্চের লব কুশদের সাথে নতুন মানুষজনদের পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন 'এই মঞ্চ আদতে এঁদের।‘ অর্ক এন্ড কোম্পানি দেখে দর্শকদের দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছেন সঞ্জয়বাবু। বোধগম্য হয় না ব্যাপারটা ওদের কাছে। নাটক শুরু হয়ে যায়। বিশাল মঞ্চে ভিন্ন পেশা অবস্থানের ভিন্ন ভিন্ন পরিবার পালা সাজিয়েছে। যারা এই মাটির বাসিন্দা। সবার জীবনের মূল সমস্যা দিন আনা দিন খাওয়া। কোনরকমে আধপেটা জীবন। ঘরের বাচ্চাগুলো অপেক্ষায় থাকে কখন মা এসে উনুনে আঁচ দেবে। ভ্যানচালক পুরুষ ক্ষেত থেকে সবজি আনে হাটে। হাতে দুপয়সা মেলায় চোলাই খায়। হাট পর্ব সমাপ্ত হয়ে হাটুরেরা কখন ঘরে চলে গেছে। শুনশান হাটে খোয়াব দেখতে থাকে মরদ। প্রতিদিনই এক কিসসা। ছেলে মেয়ের মুখ চেয়ে মা মাঠে-ঘাটে জন খাটে কেউবা বড় বাড়িতে পরিচারিকা। নিয়ম করে পুরুষেরা সকাল হলেই যে যার কাজে বেরিয়ে পড়ে। মাঠে ঘাটে কর্মস্থলে নেশার যোগান আছে। সূর্য যখন আপন নিয়মে পাটে যাবে তখন নেশা কেটে পেটে ছুঁচোর হুটোপাটি। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে ঘরমুখী নেশাড়ু পুরুষ মেজাজ সপ্তমে তুলে ফেরে। বৌ ভাত বেঁধে রাখবে, কোথা থেকে ভাত আসবে তার খেয়াল নেই। মঞ্চে হরেক পরিবারে নিত্য ঘটে চলেছে একই ঘটনা। হঠাৎ করে ডাটো এক মেয়েছেলে নাম সোনালী সে ঘরে ঘরে গিয়ে মহিলাদের বলে আমাদের একত্রিত হতে হবে। গড়ে ওঠে মহিলা ফৌজ। মদো মাতাল স্বামী ঘরে এলেই খবর চলে যায় ওদের কাছে। জুতো ঝাঁটা রামধোলাই খেয়ে চুপ মেরে যায় মাতাল পুরুষ। পৌরুষ ধাক্কা খায় কিন্তু নেশামুক্তি ঘটে না। ঘরে ফিরলে তবে তো আড়ম ধোলাই যদি ঘরে না ফেরা যায় তাহলে কেল্লাফতে। এই জায়গায় নাটক থেমে যায়। মঞ্চে উঠে আসেন সঞ্জয়বাবু। 'দর্শকদের কাছে ডাক আসে মঞ্চের কুশীলবরা পথ খুঁজে পাচ্ছে না। আপনারা কী কিছু আলো দিতে পারেন?' দর্শকদের থেকে তিন জন মহিলা উঠে আসেন তারা এক একজন মহিলার চরিত্রের নিজেদের দাঁড় করান। এদের মধ্যে একজন অর্কর দেখা চায়ের দোকানি। নাটক ফের শুরু হয়ে যায় সঞ্জয়বাবু দাঁড়িয়ে থাকেন। নতুন মানুষ পুরনো চরিত্রর খোলসে ঢুকে পড়ে। ফের নাটক শুরু হয়ে যায়।
প্রথমজন- কোন রাস্তায় আমাদের চলা উচিত?
দ্বিতীয়- গ্রাম পঞ্চায়েতে জানাই চলো।
প্রথম - এর আগে পঞ্চায়েত কে জানানো হয়েছিল কোনো ফল হয়নি। তবে উপায় একটা আছে।
দ্বিতীয় - উপায়?
তৃতীয় - চলো চোলাইয়ের ঠেক গুলো ভেঙে দিয়ে আসি।
দ্বিতীয়- লড়াই লেগে গেলে, ওদের পোশা গুন্ডা মাস্তান আছে।
প্রথম - তাহলে থানা পুলিশ হোক।
দর্শক আসনের থেকেই অনেকে উঠে স্টেজের দিকে ধেয়ে আসে। তারা সমর্থন জানায় পুলিশে যাওয়ার অভিমত মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়। কথক মঞ্চের মাঝে এসে দর্শকদের জিজ্ঞেস করে – আপনাদের কি একই অভিমত? চিৎকার করে হাত তুলে অভিমত পোষণ করেন অধিকাংশ দর্শক। নাটক শেষ হয়। শহর বাবুরা জমজমাট ড্রামায় হতবাক হয়। কেউ কেউ অবশ্য দর্শক এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মিলে মিশে যাওয়াকে স্থুল চোখে দেখে। সারবত্তার দিকটা তাদের নজরে আসে না।
পরের দিন ভোর সকাল থেকেই আশ্রম এ জনসমাগম বাড়তে থাকে। দলবেঁধে মানুষজন থানায় যাবে। মানুষজনের বড় অংশই মহিলা। পুরুষ বলতে নাট্যকর্মীরা। অর্ক অনি দিপু উৎসুক। আজ আর মঞ্চে নয় জীবন্ত নাটক দেখবে ফাঁড়িতে। থানার খবর ছিল রামগঙ্গা বাসিন্দারা আসবে সঙ্গে ট্যাংরার চরের লোকজন। পাশের ফাঁড়ি থেকে পুলিশ চেয়ে পাঠানো হয়েছিল। যাদের আর্জিতে উত্থাপন হয়েছিল ফাঁড়িতে আসার প্রস্তাব তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সঙ্গে হাজার হাজার কালোমাথা। থানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সেন্ট্রি কি কেন প্রশ্ন করলে, মেয়েরা জানায় যা দরকার দারোগাবাবু কে বলবো। মেয়েদের সঙ্গে প্রদীপবাবু ভিতরে ঢোকেন, লিখিত অভিযোগ জানানো হয়। বেআইনি চোলাই কারখানা বন্ধ করতে হবে। ফাঁড়ির ভেতরে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটে বাদানুবাদে। রঙঢঙ করে দারোগাবাবু জানায় তার অক্ষমতার কথা। প্রদীপ বাবুর দারোগাকে বলেন, 'আমরা চলে যাচ্ছি না। মানুষের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিরে আসব। আলতো উচ্চারণে দারোগা বলে 'বড্ডো তেল হয়েছে তোমাদের নিংড়ে বার করতে হবে।'
থানার সামনে পাঁচিল ঘেরা অঞ্চলে প্রদীপবাবু দাঁড়িয়ে যায় সঙ্গী কুশীলব আরো তিনজন পাঁচিলের বাইরে-ভেতরে জনসমাগম উপছে পড়ছে। নাটকের প্রথম দৃশ্য এর অবতারণা হয় যেখানে প্রদীপবাবু দারোগার ভুমিকায় আর বাকিরা গ্রামবাসী।
দারোগা -এত হই হল্লা কিসের?
প্রথম জন- দরখাস্তে লেখা আছে। ( লিখিত দরখাস্ত জমা হয়। চোখ বুলিয়ে নেয় দারোগাবাবু।)
দারোগা রুপি প্রদীপ- বুঝলাম। তোরা কেমন মাগী পুরুষ মানুষকে ঘরে আটকে রাখতে পারিসনা? (হতভম্ব হয়ে যায় সব্বাই)
গ্রামবাসীদের একজন- আপনারাই বা কেমন পুরুষ যে চোলাইয়ের ঠেক থেকে দানা পানি আনতে যান। দারোগা- যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা।
অন্য গ্রামবাসী -বাঁচার আশায় আমরা প্রশাসনের কাছে এসেছি প্রশাসন ব্যবস্থা নিক।
দারোগা- বাসে উঠেছিস কখনো দেখেছিস কি লেখা থাকে। মাল নিজের দায়িত্বে রাখুন। অবশ্য তোরা আর পড়বি কি তোরা তো গন্ডমুখ্যু।
গ্রামবাসী- লেখাপড়া জানলে বুঝি দেশের সাধারণ মানুষকে তুই-তোকারি করতে হয়। আমাদের অমন লেখা পড়ার দরকার নেই। (দারোগার নির্দেশে কয়েকজন ফাঁড়ির কনস্টেবল হোমগার্ড নাটক থামিয়ে দিতে এগিয়ে গেলেও রা কাড়তে সাহস পায়না। জনসভার চেহারা দেখে ফাঁড়ির সবাই এমনকি দারোগাও হতভম্ব হয়ে গেছে।)
নাটকের দারোগা - যাহ, যা পারবি করগে যা। আমরা সরকারি চাকুরে, ফালতু কাজ করতে আসিনি। শুধু ল অ্যান্ড অর্ডার দেখা আমাদের কাজ।
নাটক এইখানে থেমে যায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে প্রদীপ বলেন- আপনারা বলুন এই অবস্থায় আমাদের কি কি করার আছে? অর্ক দেখে ঠিক যেন গতকালের নাটক। তফাৎ শুধু আজ যুদ্ধক্ষেত্রে মঞ্চস্থ হচ্ছে। থানার সামনের ফাঁকা অঞ্চলে, কল্পিত মঞ্চে উঠে আসে সাধারণ মানুষ।
গ্রামবাসীদের একজন- পুলিশ বাবুরা লেখাপড়া জানা বউকে বাড়িতে বন্দি করে চকপাড়ায় বেশ্যা সঙ্গ করতে যায়। (গোটা পুলিশ ফাঁড়ি হজম করতে থাকে নাটকের সংলাপ। দারোগা ওদের ডেকে পাঠায় প্রদীপ আলোচনায় না গিয়ে নাটক এগিয়ে নিয়ে যায়।)
সূত্রধর কথক প্রদীপ- আমাদের এখন কি করা উচিত?
গ্রামবাসীদের অপরজন- বহুদিনের টাকা খাওয়ার অভ্যেস এদের দু একদিন সময় দেয়া হোক।
অন্য একজন গ্রামবাসী - এর মধ্যে চোলাইয়ের আখড়া ভেঙে যদি না ফেলা হয় তাহলে হাইওয়ে অবরোধ করব।
প্রদীপ- আপনার আপনাদের মত জানান।
সর্বসাধারণ- গগনভেদী চিৎকারে হাত তুলে জানায় সিদ্ধান্তে তাদের মত আছে।
প্রদীপ এগিয়ে গিয়ে থানার দারোগাকে বলে, ‘নিজ কানে শুনলেন? এখন দায়িত্ব আপনার।‘
ভিড় হালকা হলে দারোগা ঠেকের মালিকদের ডেকে পাঠিয়ে বলে, 'তোরা বেশ কিছুদিন এলাকা থেকে হাওয়া লাগা। চিঠির কপি ওরা নিশ্চয়ই এসপি কে দেবে। কাগজে খবর হয়ে গেলে আমাদের ঠেক ভাঙতেই হবে। উপদেশ মত হাওয়া দেয় চোলাই ম্যানেজাররা। দুদিন পর অগস্ত্য মুনির আশ্রমে রিপোর্ট আসে কোন ঠেক ভাঙা হয়নি। শুধু ঝাঁপ বন্ধ আছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ঘোষিত নীতি অনুযায়ী তারা পথ অবরোধ করবে। নির্দিষ্ট দিনে পথ অবরোধ হয়। বেশ কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় বসে পড়ে। শুধু এম্বুলেন্স অবাধে চলতে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশি আগ্রাসন নেমে আসে। প্রদীপ আরও দু চার জনকে পুলিশ ধরপাকড় করে থানায় নিয়ে যায়। থানা ঘেরাও করে বসে থাকে গ্রামবাসী। ধরপাকড়ের সমাচারে দূর গ্রাম থেকেও সাধারন মানুষ ভীড় জমাতে শুরু করেছে। গ্রামের মহিলারা সড়কপথের বিভিন্ন জায়গায় অবরোধ করে। পুলিশ সামলাতে পারছে না। খবর গেছে এস.পির কাছে। বিরক্ত এস.পি জানতে চাইছে কেন এমন হলো? দারোগা নিজের দোষ এড়াতে অগস্ত্য আশ্রমের নামে চুগলি করে। অবরুদ্ধ সড়ক বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে আমতলা সহ বৃহত্তর কলকাতাকে। পঞ্চায়েত প্রধান ফাঁড়িতে এসে হাজির সঙ্গে পার্টির লোকজন। সময়ে অগ্রণী ভূমিকা না নিয়ে পার পেয়ে গেলেও প্রদীপের অ্যারেস্ট রাজনৈতিক নেতাদের মুখে চুনকালি ছেটাবে নিশ্চিত। জনতা জনার্দনের গোঁতা কাকে আর বলে তারা সরাসরি নেতাদের জানিয়ে দেয় তিন দিনের মধ্যে সমস্ত চোলাই ঠেক যদি ভেঙে না ফেলা হয় তাহলে লাগাতার অবরোধ হবে। নেতারা দারোগাকে প্রদীপকে ছেড়ে দেওয়ার আর্জি জানায়। দারোগা বাধ্য হয় আটক গ্রামবাসীদের ছেড়ে দিতে। ঘটোনার ঘনঘটায় উত্তেজিত অর্ক পাশের বাড়িতে ফোন করে মা-বাবাকে জানিয়ে দেয় তার ফিরতে দেরী হবে। নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলে আশ্রমে জড় হতে থাকে সব্বাই। হইহই করে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ছুটতে থাকে মানুষ। একে একে চোলাইয়ের হাঁড়িতে মৃদঙ্গর বোল উঠতে থাকে। নৃত্যের তরঙ্গে ভাসান হতে থাকে চোলাই ঠেকের ‘যা কিছু সম্বল’। মৃদঙ্গভাঙ্গা নদীতে আজ বান ডেকেছে। টালির চালা, খোঁটা বাঁশ, উনুনের ইট আর ড্রাম কে ড্রাম চোলাইয়ে তৃপ্ত নদীতে যেন জোয়ার লেগেছে। এলাকার পুরুষরা হয়তো এবার ঘরে ফিরবে।
অর্ক বাবুর মনের ঘরে বসত করা ভাবনার সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আস্তাকুঁড়ে ফেলে আসা স্বপ্নগুলো আবার কুড়িয়ে তোলা উচিত হবে কিনা অর্কর অন্তরের ভোম্বল দাস ভাবতে শুরু করেছে। অর্ক দিপুকে বলে,'একটা বিড়ি দিবি, ধরিয়ে দিতে হবে কিন্তু।' দিপু আগুন দেয় অর্কদার মুখে। অনি জিজ্ঞেস করে 'অর্কদা, তাহলে কোন আশ্রমের আশ্রমিক হবে তুমি?' অনির প্রশ্নে একটু হেসে অর্ক বলে, 'কেন,অগস্ত্য মুনির আশ্রম।' হো হো করে হেসে ওঠে অনি আর দিপু। ফ্যালফ্যাল জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকে অর্ক! দিপু বলে, 'উনি অগাস্টো বোয়াল, ফোরাম থিয়েটারের জনক, সঞ্জয়বাবু সঙ্গে ওনার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। আশ্রম থেকে বেরিয়ে চলতে চলতে কথোপকথন শুরু হয়েছিল। কোথায় অর্ক অগ্যাস্টো বোয়ালের নাম শুনেছিল মনে করতে পারে না। অনি তার বক্তব্যে পাওলো ফ্রেয়ারের কথা বলতেই অর্কর মনে পড়ে যায় স্তানিস্লাভস্কি আর বোয়ালের কথা। স্তানিস্লাভস্কি নাটক নির্মাণ করতেন আলোচনার মাধ্যমে আর বোয়াল গণতান্ত্রিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে। অর্কর তর সয় না, সে অনি আর দিপুকে দাঁড় করিয়ে রেখে একছুট্টে আশ্রমে চলে যায়। সঞ্জয়বাবু মাঠে চাষের কাজে হাত লাগিয়েছেন। অর্ক কে ফিরে আসতে দেখে উনি জানতে চান কিছু ফেলে গিয়েছে কিনা। অর্ক জানায়, 'নাঃ, ঝোলা অপূর্ণ রয়ে গেছে,পূর্ণতার সন্ধানে ফিরে এলাম।' সঞ্জয়বাবুকে শুনতে থাকে অর্ক। "লিবারেশন থিওলজিস্টদের প্রশ্ন ছিল ধর্ম কার জন্য? পাওলোর প্রশ্ন সেখানে কার জন্য শিক্ষা? নিপীড়িত মানুষের শিক্ষার ধারনায় প্রথম আলো দেন পাওলো। সেই পথ ধরেই বোয়াল জানতে চাইতেন থিয়েটার অভিনেতাদের না দর্শকের। সবকটি প্রশ্নের উত্তরই এক। নিপীড়িতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতির নাম ধর্ম শিক্ষা এবং নাটক। এই পথে হেঁটে পাওলো এবং অগ্যাস্টো বোয়াল ল্যাতিন আ্যমেরিকায় নিঃশব্দতার সংস্কৃতি ভেঙে নিপীড়িত জনকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছেন। আর এই অধমের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় ভারতবর্ষে, খুব নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে মধ্যমগ্রামের বাদু চব্বিশ পরগোনার পাথর প্রতিমায় এই কাজ শুরু হয়েছে।' বিস্ময়াবিষ্ট অর্ক চুপ মেরে গেছে, সে জানতেও পারেনি অনি আর দিপু কখন এসে বুভুক্ষুর মতো অমৃতসুধা পান করছে। অর্ক হেঁসে বলে ওদের উদ্দশ্যে,‘রয়ে সয়ে গেলও নাহলে হজম হবে না।‘ হাঁসির রোল ওঠে প্রাঙ্গনে।সঞ্জয় বাবু ওদের পুনর্বার আসার আমন্ত্রন জানায়।
নিজের ভাবনা ও বিশ্বাসের ওপর বড্ড বেশি আস্থা ছিল অর্কর। আজ ঠুনকো অহংয়ের কাঁচ ঘর খান খান হয়ে ভেঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। নগ্ন পায়ে সে হেঁটে চলেছে ছিটিয়ে থাকা শানানো টুকরো গুলো পাড়িয়ে। রক্তাত্ত ক্ষত বিক্ষত পদযুগলে সমর্পণের ঈঙ্গিত। ওর কর্ণকুহরে এখন রিদয়ের শব্দ ছাড়া কারও প্রবেশ অধিকার নেই।
কে প্রথম কথা দিয়েছি।
ছাব্বিশ।
মায়ের ইচ্ছেপূরণ হল। দিগম্বরপুর থেকে ফিরে, ফিরে পাওয়া গেছিল ছেলের অতীত উচ্ছলতা। যে অঞ্জলী অনি দিপুকে গালাগাল পাড়ত এখন সে তাদেরই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বর্তমানে অর্ককে দেখা যাচ্ছে সারাদিন হাবিজাবি বই নাড়াঘাঁটা করতে। অঞ্জলী বুঝতে পেরেছে জোর করে কিছু সম্ভব নয়। চাকরি-বাকরি পরীক্ষা ইত্যাদি নিয়ে তার চিন্তা থাকলেও ছেলেকে কিছু বলে না। সরকারি চাকরির সুযোগ বয়সের কারনে অর্ক প্রায় পেরিয়ে যেতে বসেছে। মা হয়ে উদ্বেগ থাকা সমীচীন তবু মনের উদ্বেগ মনেই চেপে রাখে অন্জলী। তিনটে ফরম ফিলাপ করে অর্ক একসাথে। ঘোষণা হয় প্রথম পরীক্ষার দিন। অর্ক উত্তরপত্রে উগড়ে দেয় জীবনে অপ্রয়োজনীয় বই কুড়ানো জ্ঞানভাণ্ডার। অঞ্জলীর হা-হুতাশ বৃহস্পতি বার লক্ষ্মী আগমন সংবাদে উবে যায়। ব্যাংকের চাকরিতে যোগদান করে অর্ক। অঞ্জলীর অবশ্য চিন্তার জ্বালা থেকে মুক্তি নেই বুবুকে অঞ্জলী আগাপাশতলা চেনে। ছেলে যে সংসার ধর্ম পালন করবে অন্য কিছুতে ভিড়ে যাবে না তার গ্যারান্টি কই। অঞ্জলীর অকারণ চিন্তা স্রোতে ভাঁটা দিতে কৃষ্ণ মাঝে মধ্যে আমুদে হাসে। পিত্তি জ্বলে যায় অঞ্জলীর সে বলে, 'এইখানেই বাপ আর মায়ের ফারাক।' কৃষ্ণ বলে, 'তুমি ঠিক এমনটা ছিলে না,তোমাকে বীরঙ্গনা হিসাবেই জেনে এসেছি এতকাল।' অঞ্জলী উত্তর করেনা। একরোখা ছেলেকে নিয়ে সর্বদাই তার ধুকপুক জীবন। বুবু বাড়িতে কি সব অচেনা যন্ত্রপাতি নিয়ে আসছে। ছেলেকে জিজ্ঞেস করলে বলে, 'চুরি ডাকাতিতে হাত পাকাচ্ছি। এইসব ইকুইপমেন্ট দিয়ে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ির ছাদে অনায়াসে চলে যাওয়া যায়। বড়লোকের সম্পদ ডাকাতি করে গরীব লোককে বেলাতে হবে।' অঞ্জলী বলে, 'ইয়ার্কি মারিস না ভয় করে, বয়সের ধর্মে একটা প্রেম-টেম করতে পারিস না?' অর্ক বলে, 'করছি তো, আমি নন্দাকে ভালোবাসি।' কৃষ্ণ মুচকি হাসে। অঞ্জলী, নন্দা মুচকি হাসি কোন কিছুর রহস্য ভেদ করতে পারে না। কৃষ্ণ বলে, 'নন্দাদেবী ভারতবর্ষের উচ্চতম হিমালয় শিখর।' অঞ্জলী বলে,'যত্তসব।' ঘর ভরে গেছে গাঁইতি লাঠি ক্যারাবিনার তাঁবু দড়িতে। অঞ্জলী রেগেমেগে বলে, 'বুবু, একটা কলসি আনিসতো।' বুঝতে না পেরে বুবু জানতে চায় কলসি দিয়ে কী হবে? মা জানায় দড়ি যখন এনেই রেখেছিস তখন শুধু কলসি জুটলেই হবে। ছেলের পাহাড় পাহাড় খেলায় মন মজেছে। আজ কুমায়ুন তো কাল সিকিম হিমালয়, নিত্যদিন পালাই পালাই। রথিনের সঙ্গতি নেই কিন্তু ইচ্ছা আছে। অর্কদাকে হঠাৎ করে একদিন সে তার ইচ্ছার কথা জানিয়ে ফেলে। অর্ক বলে, 'চল না, টাকাপয়সা ঠিক যোগাড় হয়ে যাবে। রথিন জানে, অর্কদা পকেট থেকে টাকার যোগান দিয়ে দেবে তাই আগ বাড়িয়ে সে বলে, 'তুমি ধার দিও আমি মাসে মাসে শোধ দিয়ে দেবো।' যদিও রেল কামরায় বাতাসীর হঠাৎ আবির্ভাবের কিছুদিন পর থেকে রথিনের মনে হচ্ছে অর্কর পালে হাওয়া কম লাগছে। উদাসীন ইতস্তত ঘুরে বেড়ানোর রশিতে কেউ যেন অদৃশ্য টান দিয়েছে। রথিনের পরিবার জীবন ছেড়ে পালানোর সুযোগ বা অর্থের যোগান কোনটাই নেই। তাই অর্কর নিত্য উড়ানে সঙ্গী হওয়ার মুরোদ নেই তার। অর্কদা যখন বেড়াতে চলে যেত তখন করুণ মুখে রথিন তাকিয়ে থাকত। অর্কর সঙ্গ রথিন হারাতে চাইত না। এখন অর্কর পায়ে বেড়ি পড়েছে রথিন খুশি। যদিও বাঁশবেড়িয়ার পিকনিকের পর এখনও তেমন কিছু ঘটেনি। রথিন মনে মনে নিরন্তর দ্রুত অনু-ঘটনের জাল বুনে চলেছে। জলদি একটা এসপার-ওসপার করতেই হবে রোজ বাড়িতে ফিরে আক্ষেপ করে রথিন কিন্তু পথ খুঁজে পায়না। একদিন রথিনের স্ত্রী বলে, 'তোমার মত ভাই থাকলে দাদাকে সারাজীবন আইবুড়ো থাকতে হবে।' রথীন বলে, 'মাইরি একটা পথ বাতলাও না।' রথিনের বউ কমলা বলে,'সাহস আছে? আমার বুদ্ধিতে চলো নিমেষে কেল্লাফতে হয়ে যাবে।' রথিন জানতে চায় আশু কর্তব্য। কমলা বলে, 'আমি বাতাসীদির হয়ে অর্কদা কে একটা চিঠি লিখছি।' রথিন বলে, 'না, বাতাসীদি হেব্বি ক্ষেপে আছে।' কমলা বলে, 'দাদার ওপর ক্ষেপে থাকাই স্বাভাবিক। সবার হয়ে রুস্তমি করে অথচ নিজের বেলায় লবডঙ্কা। দাদা কি জানে বাতাসীদির অভিমানের কথা?' রথিন বলে, 'সম্ভবত না।' 'তাহলে এক কাজ করো দাদার হয়ে লেখা চিঠি আগে পৌঁছাক বাতাসীদির কাছে তারপর দেখো কী হয়। বাতাসীদি উত্তর করলে ভালো। না করলে আমি লিখব দিদির জবানীতে। প্ল্যান অনুযায়ী দাদার চিঠি পৌঁছে যায় বাতাসীর কাছে। বাতাসী রথিন কে বলে, 'আমি রাজি। দিনক্ষণ ঠিক হোক। ফাঁপড়ে পড়ে রথিন। কিভাবে সে দাদাকে জানাবে। স্ত্রী কমলা বলে, 'নো চিন্তা, কোথায় কখন নিরালায় দেখা করে দু'দন্ড ওরা কথা বলতে পারবে তেমন জায়গার নাম বলো। আমি সেই মতো চিঠি লিখে ফেলছি।'
খুব সাবধানে কমলা লেখে-
অর্ক দা
আমি আপনার সাথে শনিবার বিকেলে হাওড়া রেল মিউজিয়াম এর কাছে দেখা করতে চাই। আপনার মত না থাকলে রথিনদা কে জানাবেন।
ইতি
বাতাসী।
ট্রেন কামরায় বাতাসীর চিঠি সবার অগোচরে অর্কর কাছে পৌঁছে যায়। অর্ক যে কখন চিঠি পড়ে ফেলেছে তা অন্য কেউ টের পায়না। অর্ক শুধু বলে, 'রথীন, হাওড়া স্টেশনে আমার একটা ছোট্ট কাজ আছে তোমাকে থাকতে হবে।' রথিন বুঝে যায় বকলম বয়ানে কার্য সিদ্ধি হয়েছে।
শনিবার বসা ঠিক হয়। শনিবার দুজনেরই হাফ ছুটি। অর্কর মন লাগছিল না কাজে। এর কারণ শুধুমাত্র শারীরিক-মানসিক প্রেমজ উন্মাদনা নয়। কিছুতেই সে বুঝে উঠতে পারছিল না কিভাবে প্রকাশ করবে নিজেকে। সে আগে এই পরিস্থিতিতে কখনও পড়েনি। ওদিকে বাতাসীর কাছে প্রতিটা মুহূর্ত যেন এক একটি দিন। প্রিয় দিদিমনির এহেন উদাসী নয়ন দেখে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রীরা কিছু বুঝে উঠতে পারে না। একজন জিজ্ঞেস করে, 'দিদি, আপনার শরীর খারাপ?' উত্তর দিতে না পেরে বাতাসী ততধিক আনমনা হয়ে যায়। বাতাসী চায় ভালোবাসার কথা আজ আগে অর্ক কবুল করুক। বাতাসী জানেনা তার বাবা কিভাবে মাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। কল্পনায় সে দেখে ফেলে সেই দৃশ্য তার বাবা হাঁটু গেড়ে ফুল নিয়ে মাকে দিচ্ছে হেসে ফেলে সে। হারু কাকা সীমা পিসির বিয়েও ভালোবাসার। সীমা পিসিকে জিজ্ঞেস করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু হাবা কাকা সীমা পিসির সঙ্গে কেমন করে জড়িয়ে পড়ল। ফেলা কাকিমা যদি জানতে পারত সারা জীবন যাকে ভালবেসে মনের মনিকোঠায় বেঁধে রেখেছে অন্য কেউ তার মনে বাসা বেঁধেছে। কেন এমন হয়! যন্ত্রণায় বাতাসীর মুখমণ্ডল কঠিন হয়ে পড়ে। চক হাতে ব্ল্যাক বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আগেই নিজেকে সে আড়াল করেছিল। বিক্ষিপ্ত চিন্তার প্লাবনে হঠাৎই তার পা দুটো ঠলে যায়। হাত থেকে চকটা খসে পড়েছে ততক্ষণে। সম্বিত ফেরে এক ছাত্রীর পরশে। মেয়েটি সাহস করে উঠে এসে দিদিকে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। ছাত্রীর অনুভুতির ছোঁয়ায় বাতাসীর চিন্তার জগত মুহূর্তে সরে যায়। একটু স্বাভাবিক হয়ে বাতাসী বলে, 'আজ থাক ক্লাসটা পরে পুষিয়ে দেব।‘ তারপর সে সোজা হেঁটে বেরিয়ে যায়।
আগে পৌছায় অর্ক। বেরোবার সময় ঘড়ি দেখেনি। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক আগে গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। দূর দেশে পাড়ি দেওয়ার আগে যেমন মানুষ সময় হাতে করে বের হয়। নির্দিষ্ট সময়ের আগে পৌঁছায় স্টেশনে, ট্রেনের প্রতীক্ষায়। ঠিক তেমনই ব্যস্ত অর্ক পৌঁছে যায় নির্দিষ্ট স্থানে। নতুন দেশে পাড়ি জমানো আর নতুন জীবনে প্রবেশ খুব একটা ফারাক আছে কি? দুই ক্ষেত্রেই অদেখা ভবিষ্যতের টানাপোড়েনে চলে মানুষের মনে। জীবনে কখনো এমন দোলাচলে পড়েনি সে। হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। শীতের কারনে নিশ্চয় নয়। কখন যে চিন্তায় চিন্তায় সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে খেয়াল করতে পারেনি সে। বাতাসীর শরীর জুড়ে নীল আকাশ। বাতাসী জানে না নীল রঙ অর্কর প্রিয়। নীল সালোয়ারে আজ আকাশের মতোই উদাত্ত বাতাসী। শাড়ির আঁচলে সাদা সাদা ছোপ শরতের আকাশে উড়ে বেড়ানো মেঘ যেন। আন্দোলিত ওড়নার ভাসমানতা আন্দাজ করে অর্ক ফিরে তাকায়। ওর মনে হয় একটা গোটা আকাশ ওর সামনে হাজির। গুন্জরিত মন নিঃশব্দে গেয়ে ওঠে "আকাশ আমায় ভরল আলোয়"।
অর্কর চোখের স্তব্ধতা ভাঙতে বাতাসী মাছি তাড়ানোর মত নিজের হাত অর্কর চোখের সামনে বার কয়েক নাড়ায়। লজ্জিত অর্ক স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। বাতাসী হাসি লুকিয়ে রেল মিউজিয়ামে ঢুকে পড়ে পেছু পেছু অর্কও ধাওয়া করে। ভারতীয় রেলের ইতিহাস ধরা আছে মিউজিয়ামে। প্রথম স্টিম চালিত রেল ইঞ্জিনের মডেল দিয়ে শুরু। তারপর একে একে ডিজেল ইলেকট্রিক ইঞ্জিন। এগিয়ে চলেছে ভারতীয় রেল পরিষেবা কালের গণ্ডি মাড়িয়ে। দুজনের বুকে তখন রেল কম ঝমাঝম। মনঃসংযোগ দিয়ে কিছুই দেখা হচ্ছে না। এটা ওটা সেটা দেখতে দেখতে অর্ক বলে, 'এখানে কিছু দেখার নেই।' বাতাসীর মনের কথা অর্ক যেন পড়তে পেরেছে। মিউজিয়ামে অফুরন্ত মানুষের ভিড়ে ওদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বাতাসী প্রতীক্ষায় ছিল অর্ক কখন বিরক্ত হয়ে নিজেকে প্রকাশ করবে। প্রথম জয়ে বাতাসী খুশি বাতাসীর চোখে অর্কর দেউলিয়া রূপ ধরা পড়ে গেছে। এখন সে অনন্ত অপেক্ষায় রাজি। মিউজিয়াম ছেড়ে বেরিয়ে পায়ে পায়ে ওরা ফোরসোর রোড ধরে এগিয়ে চলেছে। নিরন্তর প্রবাহমানতায় গঙ্গা ওদের পাশে পাশে চলেছে। ডাইনে বার্ন স্ট্যান্ডার্ডের জেগে থাকা দৃশ্যমান চিমনি। বাঁয়ে তেলকল ঘাট। ওপারে কল্লোলিনী কলকাতা। গঙ্গার এপ্রান্ত থেকে দূষণযুক্ত কলকাতা বড়ই মোহময়ী। অনেকটা জীবনের সঙ্গে সাদৃশ্য আছে কলকাতার। ফোরসোর রোড জুড়ে বনবিতান। গঙ্গার উঠোন জুড়ে সারি সারি চেয়ার সাজানো আছে। ওরা বসে পড়ে পাশাপাশি। নীরবে কাটতে থাকে সময়। সারি সারি যুবক-যুবতী প্রেম পূজায় সন্ধ্যার আবাহনে মত। আলোর ভিক্ষার নয় অন্ধকারের আকাঙ্ক্ষাই ওদের নিজস্ব চাহিদা। যে পূজার যে নিয়ম। অর্কও ভক্তর ডালা হাতে হাজির। দিনের সকল প্রতিজ্ঞা ঝেড়ে ফেলে বাতাসী সোজাসুজি তাকায় অর্কর দিকে। ফিরতি চোখে আবেগ বিহ্বল বাতাসীর চোখ নেমে আসে পরক্ষণে তার আনত চোখ দেখতে পায় না নিজের ঠোটের কম্পন। জেহাদ ঘোষণা করতে চায় ঠোঁট অথচ সংকোচ ঝেড়ে ফেলে কিছু বলতে পারেনা বাতাসী। বাতাসীর সমর্পণ ততক্ষণে উজ্জীবিত করেছে অর্ককে। ওষ্ঠের স্থিতি জাড্য ঝেড়ে ফেলে অর্ক সরাসরি বলে,' আমি তোমাকে ভালোবাসি'। অর্ক হাত বাড়িয়ে বাতাসীর দক্ষিন হস্ত নিজের কোলে টেনে নেয়। আলতো ছোঁয়ায় দুজনের শরীরে ততক্ষণে হড়পা বান। সেই প্লাবনের ভেলায় চড়ে অর্ক ছোট্ট চুম্বন এঁকে দেয়ে বাতাসীর দক্ষিণ হস্তে। শপথ নেয় একসাথে চলার। বাতাসী আর কিছু ভাবতে না পেরে জিগেস করে- আমাকে কোনদিন ফেলে পালাবে না তো? অর্ক অবাক হয়ে তাকিয়ে অস্ফুটে বলে,’আমি!’ ছন্দান্তর ঘটে গেছে ওদের কথার ভাবে। কথায় অসংলগ্ন অর্ক বলে ফেলে, ‘বাইরের কাঠিন্য দিয়ে আমাকে বিচার করলে ভুল হবে। সঠিক পুরুষ হওয়ার মাপন যন্ত্রে আমি অযোগ্য। এ সত্য উপলব্ধি করলে জানিনা তোমার মনের কোনে অসন্তোষ দানা বাঁধবে কিনা। নিজের হাত অর্কর ঠোঁটে ছুঁইয়ে বাতাসী ওকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলে, ‘আমি সকল ছোটখাটো অপূর্ণতায় আড়াল দেব তুমি শুধু আমায় ছেড়ে যেও না।‘ স্তব্ধ সময়, গ্রহ তারা স্থির হয়ে গেছে। আগে পাশে চিৎকার করা যানগুলো কেমন পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের সব নিয়ম মেনে শব্দহীন। নদীতে শুধু ভরা জোয়ার। মাঝি-মাল্লারা মাঝনদীতে ঠাঁই নিয়েছে। পূর্ণিমা চাঁদের ঝলমলে আলোর দূরে দেখা যাচ্ছে নৌকার দল, দোল খাচ্ছে ঢেউয়ের তালে তালে। শব্দ বলতে শুধু ছলাৎ ছল ছলাৎ ছল….।
ঘড়িতে এখন সবে সাড়ে পাঁচটা। অর্ক ভেবেছিল আরো অনেকটা সময় গল্পে আর চোখের আদরে কাটবে। বাতাসী হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। মনে মনে হিসাব করে নেয় হাওড়া থেকে পালসিট সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে মেমারি। পালসিট থেকে মেমারি পনের মিনিট। মায়ের সাথে আজ বাতাসীকে মাসির বাড়ি থাকতে হবে। বাপ সোহাগী মেয়ে তার জীবনে আসা নতুন সমাচার আগে অভয় কে জানাতে চায়। মেমারিতে বিরাট বড়লোক বাড়িতে বাণী মাসির বিয়ে হয়েছিল। পুরানো হিংসা-দ্বেষ এখন অতীত। মুহূর্তে পড়া যবনিকায় অতৃপ্ত অর্ক ক্ষুন্ন হয়। বাতাসী অর্কর মনের ভাব বুঝতে পেরে বলে,'লক্ষ্মীটি আজকের দিনটি একটি মানিয়ে নাও। বাবা আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আমার ইচ্ছা করছে বাবার কাছে ফুরুত করে উড়ে গিয়ে এই মুহূর্তে কারামুক্তির সমাচার দিয়ে আসি'। অর্ক তার প্রেমিকার মুখে আকাশের উচ্ছাস দেখে পরম শান্তি পায়, সে বলে,‘বাপের বাড়ি তোমার কাছে কারাগার ছিল?’ বাতাসী অর্কর পিঠে কিল মেরে বলে ‘চলও, তোমার বন্ধা আচরণে আমি কারারুদ্ধ ছিলাম। দুজনে হাঁটা দেয় স্টেশনের দিকে। ছটার ট্রেনে পাশাপাশি যেতে পারবে ওরা। আজ আর কোন বাঁধা নেই।
ট্রেন আদি সপ্তগ্রাম স্টেশনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে। যাত্রীরা উসখুশ করছে। কিছুক্ষণ আগেও পাশে বসে থাকা অর্কর শরীরী আবেশের আমেজ। জেনারেল কম্পার্টমেন্টে ঘেঁষাঘেঁষি বসা। বাতাসীর পাশে বসে থাকা লোকটি যে অর্ক নয় হঠাৎ খেয়াল হয় সিগন্যাল পেয়ে গাড়ির নড়ে ওঠা ঝাকুনিতে। লজ্জা পেয়ে বাতাসী একটু সরে যেতে চেষ্টা করে। জায়গা অপ্রতুল।
জোর করে বাবার কথা চিন্তা করে অস্বস্তি কাটাতে চায় বাতাসী। বাবা নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে। কোনদিন বাবা মেয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেনি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেয়ের অমতে বিয়ের তোড়জোর করেনি। ভরসা রেখেছে মেয়ের ভাবনায়। ছোটবেলার দিনগুলো ফিরে ফিরে আসতে থাকে মনে। ট্রেন যে অভিষ্ঠ স্থানে পৌঁছতে যাচ্ছে বাবার এক পুরানো সাথীর ডাকে খেয়াল হয়। আবার এক প্রস্থ লজ্জা পাওয়ার পালা। উনি কি অর্কর সাথে আমাকে দেখলেন। পালসিটে ট্রেন থেকে নেমে পরিচিত ব্যক্তির সাথে কথা না বাড়িয়ে হন হন করে হাঁটা দেয় বাতাসী। ফুরফুরে হাওয়া হাড় কাঁপিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। বাতাসী শরীরে শীতের টিকিটি অনুভব করে না। রিতা পিসি বাবার খাবার তৈরি করে দিয়ে নিশ্চয় চলে গেছে। দলের কর্মীরা শীতের রাতে যে যার ঘরে। তড়িঘড়ি চলতে গিয়ে বাতাসী কেটে নেওয়া বাঁশের খোঁটায় হোঁচট খায়। কোন রকমে সামলে নিয়ে চলার গতি বৃদ্ধি করে। তাকে আজ মেমারি ফিরতে হবে। সদর এড়িয়ে বাড়ির পাশ দিয়ে পিছনের দরজার দিকে এগোতে থাকে বাতাসী। শোবার আগে বাবা পেছনের দরজায় আগল দেয়। চুরি-ডাকাতি হয়না এখানে তাই কোন কবাট দেওয়ার অভ্যাস নাই কারও। বাতাসীর এক প্রিয় ছাত্রী শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দিদিমণিকে টর্চপেন দিয়েছিল। পেছনের দরজায় আলো থাকেনা। এমার্জেন্সির সময় পুলিশের হাত থেকে পালাবার জন্য অন্ধকারের প্রয়োজন ছিল। অভয়রা চটজলদি পালাবার জন্য এই রাস্তা ব্যবহার করত। ঝোপঝাড় ছিল পথের দু'ধারে এখন বরং রুটিন করে পরিষ্কার করা হয়। পেনটর্চ জ্বালিয়ে আলতোভাবে বাতাসী দরজায় ঠেলা দেয়। কোনরকম আওয়াজ হয়না। শৈশবের অভ্যাস, অপকর্ম করে বাড়ীর ভেতরে সেঁধিয়ে যাওয়া। আজও সমান নিপুনতায় বাতাসী দোর খোলে। জমজমাট উঠোনে একটা টিমটিম করে আলো জ্বলছে, কাকপক্ষী নেই। ঘরগুলো ভুতুড়ে অন্ধকারে নিস্তেজ। বাবা মায়ের শোবার ঘর বন্ধ। বাতাসী অবাক হয়। ভাবে ইস, বাবা যদি না থাকে কিন্তু না থাকলে পিছনের দরজায় আগল থাকতো। বাবার পড়ার ঘরের সবুজ আলো জ্বলছে। কাঠের গরাদের হালকা ছায়া লম্বা হয়ে অন্ধকার উঠোনে পড়েছে। কেমন যেন আধা ভৌতিক আবহ। বাবা হয়তো পড়ায় ঘরে। বাবার এই এক পাগলামো বই হাতে থাকলে পৃথিবী তার কাছে অস্তিত্বহীন ডেকে ডেকে সাড়া পাওয়া যায় না। তবু সন্তর্পনে বাতাসী পা টিপে টিপে উঠোন পার হয়। বাবা শুয়ে পড়াশুনো করে। বাতাসী ঠিক করে হঠাৎ করে বাপের সামনে গিয়ে হাজির হয়ে চমকে দেবে। যদিও আজ বাতাসী সভাবসিদ্ধ চপলতা লুকিয়ে ফেলেছে। বাপকে প্রেমের কথা জানাবে সে। নাঃ, দৃপ্ত কণ্ঠে বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। বাবার পাশে শুয়ে কানে কানে বলবে অর্কর আর নিজের কথা। মায়ের কাছে মেমারিতে ফিরতে হবে তাই যা বলতে হবে খুব তাড়াতাড়ি।
ঘরের চৌকাট পেরিয়ে সামনের পায়ের সঙ্গে মাথাটি এগিয়ে দেয় বাতাসী। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পায় না সে। ঘরে বইয়ের সারি সারি কাঠের তাক সমান্তরাল ভাবে সাজানো। খাট পার হয়ে যেতে হয় সেখানে। দু পা এগোলে বইয়ের তাকের ফাঁক বেয়ে আসা টিমেটিমে আলোতে বাতাসীর মনে হয় একটি ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। অদ্ভুত রোমাঞ্চে বাতাসীর গা ছমছম করছে। সন্তর্পনে আর একটা পা ফেলে বাতাসী এগিয়ে যায়। এখন আর একা নয় একজোড়া নর-নারীর প্রতিবিম্ব বাতাসীর চোখে ধরা পড়ে। হতবাক বাতাসী দেখে উজ্জ্বলা পিসি তার বাবার দুই হাঁটু জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। অভয় দ্বিধাদ্বন্দ্ব আকীর্ণ সে উজ্জ্বলার আবেগের উত্তরে কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। মেয়েবেলার উঠোন থেকে প্রায় অন্ধকার স্মৃতি উঠে আসে বাতাসীর মনভুমে। উজ্জ্বলা পিসি চিৎকার করে বলছে, 'ছান্দসি কার মেয়ে তুমি জানো? বাগদি পাড়ার মানুষজন জানতে পারলে একটা মার বাইরে পড়বে না।' সম্ভ্রম শ্রদ্ধা বিশ্বাস ভালবাসার অপর নাম, কিন্তু বাবা? সন্ত্রস্ত হরিণীর মতো বাতাসী এক পা এক পা পেছিয়ে যেতে থাকে। তারপর যেমন এসে ছিল তেমনই হন্তদন্ত বেরিয়ে যায়। উজ্জ্বলার নারী মন তৃতীয় কারও উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে ততক্ষণে। জ্ঞানশূন্য উজ্জ্বলা একছুট্টে সদরের দরজায় পৌঁছে দেখে পথের বাঁকে হারিয়ে যাচ্ছে বাতাসী। মাথায় হাত দিয়ে উজ্জ্বলা সদরে বসে পড়ে।
চলমান পৃথিবীর উপর আর যেন দাঁড়ানো যাচ্ছেনা। পাগলের মত ছুটতে থাকে বাতাসী। কুয়াশাচ্ছন্ন গভীর অন্ধকারে শীতের জারিজুরি খতম করতে বিদ্রোহী এক কুকুর একঘেয়ে ডেকে চলেছে। বাতাসী ভ্রুক্ষেপ হীন সে হনহন করে পাশ দিয়ে চলে যায়। স্যাঙাতদের সাহারা না পেয়ে বিদ্রোহী ঠাণ্ডায় ঝিম মেরে রণে ক্ষান্ত দেয়। রাতের ডাউন ট্রেন নিস্তব্ধতা চিরে বর্ধমান শক্তিগড় পার হয়ে পালসিট আসছে বাতাসীকে নিতে। রেলগাড়ি জানেনা বাতাসী কে কোথায় পৌঁছে দিতে হবে।
প্রথম খন্ড এখানেই শেষ করলাম।
দ্বিতীয় খন্ড (সাতাশ)
ঘামের জলে নৌক চলা বন্ধ কল
পর্ব এক
মায়ের ইচ্ছেপূরণ হল। দিগম্বরপুর থেকে ফিরে, ফিরে পাওয়া গেছিল ছেলের অতীতের উচ্ছলতা। যে অঞ্জলী অনি দিপুকে গালাগাল পাড়ত এখন সে তাদেরই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বর্তমানে অর্ককে দেখা যাচ্ছে সারাদিন হাবিজাবি বই নাড়াঘাঁটা করতে। অঞ্জলী বুঝতে পেরেছে জোর করে কিছু সম্ভব নয়। চাকরি-বাকরি পরীক্ষা নিয়ে সে আর মাথা ঘামায় না। যদিও মা হয়ে ছেলে সরকারি চাকরি পাবে কিনা এমন উদ্বেগ থাকাটা অসমীচীন নয়। অন্জলী মনের উদ্বেগ মনেই চেপে রাখে। অর্কর চাকরি পাওয়ার বয়স পের হল বলে সে তিনটে ফরম একসাথে ফিলাপ করেছে। ঘোষণা হয় প্রথম পরীক্ষার দিন। অর্ক উত্তরপত্রে উগড়ে দেয় জীবনে অ-প্রয়োজনীয় বই কুড়ানো জ্ঞানভাণ্ডার। অঞ্জলীর হা-হুতাশ বৃহস্পতি বার লক্ষ্মী আগমন সংবাদে উবে যায়। ব্যাংকের চাকরিতে যোগদান করে অর্ক। যদিও মা হলে চিন্তার জাল ছিঁড়ে বের হওয়া অসম্ভব। বুবুকে অঞ্জলী আগাপাশতলা চেনে। ছেলে যে সংসার ধর্ম পালন করবে অন্য কিছুতে ভিড়ে যাবে না অমন গ্যারান্টি কই? অঞ্জলীর অকারণ চিন্তা স্রোতে ভাঁটা দিতে কৃষ্ণ মাঝে মধ্যে আমুদে হাসে। পিত্তি জ্বলে যায় অঞ্জলীর সে বলে, এইখানেই বাপ আর মায়ের ফারাক। তোমাকে বীরঙ্গনা হিসাবে জেনে এসেছি চিরটিকাল। ফেলে আসা দিন গুলো এত সহজে ভুলে গেলে! কৃষ্ণর কথায় অঞ্জলী কোন উত্তর করেনা। একরোখা ছেলেকে নিয়ে সর্বদাই তার ধুকপুক জীবন। বুবু বাড়িতে কি সব অচেনা যন্ত্রপাতি নিয়ে আসছে। ছেলেকে জিজ্ঞেস করলে বলে,চুরি ডাকাতিতে হাত পাকাচ্ছি। এইসব ইকুইপমেন্ট দিয়ে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ির ছাদে অনায়াসে চলে যাওয়া যায়। বড়লোকের সম্পদ ডাকাতি করে গরিবদের বাটয়ারা করব। অঞ্জলী বলে,ইয়ার্কি মারিস না ভয় করে, বয়সের ধর্মে প্রেম-টেম করতে পারিস তো। অর্ক বলে,করছি তো, আমি নন্দাকে ভালোবাসি। কৃষ্ণ মুচকি হাসে। অঞ্জলী, নন্দা মুচকি হাসি কোন কিছুর রহস্য ভেদ করতে পারে না। কৃষ্ণ বলে,নন্দাদেবী ভারতবর্ষের উচ্চতম হিমালয় শিখর। অঞ্জলী বলে,যত্তসব। ঘর ভরে গেছে গাঁইতি লাঠি ক্যারাবিনার তাঁবু দড়িতে। অঞ্জলী রেগেমেগে বলে, বুবু, একটা কলসি আনিসতো। বুঝতে না পেরে বুবু জানতে চায় কলসি দিয়ে কী হবে? মা জানায় দড়ি যখন এনে রেখেছিস তখন শুধু কলসি জুটলেই হয়। ডুবে মরব।
ছেলের পাহাড় পাহাড় খেলায় মন মজেছে। আজ কুমায়ুন তো কাল সিকিম হিমালয়। নিত্যদিন পালাই পালাই। রথিনের সঙ্গতি নেই কিন্তু ইচ্ছা আছে। অর্কদাকে হঠাৎ করে একদিন সে তার ইচ্ছার কথা জানিয়ে ফেলে। অর্ক বলে,চল না, টাকাপয়সা ঠিক যোগাড় হয়ে যাবে। রথিন জানে, অর্কদা পকেট থেকে টাকার যোগান দিয়ে দেবে তাই আগ বাড়িয়ে বলে,তুমি ধার দিও আমি মাসে মাসে শোধ দিয়ে দেবো। পিন্ডার গঙ্গার উৎস সন্ধান দিয়ে রথিনের অভিযান শুরু হয়েছিল। কষ্টেসিষ্টে হলেও সে এখন মাঝে মধ্যে অর্কদার সঙ্গী হয়। বাতাসী, অর্কর দেখা পেয়ে গেছে ততদিনে। বাতাসী শতেক ইচ্ছে নিয়েও সঙ্গী হতে পারে নি। বাতাসী অর্কর এমন পাগলামোয় বেড়ি পরাতে চায় কিন্তু অর্ক শুনবে তবেতো। এই বছর অর্করা নর্মদা পরিক্রমা সেরে ফিরছে। সকালে হাওড়া পৌঁছানোর কথা কিন্তু কোন এক অজানা কারণে ট্রেন কোলাঘাট পেরিয়ে ঘণ্টা কয়েক ঝিম মেরে বসে গেছে। সাগরেদরা তাসে মগ্ন, ট্রেন যে চলছে না কারও খেয়ালে নেই। রথিনও মাস্টার তাসুড়ে। অর্ক চঞ্চল হয় বাতাসী হয়তো হাওড়া স্টেশনে অপেক্ষা করবে। অচল ট্রেন থেকে নেমে অর্ক দেখে সারি সারি উদগ্রীব মানুষ লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে জটলা করছে। ট্র্যাকের পেছনে নয়ানজুলি, অর্ক একটু এগিয়ে একটা জটলায় গিয়ে জোটে। ট্রেন পথ খুঁজে পাচ্ছে না কারন জানা প্রয়োজন। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় অর্ক চুপ করে শুনতে থাকে আলোচনা। অর্ক বুঝতে পারে এখানে বিভিন্ন যাত্রী গ্রুপের সহাবস্থান ঘটেছে। মূল যে দল তাদের ঘিরে অনেকের আগ্রহ। আগ্রহ বলতে একজনের কথাসংগীতে সাথীরা নিখুঁত সংগত করছে। মনের ভ্রম দূর হয় কিছু সময়ের মধ্যে। আপাত বিদ্বজন আদতে প্রকৃত জ্ঞানী মানুষ। নাম মনীষ, দলবল নিয়ে ফিরছে দেলহি রাজহরা থেকে। প্রয়াত শঙ্কর গুহ নিয়োগীর নেতৃত্বে তৈরী শ্রমিক জোট তাঁরই স্বপ্নের শহীদ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছে সেখানে। মনীষ বাবুরা একটি লিটল ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে খবর করতে গিয়েছিলেন রাজহরায়ে। একে অপরের সাথে আলোচনায় উঠে আসছিল এই সকল তথ্য। মনীষ বলে, ঘরমুখী মানুষের তর সয়না। ঘরকাতুরে মন বড় চঞ্চল প্রকৃতির। আমিও নিয়মের ব্যতিক্রম নই কিন্তু অবরোধের কারণ জানতে আমি উন্মুখ ছিলাম। অর্কর কান খাড়া হয়ে আছে। কথায় কথায় সবাই জানতে পারে গার্ডের কাছে খবর এসেছে বাউড়িয়ায় কোন এক জুট মিলের শ্রমিকরা কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রেল অবরোধ করেছে। মনীষ বলে, দু একদিনের মধ্যে বাউরিয়া যেতে হবে। অর্ক ফস করে বলে ওঠে, এ আর নতুন কি? মনীষ বলে, শুনেছি এই অঞ্চলের মিল শ্রমিক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ইউনিয়ন কে বাতিল দিয়েছে। এরাই বাঙলায় সংঘর্ষ ও নির্মাণের নতুন বীজতলা। তারপর স্বগতোক্তি, জানতে হবে। স্বগতোক্তি অর্কর কান এড়ায় না। চাতকের মত চেয়ে সে নরম গলায় বলে, আমাকে সঙ্গে নেবেন? মনীষ বলে,দেশের যে কোন জায়গায় যাওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার আপনার আছে। আমাদের সঙ্গে চাইলে যেতেই পারেন।
অবরোধ উঠে রেল পরিষেবা ঠিকঠাক হতে সময় লাগে। বাতাসী অবরোধের খবর পেয়ে বিফল মনোরথ হয়ে হাঁটা দেয় স্কুলের পথে। পরদিন ওদের ট্রেনে সাক্ষাৎ হয়েছিল। বাতাসী অর্ককে চোখে হারায়। দেখা হওয়ার সাথে সাথে প্রকাশ্যে বাতাসী অর্ককে বলে,কথা দাও, আমাকে ফেলে তুমি কোথাও কোনদিন যাবে না। লাজুক অর্ক উত্তর এড়িয়ে যায়। বাতাসী ভাবে এই মানুষকে ঢিট করা খুব শক্ত। অথচ ম্যাওপুষি মার্কা পুরুষমানুষ সে চায় নি জীবনে। তার স্বপ্নের পুরুষ কে হতে হবে রেলগাড়ির মতো আচরণে দৃপ্ত, পড়ে থাকা প্রান্তরের মত উদাসীন। এমন মানুষের সন্ধানেই সে বুড়িয়েছিল। অর্ক বুঝতে পারে না বাতাসী কি চিন্তা করছে। আপাতত বাতাসীর চিন্তাঘুড়ির সুতো কেটে দিতে অর্ক বলে,জানো, গতকাল ট্রেন অবরোধের কারণ? বাউরিয়া জুট মিল বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে এই আন্দোলন। কাল অফিস ডুব দিয়ে বাউড়িয়া যাব ভাবছি। নিমেষে ভাবনা জাল ছিন্ন করে বাতাসী বলে,আমিও যাব। আপাতত বাতাসীর মন পেতে রাজি হয়ে যায় অর্ক। নিশিথ আরও অনেকে কান খাড়া রেখে উপভোগ করছিলো ওদের বাক্যালাপ। রথীন স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় বলে- জমে ক্ষীর। নিশিথ বলে,হ্যাঁ, তোমার ব্যাপারটা কেউ জানতে পারছে না তো? পাটকেলটা খেয়ে রথীন চুপ মেরে যায়। বাতাসীর বাউরিয়া যাওয়ার তেমন কোনো আগ্রহ নেই। সে ঠিক করেছে কোথাও অর্ক কে একলা ছাড়বে না। মনীষ বাবুদের সঙ্গে অর্কর যোগাযোগ হয়নি। পরদিন সকাল দশটায় হাওড়া ষ্টেশন থেকে ওরা বাউড়িয়ার পথে রওনা দেয়। প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে চায়ের দোকানে অবরোধের গল্প প্রথম শুনতে পায় ওরা। উপস্থিত আড্ডাবাজ মানুষজন যুদ্ধংদেহী হয়ে তাল ঠুকছে। অপরদল এই অভব্য আচরণকে গুন্ডা বাজি আখ্যা দিচ্ছে। একজন চায়ের দোকানিকে বলে, তুই বলনা, ট্রেন না চললে তোর বিক্রিবাটা হবে? কাল যে এত মানুষের অসুবিধা হলো রোজ মারা গেল তার কি হবে? দোকানি এতক্ষণ রা কাড়েনি। বিক্রি বাটার প্রশ্ন উঠে আসায় সে জানায়, কাল তার বাম্পার সেল হয়েছে। সাথে সাথে সমর্থকদের হাসির রোল ওঠে। চুপ মেরে যায় লোকেটি। অর্ক বুঝতে পারে বর্তমানে বাউরিয়ার আনাচে কানাচে এমন আলোচনাই চলবে। একটা সাইকেল এসে দাঁড়ায় দোকানে। দোকানি কে আগন্তুক শুধায়, শিবু কোন খবর আছে? শিবু মাথা নাড়ে। একজন অর্ক আর বাতাসীর দিকে চোখ ঘুরিয়ে আগন্তুককে ইঙ্গিত করে। চায়ের দাম মিটিয়ে বাতাসীরা বেরিয়ে পড়ে। পিছুপিছু এসে ওদের ধরে ফেলে সাইকেল আরোহী। নিজের পরিচয় দেয়, আমার নাম নবী এখানকার আদি বাসিন্দা। ধর্ম ও কর্ম সিপিএম পার্টি। আমাকে এক ডাকে এখানে সবাই চেনে। চুপ করে শুনতে থাকলেও বাতাসীর সহ্য হয় না ঔদ্ধত্য। সে বলে, আমার বাবা আপনার কথিত সিপিএম ধর্মে দীক্ষিত। তাকে বরং রবীন্দ্রনাথ কপচে বলতে শুনেছি,“মোর আমি ডুবে যাক নেমে”। সাইকেল থেকে নেমে পড়ে নবী জিজ্ঞেস করে,আপনাদের নিবাস? অর্ক বুঝতে পারে নজরদারি চলছে। বাতাসী নিজের পিতৃ পরিচয়ের আড়াল নিয়ে নবীর পেটের খবর টেনে বার করতে চায়। নবী ধরা না দিয়ে উল্টো প্রশ্নে আগমনের হেতু জানতে চায়। অর্ক একটা মিলের চিমনির দিকে আঙ্গুল তুলে জিজ্ঞেস করে,এটা বোধহয় বন্ধ কারখানা, ধোঁয়া উড়ছে না। নবী এড়িয়ে যায়। বাতাসী নবীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে তারা স্বভাবগত কারণে ভ্রমণপিপাসু। অচেনা অজানা স্টেশনে নেমে তারা আবিস্কার করে ফেরে নতুন নতুন অঞ্চলকে। অর্ক এমনটা চাইছিল না সে সোজা কথা সোজা বলতে ভালোবাসে। বাতাসী নবীকে কবজা করে ফেলায় অর্ক কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পায় না। নবী বলে, সোনার পশ্চিমবঙ্গে বাউরিয়া হল নব্য হনুমানের আখড়া। হুপহুপ শব্দে লাফাতে লাফাতে গত পরশু সব হনুমানে বাউড়িয়া স্টেশনের রেললাইনে বসে পড়েছে। কথায় কথায় ইউনিয়ন অফিস ঘেরাও করা ওদের স্বভাব। অর্ক জানতে চায় এত মানুষ ওদের সঙ্গে আছে কেন? উত্তর আসে ভুল বোঝানো হচ্ছে। গঙ্গার ঘাট এখান থেকে কাছেই। অপরপ্রান্তে বজবজ ঘাটের অস্পষ্ট ছবি দেখা যায়। দুজনেই নিষ্পলক চেয়ে থাকে বহুক্ষণ যদিও ওদের ছলে ভবি ভোলবার নয়। নাছোড় নবী ওদের পার্টি অফিসে বসাতে চায়, অর্ক রাজি হয়না। শেষমেষ বাতাসীর পীড়াপীড়িতে অর্ক সায় দেয়। তারপর এখান সেখান ঘুরে ওরা স্টেশনের দিকে আসে। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতায় বোঝা যায় সরকারি ইউনিয়ন কিছুটা হলেও সন্ত্রস্ত। ফেরার পথে অর্ক বাতাসীকে জানায় তার সিদ্ধান্তের কথা। সে এখানে একা আসতে চায়। এমন সুন্দরী ললনা সঙ্গে থাকলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। নবী গোবি হাবা গবা কেউ না কেউ ঠিক জুটে যাবে সঙ্গে। পথেরও পরিবর্তন করার প্রয়োজন না হলে আবার এই মর্কটের পাল্লায় পড়তে হবে। বাতাসী চোখ পাকিয়ে বলে,তুমি বিয়ের আগেই আমাকে সন্দেহ করছো! আর কোনো কাজ হয়নি বলছো কেন? ভালো করে সবার কথা শুনতে হয়। তুমি না কিছুই শেখোনি। অর্ক বলে, আচ্ছা বাবা ঘাট হয়েছে মানছি কিছু শিখিনি কিন্তু তোমাকে সহস্র লোক চোখ দিয়ে গিলবে এটা মানতে পারছিনা। এই নবী আমার ধর্ম ভাই। বাতাসীর কথায় অর্ক অট্টহাসি তোলে,বাতাসীও যোগ দেয় তাতে।
দৈনিক সংবাদপত্রের খবর পরিবেশিত হচ্ছে- বোম্বাইয়ের কামানি টিউবস এর অনুকরণে আন্দোলনের হাল ধরতে চাইছেন বাউরিয়া মিলের নতুন শ্রমিক জোট। কেউ লিখেছে- অবরোধের অগণতান্ত্রিক পথে লক্ষ লক্ষ নিত্যযাত্রী কে বিপদে ফেলে জুট শ্রমিক সাধারণ মানুষের সহানুভূতি হারাবে। নিত্যযাত্রীদের বেশিরভাগ অংশ সত্যি সত্যিই শ্রমিকের গুষ্টি উচ্ছেদ করছে। তাদের বয়েই গেছে বুঝতে কোথাকার জুটমিল কারা খেতে পেল না। অর্ক ট্রেনে এমনও শুনেছে এই জমানায় শ্রমিক কাজ না করার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। মালিক কাজের কথা বললেই অবরোধ। প্রত্যুত্তরে একজন বলেছিল,ও দিন গ্যায়া। বাম আমলেও শ্রমিকের ওপর পুঁজি ছড়ি ঘুরাচ্ছে। পথ, ভুতুড়ে আলোচনার বিষাক্ত আধার হয়ে অর্কর ভাবনা এলোমেলো করে দেয়। অথচ এই পথই তাকে টেনে এনেছে বাউড়িয়া প্রাঙ্গনে।
দিনটা রবিবার বাতাসী সঙ্গী হতে পারবে না। আজকের অভিযানের কথা সে জানায়নি বাতাসীকে। বাউরিয়ার আগের স্টেশনে নেমে পড়ে অর্ক। অঞ্চল পরিচিতির আন্দাজ আগেরদিন কিছুটা পেয়েছিল সে। নলপুর স্টেশনের সামনে পোস্ট অফিস। ঢুকে পড়ে অর্ক। বয়স্ক পোস্টমাস্টার চশমা তুলে কাজের মাঝে বেঁকাট্যারা কিছু বলতে যাচ্ছিল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটির সৌম্য প্রশান্তিতে সে বাধ্য হয় নিজেকে সংবরণ করতে। পেছনের দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক দুবার হাঁক পাড়েন,ত্রিদিব ত্রিদিব। বেঁটেখাটো গাট্টাগোট্টা গুঁফো একটা লোক বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, কিছু বলছেন মাস্টারমশাই? কাজে ডোবার আগে মুখ নামিয়ে তিনি বলেন, দেখো মনে হচ্ছে তোমার সাগরেদ হতে চায়। অর্ক কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা। তিড়িংবিড়িং লাফাতে লাফাতে এসে ত্রিদিব ওর সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলে। সামান্য সময়ে বন্ধুত্ব জমে ওঠে। অর্ক অকপটে জানায় তার আসার উদ্দেশ্য। ত্রিদিব গম্ভীরভাবে বলে- কোন ভুল নেই, মাস্টারমশাই যুগ যুগ জিও। পোস্টমাস্টার, চশমার ফাঁক দিয়ে দৃষ্টিবান মেরে ফিক করে হেসে ফেলে। অর্ক জানতে চায় এর মানে। উত্তরে ফিক করে হেসে ফেলে ত্রিদিব, জিগেস করে, সাইকেল চালাতে জান? না উত্তর পেয়ে ত্রিদিব বলে, আমার কাজ চিঠি বিলি করা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখি আমি। দুচাকা আমার কাছে জল মানে জীবনের মত। অর্কর গর্ব ছিল দু পায়ের ওপর। তার ভাবনায় দু'পা দিয়ে সারা পৃথিবী চক্কর কাটা যায়। ত্রিদিবদার সঙ্গী হতে গেলে সাইকেল শেখা জরুরী। অর্ক বলে, আমি সাইকেল চড়া শিখে নেব তুমি চিন্তা কর না। আজ কি করা যায় বল। ত্রিদিব ওকে ওদিকপানে যাওয়া একটি মোটর সাইকেলের পেছনে চড়িয়ে দিয়ে বলে, ওখানে পৌঁছে সবার সাথে নিজ গুনে বন্ধুত্ব পাতাও আমি ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব। মিল গেটের কাছে নেমে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে অর্ক। ঠাঠা রদ্দুর, রবিবার বাউড়িয়ায় ছুটির দিন নয়। মিল গেটের বাইরে একটি পোড়ো বাড়ির গায়ে ধুলামলিন সাইন বোর্ড টাঙ্গানো যেখানে কো-অপারেটিভ কথাটি লেখা আছে। পলেস্তারা খসে পড়ায় ভার রাখতে না পেরে একটি পেরেক বেঁকে সাইনবোর্ডের একদিক হেলিয়ে দিয়েছে। ভেতরে অন্ধকার ঘরে কতকগুলো বেঞ্চি পাতা। টেবিলে একটি ভাঙ্গা প্লাস্টিকের মগ রাখা। ঘিরে থাকা লোকজন যেখানে ছাই ফেলছে। উপস্থিত দশ-বারোজন মানুষের বেশিরভাগের ঠোঁটে বিড়ি গোঁজা। অর্ক আসবো বলে, ঢুকে পড়ে ভেতরে। উপস্থিত মানুষ সন্ধিগ্ধ। রেল অবরোধের পরদিনই কলকাতার বাবুরা গ্রামে এসেছিলেন। কে কোন ধান্দায় আসছে জানা দরকার। হঠাৎ একজন বলে ওঠে, কী প্রয়োজন? অর্ক সরাসরি বলে,একা কুম্ভের মত রাজনৈতিক জোট নিরপেক্ষ শ্রমিক আন্দোলনের কথা জীবনে শুনিনি জানতে এলাম। ত্রিদিব দা পাঠালেন। একজন বলে,এই যে রফিক ও সব জানে, ওর ডাকেই সেদিন ছুটে গিয়েছিলাম সব্বাই। রফিক বলে, যা শালা, সকলে করল অবরোধ আর আমার নাম ফাটছে। জানতো যার নাম ফাটে তার কী ফাটে? আঁধার আলো করে হাসি ফোটে ঘরে। হাসি ফুরালে সমবেত সুখটানে ঘরে আঁধার মানিকের আশ্বাস। সেই সাহস বুকে বেঁধে রফিক অর্কর নাম জেনে নিয়ে বলে, আমার একটু কাজ আছে অর্ক ভাই। পরে দেখা হবে। ত্রিদিবের পরিচিত জেনে সবার আড়ষ্টতা কেটে গেছে। ওদের আলোচনা এখন স্বাভাবিক পথে হাঁটা দিয়েছে। দেবু বিড়ি না খেয়ে তৃষ্ণার্ত হয়ে বসেছিল ত্রিদিবের অপেক্ষায়। দেরি হচ্ছে দেখে বিড়ির বান্ডিল বার করে ফেলে। অর্ক চেয়ে নেয় একটা বিড়ি। দেবু বলে, ওস্তাদ বিড়ি খাও? মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উক্তি করে অর্ক। দেবু সুখটান দিয়ে বলে,যাক। রফিক কিন্তু কংগ্রেসী মাল। এখন নেতাদের কাছে হালে পানি পাচ্ছেনা। পাল্লা ভারী দেখে এখানে ব্যাট করতে নেমেছে। আরিফ বলে,একতরফা বিচার করিস না। অতীতে ও অনেক বাওয়ালির নায়ক। জানো অর্ক ওর শক্তি হল সাহস। চাইলে ও ম্যানেজারের মুখের ওপরে জবাব দিতে পারে। নেদো চেঁচিয়ে বলে,তাহলে চায়না কেন? শালা ফাঁকিবাজ, কামচোর। নেতা হতে গেলে ব্যক্তি জীবনে সৎ হতে হয়। দেবু ঠিক এইখান থেকেই ধরে,সেদিন মিল শ্রমিক শুকনো বারুদের মত তেতে ছিল। যে কেউ আগুন দিলেই ফেটে যেত। আরিফ স্বগতোক্তি করে,আগুন কেউ না দিলে আলো জ্বলত না। অর্ক চুপটি করে শুনছিল। ঘরের বাইরে একটা সাইকেল এসে দাঁড়ায়। সাইকেল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ত্রিদিব ঢুকে পড়ে ভেতরে। অর্ক তখন অন্যদের কিছু জিজ্ঞেস করছে। ত্রিদিব বলে,কি স্যাঙাত এর মধ্যেই জমে গেলে? বাকিদের যতোটুকু দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছিল ত্রিদিবের কথার ফুতকারে সব উড়ে গেল। ত্রিদিব বলে,শোন শোন, অর্ক শহরের বাবু সাইকেল চালাতে জানেনা। অর্ক কে নিয়ে আমি মহল্লায় মহল্লায় ঘুরবো। তোদের ক্লাস নিতে হবে, তিন দিনের আগে অর্ক যেন দুচাকায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। নেদো বলে, অর্ক ভাই আজ থেকেই ট্রেনিং চালু হোক। অর্ক ভাবছিল যাক বাঁচা গেল। এই বয়সে পাড়ায় গিয়ে সাইকেল শিখতে গেলে প্যাঁক খেতে হবে। চল পানসি বেলঘড়িয়া শুরু হয়ে যায় ট্রেনিং।
চটজলদি সাইকেল শিখে ফেলে অর্ক। চিঠি বাবুর সঙ্গে সে চিঠি বিলির কাজে লেগে পড়েছে। কোন কোনদিন বাতাসীও সঙ্গে থাকে। বিনে পয়সায় পোস্টাল ডিপার্টমেন্ট দুজন এক্সট্রা পেয়ে গেছে। চিঠির ফাঁকে ফাঁকে চলে আড্ডার ছলে মিটিং। আজ অর্ক বাতাসী দুজনেই হাজির। ত্রিদিব ওদের সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়েছে। গুতিমাগুড়ি গ্রামের মেলা চিঠি আছে। ত্রিদিব অঞ্চলের রাজনীতি করা লোক। যদিও বর্তমানে ওর প্রতিষ্ঠিত কোন দলের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। ভূমিপুত্র হবার সুবাদে মানুষের সাথে অতীতের যোগাযোগ আজও অমলিন। কর্মক্ষেত্রও যোগাযোগের সেতু নির্মাণে বড় ভূমিকা নিয়েছে। ত্রিদিব ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী চিঠি গুলো সাজিয়ে নিয়েছে। গুতিমাগুড়ি হাটের মুখে গোলাম মুস্তাফার বাড়ি। চিঠি বিলি শুরু হবে সেখান থেকে। দরজায় কড়া নেড়ে আগমনবার্তা জানান দেয় ওরা। দরজা খুলে স্বয়ং মুস্তাফা হাজির। চিঠি নিয়ে হেসে মুস্তাফা ওদের ঘরে আসতে বলে। হাতে মেলা কাজ, ত্রিদিব বাতাসীদের সঙ্গে মুস্তাফার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে, গোলাম তুমি এদের সঙ্গে আড্ডা দাও। আমি চিঠি বিলি করে আসছি। গোলাম বলে, না দাদা, তুমি চিঠি গুলো দাও আমি ছেলেকে দিয়ে বিলি করিয়ে দিচ্ছি। অনেক কথা আছে বলার সময় পাবো না। অগত্যা ওরা মাটিলেপা উঠোনে পাতা চাটাইয়ের উপরে বসে পড়ে। চা সহযোগে মুড়ি খেতে খেতে গোলাম বলে,খুব তাড়াতাড়ি আন্দোলনকে শক্ত হাতে ধরতে হবে। না হলে শয়তানদের গদ্দারিতে শ্রমিকের ক্ষোভ দিশা হারাবে। অর্ক ইউনিয়নের ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে মুস্তাফা জানায়, আমি সিটু কর্মী, এখানে চারটি ইউনিয়ন আছে। বিক্ষুব্ধ সিটু ইউনিয়নের জোর বেশি। এরা কারখানার আনাচে-কানাচে লুকিয়ে-চুরিয়ে ঘুরছে সামনে এসে বিক্ষোভকে নেতৃত্ব দিচ্ছে না। আদতে কোম্পানি শ'খানেক শ্রমিক পোষে যাদের সাথে শ্রমের কোন সম্পর্ক নেই। এর দালালি করে আর শ্রমিক-কর্মচারীর ওপর ছড়ি ঘোরায়। দালালদের মধ্যে সিটু এবং বিক্ষুব্ধ সিটু ইউনিয়নের শ্রমিক বেশি। বাতাসী প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, মিল বন্ধ হয়ে গেলে এদের লাভ? ত্রিদিব নিরুচ্চার শ্রোতা। গোলাম জানায় এই মিল, ভবন লালের সখের মিল। মহারাষ্ট্রের টেক্সটাইল মিলে উৎপাদিত কাপড়ের সৌখিন প্যাকিং তৈরী হতো এখানে। ভবন লালের মিল বিক্রি হয়ে যায় এক মদ্যপ দুশ্চরিত্র ব্যবসায়ীর কাছে। মিল চালাতে না পেরে মিল হস্তান্তর ঘটে এক দালাল ফোড়ে বাজোরিয়ার হাতে। উনিশশো ছিয়াশি সালে মদ্যপ মালিক মিল বন্ধ করে দিলে কোম্পানী বিআইএফআরে যায়। দালাল ইউনিয়নগুলি কালা চুক্তি করে মালিকের সাথে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী বন্ধ কারখানার ফিনিশড মাল বিক্রি হলে সেই টাকার সঙ্গে জুড়বে মালিকের দেওয়া কয়েক কোটি টাকা। আর শ্রমিকের থেকে দিনপ্রতি এগারো টাকা কাটৌতি হবে। সম্মিলিত এই পুঁজির জোরে চলবে কারখানা। কাটৌতি লাগু হয়ে যায় চুক্তি মেনে। জমা পড়ে না ফিনিশড মাল বিক্রির টাকা নতুন মালিক চুক্তি মত এক টাকাও জমা করে না। অথচ কাটৌতি বহাল থাকে। অর্ক জানতে চায় সরকার কিছু বলে না কেন? ত্রিদিব কৌতুকের হাসি হেসে মুখ খোলে- সরকার পুঁজির আগমনে ব্যাঘাত না ঘটার ছুতোয় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিষ্টদের কাছে বিরুদ্ধ বার্তা না দিয়ে ভালো সাজতে চায়। গোলাম বলে,ত্রিদিবদা, তুমি কি এই যুক্তির সম্পূর্ণতায় বিশ্বাস করো? ত্রিদিব বলে,তাহলে তুই বল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মুস্তাফা জানায়, ইউনিয়ন নেতৃত্ব বাজোরিয়া কে পাইয়ে দিতে চেয়েছিল বিনিময়ে নিজেরা লুঠের ভাগ পেয়েছিল। পার্টি বা সরকারের কাছে এলাকার মাটির খবর ছিল না। কাঁচাখোলা ইউনিয়নগুলো ভেবেছিলো যে কোনো মূল্যে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে দমিয়ে দেওয়া যাবে। একইসাথে ত্রিদিবদার কথাও ঠিক। কারখানা, শ্রমিকের উদ্যোগে চালু হলে নেতারা কক্ষচ্যুত হবে এবং ফোঁড়েদের যাদের সরকার ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট বলে চালাতে চাইছে তাদের মান হবে। তারচেয়ে লাগাতার খোলা বন্ধ চললে শ্রমিক রুজির ফেরে দূর্বল হয়ে পড়বে। আন্দোলনে ভরসা রাখতে পারবে না। যে কোন চুক্তিতে তারা কাজ করতে রাজি হবে। হঠাৎই হন্তদন্ত হয়ে গোলামের ছেলের প্রবেশ ঘটে। চিঠি বিলি করে ফেরার পথে তার কানে গুঞ্জরিত হয়েছে মিলগেটে মারামারির খবর। সেকথা জানতেই চারজোড়া সাইকেলের প্যাডেলে চাপ পড়ে। ওরা পৌঁছে যায় মিলগেটে। গোলামের হস্তক্ষেপে দ্বন্দ্ব মিটে যায়। গোলাম বলে,জুট শ্রমিক মদ্দপ জুট শ্রমিককে ভুল বোঝানো যায় কিন্তু ভেবোনা এটাই একমাত্র সত্যি। জুট শ্রমিক একগুঁয়ে লড়াকু। অতীত অভিজ্ঞতা বাঁচিয়ে রাখ তোমাদেরই ভালো হবে। নবী জটলা থেকে বেরিয়ে এসে অর্ক আর বাতাসী কে দেখে মুস্তাফার সাথে। পাশ কাটিয়ে চলে যাবার সময় আলতো করে বলে যায়,এবার বুঝলাম আগমনের হেতু, সাবধানে থাকবেন।
আঠাশ
ঘামের জলে নৌকো চলা বন্ধ কল
পর্ব- দুই
মোহিত আর রত্না গণ আন্দোলনের পথে ওদের প্রথম দেখা। রত্না বাগনানের মেয়ে বাবা শ্রমিক আন্দোলনের পরিচিত মুখ। ছোটবেলা থেকেই রত্না বাবার আদর্শে বড় হয়েছে। বাউরিয়া ফুলেশ্বর বাগনান অঞ্চলে রত্নাকে শ্রমিকদের কাছে নতুন করে পরিচিত হতে হয়নি। বাউরিয়া জুট মিলে জোট বাঁধার দিনগুলোয় রত্না হাজির ছিল। সেখানেই মোহিতের সঙ্গে তার পরিচয়। মোহিত তখন জুটমিল শ্রমিকের নয়নের মনি। মোহিত সুদর্শন সুবক্তা, এমন নায়কোচিত অভিব্যাক্তি জুট শ্রমিক আগে কোনদিন দেখেনি। বয়স্করা ওকে আদর করে সাগিনা ডাকত। অন্যেরা জানতে চাইত সাগিনার পরিচয়? বয়স্কদের উৎসাহে বাউরিয়া ময়দানে সাগিনা মাহাতো ছবিটি দেখানো হয়। ছবিটি দেখে উল্লসিত এলাকাবাসী মোহিতকে দিলীপ কুমার ডাকতে শুরু করেছে। এমন রমণীমোহন কাউকে অতীতে চোখে পড়েনি রত্নার। রত্নার ডানপিটে ছটফটে মন তরুণ তুর্কি নেতাকেও গ্রাস করতে শুরু করেছে। মোহিত রত্নাকে ক্রমশ লোক চোখ থেকে সরিয়ে নিজের করে পেতে চাইছে। রত্নার প্রতি ত্রিদিব স্নেহশীল। ত্রিদিব চেনে মোহিতকে সে বুঝতে পারছে রত্না ফাঁদে পড়তে চলেছে। নারকেলের মতো শক্ত আবরণে ঢাকা থাকতো ত্রিদিবের মন, শাঁসের খবর জানা সম্ভব ছিল না কারও। অথচ অনুভুতি প্রবণ এই মানুষটি সকলের খোঁজ রাখত যদিও রত্না এই সকলের মধ্যে একজন নয়।
চেঙগাইলে শ্রমিক অবস্থান। ত্রিদিব রত্না মোহিত বাড়ি ফিরবে একসাথে। রাতের জনমানব শুন্য পাঁশকুড়া লোকাল। এক বুক ধোঁয়া ছেড়ে কয়লার ইঞ্জিন পাশ দিয়ে চলে গেল। বীভৎস আওয়াজ আর ধোঁয়ায় ত্রিদিবের চোখে অস্বস্তির লক্ষণ। মোহিতের মুখে হৃদয়ের বাণী এল বলে। মোহিত দেরি না করে ত্রিদিবকে সাক্ষী রেখে বলে ফেলে মনের কথা। মোহিতের সাফসুতরো কথায় ত্রিদিব অবাক হয়। রত্নার অভিব্যক্তি জানার আগ্রহ ছিল ত্রিদিবের। ততধিক অবাক করে রত্না ত্রিদিবকে জিজ্ঞেস করে, তোমার কি মত এই বিষয়ে? ত্রিদিব বলে,তোর ভালোলাগা ভালোবাসার প্রশ্নে আমার কী বলার আছে? রত্না মোহিতের কাছে সময় চেয়ে নেয়।
চেঙ্গাইলের মিটিং সফল হয়। মোহিতের ক্যারিশমায় চাবুক লাগে শ্রমিকের বুকে। হেমন্তের কালো আকাশে হাওয়াই তুবড়ির ফোয়ারা। মোহিতকে নিয়ে সবার আশা সহস্রগুন বেড়ে গেছে। মানুষের করতালি ধ্বনিতে সে নিজে প্রকৃতই মোহিত হয়ে পড়ে। মোহিতের অন্য প্রত্যাশায় তাল মিলিয়ে উচ্ছল রত্না কোলাহল এড়িয়ে ঝরনার মত পৌঁছে যায় নদীর কাছাকাছি। কবুল করে ভালোবাসার কথা। নদীর বুকে তখন ঝিকিমিকি আলোক মালা। রত্নার সিদ্ধান্ত নিতে একদিনের অধিক সময় লাগে নি।
মোহিতের বিয়েতে আড়ম্বরের অভাব থাকলেও মানুষের উৎসাহে ঘাটতি ছিল না। নিজের শরীরী উপস্থিতি দিয়ে ত্রিদিব হাজির ছিল 'সকল খেলার মাঝে’। কোলাহল মিটে গিয়ে একান্তে ফুলশয্যার অপেক্ষায় ছিল মোহিত আর রত্না। নারী মনে বিবাহ ঘিরে আগ্রহ স্বপ্ন সংশয়ের মেঘ থাকে। লড়াকু ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী হলেও মনের কুসুম বনে রত্না এক আদ্যোপান্ত নারী। রত্নাকে অবাক করে নির্দিষ্ট দিনের বেশ কিছুদিন আগে তার শরীরে মাসের কম্মটি ঘটে গেছে। সাত-পাঁচ ভেবে রত্না ভীষণ আড়ষ্ঠ ছিল। সে বুঝে উঠতে পারছিলো না বিয়ের প্রথম দিনটিতে কী করে সে মোহিতের পাগলামি সামাল দেবে। ফুলশয্যা প্রতিটি নারীর জীবনে একটি অধ্যায়। রত্না নিজের মাকে দেখেছে, কী প্রচ্ছন্ন গর্বে মা এখনও প্রহর গুনে বলে দিতে পারে তিন দশক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার রমণীয়তা। সেই রাতে কথায় গল্পে মোহিত ভাসিয়ে নিয়ে গেছিল রত্নাকে। রত্না নিজেকে প্রকাশ করার কোন ফুরসত পায়নি। অমন বাকপটু তেজী মেয়ে কেমন মোহিতের কথা টানে বেবাক ভেসে গেছিল। রত্নার হঠাৎ মনে পড়ে ১৯৮৫ সালের একটা ঘটনা। কুম্ভ মেলা ঠিক শুরুর মুখে। সেজে উঠেছে হর কি পৌড়ি ঘাট। গঙ্গার স্রোতের মুখে নিজের শরীর ছেড়ে দেয় রত্না। শরীর পানসি মত তরতর ভেসে চলেছে। হঠাৎ তার খেয়াল হয় বাঁধানো হরকে পৌড়ি ছেড়ে ব্রম্ভকুণ্ড ফেলে সে অনেকটা চলে এসেছে। চওড়া নদীর পাড়ে লাগানো চেন ধরতে না পারলে এখন সে মূল নদীতে স্রোতের অনুকূলে ভেসে যাবে। যতবার রত্না চেন আঁকড়ে ধরতে যায় গতির বাড়ি খেয়ে হাত ফসকে শরীরে চোট পায় সে ততবার। শেষমেশ অনেক চেষ্টার পর রত্না কোনো রকমে নিজেকে স্রোতের কবল থেকে রক্ষা করতে পারে। আজ রত্নার শুধু আদরের নৌকায় ভেসে পড়া। ব্রম্ভকুণ্ডর দ্বিধাহীন রত্না মিটিং মিছিলে খই ফোটা রত্না উচ্ছলতার স্লোগান হারিয়ে আজ রাতে নীরব, সমাহিত। যথাসময়ে আসে ব্রাহ্ম মুহূর্ত মোহিত টের পায় রত্নার শরীর নামক কারখানায় সাময়িক ধর্মঘটের লাল নিশান। মুখে কিছু বলে না সে। অপূর্ণতার হাওয়া বয়ে আনে তার শরীর। মুখমন্ডলে অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে।
পরের দিন ঘুম ভাঙতে দেরি হয় ওদের। নেদো এসে হাজির হয়েছে মোহিতের বাড়ি। নেদোকে দেখেই মোহিতের মা মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন, তোদের বোধ বুদ্ধি কিছু নেই না, ফুলশয্যার পরের দিন সাতসকালে হাজির হয়েছিস? নেদো কিছু মনে করে না। ততক্ষণে রত্না ঘরের আগল নামিয়ে বেরিয়ে এসেছে। নেদোর কাছে সে শুনতে পায় কিভাবে নবীরা চারপাশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরী করেছে। ভুল বোঝাবুঝির ঝাঁজ প্রশমিত করাই এখন প্রাথমিক কাজ। নবীর ইউনিয়ন সবকিছু ঘেঁটে গুলিয়ে দিয়ে মানুষকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে সাম্প্রদায়িক হানাহানির মণ্ডপে। রত্না বুঝতে পারে ব্যাপক জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। সাম্প্রদায়িক বিষ একবার ছড়িয়ে পড়লে তার থেকে নিস্তার নেই। ঘরের মধ্যে ঢুকে মোহিতকে ধাক্কা দিতে থাকে রত্না। কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে মোহিত জানতে চায় রত্নার শশব্যস্ততার কারণ। রত্না কারণ জানালে মোহিত বলে, হিন্দু-মুসলমানের ঝামেলায় আমি নেই। ঘুমের ঘোরে আবোল তাবোল কথার সত্যতা নেই ধরে নিয়ে রত্না জানায়, ঠিক আছে তুমি ঘুমাও আমি প্রকৃত অবস্থা বুঝে আসি। রত্না জানে না মোহিত শুনতে পেল কিনা। মোহিতের মা কিন্তু শুনতে পেয়েছিলেন। তিনি রত্নাকে বলেন, আজ কি তোমার যাওয়া উচিত? রত্না শাশুড়িকে পরিস্থিতি বোঝাবার চেষ্টা করে বিফল হয়। উনি নেদোকে গাল পাড়তে থাকেন। রত্না বলে,মা দেখুন আমি যতদুর মোহিতকে চিনেছি ঘুম ভাঙলে ও ঠিক মিল গেটে হাজির হয়ে যাবে। মোহিত আমার কাজে খুশিই হবে। এই কথার উত্তর দিতে গেলে নিজের ছেলেকে ছোট করতে হয় তাই শাশুড়ি ঠাকরুন কিছু বলেনা। প্রাতঃকৃত্য সেরে রত্না নেদোর সাথে বেরিয়ে পড়ে।
খোদ মিলপাড়ায় মিটিং। এখানে মুসলমান সংখ্যাগুরু। মিটিংয়ে তাদের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। মিটিং পৌরোহিত্য করছে ত্রিদিব। সে পুরানো সিপিএম কর্মী। আশি সালের পর পার্টির সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। এলাকায় সে অতি পরিচিত মুখ। অবাধ যাতায়াত ছিল তার মহল্লায়। মানুষ তাকে সম্মান করতো। মিটিং চলাকালীন নেদো হাজির হয় রত্নাকে নিয়ে। ত্রিদিব বলে,তুই আজকের দিনে ওকে ডাকতে গেলি কেন, মোহিত এসেছে? রত্না জানায়, সে আসেনি, আশা করি ঘুম ভাঙলে এসে পড়বে। বেশিরভাগ মানুষ উল্লসিত হয় রত্নার আগমনে। জমায়েত চাঙ্গা হয়ে যায়। মানুষের মুখ থেকে উঠে আসে বক্তব্য- দাঙ্গাবাজি রুখতে হবে। শ্রমিক ঐক্য জিন্দাবাদ। মাস্তানরাজ মুর্দাবাদ। ত্রিদিব বলে, ওরা যেখানে যেখানে সাধারণ মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার জুজু দেখাবে সেখানে সেখানে প্রতিবাদ করতে হবে। সবাই সমস্বরে চিৎকার করে হাত তুলে অঙ্গীকার করে। দালাল চক্র বহিরাগত স্টাম্প মেরে দিতে পারে এই আশঙ্কায় ত্রিদিব অর্ক আর বাতাসী কে বসিয়ে এসেছিল এক কমরেডের বাড়িতে। অর্ক চেয়েছিল একটা সম্প্রীতি মিছিল। মিটিঙে ত্রিদিব সেই কথা পেশ করে মতামত জানতে চায়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য সাইকেল মিছিলে সবাই সায় দেয়। মিটিং শেষ হলে নেদো ত্রিদিব রত্না, অর্ক আর বাতাসীর কাছে গিয়ে জানায় মিটিং এর আলোচ্য বিষয়। রত্নার সঙ্গে অর্ক আর বাতাসীর পরিচয় হয়। বাতাসী জানায় জানতে পারলে তারা বিয়েতে অংশ নিত। আজ রত্নার অংশগ্রহণে ওরাও কিঞ্চিত বিস্মিত হয়েছে। বাতাসী রত্নাকে নিজের আপ্লুত হওয়ার ঘটনা কবুল করে। বিকেলে সাইকেল মিছিলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। সবকিছু চুকেবুকে গেলে রত্না ঘর অভিমুখে যাত্রা করে।
রত্না জানতো আজ ওকে শাশুড়ির গঞ্জনা শুনতে হবে। গত রাতের প্রেমজ আদর এবং আজকের সফল সম্প্রীতি অভিযানে বিহ্বল রত্না। সে ঠিক করে ফেলেছিল শাশুড়ির কোন কথায় রা কাড়বেনা। বাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই সংসারে নিয়মানুবর্তিতার খোঁচায় বিদ্ধ হতে থাকে রত্না। কোনরকমে বাক্যবাণ গায়ে না মেখে মোহিতের কাছে হাজির হয় সে। শুয়ে থাকা মোহিত নিজস্ব ঢঙে জিগেস করে,বিপ্লব কোন পথে? রত্না উচ্ছলতায় টগবগ করছে সে মোহিতের শ্লেষ ধরতে পারে না। সে বলে, তুমি এলে না? আমি বড় মুখ করে মা কে বললাম। ক্লান্তির দোহাই দিয়ে মোহিত প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে। রত্না নাছোড়। সে অভিযোগের পথে না গিয়ে আজকের দিনলিপি বলতে থাকে। মোহিত না শোনার ভান করে পড়ে ছিল। ধীরে ঘটনার ঘনঘটায় মোহিত বিছানায় উঠে বসে। রত্নার বর্ণনা প্রায় শেষের দিকে। মোহিত দুহাত মুষ্টি বদ্ধ করে পর্যায়ক্রমে বালিশে ঘুষি মারতে থাকে। রত্না বলে, কি হলো অমন করছ কেন? কিছু না, আজ তোমার সঙ্গে গেলেই ভালো হতো। শালা ত্রিদিবের হাতে চলে যাচ্ছে আন্দোলনের রাশ। অবাক হয়ে চেয়ে থাকে রত্না মোহিতের দিকে। পরমুহূর্তে ছুটে আসা প্রশ্নে রত্নার সম্বিত ফিরে আসে। আন্দোলনে নতুন কারও আবির্ভাব ঘটেছে? ত্রিদিবের মাথা তো এমন সরেশ নয় যে সম্প্রীতি মিছিলের কথা ভাববে। রত্না অর্ক আর বাতাসী জুটির কথা জানায়। মোহিতের কপালে কিঞ্চিত ভাঁজ পড়ে, রত্না খেয়াল করেনা। বিয়ে বাড়ির বাসি খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ে ওরা। রত্না জানে আজকে রাতও জেগে কাটবে। পরিশ্রান্ত রত্না জেগে থাকার জন্য এক গ্লাস চা আনে। ইউনিয়ন মিটিং মিছিল চা লড়াইয়ের পিপাসা বাড়িয়ে দেয়। জেগে থাকা বা জাগিয়ে রাখায় চায়ের উপযোগীতা সর্বজন স্বীকৃত। মোহিত জানে রত্না চায়ের ভক্ত আজ রাতে ভালোবাসার আয়োজনে চা এর ভূমিকা কি এবং কেন তা বোঝার ক্ষমতা বা ইচ্ছে মোহিতের নেই।
বিছানায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাতে ঠোটে জিভে সচল হয় মোহিত। রত্না বুঝতে পারে আজ তার নিস্তার নেই। বাড়ি ফিরে মোহিতের বলা কথা রত্নার স্মরণে আসে। হঠাৎ করে রত্নার গা ঘিনঘিন করে উঠে। রত্না বুঝতে পারে মোহিত ত্রিদিবকে ঈর্ষা করে। আদরের বানভাসি ঢেউ রত্না গায়ে মাখতে পারেনা। মোহিত রত্নার শিথিল শরীরের স্পর্শ করে বুঝতে পারেনা ওর উৎসব বিমুখ শরীরে অমনোযোগ। খুব তাড়াতাড়ি পরিণতির দিকে এগোতে চায় মোহিত। বিবসিত হতে থাকে রত্না। সুরহীন বেখেয়াল হঠাৎ সোমে না মিলে ফাঁকে এসে পড়ে। রত্নার মানসিক অশান্তিতে যুক্ত হয় শরীরী লাল নিশানের অসময়চিত আয়োজন। তড়িঘড়ি রত্না নিজেকে মোহিতের বাহুপাশ থেকে মুক্ত করে। ঘরের কোণে কতগুলো ফ্লেক্স গোটানো অবস্থায় দাঁড় করানো আছে। রত্না সেগুলো দেখতে পেয়ে তড়িঘড়ি একটা ফ্লেক্স খুলে ফেলে। মোহিত রত্নার অভিপ্রায় বুঝতে পারে না। সে টেনে হিঁচড়ে রত্নাকে বিছানায় আনে। রত্নার হাতে গৃহকোণ থেকে জুটিয়ে আনা ফ্লেক্স। রত্না ফ্লেক্স পেতে দেয় বিছানায়। মোহিত ততক্ষণে লাল নিশানের বাঁধা অতিক্রম করে ফেলেছে। গা ঘিনঘিন করা আবহে রত্নার শরীর নিজের অজান্তে সায় দিয়ে ফেলে।
বিয়ের মাস ছয়েক কেটে গেছে। নড়বড় করছে ঘরকন্না। রোজগার বলতে দুজনের বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রাইভেট টিউশন। রত্নার ওপর চাপ বড্ড বেশি চাপ পড়ে যাচ্ছে। রান্নাবাড়ি মিছিল-মিটিং সবকিছু নিয়ে সে জেরবার। মোহিতের শরীরী রণহুঙ্কার দিনকে দিন বাড়ছে। প্রথম কিছু মাস রত্না ভালোবাসার আবেগে মেনে নিয়েছিল। একদিন মোহিতের কাছ থেকে আসা অকস্মাৎ প্রস্তাবে রত্নার পিত্তি চটকে যায়। মোহিত বলেছে সংসারে টাকা-পয়সার যোগান বাড়াতে। রত্না কিভাবে জিগেস করলে মোহিত বলে, ভবিষ্যতে প্রজন্মের সঠিক লালন-পালনে টাকার ভুমিকা অপরিহার্য। তুমি বেশি টিউশন নিলে সংসার উপকৃত হবে। ইউনিয়নের দায় আমি একাই সামলাতে পারবো। এমন কথা মোহিত বলতে পারে রত্না স্বপ্নেও ভাবেনি। সরাসরি রত্না, মোহিতকে জিজ্ঞেস করে,তুমি কি আমার পায়ে বেড়ি পড়াতে চাও? সমাজে আর পাঁচটা মেয়ে যেমন। রত্না বুঝতে পেরেছিল মোহিতের প্রস্তাবে মায়ের ইন্ধন আছে। দিন-দিন পিড়াপিড়ি বাড়তে থাকে। সঠিক কারন অনুধাবন করতে রত্নার সময় লেগেছিল। মোহিত আদতে চায়না রত্না ত্রিদিবের সঙ্গে মেলামেশা করুক। মোহিত মাঝেমধ্যেই ত্রিদিব এবং বিভিন্ন পকেট নেতাদের বাড়িতে ডেকে পাঠাতো। সেই মিটিং গুলতে রত্নাও থাকতো। মোহিত আন্দোলনের খবরাখবর নিত ইনস্ট্রাকশন দিত। অনেক ক্ষেত্রে পরামর্শগুলি ব্যাপক মানুষের সম্মিলিত সিদ্ধান্তকে মান্যতা দিয়ে আসত না। এ বিষয়ে ত্রিদিব মুখে কিছু না বললেও রত্না প্রতিবাদ করত। ত্রিদিব রত্নার যুক্তি ধারাকে সাধুবাদ জানিয়ে সমর্থন করত। উপস্থিত আরো অনেকে রত্নাদির কথায় মান্যতা দিত। মোহিত মনে মনে গজরাত। এমন ই একদিন অন্যদের অনুপস্থিতির সুযোগে রত্নার সামনে মোহিত ত্রিদিবকে বলে,তোমাদের মেলামেশা আমি ভালো চোখে দেখছি না। রত্না এখন বিবাহিত তার কি উচিত তোমার সঙ্গে এঁটুলির মতো লেগে থাকা। তুমিই বা ওকে বারণ করো না কেন? রত্না গুম মেরে যায়। উত্তরে ত্রিদিব বলে, রত্না তোর স্ত্রী, আমাদের সাথী। রত্নার যথেষ্ট বয়স হয়েছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। ও নিজে সিদ্ধান্ত নিক। বরঙ তুই নিজে কি করবি ভেবে দেখ। মোহিত বলে প্রশ্ন যখন উঠলো তাহলে বলি,আমার অনুমতি না নিয়ে তুমি বাইরের মানুষ জনকে মিলের ব্যাপারে নাক গলাতে দিচ্ছ কেন? শহুরে বাবু মিলের রাজনীতি অর্থনীতি বুঝবে এমন ভাবার কারন কী? রত্না হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে বলে,ভাষণ না দিয়ে মাঠে নামো। ত্রিদিব বলে,মোহিত, তোর কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার কোন দায় নেই আমাদের। আর যারা বাইরে থেকে আসছে তারা শিখছে মানুষের জোটবদ্ধ হওয়ার হারানো পথ। স্বতঃস্ফূর্ত লড়াইয়ের আঁকাবাঁকা পথ বাংলার মানুষের কাছে ওরা পৌঁছে দিতে চায়। সাধারণ মানুষের শেখার প্রয়োজন আছে। আমি চললাম, তোর সাথে কোন যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। দ্বিধাগ্রস্ত মোহিত কি করা উচিত বুঝে উঠতে পারেনা। এত তাড়াতাড়ি সাগিনা, জনগণের নয়ন তারায় বসা মনি কক্ষচ্যুত হবে এ হতে পারে না। ত্রিদিব চক্রান্ত করছে, ও নেতৃত্ত্বর স্বাদ পেতে আগ্রহী। বর্তমানে ত্রিদিবের যোগাযোগ আরও বেড়েছে। শালা শেয়ানা, পোস্ট অফিসের চাকরি কে সুচতুর ভাবে কাজে লাগিয়েছে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মোহিত সিদ্ধান্ত নেয় রত্নাকে চটালে চলবে না। ওকে ব্যবহার করে হারিয়ে যাওয়া জায়গা ফেরত পেতে হবে তারপর দেখা যাবে। বিছানায় অন্ধকার নেমে আসে। বিক্ষুব্ধ রত্না নাইট ল্যাম্প না জ্বালিয়ে শুয়ে পড়েছে। সে জানত আজ তাকে নিশ্চিত তোয়াজ করবে মোহিত। রত্না ঘুমের ভান করে বিছানায় পড়ে থাকে। মোহিতের কথার খোঁচাগুলো রত্নাকে নিরন্তর ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে। সে ভাবে আমি এতোখানি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ত্রিদিবদাকে যে অপমান মোহিত করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। সত্যিই ত্রিদিব দা খুব কেয়ারিং। কখনো আমাকে রাতের অন্ধকারে একলা ছাড়ে না। ত্রিদিবদা যদি আগেভাগে মনের কথা জানাতো আমাকে। ধুস কি আবোল তাবোল ভাবছি। আমি তো তখন মোহিতে পাগল। ওর চাকচিক্য আমাকে গ্রাস করেছিল। ভাগ্যিস ত্রিদিব দা আমাকে প্রস্তাব দেয় নি। দিলে উঁচু মানুষটাকে প্রত্যাখ্যান সইতে হতো। আ মলো যা, লোকটার আমাকে ভালো লাগে কিনা তাই জানি না প্রত্যাখ্যানে পৌঁছে গেলাম। ঠিক সেই সময় অন্ধকারে স্পষ্ট হয়ে এগিয়ে আসে মোহিতের রোমশ সাদা দু হাত। রত্নার পেলব শরীরের দখল পেতে চাইছে মোহিত। হঠাৎ করেই একটা সন্ধ্যে বদলে দিয়েছে মোহিতের পরিচয়। এই মুহূর্তে রত্নার সবকিছু অচেনা লাগে। ছিটকে সরে যায় রত্না। মোহিত উঠে বসে অনুনয় করতে থাকে নাগাড়ে। ঘরে বাইরে অস্তিত্বের সংকট। যেভাবে হোক তাকে সামাল দিতে হবে। শেষমেশ রত্না একটু নরম হয়। মোহিতকে সংশোধনের সুযোগ দিতে রাজি হয় সঙ্গে এও জানিয়ে দেয়,শরীরী ভালোবাসা তখনই সম্ভব যখন মন মান্যতা দেবে। আমার চোখে পুরনো অবস্থানে ফিরে না আসতে পারলে আমার শরীর সাড়া দিতে অপারগ। তোমাকে বেছে নিতে হবে তোমার রাস্তা। মনের ভাব লুকিয়ে মোহিত মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে থাকে।
নতুন করে সাগিনাকে ফিরে পাওয়া যাচ্ছে মিটিং-মিছিলে। যদিও রত্নাকে সবসময় নজর বন্দী করে রাখছে মোহিত। রত্নাও অবাক হয়ে যাচ্ছে। আজ গদাইপুরে মিটিং, ত্রিদিব সবাইকে বলেছিল যে যার মনের মতো পোস্টার ছবি তৈরী করে আনতে। রংধনুর রঙে রাঙানো সব পোষ্টার। মানুষ পোস্টার আঁকছে লিখেছে। গ্রামের কচিকাচাদের কাছে হাত পেতে সাহায্য চেয়েছে ওরা। মিটিংয়ে পোস্টার আসছে, দালাল হটাও দেশ বাঁচাও। কাটৌতি ফেরত দিতে হবে। একটা সারিবদ্ধ হাতের ছবি নিচে লেখা, কাজের অধিকার চাই। রক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে উপস্থিত মানুষের। আবারও একটা দল নতুন প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজির। শ্রমিক-কৃষক ঐক্য হবে নাকো ব্যর্থ। আগের দিন মোটর ওয়াইন্ডিং এর পরাণ মন্ডল ধুমধুমার কান্ড বাঁধিয়েছিল। বেড়াবেড়িয়ার পরাণ মন্ডল শিল্পী মানুষ। কাপড়ের ইজেল কাঠের ফ্রেমে বেঁধে এক অপূর্ব ছবি বানিয়ে নিয়ে এসেছে সে। অশ্বত্থ গাছের মগডালে ফোঁড়ে মালিক চড়ে বসে দুইহাত জোড় করে ক্ষমা চাইছে। নিচে সারি সারি কালো মাথা। মিল শ্রমিকের হাতে লাল সবুজ ঝান্ডা। ওপরে লাল নিচে সবুজ যেন ঘয়লা ঘুড়ি। ঝান্ডার রং নিয়ে মঞ্চে আলোচনা শুরু হয়। ত্রিদিব দেলহি রাজহরায় দেখে এসেছে ছত্রিশগড় মুক্তি মোর্চার পতাকার রং লাল সবুজ। ত্রিদিব এই কথা জানায়। একজন বলে, লাল শ্রমিক এবং সবুজ কৃষকের রঙ। জমায়েত থেকে আওয়াজ ওঠে- কিউ না লাল হারা হো যায়। স্লোগান উঠতে থাকে- লাল সবুজ
মানুষের জোট
টিকবে না
দালাল
মালিক ঘোঁট। জমায়েত সরগরম। হাঁড়িতে টগবগ করে ফুটছিল চাল সময় বুঝে নামাতে হবে। যথাসময়ে মঞ্চে এসে হাজির মোহিত। মাইকের দখল মোহিতের হাতে চলে গেছে। রত্না আর মোহিত একইসাথে এসেছে। রত্না একজন লড়াকু সৈনিক তার স্থান সর্বদা মঞ্চের বাইরে অন্যদের সাথে। ত্রিদিব ছোট্ট করে মোহিতকে জানায় সভায় আলোচিত বিষয় সমূহ। মোহিত ক্ষুন্ন হয়, তার অনুপস্থিতিতে কেন পতাকার রঙ নির্বাচিত হলো। ত্রিদিব বলে,জনমত নদীর মত। তার বয়ে যাওয়ায় কে বাধসাধবে? বিরক্ত মোহিতের চোখ হঠাৎই আটকে যায় ভিড়ের কেন্দ্রে বসে থাকা রমণীয় দ্রষ্টব্যে। ত্রিদিবের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে মাইকের সুইচ অন করে দেয় সে। তার ঝাঁজালো বক্তব্যের মুগ্ধতায় জনগণ কিছু একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। কারন মিটিংয়ে মন নেই মোহিতের। তার চোখ এখন বাতাসীর অনুসরণে ব্যস্ত। মিটিঙয়ে সে বেখেয়ালি। রত্না খেয়াল করতে পারেনি মোহিতের চোখের গতিবিধি। আজ মোহিতের আগুনে ভাষণে রত্না আগের মতোই মুগ্ধ। কিন্তু এত বড় জমায়েত আশু কর্তব্যর নির্দেশ দিতে না পারায় সে হতাশ। সভা থেকে কোনো সিদ্ধান্ত উঠে আসতে পারে না বরং মোহিত ফের পতাকার রং লাল সবুজ হওয়া উচিত কিনা সেই প্রসঙ্গ পেড়ে ফেলে। সভা স্বতস্ফূর্ততা ঝেড়ে ফেলে নির্বাক হয়ে যায়। সেই সুযোগে মোহিত প্রস্তাব দেয়- সোনালী পাটের রঙ থাকা উচিত শ্রমিকের প্রতিকি লাল রংয়ের সঙ্গে। সকলের ঠিক ভুল গুলিয়ে যায়। অর্ক অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল সে দাঁড়িয়ে উঠে বলে,পতাকার ডিজাইন মানুষের কল্পনায় উঠে এসেছে। এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকা উচিত। আন্দোলনে দিশা না দেখিয়ে এমন ফালতু বিষয় নিয়ে কালাতিপাত সমীচীন নয়। হইহই করে সমর্থন আছে সহস্র কন্ঠে, রত্নাও সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সমর্থন জানায়। মোহিত বিগড়ে যায়। মাইক হাতে তুলে নিয়ে সে বলে,বুঝতে পারছি, শ্রমিক জোট আজ প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতের পুতুল। আর এর জন্য দায়ী ত্রিদিব। শহর থেকে পেটিবুর্জোয়া নেতৃত্ব ধরে এনে ও মাটির নেতাকে অপমান করতে চাইছে। বন্ধুগণ আন্দোলনের এদের হাতে তুলে দিয়ে কারখানার বিপদ নিজেদের সমূহ বিপদ ডেকে আনবেন না। মোহিতের আহবানে জনমত সাড়া দেয় না। বাতাসী শুধু বলে, আমরা নেতৃত্ব দিতে আসিনি বরং খুব কাছ থেকে দেখে শিখতে এসেছি। আপনার ভুল হচ্ছে বুঝতে পারছি। সভার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে আপনি পথ দেখান। উপস্থিত জনতা আপনার বক্তব্য যুক্তিপূর্ণ হলে মেনে নেবে। সম্মতি জানায় সবাই। কোনরকমে মান রক্ষা হয় মোহিতের। সে বলে,ঠিক আছে, পরের মিটিঙের দিন ঠিক হোক। সেখানে আমার ভাবনা জানাবো।
অঞ্চলের ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন পকেট মিটিং চলতেই থাকে। বৃহত্তর সমাজের সমর্থনের আশায় ত্রিদিব সরকারি কাজের ফাঁকে ফাঁকে শহরতলিতে মিটিং করছে। সব মিটিংয়ে হাজির থাকতে পারছে না অর্করা। মুজিবের এলাকায় মিটিং আয়োজিত হয়েছে। মুজিব সৎ নির্ভীক আপোষহীন মাটির মানুষ। মুজিব ভাই জুটমিলে সর্বজন স্বীকৃত একটা নাম। ত্রিদিব ভাবে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব মুজিবের হাতে থাকা উচিত। অপটু আপসকামী অলস মোহিত এই জনরোষকে নেতৃত্ব দেওয়ার অযোগ্য। রত্নাকে নিয়ে তার চিন্তা। আক্রমণের তীর মোহিতের দিকে গেলে রত্না ক্ষুব্দ হতে পারে। ওদের সংসারে এখন ছন্দ ফিরে এসেছে। ত্রিদিব ভেবে কূলকিনারা পায় না। চালভাজা আর এক মগ চা উপস্থিত। জনা দশেক মানুষ এসেছে। ত্রিদিব কথা শুরু করার ভার মুজিবের হাতে ছেড়ে দেয়। মুজিব সহজাত ভঙ্গিমায় আশু কর্তব্য নিয়ে আলোচনা শুরু করে। বিআইএফআরে তাদের কী বক্তব্য পেশ করা উচিত। সিটু বা অন্য ইউনিয়ন সাংগঠনিক ক্ষমতার জোরে দিল্লি পৌঁছে যাবে। ফিরে এসে যথারীতি ফের মানুষের সাথে কোনরকম আলোচনা না করে ভুল পথ দেখাবে। কারখানা কি সত্যই শ্রমিক চালাতে পারবে? ত্রিদিব জিজ্ঞেস করে,না পারার কারণ? মুজিব বলে, কারন হল সরকার পুলিশ দালাল ইউনিয়ন একজোট হয়ে বাঁধা দেবে। বাতাসীর খেয়াল আছে পার্টির উঁচুতলার কোন কোন নেতা ওদের বাড়ি আসত। বর্ধমান অঞ্চলে ওর বাপের সততা প্রতিপত্তি অনেকটা রূপকথার মতো। বাতাসী তাই হঠাৎ করে বলে,পার্টির উঁচুতলার লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে হয়না। মুজিব বলে, না রে বোন, পার্টির উঁচুতলা এক্কেবারে পচে গেছে। আমার আর ত্রিদিবের পার্টি ছাড়ার কারন কখনো সুযোগ পেলে বলব। অর্ক তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা কোনদিন বাতাসীকে বলে নি। ত্রিদিব সুযোগ খুঁজছিল। সে পার্টি নিয়ে এই আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে আগ্রহি নয়। কথার খেই ধরে প্রাসঙ্গিকভাবে তার প্রশ্ন,তাহলে রণমুখী শ্রমিক কার নেতৃত্বে যুদ্ধে যাবে? তেমন নেতা কই, এ বিষয়ে তোমাদের মত কী? বাতাসী মোহিতের বাকচাতুর্য মুগ্ধ হয়েছিল। সে বলে,মোহিতদা কোন অপরাধ করলো? রত্না বাতাসীর দিকে আড়চোখে দেখে। অর্ক কোন কথা বলে না সে শুনতে চায়। সব্বাইকে হতচকিত করে মুজিব বলে, শুধু পাট নয় বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদনের দখল নিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে পুঁজি মালিক ছাড়াও শিল্পের বিকাশ সম্ভব। এই কাজ আমাকে দিয়ে সম্ভব নয়। আমি সাংগঠনিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখব। মোহিতের প্রসঙ্গে বলি অমন যোগ্যতা তার নেই। রত্নার দিকে তাকিয়ে নিয়ে মুজিব বলে,কিছু মনে করিস না, আমি সারা জীবন এমন একটা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের প্রতীক্ষায় ছিলাম। অঞ্চলের ঘরে ঘরে আন্দোলনের আঁচ পৌঁছে দেওয়ায় ত্রিদিবের কৃতিত্ব অনস্বিকার্য। আর সেই সময় নেতৃত্ব পিয়াসী মোহিত স্বপ্নে মশগুল থেকে ঘুমাচ্ছিল তাই আন্দোলনের রাশ আমাদের হাতে চলে এসেছে। রত্না মুজিবকে থামিয়ে দিয়ে বলে, তোমরা ভুলে যাও আমি মোহিতের স্ত্রী। আমার কাছে লড়াই আন্দোলন সততার চেয়ে বড় কিছু নয়। ত্রিদিব জানতে চায় মুজিবের কাকে পছন্দ। মুজিব সোজাসুজি বলে,এই মাটিতে তেমন হারকিউলিস কেউ নেই তোমরা সন্ধান করো। অর্ক কিঞ্চিত বিরক্ত হয় প্রতিবাদ করে- নেতৃত্ব জন্ম নিক আন্দোলনের মধ্য থেকে। মুজিব বলে,ঘটনাপ্রবাহ যে গতিতে এবং যে খাতে বয়ে চলেছে, আমাদের হাতে সময় নেই। পথ খুঁজে বার করতে হবে এবং তা অতি শীঘ্র। ত্রিদিব হাওড়া শিবপুরের মনীষ বাবুর কথা বলে। অর্কর মনে পড়ে যায় ট্রেনের সেই ভদ্রলোকের কথা। অর্ক জানায় মনীষ বাবুর সঙ্গে তার পরিচয়ের সুযোগ ঘটেছিল। ত্রিদিব বলে,উনি একদিন এসেছিলেন, ওনার পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল এই আন্দোলনের ইতিবৃত্ত। প্রত্যেকে রাজি হয়ে যায়। অর্ক নিমরাজি হয়েও মেনে নেয়।
পরদিন সকালে পৌঁছে যায় ত্রিদিব মনীষ বাবুর বাড়ি। বিছানায় গা এলিয়ে দৈনিক পত্রিকায় চোখ বোলাচ্ছেন মনীষ। অভিব্যক্তিহীন মুখ দেখে মনে হয় না বিশেষ কোনোও সমাচার ওকে টানতে পারছে। ত্রিদিব আগেও এ বাড়িতে এসেছে। বৌদির সঙ্গে তার পরিচয় বহুদিনের। সেই সুবাদে সে সটান মনীষের ঘরে ঢুকে মাটিতে বসে পড়ে। মনীষ জিজ্ঞেস করে, কী হলো হঠাৎ তোমার আবির্ভাব? আন্দোলনের খবর বলো। গুছিয়ে সবকিছু জানায় ত্রিদিব। টগবগ করে ফুটতে থাকা শ্রমিকের কথায় উল্লসিত হয়ে উনি বলেন,ক্ষেত্র প্রস্তুত, কালই যাব। আমি তোমাদের সঙ্গে আছি এখন তোমরাই নেতা।
উনত্রিশ
ঘামের জলে নৌক চলা বন্ধ কল।
পর্ব -৩
মনীষ বাবু পুরানো ইযেল ছিঁড়েখুঁড়ে এক অজানা অচেনা আঁকা ছবিতে রং ছড়ানোর কাজ হাতে নিলেন। মেতে গেল গ্রাম আধা শহর জাদুকর মনীষের জাধ্বনিতে। অর্ক একদিন দোকানে বসে চায়ের ভাঁড়ে ঠোঁট সবে ডোবাবে শুরু হয় দুপক্ষের কোস্তা কুস্তি। বড় দল ঘিরে ধরেছে দু-তিনজনকে। তারা বুঝিয়েই ছাড়বে মনিষ বাবুর নখের যোগ্য নয় কেউ। প্রথম দিন এই মাটিতে পা দেওয়ার অভিজ্ঞতা আজও অর্কর কাছে স্পষ্ট। মুক্তকণ্ঠে চায়ের দোকানের রেল অবরোধ সমর্থন করতে যারা সেদিন ভয় পাচ্ছিল আজ মুক্তকণ্ঠে খুল্লামখুল্লা সমালোচনায় তাদের মুখে আগল দেওয়া যাচ্ছে না। এখন কথায় কথায় আন্দোলন ছেড়ে মানুষ মনীষ কে দেবতুল্য বলে বর্ণনা করতে শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে অর্ক উল্লসিত হলেও হোঁচট খেতে সময় লাগে না। ওর কেমন মনে হয় সাধারন মানুষ কেমন আন্দোলন থেকে সরে গিয়ে দেব পূজায় মগ্ন হয়ে পড়ছে। একদিন অর্ক নাক গলিয়ে ফেলে বলে, আপনারা,আন্দোলনের কথা বলুন,নিজেদের কথা বলুন। জনগণের নেতৃত্বে আন্দোলনের সূত্রপাত। সেই আন্দোলনের দিনপঞ্জিকা অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করুন আন্দোলন শক্তিশালী হবে। নেতারা তো অনেক পরে এসেছে। যদিও একইভাবে অর্কও আচ্ছন্ন মনীষের জাদুতে। আবেগ আর নীতিবোধের পরষ্পর বিরোধ অর্ক কে দীর্ণ করে। মোহগ্রস্থতা ছেড়ে কিছুতেই বেরিয়ে আসা যায় না। উপস্থিত সাধারণ মানুষ অর্কর আবেগহীন বক্তব্যকে সায় না দিয়ে ফের সূর্য বন্দনায় মেতে যায়। ছোট্ট বুকের খাঁচায় একসাথে কয়জন বাস করে কেউ জানে না। অর্ক স্টেশনে বাতাসীর জন্য অপেক্ষা করছে। মনীষ চেঙ্গাইলে। আজকে প্রচারের দায়িত্ব অর্ক আর বাতাসীকে দিয়েছে মনীষ। বাতাসীর ট্রেন লেট করছে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অর্কর মনে হয় মোহিত বাতাসীর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন মিটিং এ মোহিত কোণঠাসা হয়ে পড়ে বিভিন্ন কারণে। বাতাসী উপস্থিত মানুষের মনে মোহিতের সম্পর্কে জন্মানো বিরূপ ধারণা মুছে দিতে চেষ্টা করে। মোহিতের লড়াকু অতীত সাগিনা নামে খ্যাত হওয়ার কথা, বাতাসী শুনেছে। এছাড়াও বাতাসীর ভালো লাগার অন্য কারন মোহিতের মর্মস্পর্শী বক্তব্য রাখার ক্ষমতা। এমন মানুষ পচে যেতে পারে না বাতাসীর বিশ্বাস। বাতাসী,মোহিতে অনুরক্ত হয়ে পড়ছে না তো। হঠাৎ মনের কোণে ঝিলিক মেরে আসা এমন অসুস্থ অনুভূতিতে অর্ক লজ্জিত হয়। ওর মন অনুশোচনায় ডুবে যায়। ত্রিদিব মুজিব এবং অবশ্যই রত্নার নেতৃত্বে আন্দোলনের ছড়াচ্ছিল কিন্তু তা কখনো হ্যারিকেন এর আকার নেয় নি। মনীষের বাগ্মিতা অকাট্য যুক্তি, বাউরিয়া ফুলেশ্বর চেঙ্গাইল শ্রমিক-কৃষক বৃত্তে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। শহর থেকে মানুষজন আসছে বহমান আন্দোলনের সঙ্গী হতে। অনেকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুপ্ত অভিপ্রায় নিয়ে আসছেন যদিও মুখে তা প্রকাশ পাচ্ছে না। এসব নিয়ে কারও ভাবার সময় নেই। অঞ্চল জুড়ে মিটিং-মিছিল। ভাগ করে নেয়া হচ্ছে দায়িত্ব। কমল এবং সপ্তর্ষি এসেছে হাওড়ার শহরতলি থেকে। গায়ক সুজাত গান গেয়ে যৌথ রান্নাঘরে টাকার জোগান দিচ্ছে। সব জায়গায় মনীষ কে যেতে হচ্ছে না। নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতায় অন্যরা দিনদিন সম্মৃদ্ধ হয়ে উঠছে।
ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়া ঘটনার ঘনঘটায় খেই হারিয়ে ফেলছে মোহিত। সে একদিন কারখানা দখল নেওয়ার ঔচিত্য সম্পর্কে বক্তব্য রাখে মিটিংয়ে। মনোগ্রাহী বক্তব্যে জনতা খেপে ওঠে। মোহিত বলে, শুভক্ষণ উপস্থিত, এখন আমরা এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে না নিতে পারলে আর কোনদিন পারবনা। মোহিত জানত মনীষ এই প্রস্তাবে সম্মত হবে না। বাতাসী ও অর্ক উভয়ই মনে মনে এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করে। সবাই চাইছে মনীষ বাবু কিছু বলুক। পকেট মিটিংগুলো থেকে এমন সিদ্ধান্ত উঠে আসেনি। অগণতান্ত্রিক ভাবে এমন সিদ্ধান্ত হঠাৎ মেনে নেওয়া আদতে হঠকারিতা। আবার একইসাথে জনমত সায় দিলে সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক। মনীষ ভেবে কূলকিনারা পায় না কি করা উচিত। ওদিকে মানুষের প্রবল চাপ। মোহিত ঠিক এমনটাই চেয়েছিল। হঠাৎ নিয়ম ভেঙ্গে দ্বিতীয়বার মঞ্চে উঠে মোহিত ফের মাইকের দখল নেয়। পুতুলের মত মাইক হাত থেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় মনীষ। সেই সুযোগে মোহিত বলে- মনীষবাবু, এই মাটির কেউ নয় তাই মাটিকে চিনতে পারেননি। উনি জানেন না জুট শ্রমিকের আরেক নাম, 'জাতে মাতাল তালে ঠিক'। সাহসী লড়াইয়ে এদের জুড়ি নেই। মোহিতের চড়ায় তোলা সুরে নিজেদের বেঁধে নিয়েছে উপস্থিত মানুষজন। মনীষ এতটা আশা করেনি। বিভ্রান্ত জনগণ উত্তর চায় মনীষের কাছ থেকে। মনীষ জানায় অপেক্ষা করতে হবে। সবুরে মেওয়া ফলে। আইন লড়াই এবং জমির আন্দোলন হাত ধরাধরি করে হাঁটবে। আইনি সুযোগ নিয়ে কারখানা দখল করা বাঞ্ছনীয়। জনগণ প্রত্যাশিত উত্তর না পেয়ে বিমর্ষ হয়। মোহিতের ইন্ধনে সোরগোল বাড়তে থাকে। মোহিত, মনীষের কাছে জানতে চায়, কী ঘটলে পরিস্থিতি অনুকুলে আসবে তা খুলে বলুন জনগণ জানতে চায়। মনীষ সংক্ষেপে বলে, বি আই এফ আরের মিটিং হলে বোঝা যাবে। মোহিত বলে, আপনারা এখনও এই বুর্জুয়া সরকারি দপ্তর গুলোকে বিশ্বাস করেন! জনগণ সাথ দেয় মোহিতকে। মুজিব চুপ মেরে গেছে। ত্রিদিবের অবস্থাও তথৈবচ। কেবল বাতাসী মোহিতের কথায় চিৎকার করে সায় দিচ্ছিল। গতিক ঠিক নয় বুঝে মনীষ মঞ্চ থেকে নেমে নীরবে হাঁটা দেয়। মিটিঙয়ে আসা শ্রোতার ঢল কেমন চুপ মেরে মিটিং ছেড়ে ফিরে যাচ্ছে। অন্যদিন মনীষকে স্টেশন পর্যন্ত সঙ্গ দিতে লোকের অভাব হয় না। সক্কলে লুটেপুটে নিতে চায় মনীষের মুখ নিঃসৃত বাণী,অভিজ্ঞতার নির্যাস। অবশিষ্ট কয়েকজনের মাঝে রত্না মোহিতের হয়ে সালিশি চালিয়ে যাচ্ছে। কমল আর সপ্তর্ষির সাথে আজ নেদো আছে। কাঁটাবেড়িয়ায় মিটিং সেরে বুড়িখালি তে ফিরে ওরা সব শোনে। নেদো হতবাক হয়ে গেছে এমন ঘটনায়। কমল সপ্তর্ষি জুটি কিভাবে দেখছে এই ঘটনাকে তারাই বলতে পারবে।তবে অখুশী হওয়ার কারন যে বড় একটা ঘটেনি তা বলাই বাহুল্য।
সেদিনের ঘটনা কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি। মনীষ স্টেজ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ত্রিদিব বলে,তোমরা এগোও আমি মঞ্চ তুলে আসছি। ত্রিদিব অর্ককে অনুরোধ করে থেকে যেতে। এই অঞ্চলে একটা ঘর নির্দিষ্ট হয়েছিল ওদের অবসর এবং আলোচনার জন্য। ত্রিদিবের সঙ্গে থাকা উচিত ভেবে অনেকে রয়ে যায়। রোদ লেগে বাতাসী পরিশ্রান্ত সে পা বাড়ায়। ঘরের দরজা হালকা ভেজানো ছিল। বাতাসী দরজা ঠেলে ঢোকে একটু এলিয়ে নিতে। প্রতিশোধ পর্ব চুকিয়ে অপেক্ষা করছিল মোহিত সেখানে। এই ঘরেও ঘরেলু আলোচনায়ও মনীষ কে পেড়ে ফেলতে চায় মোহিত। সেখানে অকস্মাৎ বাতাসীর প্রবেশে মোহিত চমকে ওঠে। প্রকাশ্যে বাতাসীর সমর্থনকে নিজের প্রতি অনুরাগ বলে ধরে নিয়ে ছিল সে। জয়ের আনন্দে ভাসছিল মোহিত। মুহুর্তে মনের সঙ্গে মোহিতের শরীরী ইচ্ছে পাল্লা দিয়ে টানটান হয়। শহরের বাবুকে উৎখাত করতে পেরে প্রাণে তার খুশির তুফান। এখন শুধু জিততে হবে শহুরে নারীর মন। আবেগে ভেসে গিয়ে হঠাৎ করে বাতাসীর কোমর জড়িয়ে ধরে মোহিত। বাতাসী কোনদিন সরাসরি কথা বলেনি মোহিতের সঙ্গে, সে ভাবতেও পারেনি এমন একটা কান্ড মোহিত ঘটাতে পারে। ঘটনার আকস্মিকতায় বাতাসী হতবাক হয়ে যায়। সেই অবসরে মোহিত বাতাসীর ওষ্ঠ স্পর্শ করতে চায়। অনুরাগের ভারে বাতাসীকে শক্তিহীন ভেবেছিল মোহিত। বাতাসীর চোখের ভাষা সঠিক পড়তে পারলে তবেই ওকে স্পর্শ করা যায়। নিমেষে সর্ব শক্তি সংহত করে বাতাসী ধাক্কা মারে মোহিতকে। মোহিত আশা করেছিল বাতাসী চুপটি করে তার সোহাগে সায় দেবে। ছিটকে মাটিতে পড়ে মোহিত। ঠিক সেই সময়ে রত্না ঢুকে পড়ে ঘটনার কিয়দংশ চাক্ষুষ করে ফেলে। বাতাসী বলে,এখন বুঝতে পারছি মনীষ বাবুকে উনি চক্রান্ত করে হেয় করলেন। কাঁদতে কাঁদতে রত্না ঘর ছেড়ে পাগলের মতো ছুটতে থাকে।
বি আই এফ আর হেয়ারিং এর দিন এগিয়ে আসছে। সিটু, আই.এন.টি.ইউ.সির ল্যঙোটরা খবর পেয়ে গেছে। আড়ালে-আবডালে তারা চুটকি মারছে,কে যায় দিল্লি দেখব।সব কেরামতি শেষ। সত্যি কে যাবে মুজিবরা ঠিক করতে পারেনা। মুজিব জানিয়ে দিয়েছে সে নিশ্চিত যাচ্ছে। ত্রিদিব যাবে ধরে নিয়ে মুজিব বলে,মনীষদাকে চাই। ওঁকে ফিরিয়ে আনতে হবে। দফায় দফায় সবাইকে নিয়ে আলোচনা চলে। মানুষ সেদিনের হঠকারিতা স্বীকার করে নেয়। মুজিব অবশ্য বলে,এই জঙ্গিপনা আদৌ হঠকারিতা কিনা সে নিয়ে সওয়াল জবাব চলতে পারে। কিন্তু মোহিত অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই কাজ করেছে এ নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব থাকা উচিত নয়। নেদো বলে,মোহিতের এই কথা যদি যুক্তিযুক্ত মনে হয় তাহলে আমাদের আলোচনা করে আশু পথ ঠিক করা উচিত। বাতাসীর সাথে অশ্লীলতার কথা রত্না ঘনিষ্ঠ দু-একজন কে জানিয়েছে। কথা ভাইরাসের মত বাতাসে ওড়ে। মিল পাড়ায় কারও আজ মোহিতের অসভ্যতা জানতে বাকি নেই। রাজনৈতিক কারণের ঊর্ধ্বে উঠে বিশেষ করে বাতাসীর প্রতি অশালীন আচরণের কারনে মানুষ মোহিতকে বাতিল করে দেয়। মোহিত বাধ্য হয় নিজেকে ঘরবন্দী রাখতে। রত্না ঐ মুহুর্তে না এসে পড়লে ব্যাপারটা হয়ত ধামাচাপা দেওয়া যেত। বাতাসীর আচরণে মোহিত ক্ষুব্ধ হলেও তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে রত্নার ওপরে। দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মধ্যেও রত্না প্রত্যহ আলোচনায় যোগদান করছে। বিশ্বাস মরেও মরে না। রত্না একদিন আলোচনার মাঝে ফস করে বলে ফেলে,আজ যদি দেখা যায় মোহিতের ভাবনা ঠিক আমরা ভুল পথে হাঁটছি ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। অর্ক আর বাতাসী উভয়েই এই কথায় সায় দেয়। ত্রিদিব বলে, আমাদের আশু কর্তব্য মনীষদাকে ফিরিয়ে আনা। ওর উপস্থিতিতে আমাদের এই আলোচনা শুরু করতে হবে। জানতে হবে ওর ভাবনা।
ত্রিদিব আর অর্ক হাজির হয় মনীষের শিবপুরের বাড়িতে। ত্রিদিব বলে,দাদা, ফিরে চলুন মাটি কাঁদছে। মনীষ বলে, তেমনটা দেখলাম কই? জনমত মোহিত কে সমর্থন দিয়েছে ওকে নেতৃত্ব দিতে দাও। ত্রিদিব বলে, এ নিছক আপনার রাগের কথা। আমরা দফায় দফায় আলোচনা করেছি সেদিনের ঘটনায় শ্রমিক মহল্লা কুণ্ঠিত। সত্যি কথা বলতে কি মোহিত আর আপনার মধ্যে যা ঘটেছে তা নেহাত ইগোর লড়াই। বাতাসীর প্রতি মোহিতের অভব্যতার খবর হাওয়ায় মনীষের কানে প্রবেশ করেছে। ত্রিদিবের স্পষ্ট চাঁচাছোলা কথায় ঘাবড়ে গিয়ে মনীষ ভাবার সময় চায়। অর্ক বলে, দাদা, সময় যে বয়ে যায়। কোন উত্তর আসে না মনীষের কাছ থেকে। বিফল মনোরথ হয়ে ওরা যখন ফিরবে বলে ঠিক করেছে,পর্দা সরিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করেন বৌদি। ঘরে ঢুকে অযাচিত ভাবে তিনি বলেন, তুমি বুঝতে চাইছো না কেন এই দায় খেটে খাওয়া মজদুরের নয়। তুমি তাদের বঞ্চিত করতে পার না। মনীষ কিছুক্ষন চুপ করে থাকে। তারপর, পাগলা হাতির মাথা' নাড়িয়ে বলে, তুমি ঠিকই বলেছ,ব্যক্তিগত টানাপোড়েনে শ্রমিকের লড়াইয়ের আঁচে কেন ছাই পড়বে? জিতে ফেরে ত্রিদিব এন্ড কোম্পানি।
ফেরার মনীষের প্রত্যাবর্তনের খবর মাঠে ময়দানে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি মিটিংয়ে মানুষের উপস্থিতি বর্তমানে চোখে পড়ার মত। মনীষের বিশ্বাস ছিল একটা লাল রঙা সরকার শেষ পর্যন্ত ঠিক মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এই বিশ্বাসের কথা ঘনিষ্ঠ মহলে সে প্রকাশ করলেও লড়াইয়ের ময়দানে এ বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করতেন না। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বাউড়িয়া মিল শ্রমিকের। সরকারি ইউনিয়নকে তারা একদম বিশ্বাস করে না। মনীষে জানতেন মোহিতের পথ বর্তমানে সময় উপযোগী নয়, মাহেন্দ্রক্ষণে এইটি ব্যবহার করতে হবে। বিরাট এক জনসভায় মনীষ হাজির করলেন নতুন তত্ত্ব- শ্রমিক কখনো পুঁজি নির্ভর বেঁচে থাকবে না। নিজস্ব ভাবনা দিয়ে নির্মাণের ফসল সমান্তরালভাবে ঘরে তুলতে হবে গোটা সমাজকে। গোটা মহল্লা অবাক হয়ে গিলছে মনীষের ভাবনা। হয়ত ততটা বোধগম্যতা দিয়ে নয় যতটা আবেগ দিয়ে। অর্ক বুঝতে পারে এত জটিল বিষয় নিয়ে বক্তা শ্রোতাদের কাছে পৌঁছতে পারবে না। বিষয়টা সবার কাছে সহজ করে দেওয়ার জন্য সে প্রশ্ন করে, আপনি কি সমান্তরাল উৎপাদনের কথা বলছেন? তারপর চকিতে সে ভাবে সমান্তরাল উৎপাদন খায় না মাথায় দেয়? মনীষ শুরু করার আগেই অর্ক ফের বলে ওঠে, গোটা গল্পটা সাবলীলভাবে বলুন সবার কাছে যাতে বোধগম্য হয়। মনীষ শুরু করে,কারখানায় কে কোন বিভাগে কাজ করেন হাত তুলে জানান। মনীষের এই কথার উত্তরে মুজিব হাত তুলে বলে, আমি ওয়াইন্ডিং এ আছি। আমি কম দামে পাখা তৈরি করতে পারব। মনীষ জেনে নেয় কারা কারা মেকানিক্যাল ইলেকট্রিক্যাল এবং অনান্য বিভাগে আছে। তারপর বলে, শ্রমিকদের বিভাগ অনুযায়ী ছড়িয়ে পড়তে হবে চালু ইন্ডাস্ট্রির সহযোগী শ্রমিকদের কাছে। নতুন কাজ কারিগরি দক্ষতায় শিখতে হবে। নতুন নির্মাণে শামিল হতে হবে। দিকে দিকে সহযোগী শ্রমিকের বন্ধুতা অর্জন করে প্রয়োজনে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। শুধু উৎপাদনই নয় বিপণনে মাথা ঘামাতে হবে। একটা সমান্তরাল বাজার তৈরি করা জররি। মালিকের কি আছে,বিজ্ঞাপন মানে মিথ্যার বেসাতি আর অর্থ ছাড়া? আমরা শত সহস্র হাত নিয়ে পৌঁছে যাব উপভোক্তার হাতে। উৎপাদিত পণ্য নিয়ে কম দামে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পারলে আমাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধিত হবে। বন্ধ কারখানায় লড়াইয়ের দিনগুলোতে কিভাবে শ্রমিকের পেট চলবে সেই ভাবনাগুলো রাখলাম, এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের হাতে। চক্ষু চড়কগাছ সবার। রত্না স্বগোতক্তি করে বাপের জন্মেও শুনিনি এমন কথা। হৈ হৈ পড়ে যায় শ্রমিকদের মধ্যে। আলোচনার মধ্যেই বিভাগ অনুযায়ী নিজেদের দল গড়তে থাকে সবাই। মনীষ চিৎকার করে সবাইকে থামাতে চেষ্টা করে। মনীষ মস্তিষ্ক সর্বস্ব মানুষ গলার তার জোর কম। অর্ক বাজখাই গলায় সবাইকে থামায়। অর্কর চিৎকারে সবাই ফিরে তাকায়। অর্ক হাতটা দাদার দিকে দেখাতে সবার বাক্যি বন্ধ হয়। মনীষ বলে চলে, এই কাজ আন্দোলনের অংশ,মূল আন্দোলন নয়। নিজেকে টেনে বাড়াতে হবে। লড়াই করে উৎপাদন, বিপণন পারবেন তো?' আকাশে বাতাসে প্রতিজ্ঞা। সবাই এক সুরে 'অসম্ভবের' পায়ে হাঁটার রায় জানায়।
চলতে থাকে নতুন উদ্যমে একা বোকা না থেকে নব আনন্দে নির্মাণের খোঁজ। হাজির হন রসায়নবিদ অর্থনীতিবিদ শিল্পীর দল। তৈরি হয় ফিনাইল সাবান ডিটারজেন্ট প্রথম ধাপে। তারপর গৃহস্থালি জিনিস ক্লিপ নাইলন দড়ি এমনকি ছুঁচে সুতো পরানোর মেশিন। ডাক্তাররা এগিয়ে আসেন প্রাথমিক চিকিৎসা এবং হাইজিন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে। ডাক্তারদের পরিচালনায় সিরিঞ্জ তৈরি করার কাজ শুরু হয়। গৃহস্থালি জিনিসপত্রও বিপণন হতে থাকে মিটিং এর ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী। যেখানে মিটিং সেখানে বিপণন। একদল শ্রমিক নিজেদের উদ্যোগে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে বিপণনে হাজির হয়। প্রথম পর্যায়ে হতাশ হতে হয়। এই কাজে দার্শনিকতার দিক আছে ভেবে, বেশ কিছু সমব্যথী সংগঠন এগিয়ে এলে বিপণন জমে যায়। এমন উৎসব মুখরতা বাউরিয়া চেঙ্গাইল বাগনান ফুলেশ্বর মানুষের উপলব্ধির বাইরে ছিল। উৎসব মানে কি কেবল ধর্মীয় মোড়কে ভক্তির প্রদর্শন? ধর্মের বাইরে এমন সামাজিক উৎসব ধারণাতীত ছিল জনগণের। উৎপাদন বিপণন এমনকি অ্যাকাউন্টসের গুরুদায়িত্বে শ্রমিক। সবার উপস্থিতিতে একদিন হাসির ছলে মুজিব বলে ফেলে- তাহলে অবিশ্বাসের চাদর গায়ে মোহিত যে পতাকা উত্তোলন করতে চেয়েছিল রথ সেই দিকেই আগুয়ান। আমাদের সামনে এমন দিন আসবে যেদিন কারখানার দায়িত্ব আমাদের বুঝে নিতে হবে। বাতাসী ঘাড় নাড়ে সে হৃদয় দিয়ে বুঝতে পারে বাবা এমন সমাজটাই গড়তে চেয়েছিল। রত্না শুধু কিছু বলতে পারেনি। বাতাসীর সঙ্গে এমন ঘটনা না ঘটলে রত্নার বুকের পাথর হয়ত একটু হলেও সরত। ত্রিদিব তার মনীষদা কে ফিরিয়ে আনার গর্বে গর্বিত। মনীষ কোন কথা বলে না,মুজিবের কথায় সে একটু হলেও অপ্রস্তুত হয়েছে। মনীষের শরীরী ভাষায় দ্বিধার আভাস অর্ক লক্ষ্য করে।
তিরিশ
ঘামের জলে নৌকো চলা বন্ধ কল
পর্ব -চার
বাড়ি ফেরার পথে কামার শালের হাতুড়ির মত মুজিবের কথাগুলো মনীষের বুকে বাজছিল। নিপুন কুশলতায় একজন দক্ষ কামার স্বপ্নের লালিমায় রূপ দেয় গরম নরম লোহাকে। জ্বলে ওঠা হাপরের আঁচে নরম হয়েও নিজেকে সাজাতে পারছেনা মনীষ। মনীষ দেখতে চায় স্বপ্ন দেখা সমাজের মুর্ত আঙ্গিক। লক্ষ্মণ গণ্ডি ভেঙে নতুন সৃষ্টির উল্লাসে মেতে যাওয়াই তার কাছে স্বাভাবিক। কোথাও তার স্বপ্নের চলাচল থমকে যাচ্ছে সে বুঝতে পারছেনা। ভাবতে ভাবতে ভাব রহিত হয়ে ভাবনা ঘুরে মরছে অন্যখানে। ফের দমাদম হাতুড়ির ঘায়ে চেতনা ফিরে আসছে। মুজিব তো ঠিকই বলেছে আমরা যদি সমান্তরাল শিল্পের উৎপাদন, বিপণন এবং হিসাব রক্ষা করতে পারি তাহলে কেন মূল শিল্পের আঙিনায় শ্রমিক প্রবেশ করতে পারবে না। মোহিতের কথার নির্যাস মুজিব সঠিক ব্যাখ্যায় ছোট করে বুঝিয়ে দিয়েছে। মোহিত কি সত্যিই লড়াই আন্দোলনের সঠিক পথে ছিল? না,ও নেহাতই আমাকে শ্রমিকদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইছিল। একজন নেতাকে সৎ হতে হয় জীবনের সবখানে। মোহিতের চরিত্রের কোন ঠিকানা নেই সে আবার কিসের নেতা। ঢেউয়ের মতো ভাবনাগুলো নিরন্তর আছড়ে পড়ে হারিয়ে যেতে থাকে। আবেগের আতিশয্য কখনো হাতের ভঙ্গিমায় ঠোঁটকে তাল দিয়ে সঙ্গত করতে থাকে। অবান্তর কথারাশি বুদবুদের মত মনের উপরিতলে ভুড়ভুড়ি কাটছে। একজন সফল নেতা কি ঋষিতুল্য হবে? তার ব্যক্তিগত জীবনে কামনা-বাসনার কি কোন মূল্য নেই? ঋষিতুল্য কথাটা কেমন বেমানান ঠেকে নিজেরই। বেশিরভাগ ঋষি মুনিদের যৌন আচরণ ধোঁয়াশায় পরিপূর্ণ। অপূর্ণতায় ভারে তারা কখনও সমকামী কখনও ধর্ষকামী। কিন্তু মোহিত তার জীবনাচরণে কেন এমন হবে। সদ্য বিবাহিত সুন্দরী স্ত্রী, মানুষ হিসেবেও রত্না সৎ কর্মনিষ্ঠ। বাতাসীর সঙ্গে এমন আচরণ মোহিত কেন করবে! রত্নার সঙ্গে মোহিতের সম্পর্কের বিন্যাস নিশ্চয়ই মন্দ। রত্না এতদিনে নিশ্চয় ধরে ফেলেছে মোহিতের ব্যক্তিগত অসৎতা যা তার রাজনৈতিক জীবনে প্রভাব ফেলছে। না হলে কাঁচা প্রেম কর্পূরের মতো উবে গেল কি করে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে মনীষ। ঘরে রিক্তা, দিনের কাজ সমাপন করে দূরদর্শনে আশ্রয় দিয়েছে। ঝোলা ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে পরিশ্রান্ত মনীষ চান ঘরে ঢুকে পড়ে। রিক্তার চোখে মনীষের আচরনের অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে যায়। রিক্তা মনীষ কে চেনে। অযাচিত প্রশ্নের সামনে সে মনীষ কে ফেলতে চায় না। মনীষ ম্যারাথন রেসের ঘোড়া, সে নিজের ছন্দে দৌড়াতে জানে। প্রয়োজন হলে সে ঠিক রিক্তার সঙ্গে পরামর্শ করবে। তবু মন মানেনা। দূরদর্শনের অনুষ্ঠান থেকে রিক্তার মন সরে গেছে। বাথরুমের দরজার বাইরে এসে সে হাঁক দেয়, কি গো চা বসাই। অন্যদিন হলে রিক্তা অনুমতি চাইত না। মুখোমুখি বসে চায়ের আসর ওদের কাছে ভাব বিনিময়ের ক্ষণ। মনীষ ঘরে সময় মত ফিরলে একটা দিনও এর অন্যথা হত না। মনীষের উত্তর না পেয়ে গলা নামিয়ে রিক্তা ফের জিজ্ঞেস করে। এবার উত্তর আসে, আজ আর চা খাব না খুব খিদে পেয়েছে খেতে দাও। রিক্তা খাবার সাজাতে রান্না ঘরে ঢোকে। মনীষ চান ঘর থেকে বেরিয়ে এলোমেলো অবস্থায় খাবার টেবিলে বসে পড়ে। রিক্তার মনে অন্য ক্ষিধে বাসা বেঁধে আছে। খুব তাড়াতাড়ি গরম খাবার নিয়ে হাজির হয় সে। খাবার পরিবেশনের করে হত্যে দিয়ে বসে থাকে রিক্তা। সে আশা করে মনীষ তার তৃষ্ণা মেটাবে। গরম ছোলার ডাল দিয়ে রুটি খেতে মনীষ খুব ভালোবাসে সঙ্গে পিঁয়াজ আর লঙ্কা হলে তো কথাই নেই। প্রতিবেশীর বাগানে সিলেটি লঙ্কা বড় হয়েছে। ওরা নার্সারি থেকে এনে বাগানে লাগিয়ে ছিল। প্রথম ফলনের ভাগ এসেছে রিক্তার ঘরে। লঙ্কায় বেহিসাবি কামড় দেয় মনীষ। অচেনা গন্ধের বুনো লঙ্কার ফিরতি কামড়ে বেহাল অবস্থা মনীষের। চোখে জলের প্রবল ধারা। ঘামে ভিজে উঠেছে মুখমণ্ডল সঙ্গে কাশির দমক বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। রিক্তা ক্রমাগত মনীষের পিঠে ঘুষি মারতে থাকে। মনীষ হাত নাড়িয়ে থামতে বলে রিক্তাকে। হাতের ইশারায় জলের যোগান চায় সে। খেতে খেতে জল খাওয়ার অভ্যাস মনীষের একদম নেই। তাই হাঁকপাঁক করে জল আনতে ছোটে রিক্তা। জল আসার আগেই স্তিমিত হয়ে আসে মনীষের শ্বাসকষ্ট। কিন্তু জিভের জ্বলুনি কিছুতেই কমছে না। অর্ধভুক্ত খাবার ফেলে রেখে বয়াম থেকে এক চামুচ চিনি মুখে ফেলে দেয় মনীষ। তবু জ্বলুনি কমার কোনো লক্ষণ নেই। রিক্তা মনীষ কে খাবারের জন্য পীড়াপীড়ি করে না। আজ অবধি মনীষ কোনদিন পাতে অভুক্ত খাবার ফেলে উঠে যায় নি। রিক্তা মনীষের প্রয়োজন বুঝে চটজলদি বিছানা করে ফেলে। তৃষ্ণা মেটেনা রিক্তার, শুধু চাতকের মত নিষ্ফল চেয়ে থাকে সে।
শারীরিক ভাবে পরিশ্রান্ত মনীষের রাতে ঘুমের ওষুধের প্রয়োজন হয় না। অলস দিনযাপন বা মানসিক টানাপোড়েন থাকলে তবেই মনীষ ঘুমের বড়ি খায়। সেই হিসেবে আজ ঘুমের ওষুধ খাওয়ার দিন। রিক্তাকে অবাক করে মনীষ চোখ বুজে ফেলে। ঘুমের ওষুধ খাটেই রাখা থাকে। রিক্তা জিজ্ঞেস করে,আজ ঘুমের ওষুধ নেবে না? ঘুমের ভান করে পড়ে থাকা মনীষ কোন উত্তর করে না। মনে মনে বলে আজ নিজের সাথে অনেক বোঝাপড়া বাকি। রিক্তা স্ট্রিপ থেকে ওষুধ বার করে মনীষের দুই গালে দুই আঙুলের চাপ দেয়। মনীষ হাঁ করে ফেলে। সেই সুযোগে ওষুধ আর জল গলায় ঢেলে দেয় রিক্তা। বিরক্ত হলেও মনীষ কোন কথা বলতে পারেনা। আজ অন্য কারো সাথে ওর কোন কথা নেই। ওষুধের আগ্রাসী আক্রমণ স্নায়ু বৈকল্যের কারন হয়ে ঘুম নামিয়ে আনে মনীষের চোখে। বিভাবরী জাগরণে কাটিয়ে দেবার মানসিক ইচ্ছা কি হেরে যাবে? আজ রাতে প্রতিজ্ঞা ছিল এসপার-ওসপার করার। আঃ ঘুমে চোখ জুড়ে আসছে। প্রাণপণেমনীষ সরিয়ে দিতে চাইছে ঘুমের আবেশ। আধো তন্দ্রায়, অবচেতনে স্বপ্নেরা ভিড় করে আসে। জীবন বড়ই অদ্ভুত ভাববো বলে ভাবতে বসলে ভাবা হয় না। অথচ কোন অসতর্ক অচেতন মুহূর্তে ভিড় করে আসে অচেনা বাস্তবেরা। দোতলায় ঠাকুরদার আমলের দেওয়াল ঘড়ি লাগানো। নিশুতি রাত একলা জেগে বসে ঘড়িতে ঢং ঢং বারোটার ঘন্টা বাজিয়ে যাচ্ছে। লাল ডিম আলোর আবহে হাজির হয়েছেন এক অচেনা মানুষ। পরনে তার কোর্ট মাথায় টুপি। ঘরের ছোট শোকেসের ওপর দু কনুই দুই পাশে রেখে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। দেখে মনে হয় তিনি অবাঙ্গালী অথচ পরিষ্কার বাংলায় তিনি বলছেন, ওরে পাগল, মন কি বাত শোন। এই শেষ সুযোগ। গর্বাচভের বাঁশি শুনে আর কাজ নাই একথা বলার জন্য আর কেউ বেঁচে থাকবে না। পূর্ব ইউরোপ ধ্বংসের মুখে। অবচেতনে উত্তর করে মনীষ, আপনি কে, আপনি এখানে কী করছেন? একটু থেমে গিয়ে মনীষ আবার বলে, আপনি কি দন্ডেকর সাহেব? এইতো, ঠিক ধরেছিস? দিকে দিকে বাদ্যি বাজছে শুনেছিস নিশ্চয়। রবি ঠাকুর লিখেছিলেন সেই সুললিত গান- বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছ কেমনে দেব ফাঁকি,মনে পড়ছে? কেউই অন্তর্জালের বাইরে থাকতে পারবেনা। মনীষ বলে,ঠিক বুঝলাম না। ভ্যানতারা করোনা বাবা, তুমি তো এত বোকা নও। সকলি তোমারি ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী...,না এখন থাক এসব বরং সরাসরি কাজের কথায় আসি। সমাজবাদের নাম করে দেশে দেশে যা হল পরিণতিতে তা আদর্শের গর্ভস্রাব। এখন বিশ্বায়নের ঢেউয়ে পৃথিবী মাতোয়ারা। আমাদের দেশে কিন্তু নবতম আঙ্গিকে পুঁজিবাদ দেশীয় শিল্পের দফারফা করবে। ব্রিটিশরা দেশ দখল করে যা করেছিল। সমাজবাদ ফসিল হয়ে যাবে যদি না নতুন উদ্যোগ জেগে ওঠে। ভয় পাস না। অভিমুন্য কে মনে রাখ। এই ধরাধামে যে জন্ম নিয়েছিল নিজেকে উৎসর্গ করে সত্য প্রতিষ্ঠা করতে। “জন্মিলে মরিতে হবে জানে তো সবাই /তবু মরণে মরণে জেন ফারাক আছে ভাই/সব মরণ নয় সমান”। কোটি কোটি হাত কর্মহীন ঘুরে বেড়াবে দেশময়, বুঝলে কিছু? মনীষে হাত কচলে বলে, একটু যদি বলেন কিভাবে? শালা,লেনিন গান্ধী এঁদের কে বলে দিয়েছিল? অন্তরে বাসনার অন্ধকার উনি পৃথিবীর বাতি জ্বালাবেন। লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে মনীষ। দু হাত কচলে সে বলে,তবু যদি ধরিয়ে দেন। মনীষের কথায় ছায়ামূর্তি বলে, দখল নাও কারখানায় বেঁধে রাখতে চেষ্টা করো দক্ষ শ্রমিক এবং হিসাব বাবুদের। শতক শেষের বাদ্যি বাজছে। সমাজবাদের ভাবনা শতাব্দী সাথে তাল মিলিয়ে ফসিল হয়ে যাবে যদি না বাঁধতে পার। আমি চললাম। অশরীরী আত্মা ঘরের চৌহদ্দি ছেড়ে মিলিয়ে যায়। মনীষের স্বপ্ন কিন্তু সচল থেকে যায়। আধো জাগরণে রাজপ্রাসাদে রাজশয্যায় নারীপুরুষ জোড়ে আবির্ভূত হন। রমণ আকাঙ্ক্ষায় অনাগ্রহী উক্ত বীরপুরুষ স্ত্রীর শরীরী প্রেম থেকে বিযুক্ত করতে চাইছেন নিজেকে। নারী কহে, বীরশ্রেষ্ঠ, আপনি রণক্ষেত্রের মুন্সিয়ানায় আমাকে ছলনা করে চলেন নিত্যদিন। আমার গর্ভে শৌর্যে-বীর্যে অর্জুনসম বীরশ্রেষ্ঠ জন্ম নিক,আমার এই আকাঙ্খা সত্যিই কি আপনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন? আপনার অমিত প্রেম এবং একইসাথে বিরহ দিয়ে শরীরী আকাঙ্ক্ষা তাড়িত আমাকে আপনি বিষণ্ণ করে তুলছেন, নরশ্রেষ্ঠ। আমি যে আপনার ঔরসজাত সন্তান গর্ভে ধারণ করতে উন্মুখ। সুভদ্রা বিলাসী, সখা কৃষ্ণর ভবিষ্যৎ বাণী মুহূর্তে মনে করেন। নিমিলিত চক্ষে হতাশ অর্জুন ভাবে হায় প্রিয়া তুমি যদি জানতে তোমার গর্ভের সন্তান এলে তার আয়ু লেখা থাকবে। আবার একই সাথে তোমার গর্ভে সন্তান আসা নির্দিষ্ট হয়ে আছে। আমি ছলাকলায় অবশ্যম্ভাবী কে এড়িয়ে চলতে বীজ বপন এড়িয়ে চলি। তুমি জানো না আমি রমণে রমণীয় আনন্দ অনুভব করিনা। আমার সারা শরীর জুড়ে ব্যথা কেঁদে মরে। শুধু সন্দিগ্ধ তোমাকে এড়িয়ে চলতে আমি অভিনয় করে চলি নিত্যদিন। নিতান্ত অভ্যাস বশত চিন্তার সমিধ ভারে কখন যে নরশ্রেষ্ঠ রমণলিপ্ত হয়েছেন এবং মুহূর্তের বেখেয়ালে সর্বশক্তিমানের ইচ্ছায় সুভদ্রার জরায়ুতে ঔরস সঞ্চালন করে ফেলেছেন তা নিজেরই অগোচরে রয়ে যায়। প্রোথিত হয় দুর্ভাগ্যের বীজ দীর্ঘ লালিত আকাঙ্ক্ষার উদযাপনে।
সময়ে সুভদ্রা টের পায় তার জঠোরে লম্ফঝম্প বেড়ে চলেছে। এক প্রাণচঞ্চল পুত্র সন্তান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শরীরজুড়ে। গল্পে লালিত ভ্রুণ যে পুত্র সন্তান এমন বিশ্বাসের কথা বিভিন্ন সময়ে কামাতুর অর্জুনের কাছ থেকে সুভদ্রা জেনেছে। ঘটনা যখন ঘটেই গেছে তখন, অর্জুন প্রেমের আতিশয্যে সুভদ্রাকে মোহিত করে রাখে ভিন্নধর্মী গল্পে। স্বামী সোহাগে উৎফুল্ল সুভদ্রার দিন বয়ে চলে। জঠরে বীরশ্রেষ্ঠ অথচ কী আশ্চর্য, অর্জুন যখন যুদ্ধর কৌশলগত দিক ব্যাখ্যা করে চলে তখন সুভদ্রা অনাগ্রহী, নিদ্রাচ্ছন্ন। স্বর্গের দেবতা চন্দ্রের সন্তান অবতার হয়ে সুভদ্রার গর্ভে অভিমুন্য রূপে ভূমিষ্ঠ হবে,এই সত্য কৃষ্ণ অর্জুন ব্যতীত আর কেউ জানে না। সুভদ্রা যে প্রাণাধিক পুত্রের মৃত্যুর কারণ হবে অবোধ মাতা সুভদ্রা যদি তা জানতো! নিয়তি কেন বাধ্যতে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হবে ন্যায় জয়লাভ করবে। পরিজন হত্যায় সমর বিমুখ পান্ডবদের যুদ্ধে ফেরাতে সুভদ্রার দুর্ভাগ্য লেখা হয়েছিল। গর্ভে বেড়ে ওঠা প্রাণচঞ্চল ভ্রুণ মানুষের আকৃতি পেতে থাকে দ্রুত। চন্দ্রের ইচ্ছায় তার মস্তিষ্ক দ্রুত পরিপক্কতা অর্জন করছে। মাতৃগর্ভ থেকে অভিমন্যু সুজলাং সুফলাং প্রকৃতি দেখতে পায়। পিতার শৌর্যবীর্যের রোমাঞ্চকর গল্প পিতামাতার প্রেম আলাপের ফাঁকে শুনতে থাকে সে। ক্রমশ এগিয়ে আসে সেই দিন যেদিন অর্জুন চক্রব্যূহে প্রবেশের কৌশল সুভদ্রা কে জানাবে। অর্জুন ব্যতীত ধরাধামে কোন ব্যক্তি নেই যিনি চক্রব্যূহ ভেঙ্গে প্রবেশ করতে পারেন। সুভদ্রা যুদ্ধের কূটকচালির গল্পের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিদ্রাদেবীর করুণায় আচ্ছন্ন নিমীলিত আঁখি সুভদ্রাকে পারিজাতের মত সুন্দর লাগছে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গান্ডীবধারী স্তব্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে মাতৃজঠরে কি ঘটে চলেছে কেউ খবর রাখে নি। অভিমন্যুর মাতৃজঠর থেকে মাতৃদেবী কে জাগিয়ে রাখার সম্ভাব্য সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়। নিজের অজান্তে সুভদ্রা অভিমন্যুর চক্রব্যূহ ভেঙে বেরিয়ে আসার শিক্ষায় বাধ সাধে।
স্বপ্নের রথ মুহূর্তে উড়ান দেয় কুরুক্ষেত্রের ময়দানে। যেখানে বালক যোদ্ধা অবলীলায় পেরিয়ে যাচ্ছে বীরপুঙ্গবদের বেষ্টনী। অবোধ বালকের চক্রব্যুহ থেকে বেরিয়ে আসার শিক্ষা জানা নেই। সামনে বিভীষণ অস্ত্রধারীদের সমাগম। দ্রোণ দুর্যোধন দুঃশাসন জয়দ্রথ। ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে ওঠে মনীষ, অভিমুন্য তোমার পেছনে স্বয়ং যম শল্য। ওরা যুদ্ধের কোন নিয়ম মানছে না সাবধান। গোঙানীর শব্দে ঘুম ভেঙে যায় রিক্তার। মনীষের মাথায় হাত বোলাতে থাকে সে। মনীষ নিদ্রাদেবীর আহবানে ততক্ষনে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রিক্তা ভাবে মরতে কেন যে মনীষ কে সে ঠেলে দিল এ যূগের কুরুক্ষেত্রে। অবচেতনের তরলতা ঘুমের মাঝে সতত প্রবাহমান। স্বপ্ন ফিরে ফিরে আসে। যুদ্ধের নিয়ম ভেঙে বীরপুঙ্গব শল্য পিছন থেকে আক্রমণ করে অভিমুন্যর দুর্জয় ধনুক ভেঙে ফেলেছে। অসহায় নিরস্ত্র বীর অভিমন্যু, সম্মানে গুরু আত্মীয়স্বজনের কাছে আত্মসমর্পণ করে না। জয়দ্রথর তুণ এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় অভিমন্যুর বক্ষদেশ। কুরুক্ষেত্রের ময়দান ছেড়ে ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্ন উড়ান দেয় পুরানো কক্ষে যেখানে চাদর গায়ে অন্ধকার মেখে দন্ডকার সাহেবের পুনরাবির্ভাব সচকিত করে মনীষ কে। আকাশবাণীর মতো ভেসে আসে কঠিন কণ্ঠস্বর, বোঝা গেল? যুদ্ধজয়ী অভিমুন্যর বীরত্ত্ব যথেষ্ট নয় প্রয়োজন ক্ষুরধার বুদ্ধির আর...। আর কী?, সন্ত্রস্ত মনীষ জিগেস করে। শিখতে হবে কৃষ্ণের কূটবুদ্ধি। কৃষ্ণের মতো খচ্চর না থাকলে মহাভারতের যুদ্ধে পাণ্ডবদের বিজয়ী হওয়া সম্ভব ছিল না। পর্দা সরে যায় কর্পূরের মত উবে যান দন্ডেকর সাহেব। চিৎকার করে মনীষ স্বপ্নের মাঝে বলছে,, আমিও তো অভিমন্যুর মত অর্ধ শিক্ষিত হয়ে রইলাম। কৃপা করুন পথ দেখান। ঘুমের ঘোরে ধড়ফড় করে উঠে বসে মনীষ। রিক্তার আলিঙ্গনে থেমে আসে চঞ্চল বুকের আলোড়ন। বাকি রাতটা বাক্যহীন নির্ঘুম কেটে যায়।
একত্রিশ
ঘামের জলে নৌকো চলা বন্ধ কল
পাঁচ
ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়েছে বি.আই.এফ.আর এ প্রতিনিধিত্ব করার দিন। সাতাশির আগে থেকে থেকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে রেজিস্টার্ড ইউনিয়নগুলো। মিটিং এর ফলাফল শ্রমিকদের জানানোর ঔচিত্যর কথা তারা কখনও অনুভব করেনি। সিটু আই এন টি ইউ সির মতো রেস্ত ত্রিদিবদের পকেটে নেই। দিল্লি যাওয়ার ক্ষমতা শ্রমিক সাধারণের নেই। প্রতিষ্ঠিত সংগঠনগুলো অতীতে এ নিয়ে টীকাটিপ্পনী কেটেছে । শহর থেকে বুদ্ধিজীবীদের ঢল নামার কারনে এখন আর জোর দিয়ে এই কথা ওরা বলতে পারছে না। তোড়জোড় চলছে সব পক্ষের। বাতাসী ভাবে কেন যে মরতে এই আন্দোলনের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ছিল। বাতাসী কি সবার মাঝে অর্ক কে চিনতে চেয়েছিল? বাতাসীর মনে সর্বক্ষণ একটা কাঁটা খচখচ করে সে এই মাটিতে পা না দিলে রত্না মোহিতের সম্পর্কটা হয়তো টিকে যেত। অর্ক বাতাসীকে বোঝায় এ বরং ভালোই হল, এমন অসৎ মানুষকে চিনতে দেরি হলে রত্নার অধিক ক্ষতি হতো। মুহুর্তে বিদ্যুৎ খেলে যায় বাতাসীর মনে অর্কও কি এমন...? বাবার কথা মনে পড়ে যায় তার। চকিতে সে পালাতে চায় ভাবনা স্রোত সাঁতরে কিন্তু প্রতিকুলে সাঁতরানো কষ্টসাধ্য। অর্ক নিশ্চিত দিল্লি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে কোন মহিলা সদস্যা গেলে রত্নারই যাওয়া উচিত। রত্না গেলে আমিও যাব। অর্ক কে বললে সে কি উল্টো ভাববে। সাত-পাঁচ ভেবে বাতাসী অর্ক কে জিজ্ঞেস করে ফেলে, তুমি বি আই এফ আরে না গেলেই নয়? অর্ক জানায়, তুমি কি চাও আমি না যাই? আমার যাওয়ার ইচ্ছে ষোলোয়ানা আমি এও জানি আমি না গেলে আন্দোলনের কোন ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। আমি গেলে সংগঠনের অর্থনৈতিক সুবিধা হবে। এমন চলমান আন্দোলনের অভিজ্ঞতা লাভ করার সম্ভাবনা হয়ত আর জীবনে আসবেনা। এখন তুমি অনুমতি না দিলে যাব না। যেতে না পারার কষ্ট বুকে চেপে বাতাসী বলে,ঠিক আছে তাহলে হুটহাট বেড়াতে যাওয়ার দুয়ারে খিল পড়ল। আর দেখো, রত্না যাবে তুমি আবার…। অর্ক সহর্ষে বাতাসীর একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে আদর করতে থাকে।
বি আই এফ আরে স্বেচ্ছায় যেতে চাওয়া মানুষের অভাব আছে। প্রথম কারন অর্থনৈতিক। দ্বিতীয় কারন প্রতিনিধিত্ব করার সাহস। সংগঠন মোহিতকে সুযোগ দেবে না আর কারখানার বাইরের কেউ প্রতিনিধিত্ব করতেও পারবে না। মুজিব,ত্রিদিব দু পায়ে খাড়া। আরিফকে মুজিব রাজি করিয়েছে। আরিফ ঠোঁটকাটা সে বলে,গাটের কড়ি খরচা করে সে যেতে পারবে না। অর্ক জানায় সে যেতে রাজি সে আরিফের খরচা বহন করতে পারবে। ত্রিদিবের সরকারি কর্মী তার অসুবিধে নেই। বাকি খরচ যোগাবে সমবায়। মুজিব চায় মনীষদা চলুক একান্ত যদি সম্ভব না হয় তাহলে শুভঙ্কর বাবু গেলে ভালো হবে। মুজিবের এই চাওয়ায় বুদ্ধিজীবী মহল প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করে। একে একে সবাই জানায় এমন সিদ্ধান্ত করা উচিত হবে না। এই আন্দোলনের নেতা শ্রমিক জনগণ তারাই প্রতিনিধিত্ব করুক। মনীষও নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ত্রিদিব বলে, ঠিক আছে আমি দেখছি। যারা যেতে আগ্রহী বাকিটা তাদের মিটিংয়ে আলোচিত হবে।
ট্রেনে তুলতে এসেছিল মিলের কয়জন। বাতাসী নিজে যেতে না পারায় ক্ষুব্দ তাই প্লাটফর্মে আসেনি। শুভঙ্করবাবু প্লাটফর্মে এসেছেন। ত্রিদিব বলে,দাদা, কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাবো। শুভঙ্কর বলে,সবাই কান খুলে শুনে নিন, শ্রমিকরা ফেলনা নয়। যাদের শ্রমে চলছে সারা পৃথিবী তারা অলৌকিক কান্ড ঘটাতে পারে। আপনারা শুধু মনে রাখবেন এই কথাটা। নাগভূষণ নাক গলিয়ে বলে ফেলেন , সে আর বলতে। ফিরে তাকায় সক্কলে।শুভঙ্কর বলে,আপনি যাচ্ছেন! আমি আস্বস্ত হলাম। ট্রেন ছেড়ে দেয়।
নাগভূষণ বাবু বেলঘড়িয়া জুট মিলের শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক। লেখাপড়া জানা মানুষ। যিনি শ্রম সহযোগে শ্রমিকের দিনগত লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন পাশে থেকে । নাগভূষণ বাপ ঠাকুরদার দেওয়া পদবী ব্যবহার করেন না। নাম শুনে অর্ক ভেবেছিল দক্ষিণের কোন মানুষ হবেন। সেই সময় দক্ষিণী সিনেমায় হিরোদের এমন সব নাম ছিল। ট্রেনে অন্যদের সঙ্গে ওঁর প্রথম পরিচয়। উনি বেলঘড়িয়া মিলের প্রতিনিধি হয়ে বিয়াইএফারে যাচ্ছেন। কাকতালীয় ভাবে যোগাযোগ হয়ে যাওয়ায় ত্রিদিব আনন্দে আত্মহারা।সে লাফিয়ে উঠেছে। নাগভুষন ত্রিদিবের পূর্ব পরিচিত। ভাব বিনিময়ে সময় নষ্ট না করে ত্রিদিব সরাসরি মিলের বিষয়ে চলে আসে।ভূষণবাবুও ঢুকে পড়ে আলোচনায়। কিছুক্ষণের মধ্য অর্ক বুঝতে পারে নাগ ভূষণ সত্যি সত্যিই রিয়েল লাইফ হিরো। বাংলার ধুঁকতে থাকা দুই মিলের নিদান বের হবে বোর্ড অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইনান্সিয়াল রিকনস্ট্রাকশনের ঝোলা থেকে। যদিও প্রায় একশো শতাংশ ক্ষেত্রে মালিকের কথা শুনে বোর্ড কারখানাকে ডকে তুলে দেয়।
লম্বা সময় সফর করে অর্ক বুঝতে পারে সবার অভিমত। বিশেষ করে ভূষণদার অতীত জীবনের গল্প যা আজ ওকে নাগভূষণ হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। অর্ককেও জানাতে হয় কেমন করে কিভাবে বাউরিয়া মিলের ঝঞ্ঝাটে সে সামিল হলো। ত্রিদিব বলে, অর্ক শখে এসে জড়িয়েছে। প্রথম প্রথম একটু হলেও আমি দূর থেকে মিশেছি এখন কিন্তু আমরা হলায় গলায়। বিভিন্ন গল্পের মধ্যে বারবার মিল এসে ঢুকে পড়ে। বিশেষ করে মুজিব অন্য কোনো আলোচনায় সঙ্গ দিতে চায় না। বারবার সে মিলের আলোচনা ঢুকে পড়তে চায়। মুজিব বলে,পৌঁছানোর পরের পরেরদিন মোলাকাত। আমাদের আশু কর্তব্যগুলো ঠিক করে নিতে হবে। মুজিবের এমন কথায় ভূষণ বলে, তোমাদের ইউনিয়নের একটা নাম ঠিক করে রাতারাতি প্যাড ছাপাতে হবে। ত্রিদিব বলে, মুজিব সেই ইউনিয়নের সেক্রেটারি হবে। মুজিব বাদে আরিফ একমাত্র উপস্থিত মিল কর্মী,সে ভেটো দেয়। ভূষণ দা বলেন,এই ফোরামে খোলাখুলি তোমরা রেকগনাইজড ট্রেড ইউনিয়নগুলোর চরিত্র জানতে পারবে। আমাদের চেনা দুঃখ গুলো নিয়ে খেলতে খেলতে ফোরামের নাট্যমঞ্চে ফোঁড়ে মালিকের গদগদ ভাব এবার তোমাদের নজরে আসবে যা কাজে লাগবে ভবিষ্যতে। মুজিব জানতে চায় আমাদের ইউনিয়নের আইনি বৈধতা নেই ফোরাম আমাদের কথা শুনবে কেন? ত্রিদিব জানায় আমাদের সঙ্গে কত শ্রমিক আছে তাদের টিপসই নিয়ে এসেছি এও ভূষণদার পূরানো অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে কুড়িয়ে আনা। ভুষন বলে,তুই মনে রেখেছিলি? ত্রিদিব হেসে উত্তর করে, তবেই না চেলা। বাবা, গুরু মেলে লাখ লাখ। সবাই একচোট হেসে নেয়। ট্রেনে ফেরিওয়ালা উঠেছে পেঁড়া নিয়ে। ভূষণদার পকেটে পয়সা নেই অথচ মনে পেঁড়া খাওয়ার শখ। ওকে উসখুস করতে দেখে অর্ক কিনে ফেলে কেজিখানেক পেঁড়া। মোগলসরাই প্ল্যাটফর্ম থেকেও হাবিজাবি পটেটো চিপস কলা যা পেয়েছে কম দামে কিনে ফেলেছেন ভূষণ। অর্ক বলে,দুপুরে মিল খাবেন আলতু-ফালতু খেলে খিদে মরে যাবে যে। ভুষণ দা হেসে বলেন, ধুর, খেতে অনেক টাকা লাগবে তারচেয়ে আলতু ফালতু খাবার খেয়ে খিদেটা মেরে ফেলো। শ্রমিকের ঘরে ভরপেট খাবার জুটছেনা আমাদের নিয়ম মেনে খাই খাই বাই কেন? আপাতত আমাদের কাজ মস্তিষ্কে শান দেওয়া। চুপ মেরে যায় সকলে। কথার ঝাঁজে হাঁচি পেলেও বুকটা কেমন চিনচিন করে ওঠে সবার। কেউ কিছু কথা বলছে না দেখে ভূষণ বলে,তোমরা খুব ঘাবড়ে গেছ দেখছি? আমাদের জীবনের সফল যাপন লুকিয়ে থাকুক শ্রমিকের কান্নায়। বৃহত্তর ক্ষেত্রের কথা জানিনা। আমাদের সহযোগী সাথী শ্রমিকদের মুক্তির ঠিকানা না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের শান্তি নেই। তারপর যদি সম্ভব হয়….।
নির্দিষ্ট দিনে কেস ওঠে,প্রথমে ডাক পড়ে আইনি সংগঠন গুলির। কর্তৃপক্ষ জানায় সবাইকে ঢুকতে দেয়া যাবে না। প্রত্যেক সংগঠনে দুজন করে প্রবেশ অধিকার পায়। মুজিব শ্রমিক প্রতিনিধি আর ত্রিদিব উপদেষ্টা। প্রথমে দলীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা গুঁফো অফিসার এবং পারিষদের সামনে হাজির হয় বীরদর্পে। হঠাৎ কি মনে করে গুঁফো অফিসার বাজোরিয়ার দিকে ঘুরে তাকায়। ফোঁড়ে বাজোরিয়া এখন মিল মালিক। ইংরেজ মালিক চলে যাবার পর ব্যবসায়ী মালিক জুট শিল্প দখল করেছিল। আংশিক ছিবড়ে হওয়ার পরে চুক্তিতে মিল ফোঁড়ের হাতে হস্তান্তরিত হয়। শিল্প হবে এই আকাঙ্ক্ষার সরকার ফোঁড়েদের তোল্লাই দেয়। জুট আকাশে তদবধি ফোঁড়েদের ঘুড়ি উড়ছে। কোর্ট লাটাই দেখতে চাইলে বাজোরিয়া দাঁত বার করা জীর্ণ লাটাই বার করে দেখায়। দুচার প্যাঁচ সুতো জড়ানো সেখানে। কোর্ট পকেট দেখতে চাইলে কোটের পকেটে উল্টে দেখায় বাজোরিয়া। ঝুলঝুল ঝুলুনি, কপর্দকশূন্য। হতাশ কোর্ট বলে, কোন ভরসায় চুক্তিতে কারখানা নিয়েছো? কারখানা চালাতে পারবেনা, শ্রমিককে খেতে দিতে পারবেনা। ফিনিশড গুডস বিক্রি করে পকেট ভরাবে আবার চাষীদেরও ঠকাবে, উত্তম নীতি। ইনিয়ে বিনিয়ে ইউনিয়নের দিকে ইঙ্গিত করে বাজোরিয়া বলে, এদের জিজ্ঞেস করুন আমার লাটাইয়ের খবর এনারা রাখেন। কোর্ট মুখ ঘুরিয়ে নিজস্ব শরীরী ব্যঞ্জনায় জিজ্ঞেস করে, কি আপনারা বাজোরিয়ার লুকানো লাটাইয়ের সুতোয় ঘুড়ি ওড়ান? ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা হতবুদ্ধি হয়ে ঘাড় নেড়ে, হ্যাঁ, বলে ফেলে। পরমুহুর্তে নিজেদের সামলে নিয়ে বলে,না হুজুর, বাজোরিয়াজীর প্রতিটি কথাই সত্য। জুটের বাজার ধূলায় মিশিয়ে দিয়েছে প্লাস্টিক। কোর্ট বলে,থাক, এ অর্ধসত্য সবার জানা। পেটকাটি মোমবাতি বগ্গা, চাঁদিয়াল আপনাদের আকাশে ঘুড়ির সংখ্যা কত? ইউনিয়নের নেতারা ঘাবড়ে যায় বুঝে উঠতে পারে না কি বলবে। সাহসী একজন মিনমিন করে বলে, আমাদের ইন্টিগ্রিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার আপনার কি আছে? কথা ঘুরিয়ে কোর্ট বলে, ইন্টিগ্রিটির প্রশ্ন নয়, আমরা জানতে চাই আপনাদের ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা কত? ব্যাস খেল খতম, ইউনিয়ন গুলো প্রমাণ দাখিল করতে পারেনা। ঠিক সেই সময় কথা কেড়ে নিয়ে ত্রিদিব বলে, হুজুর, এখন নব্বই শতাংশ কর্মী আমাদের সাথে আছে প্রমাণ দেব? কোর্টকে কোনো সুযোগ না দিয়ে সই টিপছাপ দেওয়া নথি টেবিলে রাখে ত্রিদিব। কোর্ট ত্রিদিবের দিকে তাকিয়ে জানতে চায় তার পরিচয়। বাকি দুই ইউনিয়ন বলে ত্রিদিব কারখানার কর্মী নয়। ওর অধিকার নেই এই মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করার। ত্রিদিব জানায়,আমি কারখানার নতুন ইউনিয়নের উপদেষ্টা। মুজিব সমর্থন জানায়। নতুন ইউনিয়নের নাম কি কোর্ট জানতে চায়। মুজিব বলে,এস এস.কে.এম,শ্রমিক সংঘটিত কৃষক মোর্চা। পরানের ডিজাইন করা নিশানের রঙে মাতোয়ারা প্যাড বেরিয়ে পড়ে ত্রিদিবের ঝোলা থেকে। দিল্লীতে বসে, ভূষণদার কথায় রাতারাতি ছাপানো হয়েছিল এই প্যাড। বাকিদের চক্ষু চড়কগাছ ওদের ধারণা ছিল দিল্লিতে অনাহুত শ্রমিকের ঘুড়ি উড়বেনা কোনদিন। কোনো উপায়ান্তর না দেখে আইনি ইউনিয়ন চ্যালেঞ্জ করে উপদেষ্টা ত্রিদিবের উপস্থিতির বৈধতা নিয়ে। ত্রিদিবকে বেরিয়ে যেতে হয় কোর্ট ঘর ছেড়ে। মুজিব দমে যাবার পাত্র নয়। ছেঁড়া ছেঁড়া ছবির কোলাজ মুজিবের মনে দোলা দিচ্ছে। মানুষের জমায়েত পকেট মিটিং গুলোতে মানুষের উল্লাস লড়াকু মেজাজ, মুজিব এক লহমায় স্মরণ করে নেয়। স্মরণ করে নেয় দৃপ্ত ভঙ্গিমায় বৃহত্তর মানুষকে সংগঠিত করায় মনীষী ছু মন্তর। প্রতিটি দিন চিঠি ফেরি করে বেড়ানোর ছলে ত্রিদিবের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অঞ্চলের মানুষকে জাগরিত করার প্রচেষ্টা। হাওড়া স্টেশনে শুভঙ্করদার প্রত্যাশা ব্যাকুল চাওয়া। স্বচ্ছল অর্ক কেনই বা সরকারি চাকরিতে নিজের ক্ষতিসাধন করে আন্দোলনে সাথ দেবে? বাঙলার মুখ হয়ে ওঠা তরুণ গায়ক সুজিত কেনই বা যৌথ রান্নাঘরের জন্য গান বেচবে!মুজিব বুঝে উঠতে পারেনা হঠাৎ কেন রত্না মোহিতের জীবনের বিষাদময় কাব্য ওকে জাপটে ধরছে। সংসার জীবনে রত্নার এই ত্যাগ ফের ওকে নাড়া দেয় আর ঠিক সেই মুহূর্তে ভূষণদার গানের ছলে বলা কথা মনে পড়ে যায় - এ সুযোগ পাবে না আর। মুজিব দৃপ্ত কণ্ঠে বলে ওঠে,বাজোরিয়া চুক্তি মালিক তার ধান্দা লুঠ করা, হ্যাঁ মিল লুঠ করা। ১৯৮৬ র কালা চুক্তির পর দিনে জনপ্রতি 11 টাকা কাটৌতি মেরেছে বাজোরিয়া। চুক্তি ছিল বেশ কয়েক কোটি টাকা ভিঁড়িয়ে সে মিলের কাজে গতি আনবে। ফিনিশড গুডস বিক্রির টাকা লাগিয়ে মিল চলবে নতুন উদ্যমে। কিন্তু মাল বিক্রির টাকা আত্মসাৎ করেছে সে এক পয়সা না লাগিয়ে। এমনকি শ্রমিকের কাটৌতির চার কোটি টাকা পকেটে ঢুকিয়েছে সে। ত্রিদিবকে কোর্টরুম থেকে বহিষ্কার করতে পেরে মৌজে ছিল গদ্দাররা। তারা আন্দাজ করতে পারেনি মিতভাষী মুজিব ফিল্মি কায়দায় নায়ক হয়ে উঠেবে। সবাই চুপ মেরে গেছে। নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে কোর্ট জানায়- প্রস্তাব জমা করুন তিন মাস সময় দিলাম। বাজোরিয়া কিছু বলতে গেলে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার বলেন, 'একদম চুপ, শ্রমিকের কাটৌতি মেরে এখন নাটক হচ্ছে।
ত্রিদিব রাতে ফোন করে মনীষ এবং শুভঙ্কর কে বিআইএফআরের সিদ্ধান্ত জানায়। কলকাতায় ফেরার পরদিন একটা বড় মিটিং করে জনতা জনার্দন কে জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে ত্রিদিব। শুভঙ্কর নেচে ওঠে। মনীষ কী ভাবল বোঝা গেল না কারন সে ভীষণ অন্তর্মুখী। রাতারাতি রংতুলিতে পোস্টার লেখা শুরু হয়ে যায়। লাল কালো রং মুষ্টিবদ্ধ হাতে আগামীর বার্তা। পাগলের মতো চেলা চামুন্ডাদের নিয়ে, 'সারারাত জেগে আঁকা লড়াকু ছবিতে', মত্ত পরান। রাত ভোর হলে মিল পাড়ায় সবার চোখে পড়ে অবাক শিল্প কীর্তি। একটা গাছ একটি কিশোরের স্বপ্ন, কাকলি কলতানে মুগ্ধ কিশোর শুধু চেয়ে থাকে। তার পাশে আরেকটি ছবি সমুদ্রতট নোঙরা প্লাস্টিক বোঝাই। এক একটা ঢেউ ভেঙে দিচ্ছে পলিমারের পাহাড়। পাহাড় গলে গলে সমুদ্রে নির্বাসিত হচ্ছে। অমরত্ত্বের বরদান করতে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এর প্রয়োজন নেই। মানুষের তৈরি বিজ্ঞানের অমরকীর্তি প্লাস্টিক পলিমার একদিন ধ্বংস করে দেবে প্রাণীজগৎ এবং তার সৃষ্টিকর্তাকে। বন্ধ সারি সারি জুট মিল, পাটের ক্ষেত ফাঁকা চাষির হুতাশ। কিশোরের স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। যোগ দেয় সে শ্রমিক মিছিলে। সাজিয়ে রাখা ছবিগুলো যেন ছোটগল্পের অবাক দৃশ্যকল্প।
ছবিগুলো অপার বিস্ময়ে দেখতে থাকে মিটিংয়ে উপস্থিত জনতা। মিটিং শুরু হওয়ার মুখে।
বত্রিশ
ঘামের জলে নৌকো চলে বন্ধ কল
ছয়
সুজাত মুখার্জির গানের ভক্ত অর্ক। সুজাত আজ আসবে গানে গানে মিটিং শুরু করতে। বিজয় উল্লাস সুজাতর গানে। মুগ্ধ হল বাউরিয়া শ্রমিক মেহনতী মানুষের জমায়েত। বেশ কিছুদিন আগে বিশেষ লক্ষে গলায় পোস্টার বেঁধে সুজাত রাইটার্স বিল্ডিংয়ের চারিধারে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর নজর কাটতে চায় সে। সে চায় মুখ্যমন্ত্রী বাজোরিয়া জুটমিলের অন্যায় অবিচার সম্পর্কে জানুক। মুখ্যমন্ত্রী জয়দ্রথ স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় কোন দিকে নজরে না করে হনহন করে হে়ঁটে অফিসে ঢুকে যান। সুজাতর অভিসন্ধি কিছুতে কাজে লাগেনা। ব্যর্থ সুজাতর মাথায় একদিন বদমাইশি বুদ্ধি ঝিলিক মারে। সে মুখ্যমন্ত্রী গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে উচ্চ কম্পাঙ্কে গান ধরে। মুখ্যমন্ত্রী বাধ্য হন সুজাতর দিকে দৃষ্টি দিতে। নিজের ভরবেগ শূন্য করে উনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। সুজাত আকাশের দিকে তাকিয়ে চোরা নজরে মুখ্যমন্ত্রী কে দেখতে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী মন দিয়ে পড়তে থাকেন পোস্টারে লেখা কথাগুলো- শ্রমিকের কারখানা শ্রমিক গড়বে। নিজের মনে বিড়বিড় করে মুখ্যমন্ত্রী কিছু বলেন। সঠিক সময় আন্দাজ করে সুজাত চকিতে মুখ্যমন্ত্রীর দিকে পিছন ফিরে ঘুরে দাঁড়ায়। তার পিঠে ঝুলছে একটি পোস্টার যেখানে লেখা-
ফোঁড়ে, মালিকের নয়
শ্রমিক মালিক হোক
মানুষ চায়।
ধীর স্থির মুখ্যমন্ত্রী চোখ বুলিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলেন, দেখতে হবে বুঝতে হবে বিষয়টা। সেদিন সুজাতর গানে অবিশ্বাস ছিল আজকের প্রত্যয়ে যা ভেসে গেছে। সুজাত আজ বিশ্বাস করে সরকারের আর কোনও গতি নেই। শ্রমিকের মিল আজকের লিখন। সুমনের কাছ থেকে ধার নিয়ে সুজাত বলে- হাল ছেড়না বন্ধু।
মুজিব যতটা স্বাচ্ছন্দে মানুষকে কাছে ডাকতে পারে মাইক হাতে সে ততটাই এলেবেলে। বড় জমায়েত, মিল কর্মচারী ছাড়াও এলাকার প্রভূত মানুষ হাজির হয়ে জমায়েতে অংশ নিয়েছে। মোহিতকে শেষের সারিতে দেখা যাচ্ছে। অর্ক এবং বাতাসীর সঙ্গে ভূষণ দা সামনের সারিতে। প্রথম সারির একটু ডাইনে মনীষ। ত্রিদীবকে মঞ্চে শলা করতে দেখা যায়। ডেকোরেটার জানিয়ে দিয়েছে আজ সব ফ্রি। অঞ্চলের মানুষ উৎসবের মেজাজে। পরানের আঁকা ছবির ওপর হামড়ে পড়েছে মানুষজন। ছবি দেখে মিটিংয়ে কি ঘটবে মানুষ তার আন্দাজ পেতে চাইছে। পরানের কর্ম বিরতি নেই। ও ইজেল সাজিয়ে চ্যালা চামুন্ডাদের নিয়ে এঁকে চলেছে। বিশাল এক একটা ইজেলে তিন চারজন শিল্পী রং ছড়াচ্ছে। নতুন নতুন ছবি ফুটে উঠছে। মুজিব মাইক ধরবে। ইলেকট্রিশিয়ান বন্ধু সুইচ অন করে ওয়ান টু থ্রি টেক বলে ষ্ট্যান্ড মাইকটা মুজিবের দিকে সরিয়ে আনলো। মুজিবের পা কাঁপছে। জায়গায় জায়গায় জটলা। জটলায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা আসন গ্রহণ করতে চাইছে না। মানুষের মধ্যে কাজ করছে যুদ্ধ জেতার অনুভূতি। জটলার মধ্যে থেকে একজনকে বলতে শোনা গেল মনীষবাবুর এক গাছার সমান নয় মুখ্যমন্ত্রী। সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। আড্ডায় ভাই বন্ধুদের যেভাবে ধমকে বলা যায় সেই ঢঙে মুজিব জটলায় সামিল মানুষদের আসন গ্রহণ করতে বলে। মাইক উন্মুখ হয়ে আছে মুজিবের সুললিত কথা আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দেবে বলে। জটলার হাসির রোল মুজিবের বর্ধিত কম্পাঙ্কে চাপা পড়ে যায়। মুজিব খেয়াল করেনি মাইক্রোফোনের সুইচ জেগে বসে আছে তাকে ধরতে। সে একটু হতভম্ব হয়ে গিয়ে তড়িঘড়ি কিছু বলতে গিয়ে তার চোখ আটক হয়ে পড়ে পরানের ছবিতে। গেট না একটা আস্ত তালা? পকেট গেট বন্ধ। মিলের পেছনে দিয়ে গঙ্গায় পাচার হওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে ঘামের বিনিময়ে তৈরি পাকা মাল সুতো জুট। মুজিবকে হতবাক দেখে সবাই সমস্বরে চিৎকার করে বলে, মুজিব দা মুজিব দা। মুজিবের শরীরে হঠাৎ শিহরণ জাগে সে চিৎকার করে বলে ওঠে, সাথী বন্ধু, আগামী দিনে কি হতে যাচ্ছে তা আপনারা পরাণের আঁকি-বুকি থেকে বুঝে নিন। যদি চান আমার গলায়ও শুনতে পারেন। আবার এক দফা চিৎকার আমরা মুজিব ভাইয়ের গলায় শুনতে চাই। মুজিব বলে যত শীঘ্র সম্ভব শ্রমিক জোটের নেতৃত্বে কারখানার দখল নেওয়া উচিত। বিআইএফআরের সংকেত আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি। কারখানা শ্রমিকের মালিকানাধীন হতে আইনত কোন বাঁধা নেই। মনীষদা এই সত্যই আমাদের বোঝাতে চেষ্টা করছিলেন। সম্ভবত উনি সঠিক সময়ের অপেক্ষায় উপোষী ছিলেন। আজ আমরা ওঁকে শুনব মাথা পেতে নেব ওঁর আদেশ। যদি ভালো করে পরানদার ছবিগুলি লক্ষ্য করেন আপনারাও বুঝতে পারবেন নিজেদের গন্তব্য। পরাণের নতুন ছবিতে তখন গেটের মাথায় লোক চড়ে বসার দৃশ্য। হাতুড়ি দিয়ে গেট ভাঙ্গার প্রচেষ্টার আবছায়া প্রতিকৃতি। স্টেজ থেকে ছবির প্রিয়দংশ দেখে মুজিবের শরীর টানটান হয়ে ওঠে। নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে সে ত্রিদিব কে মঞ্চে ডেকে মাইক হস্তান্তর করে। সুললিত বক্তব্যে ত্রিদিব জানিয়ে দেয় বি আই এফ আরের প্রস্তাব। সমবেত জনগণের কাছে ত্রিদিব প্রশ্ন তুলে দেয় জনগনই যখন চালক তখন তারাই জানাক আশু কর্তব্য। বাতাসী জীবনে প্রত্যক্ষ করেনি এমন ঘটনা। নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চেষ্টা না করে সে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। লজ্জা নয় কান্না উৎসব মুখরিত। মোহিত দাঁড়িয়ে ভাবছে নিজের বোকামির কথা। আজ স্টেজে তার দখল কায়েম হত। শুধুমাত্র হঠকারিতা আজ তাকে শেষ করে দিল। জনগণ চুপ মেরে গেছে। দীর্ঘকাল শুনতে থাকার অভ্যেস ভেঙে ফেলার ক্ষণ আজ দুয়ারে উপস্থিত। সার সত্য সকলকে বুঝতে হবে। গনগনে আঁচে হাওয়া না দিলে আগুন থিতিয়ে যাবে। হঠাৎ উঠে পড়ে ভূষন। বাজখাঁই গলায় স্লোগান দিতে থাকে- তোড় ডালো দুনিয়াদারি/কারখানা হামারা মাঙ্গ/তোড় ডালো বন্ধ কেওয়ারি/ দুনিয়া ক্যা মাজদুর এক সঙ্গ।
উত্তেজনার পারদ চড়চড় করে বাড়তে থাকে। সবার মুখে ছড়িয়ে পড়ে ছন্দে গাঁথা স্বতঃস্ফূর্ত মাঙ্গ। কখনো শ্লোগান থেকে ক্যানভাসে জন্ম নিচ্ছে ছবি। কখনো ক্যানভাসে রং তুলির বাহারে জন্ম নিচ্ছে আগুনে শ্লোগান।
আজকের আবেগ কোথাও বাঁধা পড়বে না। ভাকরা- নাঙ্গাল দিয়ে চেতনাহীন জড় কে বাঁধা যায়। প্রাণিত আগুনে নদী বিধ্বংসী সে ক্ষয়ক্ষতি কিছুরই আশঙ্কা করে না। মানুষ চেয়েছিল এমনটাই ঘটুক। ঠিক সময় ভুষনের শরীরী বিভঙ্গে বলা উত্তেজক শ্লোগান জনজোয়ারে বিধ্বংসী ঢেউ তুললো। মনীষ, কী করা উচিত ভেবে পাচ্ছে না। হটকারিতায় মনীষের বিশ্বাস নেই। সে তড়িঘড়ি স্টেজে উঠে হাতে মাইক ধরে। রণমুখী ঘোড়ার স্ফূর্তিতে মিল শ্রমিক ছুটেছে মিল গেটের দিকে। মনীষ মাইক হাতে বলে,এখনও সময় হয়নি। আপনারা শান্ত হন। মাইকের কথা কারও কানে পৌঁছায় না। পুলিশ দপ্তর এমন একটা আশঙ্কা করেছিল। মিটিং শুরু হওয়ার আগে থেকেই তারা সার সার সাদা গাড়ি নীরবে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল দুরে। উৎসাহি কেউ কেউ লাঠি হাতে টহল দিচ্ছিল রাস্তায়। পরান নটরাজের একটা ড্রয়িং ত্রিদিব আর মুজিবের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। আজ মুজিব আর ত্রিদিবই নেতা। নটরাজ, প্রলয় নৃত্যে পৃথিবীর মানুষকে অনুশাসনের শৃংখল মুক্তি ঘটাতে চাইছে। কেউ শুনুক না শুনুক অর্ক গেয়ে উঠেছে, 'এস মুক্ত করো প্রিয় মাতৃভূমি'। বাতাসী শ্রমিকদের সঙ্গে মিল গেটে পৌঁছে গেছে। মাইক হাতে একা মনীষ। সকলের সামনে অথচ অলক্ষে মোহিত বাতাসীর পাশে পৌঁছে গেল। বাতাসী খেয়াল করেনি। হাতে স্পর্শ পেয়ে বাতাসী ফিরে তাকিয়ে দেখে মোহিত তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। বাতাসীর অবাক চোখের বিস্ময় ছাপিয়ে মোহিত বলে, দেখলে তো সেদিন আমি ভুল ছিলাম না। সেই পথেই মানুষ হাঁটল কেবল আমি ব্রাত্য হয়ে গেলাম। বাতাসী বলে, ঠিক, শুধু বেঠিক ছিল আমার অনুমতি না নিয়ে আমাকে স্পর্শ করার ঔদ্ধত্য। আজও যেমন। আপনি একজন অসৎ মানুষ আপনার সর্বগ্রাসী লোভই তার প্রমান। সময়ের প্রয়োজনে গণ আন্দোলনে শামিল না হয়ে একজন মহিলার পেছনে ঘুরঘুর করছেন। আপনি একটা ক্লিব। স্বতঃস্ফূর্ত এই লড়াইয়ের প্রতি আপনার কোন ভালোবাসা নেই। মোহিত বলে আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। পথের পাশে পড়ে থাকা আঁস্তাকুড় এড়িয়ে বাতাসী অর্কর দিকে এগিয়ে যায়। মিলগেট তখন ভুষণদার উচ্চারিত শ্লোগানে উদ্ভাসিত। মনীষ স্টেজে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মনীষ কি এমনটাই চেয়েছিল? নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় তার। ছন্দবদ্ধ স্লোগানের ধাক্কায় মিল গেট কাঁপছে। বেশ কয়েকজন শ্রমিক গেট টপকে দরজার নাট বল্টু খুলে ফেলেছে। শুধু তালার জোরে গেট কতক্ষণ টিকে থাকবে তা সময় বলবে। শ্রমিকের ঘামে তৈরি লৌহ কপাট টলমল করছে। ত্রিদিবকে ছটফট করতে দেখে ইলেকট্রিশিয়ান হ্যান্ড মাইক ত্রিদিবের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। মাইকের চোঙে ইলেকট্রিক কানেকশন নেই। এক ছুটে একটা স্পেয়ার ব্যাটারি খুলে আনে ইলেকট্রিশিয়ান। হঠাৎ ব্যাটারির যোগাযোগ পেয়ে ত্রিদিবের মাইক চিৎকার করে ওঠে- কেউ অনধিকার প্রবেশ করবেন না। মিল বাউরিয়া জুটমিল শ্রমিকের। বাজোরিয়া অন্যায় ভাবে মিল বন্ধ করে শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। শ্রমিক আজ এই মুহূর্ত থেকে মিলে নিজের অধিকার রাখবে। উপস্থিত সাথী, বন্ধুদের অনুরোধ করছি আমরা কেউ কারখানায় অনধিকার প্রবেশ করব না। মিল শ্রমিক নিজের দায়িত্ত্ব বুঝে নিক।
হঠাৎ মনীষ দেখে কালো কাঁচ ঢাকা একটা কালো গাড়ি এসে স্টেজের সামনে দাঁড়াল। কালো শুট প্যান্ট পরিহিত দুজন গাড়ি থেকে নেমে স্টেজে উঠে আসছে সঙ্গে গাড়ির চালক। স্টেজের এ পাশটা এক্কেবারে ফাঁকা, কাকপক্ষী নেই। চিৎকার চেঁচামেচিতে কেউ খেয়ালও করেনি গাড়ির কালো মানুষদের। হঠাৎই অর্কর চোখ চলে যায় সেই দিকে। অর্ক দেখে অজানা অচেনা দুই মানুষের সঙ্গে কথা বলছে তাদের প্রিয় নেতা মনীষবাবু। কৌতুহলি অর্ক স্টেজের দিকে হাঁটা দেয়। মনীষ তৎক্ষনাৎ এমপ্লিফায়েড উচ্চ নিনাদে সব্বাইকে মঞ্চের দিকে আসার আহ্বান জানাতে চায়। অ্যামপ্লিফায়ারে ব্যাটারি নেই। সরকারি লোক চিরটিকাল অকাজে প্রস্তুত থাকে। তড়িঘড়ি গাড়ির চালক নিজের হাতে থাকা হ্যান্ড মাইক চোঙ্গা সমেত মনীষের হাতে ধরিয়ে দেয়। মনীষ কথা শুরু করে, আপনারা কিছু ভাববেন না। কারখানা আজ অথবা কাল শ্রমিকের হাতে যাবেই। আলোচনার জন্য সরকার পক্ষ দূত পাঠিয়েছেন। নির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে দুয়ারে সরকার হাজির। ওনারা শ্রমিক কো-অপারেটিভ কে মান্যতা দিতে চান। সরকার অনুভূতিশীল তাই এই মুহূর্তে আইন ভেঙে কোন কাজ করা উচিত হবে না। আমি ওদের হাতে মাইক দিচ্ছি ওনারা সরকারের কথা শোনাবেন।
একটা দুটো করে লোক মিল গেট থেকে স্টেজের দিকে গুটি গুটি পায় হাঁটা দিচ্ছে। অর্ক আগেই এসেছে। বিরক্ত ভুষন দা বাঁধা দিতে চেষ্টা করেন। ত্রিদিব শুভঙ্কর সহ বাকি নেতৃত্ব ধীর পদক্ষেপে মঞ্চের দিকে হাঁটা শুরু করে দিয়েছে। মোহিতও জুটে গেছে। এই সুযোগ মোহিত মনীষের সঙ্গে একটা রফা করতে চায়। ত্রিদিব স্টেজে উঠে মাইক হাতে নিয়ে জমায়েতকে স্টেজের সামনে আসতে বলছে। ভোজবাজির মত পাল্টে গেছে আবহাওয়া। যারা মুখ্যমন্ত্রীর যোগ্যতা নিয়ে আলোচনারত ছিল তারা একে অপরের পিঠ চাপড়াচ্ছে। পরানের তুলি রংয়ের কৌটে ডুবে রয়েছে মাথা তুলতে পারছে না। সরকারি আমলারা পরানের সৃষ্টিশীলতায় জল ঢেলে দিয়েছে। জোলো আবহাওয়ায় সেঁকা পাঁপড় যেমন জনগণের অবস্থাও ঠিক সেরকম। বাতাসীর পাশে দাঁড়িয়ে ভূষণদা, অসহায়। শুভঙ্কর বুঝতে পারছে না কোনদিকে যাবে সে। মুজিবের মাথায় হাত। হঠাৎ লাফিয়ে উঠে মুজিব ভুষণদার কাছে ছুটে গিয়ে বলে, দাদা আপনি কিছু করুন। ততক্ষণে ঘোষক আমলারা সরকারি বক্তব্য শেষ করে গুটিগুটি পায়ে মঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাচ্ছে। মাইক মনীষের হাতে। সরকারি আশ্বাস বাণী মনীষের কন্ঠে আকাশ বাতাস বয়ে দূর দূরান্তে পৌঁছে যাচ্ছে।
তেত্রিশ
বাতাসীর বিয়ে
শুক্লাদি সমবায় কান্টিনের নিরুচ্চার কর্মী। সাত চড়ে রা কাড়েন না। উনি ভাবেন বেশী বলেন কম। জন্মসুত্রে পাওয়া ওষ্ঠ বিকৃতি শুক্লাদির স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণে প্রতিবন্ধক। ক্যান্টিনের কমরেডরা কেবল শুক্লাদির সঙ্গে অনায়াসে ভাব আদান প্রদান করতে পারত। সেই শুক্লাদি সবার সামনে ওষ্ঠের জড়তা ঝেড়ে ফেলে নিজের মনের কথা বলে ফেললেন। বিয়ে না করার কারন হিসেবে ইঙ্গবঙ্গ ভাষায় শুক্লাদি নিজেকে ডিফেক্টিভ মাল বলতেন। এই কায়দায় তিনি দাদাদের দায় থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। নিম্নবিত্ত পরিবার খরচের টেনশন থেকে মুক্তি পেয়েছিল। কোন একটা কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে শুক্লাদি এই দামাল এই ছেলেমেয়ে গুলোর সাথে যোগাযোগ করেছিল। শুরু হয়েছিল শুক্লার নতুন পথচলা। এরাও ওকে ভালোবাসত। এইভাবেই ওর অর্ক এবং বাতাসীর সাথে পরিচয়। যদিও ব্যস্ততার দরুন আগে খুব বেশি বাক্য বিনিময় করার ফুরসত মেলেনি ওদের। আজকের মত চলকে ওঠা কলসে আগে কোনদিন কপোত কপোতির তৃষ্ণা নিবারিত হয় নি। বাতাসী অর্ক জুড়ি হিসাবে শুক্লাদির মনে ধরেছিল। অনেকদিন ধরে শুক্লা ওদের বাঁধবার পথ খুঁজছিলেন। এই আশ্চর্য ধরায় অধরা থেকে যায় কতকিছু! মানুষের মনের আনাচে- কানাচে পড়ে থাকা মণিমুক্তর সন্ধান পাওয়া সত্যিই দুস্তর। শুক্লাদির মত আইবুড়ো মহিলা বাতাসীর বিয়ে দিতে কেন উদগ্রীব হবে তা অন্য লোকে কি করে বুঝবে? যেখানে বাতাসীই স্বয়ং অন্ধকারে! আজ চায়ের আসরে শুক্লাকে চনমন করতে দেখে ত্রিদিব শুক্লাদিকে পড়তে পেরেছিল। ত্রিদিব বুঝতে পারছিল শুক্লাদি বড়সড় কিছু একটা অঘটন ঘটাতে চান। ত্রিদিবের উপস্থিতিতে নিজের বিয়ে প্রসঙ্গে ঠিক একই আবহে দাদাদের কল্পিত ভয়ের হাঁড়ি ফাটিয়ে দিয়েছিল শুক্লাদি। ত্রিদিব খুঁচিয়ে দিয়ে বলে, দিদি, মনে হয় কিছু...। শুক্লা দি দেরি করে না। সবাইকে চমকে দিয়ে অর্ক বাতাসীর দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট উচ্চারণে স্পষ্ট বলেন, ঘোরা ঘোরা নিন্দা, বিয়ে। অর্ক কথার সারমর্ম বুঝতে না পেরে শুক্লাদির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ত্রিদিব সময় দেয়নি অর্কদের। বাতাসী মুচকি হেসে মাথা নিচু করার সাথে সাথে ত্রিদিব হুররে বলে চিৎকার করে ওঠে। বুঝে না বুঝে অনেকে ত্রিদিবের কথায় তাল দেয়। ত্রিদিব বলে হাতে তিন মাস সময় আছে। তোমরা বিয়ের আয়োজন কর। গোটা ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পেরে অর্ক বলে, আমাকে বলে কিছু হবে না। দেবীকে পূজা পাঠ চড়াও। আমার মনে হয় দেবী এখনো তুষ্ট হতে পারেননি। রত্না অতি উৎসাহে বলে, দেবা রাজি থাকলে দেবীর সাধ্য কি? কে যে কখনো অজান্তে আনমনে অন্যর জীবন বাঁধতে অনুঘটন প্রক্রিয়ায় সামিল হয় কেউ বলতে পারে না। এই প্রথম শুক্লাদি কিছু বললেন। অর্ক বাতাসী উভয়েই অতীতে কোনদিন শুক্লাদির দিকে ফিরেও তাকায়নি। অথচ সেই শুক্লা মনের খাঁচায় ওদের জন্য নিজস্ব ভাবনা পুষে রেখে ছিলেন। ভাবনার সেই অচিন পাখি আজ অর্ক আর বাডাসীকে খাঁচায় পুরতে অগ্রণী ভুমিকা নিল। রত্নার ভুমিকা কি একেবারেই নেই? বলা দুস্কর। ত্রিদিব কিছু বলতে গিয়ে দেখে শুক্লাদি বাতাসীর বুকে ঠাঁই পেয়েছে। আর একবার ত্রিদিব বিজয়ীর হুংকার ছেড়ে দক্ষিণ হস্ত আকাশে ছোঁড়ে।
অভয়, বীণা, অন্জলী এমনকি কেষ্টবাবু অবধি আনন্দে নেচে ওঠেন খবর শুনে। অন্জলী বলে, দুগ্গা দুগ্গা। কেষ্ট মুচকি হাসে ভাবটা এমন সব কিছুরই নির্দিষ্ট সমায় থাকে। বীণার আক্ষেপ যায় না। শুধু শুধু এতগুলো বছর নষ্ট করা। চিন্তাশীল অভয় বুঝে উঠতে পারে না হঠাৎ কি করে বাতাসী এমব সিদ্ধান্ত নিতে পারল। মেয়ের সিদ্ধান্তে তার অখুশি হওয়ার মত কোন কারন ছিল না। যদিও কোনো আলোচনা না করে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় একটু হলেও অস্বস্তি হচ্ছিল অভয়ের।
লেগে যায় বিয়ে। শুক্লা কোথাও যান না। তিনি এক গোছা রজনীগন্ধায় শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন। বিয়ের আসরে অর্ক ত্রিদিব কে বিআইএফআরের প্রপোজালের অগ্রগতি নিয়ে জিজ্ঞেস করলে, ত্রিদিব বলে, শুভঙ্কর দা এখনো কিছু জানান নি। রত্না কে আসতে দেখে ত্রিদিব কথা পাল্টিয়ে বলে, এখন তোমায় এইসব কথা ভাবতে হবে না। রত্নার উপস্থিতি খেয়াল না করে মুজিব ত্রিদিবকে বলে ফেলে, অর্ক কে মনীষদার কথা জানাওনি? সরকার পক্ষ কেমন নিত্য আলোচনায় মনীষদা কে ডেকে পাঠাচ্ছে! অর্ক অবাক বিস্ময় বলে, তাই? আশাবাদী ত্রিদিব বলে এবার একটা হেস্তনেস্ত হবেই। মুজিবকে অন্যমনস্ক দেখে অর্ক বলে, "নাই নাই ভয়...।" রত্না এতক্ষণ বাতাসীর সঙ্গে গল্পে মশগুল ছিল। হঠাৎ করে এদের আলোচনা শুনে সে বলে, তোমাদের গুনেঘাট নেই। অস্থানে এই সব আলোচনার প্রয়োজন কি? পাগলা জগাইয়ে পেয়েছে এদের! বাতাসী ভুষণদার কথা জিজ্ঞেস করলে, ত্রিদিব বলে, দাদা রাতে আসবেন।
বাতাসী অর্কর বিয়ে বলে কথা ভুষন দা না এলে হয়। ভুষন দা এসেছিলেন। খেয়েও ছিলেন পেট পুরে। নাছোড় অর্কর প্রশ্নে উনি হেঁয়ালি করে বলেন,এখনও আঁচানো হয় নি। আঁচাতে কতদিন কে জানে। এই কথা শুনে অল্প হলেও অর্ক কেমন ভেবলে যায়।
ফুলশয্যার রাত। দস্যি বাতাসীর মনের কোণে ঠেসে বোনা ছিল শত সহস্র স্বপ্নজাল। জীবন বড়ই অদ্ভুত কোথাও শুরু কোথায় শেষ কিছুই বোঝা যায় না। অথচ মধুর হয়ে যায় নিজস্ব চলায়। কৃষ্ণ বাবু ছেলের সংসারের আশায় দোতলার বিশাল ঘর বারান্দা বানিয়ে রেখেছিল। যেখান থেকে চোখ বাড়ালেই টলটলে দিঘির জল দেখা যায়। দক্ষিণা বাতাস তার শীতল পরশ দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে। এই নিরালায়, আজ ওরা প্রথম নয়। অর্ক আর বাতাসী এইখানটিতে বহুবার একান্তে হারিয়ে যেত। কিন্তু স্থানমাহাত্ম কোন এক অজানা কারণে বাতাসীকে অর্কর শরীরী আওতায় থেকেও বাধ্য করেনি ধরা দিতে। যদিও এ নিয়ে তার ছুতমার্গ ছিলো না। সম্ভবত ফুলশয্যার রাতের কথা ভেবেই সে তাকে তুলে রেখেছিল সকল ভাবনা। সে চেয়েছিল সেই রাতে উন্মোচিত আবিস্কৃত হোক অজানা অনেক কিছু। বাতাসী নিজেকে পরিকল্পনা মাফিক তৈরি রেখেছিল। কিভাবে কথা শুরু হবে। কে কথা শুরু করবে? সবটাই সিনেমা পরিচালকের মত খেরোর খাতায় লিখে লাল সুতোয় বাঁধা ছিলো। নিমন্ত্রিত অতিথিরা চলে গেলে অর্ক ঘরে ঢোকার প্রস্তুতি নেয়। মা অন্জলী বাতাসীকে ঘরে বসিয়ে এসেছে। তীর্থের কাকের মতো বাতাসী অপেক্ষমান। তর সইছেনা আর। সে নিজেকে দোষারোপ করতে থাকে কেন বিয়েয় মত দিতে সে এত দেরি করল। অর্ক তো রাজি ছিল। অনেকবার এর ওর পায়ের আওয়াজে বাতাসী অর্কর আগমনের নির্ঘন্ট ভেবে কৃত পরিকল্পনার মহড়া প্রায় শুরু করে দিতে বসেছিল। পালে বাঘ পড়ার মতো বলিষ্ঠ পদক্ষেপে অর্ক হঠাৎ করে ঘরে ঢুকে পড়ে। বাতাসী খেয়াল করলেও ভাবতে পারে নি এমন প্যারেড করার স্ফুর্তিতে কেউ ফুলশয্যর ঘরে আসতে পারে। ভেস্তে যায় বাতাসীর,"সকল নিয়ে",বসে থাকা পরিকল্পনা। "আপন মনের মাধুরী মিশায়ে" অর্ক শুরু করে দেয়: She dwelt among the untrodden ways
Beside the springs of Dove.
বাতাসী এলোমেলো হয়ে যায় নিমেষে। ছুটে আসে ছোটবেলা, প্রমথ দাদু হাবা কাকার সপ্তডিঙা। বাতাসী সুর করে গেয়ে ওঠে:
A Maid whom there were none to praise
And very few to love.
অর্ক এতটা আন্দাজ করেনি। সে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে বাতাসীর দিকে। বাতাসীর কন্ঠে সুরের অনায়াস মুক্তির খবর অর্ক ছিটেফো়ঁটা জানত। কিন্তু রোম্যান্টিক ইংরেজি সাহিত্যে বাতাসীর যাতায়াত আছে এ খবর তার কাছে অজানা। অর্কর ক্ষণিকের নিস্তব্ধতায় বাতাসী পরের লাইন ধরে ফেলে:
A violet by a mossy stone
Half hidden from the eye!
আর সময় নেয় না অর্ক। নিমেষে বাতাসীর দুটি হাত ধরে বুকের কাছে টেনে আনে তাকে। বাতাসী নিবিড় হওয়ার প্রত্যাশায় অর্কর দুটি পায়ের পাতার উপর দাঁড়িয়ে পড়ে। ঠিক তখনই অর্ক মুহূর্ত বিলম্ব না ঘটিয়ে সময়ের সদব্যবহার করতে আবৃত্তির করে :
....Fair as a star, when only one
is shining in the sky.
অর্ক থেমে গিয়ে দুচোখ ভরে পাগলের মতো বাতাসীকে দেখতে থাকে। বহু যুগ ধরে অর্ক, দেখিতে গিয়েছে পর্বতমালা দেখিতে গিয়েছে সিন্ধু কিন্তু প্রকৃত অর্থে কোনদিন সে প্রকৃতি দেখে নি। তাই শিশির বিন্দুতেই আজ তার চোখে ঘোর লেগেছে। বাতাসী, তার জীবন প্রদীপ নিয়ে প্রকৃতি হয়ে আজ ধরা দিয়েছে অর্কর কাছে। বাতাসী অর্কর বিহ্বলতা অনুভব করতে পারে। সে বুঝতে চায় এর কারন। কেন অর্ক এমন উতলা আগ্রাসী! অর্ক বোধহয় নিজের মধ্যে থাকা শরীরী উপস্থিতি টের পায়নি কোনদিন। আজ প্রথম সুযোগেই জোয়ালামুখীর মতো যা বেরিয়ে আসতে চাইছে। বাতাসী তাড়াহুড়োয় বিশ্বাসী নয় সে অর্ককে কবিতায় থামাতে চায়:
But she is in her Grave, and,oh,
অর্ক ডান হাত দিয়ে বাতাসীর ঠোঁটের কম্পন রুখে দেয়। আর একটা কথাও বাতাসীকে সে উচ্চারণ করতে দিতে চায় না। বাতাসী অপেক্ষায়মান। অর্ক পাথরের মত কাঠ হয়ে আছে। বাতাসী অর্কর হাত সরিয়ে দিয়ে আবার গেয়ে ওঠে : But she is in her....। কথা শেষ হয় না অর্ক ঝাঁপিয়ে পড়ে বাতাসীকে কোলে তুলে নেয়। অর্কর শুকনো ঠোট মুহুর্তের রসসিক্ত হয়ে বাতাসীর বুকে, জমে থাকা ব্যাথার উৎস খুঁজতে থাকে। বাতাসীর আজ কিচ্ছুটি মিলছে না। তার ভাবনাগুলো ওলোট পালোট হয়ে প্রবল স্রোতে খড়কুটোর মত ভেসে যাচ্ছে। ভাবনা কোন কালে স্থির থাকতে পারে না। আজ এই মুহূর্তে সে উপলব্ধি করে অর্কস্রোতে ভেসে যাওয়াই এ মুহুর্তের দাবি। বাতাসী যতটুকুই চেয়েছিল এ যেন তার শতসহস্র গুন। তরঙ্গ সুখে ভেসে যেতে যেতে পাল তুলে দাঁড় ছেড়ে দেয় বাতাসী। বাতাসী নিজেকে সমর্পণ করেছে আজ। অর্ক আতিপাতি করে খুঁজতে থাকে বাতাসীর দুঃখগুলো। কেন বিবাহর সিদ্ধান্ত নিতে বাতাসী এমন দেরি করল। উভয়ের শরীরে উচ্চ বিভবের প্রবাহ অথচ আলো জ্বলল না। বৃক্ষমূলের সন্ধান না পেয়ে ঝাঁকড়া মাথা গাছটাকে বোঝা সম্ভব নয়। গোটা রাত অর্ক, আলোক যাত্রায় মগ্ন হয়েও অন্ধকারের উৎস খুঁজে পেতে ব্যার্থ হল। যদিও শরীরী পুষ্টিতে উভয়েই তুষ্ট। তবুও, ধৈর্য অর্কর চিরসখা। হেরে সে যায় না।
চৌত্রিশ
নষ্ট মঙ্গলা
আট দিনের মাথায় নাকি যেতে হয় শ্বশুর ঘর। সেখানে গিয়ে জোড় খুলে শাশুড়ি মা নারায়ণ পূজো দেবেন। অর্ক বলে, বিনা জোড়ে বেনিয়মের বিয়ে, তার আবার অষ্টমঙ্গলা। তার চেয়ে বরং নিয়ম ভাঙ্গার ধারা বজায় থাকুক। বাতাসী জিজ্ঞেস করে, সে কেমন? বাবা-মা বন্ধুবান্ধব নিয়ে চুটিয়ে আড্ডা মেরে আসি চলো তোমাদের বাড়ি। বাতাসী বন্ধু-বান্ধবে নিমরাজি, শ্বশুর-শাশুড়ির যাওয়ায় আগ্রহ দেখালে সে রাজি। অর্ক চেঁচাতে থাকে, বাবা ও বাবা, মা, জলদি এসো। বাবা বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে আছে আসে না। অঞ্জলি এসে হাজির হয়। প্রস্তাব শুনে হেসে বলে, পাগলের ঝাড়, কোথা থেকে আরেকটা পাগলী এসে জুটেছে। কিন্তু আবদার এড়াতে পারে না।পরের দিন অষ্টমঙ্গলা, ওরা পালসিট যাত্রা করে।
বীণা এলাহি আয়োজন করে রেখেছে, প্রথমবার জোড়ে আসবে মেয়েজামাই।কে জানত সঙ্গে বেয়াই বেয়ান ও আসবে। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতে সবার সামনে বাতাসীর শৈশব ফিরে আসে।বীণাপাণির তিরস্কারে বাতাসীর প্রাণ ওষ্ঠাগত হবার উপায়। বাতাসী বলে কী করে খবর দিতাম? সবে গতকাল মা-বাবার আসার কথা ঠিক হয়েছে।’ ‘চলবে না অমন অত্যাচার।বাতাসী এখন বর্ধমান পুলিশের আন্ডারে নয়। এখন ওর পিএস চুঁচুড়া, ইন্সপেক্টর অর্কপ্রভ।জুরিসডিকশন চেঞ্জ হয়ে গেছে।’অর্কর কথায় হো হো করে হেসে ওঠে উপস্থিত সকলে। হাসির শব্দ বেয়ে অর্কর নজরে আসে মাঝ বয়সী সীমা। তীক্ষ্ণ টিকালো নাক, সাদাটে শাড়িতে বিধবার বেশ অথচ ব্যবহারে চকিত নেমে আসা ঝরনা যেন।
পালসিট পৌঁছে তড়িঘড়ি কিছু নাকে মুখে গুঁজে বাতাসী অর্ক কে ওর শৈশবের মাইল ফলক গুলিকে ছুঁয়ে আসতে ডাক দেয়। একটু ইতস্তত বোধ করে অর্ক, মা বাবার জন্য। সীমা বুঝতে পেরে বলে, আমরা খেয়াল রাখব, জীবনের চৌকাট, উঠোন না দেখিয়ে ছুটকি তোমায় নিস্তার দেবে মনে করেছ? অর্ক সীমার কথায় নিশ্চিন্ত হয়ে বাতাসীর হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে পড়ে। লেখাপড়া স্কুল-কলেজ,চাকরি পাওয়ার লড়াই, এত বেড়া ডিঙিয়ে বহুদিন বাতাসীর এদিকটায় আসা হয়নি। বাড়ি থেকে বার হয়ে চালু পথ ছেড়ে, বাতাসী পোস্তার পাড় ধরে আদিগন্ত পড়ে থাকা খড়ের মাঠে হাজির হয়। মাঠজুড়ে খোঁচাখোঁচা জেগে থাকা মড়া ধান গাছ। কোথাও নতুন ভাতের গন্ধ লেগে নেই, আছে শুধু হাহাকার। বাতাসী দেখে গাছে ঠেস দিয়ে রোদ পোহাচ্ছে একজন। ওদের আগমনবার্তা দৃষ্টিগোচরে এলেও সেই ব্যক্তি নিজস্ব ভাবনায় বিভোর। আর পাঁচটা মানুষ যেমন আল ধরে চলে যায়, কেউ নজর করার প্রয়োজন বোধ করে না, লোকটা অন্যর প্রতি তেমনই উদাসীন। বাতাসী দু বাহু পাখার মতো মেলে দিয়ে, আল বেয়ে তরতর করে এগিয়ে চলে অসময়ে পেখম মেলা ময়ূরী যেমন। পিছনে পিছনে পুরুষ ময়ুর চঞ্চল চলনে ছুটতে থাকে টলমল পায়ে। চিড়িয়াখানায় বন্দি পাখি হঠাৎ মাটির পরশ পেয়ে ফিরে পায় না অতীত চলা। শীতের শিশির ভেজা সকালের ঘাস, অনেকটা ইডেন গার্ডেন্স এর মতই সতেজ। ফার্স্ট বোলারদের স্বর্গ, হড়কে পড়ে যায় অর্ক। আওয়াজ পেয়ে পিছু ফিরে ‘হো হো’, করে হেসে ওঠে বাতাসী। অর্ক কথা না বলে এমন ভাবে মোল্ডেড জুতোর সোল দেখতে থাকে, যেন অঘটন এর জন্য দায়ী বাটা কোম্পানি। অর্কর সাদা প্যান্টে মাটির দাগ লেগে আছে। বাতাসীর তাতে কিছু এসে যায় না। সে জানে অর্কর কাছে যাওয়া, আর সাতসকালে কলকাতার ক্রিকেট মাঠে ইমরানকে ফেস করা একই রকম বিপদজনক। যদিও মাঠে দর্শক বলতে তো একজন, সে ভাবে বিভোর হয়ে আছে। ভুল ভাঙ্গে বাতাসীর, ফাঁকা মাঠে বিকট অট্টহাস্যে, ভাবের ঘোর কেটে গেছে দর্শকের। নেপু কাকা দূর থেকে ঠাওর করতে পারে ছুটকি কে,মনে ভাবে ইস আজ ছুটকির অষ্টমঙ্গলা, সকালবেলা মাস্টারের ঘর যাওয়া উচিত ছিল তার। যাহোক ছুটকি যখন খোদ হাজির তাহলে আর অসুবিধেটা কি ? দৌড়ে আসে সে। অর্ক নেপুকাকা কে চেনে না সে বাতাসী কে বলে ‘ওই দেখো, কে একজন হন্তদন্ত হয়ে আসছে।’ বাতাসী নেপু কাকাকে বলে ‘কি গো সকাল বেলায় তোমাকে দেখতে পেলাম না কেন? উত্তর আসার আগেই অর্ক নিজের পদস্খলন ঢাকতে জিজ্ঞেস করে, আপনি মাঠে রোদ পোহাচ্ছিলেন না ? নেপু বলে, তা বলতে পারো। পড়ে থাকা খাঁখাঁ মাঠে বসতে ভাল লাগে। মাঠ আমাদের পেট। কেবল ফসল থাকলে আসব এটা ভাবলে কষ্ট হয়। মন্দির মসজিদে মানুষ কিছু না পেয়েও নিয়মিত পূজা দেয়। আমাদের জীবনে মাঠই মন্দির। বাতাসীর বুকটা হঠাৎ করে ভরে ওঠে। এই বোধ অভয় মাস্টারের স্কুলে পাঠ নেওয়ার কারনে সম্ভব হয়েছে ভেবে। ওরা তিনজনে হাঁটতে থাকে বাগদি পাড়ার দিকে। নেপু কাকার মুখে জমির লড়াইয়ে শ্বশুরমশাইয়ের নেতৃত্ব দেওয়ার গল্পে মুগ্ধ হয় অর্ক।
বাগদি পাড়ায় মুখে পুকুরপাড়ে সারি সারি তালগাছ সেখানে বাসা বেঁধেছে অসংখ্য বাবুই পাখি। মা পাখি উঁকি মারছে এধার ওধার, চারিদিকে সজাগ দৃষ্টি তার । কখনো ঠোঁটে খাবার এনে মুখে গুঁজে দিচ্ছে কখনো বা বাসার মধ্যে নাগালের বাইরে খাবার রেখে, খাবার খুঁটে খাওয়ার ট্রেনিং দিচ্ছে বাচ্চাদের, নিমগ্ন অর্ক। কত যে কথা নেপু কাকা বলে চলে তার সবটুকু খেয়াল করেনা সে। যদিও একটু আগে নেপু কাকার কাছ থেকে অভয় এন্ড কোম্পানি কে জানার ক্রাশ কোর্সে পাঠ নিচ্ছিল অর্ক। চট করে গতি বাড়িয়ে অর্ক বাতাসীর পাশে চলে যায়। কাকার সঙ্গে একটু দূরত্ব হওয়ায় একটু নিচু গলায় অর্ক বলে, আমাকে দেবে এমন একটি বাসা? বাতাসী চিৎকার করে বলে, তোমার নেই বুঝি? বাতাসী হঠাৎ করে চেঁচিয়ে ওটায় অর্ক কাকার সামনে একটু ঘাবড়ে যায়। বাতাসী পুনর্বার চেঁচিয়ে বলে, ঠিক এমনটি চাইলে,ঝড় হলে খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে কিন্তু। নিপু না বুঝে বলে, দাদাবাবু তোমার কি নেই গো, যা নেই তা আবার উড়ে যাবে কি করে? তবে বাবুই বাসা খুব মজবুত ঝড়ে দোল খায়, উড়ে যায় না কখনো। ওরা দুজনে প্রানভরে করে হেসে ওঠে। মেয়ে-জামাইয়ের হাসির রোল দেখে কিছু বুঝতে না পেরে নিপু ওদের সঙ্গে গলা মেলায়। শান-বাঁধানো চাপাকলের গোড়ায় জমে থাকা জলে লেজ পাখা নাচিয়ে কিচিরমিচির করছে একজোড়া বাবুই দম্পতি। শব্দসন্ধান করে নেপুর চোখজোড়া পৌঁছায় কল গোড়ায়। সদ্য বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী যেন। স্মৃতি, আলোকবর্ষের গতিতে পার হয় বেশ কয়েক দশক। নেপু দেখতে থাকে একসাথে গ্রামের মানুষের ভুরিভোজের দৃশ্য। ঘরোয়া কোন্দল ফেলে অমন মেলামেশা গ্রামে বড়ো একটা দেখা যেত না। ছুটকি কে কোলে নিয়ে চাপা কলে হাত রাখছেন বীণা দিদি। গ্রামের প্রথম ডিপ টিউব ওয়েল। নেপুর চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসে। অর্ক লক্ষ্য করে কাকার পরিবর্তন, এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখে সে। নিজেকে সামলে নিয়ে নেপু সেই হাত নিজের হাতে ধারণ করে অর্ক কে টিউব ওয়েলের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তারপর দুহাত ধরে টিউব কলের হ্যান্ডেলের চাপ দিতে থাকে । এই টিপকল গ্রামের মানুষের তৃষ্ণা নিবারণে ছুটকির অন্নপ্রাশনে মাষ্টার় দাদা বানিয়েছিলেন। নেপুকাকার কথায় অর্ক সুমিষ্ট ঝরনার পরিতৃপ্তিতে আঁজলা ভরে পান করে জল।
এরপর পায়ে পায়ে ওরা স্কুল,ইটভাটা পার হয়ে, গ্রামের শেষ প্রান্ত যেখানে হাবা কাকার ঘর সেই দিকে যাত্রা করে। ওরা বলাবাহুল্য কারণ অর্ক চলে ট্রেনের বগির মতো পিছনে। বাতাসী পেশা শিক্ষকতা। আজকে শিক্ষকতার অন্য আমেজ। আগে থেকেই বাতাসীর সিলেবাস তৈরী করা ছিল। অর্ক কে সে আজ নিজের শৈশব বেড়ে ওঠা প্রেম,অপ্রেম সব মেড ইজির ধাঁচায় গলাধঃকরণ করাতে চায়। অর্ক বাধ্য ছাত্রর মতো পাখি পড়া করছিল। ঝোঁপ, জঙ্গলের মাঝে পায়ে চলা পথ। বাতাসীর নীল শাড়িতে ছড়িয়ে থাকা চোরকাঁটার অকৃত্রিম চিত্রণে অর্কর বিস্ময়, ভালোলাগা়। সত্যিই দিনটা আজ একেবারে আলাদা। হঠাৎ মূল রাস্তায় উঠে পড়ে ওরা। সামনেই ক্যানেল। জলের উপর দু পাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে হরেক রকম গাছের ডালপালা। দড়ি দিয়ে আম গাছে বাঁধা ডিঙ্গি নৌকা দেখে ছুট্টে গিয়ে দড়িতে টান দেয় সে বাতাসী। নৌকো পাড়ে এসে ভেড়ে। দুহাত দিয়ে বাতাসী স্পর্শ করে তার ছেলেবেলা। চোখ বুজে বাক্যহীন বসে থাকে বাতাসী দুচোখে জলের ধারা। অর্কর নিরুচ্চার। ঢিমেতালে সময় বয়ে যায়। বাতাসী খুঁজে ফিরছিল তার হাবা কাকাকে। নিজের ভিতরে থাকা কবিত্ত্ব, আদতে হাবা কাকার কল্পনায় প্রমথ মাষ্টারের কবিতা। রুদ্ধ কন্ঠে বাতাসী আবৃত্তি করে -
It is a beauteous evening calm and free
The holy time is quiet as a nun..
অর্ক কাঁধে হাত রাখে বাতাসীর। অর্কর ঝুঁকে পড়া হাঁটুতে বাতাসী মাথা গুঁজে ফোঁপাতে থাকে। হাত ধরে হালকা টানে অর্ক দাঁড় করিয়ে দেয় বাতাসীকে। ওরা চলতে থাকে গ্রামের শেষ প্রান্তে যেখানে ক্যানেল হঠাৎ করে বাঁক নিয়ে চলে গেছে অন্য কোথাও। যেখানে পথের সীমানা বেঁধে দিয়েছে জলরেখা। এই শেষপ্রান্তে ছিল হাবা কাকার বাস। ঢিবির মাথায় কতগুলো খেজুর গাছ চব্বিশ ঘন্টা গ্রামকে সুরক্ষা দিতে প্রহরারত। খাল এর অপর পাড়ে চাষের মাঠ তৈরি হচ্ছে, বড় মনোরম দৃশ্য। অর্কর চোখে নেশা লাগে। ঢিবির উপরে নিতান্ত অবহেলায় পড়ে থাকা একটি কুঁড়ে ঘর। ঢিবির নিচে নিকানো উঠোন। বাগান গাছের বেড়ায় ঘেরা। মরসুমি ফুলের রংবাহার, গেরস্থালী সুখের সুবাস ছড়াচ্ছে। বাতাসীর মন চঞ্চল হয়ে ওঠে সে আর এক মিনিটও তিষ্ঠতে চাইছে না এ স্থানে। ঈশারায় অর্ককে ডাক দিতে থাকে দূর থেকে।
হাবা কাকা গত হবার আগে থেকেই অনন্ত মণ্ডল কে নিয়ে কানাঘুষো শুনতো বাতাসী। ছোটবেলা থেকেই বাবার আচরণ বিধি বাতাসীর কাছে বিধান ছিল। বাঁকা পথে চলা বহু মানুষকে বাতাসী ছেঁটে দিয়েছে নিজের জীবনগণ্ডি থেকে। শুধু হাবা কাকা আর সীমা পিসি ছিল এই নিয়মের উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম। কেন এই দু চোখো নীতি তা বাতাসী বলতে পারবে। কাকা সুস্থ থাকার সময় মাঝে মধ্যে সে আসতো। হাবা কাকার বাড়ীর কাছে এসে বাতাসী মন থেকে ফিরে আসতে চাইছিল। হাবেভাবে অমন করে ডাকার কারন অর্কর অজানা। অর্ক তাই বড়ো একটা আমল না দিয়ে শীতের রঙ্গিন বাগানে মননিবেশ করে। বাতাসী ভাবে বাগান চৌকাঠ পেরিয়ে কাকির কাছে যাওয়ার কথা। পরক্ষণেই তার মনে হয় কাকিও সমান অপরাধী। ঠিক সেই সময় ঘরের ভেতর থেকে চুলা হাতে কাকি বেরিয়ে আসে। কাকি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বুঝতে পারে চেনা কেউ বাড়ির কাছে এসেছে। মুখ তুলে সে দেখে সুন্দর মত এক পুরুষ তার বাগান ছেড়ে রাস্তার ঢালে উঠছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে বাহারি পোষাকে এক মহিলা বাড়ির দিকে পেছন করে হাঁটা দিয়েছে। ফেলা শরীরের গড়নের আন্দাজ করে চিৎকার করে জিগেস করে, কে গো তোমরা? বাতাসী চমকে ওঠে। এই আশংকা তার ছিল। ধরা পড়ে গেছে ভেবে সে পেছু তাকাতে বাধ্য হয়। কাকির সাথে সরাসরি চোখাচোখি হয় বাতাসীর। বাতাসী বলে, চিনতে পারছ কাকি? কাকি বলে, ও মা বাতাসীদি, এসো এসো। এখানে এসে ফিরে যাচ্ছিলে বড়। তোমরা সাহস তো কম নয়! জামাই বাবা এস। অর্ক বাতাসীর আদেশের অপেক্ষায় না থেকে মুহূর্তে মাথা নিচু করে পর্ণকুটিরে ঢুকে পড়ে। কানু গেছে নদীতে মাছ মারতে। ঘরে বসে আছে অনন্ত মন্ডল। ওকে দেখেই বাতাসীর পিত্তি জ্বলে যায়। মনে মনে বলে এই হারামজাদা কে কোথা থেকে যে হাবা কাকা জুটিয়ে এনেছিল। ঘরদোর পুত্র পরিবার দখল দিয়ে মৌরসিপাট্টা জুড়েছে ওরই ডেরায়। হাবা কাকাকে এই হারামজাদায় খেলো কিনা কে জানে? বাতাসীর সংশয় জটিল, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ঘেঁটে থাকা মনের খোঁজ পেয়ে যায় কাকি। পরিস্থিতি লঘু করতে সে অনন্ত কে বলে, দেখো কে এসেছে। ছুটকি মানে বাতাসীদি। হাবার পরম আদরের মেয়ে। অর্ক কিছু বুঝতে না পেরে বাতাসী কে বসতে বলে। কথাবার্তা বেশি এগোয়না। বাতাসী ডাঁটো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অপ্রস্তুত অর্ক বলে, কাকি আমরা অন্য কোন দিন আসবো, আজ উঠি। ওরা যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, অনন্ত বলে,খুকি, দেখবে তোমার ভুল একদিন ভাঙবে। তীব্র চাহনিতে বাতাসী বিদ্ধ করে অনন্তকে, তারপর হনহন করে হাঁটা দেয়।
বাতাসীর মনটা ভীষণ খিঁচড়ে গেছে বুঝতে পেরে অর্ক বলে, বাতাসী, তোমার শৈশবের প্রথম হৃদয় বিনিময়ের পুণ্য স্থানে যাওয়ার ইচ্ছে সুপ্ত রেখেছিলাম মনে। আজ কিন্তু ওখানে না গিয়ে ছাড়বো না। শরতের মেঘের মতো উড়ে যায় বাতাসীর বুকে বাসা বাঁধা কালো মেঘের ঢল। ওর কাছে জীবন আদতে প্রতিটি মুহূর্তের ছোট ছোট সত্যি নিয়ে গড়া। লালচে ধূসর রাস্তা উঠে গেছে ক্যানেল ব্রিজের দিকে। রাস্তার দু'পাশে, নিচু জমি। রাস্তার ধারে অজস্র খেজুর গাছ। দুপাশে নেড়া ধানের ক্ষেত। আদিগন্ত নীল আকাশে সাদা ছিট মেঘ হাওয়ায় পতপত উড়ছে। ফুরফুরে শীতের হাওয়ায় খেজুর পাতায় নুপূরের ধ্বনি। মাদকতা অর্কর শরীরে। হালকা উলের পোশাকে বেশ আরাম অনুভূত হচ্ছে তার।বাতাসীর গায়ে নীল শাড়ি। অর্ক মাটিতে আকাশ দেখছে। একটু এগিয়ে বাতাসী অর্ক কে পথ দেখাচ্ছে। হঠাৎ করে অর্ক ছুটতে শুরু করে। বাতাসী পায়ের আওয়াজে পেছন ফিরে দেখে পাগলটা ওর গায়ের কাছে এসে পড়েছে এড়িয়ে যাওয়া আর সম্ভব নয়। নিজেকে শেষমেশ ছেড়ে দেয় ওর হাতে। নির্জন মেঠো পথ, নির্জনতার অবাধ মালিকানা কেবল ওদের হাতে। মাঠ খালি ধানের সম্ভার গোলায় উঠেছে আর বাতাসী অর্কর বুকে। বাতাসী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। যে মানুষ প্রাকবিবাহ পর্বে নিজের ভালোবাসার কথা লুকিয়ে রাখে সযত্নে এতদিন পর তার খুলমখুল্লা প্রেমের প্রকাশ দেখে বাতাসী যারপরনাই বিস্মিত হয়। নির্জনতা বেহিসাবি প্রশ্রয়ে পটু। ভালো লেগে থমকে গেছে সময়।
অর্কর বাহুপাশ মুক্ত বাতাসী এখন একটু এগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকেই প্রথম সত্যজিৎ তার দিকে সলজ্জ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। বাতাসী হাতছানি দিয়ে অর্ক কে ডাকে সেখানে। পুরানো দৃশ্যের রিমেক হবে নতুন অভিনেতার সঙ্গে। অর্ক জিজ্ঞেস করে, প্রথম দৃষ্টি বিনিময়েই প্রেম এসেছিল? বাতাসী বলে, তোমার সঙ্গেও কি তাই ঘটে নি? পরের প্রশ্ন, তোমরা কোথায় দেখা করতে? বাতাসী বলে, তোমার জেনে কি দরকার? ফের অর্কর প্রশ্ন আসে, না মানে জানতে চাইছি কতটা জনহীন থাকতো লীলাক্ষেত্র? মেকি গম্ভীর স্বরে উত্তর আসে, আমাদের কোনোদিন দেখা হতো না। অর্ক হাসলে, বাতাসী গেয়ে ওঠে,”আমি তারেই খুঁজে বেড়াই/ যে রয় মনে…”। মনে মনে ভালোবাসা জন্মেছিল বুঝলে মশায়। মাঝে মাঝে হাবা কাকার কাছে যাতায়াতের কারণে চোখাচোখি অবশ্যই হতো। আমাদের কখনো কোনো কথা বলতে হয়নি। অর্ক বলে, প্লিজ গুল মেরো না তবে এমন জায়গায় এলে যে কোন মানুষের প্রেমে পড়া যায়। এ হলো গিয়ে স্থান মাহাত্ম্য!’ বাতাসী রাগে অর্কর বুকের উপর দুমদাম কিল মারতে থাকে। পুরানো ফিল্মের রিমেক আর সম্ভব নয় উল্টো দিক থেকে হারুকাকা ভ্যান চালিয়ে ব্রিজের উপর প্রায় উঠে এসেছে। তড়িঘড়ি ওরা দুজনে দুজনের থেকে ছিটকে যায়। হারু কাকা মেয়ে জামাইকে এই অবস্থায় দেখে হঠাৎ করে ভ্যান সারতে নেবে যায়। যেন কিছুই চোখে পড়েনি ওর। বাতাসী ছুটে গিয়ে হারুকাকাকে বলে,বাঁচা গেল! অনেক হেঁটেছি, এবার তোমার ভ্যানে বাড়ি ফিরে যাব। কীভাবে যেন হঠাৎ করে ঠিক হয়ে যায় ভ্যান। দুজনে ঝটপট ভ্যানের সামনে গিয়ে বসে পড়ে। হুড়মুড় করে ভ্যান ঢাল ধরে নামতে থাকে। শীতের ধুলোয় মাখামাখি দুজন। উঁচুনিচু রাস্তায় পাশাপাশি ছুঁয়েছুঁয়ে চলা। বাতাসী শরীরে কম্পন লুকাতে একটু কাঠকাঠ হয়ে নিবিষ্ট চোখে হারুর দিকে চেয়ে। অর্ক নির্ভয়,বাতাসীর কোমর তার বাম হাতের বেষ্টনীতে। হারু ঠিক করে নিয়েছে সে পিছনে তাকাবে না। শুধু অপ্রাসঙ্গিক কথার জাল বুনে চলেছে ওদের হারুকাকা। যার আগামাথা কিছুই নেই। অন্য দুজনের কারও হারুকাকাকে বোঝার তাগিদও নেই।
সদর পেরিয়ে বাতাসী দেখে ভাগাভাগি হয়ে গেছে উঠোন। একদিকে মেয়েরা অন্যদিকে দুই বাবা। সীমা পিসি কী করবে ভেবে পাচ্ছেনা। বাতাসী সটান মেয়েদের আখড়ায় গিয়ে ঢিপ করে বসে যায়। অর্ক ফ্যাসাদে পড়ে যায়,কোন দিকে যাবে বুঝে উঠতে পারেনা সে। অর্ক যে বাড়িতে নতুন তা বুঝতে চায় না বাতাসী। রিতা রান্না সামলাচ্ছে, বীণা আর সীমা মাঝেমধ্যে দেখভাল করছে রান্না। পাড়ার মেয়েরা এসে হাজির, সীমা অর্ককে হাত ধরে বসিয়ে দেয় মেয়েদের মাঝখানে। সীমার জানা আছে তার দিলুদা এখনি রাজনীতিতে ঢুকে যাবে। জামাইকে আজকের দিনে যেন রাজনৈতিক কচকচানি শুনতে না হয় তাই তার অমন ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। সীমা জানে সঙ্গতের অভাবে আলোচনা ভেস্তে দিলুদা শীঘ্র রণে ভঙ্গ দেবে। তার চেয়ে বরং ছুটকির বন্ধুরা জামাইকে নিয়ে একটু মজা করুক।
মেয়েদের বুকে জমে ওঠা রসালো প্রশ্নবাণে নাকাল হতে থাকে অর্ক। বেবির আবদার নিজের মুখে অর্ক কে বলতে হবে প্রেমের ইতিবৃত্ত। কে প্রথম ভালোবাসার কথা বলেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। বাতাসী বলে, আমি কিচ্ছু জানি না আসল সময়ে বলে নি আজ সব ওকে বলতে হবে। অর্ক এমন পরিস্থিতিতে এক্কেবারে ক্যাবলা বনে গেছে। অঞ্জলি বলে, আমি কিন্তু সইতে পারছিনা আমার ভোলেভালা ছেলের নাজেহাল অবস্থা। আমি কিন্তু হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেব। ছুটে গিয়ে বাতাসী অঞ্জলির মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে,তুমি যদি মুখ খুলেছ না। বীনা মেয়ের হতবাক করা আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বলে, তোর কি কোন লজ্জা শরম কিসসু নেই? শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে এত লোকের সামনে একি ব্যবহার! অঞ্জলি বলে, শাশুড়ি বলে আমাকে নামিয়ে দিলে চলবে না। জুরিসডিকশন চেঞ্জড, এখন আমি ওর মা। কিরে তাই না? বাতাসী জড়িয়ে ধরে ওর নতুন মাকে। বান্ধবীর ভাগ্যে হয়তো কেউ কেউ ঈর্ষান্বিত হয়। সীমা পুরুষদের চাটায়ে বসে অথচ মন পড়ে আছে মেয়েদের এইখানে। রিতা বলে কিরে দিদি, তুই সবকিছুর টেস্ট নিবি? সীমা কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যে কৃষ্ণদা আর তার রাজনীতি শুনে মজে গেছে। আজকে দুই দাদা আসর জমিয়ে দিতে পারবে, সারাদিন ফাটাফাটি কাটবে এই ভেবে সীমা পুলকিত হয়। হঠাৎই সে যেমন অর্ক কে তুলে নিয়ে গিয়ে মেয়েদের জটলায় বসিয়ে দিয়েছিল ঠিক তেমনই এক টানে তুলে এনে আবার নিজেদের চাটাইয়ে বসিয়ে দেয়। মেয়েরা চিৎকার-চেঁচামেচি করতে থাকে। অর্ক অনেকটা আশ্বস্ত হয়ে বলে, বাতাসীর কথার মধ্যেই স্বীকারোক্তি আছে। ভালো করে ভাবুন উত্তর মিলে যাবে। সবাই হই হই করে ওঠে। বাতাসী গোল খেয়ে মুষড়ে পড়ে।
রাজনীতিতে মাঝারি মাপের দুই সৈনিক ততক্ষণে মগ্ন হয়ে গেছে ইতিহাসের পর্যালোচনায়। অভয়ের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছিল কৃষ্ণ। খুব সরল সাদা প্রশ্ন,আপনি আজ যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানে থেকে আপনাদের পথ যে নির্ভুল ছিল তা ব্যাখ্যা করতে পারেন? কান খাড়া ছিল অর্কর, সে প্রশ্নর ব্যাপকতার হদিশ পেয়ে চিৎকার হইহল্লা থেকে কান সরিয়ে নেয়। কৃষ্ণ বলে, আমি এর উত্তর দেবো না, একটা গল্প বলব। তার থেকে যা বোঝার বুঝে নিতে হবে। শুরু হয়ে যায় গল্প- সন ১৯৭১, ধরা পড়ে যাই বর্ধমান জেলার বনকাপাশি তে। বাড়ি থেকে বেশ কিছুদিন বেরিয়ে পড়েছি, এখান ওখান ঘুরে বনকাপাশি, কমরেড প্রশান্তর বাড়ি। কয়েক দিনের মধ্যে কাটোয়া কে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা হবে। বিভিন্ন জায়গা থেকে কমরেডরা এসেছেন বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। বনকাপাশি স্কোয়াডের পনেরো জন কমরেড গা ঢাকা দিয়ে আছে। প্রশান্তর ভাষায় এদের মধ্যে জন্য দশেকের নীতিবোধ আছে। বাকি পাঁচজন মদখোর, জুয়া খেলে তবে অমানবিক নয়। কী হতে যাচ্ছে তার ছবি একেবারেই পরিষ্কার নয় এদের কাছে। পার্টিতে গণ লাইনের চর্চা ততদিনে শুরু হয়ে গেছে। এই অঞ্চলের অনেকে তৈরি হচ্ছেন, প্রশ্ন তোলার আকাঙ্ক্ষা জাগছে মনে। আমি বন্ধু প্রশান্ত এবং ওর মা রাতে সবে খেতে বসেছি। দরজায় খটখট আওয়াজ, মাসিমা দরজা খুলে দিতে উঠলেন। ঢুকলো মোটা গোঁফওয়ালা ঝাঁকড়া চুলের রোগাপটকা একটা ছেলে। ঠিক যেন পাকিস্তানের ক্রিকেটার সিকান্দার ওয়াক্ত। নিজেকে পরিচয় করাল কিশোর দাস বলে, হাতে একটা চিঠি। বন্ধু প্রশান্ত চিঠি দেখে ওকে বসতে বলল। রাতের খাবার পড়ে আছে তখনও যার যার থালায়, ভাগাভাগি করে খেতে হল। খাওয়ার পরে আমি অবসন্ন থাকায় শুয়ে পড়েছিলাম। ওদের আলোচনা আমাকে বাধ্য করেছিল তাড়াতাড়ি ঘুমাতে। কিশোর যে কোনো রাজনৈতিক পাঠ নেয়নি তা বুঝতে পেরে প্রশান্ত ওকে দেশব্রতী পড়াতে শুরু করে। গভীর রাত, নিদ্রায় অচেতন আমি হঠাৎ কড়া নাড়ায় চমকে উঠি। দরজায় দমাদ্দম ধাক্কা শুরু হয়। মাসিমা আছন্না ঘুমে। দোর খোলার আগেই হালকা ছিটকিনি উপড়ে দরজা ভেঙ্গে পুলিশ ভেতরে ঢুকে কিশোরকে কলার ধরে তুলে নেয়। এমন একটা ভাব দেখায় যেন রত্নভাণ্ডারের হদিশ পেয়েছে। জিজ্ঞেস করে,কেন এমন খতরনাগ মানুষকে থাকতে দিয়েছেন? হতচকিত মাসিমা উত্তর করতে গেলে থামিয়ে দেয় ওরা। ততক্ষনে ওদের চোখ চলে গেছে হারিকেনের আলোয় রাখা দেশব্রতী দিকে। বিকট চিৎকার করে কনস্টেবল বলে ‘শালা! তুমি এই অঞ্চলে দেশব্রতী সাপ্লাই দাও? কিশোর নিমেষে বলে ওঠে, আমি না ওরা আমাকে পড়াচ্ছিল। পুলিশকে আর কে পায়। একসঙ্গে তিনটি মাছ কিশোর নামের রাঘববোয়াল সমেত। পুলিশ থানায় নিয়ে গিয়ে বেদম পেটাতে থাকে। কিশোরকে বেশি, আমাদের কম। আগাপাশতলা পেটানি খেয়েও কিশোর কিছু বলতে পারে না। কারণ সে বোমা বাঁধায় এক্সপার্ট বলে পার্টিতে এসে জুটেছিল। এখানে-ওখানে ফাঁকা দু'একখানা চার্জ করে পুলিশের খাতায় নাম ফেটে গেছিলো ওর। আমাদের কেউ চেনে না তবু কমবেশি মার খেয়ে দম ছুটে যাওয়ার অবস্থা। কোর্ট থেকে জেল কাস্টডি দেয়। আমরা চালান যাই বর্ধমান জেলে। আমার আর প্রশান্তর তিন নম্বর সেলে ঠাঁই হয়। কমরেড সাবর্ণ মুখার্জি এবং জিতেন মিশ্র তখন বর্ধমান জেলের নয় আর এগারো নম্বর সেলে। রোজ দু'চারজন মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইছে জেল থেকে। অন্যরা তাদের বোঝাচ্ছে। কয়েক দিন পরে দেখা যাচ্ছে যারা বোঝাচ্ছে তারাই মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ততদিনে সেলের মধ্যেও গণ লাইনের চর্চা লুকিয়ে শুরু হয়ে গেছে।আমি নিজেকে সরিয়ে রেখেছি আলোচনা থেকে। হঠাৎ করে ছন্দ পতন ঘটিয়ে রিতা গরম গরম পেঁয়াজি আর চা আনলে গল্প থমকে যায়। রিতা বলে, গরম গরম খেয়ে নাও, আজ খেতে বেলা গড়িয়ে বিকেল হবে। অভয় বলে, কৃষ্ণ বাবু দেখুন, আপনার গল্পের গুঁতোয় বর্মা থেকে লোক এসে হাজির হয়েছে এই বাংলায়। খেয়াল করে কৃষ্ণ বলে, তাইতো, শুধু বাতাসী মা বন্ধু নিয়ে মশগুল। এই বুড়োর খেয়াল রাখছে না একদম। সীমা বলে, ওদের এখন অনেক কথা, আপনি বুঝবেন না। সবাই হেসে ওঠে। গল্প বলার একটা পরিবেশ চাই। চা খেতে খেতে গভীর গল্প তেমন জমে না, তাই হালকা চালে চলতে থাকে হাসি ঠাট্টা। অঞ্জলির খুব পছন্দ হয়েছে সীমাকে, রঙমশাল জ্বাললে যেমন আগুনের ছোট-বড় রঙিন ফুলকি ছোটে তেমনি ওর কথা। অঞ্জলি সীমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ওই মেয়ে, তোর পরিবারে কে কে আছে রে? তুই কি এ বাড়িতেই থাকিস? সীমা বলে, মরদ হারু আর মুই/ দোকান বাড়িতে শুই। হারু নতুন দোকান করেছে তার সংলগ্ন ঘর। আবার একচোট হাসির ফোয়ারা। অঞ্জলি চোখ এড়ায় না সীমার সিঁথিতে সিঁদুরের চিহ্নমাত্র নেই অথচ স্বামী, হারু বর্তমান।
চায়ের বিরতি শেষ, গল্পের চলা শুরু,মুচলেকা দিয়ে কিরণ তিন নম্বর সেল থেকে বেরিয়ে গেল। তিনি পেশায় উকিল,তার চারিত্রিক দুর্বলতা সম্পর্কে অনেকের সন্দেহ ছিল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে কিরণ তিন নম্বর সেলের কমরেড দের জন্য বেল পিটিশন আনলো। নামকাওয়াস্তে বসলো স্পেশাল কোর্ট। কোর্ট ঘুরিয়ে আবার জেলে আনার পথে প্রবল হাঙ্গামা। পুলিশ ভ্যান ফেরার পথে থানায় নোঙর করল। মাঠে হাফপ্যান্ট পরা জওয়ানরা হকি খেলছিল। গ্রামের নকশাল ধরা পড়েছে শুনে মহানন্দে ভ্যান থেকে নামিয়ে হকি স্টিক দিয়ে ক্রিকেটের হুক,পুল, কাট সবই চলতে থাকলো। একজন আবার আদর করে তারই মধ্যে প্রশান্ত কে কেক খেতে দিল। পেটে খিদে থাকা স্বত্বেও প্রবল ঘৃণায় দেশি কুত্তাদের তাচ্ছিল্লের দান প্রত্যাখ্যান করল প্রশান্ত। একজন পানামা সিগারেট জ্বালিয়ে ওকে টানতে বলে। প্রশান্ত রাজি না হলে সিগারের জ্বলন্ত দিকটা ওর মুখে ঠোঁটে গুঁজে দেয়। প্রশান্ত মুখ খুলতে বাধ্য হয়। সেই সুযোগে আরেকজন সিগারেটের সামনের দিকটা ওর মুখে গুঁজে দিয়ে বলে, টান, টান শুয়োরের বাচ্চা,আমাদের ঘেন্না করা। বুক ভরে নিশ্বাস নিয়ে টান দেয় প্রশান্ত, তারপর গোলগোল রিং জওয়ানদের মুখের ওপর ছুঁড়ে দেয়। একটা প্রবল ঘুষি প্রশান্তর চোখ নাক জুড়ে আছড়ে পড়ে। প্রশান্তর দু চোখ ঘনিয়ে আঁধার নেমে আসে। ওদের মধ্যে একজন বলে। আন্ডার ট্রায়াল আসামি বাড়াবাড়ি করো না। তাড়াতাড়ি ওরা ঠেলে আমাদের ভ্যানে তুলে দেয়।প্রশান্ত তখন ছটফট করছে যন্ত্রণায়। ক্রমে সে শিখে যায় জেলে থাকার স্ট্র্যাটেজি। আসলে কৌশল করেই জীবনে বাঁচতে হয়।এরপর থেকে প্রশান্ত নিজেকে সিপিএমের ক্যাডার বলে পরিচয় দেওয়া শুরু করে। ওর কিশোর জীবনে স্টুডেন্ট ফ্রন্টের সঙ্গে চলার অভিজ্ঞতা ছিল। প্রত্যেক দিন লাথানোর সময় বিভিন্ন সিপিএম কর্মীর নামটাম ভাঙ্গিয়ে কপালে কম প্যাঁদানি জুটত। অর্ক এমনকি অঞ্জলিও এত বিশদে কিছু জানত না।
শক্তিগড় অঞ্চলের কিছু ওয়াগন ব্রেকার তখন জেলে, তাদের উৎসাহে চালু হয় তিন নম্বর সেলে স্লোগান দেওয়া। ব্যাপক ধরপাকড়ে তখন জেল হঠাৎ করে ভরে উঠেছে। কমরেড মুখার্জির যা জানা ছিল না। আওয়াজ না মেলায় তারা জানতেন না কেবল ওদের সেলেই নকশালরা বন্দি আছে। কারণ বিভিন্ন সেলে বেশকিছু সামাজিক অপরাধে জড়িত থাকা মানুষ ছিল। তিন নম্বর সেল থেকে স্লোগান ওঠায়, প্রতিটি সেল থেকে ভেসে আসতে শুরু হয় প্রতিধ্বনি। নেতৃত্ব বুঝতে পারে জেলে পার্টিকর্মীদের জোরালো অস্তিত্বের কথা। পরদিন সকাল হতেই কমরেড মুখার্জি ভারী গলায় চেঁচিয়ে গান ধরলেন, অনুরণনিত হতে থাকলো প্রতিটি সেল থেকে প্রতিধ্বনি। গণগানে মুখর হয়ে উঠল জেল। হঠাৎ বিশৃঙ্খলা চিৎকার-চেঁচামেচিতে অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকলো। বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খবর চিৎকার করে সেল থেকে সেল পৌঁছে যাচ্ছে। প্রতিটি সেলে কমিউন গঠন হয়েছে। বাড়ি থেকে আসা খাবার জল সব ভাগাভাগি করে খাওয়া। আমার তো বাড়ি নেই প্রশান্তর বাড়ি ই আমার বাড়ি। মাসিমা মাঝে মাঝে খাবার পাঠাতেন দুজনের জন্য তা কমিউনে গিয়ে পড়তো। হারামজাদা কিশোর এখন পুলিশের সঙ্গত করছে। কিন্তু সে তো কিছুই জানেনা। তার প্রথম দেশব্রতী দেখা প্রশান্তর বাড়িতে। পুলিশ তাকে নিয়ে খুব কিছু করে উঠতে পারে না। উল্টে সঠিক খবর দিচ্ছে না ভেবে একদিন বেধড়ক ওকে পুলিশ বেদম মারে। না ঘর কা না ঘাটকা হয়ে গেছে সে।এই সময়টায় বর্ধমানের ভাতার, কেতুগ্রাম, বলাগড়, দাঁইহাট অঞ্চলে কংগ্রেসী ক্লাবগুলোর দোর্দণ্ড প্রতাপ। পুলিশি সহায়তায় তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করেছে। অত্যাচারের মাত্রা অত্যন্ত বেড়ে গেছে কিশোর। ঘর থেকে মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার চলেছে, সঙ্গে নকশাল সমর্থনে থাকা পরিবারের ওপর লেভি ধার্য হচ্ছে। জেলের ভেতরে প্রাণের আবেগ রক্তের নেশা হয়ে জ্বলতে থাকে। জেল থেকে সাংকেতিক আদেশ যায় বাইরে। কমরেডরা উড়িয়ে দেয় কাটোয়ার বুলেট ক্লাব। পরপর আরো কয়েকটা বজ্জাতের ঠেক গুঁড়িয়ে যায়। গ্রামে পুলিশি অত্যাচারের মাত্রা অনেকাংশে বাড়ে। এখান থেকে পরিকল্পনা হয় জেল ভাঙ্গার। সীমা অবাক হয়ে লকআপে থেকে জেল ভাঙার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কৃষ্ণ বলে, কমরেড মুখার্জি এবং কমরেড মিশ্র তখন আবেগের বারুদ ঠেসে দিয়েছেন বিপ্লবী প্রাণে। যারা বেল চায়নি তারা শুধু পড়ে আছে। এদের নির্ভীকতা নেতৃত্বর কাছে বারুদের মতো। আট নম্বর সেল থেকে স্লোগান উঠলো- কমরেড আজকের যুদ্ধে অব্যাহতি চাওয়ার মানে হল কমরেড মুখার্জির অপমান, কমরেড মুখার্জির অবমাননা মানে সিএম এর অবমাননা। যা আদতে চেয়ারম্যানের উজ্জ্বল স্বপ্ন রঙিন চোখকে অবিশ্বাস করা। যে মানুষ স্বপ্ন ফেরি করে তার অমর্যাদা হতে দেওয়া চলবে না। বলুন ‘চীনের পথ’, অন্য সেল থেকে ভেসে আসে ‘আমাদের পথ’। প্রশান্ত সহমত হয় না, সে বুক ভরে শ্লোগান দিতে পারেনা, বিড়বিড় করে। অভয় শুধায়,এ কি মন্ত্রপাঠ? কৃষ্ণ বলে ঠিক, মানুষ যেভাবে দেবতার কাছে পৌঁছানোর জন্য একের পর এক ছোট পুরোহিত বড় পুরোহিত এর চৌকাঠ পার হয় এ ঠিক তেমন। আমার মনে কোনো সংশয় ছিল না। অর্ক কারণ জানতে চাইলে, কৃষ্ণ বলে, কোনো না কোনো ভাবে আমি মূর্তি পূজায় বিশ্বাস করেছিলাম। আমাদের বড় পুরোহিত কমরেড মিশ্র, কমরেড মুখার্জী ফুটছিলেন তাই প্রবল দমন-পীড়ন ও আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে থামাতে পারেনি। অভয় ছোট্ট করে বলে, সবার ক্ষেত্রেই একই অনুভব। ছুটতে থাকে কথার এক্কা গাড়ি। খবর আসতে থাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে দেওয়া হয়েছে অত্যাচারী শাসকের প্রতিভূ লুম্পেন কংগ্রেস পার্টির প্রতিটি ঠেক। ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হতে থাকে জেলে থাকা কমরেডরা। বিজয় আসন্ন কিন্তু ভেতর থেকে জেল ভাঙ্গার পরিকল্পনা মানে সুইসাইড করা। এ সত্য বুঝতে পেরে সকলে ঠিক হয় বাইরে থেকে জেলব্রেক করতে আসা বিপ্লবীদের নিয়ে ফোর্স যখন দিশাহারা হবে তখনই আঘাত হানতে হবে ভেতর থেকে। সীমা গোল গোল চোখে হ্যাঁ করে শুনছে। বাতাসী যৌবনে তার বাপের সাহসী অস্তিত্বের সাথে দিনযাপন করেছে কিন্তু এমন রুদ্ধশ্বাস গল্প সে কোনদিন শোনেনি। সে কৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করে,তোমার এত সাহস ছিল? সীমা বলে, আমি সেই সময়ে ওদের দেখেছি, আমি জানি ভালোবাসা থাকলে তবেই এমন হয়। বাতাসীর গলা শুনে বর্তমানে ফেরে কৃষ্ণ। দেখে তার কন্যাসমা পুত্রবধূ মেয়েলি আড্ডা ফেলে জাগরণের গল্পে ঢূকে পড়েছে। অঞ্জলি বলে, লড়াই শুধু গোলাবারুদ নয়, বিপ্লব হয় ঘরে, মানুষকে নিরন্তর নিজের সঙ্গে যুঝতে হয়। এই গ্রামের সীমাই বা কম কিসে? কৃষ্ণ সীমার দিকে তাকায়, প্রথম থেকেই কৃষ্ণর আগ্রহের কেন্দ্রস্থল ছিল সীমা। সীমা বলে,আমি আবার কী করলাম? দিলুদা যেমনটি শিখিয়েছে আমি ঠিক তেমনটি। দিলু বলে, উহু সীমা এক্কেবারে নিজের মতন। অঞ্জলির ইঙ্গিত অন্য কারও কাছে পরিস্কার হয় না। বাতাসী খোঁচা মারতে থাকে তার নতুন মাকে। অঞ্জলি ফস করে বলে বসে, একজন সধবার মাথায় সিঁদুরের লেশমাত্র নেই, কেন? আমরা যা পারিনি তা সীমা করে দেখিয়েছে এবং তা এই গ্রাম্য পরিবেশে। বিপ্লব ছাড়া একে কী বলবো? খেয়াল করে অন্যরা,অভয় ভাবে সত্যিই তো আমার চোখে কেন পৌঁছায়নি এই বার্তা। সীমা একটু ঘাবড়ে যায় তাহলে কি সে ধরা পড়ে গেল। তার ভাবনা কি প্রকাশ পেয়ে গেল অন্যদের কাছে? অভয় গল্পের খেই হারিয়ে যাচ্ছে দেখে বলে, সীমাকে নিয়ে আমরা পরে গবেষণা করব। এখন গল্পের পিঠে সওয়ার হওয়াই সমীচিন। সীমা রক্ষা পেয়ে যায়। কৃষ্ণ শুরু করে,প্রতিটি দিন রাজনৈতিক কয়েদিরা অপেক্ষা করে থাকে গোটা বর্ধমান জেলা মুক্তাঞ্চল হবে। পুলিশি অত্যাচার কমছে কারণ পুলিশ ফোর্সের অনেকে ভয় পেতে শুরু করেছে। কিছু লোভী নৃশংস পুলিশ অফিসার তখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে খবর আদায় করার। খবর আদায় করলেই প্রমোশন। মুক্তাঞ্চল গঠনের হাল-হকিকত জানা চাই। মার খেয়ে মরছে অন্য অপরাধীরা যাদের গায়ে বিপ্লবী তকমা পড়েছে। সবচেয়ে অসুবিধায় পড়েছে বোমা বাঁধা মিস্ত্রিরা। বোমা, বন্দুক যোগান দিত যারা কয়জন নেতার নাম ছাড়া তারা কিছুই জানেনা। পুলিশের খাতায় এরাই পান্ডা। বেদম প্যাদানি খেয়ে ওরাও মুক্তির দিন গোনে। রবি ঠাকুর লিখেছিলেন জেগে রব গভীর উপবাসে। বিপ্লব উপবাসী মন, জেলভাঙ্গা, মুক্তাঞ্চল করার নেশায় বুঁদ।
প্রতিটি মুহূর্ত জয়ের আকাঙ্ক্ষায় থাকা। আড়াইশো বছরের দাসত্বের থেকে বেরিয়ে আসার যুদ্ধ। কেবল মাত্র একবারই মোহনবাগান ক্লাব পরাধীন ভারতকে জেতাতে পেরেছিল। স্বাধীনতার পরেও বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তেভাগা পথ দেখালেও শ্রমজীবী মানুষের জয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এরই মধ্যে ইংল্যান্ডে লর্ডসে প্রথম টেস্ট শুরু হতে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের ক্যাপ্টেন স্নো, মাঠে অপমান করে গাভাসকার কে। ম্যানেজার আলেক বেডসার বাধ্য করেন স্নো কে ক্ষমা চাইতে। স্বাধীনতার প্রাপ্তি বলতে এটুকুই। জেলে কোন ওয়াগন ব্রেকার যখন অত্যাচারের মাত্রা সহ্য করতে না পেরে বলে,শালা মুক্তাঞ্চল হোক দেখে নেব। পুলিশ কেমন ঘাবড়ে যায়। ভারত টেক্কা দিচ্ছে লর্ডসে প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের ওপর। ফার্স্ট ইনিংসে ৩১৩, ইংল্যান্ডের ৩০৪ রানের জবাবে। বর্ধমান জেলা পুলিশ ও প্রথমে ভুলটা করে ফেলেছিল। উচ্চ নেতৃত্বর হটকারিতায় প্রকাশ পায় মুক্তাঞ্চলের গোপন খবর। গণপ্রহারে এগিয়েও বাহিনী কোচের পরামর্শে আক্রমনের রশি টেনে ধরে। এদের বাইরে থেকে শায়েস্তা করা যাবে না এদের সর্বনাশা আবেগই এদের মারবে। মারের বৃষ্টি থেমে যায় কিন্তু বৃষ্টির মারে পন্ড হয় লর্ডস টেস্ট। অজিত ওয়াদেকর ভাবতে শুরু করেছিল প্রথম বিদেশী মাঠে জয় আসন্ন। অপেক্ষায় থাকে দুই দল দ্বিতীয় মোকাবেলার টানটান উত্তেজনায়। শুধু বিদেশীদের নয় একবার বিদেশ দালাল মুৎসুদ্দিদের পরাজয় চেখে দেখা জরুরী।
টানটান উত্তেজনায় দ্বিতীয় টেস্ট শেষ হয়। সেখানেও বৃষ্টির আবির্ভাবে নিস্তার পায় ভারতীয় ক্রিকেট দল। সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করে,কেউ কিছু বলতে পারছে না কোথা থেকে ক্রিকেট এসে হাজির হলো।বীণা বিরক্ত হয়ে শেষমেশ বলেই ফেলল, ও দাদা কিছু যে হজম হচ্ছে না। অভয় বলে বীণা তোমার অন্তরের সুফিয়া কামাল যে কেন প্রস্থান করলেন? হেসে কপট রাগে বীণা বলে ‘তাঁকে তো তুমি আর তোমার মেয়ে কবেই হজম করে দিয়েছো। বেবি বলে ওঠে, ও কাকু একটু সহজ করে বলুন। কৃষ্ণ বলে, আমি গল্পের শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি। একটু ধৈর্য ধরে শোনো বুঝতে পারবে।
শুরু হল শেষ টেস্ট। বনকাপাসির এক সেন্ট্রি এদিক ওদিক তাকিয়ে তিন নম্বর সেলের কাছে হাজির হয়। প্রশান্তর সঙ্গে পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে খবর পৌঁছাত সেলে। প্রশান্ত এগিয়ে যায় গরাদের দিকে। উত্তর আসে বিপ্লবী স্কোয়াড রেডি, সময় মতো সব খবর পাবে। কিছুক্ষণ পর তিন নম্বর থেকে শ্লোগান উঠতে থাকে- বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। ভর সন্ধ্যায় কমরেড মুখার্জি সুরে সুর মেলান। উত্তেজনার পারদ চড়ছে। সেন্ট্রিরা কেউ এদিকের পথ মাড়চ্ছে না। গা ছমছম পরিবেশ। খবর যাচ্ছে উপরওয়ালাদের কাছে। গাড়ি গাড়ি পুলিশ, অফিসারে জেল বোঝাই হচ্ছে। বেদম মার খাচ্ছে ভারতীয় তিন স্পিনার। কোনরকমে ড্র করে ফিরতে পারলে বাঁচা যায়। তিনশত পাহাড় প্রমাণ রান বানাল ইংল্যান্ড প্রথম দিনে। দ্বিতীয় দিন ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেস্তে গেল। এদিকে নাগাড়ে চলেছে উপরওয়ালাদের উপস্থিতিতে ক্রিকেটের হাজারো ব্যাকরন বিরোধী শট। তিন, চার নম্বর সেলের দরজা খুলে ফেলে চলছে প্রয়োগ। লুম্পেন,ওয়াগব্রেকার,সামাজিক অপরাধী সব্বাই মুখে কুলুপ এঁটেছে। নিষ্ফলা দিন গেল ইংল্যান্ডের। তৃতীয় দিন দিলীপ সরদেশাই, ফারুক ইঞ্জিনিয়ার দাঁতে দাঁত চেপে খেলে যাচ্ছে। ভারতের ঝুলিতে ২৮৪ রান। খবর এসে গেছে কিছু একটা ঘটবে। পাটুলি, দাঁইহাট গ্রামের কমরেডরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত। বিপ্লবী স্কোয়াডে আক্রমণ শানাবে কুন্তীঘাট, বলাগড়ে লুকিয়ে আছে দুটি বড় স্কোয়াড। জিরাটের সঙ্গে যোগ দেবে তারা। ইংল্যান্ডের ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা। চন্দ্র প্রথমেই রান আউট করে দেয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক জনসনকে। ধ্বংসের শুরু এখান থেকে। বাঁহাতি এড্রিক ডান পায়ে এগিয়ে বলের লাইনে পা, মাথা নিয়ে মাটিতে বল কে দাবিয়ে রাখবে ভেবেছিল। সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল তার। কিন্তু আজকের চন্দ্রালোকে আলোকিত হবে এক দল আরেক দল হতভম্ব, বিস্মিত। বলের কি চোখ আছে সে কি ইচ্ছে অনুযায়ী চলতে পারে? অবাক করা চলনে লাল গোলা ব্যাট, প্যাডের সামান্য ফাঁক দিয়ে ছোবল মারে। লেগ এন্ড মিডল স্ট্যাম্প ভূপতিত। রাম হারামি এক সিপাই টহল দিচ্ছিল সেলের সামনে। একটু আলো-আঁধারি ৫ নম্বর সেল। হঠাৎ করে গরাদের ফাঁক দিয়ে পা বাড়িয়ে ল্যাং মেরে দেয় এক কমরেড, হুমড়ি খেয়ে পড়ে সিপাই। বোঝা যায় বেখেয়ালে ছিল সে, হয়তো জেল ভাঙ্গা আন্দোলনে নিজের পরিণতির কথা ভাবছিল সে। মুক্তাঞ্চল তৈরী হলে নিজেদের পশুর মত আচরণের কী শাস্তি পাওয়া উচিত হয়ত সেই ভাবনায় বিভোর ছিল। পাঁচ নম্বর থেকে ভেসে আসা উচ্ছাসে মুক্তির আশ্বাস। লজ্জা পেয়ে যায় অত্যাচারী সেপাই, হাতে বন্দুক নিয়ে মাথা নিচু করে সে ফিরে যাচ্ছে। ঠিক যেন এড্রিকের প্যাভিলিয়নে ফেরত যাওয়া। ফ্লেচার ব্যাট ঘোরাতে ঘোরাতে মাঠে নামছে। চন্দ্র রান আপ ছোটো কোরে নেয়। গুগলি, কেউটে সাপের মতো ছোবল দিল ফ্লেচারের ব্যাটে। ছোট করে চুমু খেয়ে জমি নেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে লাল ঘূর্ণি। “মাটি কাটি দংশে সর্প আয়ুহীন জনে”,আশেপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। ফরওয়ার্ড শর্ট লেগে সোলকার দাঁড়িয়েছিল। শুধু দেখা গেল আলোর গতিতে তার হাত পৌঁছে গেল বল আর জমির মাঝে। ফ্লেচার যেন ব্ল্যাক ম্যাজিক দেখতে এসেছিল! ক্যাপটেন ইলিংওয়ারথ কট এন্ড বোল্ড চন্দ্রশেখর। ডেরেক আন্ডারউড আর আল্যান নট শেষ যুদ্ধ শুরু করে। কমরেড মুখার্জি কম্যান্ড দেন, প্রস্তুত হন সবাই, আজ মুক্তির দিন। যে মুক্তি শুধু আমার আপনার নয়। এ মুক্তি সিএমের স্বপ্নের ভোর,এ মুক্তি চেয়ারম্যান এর দেখানো পথে বিশ্ববাসীর মুক্তি। কমরেড বন্ধুরা ছাড়াও এই জেলে উপস্থিত শোষিত জনগণ এই জয় আপনাদের। দাঁতে দাঁত চিপে আল্যান নট উইকেটে দাঁড়িয়ে। একটা লেগ ব্রেক সামলাতে গিয়ে প্রায় আছড়ে পড়ল উইকেটে। আন্ডারউড একটুর জন্য বেঁচে গেছে। চার নম্বর থেকে গান উঠেছে ‘কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট।’ পুলিশ যেন কেনিংটন ওভাল মাঠের দর্শক। মাঠে রাতের নিস্তব্ধতা। রাস্তার কুকুর যেমন গৃহস্থদের ভরসা যোগায় নিশুতি রাত পাহারায়, দু চারজন সেপাই তেমনি জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব।
সন্ধ্যা বেলা থেকেই গুলি বারুদ এর আওয়াজ শুরু হয়, তটস্থ পুলিশ। সেলে সেলে আছড়ে পড়ছে বিদ্রোহের ঢেউ। এগারো নম্বরের ওরা গরাদ ভেঙে বেরিয়ে পড়েছে। হয়তো কেউ প্রভুদের সাথে গদ্দারি করে খুলে দিয়েছে গেট। কে খুলেছে সেই হদিশ করার সময় পুলিশ বাহিনীর নেই। উন্মত্ত নকশালদের সেল বন্দি করাই আশু কর্তব্য। রান্নাঘর থেকে কিছু খুন্তি, হাতা জোগাড় হয়েছে তাই নিয়ে যুদ্ধ শুরু। বন্ধ সেলগুলো থেকে গান ‘ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’, সবার মুখে মুখে ফিরছে। বন্দুকের সাথে খুন্তি দিয়ে লড়াইয়ের হিম্মত একমাত্র বিপ্লবীরাই দেখাতে পারে! গুলি চলল পুলিশের বন্দুক থেকে। পড়ে আছে এক কমরেড গুলি খেয়ে। পুলিশের দল মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে লাশ। রাস্তায় বিপুল জনরব। এই বিপুল বাহিনী যদি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহলে মাটিতে মিশে যাবে বর্ধমান জেল। কলরব এগিয়ে আসছে সঙ্গে বারুদের গন্ধ। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা শবদেহ থেকে চুইয়ে পড়া রক্তস্রোত ঢাল বেয়ে গরাদের সামনে দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে রক্ত তিলক আঁকছে কেউকেউ। শপথ নিচ্ছে, ‘শহিদের রক্ত হবে নাকো ব্যর্থ।’ প্রশান্ত গোটা আবহে একমাত্র ব্যতিক্রম, ভিতরের কোনো এক দোলাচলে সে আঙুলের নখ দাঁতে কাটছে। একবার ওর হাত ধরে সবার মাঝে টেনে আনার চেষ্টা করলাম, ও পিছিয়ে গেল। জেলের দেওয়াল টপকে এসে পড়েছে বোমা। বাইরে থাকা সেন্ট্রিরা দরজা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকে এসেছে। জেল পুলিশ সিআরপিএফ এর অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করে বসে আছ। থেমে যায় কৃষ্ণ হঠাৎ, মুখ দিয়ে বাক্য সরছেনা আর। ওভালে এখন চা পানের বিরতি। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচের ধারাবিবরণী দিতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। থেমে গেলে তো চলবে না আপামর বিশ্ব লাভ খরচের হিসেব চাইবে। যোদ্ধাদের যে থামতে নেই। অভয় বলে, তারপর? কোনো উত্তর আসে না কৃষ্ণর কাছ থেকে। টেনশনে অর্ক বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। অবসন্ন কৃষ্ণ ধীরে নত মাথা তুলে সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলে‘তারপর এক নতুন মানুষের জন্ম। বুঝতে না পেরেও কেউ কোনো প্রশ্ন করেনা। আসলে গুলি বারুদ মনের ভুলছিল। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তৃতীয় টেস্টে ইংল্যান্ডের মাঠে ভারতের প্রথম জয়ের স্বীকৃতিতে এই উৎসব। কমরেডরা এই মিছিলকে ব্যবহার করে জেল আক্রমন করতে চেয়েছিল। কিন্তু সংখ্যায় তারা বিপুল মিছিলের তুলনায় বিন্দুবৎ নগণ্য। সব স্কোয়াড এসে যোগদানও করতে পারেনি এই মিছিলে। আদতে সাধারণ মানুষের কিছু যায় আসে না আমাদের পাগলামিতে। ধরা গলায় আর কিছু শুনতে পাওয়া যায়না।
গল্পের অভিঘাতে নষ্ট হয় অষ্টমঙ্গলার আমেজ। সবাই কেমন চুপ মেরেগেছে। হঠাৎ করে ছমছম শব্দ জানান দেয় নতুন কারও আগমন বার্তা। দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ে এক পাল বৃহন্নলা। চিৎকার করে বলে, কোথায় গো, টাকা আনো তাড়াতাড়ি। শাড়ি,বেলাউজ সবকিছুর দাম ধরে নেব। সঙ্গে তিন হাজার টাকা। দু পা পিছিয়ে গিয়ে বাতাসীর কানে কানে সীমা বলে, বল কবে আসতে বলব? বাতাসী বলে, তুমি না, তোমাকেও একটা উত্তর দিতে হবে তবে সে এখন নয়। মা আগে ওদের সামলাক। বীণা ওদের বোঝায় শুনেছ ঠিকই, চক্রবর্তী বাড়িতে পুত্র সন্তান এসেছে। পুকুরের ও পাড়ে ওদের বাস। চোখাচোখি হয়ে যায় বীণার সঙ্গে সেদিনের লছমির। স্মৃতির গহনে ডুব দিয়ে দুজনেই চিনতে পারে দুজনকে। মুখ থেকে কথা সরেনা কারও। সেদিনের লাজুক বীণা জিজ্ঞেস করে জানকী দিদির কথা। লছমি বলে, দিদি তুমি আমাদের মনে রেখেছো? কালাচাঁদ মেয়ে কেমন আছে, স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে ঘর করছেতো? বাতাসীর হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে এনে সীমা বলে, এই সেই মেয়ে, বিয়ের আট দিনের দিন এসেছে বাপের ঘর। লছমি জড়িয়ে ধরে বাতাসীকে, যেন এখনো সে সেই ছোট্ট মেয়েটি। তারপর আদর করে বলে ‘সুখবর দিস কিন্তু নাহলে আসবোনা। নিমন্ত্রণ করলে তবেই আসব। অর্কর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলে, ওরে আমার রাজপুত্তুর এতো দেরি করলি কেন বাবা? বৃষ্টি ঝরা বিকেলে যেমন হঠাৎ সূর্যালোক ঝলমল করে সবুজ পাতায় আলোর নাচন লাগায় ঠিক সেইরকম ঘরের আবহ বদলে যায় মুহূর্তে।
নতুন করে কেউ রাজনীতির আলোচনায় ঢুকতে চায় না। হইচই করে গান, গল্পে, নাটকে কেটে যায় সন্ধ্যা, সঙ্গে ভূরিভোজ। সাতটায় ফেরার ট্রেন। সাড়ে আটটায- নটায় বাড়ি পৌঁছে যাবে ওরা। বাতাসীকে সীমা জিজ্ঞেস করে, কী জানতে চেয়েছিলিস বললি না তো? বলেই ফেলে বাতাসী শেষমেশ। পিসির কাছে ওর কিসের সংকোচ। সীমা কিন্তু একটু হলেও থমকে যায়, মুহূর্তের রেশ কাটিয়ে উঠে সে বলে, তোকে সত্য জানাতে কোনও আপত্তি নেই। আশাকরি লুকিয়ে রাখবি নিজের কাছে। সেদিন তোর কাছে দ্বিধা ছিল, আজ নেই। তোর হাবা কাকা যখন রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল আমি বুঝতে পারছিলাম সে আর বেশিদিন নেই। তাই বছর খানেক সময় ধরেই আমি সিঁথির সিঁদুর তুলতে থাকি। কৌতূহলী চোখকে আড়াল করতে চেয়েছিলাম। হাবাকে যে অপমান করেছিলাম তার কোনো ক্ষমা নেই। আমার চিনতে ভুল হয়েছিল হাবাগোবা মানুষের ছদ্মবেশে থাকা সিংহ হৃদয় এই মানুষটাকে। বলতে পারিস এ আমার প্রায়শ্চিত্ত। অবাক বাতাসী জিগেস করে, হারু কাকা কিছু বলেনা? সীমা জানায়, তোর মনে হয়তো প্রশ্ন জাগছে হারুর সঙ্গে আমার সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে। জেনে রাখা ভালো, আমি তোর হারুকাকা কে আজও ভালোবাসি। ভোলেভালা মানুষটা খেয়ালই করেনি আস্তে আস্তে কখন আমার সিঁদুরের রঙ ফিকে হয়ে গেলো। শ্রদ্ধায়, ভালবাসায় হাবা আমার কাছে উজ্জ্বল ধ্রুবতারা আর হারু ঘরের কোণের সেই প্রদীপটি, যে নিঃশর্ত আলো যুগিয়ে যায় অন্ধকারে। চুপ করে যায় বাতাসী। সবাই মিলে হৈ চৈ তুলে স্টেশনে যাবে ওদের ট্রেনে তুলে দিতে। চিকচিকে জল বীণার চোখের কোণে। অভয় আর কৃষ্ণ প্রথম বাড়ির বাইরে পা ফেলে। মেয়েরা বাতাসীকে ঘিরে রেখেছে। তোমরা আমার ঘরের মেয়েকে বেঁধে রাখছো কেন? অঞ্জলির কথায় লজ্জা পেয়ে বীণা বলে, যা মা তোর নতুন মায়ের কাছে। হাসির রোল ওঠে বাইরে। বাইরে পা ফেলেই বাতাসী দেখে বদমাশ অনন্ত মন্ডল তার বাপের হাতে একটা ভাঁড় জমা দিচ্ছে। অভয়ের প্রশ্নে অনন্ত বলে, কানুর মাছ ধরতে বেলা হয়ে গেছিল। ওর মা কেটেকুটে নুন হলুদ মাখিয়ে টাটকা মাছ মেয়েটার যাবার আগে দিতে কইলো। বাতাসী কিছু বলতে যাচ্ছিল, হাতের ঈশারায় অভয় ওকে থামিযে দেয়। অভয় বলে, অনন্ত, আমাদের সাথে চলো। মাথা নিচু করে অনন্ত, কিছু না বলে যেমন ছিল তেমন ফিরে যায। অভয় তার না বলা কথার সূত্র ধরে পায়ে পায়ে এগোতে থাকে।
কে এই অনন্ত মন্ডল? কৃষ্ণর প্রশ্নর উত্তরে অভয় শুরু করে, হাবা এই গ্রামের এক হাবাগোবা সন্তান। সবার তাচ্ছিল্যে বড় হয়েছিল সে। আপনার পার্টির কমরেডরা কিন্তু ওকে চিনতে ভুল করেনি। হাবা আদতে ছিল খাঁটি সোনা। দাঁড় বাইতে বাইতে মেছুড়ে হাবা দেখে,খালপাড়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে এই মানুষটি। চোখেমুখে জল দিলে তার ঘোর কাটে। বেশ কয়েকদিন অভুক্ত অনন্ত ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে শূন্য দৃষ্টিতে। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। মাঘের শীতে গায়ে মলিন পাতলা জামা ঠকঠক করে কাঁপছে মানুষটা। ওকে যত্ন করে ঘরে এনে তোলে হাবা। চিৎকার করতে থাকে হাবার বউ ফেলা– নিজেদের খাবার জোগান নেই পেট বাড়িয়ে ভাগ কমানোর দুর্বুদ্ধি যত। ফেলা জানতো না ওর ভবিতব্য। অনন্ত সুস্থ হয়ে ওঠে। একদিন রাস্তায় হাবা আমাকে দেখে ধরে নিয়ে যায় ওর বাড়ি। পরিচয় হয় অনন্ত মন্ডল এর সঙ্গে। পূর্ববাংলার লোক অসময়ে এই বাংলায় পাড়ি দিয়েছিলেন। তারপর দণ্ডকারণ্যে থাকার বন্দোবস্ত হয় ওদের। হাবা এখন আমার শরণাপন্ন। অনন্তর আলাদা থাকার বন্দোবস্ত করতে চায় সে। আমি বলি, এক কাজ করো পাশেই ঢিবির ওপর একটা ছাউনি তুলে দাও। শক্ত সমর্থ পুরুষ আপাতত তোমার সাথে মাছ ধরতে যাক। কাঠকুটো, খড় জোগাড় করে ছোট ঘর মাথা তুলে দাঁড়ায়। এরপর থেকে দুজনে একসাথে মাছ ধরতে যায়। পূর্ববঙ্গে থাকা মানুষ জীবনের সঙ্গে নদীর যোগ। তিন-চারগুণ মাছ পড়তে থাকে জালে। অনন্তর প্রয়োজনই বা কি? বেশিরভাগটাই কানু আর ফেলার সংসারে ঢোকে। বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে হাবার পরিবারের সঙ্গে অনন্তর। তারপর আসে সেই ভয়ঙ্কর দিন যেদিন হাবা অনন্তকে বলে, আমার শরীরটা ঠিক নেই,মাছ ও তেমন পড়েনি জালে, তুমি এগিয়ে যাও আমি বরং একটু জিরিয়ে নিই। নৌকায় এগিয়ে চলে অনন্ত। বউ, ছেলে, মা কে ফেলে আসার স্মৃতি ভিড় করে আসছিল তার মনে। তারা যেন দূর আকাশ থেকে বলছিল, বেশ আছো আমাদের ফেলে। সময়ের খেয়ালে আজ অনন্ত বেখেয়ালি। কেবলমাত্র রাতগুলো ওর একাকীত্বে ফেলে আসা স্মৃতির ঢেউ দিয়ে যায়। সূর্য উঠলেই আবার কঠিন জীবন, নতুন করে দাঁড় বেয়ে চলা। মন বসানোর অক্ষম চেষ্টা। আজ আর ফিরে আসার টান নেই অনেক মাছ ধরা পড়েছে যদিও না পড়লেও ক্ষতি ছিল না। গনগনে রোদ্দুর আকাশ বেয়ে কখন যে হঠাৎ নেমে গেছে খেয়াল করতে পারেনি সে। ঝলমলে রোদ তরঙ্গের মাথা ছুঁয়ে ধাক্কা মারছে চোখে। দেরি হয়ে গেছে বড্ড। হাবাদার শরীরটাও ভালো নেই, ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি। জানপ্রান দিয়ে দাঁড় বাইতে থাকে অনন্ত। হাবা যে ঘাটে নেমেছিল সেই ঘাটে পৌঁছে অনন্ত দেখে হাবাদা যেমনটি শুয়েছিল ঠিক তেমনটি পড়ে আছে। অনন্ত খুব ভয় পেয়ে যায়। এই অজানা দেশে নতুন করে প্রাণে ভয়ের উদ্রেক হতে পারে অনন্ত সে কথা ভাবেনি কখনো। নৌকায় রাখা জলের ঝাপট দিতে থাকে হাবার চোখে মুখে। হাবা চোখ চেয়ে দেখে। অনন্ত শত চেষ্টা করেও হাবার এলিয়ে যাওয়া কথা কিছু বুঝতে পারে না। হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে সে বলতে থাকে, হাবাদা ওঠ,তোরা কেউ কি একটুও শান্তি দিবিনা আমায়। তার বলিষ্ঠ দুই হাত পিঠে তুলে নেয় হাবাকে। তরতর করে জল কেটে নৌকা ছুটতে থাকে ঘাটপানে। নতুনদেশ, নতুন ঘর, নতুন লড়াই। যদিও এ নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ নেই অনন্তর। একটা ভ্যান জোগাড় করে অনন্ত হাসপাতালের ডাক্তারের কাছে হাবাকে নিয়ে যায়। ডাক্তার বলে, ওর শরীরের একদিক পড়ে গেছে, কিচ্ছু করার নেই। এভাবেই ধীরে ধীরে রোগী মৃত্যুর ডাকে সাড়া দিতে এগিয়ে যাবে। থেমে যায় অভয়। স্টেশনে এসে গেছে। এই গল্প গ্রামের অনেকের জানা, শুধু বাতাসীই অবজ্ঞা করে শুনতে চায়নি কখনো। কারণ ও বিশ্বাস করে অনন্তর হাতে খুন হয়েছে কাকা। ট্রেন আসতে বেশ কিছুক্ষণ দেরি হওয়ায় অভয় তড়িঘড়ি শুরু করে গল্পের দ্বিতীয় ভাগ।
হাবা আন্দাজ করতে পেরেছিল ভবিতব্য। সে একদিন অনন্তকে ইঙ্গিতে জানিয়েছিল আমার কথা। অনন্ত আমাকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে হাজির করেছিল হাবার ঘরে। সেখানেই জানতে পারলাম, এই অজানা-অচেনা মানুষটাই হাবার সংসার জোয়াল কাঁধে বয়ে নিয়ে চলেছে। কানুকেও পুত্র স্নেহে জাত মেছুড়ে তৈরী করার সঙ্কল্প নিয়েছে সে। হাবার বদলে কানু এখন অনন্তর জুড়িদার। হাবার জ্ঞান একেবারে নেই তা নয়, সে আমায় সহজেই চিনতে পারল। হাবা চোখ তুলে আমাকে কিছু বলতে চাইছিল। ওর শরীরী ভাষা জানান দিচ্ছে ও গভীর কিছু বলতে চায়। আমি পাশে বসে পড়ে ওর হাতটা চেপে ধরি। ওর চোখে অবিশ্রাম জলের ধারা। আমি ওর কথা কিসসু বুঝতে পারছিলাম না। ঘরে কানু আছে,ফেলা গেরস্থালির কাজে ঘরবার করছে। হাবার কথা বুঝতে না পেরে আমি হাঁক দিয়ে ফেলাকে ডাকি। ফেলা ততদিনে হাবার পঙ্গু জীবনের ভাষা পড়তে শিখে গেছে। ফেলা দৌড়ে গিয়ে অনন্তকে ডেকে আনে। আমার সামনে হাবা অনন্তকে মৌন শরীরী ভাষায় কিছু বলতে চায়। লজ্জা পেয়ে অনন্ত মাথা নিচু করে। ফেলা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি ও কী বলতে চাইছে? কেউ কোনো উত্তর করে না। আমি হাবার করতল স্পর্শ করলে সে তার সংহত শক্তি দিয়ে মাথা নেড়ে আমাকে বোঝানোর অক্ষম চেষ্টা করে। শুধু ওর এক চোখের কালো মণি কোটরে ডাইনে-বাঁয়ে হতে থাকে। আমি পড়তে পারি ওর ইচ্ছেরহস্য। আমার আর কিছু বুঝতে অসুবিধা হয় না। হাবা আমাকে ডেকে এনে সকলের সামনে ওর পরিবার পরিজনকে এই সব হারানো মানুষটার হাতে তুলে দিতে চায়। এমন অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হওয়া আমার জীবনের এই প্রথম। আমি নিজেকে এমন বোধহীন নির্বাক হতে কখনো দেখিনি। কয়েক মাসের মধ্যেই হাবা তার সাধের দুনিয়া জল জমিন পরিজন ছেড়ে চলে যায়। যাবার আগে সে বলেছিল তাকে বেঁচে থাকতে থাকতে ক্যানেলের ধারে রেখে আসতে। ওর পরিবার তা চায়নি। আমার অনুরোধে ওরা শেষ কদিন হাবার সাথে নদীর ধারে গাছ তলায় ছাউনি বেঁধে কাটায়। হাবা নির্বাক চোখে আকাশ, নদী,গাছ, ডিঙ্গি নাও দেখতে দেখতে ওর সাধের জগত ছেড়ে চলে যায়।
ট্রেন আসার ঘোষণা হয়েছে ততক্ষণে। গাংপুর স্টেশন ছেড়ে ট্রেন এখন শক্তিগড়ের দিকে। গল্পের অবিশ্বাস্য বাঁক বদলে হতবাক সক্কলে। অর্ক জিজ্ঞেস করে, কিন্তু, আপনার নতুন জীবনের চাবিকাঠি জানতে পারলাম কই? অভয় বলে, অনন্তর অপার অনন্ত অভিজ্ঞতা ওর দণ্ডকারণ্যের জীবন। শ্যাম চ্যাটার্জির ডাকে মরিচঝাঁপি ফিরে আসা। সেখানে গুছিয়ে সমাজ গঠন। বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে লড়াকু অস্তিত্ব কায়েম করতে সেখানে তৃতীয় কারও সাহায্যর প্রয়োজন হয়নি। সরকারের কোন ভূমিকা ছিল না ওদের নিত্য দিনের সাবলীল চলায়। ওদের পৃথিবী, শরীর এবং মস্তিস্কর সাধনে নির্মিত। এই স্বনির্ভরতা, ভোটে জিতে আসা বাম সরকার মান্যতা দিতে পারেনি। তাই বাঘের দোহাই দিয়ে ওদের ভিটেমাটি চাটি করে দিতে সরকারের বাঁধেনি। অর্ক বলে, বাঘের দোহাই মানে? সুন্দরবনে বাঘের বাসা, তাই বাঘের জঙ্গলে মানুষের বাস চলতে পারে না। এই অছিলায় বাঁচতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাজনীতিহীন মানুষগুলো কে মৃত্যুর মুখোমুখি ঠেলে দেয় আমার দল,আমার সরকার। সত্যি, আজ আমার হাবার মত মনে হয় বাঁচার জন্য জল জমিন আসমানের বেশী কিছু প্রয়োজন নেই। ট্রেনের শব্দে চাপা পড়ে যায় অভয়ের কণ্ঠস্বর। ঝপঝপ করে উঠে পড়ে চারজন, ফাঁকা কামরা। জানলার এক কোণে অক্ষম আড়াল নিয়ে বসে আছে বাতাসী। তার চোখে অঝোর নদী। হঠাৎ ‘অনন্তকাকা’ বলে ডেকে ওঠে মেয়ে।
পঁয়ত্রিশ
ঘামের জলে নৌকা থামা বন্ধ কল
এক একটা দিন রাতের সন্ধানে হুড়োহুড়ি ফেলে দেয়। কোনরকমে আধো তন্দ্রায দিন কাটতে থাকে ওদের। সব কাজ মাথায় ওঠার জোগাড়। ধীর স্থির অর্ককে দেখে আন্দাজ পাওয়া যায় না। বাতাসী ধরা পড়ে যায় সহ শিক্ষিকাদের চোখে। বাতাসী এলোমেলো হাওয়ায় শুকনো পাতা উড়িয়ে দিতে জানে। তবে ছাত্রীদের অপরিণত চোখ যখন হানা দেয় শরীরের ভূগোলে অথবা মনের জানলায় তখন সে কুণ্ঠিত হয়। নবম শ্রেণীর শ্রেয়া কেমিকাল বন্ড পড়ানোর সময় তাকে জিজ্ঞেস করে,দিদি, সব বন্ধন কি ফেভিকলের অটুট জোড়? হতচকিত বাতাসী বলে, মানে? শ্রেয়াও তৎক্ষণাৎ পাল্টা প্রশ্নে জিগেস করে, সমযোজী বন্ধন কি অটুট? শ্রেয়ার প্রশ্নের রহস্য ভেদ করতে বাতাসী বলে, কোন বন্ধনই চিরস্থায়ী নয়। বাইরের অথবা অন্তর্নিহিত শক্তি প্রয়োগ করে সব বন্ধনই ভাঙা যেতে পারে। এই উত্তর থামাতে পারেনা এ্যসিস্টেন্ট হেড মিস্ট্রেসের মেয়েকে। এ্যসিস্টেন্ট হেড মিস্ট্রেস আবার বাতাসী প্রতিদ্বন্দ্বী। লুকিয়ে মেয়ে বাতাসীকে নিয়ে তার মা বাবার চর্চা শুনেছে। স্কুলের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাতাসী দিদিমণি কে একবার দেখে শ্রেয়ার বাবাও যে ফিদা হবে মেয়ের তা ধারণার অতীত ছিল। সেই থেকেই মেয়ের রাগ। শ্রেয়া একটু বেড়ে খেলে। মায়ের ভাষা উঠে আসে শ্রেয়ার কন্ঠে। সে জিজ্ঞেস করে বুড়ো বয়সের জোড়, পাক্কা শক্তপোক্ত হয়? ক্লাসের ডেঁপো মেয়েরা হেসে উঠলেও গোটা ক্লাস এমন অশালীন প্রশ্নে চুপ মেরে গেছে। পেছনের বেঞ্চি থেকে একজন বলে ওঠে শ্রেয়াকে ক্লাস থেকে বার করে দিন ম্যাম। বাতাসী উঁচু পাটাতন ছেড়ে সমতলে নেমে আসে। তারপর একবার পায়চারি করে শ্রেয়ার সামনে দাঁড়ায়। শ্রেয়াও দিদিমণির চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। বাতাসী নিজের জায়গায় ফিরে এসে সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, আমাকে নিয়ে আমার নতুন জীবন নিয়ে যাদের বাড়িতে আলোচনা হয় না তারা হাত তোল। শ্রেয়া হতবুদ্ধি হয়ে হাত তুলতে ভুলে যায়। বাকিদের সবাই ঊর্ধ্ববাহু। থতমত খেয়ে শ্রেয়া হঠাৎ ঊর্ধ্বে হাত তোলার চেষ্টা করে। ততক্ষণে সবার হাত যথাস্থানে নেমে এসেছে। বাতাসী ছাত্রীদের বলে, তাহলে তোমরা নিশ্চয়ই বুঝেছ এই কুটিলতায় শ্রেয়ার দোষ নেই। এক ঘর সহপাঠীর সামনে বেআব্রু হয়ে মাথা নিচু করে শ্রেয়া। ছোটবেলা থেকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার এই খেলা বাতাসী রপ্ত করেছে।
মসৃণ পিচ ঢালাই হাইওয়েতে ছুটতে থাকে যৌথ জীবনের মার্সিডিজ। পারলে প্রতিটা শনি রবিবারে, “তারা দেয় ছুট”। অঞ্জলি বলে, ইস বেকার শনিবার হাফবেলার জন্য একটা গোটা দিন নষ্ট করছিস। এক কাজ কর তোদের তেমন লোকসান হবে না। বাতাসী উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে, লাভ হবে কিভাবে? অঞ্জলি বলে,আমি আর তোর বাবা শনিবার ঘুরতে চলে যাব সোমবার করে ফিরব । আচ্ছা আমরা নয় বাসন্তীকেও সঙ্গে নিয়ে যাব। পয়সাও খরচ হবে না পাহাড় নদীর ছবি পাল্টে পাল্টে ঘরে সাজিয়ে রাখবি। প্রতি সপ্তাহে হানিমুন হবে। কী বলিস? বাতাসী নিজ ঘরে প্রবেশ করার আগে বলে যায়, মা তোমার ছেলেকে বুদ্ধিটা দাও। অঞ্জলি বলে, ওরে বাবা একটা শয়তানিকে শেষমেশ ঘরে আনলাম। যতই ইয়ার্কি হোক ওদের থামানো যায় না। মাঝে মধ্যে যদিও কৃষ্ণ অঞ্জলিরও সঙ্গী হয়। তবে এবারে নয়। এবারের গন্তব্য গঙ্গার তীরে অবস্থিত হাজিপুর গ্রাম।
বিয়ের আগে ওদের অনেক বিষয়ে কথা চললেও দুজনেই যে কবি ওয়াটসওয়ার্থের ভক্ত তা উভয়েরই জানা ছিল না। মহাকবিকে লুকিয়ে রেখেছিল ওরা মনের কোনে। ফুলশয্যা উৎযাপনে মহাকবির অনুভূতিগুলি শাসন করুক এমনই আশা ছিল পৃথকভাবে উভয়ের। কবির প্রকৃতি প্রেম বাতাসী কে আবিষ্ঠ করলেও গানের প্রতিযোগিতা ছাড়া বাতাসীর গ্রামের বাইরে পা ফেলার সুযোগ মেলেনি কখনো। তাই বিয়ের রাতেই, "দেখব এবার জগতটাকে" এই শপথ বাক্য অর্ককে পাঠ করতে হয়েছিল।
হাজিপুর গঙ্গা তীরবর্তী একটি গ্রাম। যেখানে গঙ্গানদীর এপার ওপার দেখা যায় না। হাজিপুর আড়াইশো বছর পূর্বের নাম। গ্রামের বাসিন্দাদের কাছেও আজকের দিনে এই নাম অচেনা। সাগরে যাবার আগে গঙ্গা,বরুণ নারায়ণ আর হলদি নদীর জলে পুষ্ট হয়ে কুল হারিয়ে অপার। ভিনদেশি মানুষ নিজস্ব মোকামে যাওয়ার প্রাক্কালে জাহাজের অপেক্ষায় এখানে আশ্রয় নিত। হাজিপুরই আজকের ডায়মন্ড হারবার। ওরা প্রথমে চিংড়িখালি দুর্গ দেখতে যায় যা আজ শুধুই ধ্বংসাবশেষ। তিনশ বছর আগে পর্তুগিজ জলদস্যুর আক্রমণে এই দুর্গ বিধ্বস্ত হয়েছিল। বাতাসীর কেমন গা ছমছম করে। সে অর্ককে বলে, আমার বড় ভয় লাগছে। অর্ক ভেবে উঠতে পারে না সুপ্রাচীন ধ্বংসাবশেষ কোন কারণে ভয়ের ঈঙ্গিত বাহী।
ভয়ের আবহ অনত্রও ছড়িয়ে পড়েছে। আজ কী করে মনীষ বাবুকে আমলারা সামলাবেন এই আলোচনা যখন বাউরিয়ায় তুঙ্গে তখন সত্যি সত্যিই মনীষকে নিয়ে মহাকরণে হিমশিম খাচ্ছে কয়জন আমলা। মুখ্যমন্ত্রী কে আমলারা কথা দিয়েছে আজ মনীষবধ পর্ব সাঙ্গ হবে। হঠাৎ করে অর্ক আর বাতাসী কোওপারেটিভের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, তাদের কাঁধে ব্যাগ। ত্রিদিব সঙ্গে সঙ্গে ছুঁড়ে দেয়- কোথা থেকে অনাহুতর মত হাজির হলেন আপনারা? ভূষনদা বলেন, হিসাব চাই এই কদিনে কোন কাজে তোমাদের পাওয়া গেল না কেন? বাতাসী ভূষনদার দিকে তাকিয়ে বলে, ত্রিদিবদার মানা ছিল তাই আসিনি। অর্ক ভূষনদাকে এড়িয়ে হাজীপুরের পালা শুরু করে। মুজিব বলে, বিহারের হাজিপুর আবার কবে থেকে ভ্রমণের জায়গা হল! অর্ক বলে, এ হাজিপুর সে হাজিপুর নয়। হাজিপুর ডায়মন্ড হারবার এর পুরানো নাম। পর্তুগিজ জলদস্যুরা তিনশ বছর আগে ধ্বংস করতে চেয়েছিল এর ঐতিহ্য। ত্রিদিব বলে, যেমন? অর্ক শিক্ষকের ভঙ্গিমায় বলে, রূপনারায়ণ হলদি নদীর সঙ্গমস্থলে এ এক আশ্চর্য জায়গা। ইউরোপ যাত্রার প্রাক্কালে যেখানে ইংরেজদের সপ্তাহ ভোর অপেক্ষায় সময় কাটাতো। সঙ্গম কথাটা অর্ক জোর দিয়ে বলায় আরিফ হেসে ফেলে। ভূষনদার কঠিন চোখে ধরা পড়ে গিয়ে আরিফ লুকিয়ে ফেলে হাসি। অর্ক না বুঝলেও বাতাসী আপন বোধে আরিফকে বোঝে। সে চিংড়িখালি দুর্গের গল্প বলে নদীর মিলন ঘটিত বিষয় থেকে সরতে চায়। দুর্গ পার হয়ে আমরা লাইট হাউজের দিকে আসি। যেখান থেকে জাহাজের গতিপথ দেখা যেত। লাইট হাউসের মাথায় ওঠার ইচ্ছে জাগে মনে। অথচ মনে ভয়। বাতাসীর এই কথায় ত্রিদিব বলে স্বয়ং অর্ক যার সাথে আছে তার আবার ভয় কিসের? সবাই এ ওর দিকে তাকায়। ভয় নেই বুঝি অর্ক জিজ্ঞেস করে? বাতাসী অর্ক কথায় কান না দিয়ে বলে চলে, দগদগে ঘা এর মত লাল ইট ইতিহাস ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নিঝুম অন্ধকার দিনের আলো গ্রাস করেছে। গা ছমছমে পরিবেশ। ভাঙা সিঁড়িতে মাঝে মধ্যে পা ফসকে যাচ্ছে। লাইট হাউজের পেঁচানো চওড়া বৃহদাকৃতি সিঁড়ি মোবাইল টর্চের আলো গিলে খাচ্ছে। কথা কেড়ে নিয়ে অর্ক নাটকীয় ভঙ্গিমায় বলে, হঠাৎ করে ঝটপটিয়ে বাদুড় না কি ছাই একটা উড়ে গেল। ঠিক এই কারনেই গল্পের রাশ নিজের হাতে টেনে রেখেছিল বাতাসী। অবসম্ভাবী প্রশ্ন এলো, তারপর? কী বলবে ভেবে না পেয়ে অর্ক থেমে যায়। শুক্লা চোখের ঈশারায় জিজ্ঞেস করে, তারপর? অর্ক বলে, দিদি তোমার সাহসী মেয়ে ভয় পেয়ে চিল চিৎকারে স্তব্ধতার দফা রফা করে দিল। বাতাসী ভাবে যাক বাবা বাঁচা গেছে। আরিফ চির ছ্যাবলা। সে চুপ করে না থেকে বলে, অর্ক ভয় পেলে নারীশক্তি কী করে? উত্তর আসছে না দেখে আরিফ বলে, জড়িয়ে ধরে তার পুরুষকে, ঠিক কিনা? পেছন থেকে রব ওঠে ঠিক,ঠিক। বাতাসী বলে, অর্ক আমাকে সাহস দিয়ে বাতিঘরের শীর্ষে নিয়ে যায়। গঙ্গার আকাশে তখন ঘন কালো মেঘ। মোচার খোলার মতো ভাসছে নৌকাগুলো মাঝ নদীতে। এপারে জমজমাট মফস্বল। পশ্চিম দিগন্তে কুকুরহাটি। যার আকাশে সাদা মেঘের চাদর। গঙ্গার আকাশে জমা কালো মেঘের সমান্তরালে ক্ষীন আশার বলিরেখা। অপার্থিব ভয়াল সৌন্দর্য। বাতাসী বলে, আমি দুর আলোর দেশে যেতে নৌকোয় সওয়ার হতে চাইলে অর্ক সহমত হয়ে আমার হাত ধরে। পায়ে পায়ে নেমে এসে আমরা নদীর দিকে যাই। অর্ক পথে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ঝড় এলে? আমি বলি, তুমি আছতো ঠিক পার হয়ে যাব। জেটিতে এসে ভটভটির খোঁজ মেলে না। অপেক্ষায়মান যাত্রীর সংখ্যাও বেশি না। ঘাটে শুয়ে আছে এক ফকির। বাতাসী গল্পের রাশ নিজের হাতে রাখতে চায়। অর্ক বলে, না আমাকেই বলতে হবে। ফকির সম্ভবত কুরকুরহাটি যাবে। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। কালো আলখাল্লায় মোড়া শরীরে লাল উষ্ণীচ। ওপারে পশ্চিমের ক্ষীণ আলো মেঘ পেরিয়ে ফকিরের দাড়িতে রং ধরিয়েছে। ঐ মুহূর্তে আকাশের একমাত্র কাজ আলোর সাথে যুক্তি করে ফকিরের দাড়িতে রং মাখানো। চুপটি করে সবাই শুনছে। বাতাসী অবাক হয়ে গিলছে ফকিরকে। বাতাসী প্রতিবাদ করে বলে, শুধু আমার কথা বলছ কেন তুমিও হাঁ করে গিলছিলে। অর্ক বলে,ঠিক, তুমি মুগ্ধতায় আর আমি গানের তৃষায়। টের পেয়ে যায় ফকির। বৃদ্ধ ফকিরের চোখ সরতেই চায় না। বাতাসী হতভম্ভ কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। আমি বাতাসীর সাথে অবান্তর কথা বলতে থাকি।ফকিরকে নিরুৎসাহিত করা যায় না। বাতাসী আর ফকিরের চোখের সরলরেখায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে তবেই আমার শান্তি। ভাবলাম ফকিরি চাহনিতে বুঝি বউ বেহাত হলো। হাসির ফোয়ারা ওঠে আড্ডায়। ত্রিদিব বলে,ভায়া তুমি এই কদিনে বড় হয়ে গেছ। বাতাসী সবার সামনে অর্ককে গুমাগুম কিন মারতে থাকে। অর্ক ঘর থেকে দৌড়ে পালায়। সবাইকে অবাক করে ভূষনদা জিজ্ঞেস করে, তারপর? বিষ্ময়ে বাতাসী চেয়ে থাকে ভূষনদার দিকে। তারপর আর কি দোতারার কান মুড়ে চড়া সুরে বাঁধা পড়ে ফকির। 'বন্ধু কই রইলারে" র উদাত্ত সুরে নদী তীর ধন্য হয়। কখন গান শেষ হয়ে গেছে টের পাইনি। বাতাসী কথা শেষ করার সুযোগ পায় না। অর্ক কথার রাশ টেনে বলে, হঠাৎ খেয়াল হয় ফকিরকে অবাক দৃষ্টিতে বাতাসীর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে। বাতাসীও বিহ্বল সে বলে, এত নির্মলেন্দু বাবুর গান। নিজের সুরে বাজুন। ফকির দ্বিধাহীন চিত্তে বলে, তুমি খুব সুন্দর এবং বুদ্ধিমতী তোমার হাতটা একটু ধরব? আরিফ জিগেস করে,তারপর? তারপর আর কি বাতাসী হস্তান্তর করল। জলের ঢেউয়ে পন্টুন ভাসছে। আমি অবাক দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছি। বুঝতে পারছি না কিসের আবেশ ফকিরি দৃষ্টিতে, বাৎসল্য না প্রেম। দোতারা ফকিরের শরীরে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে। দোতারা যন্ত্রটা বোধহয় নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। সেটাকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে টুংটাং করে গান ধরলাম। ভাবটা আমিই তোমার ফকির। বাতাসী অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাতাসীর দুহাত তখনও ফকিরের হাতে বন্দি। আমি গলা ছেড়ে গান ধরলাম- ভালোবাসা পোড়ায় যে মন/ পোড়ে না তো অঙ্গ/ এ কেমন রঙ্গ জাদু এ কেমন রঙ্গ।
গান থামার আগেই জেঠিঘাটের ভেঁপু বাজতে শুরু করে। বাতাসী প্রায় জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে কুরকুরহাটের লঞ্চ ধরতে এগিয়ে যায়। আমিও চলি পিছুপিছু। জলযান অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। ফকির তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষন। রফিক বলে, কোথায় অকুল দরিয়ায় প্রেম নাও ভাসাবে দুজনে তা নয় কোথা থেকে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে জুটলো এক বুড়ো ফকির। আরিফ ফের ফুট কাটে, এই অর্কদা, তোমার ফাটছিল? অর্ক উত্তর না করায় রফিক বলে, ভাগ্যিস এমনটা ঘটলো নাহলে কি তোমরা রণেভঙ্গ দিয়ে নদী পার হয়ে এসে বাউরিয়ায় জুটতে? অর্ক বলে, শেষ পর্যন্ত শুনবে না তো? রত্না অতি উৎসাহে বলে, মনীষদা এলেন বলে তাড়াতাড়ি শেষ কর। অর্ক শুরু করে দেয়- অথৈ জলের জোয়ারের টানে বাতাসীর মন ব্যাকুল। বাতাসীর হঠাৎ নিজের মধ্যে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করে, কিছু মনে করলে না তো? আমি বললাম, নাঃ। ব্যপারটা একটু তরল হয়ে গেল। বাতাসী বলে চলে, এইসব সাধু, ফকির জীবন ধর্ম ত্যাগ করে হতাশায় বৈরাগী হয়। বৈরাগ্য সাধনায় মন ছাই চাপা থাকে মাত্র। হঠাৎ সময়, সুযোগ করে দিলে এরা বেআব্রু। আমি বললাম কে সুযোগ করে দিল বাতাসী অভিযোগের সুরে বলল, তুমি। হ্যাঁ তুমি ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে পারতে। আমি হেসে বলি তুমি তো ফকিরের কাছ থেকে হাতটা সরিয়ে নিতে পারতে। বাতাসী বললো, বাঁধল্, বৃদ্ধ মানুষ আর তুমি তো আছোই কি আর করবে? আমি বললাম, একদম ঠিক। বাসে ট্রেনে অনুমতি ছাড়াই কত মানুষ নারী শরীর স্পর্শ করে উনি তো হস্তভিক্ষা চেয়েছেন। আমার বাবা স্নেহের বসে তোমার হাতদুটো যদি ধরতে চান আমি বা তুমি কি কিছু মনে করব? আকাশের মেঘ প্রবল হাওয়ায় কখন উবে গেছে কেউ খেয়াল করিনি। আকাশজোড়া নীল প্রশান্তি। বাতাসী ঝুঁকে পড়ে তার ডান হাত জোয়ারের জল কেটে এগিয়ে চলে। আর তুমি? ভূষনদার প্রশ্নে ওজন ছিল। ছিল ব্যঞ্জনা। অর্ক খেয়াল করে নি। ভূষনদা অর্ক রত্না আর বাতাসীকে আড্ডা মারার ছলে বাইরে ডাকে।
ভুষণদা দোর পেরিয়ে রত্নাদের উল্টোদিকে হাঁটে। স্যাঙ্গাত অর্ক পেছু পেছু আসে। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে ভূষণ দা অর্কর দিকে চেয়ে থাকে। চমকে গিয়ে অর্ক ভূষণদাকে জিজ্ঞেস করে, কিছু বলবেন? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভূষণদা বলে, কিছু মনে কোরো না দ্রুত আপ্লুত হওয়া বাতাসীর বিশ্বাসে নিহিত। ঘূর্ণির মত এগিয়ে চলে সে। ঝড়ো হাওয়ার মত দিক পরিবর্তন করে। এই আবেগ ছাড়া সৃষ্টি হয় না আবার এই আবেগ ধ্বংসের কারন। অর্ক ভাবতে পারেনি ভূষণদা কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতে পারে। অসন্তুষ্ট অর্ক বলে, আপনি হঠাৎ লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে ব্যক্তিগত জীবনে হানা দিচ্ছেন যে বড়? হেসে ভূষণদা বলেন, ঐ দেখ কালো গাড়ি এসে হাজির। মনীষদা নামল বলে। রত্না রাখঢাক না করে বলে, ক্ষমা করে দিস বোন। কোথাও একটা একতরফা ভুলের বোঝা তোর ঘাড়ে চাপিয়ে বসিয়েছিলাম। তোদের হাজিপুর অভিযান সব ধুয়ে মুছে দিয়েছে। তুই নিজের মতই বয়ে যা। বাতাসী এতখানি আশা করে নি। আপ্লুত হয়ে নিজস্ব ভাবাবেগ রত্নাকে ফেরৎ দিতে গিয়ে বাতাসী লক্ষ্য করে গজগম্ভীর চালে মনীষ প্রায় তার সামনে এসে হাজির হয়েছেন। কথা শেষ করে রত্নার হাত ধরে বাতাসী ঘরে ঢুকে পড়ে।
মাপা অথচ ধীর-স্থির পদক্ষেপে মনীষ ঘরে ঢুকে পড়ল। মনীষ তখনও কথা শুরু করেনি। বাকিরা উসখুস করছে। আরিফ দরজায় ভূষণদার খোঁজে উঁকি মারে দেখে ভূষণ দা আর অর্ক চঞ্চল পদক্ষেপে আগতপ্রায়। ত্রিদিব মনীষকে বসতে ইঙ্গিত করলে মনীষ উল্টে ত্রিদিবকে বসতে বলে। পাশাপাশি ভূষণ এবং অর্ক বসে পড়েছে। শুক্লা নিজের কাজে অত্যন্ত পটু। সে জানে ফুটন্ত গরম জলে চা পাতা পড়লে মানুষ মৌতাতে ঝরঝরে হয়।গরম চা হাজির হয় টেবিলে সঙ্গে লেড়ো বিস্কুট। একই ছন্দে অনেকে বিস্কুট দাঁতে কাটে। বিকৃত শব্দে মনীষের মুখমন্ডলীতে বিরক্তির বলিরেখা সুস্পষ্ট হয়। মনীষের এ হেন ঔদ্ধ্যতে ভূষণ বিরক্ত হয়। সে বলতে বাধ্য হয়, শুনি আপনার রাজ্য জয়ের গল্প। আর সকলকে অবজ্ঞা করা গেলেও ভূষণের অস্তিত্ব হেলায় সরিয়ে দেওয়া যায় না। মনীষ বলে, বলছি তার আগে শুক্লাদির চায়ে তৃপ্ত হই। শুক্লা দি হাসে। সন্ধ্যে নেমে এসেছে। হঠাৎ লোডশেডিংয়ে, ঘরে বাসা বাঁধা ষাট ওয়াটের অন্ধকার গভীরতা পায়। দেশলাই জেলে আরিফ গরু খোঁজার ঢঙে মোমবাতি খুঁজতে ছোটে। চায়ের চুমুকে তৃপ্ত মনীষ বিরক্তি নিয়ে বলে, মোমবাতি খুঁজতে যদি দক্ষযজ্ঞ বাঁধাতে হয় তাহলে এত বড় মিল চালাবে কি করে? ভুষণ বলে, থাক না অন্ধকার। আপনি শুরু করুন। আরিফ ততক্ষণে মোমবাতি ব্যবস্থা করে ফেলেছে। মোমবাতি আলো কাঁপতে থাকা শিখায় মানুষগুলোর আধা ভৌতিক ছায়া প্রলম্বিত করে তুলেছে। সবাই চুপ মেরে গেছে। কাপ, ডিসে নামিয়ে রেখে মনীষ বলে, আমলাদের সঙ্গে সে এক যুদ্ধ। কেউ কোন প্রশ্ন করছে না দেখে বিরতি নিয়ে মনীষ ফের বলে, ওদের বক্তব্য ভারতবর্ষে এমন কোন প্রিসিডেন্স নেই। আপনাদের পাগলামিতে সায় দিতে আমরা পারব না। এই কথার উত্তরে আমি বলি, ঠিক আছে মেনে নিলাম। শ্রমিকদের সব পাওনা গন্ডা পিএফ গ্র্যাচুয়িটি ইনসিওরেন্স প্রিমিয়াম এবং কেটে নেওয়া দিন প্রতি ১১ টাকা ফেরত দিন। কালই ফেরত দিতে হবে কিন্তু। আজ এই প্রস্তাব মেনে নিলে কাল শ্রমিক ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত আলোচনা সাপেক্ষে জানাবো। কে যেন পিছন থেকে জিজ্ঞেস করে কজন আমলা ছিল? দৃপ্ত কন্ঠে মনীষ বলে, জনা ছয়েক। ধৈর্য হারিয়ে ভূষন ততক্ষণে বলে ফেলেছে মোদ্দা কথা জানান। ততোধিক গম্ভীর হয়ে মনীষ বলে কার্যকারন না জেনে বুঝে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মনীষ এগিয়ে চলে- আমার কথার অভিঘাতে স্তব্ধ আমলারা নিজেদের মধ্যে গুজুর ফুসুর শুরু করে দেয়। বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে শ্রোতার দল এখনো গল্পের কূলকিনারা পাচ্ছে না। বিরক্ত রত্না বলে, আমাদের কাছে এক এক মুহূর্ত এক এক যুগ মনে হচ্ছে। মনীষ বলে, এই ধৈর্য যদি মোহিত ধরতে পারতো তাহলে আজকে আমার জায়গায় সে অধিষ্ঠিত হত। রত্না বলে, মোহিতের প্রসঙ্গ আসছে কেন? শুভঙ্কর সবার মত নিজের প্রোপোজালের ভবিষ্যৎ জানতে না পেরে বিরক্ত হচ্ছে। শুভঙ্করের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে রত্নর উপর। রুষ্ট শুভঙ্কর বলে, উনি ঠিকই বলেছেন, মোহিত একজন অসৎ লোক। বাতাসী চুপ করে থাকতে পারেনা। সে বলে, এই ঘর ইউনিয়নের এখানে মনীষ মোহিত দ্বন্দ্ব বাঁধাবেন না। ভুষন আড় চোখে বাতাসীকে দেখে নিয়ে হাতের চাপড়ে হাঁটুতে ছন্দ তোলেন। ভূষণের অবজ্ঞা পূর্ণ আচরণে মনীষ সম্বিত ফিরে পায়। শুভঙ্কর জিজ্ঞেস করে, সরকারের ভাবনা কি ওয়ার্কার্স প্রপোজাল কি একসেপ্ট হয়েছে? মুজিবের সাথে একসাথে অনেকে গর্জে ওঠে প্রসঙ্গান্তরে না গিয়ে আগে এই প্রশ্নের উত্তর দিন। ত্রিদিব বলে, উনি তো বুঝিয়ে বলছেন একটু ধৈর্য ধরো। বেশ কিছু মানুষ মুজিবের কথাতেই সায় দেয়। আড়াআড়ি বিভাজনের বার্তা ভূষনের অভিজ্ঞ চোখে এড়ায় না। সে ভাবতে থাকে এই বিভাজন কি আন্দোলোনের শুরুর দিন থেকেই ছিল। কিন্তু তা যদি থাকত তাহলে এতদিন প্রকাশ্যে আসেনি কেন? মোহিত ছাড়াও শহুরে নেতৃত্বকামী মানুষ এতদিন চুপ মেরে ছিল কেন! সে কি মনীষ ত্রিদিবের ভারী জোটের বিপক্ষে যাওয়ার সাহসের অভাব। ত্রিদিব একদিন তাকে বলেছিল এই মাটির কেউ এমনকি মোহিতও এই আন্দোলনকে দিশা দেখাতে পারবে না। ত্রিদিব আরো বলেছিল সংসার জীবনে রত্নার সঙ্গে ওর ব্যবহারে মোহিত প্রমানিত। নিজের ছোট্ট সংসার যে ঠেলতে অপারগ সেই মোহিত বৃহৎ আন্দোলনের নেতৃত্ব সামলাবে কি করে। মোহিত একদিন আলটপকা বলেও ফেলেছিল, তার বউয়ের প্রতি ত্রিদিবদার আগ্রহের কথা সবার জানা। সে কথাও ভূষণের জানা। ভূষন এলোমেলো চিন্তার জট ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আলোচনায় প্রবেশ করতে চায়। মানুষ লড়াইয়ের হাল হকিকত জানতে চাইবে তার অধিকার আছে। কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত মূল সত্যকে সবার সামনে আনতে হবে। কিন্তু বারেবারে ভূষণের নিউরন জাল তার ইচ্ছা গুলোকে পরাভুত করে চিন্তাস্রোতের উল্টো খাতে নিয়ে যায়। এতদিন যারা টু শব্দটি করেনি তাদের এক এক জন হঠাৎ করে গলা চড়িয়ে বলে উঠছেন। বলছেন কিছু না কিছু। ইস, যদি আগে লোকে মুখ খুলত এমনটা ঘটত না। কী ঘটেছে তার আন্দাজ না পেয়েই শুরু করলেন সপ্তর্ষীদের নেওটা একজন। তার কথায় বিরক্তির সূত্র ধরে সপ্তর্ষী বলল, মনীষদা আপনার গতিবিধি রুলিং পার্টির সঙ্গে মাখামাখি সবার স্ক্যানারে ধরা পড়ে গেছে। আপনি শুধু আন্দোলন নয় আন্দোলন থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক সম্ভাবনার কন্ঠও রোধ করেছেন। রুলিং পার্টিকে সমর্থন আপনার রুচি বা দর্শনে না বাঁধলে আমাদের আপত্তি নেই। আপনার নেতৃত্ত্বে আন্দোলন সরকারি ঠিকাদারিত্ব অর্জন করছে। গণজাগরণের স্বতঃস্ফূর্ততায় রাজনৈতিক লাগাম আমরা মেনে নিতে পারব না। আন্দোলন নির্মাণের পথ ছেড়ে ধ্বংসর পথে গেলে ইতিহাস আপনাকে ক্ষমা করবে না। প্রশ্নের উত্তর দিতে অক্ষম মনীষ চিৎকার করে বলে, কী বলতে চাও তুমি স্পষ্ট করে বল। কমল, সপ্তর্ষি আরো অনেকে একযোগে বাজোরিয়া মুভমেন্টে যোগদান করেছিল। নেতৃত্ব দ্বন্দ্বহীন না থাকলেও মোহিতের কায়েমী স্বার্থ বুঝতে কারোরই অসুবিধা হয়নি। কমল এবং সপ্তর্ষি মূলত রাজো্রিয়া সংঘর্ষ নির্মাণ এবং সংহতির মাধ্যমে রাজনৈতিক বিস্তারের সম্ভাব্যতা খুঁজতে এসেছিল। যদিও তাদের মনে হয়েছিল নিয়োগীজি তাদের মডেল নয় কারন নিয়োগীজি আন্দোলনকে সর্বত্রগামী করতে অসমর্থ হয়েছেন। বাজোরিয়া আন্দোলনের অমিত সম্ভবনা বাঙলার নিস্ফলা রাজনৈতিক জমিতে বীজতলা হতে পারত। এর থেকে উঠে আসা মানুষজন মূলস্রোতে দেশের রাজনীতিক মানচিত্রে মাঝির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারত। কমল মাথা ঠিক রাখতে না পেরে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে, এই মানুষটিকে চিনুন, একটা খোকাবাবু নয় ঝুন নারকেলের মত বুড়দের নিয়ে গড়া অনড় সরকার যারা লাল জামা গায়ে শিল্প, বিপ্লব সবকিছুর ঠিকাদার হয়ে বসে আছে। যাদের বিরুদ্ধে বাজরিয়ার শ্রমিক জোটের লড়াই এই মানুষটি অবলীলায় সেই সরকারের দালালি করছেন। মুজিবের ওপরে কমলের আস্থা ছিল। সবার অলক্ষে ওরা মুজিবের সঙ্গে বহুদফা বৈঠক করেছে। যুক্তিবোধ দিয়ে মুজিব মনস্থির করতে পারলেও মুজিবের জীবনের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। বাবু নেতৃত্বর উপর মুজিব ভরসা রাখতে পারেনি। মুজিব ভূষনের সঙ্গে আলোচনাও করতে পারেনি কারণ তার ভূষণদা যদি তাকে উল্টো বোঝে। ভূষনদা কী চায় তা সে জানেনা। ভূষণদাকে দেবপূজা করার গুরুবাদ তার মজ্জায়। অতীতে সে এমন গুরুবাদী ছিল না। বিআইএফআরে ভুষনদার ম্যাজিকে সে হিপনোটাইজড। মুজিব ভূষণের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চায় আর ঠিক সেই সময় হঠাত মনীষী বজ্র কঠিন কণ্ঠস্বর মুজিবের কানে দামামার মত বাজে, লড়াই সরকারের বিরুদ্ধে! কমল তীক্ষ্ণ গলায় মনীষ কে ছাপিয়ে গিয়ে বলে, নিশ্চয়, ঠিকাদার তো সরকারি এজেন্ট। আমরা সবাই জানতে চাই নিটফল লড়াইয়ের ভবিতব্য। যার ওপর হাজারো শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। সপ্তর্ষি বলে, হাজার নয় দেশের সব সংগঠিত অসংগঠিত শ্রমিকের ভবিষ্যৎ আমরা আক্ষরিক অর্থে মনীষদার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। মিল থেকে মিলে বিস্তার পাচ্ছিল শ্রমিক কো-অপরেটিভের ভাবনা। আজ যার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত। পাইপাই হিসাব আমাদের বুঝে নিতে হবে। সভার বাকিরা নিথর, প্রস্তরবৎ। কমল বলে ওঠে, আপনার দেখানো পথে শ্রমিক সমান্তরাল শিল্পে উৎপাদন, বিপণন,একাউন্টিংয়ের পক্ষে মত দিয়েছে। এখন আপনি মুখে কুলুপ আঁটলে তো চলবে না। ভুষন বলে,আঃ,ওঁকে বলতে দিন।কমল বলে কি বলবে কিছু বলার থাকলে নিশ্চয় বলতেন। মনীষের দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি দিয়ে কমল ফের বলে, ওখানে কয়জন আমলা দুটি সরকারি বুদ্ধিজীবী আর স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী জয়দ্রথ ওনাকে অভিমন্যু বানিয়ে ছেড়েছেন। এখানে এসে আসল ব্যাপার চেপে গিয়ে ঢংকানিনাদে পরাজয় কে জাস্টিফাই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভূষণ হেসে বলে, আরে তোমরাও তো এক একজন দ্রোন কর্ণ শল্য হয়ে যাচ্ছ। মনীষ বলে, তা হতে গেলেও এলেম লাগে। ত্রিদিব দিশাহারা কি করা উচিত সে বুঝে পায় না। অর্ক বলে, মনীষদা সবাই জানতে বুঝতে আগ্রহী সবকিছু খুলে বললে নতুন কিছু ভাবা যাবে। রত্না আর বাতাসী একযোগে বলে, মোহিত ঠিক বলেছিল। তারপর দুজনেই পরস্পরের দিকে তাকিয়ে বাকরুদ্ধ হয়। মনীষ প্রথমে অর্কর দিকে তাকিয়ে বলে, ভাবার মগজ আছে? মনীষের এ হেন কৌতুকে কেঁপে ওঠে মোমবাতির আলো। টেবিলজোড়া থাপ্পরে আগেই চায়ের কাপ টেবিলে কাত হয়ে পড়েছিল। তার থেকে গরম চা টেবিলে গড়িয়ে ঠান্ডা মেরে গেছে। সারসার পিঁপড়ের দল চেটেপুটে খাচ্ছে টেবিলে লেগে থাকা রসনার অবশেষ। মনীষ না থেমে বলে চলে, বহু বিবেচনার পর আমি জয়দ্রথদার সাথে একমত হলাম। কমল বলে, ওরে বাবা, একেবারে দাদা! ওনাকে দাদা বলার সাহস একমাত্র আমাদের দাদা মনীষদারই আছে। কী বলেন সব? কমল এবং সপ্তর্ষির গোষ্ঠী থেকে হালকা হাসির রব ওঠে। ফিচেল আরিফও যোগ দেয় তাতে। ভূষন বলে, এখন ওঁর গতিরোধ করছো কেন? বিভিন্ন বিষয়ে যখন সাবধান করেছিলাম তখন কেউ মান্যতা দাও নি। কথাগুলো কমলবাবুর উদ্দেশ্যে বলা। সরকারের সাথে অতিরিক্ত মেশামেশি গণ-আন্দোলনের পক্ষে ক্ষতিকারক তা প্রমানিত হল তো এবার? মনীষ, ভূষনের কথায় ঘাবড়ে গেছে। সে তার বাগ্মিতা দিয়ে যুক্তি কে নস্যাৎ করতে লেগে পড়ে- ভেবে দেখুন কৃষকদের সাথে দরকষাকষি করতে হবে পাট গুদামজাত করতে। এরপরে প্রোডাকশন যা শ্রমিকদের কাজ মেনে নিলাম। বিপণন সামলানো কি শ্রমজীবী মানুষের করণীয় কাজ? ব্যবসার মধ্যে দিয়ে শ্রেনী বৈরিতা বাড়বে। সরাসরি অর্থে কারখানার শ্রমিক কৃষককে শোষণ করতে শুরু করবে। কৃষকের অসহায়তার সুযোগ নেবে। শ্রমিক যদি এত বড় কারখানার মালিক হয় শ্রমের বিভাজন হায়ারার্কি যা বর্তমানে অবলুপ্তপ্রায় তা পুনর্জীবিত হবে। কারখানায় শ্রমিকদের অন্তর্দ্বন্দ্ব সামনে আসবে। বাজোরিয়া জুটমিল যা দেশে নতুন দিশা আনতে চলেছে তার বার্তা বুদবুদের মত ক্ষণস্থায়ি হবে। বিকশিত হওয়ার আগেই বেলুন অকালে ফেটে যাবে। সোসালিস্ট দেশগুলোর দিকে চেয়ে দেখো তারা বারবার কেন ধনতান্ত্রিক শক্তির হাতে পরাভূত হচ্ছে। নতুন সময়ে নতুন প্রয়োগ ভাবনা গ্রহন করতে হবে। সপ্তর্ষি বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়ায় দ্বিতীয় পুনর্গঠন মনে আছে? মাত্র পাঁচ বছর সময়ে উৎপাদনশীলতা কোথায় পৌঁছে গিয়েছিল সারা পৃথিবী তা দেখেছে। মনীষ বলে,গোটা রাষ্ট্রের পক্ষে যা সম্ভব তা একটা কারখানা শ্রমিকদের পক্ষে আকাশকুসুম। ভূষন চুপ করে থাকতে পারেনা। সে বলে, স্বপ্ন আপনি দেখিয়েছিলেন তাহলে ভুল ছিলেন আপনি। আমাদের ভুল ছিল আপনার নেতৃত্ব মেনে নেওয়া। শুধু তাই নয় একটা কারখানার চালানোর দায়িত্ব নেওয়ার হিম্মত না থাকলে রাষ্ট্র চালাবেন কি করে? কমল বলে, এই কারণেই আমরা এই আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে সার্বজনীন করতে চেয়েছিলাম যাতে প্রতিটি কারখানায় এই ভাবনা প্রসারের মাধ্যমে ব্যপ্ত হয়। উৎপাদিত সবুজ পণ্য ক্রয় এবং ন্যায্য মূল্য প্রদানের মাধ্যমে কৃষক শ্রমিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার নতুন রাস্তা খুলে যেত। শ্রমিক কেন কৃষককে ঠকাবে? কৃষক বেনিয়াদের কাছে নিরন্তর ঠকে চলেছে। ঠকানোর এই ধারাবাহিকতায় আপনার দাদার সায় আছে। কৃষক ঠকানোর অযৌক্তিক অধিকার আপনিও দাদার কাছে শিখে মান্যতা দিলেন! অযৌক্তিক কথা একদম নয়। ভারতবর্ষের শিল্প কি কেবল জুট নির্ভর? শিল্পের অন্য ক্ষেত্রে শ্রমিক কৃষক ঐক্যর পথ কি করে তৈরী হবে, উত্তর আছে? মনীষের এ হেন জবাবে উত্তেজিত কমল ভারতবর্ষে জুট শ্রমিকের সংখ্যা তত্ত্ব নিয়ে কিছু বলতে গেলে ভূষন তাকে ধমকে থামিয়ে বলে, ভারতবর্ষ বাদ দিন বাঙলার শিল্প নিয়ে বাংলার রাজনৈতিক পরিবেশে কী করনীয় তা আলোচনা হোক আগে। বড় বা ভারি শিল্পের যা অবশেষ ছিল তা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে তামাদি হতে যাচ্ছে।একটা সরকার লাল জামা গায়ে ফোড়েদের হয়ে দালালি করছে। সময় শ্রমিকের চৌকাঠে হাজিরা দিয়ে বলছে- ছিনিয়ে নাও কারখানার অধিকার। স্টিলস, জুট সব ধরনের শিল্পে শ্রমিক তার উল্লেখযোগ্য ছাপ রাখতে পারত। ইন্দোজাপান স্টিলস শ্রমিক প্রোডাকশন ডবল দেওয়ার অঙ্গীকার করে বাড়তি উৎপাদনের লভ্যাংশ চাইছে আর আপনি হাজির করছেন পচা তত্ত্বর গলিত নির্যাস। আপনি বলুনতো, কারখানা চালানোর ঝক্কি আপনি সত্যিসত্যি নিতে চেয়েছিলেন? আমার মনে হয় না। এবং ঠিক সেই কারনে আপনি সরকারি বাসনায় সায় দিয়ে এখন উল্টো বোঝাচ্ছেন। বিপ্লবের শখ এবং গদ্দারি মধ্যবিত্তর মজ্জায়। বাতাসীর সমস্ত রাগ গিয়ে পড়েছে তার বাবা অভয়ের ওপর। জয়দ্রথ মানুষটা সব কিছুর জন্য দায়ী। নাহলে মনীষদার মত মানুষকে কিভাবে ভুল বোঝনো সম্ভব! হৈ চৈ হট্টগোলের মধ্যে কমল এবং সপ্তর্ষি সভাকক্ষ ত্যাগ দেওয়ার ডাক দেয় অনুচরদের। ভূমিপুত্র ছাড়া দুএক জন এলাকার বাইরের লোক ওদের ডাকে মান্যতা দিয়ে বের হয়ে যায়। কমলের পক্ষে এলাকার যারা ছিল তারা ধরা দিতে চায় না। আরিফ বলে, কি হে মুজিব মিঁয়া এখন তোমার কি হবে? শুভঙ্করদা,আপনার হার্ট ঠিকঠাক চলছে তো? ভূষন বলে, চ্যাঙড়ামি করিস না আরিফ, শেষটা শোনা দরকার। যদি নতুন কথা ভাবতে হয়।
কমলরা বাইরে অপেক্ষায়মান শ্রমিকদের কাছে ব্রিফ করেছে মিটিংয়ে আলোচ্য বিষয়। বাইরে আওয়াজ উঠেছে- মনীষ বাবুকো আম আদমিকো সামনা করনা পড়েগা। মোহিতের নিজের জীবন এলোমেলো। সে যে কোন উপায়ে রত্নাকে ফিরে পেতে চায়। সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে উদ্যোগী হয়ে সে এগিয়ে আসে মনীষকে শরীরী আক্রমণ করতে। রত্না এগিয়ে এসে মনীষকে আগলায়। ভুষনের প্রবল চিৎকারে অন্দরমহল স্তব্ধ হলেও বাইরে শ্লোগানের বন্যা ছুটছে। ভুষন বলে,শ্রমিকদের আপনি সংগটিত করেছেন। তারা দলমত নির্বিশেষে আপনার নেতৃত্বে একযোগে আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। অর্কর দাবির যৌক্তিকতা আছে। আপনাকে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। ডাবলু.বি.এস.ই.বি র হঠাৎ করুনায় মোমবাতির আলো দীপ্তি হারিয়েছে। ঘর আলোকিত। ভিতরের মানুষদের বাইরে থেকে চাক্ষুষ করা যাচ্ছে। লুকিয়ে পড়ার সত্যিই কোন জায়গা নেই। মনীষ বাধ্য হয় সকলের সামনে দাঁড়াতে। বাইরে বেশকিছু মানুষের জমায়েত। ১০০ ওয়াটের অনুজ্জ্বল আলোয় যাদের মাথার চুলে রঙ ধরেছে। বাকি শরীর ছায়া আবিল। সামনের সারির কজন ছাড়া কারো নাক চোখ মুখ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। শুধু স্লোগানের সঙ্গে হাতের ওঠাপড়া দৃশ্যমান। সপ্তর্ষি লিড করছে ওদের। পরানকে দেখা যাচ্ছে এগিয়ে আসতে। সে বরাবরই আশাবাদী। তার একহাতে রংতুলি অন্য হাতে ক্যানভাস। যেখানে এক বিন্দু রংয়ের পোঁচ লাগেনি। কালো রঙের ডিব্বায় তুলিটা চুবিয়ে দিয়ে পরান বলে, দাদা, শেষমেষ আপনি? আপনি কালো রঙের পোঁচ শ্রমিকদের মুখে মাখালেন। সবাই তাদের পরানদা কে দেখে ফের একবার গর্জে উঠলো। পরান যেমন এসেছিল কাঁদতে কাঁদতে সেরকমই ফিরে গেল।
ত্রিদিব হ্যান্ড মাইকটা ততক্ষণে মনীষের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। মনীষ শুরু করেন, আমার বেশি কিছু বলার নেই। শ্রমিক মালিক হলে তার শ্রেণীচরিত্র পরিবর্তিত হবে। যা একান্ত ভাবেই কাম্য নয়। প্রকৃত মার্কসবাদী মানুষজনের সঙ্গে আলোচনায় আমি এই বিশ্বাসে উপনীত হয়েছি। সরকার, মালিক-শ্রমিক কো-অপারেটিভের পক্ষে রায় দিয়েছেন।
অস্ত্র নয়। নতুন তত্ত্বের মাধ্যমে আজকের অভিমন্যু বধ পালা সাঙ্গ হল। আজকের অভিমন্যুরা লড়াই, কর্ম এবং জীবনের মূল্যে পান্ডবদের বিজয় রথের চাকা এগিয়ে নিয়ে যেতে অসমর্থ হল। জয় হল কৌরবদের। অবধ্য রয়ে গেল জয়দ্রথ। বাজোরিয়া উপখ্যানের এখানেই পরিসমাপ্তি।
ছত্রিশ
কী মহা সমারোহে
শান্তনা এখন মাঝে মাঝে বাতাসীদের বাড়ি আসে। বিপিন চাইলেও পারে না। ও সকাল বেলা বটতলায় নিয়ম করে যায়। শান্তনা এলে বাতাসীর ভালো লাগে। শান্তনা বাতাসীকে একা পেতে চায় যদিও নিজের করে পাওয়ার মানুষ ওর জীবনে নতুন করে এসেছে। নতুন জীবনের খবর ঠারেঠোরে বাতাসীকে জানাতে চায় সে। অর্ক থাকলে সেই সুযোগ কম। সুদুর অতীত হলেও শান্তনার মনে লেগে আছে সিনেমা দেখতে গিয়ে বাতাসী কে সঙ্গ দিতে না পারার কথা। সেই পুরানো ব্যথা আজও কুয়ো তলার নাছোড় শ্যাওলার মতো লেগে আছে। সে ভাবে আর একদিন যদি সুযোগ পায় তাহলে বাতাসীর সঙ্গে দূরে কোথাও বেড়াতে যাবে সে। হইহই করে দুজনে ঘুরবে রেস্টুরেন্ট, ময়দান, সিনেমা কিচ্ছুটি বাদ দেবে না। প্রথম প্রথম একটু মন খারাপ হলেও বাতাসী এই দুঃখ পুষে রাখে নি। ও বুঝেছিল,তাড়াহুড়ো করে টিউনিং করতে চাওয়া মস্ত ভুল। মানুষতো বাদ্যযন্ত্র নয়, ছেঁড়া তার বদল করে দিলেই সুরে বাজবে। যদিও তার বদলালেই, সুর মাধুর্যপূর্ণ হবে এমন গ্যারান্টি নেই। যন্ত্রেরও সময় লাগে। এখন বাতাসী বোঝে সময় তার নিজস্ব সুরে মানুষকে বাঁধে। জোর করলে ছন্দপতন ঘটতে পারে। শান্ত স্বভাবের কম শিক্ষিত এই দিদির সঙ্গ বাতাসীর ভালো লাগে। শিক্ষা-সংস্কৃতি কোথাও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। শান্তনা তার নতুন জীবনের গল্প বাতাসীকে বলতে চায়। বাতাসী নিজে থেকে তেমন আগ্রহ দেখায় না। একদিন শান্ত্বনা এসে বলে, বাতাসী, তুমি না বড্ড অগোছালো, আমি আজ তোমার ঘর সাজাবো। সরাসরি শান্তনা নাম ধরে কোনদিন বাতাসী কে ডাকেনি। প্রথম প্রথম বয়সে অনেক বড় হয়েও দিদি ডাকতো শান্তনা। তারপর কখন সময়ের ফেরে শান্তনার মুখ থেকে দিদি ডাক খসে গেছে দুজনের কেউ খেয়াল করেনি। নাম ধরে ডাকায় বাতাসীর কানে বাতাস নতুন কম্পন জাগায়। খটকা লাগে বাতাসীর। মন থেকে ডাকা এই সুরেলা স্বর কে সম্মান করে বাতাসী। বাতাসী হেসে বলে, বাহ, এই তো নিজেকে মেলে ধরছো। বুঝতে পারছি ছেলে তোমার সাহস আর সমরদা তোমার শক্তির ভাঁড়ার। এই মশকরা ভুল বুঝে শান্তনা লজ্জা পায়। বাতাসী বলে, ওরে বাবা আমি কি বললাম যে তুমি লজ্জা পাচ্ছ? তুমিতো খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছ। মানিক দা যখন বেঁচে ছিলেন তখনও আমি, এই তুমি কে কোনদিন খুঁজে পাইনি। একি বিপিনের দেওয়া সচ্ছল, মসৃণ জীবন না সমরদার ভালবাসা? শান্ত্বনা হেসে বলে, পেটে ভাতের চিন্তা থাকলে মানুষ মনে মরে যায়। আমি জীবন দিয়ে তা বুঝেছি। ভাতের যোগান ঠিকঠাক পেলে মনের খোরাকের প্রয়োজন হয়। বাতাসী অবাক হয়। সেই ফুরসতে কথা বলতে বলতে শান্তনা তার রেক্সিনের ব্যাগ থেকে নানান কিছু বার করে রাখতে থাকে। বাতাসী জিজ্ঞেস করে, এগুলো কী? শান্তনা জানায়, এ আমার ছেলের ইচ্ছেরং। তোমাদের ঘর আগুন রঙে সাজাতে চায় সে। বাব্বা,বড্ড ভালো ভালো কথা বলছো। এটাও কি বিপিনের শেখানো বুলি না বসন্ত..., না বিলাপ তো নয়? বাতাসীর প্রশ্ন শেষ হওয়ার সাথে সাথেই হেসে ওঠে শান্তনা। বাতাসীও যোগ দেয় ওর সাথে। ছোট ছোট কাঠখোদাই ডিজাইন। কোনোটায় ছাতিম গাছ, কোনোটা কলাভবনের মুরাল। কাঠের ফুল, ফুলদানি। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বাতাসী। মনে মনে স্যালুট করে বিপিনকে। ঝোলা থেকে বেরিয়েই চলেছে বৈচিত্র্যপূর্ণ শিল্পসম্ভার। রবীবাউলের অচেনা এক প্রতিকৃতি খোয়াইয়ের প্রান্তরে সমাহিত কবি, বাস রিলিফের কাজ। পুচকি ছোঁড়া হলে কি হবে দরের শিল্পি। বাতাসীর মনে হয় কবি গাইছেন- যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে। একটু গুনগুন সুর ভাঁজে বাতাসী। শান্তনা বুঝতে পারে বাতাসীকে সুরে পেয়েছে। সে খোঁচা মেরে, একটু উস্কে দেয়। বাতাসী চেঁচিয়ে গাইতে থাকে। সেই সুযোগে বাতাসীর চোখ এড়িয়ে, বিপিনের বানানো সেরা কাজগুলো ঝোলা থেকে বার করে শান্তনা খাটের তলায় লুকিয়ে ফেলে। শান্তনা বাতাসীর কাছে ঝাঁপি খুলে হাট করতে চায় না।
গান শেষ হবার আগেই বাতাসীর আঁখিকোণে জমা সুস্পষ্ট জলরেখার হদিশ পেয়েছিল শান্তনা। বাতাসী শান্তনার কাছে নিজেকে লুকাতে চাইছিল। চটজলদি শান্তনা বলে, দুজনে মিলে সাজিয়ে ফেলি, চল। শান্তনা প্রত্যুত্তর করে, চলো অর্ক দা আসার আগেই গোছগাছ সেরে ফেলতে হবে। যতদিন মানিক ছিল শান্তনা ততদিন সংসার ছাড়া কোন কাজে মন দেয়নি। এখন ছেলের বৈভবে এবং সমরের উৎসাহে ছোটখাটো মিস্ত্রির কাজ অবধি শিখে ফেলেছে সে। জায়গা নির্বাচন বিপিনের করাই ছিল। বিপিন চোখের আন্দাজে ছবি এঁকে রেখেছিল। কোথা দিয়ে কানেকশান যাবে কোথায় প্যানেল বসবে। সবই অঙ্কের মতন মা কে বুঝিয়ে দিয়েছিল। শান্তনা শুধু মাপজোক অনুযায়ী লাগাবে প্যানেলগুলো। প্যানেলের বেস রাবার ভ্যাকুয়াম দিয়ে বানানো। চাপ দিলেই দেওয়ালে এঁটে বসে যাচ্ছে প্যানেলগুলো। কাজ শুরু হয় দুজনের সক্রিয় অংশগ্রহণে। একটু চটজলদি হাত চালাতে হচ্ছে ওদের,কারণ অর্ক আসার আগে উভয়েই কাজটি সমাপ্ত করতে চায়। কাজ শেষ করার পরে বাতাসী বলে, চলো এক রাউন্ড চা খাওয়া যাক। শান্তনা রাজি হলে রান্নাঘরে যাওয়ার আগে বাতাসীর বিছনা টিপটাপ পরিষ্কার হয়ে যায়। সময় নিয়েই চা খাওয়া চলতে থাকে। কাজ সময়ে সেরে ফেলার কারনে ফুরফুরে মেজাজ দুজনের। শান্তনা বাড়ি যাওয়ার জন্য তৎপর ও কিছুতেই অর্কর হাতে ধরা পড়তে চায় না। বাতাসী রাজি হয়ে ওকে ছেড়ে দেয়। যাবার আগে শান্তনা বাতাসীর দিকে ফিরে একটু এগিয়ে এসে ওর থুতনি ধরে মুখটা তুলে ধরে বলে, না থাক। বাতাসী বলে, থাকবে কেন বলো কি বলবে? শান্তনা কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বলে,‘আমি তোমায় একদিন সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাব। বাতাসী মাথা নাড়ে। খিলখিল করে হাসতে হাসতে, চৌকাঠ পেরিয়ে হাঁটতে থাকে শান্তনা। বাতাসী বুঝে উঠতে পারেনি হাসির কারন। যদিও সে চায়নি গোয়েন্দাগিরি করতে। গায়ে মনে ফাগুনে এঁকে বাতাসী বসে থাকে প্রতীক্ষায়।
রাত গড়িয়ে চলে নিজেস্ব গতিবেগে। জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকীর অনুষ্ঠান অর্কর সিলেবাসে নেই। বাতাসী এ বিষয়ে আর পাঁচটা মেয়ের মত। বাতাসী একবার ফোন করেছিল, ধরেনি অর্ক। বাতাসী ইচ্ছে করে বারবার রিং করেনি। একটা অন্য ভাবনাও বাতাসী কে বয়ে নিয়ে চলে। এমন তো কোনদিন হয়না, বাতাসীর ফোন বেজে গেছে অর্ক তোলেনি অথবা রিং ব্যাক করে নি। বাতাসীর আবেগ একটু হলেও ধাক্কা খায়, অর্ক, ঠিক আছেতো? ট্রেনে বাসে বাড়ি ফেরা তাই বারবার সে ফোন করে বিরক্ত করতে চায়না। নিতান্ত অনিচ্ছায়, দোলাচলে মাঝে মধ্যে আঁকড়ে ধরে মুঠো ফোন আবার হাত খুলে ফেলে দেয় বিছানায়। ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘরে পৌঁছে গেছে। ট্রেন থেকে নেমেই অর্ক খেয়াল করে বাতাসীর মিসড কলের ব্যর্থ সমাচার। তাড়াতাড়ি ফোন করে বলে, পুপে সোনা, আমি এসে গেছি স্টেশনে। বাতাসী নিজের রংবাহারি ভিন্ন ভিন্ন নাম শুনতে খুবই পছন্দ করতো। এমন নয় যে বাতাসী প্রথম থেকেই চাইতো অর্ক ওর আবেগের দাবি মেনে বিভিন্ন নামে ডাকুক। অর্ক অভ্যস্ত করে তুলেছিল বাতাসীকে আর বাতাসীর মনে চাহিদার জন্ম নিয়েছিল। আদরের ডাক যেন রংমিলান্তি খেলা। বাতাসী প্রতিদিন কল্পনা করত বাড়ি ফিরে অর্ক তাকে কোন নামে ডাকবে? মিলে গেলে তার জিত নচেৎ জিত অর্কর। অর্ক জানে আজ পিচ এলোমেলো যে কোনো সময় শর্ট বল বা মারাত্মক বিমার আঘাত হানতে পারে। তাই যথাসম্ভব সুর নরম করে, পুপে, ডেকে বাতাসীকে মানাতে চায়। তারপর শতেক দ্বিধা নিয়ে পায়ে পায়ে সে ঘরে ঢোকে। দরজা খুলে বাতাসী কোন কথা না বলে ফিরে আসে। সে জানে প্রয়োজন না থাকলে অর্ক এমন দেরি করে না তবু ছদ্মগাম্ভীর্যে বাতাসী অর্ককে ধরাশায়ী করতে চায়। আজ বাতাসীর আবেগে কচি মিষ্টি ডাবের পরিপূর্ণতা। জুতো জোড়া খুলে অর্ক বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। অর্কর শরীর থেকে বাতাসী রোজকার মত ঘেমো পোশাক খুলে নিতে থাকে। জল খাবে, জিজ্ঞেস করে উত্তর না পেয়ে বাতাসী মনে মনে চঞ্চল হয়। এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল নিয়ে হাজির হয়ে সে বলে, খুব খিদে পেয়েছে নিশ্চয়, আগে খেতে দিই? অর্ক ফের নীরব। বাতাসী শুধায়, কি এমন হল তুমি কথা হারালে কেন? দীর্ঘশ্বাস ফেলে অর্ক। সে ভাবে তার উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে। এখন দেরির কারন বিশদে বললে দেবী তুষ্ট হবেন। সে শুরু করে, আর বোলো না আমাদের সত্যিই কোনো আশা নেই। এমন ভাবে কেউ কাউকে অসম্মান করবে বলে রাজনীতির সাহায্য নেয়! এক ঝাঁক প্রশ্নবান ছুটে আসে অপরদিকে থেকে, তোমাকে কারা অসম্মান করল, কেনইবা করল। আমি যতদূর জানি অফিসে তোমার সম্মান আকাশছোঁয়া, তাহলে? ‘থাক ওসব কথা, এখন শুনে কাজ নেই। একটু বুকে দম নিয়ে সে বলে, ফিদেল কাস্ত্রো সাহেব একবার জ্যোতি বোস কে জিজ্ঞেস করেছিলেন- তোমাদের দেশে এতগুলো কমিউনিস্ট পার্টি কেন? এর কোন উত্তর কারও জানা ছিলনা। প্রত্যেকটা দলে একজন লেনিন আছেন, আবার একই দলে খোপে খোপে লেনিন। কেউ বড় কেউ ছোট। তারা যে কোন ঘটনাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সর্বশক্তিমান মার্কসবাদের আগুনে সেঁকে নেন নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে। অনর্গল বাঁধনহারা বাক্যবানে ততক্ষনে বাতাসীর আবেগ ডুবে যেতে বসেছে। অর্ক ক্ষণিক বিরতি দেওয়ায় বাতাসী সুযোগ পেয়ে বলে, তাতে তোমার কি, তুমি কী ভাবে জড়ালে এই ঘটনায়, ফিদেলের প্রসঙ্গই বা এল কেন? অর্ক দাঁড়িয়ে উঠে, বাতাসীর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে প্রশ্নের উত্তর দিতে উদ্যত হয়। বাতাসী সচেতন ভাবে পেছু হাঁটতে থাকে। রবি ঠাকুরের রিলিফের সামনে পৌঁছে সে অর্কর দিকে তাকিয়ে থাকে। অর্কর চোখ হঠাৎ চলে যায় দেওয়ালের দিকে। কিছু বলতে গিয়ে হতচকিত হয়ে নিজেকে সংবরণ করে। অর্ক অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে দেওয়ালে। যেন আস্ত কবি দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন খোয়াই জুড়ে। অর্ক কে চুপ মেরে যেতে দেখে বাতাসী মুচকি হাসে। অর্ক আবৃত্তি করে ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি...’ শেষ হয়না কবিতা, বাতাসী সুর তোলে ‘নিয়ে যাবি কে আমারে?’ সব জ্বালা মুছে যায় নিমেষে। অফিসে ফেলে আসা তেঁতো ঘটনার রেশ উবে যায় মুহূর্তে। বাতাসী চট করে সময় বুঝে একটা রুমাল বার করে অর্কর চোখ বেঁধে দেয়। অর্ক বাতাসীর অনেক পাগলামিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এতদিনে কিন্তু চোখ বেঁধে কানামাছি এমনটা দেখেনি কোনদিন! একটু বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে ইচ্ছে করে হাল ছেড়ে দেয়। বাতাসী ততক্ষণে তাকে ঠেলতে ঠেলতে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে বলে, স্নান সেরে এসো, আমি পায়জামা-পাঞ্জাবি বাড়িয়ে দিচ্ছি। বাইরে থেকে বাতাসী দোর এঁটে দিয়েছে। বিপিনবাবুর পাঠানো ইন্সট্রাকশন মেনে বাতাসী চটপট বৈদ্যুতিক সার্কিটের সংযোগ সেরে ফেলে। বাতাসী ভেবেছিল আগে একবার নিজে পরীক্ষা করে সমস্ত টা দেখে নেবে কিন্তু কেন জানি না একা দেখতে মন চায়নি। বৈদ্যুতিক সংযোগের দায়িত্ব শান্তনা বাতাসীর হাতে ছেড়ে দিয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই তার ইলেকট্রিক কারেন্টে ভীষণ ভয়। বাতাসীর মাথা পরিষ্কার তাই বিপিনের এঁকে দেওয়া ছবি অনুসরণ করে সাজিয়ে ফেলতে কোন অসুবিধে হয়নি। দিনের মালিন্য কাটিয়ে উঠেছে অর্ক। শাওয়ার, ঝরনার অনুভূতি নিয়ে নেমে এসেছে শরীরে। গরমের দিনে শীতল জলের স্পর্শে যেমন পাখি ডানা ঝাপটায় সেইভাবে শরীরে জমে থাকা স্থবিরতা ধুয়ে মুছে সাফ করতে চায় অর্ক। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে ওঠে পানকৌড়ির মতো। অর্ক হয়তো ভুলে গেছে, আগ্রাসী কাল তার মাথায় চুলের অবশেষ রাখে নি। শুধু মাথাটাই নড়ে চুল যেমন কে তেমন রয়ে যায়। পায়জামা পরে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বেরিয়ে পড়ে সে। ঘরে উদয় হওয়া আচমকা আলো আঁধারিতে মানিয়ে নিতে সময় লাগে অর্কর। বাতাসী কে বাথরুম থেকে চেঁচিয়ে আগেই সে জানিয়ে দিয়েছিল খাবার রেডি করতে। অর্কর চোখে বাতাসীর নতুন আচরণ নতুন সমাচারের ইঙ্গিতবাহী ছিল। সেটা বুঝতে না দিয়ে অর্ক খিদে পাওয়ার ভান করে। বাতাসী বারান্দায় অস্বচ্ছ আলোয় দাঁড়িয়ে অর্ক কে দেখতে থাকে। প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে আলোর রং পছন্দ করেছে বিপিন। একটার পর একটা শিল্পকর্ম রঙিন আলোর বাহারি সিম্ফনি যেন। অবাক বিস্ময়ে অর্ক দেখে- শনিবারের হাট বসেছে কোপাই নদীর তীরে। হাটের মাঝে গাছ তলায় আদিবাসী রংবাহারি নৃত্য। পসরা নিয়ে জমজমাট বনতল ছোট ছোট প্যানেলের নিপুণ জোড়ে বিন্যস্ত। অর্ক শনিবারের হাট দেখেছে বাতাসীর দেখা হয়নি। মনটা হু হু করে ওঠে অর্কর। বাতাসী কে কেন সে শান্তিনিকেতন নিয়ে যায়নি এই ভেবে কষ্ট পেতে থাকে। ঠিক সেই সময় বাতাসী অতর্কিতে ওর হাতটা ধরে। চকিতে অর্ক ফিরে তাকায। নীল দেওয়ালে, প্রকৃতির রঙে আঁকা ক্যানভাস। বাতাসীর চোখে চাঁদ বসেছে। অর্ক হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে বাতাসীর দিকে। হাত ছেড়ে দিয়ে বাতাসী কোঁচড়ে কাপড় জড়িয়ে ঝুমুরের সুর তুলে নাচতে থাকে। এই পরিবেশের জন্য শিল্পীকে মনে মনে স্যালুট জানায় অর্ক।
রাতের খাবার চটপট সেরে নেয় দুজনে। অর্কর খুব খিদে পেয়েছিল, বাতাসী প্রায় কিছুই খেলো না। ওর শরীরে বান ডেকেছে। তাড়াতাড়ি থালা-বাসন ধুয়ে, টেবিল পেড়ে, বাতি নিভিয়ে ঘরে এসে হাজির হয় বাতাসী। অর্ক তখনও অবাক চোখে দেওয়াল জোড়া শান্তিনিকেতন দেখছে। অর্ক বলে, বিপিন, তাই না? ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে ভালই হয়েছে। বাতাসী কোন উত্তর করে না। তার হঠাৎ অর্কদের বাড়ির দিনগুলো মনে পড়ে যায়। রাতের খাবার টেবিলে সবাইকে একসাথে হাজির হতে হত। সবার শেষে কাজ ছেড়ে আসত অর্ক। কৃষ্ণও আসতে দেরি করত। অঞ্জলীর চেঁচামেচিতে বাপ ব্যাটাকে তাড়াতাড়ি নেমে আসতে হত। অর্ক কে বাতাসী ইচ্ছে করে ডাকতো না, কারণ সবার শেষে এসে সবার আগে খেয়ে উঠে যাবে অর্ক। বাতাসী বলতো, দাঁত লক্ষ কোটি বছরের সাধনার ধন, বিবর্তনের ফসল। খাদ্য সামগ্রী মুখে নিয়ে চিবিয়ে দলে পিষে পরিপাক যোগ্য করে তোলে দাঁত। অর্ক, দাঁতের ব্যবহার জানে না। দলা দলা ভাত মুখে ঢুকিয়ে স্বাদ নেবে আর গলাধঃকরণ করে দেবে। এইভাবে পরিপাক সম্পূর্ণ হয় না। আজও অর্ক হুটোপাটি করে খেয়ে নেয়। ভাবনায় ছেদ পড়ে যায় বাতাসীর কারন অর্ক কখন শুয়ে পড়েছে খেয়াল করেনি সে। চোখ বুজে মটকা মেরে পড়েছিল অর্ক। বাতাসী বুঝতে না পেরে বিছানার কাছে হাজির হয়েছে। অর্ক অতর্কিতে কুমিরের মত আচমকা হানা দিয়ে বউকে ডাঙ্গা থেকে তুলে বুকে টেনে এনে পাগলের মতো আদর করতে থাকে। বাতাসীর শরীর-মন তৈরিই ছিল তবুও সে কপট। শুরুতে অর্কর আচরণে প্রবল ভালোলাগা তৈরি হলেও বাতাসী লক্ষ্য করে অজানা আক্রোশে ক্লিষ্ট অর্ক। দৈহিক চাহিদায় অর্ক দানবিক কিন্তু এমন অস্থিরতা বাতাসী কোনদিন খেয়াল করেনি। নরম আলোর পরশে ভাসিয়ে দেওয়ার বদলে অর্কর শরীরে যুদ্ধের বার্তা। বাতাসী নিজেকে সরিয়ে নিতে চায়। জোর করে অর্ক। বাতাসী সায় দেয় না তার শরীর এলিয়ে যায়। অর্ক নিজের অস্থিরতা বুঝতে না পেরে ততোধিক চঞ্চল হয়। বাতাসী ভাবে নিশ্চয় আজ অফিসে ঘটা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আছড়ে পড়েছে ওদের সম্পর্কে।
বাইরে এখনও আলো ফোটে নি। আজ একটু আগে চোখ মেলেছে অর্ক। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে সময়ের হদিশ পেতে বেড সুইচে হাত দেয় সে। রাতবাতির নরম আলোয় অর্কর চোখ চলে যায় শুয়ে থাকা বাতাসীর মুখমণ্ডলে। হাওয়ায় দোল খাওয়া ফুলের মতন কাঁপছে বাতাসী। অর্ক অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। বাতাসীর শরীরের নিম্নাংশে ছড়িয়ে পড়েছে কাঁপনের হালকা অনুরণন। মুখ ফুটে নিজের অজান্তে কিছু বলছে বাতাসী। অর্ক কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে তল পায় না। সে জড়িয়ে ধরে বাতাসীকে নিজের বুকে টেনে নেয়। স্বপ্নভঙ্গে চমকিত বাতাসী প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে জড়িয়ে ধরে অর্ককে।
সাঁইত্রিশ
বিপিনের বাহাদুরি
দোকানের কাজ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সমর। শান্তনা ঘর গেরস্থালি নিয়ে ব্যস্ত। বিপিন বাবুর টিকিটিও মেলে না তিনি নাকি রাজ কাজে ব্যস্ত। অর্ক সমরকে বিপিনের কথা জিজ্ঞেস করলে, উত্তর আসে দেখুন ছেলেটা বুড়ো ঘাড়ে সবকিছু চাপিয়ে দিয়ে দিব্য আছে। অর্ক বলে,বিপিন করছেটা কি? এর উত্তর সমরের জানা নেই সমর শুধু বলে আ্যমমিটার,ভোল্টমিটার মাইক্রোচিপ নিয়ে ঘরে দোর দিয়ে বসে থাকে সারাক্ষণ তবে এখন সে বাড়ি নেই। কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে মগজ ধোলাইয়ের যন্ত্র বানাচ্ছি। আপনার কোন প্রয়োজন থাকলে বলে রাখব দেখবেন সব কাজ ফেলে আপনার বাড়ি হাজির হয়ে গেছে। অর্ক একচোট হেসে নিয়ে বলে,সবাইকে ভালোর মন্ত্র পড়ালে সমাজ পরিবর্তনের কাজ সোজা হয়ে যায়। লড়াই যুদ্ধ ভোট সব অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। কথাটা সমরবাবুর মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়।
অর্কর কাছে সব শুনে বাতাসী একদিন হাজির হয় শান্তনার বাড়ি। বাতাসী বিপিনের ঘরে বহু প্রতীক্ষার পর ঢুকতে পারে। লন্ডভন্ড এলোমেলো ঘর। চোখে টুলি পড়ে বিপিন তাতাল নিয়ে ইলেকট্রনিক্স বোর্ড ঝালাই করছে। বাতাসী প্রস্থানের উদ্যোগ নিলে শান্তনা বিপিনকে জানাতে উদ্যত হয়। বাতাসী নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে শান্তনা কে ঈশারা করে চুপ করতে বলে। রাতে খাবারের টেবিলে শান্তনা ধমকে সুরে বিপিনকে এই কথা জানালে বিপিন বলে, তুমি আমাকে ডাকলে না কেন? যাহোক কদিন পরে আমাকেই অর্কদার বাড়ি যেতে হবে। শান্তনা এর গুঢ় অর্থ বুঝতে না পেরে বলে, সে যাবে না তোমার তো শুধু ধান্দায় ওদের পেছনে ঘোরা।
দরজায় এলোপাথারি করাঘাত হতে থাকে। অর্কর ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভোরের আলো ফুটতে তখনও বাকি। দুই হাত দিয়ে অর্ধ নিমিলিত আখিপল্লব কচলাতে কচলাতে অর্ক দরজার দিকে এগিয়ে যায়। ততক্ষণে করাঘাত থেমে গিয়েছে। বিপিন অর্কদার নাম ধরে চিল চিৎকার করছে। গলার স্বরে তীব্রতায় অর্ক ঘাবড়ে যায়। যথাসম্ভব তৎপরতার সাথে খিল খুলে অর্ক দেখে বিপিন দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছে। অর্ক কিছু বলার আগেই বিপিন সরাসরি ঘরে ঢুকে আসে। বারান্দা পেরিয়ে ডানদিকে শোবার ঘর বাঁয়ে ডাইনিং স্পেস। সবকিছু বিপিনের নখদর্পণে তবু সে ভুল করে শোবার ঘরে ঢুকে পড়ে। অর্ধ অনাবৃত বাতাসী সেখানে ঘুমে অচেতন। সম্বিত ফিরে আসে বিপিনের। সে তড়িঘড়ি বাঁদিকে ডাইনিং স্পেসে ঢুকে একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে। অর্ক জিজ্ঞেস করে, কি হলো, অমন ছটফট করছ কেন? টেবিলে রাখা জলের জগ থেকে ঢকঢক করে জল খেয়ে বিপিন শুরু করে, দাদা,কয়েকদিন টানা কাজ করে প্রোগ্রাম ফাইনাল করে ফেলেছি। অর্ক বলে,প্রোগ্রাম, ভোরসকালে কোথায় যাবে? বিপিন উত্তর করে, ওহ, আমার কম্পিউটার প্রোগ্রামের কথা বলছি। যেখানে ডেটা দিলে সে আশু কর্তব্য জানিয়ে দেবে। অর্ক বলে, কিসের ডেটা আশু কর্তব্যই বা কি? আবার এক ঢোক জল খেয়ে নেয় বিপিন। অর্ক জিজ্ঞেস করে, বলবে তো? বিপিন বলে আমি জেনেছিলাম বাবা যে রোগে মারা গেছেন সারা দুনিয়ায় এই রোগের কোন প্রতিকার নেই। বাবা মারা যাবার পর এই রোগের কারণ ও নিরাময় সম্পর্কে ইন্টারনেটে পাওয়া পেপারগুলো আমি পড়তে থাকি। এই রোগ প্রতি 5000 জনে একজনের হয় অথচ আমাদের দেশে টিবি বা অন্য ফুসফুসের রোগে বহু মানুষ মারা যান। আফ্রিকা মহাদেশেও এই রোগে বছরে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। উচ্চ স্বরগ্রামে বিপিন এই কথাগুলো বলছিল। বাতাসী কখন ঘুম ভেঙ্গে দোরে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ নজর করেনি। বিপিন বলে চলে আমাদের দেশের গ্রামে ডাক্তারের অভাব প্রকট। প্রশিক্ষিত চিকিৎসক গ্রামে যেতে নারাজ। এ বিষয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে মানে একজন সচেতন মানুষ হিসেবে ভাবা উচিত আরকি। বাতাসী হঠাৎ করে বলে বসে, তুমি তো চিকিৎসক নও এ নিয়ে তোমার কি করার আছে? বিপিন অর্ক দুজনেই ফিরে তাকায়। দিদিকে দেখে বিপিনের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। বিপিনের অভিপ্রায় ছিল বাতাসীর সামনে সে অর্কদাকে কথাগুলো বলবে। কাঠের ব্যবসার সূত্রে বহু হাসপাতাল নার্সিংহোম প্যাথলজি বিভাগে যোগাযোগ করে আমি টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাই। ধীরে বন্ধুত্বের বন্ধন দৃঢ় হয়। আমাকে এর জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু চা- বিস্কুট আর সময় খরচ করতে হয়েছিল। প্রতিদিন সকালে বটতলার মোড় পেরিয়ে আমি হানা দিতাম বিভিন্ন সেন্টরে। দীর্ঘ চার বছর ধরে আমি সংগ্রহ করি পেসেন্টের এক্সর এবং রক্তের রিপোর্ট। তারপর ডাক্তারি ডায়াগনোসিস মিলিয়ে আমি বুঝতে পারি কোন কারণে কোন রোগের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। অর্ক বলে,এই থামো থামো, এই সমস্ত ডেটা নিয়ে কি হবে? বিপিন বলে মাইকেল ফ্যারাডে হতে পারব কিনা জানিনা তবে অদূর ভবিষ্যতে আমি মানুষের কাজে লাগবো সেটা বলতে পারি। হাঁ করে দুজনে তাকিয়ে থাকে বিপিনের দিকে। বিপিন ফের শুরু করে,প্রতিটি এক্সরে রিপোর্ট স্ক্যান করে আমি রক্তের রিপোর্টের সঙ্গে মিলিয়ে রাখি। সাথে যুক্ত হয় রোগ নির্ণয়ের ডাক্তারি তথ্যাবলি। উক্ত রোগে ওষুধের ব্যবহার আমি কম্পিউটারের ভাঁড়ারে ভরে দেই। বাতাসী বলে, কম্পিউটার এইসব রিপোর্ট নিয়ে কি করবে? হেসে বিপিন বলে, AI সিমিউলেশন। অর্ক বলে, সেটা আবার কি? বিপিন বলে, এটা হল অদ্ভুতুড়ে কম্পিউটার জাত ভবিষ্যৎবাণী যা হার্ডডিস্ক কে জমা থাকা তথ্য নিয়ে ঝান্ডিমুন্ডি খেলবে। আর ব্যাস, রোগ নির্ণয় হয়ে যাবে তারপর নিরাময়ের ওষুধ প্রেসক্রাইব করা সেকেন্ডের খেলা। বাতাসী বলে, রোগীর বয়স কিভাবে নির্ধারিত হবে? বয়স ভিত্তিক রোগ নির্ধারণ এবং তৎসম্বন্ধীয় ওষুধ প্রয়োগের ডেটা কম্পিউটারে আছে। নতুন রোগীর বয়সের ইনপুট দিলেই কম্পিউটার সফটওয়্যার বয়সের হিসাব কষে ওষুধ ব্যবহার করার নিদান দেবে। বাতাসী আর অর্কর চক্ষু ছানাবড়া হওয়ার জোগাড়। নিজের উপলব্ধির বাইরে কোন কথা বা কাজ গ্রহণ করতে মানুষ দ্বিধাবোধ করে। দ্বিধাদ্বন্দ্বে আবিল বাতাসী বলে,আমার মনে হয় এই পদ্ধতির প্রয়োগ সমাজে লাগু করা যাবে না। এর উত্তর বিপিনের কাছে নেই। বিপিন অর্কদার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কথা বলতে বলতে বিপিনের উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে এসেছিল। এবার অর্কর উত্তেজিত হওয়ার পালা। সে বলে, আইনি আর বেআইনি। কে তফাৎ করবে? শহরে ডাক্তার অপ্রয়োজনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাচ্ছে। কোন আইনে এই নষ্ট সময়কে বাঁধবে? হিস্টেকটমি করালে সরকারি বীমা গুলি থেকে টাকা পাওয়া যায় অপ্রয়োজনে হিস্টেকটমি করে ভবিষ্যত গর্ভাধানের উপায় বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। অপকর্ম গুলি কোন আইনে আটকাচ্ছে? পেচ্ছাপের দ্বারে একটা সাধারণ ইনফেকশন ইউটিআই বলে চিকিৎসাশাস্ত্রে। তার চিকিৎসা না করে কর্পোরেট হাসপাতাল স্টেন্ট বসিয়ে দিচ্ছে। গ্রামে ডাক্তার যাচ্ছে না গেলেও অনভিজ্ঞদের ঠেলে পাঠানো হয়। যে গ্রাম আমাদের পেট ভরায় তার জন্য লবডাঙ্গা। কোন রকমে সপ্তাহে দুদিন চাকরি সেরে ক্ষেপ মারও নার্সিংহোমে। বাতাসী, তুমিতো গ্রামের মেয়ে মনে করে বলতো তুমি অসুখ করলে কাদের কাছে যেতে? বাতাসী ভেবে বলে, রাম কাকা। লোকে তাকে হাতুড়ে বলত। অর্ক বলে,ঠিক গ্রাম আজও গ্রামেই পড়ে আছে। রাম কাকাদের হাতে আজও অলিখিত গ্রামের চিকিৎসার দায়ভার তুলে দেওয়া আছে। সরকার আইন সবার চোখে ঠুলি লাগানো। বিপিনের কাজ রামকাকাদের হাতে পৌঁছে গেলে বিজ্ঞান নির্ভর চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রামের পৌঁছে যাবে। এখন রামকাকাদের শিক্ষিত করে তোলাটাই কাজ। তবে বিপিন আমি মনে করি তোমার সিমিউলেশন কতটা কার্যকরী তা পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করা জরুরী। একদিন দিপুর কাছে যাওয়া যাক। বিপিন বলে, দিপু কে? অর্ক হেসে বলে ডঃ দীপঙ্কর চৌধুরী আমার বন্ধু। দীপঙ্কর কলকাতা মেডিকেল কলেজের চাকরি করে দরদী চিকিৎসক হিসেবে খুব নাম করেছে। এসব বাতাসীর জানা কাহিনী এই সুযোগে চট করে সে দুমুঠো চাল হাঁড়িতে চাপিয়ে দিয়ে আসে। বাতাসীর আগ্রহেই অর্ক ফোন করে দিপুকে। অর্কর বিয়ের পরে দিপুর সঙ্গে অর্কর দেখা হয়নি। সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার বেসামাল অবস্থা সামাল দিতে দিপুও হাঁফিয়ে উঠেছিল। রুঢ় মিতভাষি অথচ প্রতিবাদী হওয়ায় ওকে গ্রামে অজস্রবার বদলি হতে হয়েছিল। দিপুর স্ত্রী পুত্রকন্যা পরিবার নিয়ে হিমশিম খেত সে সময়ে। হঠাৎ আজ সকালে অর্কর ফোন আসায় দিপু ভীষণ খুশি। যৌবনে অর্ক দিপুর নেতা। অর্ক মানেই দিপুর কাছে নতুন ভাবনা নতুন চলা। অর্ক দিপুকে ফোনে পুরো ঘটনাটা বলে। দিপু বলে তোমরা সবাই মিলে সামনের রবিবার আমার বাড়ি এস। আমি ফাঁকা আছি। বৌদিকে অবশ্যই আনতে হবে কিন্তু আমি দেখি অনি যদি আসতে পারে। বাতাসী অর্কর থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে বলে, আমি শুধু আপনাদের দুজনের নামই শুনে গেলাম। খুব ভালো হবে, আনন্দ করা যাবে সব্বাই মিলে। বিপিন স্বগোতপ্তি করে, আমার কাজ! অর্ক ও বাতাসী বিপিনের কথা শুনে হো হো করে হেসে ওঠে। দিপু নাগাল পায় না।
আটত্রিশ
গানের গুঁতো
সকালে বাতাসীর সংবাদপত্র দেখা হয়না। রাত করে ঘুমানো স্বভাব, তাই অবশ্যম্ভাবী, দেরি করে ঘুম থেকে উঠে হাঁকপাঁক করা। দুজনের রান্না করা দুপুরের টিফিন বানানো তারপর নাকে মুখে গুঁজে দৌড় দেওয়া। সকালের রোজনামচায় ঘর ধোয়া বাসন মাজাও সামিল ছিল। অর্ক সকালে কুটোটি নাড়ে না সেই যে বই চা কাগজ মুখে বসলো এক্কেবারে নিজেকে বাথরুমে চালান করে দিয়ে তবেই শান্তি। অফিস থেকে ফেরার পথে অর্ক বাজার করে। যেহেতু সে মাছ খেতে খুব ভালোবাসে তাই তার কাছে বাজার করা মানে এক পুকুর মাছ তুলে আনা। কুচো মাছ ছাড়াও কাঁটা বাছও দুনিয়ার ঝক্কি। এই জন্য নিত্য তাকে বাতাসীর কাছে গালাগাল শুনতে হয়। কথা না বলে চুপটি করে ঘাপটি মেরে অর্ক তখন বসে থাকে। বাতাসীও মাছ খেতে খুব ভালোবাসে। বউয়ের কষ্ট হচ্ছে দেখে অর্ক মাঝে মধ্যে মাছ ধুতে এগিয়ে আসে। তখন আরও একচোট গালাগালি খাওয়াই ভবিতব্য। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় অর্ক কে ঋনাত্মক স্কেলে মাপতে হবে। অর্ককে আজ সকাল সকাল বের হতে হবে। ব্যাংকে জি.এম ভিজিট আছে। বারান্দা থেকে কাগজটা এনে তাড়াতাড়ি হেডিং গুলোয় চোখ বুলিয়ে নেয় সে। সুনামির ধ্বংসলীলায় পাতা ভরে গেছে। গরিব মানুষগুলো সবেতেই প্রথম সারিতে। যুদ্ধ সুনামি সবকিছু মৃত্যু পরোয়ানা লিখে পাঠায় ওদের ঠিকানায়। আলতো করে পাতা উল্টে কঠোর বাস্তবের ধামাকাদার খবরের সম্ভার এড়িয়ে যেতে চায় সে। বিনোদনের পাতায় পৌঁছতে তার বেশি সময় লাগে না। খুব তাড়াতাড়ি উপরে বাঁ দিকে থেকে ডানদিক চলতে চলতে চোখ হঠাৎ আটকে যায়। 'বর্ধমানের খেয়ালিয়া গৌতমের বাংলা খেয়ালে মুগ্ধ বিড়লা সভাঘর।' খুব দ্রুত পড়তে থাকে অর্ক। ‘পন্ডিত অর্ণব সান্যালের সুযোগ্য শিষ্য এই সময়কার এক বিরল প্রতিভা গৌতম বিড়লা সভাঘরে বাংলা খেয়াল পরিবেশন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন শ্রোতাদের।' কাগজ হাতে অর্ক রান্নাঘরে পৌঁছে চেঁচিয়ে বাতাসীকে ডাকতে থাকে। বাতাসী মন দিয়ে রান্না করছে। সে রান্না ছেড়ে আসতে না পারায় অর্ক হাজির হয় রান্নাঘরে। বাতাসী বলে, কি এমন খবর তুমি নিজে না গিলে আমাকে গেলাতে এসেছো? এই দেখো তোমার গুরুর শিষ্য গৌতম বাংলা খেয়ালে মাত করে দিয়েছে শ্রোতাদের। বাতাসী হেসে অর্কর চোখে চোখ রেখে বলে, গৌতমদা আমার প্রেমে মুগ্ধ ছিল জানো তো? অর্ক বলে, তা তুমি প্রেম সাগরের লোনা জল কয়েক ফোঁটা গৌতমকে দিয়েছো কি? বাতাসী চেঁচাতে থাকে, লোনাজল, লোনাজল মানে কি? অর্ক হাসি চেপে গামছা নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ে। বাতাসীর চিৎকার আর মুষ্টিবৃষ্টি বাথরুমের দরজায় তাল তোলে। অর্ক মুখে কুলুপ এঁটে নিজের কাজ করে চলে। ওদিকে রান্নাঘরে কড়ায় চাপানো মাছ পুড়ে কালো হবার যোগাড়।
গৌতম কোনোদিন কোনভাবে বাতাসীর মনে ছাপ ফেলতে পারেনি। গৌতমের প্রেমিক সত্ত্বা অনেকের চোখে ভীষণ রোম্যান্টিক হলেও বাতাসী তাতে ভোলবার নয়। অর্থ প্রতিপত্তি বাতাসীকে তেমন করে টানে না। পন্ডিত অর্ণব সান্যাল হাওড়া কদমতলায় গানের স্কুল করেছেন নাম তার সুর ও ছন্দম। প্রথিতযশা শিল্পী গৌতম সেখানে গান শেখাতে আসে। গুরুজীর অনেক ছাত্র-ছাত্রীই এখানে গান শেখানোর দায়িত্বে আছে,তাদের মধ্যে গৌতম ওজনে ভারী। গৌতম গুরুজীকে জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছিল বাতাসী এখন শ্রীরামপুরে থাকে এবং হাওড়ার কোন এক স্কুলে শিক্ষকতা করে। একদিন সুর ও ছন্দম ফেরত গৌতম হাওড়া রেলওয়ে ফ্লাইওভার দিয়ে কলকাতার দিকে এগিয়ে চলেছে। সেখান থেকে দুরে বাঁদিকের ফুটপাত ধরে এগিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে বাতাসীকে,পাশে এক পুরুষসঙ্গী। ফুটপাতের গাড়ি দাঁড় করিয়ে গৌতম জিজ্ঞেস করে, চেনা যাচ্ছে? বাতাসী বলে- গৌতম দা যে। গৌতমের ইশারায় ওরা দুজনেই মোটর যানে উঠে পড়ে। হাওড়া স্টেশন নিকটে হওয়ায়
ওদের খুব বেশি কথা বলার সুযোগ হয় নি। শুধু ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়ার পাঠ চুকেছিল।
গৌতম বাতাসীকে অনুরোধ করেছিল গুরুজীর সুর ও ছন্দম স্কুলে আসতে। অর্ক জানতে পেরে বাতাসী কে বলে, দেখলে আমি কাগজে খবর খুঁজে না পেলে গৌতম তোমাকে খুঁজে পেত না। বাতাসী রণচন্ডী হয়ে বলে, তো? অর্ক উত্তরে বলে, কিছু না তো। বাতাসীর রণরঙ্গিণী মূর্তির মধ্যেও অর্ক অবাক বিষণ্ণতার সন্ধান পায়। অর্ক সঠিক জানেনা বিষণ্ণতা কোথায় বিপন্নতার সমার্থক। জীবনে এলোমেলো হাওয়ারও দিশা থাকে। ঝড়ো হাওয়া দিকভ্রান্ত হয়ে এদিক ওদিক ছুটলেও সে দিশাহীন নয়। ঘুরপাক খেতে খেতে উঠে টর্নেডোর যাত্রা সদাই ঊর্ধ্বমুখী। বাতাসীর যাপনে অভাব বোধ ছিল। মাঝেমধ্যে কষ্ট দলা পাকিয়ে গলার কাছে উঠে আসত কিন্তু তাকে দেখে এর আন্দাজ পাওয়া সম্ভব ছিল না। তার অস্থিরতা শান্তি পেত অর্কর বুকে। অথচ অর্ক বোধবুদ্ধি দিয়ে কখনও বাতাসীর, না’ সুখের অন্য কারন খুঁজে পায়নি। অর্ক মনে মনে চাইতো বাতাসী নিজের জীবনে, অতীত, সঙ্গীতচর্চায় মেতে যাক। সুর সমুদ্রে ভাসিয়ে দিলে বাতাসী নিজেকে প্রকাশ করতে পারবে। অথচ বাতাসী জানে সংগীত চর্চার জড়িবুটি দিয়ে তাকে নিজেকে ভোলাতে হবে না। গুরুজীর ভাষায়- জীবনে, সংগীত শুধু চর্চার বিষয় নয় উপলব্ধিরও। সকল কাজের মাঝে সকল অবসাদে বাতাসী সাংগীতিক। অর্ক বাতাসীর অদ্বিতীয় ব্যথার কারণ জানত কিন্তু এখন এই মুহূর্তে চকিতে তার মনে হল সে ভুল ছিল। একটা মানুষকে সম্পূর্ণ জানা সম্ভব নয়। জীবন আর কবিতা একাকার এইখানে।
বাতাসী একদিন গুরুজীর সুর ও ছন্দম স্কুলে হাজির হয়। গুরুজীকে সেদিন কে পায়! গুরুজী বলেন, এতদিন কোথায় ছিলি মা, বুড়ো বাপটাকে একটুও মনে পড়ত না। লজ্জা পেয়ে যায় বাতাসী সত্যিই তো কী করে এমনটা হতে পারল। অপরাধবোধ থেকে আবেগ ক্লিষ্ট গলায় বাতাসী বলে, এখন আদেশ করুন। শিশুর মতো হেঁসে গুরুজী বলেন, গাইতে হবে, তুই গান ছাড়লেও গান তোকে জাপটে ধরুক এই আমার চাওয়া। গৌতম জানতো দুজনকে মুখোমুখি হাজির করাতে পারলে তাকে আর কিছু করতে হবে না।
অনেকদিন পর তাণপুরা তবলা সব ধুলোর আস্তরন ছেড়ে বাইরে আসে। বিয়ের পর প্রথম প্রথম অর্ক বাধ্য করেছিল তারপর ভাঁটা পড়ে উৎসাহে। রেওয়াজ শুরু হয় গুরুজীর সহজিয়া পথে। পুরানো সময়কে ধরতে হবে টাইম মেশিনে পিছু হেঁটে। বিজলি খেলত বাতাসীর গলায়। যদি প্রাণঢালা চর্চায় মগ্ন হওয়া যায় এখনও সুদিন ফিরে আসার আশ্বাস আছে। গুরুজী পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনায় বিশ্বাসী নন। বাতাসী যে কাজ ধরে তা ভালোলাগায় আপন করে নেয়। তাই গুরুজীর কাজ সহজ হয়ে যায়। বাতাসী গভীরে যেতে চায় যেখানে সংগীত সমুদ্র অতল। জীবনসঙ্গীত সদা বেজে চললেও তার রুপ গম্ভীর বিষণ্ণতায় লয়হীন। মাঝেমধ্যে সূর্যের ঝিকিমিকি উপস্থিতিতে সাংগীতিক পরিমণ্ডল কল্পিত মূর্ছনায় ভিসুয়ালাইজ করা যেত। ফেলে আসা দিন গুলোয় যখন সে চর্চায় ছিল না তখনও তার অন্তরে, সংগীত নিরন্তর বয়ে চলত। গৌতমের চাওয়া ছিল সহজ পথে বাতাসীকে সেলিব্রিটি হিসেবে সাংগীতিক কক্ষে প্রতিষ্ঠিত করে বিনিময়ে কিছু ফেরত পাওয়া। গৌতমের ইচ্ছায় বৈষয়িক ইন্ধন, সে কর্পোরেট ফান্ড জোগাড় করেছে। আসলে গুরুজী সারাজীবন সংগীতের গোলামী করেও বিদগ্ধ মহলে তল পাননি। ওনার ধাতে প্যাকেজিং ছিল না। সময় ওঁকে সে শিক্ষা দেয়নি। গৌতম, ছাত্র হিসেবে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত। জীবন সায়াহ্নে এসে নিজেকে প্রকাশ করার লোভ গুরুজী সংবরন করতে পারেননি। ওনার ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে এই কনসার্ট ওনারই পরিচালনায় হবে। গৌতম গুরুজীকে ফিউশনের ধারণা এবং সময় উপযোগীতা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল। এই মুহূর্তে বাতাসীর সঙ্গে গুরুজীর যোগাযোগ হয়ে যাওয়ায় গুরুজী আস্বস্ত কারন ও ছাড়া কে হাল ধরবে?
বাতাসীর স্কুলে হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা শুরু হবে প্রশ্নপত্র তৈরি খাতা দেখা অনেক কাজ। ওদিকে অনুষ্ঠান সূচিও ঠিকঠাক। জোরদার রিহার্সাল চলেছে। বাতাসী প্রত্যেকটি রিহার্সালে ঠিকমতো হাজির থাকতে পারছে না। এক আধটা রিহার্সাল থেকে যা কানে নিয়ে আসে তাই গুন গুন করে সারাটা দিন। অর্ক দেখে বাতাসী মনের আনন্দে রেওয়াজ করে চলেছে। এই অনানুষ্ঠানিক রেওয়াজে অর্ক অনুভব করতে পারে বাতাসীর জীবনে সংগীতের গভীর উপস্থিতি হারিয়ে যায় নি। এদিকে গৌতম অসন্তুষ্ট হচ্ছে। এতগুলো কম্পোজিশন, যার অন্তত দুটিতে বাতাসী মুখ্য শিল্পী অথচ তার পাত্তা নেই। এখনো মূল কম্পোজিশন শোনেনি বাতাসী। গুরুজিকে নালিশ জানালে তিনি শুধু হাসেন। তেলেবেগুনে জ্বলে যায় গৌতম। মাঝেমধ্যে বাতাসীকে ফোন করে নিজের উদ্বেগের কথা বলে। বাতাসী বলে চিন্তা না করতে সে সময় সুযোগ করে সুর তুলে নেবে। গৌতম পীড়াপীড়ি করে অবসর মতো বাতাসী যদি ওর বাঁশদ্রোণীর ফ্ল্যাটে দু-একদিন আসে তবে সম্পূর্ণ কম্পোজিশন তুলে নেওয়া সম্ভব। বাতাসী গুরুত্ত্ব দেয় না।
বাজারে হৈচৈ বাঁধিয়ে দিয়েছে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর নতুন ছবি “মন্দ মেয়ের উপাখ্যান”, মা রজনী পতিতা, মেয়ের সুখ ও শান্তির জন্য তাকে বয়স্ক এবং অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি আছে এমন এক মানুষের হাতে তুলে দিতে চায়। মেয়ে লতি লেখাপড়া করতে চায় তাই সে মা কে ছেড়ে পালায়। বিশ্ব সাহিত্যের খনি থেকে তুলে এনে বুদ্ধদেব প্ল্যাতেরোকে সিনেমায় ব্যবহার করেছেন। বাতাসী প্ল্যাতেরো পড়েছে ভীষন উল্লসিত সে। শনিবার সন্ধ্যার শো, নন্দনে দেখতে যাওয়া ঠিক হয়। অনেকদিন ওরা একসাথে সিনেমা দেখেনি। অর্কর বিশেষ ভালোলাগার পরিচালক বুদ্ধদেব। 'বাঘ বাহাদুর,' ওকে মুগ্ধ করেছিল। স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে রান্না বান্না সেরে বাতাসী রওনা দেয় সিনেমা হলের উদ্দেশ্যে। রাস্তায় অর্কর ফোন আসে ক্যাশ মেলাতে পারা যায়নি তাই সে আজ আসতে পারবে না। মাথায় আগুন জ্বলে যায় বাতাসীর। এই রকম মুহূর্ত গুলোতে বাতাসী সম্পূর্ণ বিচারবোধ হারিয়ে ফেলে। শৈশবের পিতম থেকে আজকের অর্ক কারও পরিত্রাণ নেই। নিমেষে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে কলকাতায় যখন এসে পড়েছে তখন গৌতমের ফ্ল্যাটে গিয়ে রিহার্সাল সেরে নেবে। চটজলদি গৌতম কে ফোন করে সে জানায় সম্ভব হলে আজ রিহার্সালের অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে। গৌতম ওর ফ্ল্যাটে এসে রিহার্সাল করতে রাজি হওয়ায় নিমেষে গানের ক্লাস বন্ধ দেয় গৌতম। বাতাসীর বিশ্বাস ছিল শিক্ষিত-মার্জিত গৌতমের প্রতি। ছোটবেলা থেকে কোন বদনাম শোনা যায়নি ওর নামে। কোনরকম অভব্যতা গৌতমদা নিশ্চয় করবে না বাতাসীর সাথে। আবার পরিবারের বাইরে এক কামরা ফ্ল্যাট রাখার কারন নিয়েও বাতাসী ভাবতে থাকে। কিন্তু আজ সে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। মনের কোণে হঠাৎ জমা বিরুদ্ধতা বল তাকে পর্যুদস্ত করতে পারেনি।
এলোমেলো চিন্তা জাল ছিন্ন করে বাতাসীর আঙ্গুল কলিংবেল ছোঁয়। প্রস্তুত ছিল গৌতম বেল বাজতেই খুলে যায় দরজা। বাতাসী চরকির মতো ছোট্ট ফ্ল্যাটবাড়ির চৌহদ্দি নিমেষে ঘুরে নেয়। পরিপাটি সুন্দর ঘর। সাজানো বারান্দায় দিয়ে বাতাসী আকাশ দেখার চেষ্টা করতে থাকে। পেল্লাই আকাশচুম্বী দুই ফ্ল্যাটের ফাঁক দিয়ে চোখে এসে ধাক্কা দেয় ল্যাম্প পোষ্টের আলো। আকাশ দখল নিয়েছে হ্যালোজেন, তারা দেখা যাচ্ছে না। এইরকম পরিবেশে বাতাসী কোনদিন থাকেনি। নিয়ন আলোর আড়ালে আবছায়া চাঁদ যেন ভেংচি কাটছে বাতাসীকে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে বাতাসী ঘরে ঢুকে পড়ে। গৌতম টেবিলে রাখা সেট পাথরের পাত্রে ভদকা ঢালছে। গৌতম বাতাসীর দিকে তাকিয়ে বলে, চলবে? মন খারাপের মেঘ থম মেরে আছে কিছুতেই ছাড়ছে না বাতাসীকে। বাতাসী কোনদিন ভাবতে পারেনি অর্ক ছাড়া কারও সাথে সুরা পান করার কথা। বাতাসীকে আজ যেন নিয়ম ভাঙতেই হবে। বিরক্তির ছোঁয়াচ কাটাতে বাতাসী টেবিল থেকে গ্লাস তুলে নেয়। লেমন মেশানো ভদকায় চুমুক মেরে ওর গা কেমন পাক দিয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি গলা দিয়ে পেটে চলে যায় মদিরা। বাতাসীর আহবানে গৌতম কম্পোজ করা রেকর্ডেড ফিউজন চালিয়ে দেয়। কোন প্রশ্ন না করে চোখ বুজে বাতাসী শুনতে থাকে। গৌতম মাঝে মধ্যে ইন্টারপ্রেট করতে চাইলে বাতাসী হাত নাড়িয়ে থামিয়ে দেয় তাকে। কান খাড়া করে বাতাসী প্রতিটি স্টেজের ইন্টারলিউড মিউজিক শুনতে থাকে। বাতাসীর শরীরে ভদকার আচ্ছন্নতা। হাত বাড়িয়ে নিজেই সে এক পেগ ঢেলে নেয়। গৌতমকে সে একবার জিজ্ঞেস করে 'ক্যারাওক করা আছে?' গৌতম মাথা নেড়ে জানায় হ্যাঁ। বাতাসীর শ্রুতিধর। প্রথম এবং দ্বিতীয়বার শোনা শেষ হলেই সে, ক্যারাওক বাজাতে বলে। গৌতম গানের এসেন্স বোঝাতে গেলে বাতাসী বলে, গানের সঙ্গে সাপের মতো চলছে চেলো ভায়েলিন ভিয়েল্লা, বাঃ। সঙ্গীত নিজের খেয়ালেই বোধের সঞ্চার করে। খোলা গান, বাতাসী গুনগুন করতে থাকে মিউজিকের সাথে। নেশার ঘোর কানাড়ার মূর্ছনায় জমজমাট। বাতাসী গৌতমকে বলে, ভালো কম্পোজিশন করেছো। আমি প্রস্তুত। প্রথম থেকে চালাও। আমার গায়কীতে কোথাও ভাবের অভাব ঘটলে জানাবে। গৌতম আপ্লূত হয়ে ব্যাটান টেপে- ক্যায়সে কাটে রজনী বিনা সজনি/পিয়া বিনা মোসে রহা নাহি যায়। ঢিমা চলনে সুর কোমল নিষাদে খুঁটি বেঁধে ধৈবত ছুঁয়ে আসে বারবার। খাদের গভীরে বাগেশ্রীর আকুল অভিমান ব্যথা হয়ে ঝরে। চেলো ভায়োলিন গীটারের মৃর্চ্ছণায় বাতাসী আরোহ অবরোহ সমস্ত নিয়ম ভেঙ্গে চুরমার করে পাগলের মতো। শুধু নিষাদ কে ছাড়তে পারে না। শৈশব থেকে বাতাসী এমন। কখনো সামান্য আঘাত পেলে সেইটাকে রাঙিয়ে তোলে আপন ঐশ্বর্যে। দরিয়ান স্কেল গায়কীতে কোথাও কোন অসঙ্গতি নেই আবার একইসঙ্গে শ্রুতিমাধুর্যে তপঃশুদ্ধ। আতিপাতি করে সে যা খুঁজে চলেছে তা কোমল নিষাদ না অর্ক তা বাতাসী বলতে পারবে। রেকর্ডেড অ্যারেঞ্জমেন্ট না হয়ে লাইভ হলে রাধার বিরহানল অশ্রু হয়ে ঝরে পড়তো। বাতাসীর আতশবাজি ধরতে পারে না যন্ত্রের বাঁধা গত। বিস্তারের প্রতিবন্ধকতা হোঁচট খায়। চোখ তুলে এগিয়ে যায় বাতাসী। হাতের ছোঁয়ায় রেকর্ডার বন্ধ করে আবার চোখ বুজে গাইতে থাকে। অধরা সুরে ধরা পড়ে মনের রং, রাগ অনুরাগ। অর্ক যেন অঙ্গ বিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ ধারণ করে রেখেছে তার। সৌরভে ভরে ওঠে গান, বাঁধ ভাঙ্গা কষ্টের আঙ্গিকে। ওদিকে সংগীত মদিরায় আক্রান্ত গৌতম শুনতে থাকে "তোমার তুলনা আমি খুঁজি না কখনো/বহু ব্যবহার করা কোনো উপমায়।"সংগীতের বিমূর্ততা এখানেই। গৌতম ধীরে ধীরে উঠে আসে। গান শেষ করে অশ্রুভেজা চোখ বুজে আছে বাতাসী। হঠাৎ গৌতমের আলিঙ্গনে মগ্নতা কেটে যায়, দাঁড়িয়ে ওঠে সে। ততক্ষণে গৌতম বাতাসীর শরীরের সম্পূর্ণ দখল নিয়েছে। বাতাসী তাকে ঠেলে সরাতে বিফল হয়। গৌতমের বজ্র কঠিন শরীর মাদকতায় নেচে উঠেছে। বাতাসী চোখ মেলে দেখতে থাকে গৌতমের কদর্য নগ্নতা। একদিন বন্ধু দেবুর সাথে বাতাসী বেড়াতে গিয়েছিল নলবনে। বাতাসী দেবুকে মাছরাঙ্গা পাখির দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে। দেবুর কবি স্বত্বার প্রতি বাতাসীর ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল সেই মুহূর্তে। দেবু বাতাসীর ভালোলাগার রং চিনতে পেরে ওর আঙুল ছু্ঁয়েছিল। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে বাতাসী চোখে চোখ রাখতে পারেনি। এমন ভালোলাগা তার মুহূর্তে তৈরি হয়,তখন সে শিশুর মতন। অথচ গৌতমের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এমন হোল না। সারা শরীর জুড়ে ঘুরতে থাকে গৌতমের হাত। বাতাসী বলতে থাকে, আই লাভ অর্ক। গৌতম ওর ওষ্ঠ বেঁধে দেয় নিজের ওষ্ঠ দিয়ে। এক ধাক্কায় বাতাসী ওকে সরিয়ে দিয়ে বলে, আই লাভ ভাস্কর, আই লাভ তপন। শেষ বারের মতো উন্মত্ত গৌতম ওকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে, তোমার একটুও ভালো লাগছে না। পাথর বাতাসী জবাব দেয়, আই লাভ দিনকর। ও আমার কাছে এলে হাওয়ায় সংগীত ভাসে। আমায় ছুঁয়ে দিলে মরুভূমে বর্ষা নামে। প্রতিটা দিন প্রত্যুষে ওর চোখের আদর পেলে সূর্য নতুন রং ছড়ায়। নিজেকে সন্তর্পণে আড়াল করতে চেয়ে বাতাসী অনর্গল নামতার মত বলছিল কথাগুলি। সে ভেবে দেখার সময় পায়নি আদতে অর্কর শরীরী আদরের উত্তাল ঝঞ্ঝায় সে কতটা পিড়িত ছিল। রুদ্ররুপী অর্ক শরীরে মত্তদন্তি কখনো তার প্রেমের ফুরফুরে হাওয়া বাতাসীর প্রশান্তির কারন ছিল না। কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি রহস্যময়তা ছিঁড়ে মেঘ ফেটে সূর্য ছড়িয়ে পড়ার নিস্কলুষ আনন্দর বদলে বাতাসী পেয়েছিল মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি। তবুও ওদের ভালবাসায় কোন খামতি ছিল না।
হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠে গৌতম, লুটিয়ে পড়ে বাতাসীর পায়ের কাছে। নিজের গালে চড় মারতে থাকে হতাশায়। বাতাসী বলে, তুমি বলেছিলে বন্ধুত্বে বিশ্বাস রাখতে। আমি রেখেছিলাম তুমি তার মান রাখতে পারলে না। বুঝলাম এই ফ্ল্যাটটা সম্ভবত এইজন্যই কেনা। চুপ করো, কান্না ধরা গলায় গৌতম বলে। আমাকে অর্ক বাবুর ফোন নাম্বার দেবে আমি একটু কথা বলতে চাই ওঁর সঙ্গে। বাতাসী বন্ধ ফোন খুলে ফেলে রিং বাজিয়ে গৌতমের হাতে দেয়। ওপার থেকে কোন উত্তর আসে না, ফোন কেঁদে কেঁদে থেমে যায়। বাতাসীর ফোন বন্ধ থাকায় সে এতক্ষণ বুঝতে পারেনি। গৌতমের হাত থেকে ফোন নিয়ে দেখে অজস্র এস.এম.এসে উদ্বেগের দীর্ঘশ্বাস। বাতাসী সংক্ষেপে লেখে ও কোথায় ছিল এবং কেন? বাকিটা বাড়ি ফিরে জানাবো লিখে সে বার হয় বাড়ির উদ্দেশ্যে।
আসলে মাইকেল ফ্যারাডে'রাই আসল জীবনবোধ শেখান - কারণ জীবনটাই হাতে-কলমে বাঁচার। বাকি সব মেকি মগজে কারসাজি। সমাজ বদ্ধ থাকার বা রাখার কৌশলে শ্রমজীবীর মেধা ও শ্রমকে উপেক্ষা করে 'শয়তানের মস্তিষ্কের' কান্ডকারখানাই এখন মান্যতা পেয়েছে - আর সেই মগজধোলাইয়ের যন্তরমন্তর আমাদের 'অন্যরকম' ভাবতে বা বুঝতেও শেখায় না।
ReplyDeleteউপন্যাসের পর্ব হিসাবে নয়, আমার চোখে এ লেখা সমাজের খন্ডচিত্র নয়, বরং মননশীল দলিল, যা আমাদের ঠুলি পড়ে থাকা চোখে কিছুটা হলেও অন্য আলো ছড়ায়।
প্রথম পর্ব পড়ে খুব ভালো লাগলো।
ReplyDeleteNext part kobe likhbe
ReplyDeleteলেখা হয়ে গেছে। দিন পনের কুড়ি পর দ্বিতীয়টা পোস্ট করবো।
Deleteলেখার বর্ণনাগুণে অতি সাধারণ চরিত্রও হয়ে উঠেছে উজ্জ্বল। বিপিনের জীবনসংগ্রামের বিপরীতে মন্টুর সুনিশ্চিত জীবনযাপন ---- চির --চেনা বাস্তব সমাজচিত্র।
Deleteসহজ সরল সাবলীল গদ্যে লেখা উপন্যাসের সূচনাপর্ব পাঠকের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে।
খুব সুন্দর লেখনী। সাবলীল ,প্রাঞ্জল ভাষায় খুবসুন্দর চিত্র ফুটে উঠেছে। পরের লেখা র আশায় রইলাম।
ReplyDeleteখুব সুন্দর, নদী যেমন
ReplyDeleteমন ছুঁয়ে যাওয়া একটা বাস্তব গল্প।পরবর্তী র অপেক্ষায় রইলাম।
ReplyDeleteদাদা খুব ভালোলিখেছ। আরো লেখ। পড়তে চাই।
ReplyDeleteকিছুদিন পর পরের এপিসোড।
Deleteখুব ভালো লাগলো।
ReplyDeleteদারুন rebirth story। শত প্রতিকূলতার মধ্যে নিজের শীল্পিসত্বাকে খুঁজে পাবার, class struggle জয় করার গল্প। বাতাসি ও অর্কর মনে হল গভীর কোনো ইতিহাস লুক্কায়িত আছে। পরবর্তীতে তা জানার অপেক্ষায় রইলাম।।
ReplyDeleteপ্রথমটা বেশি ভালো। দুটো কি একই গল্পের অংশ/পর্ব?
ReplyDeleteভালো। এখনো গল্পের গতি বোঝা যাচ্ছে না
Deleteলিখলাম কিন্তু লেখাটা কোথায় গেল
ReplyDeleteসৌন্দর্যের ব্যাখ্যা ভালো লেগেছে তবে এটা নিয়ে আর একটু বিস্তারিত লেখা যেত।
ReplyDeleteKothoker উত্তরে জানাই- কথা পত্রিকায় এই লেখা ছাপা হচ্ছে ধারাবাহিক উপন্যাস হিসেবে। দুটি এপিসোড ওঁরা ছেপেছেন। আনুমানিক চল্লিশ এপিসোডে সম্পূর্ণ হবে লেখা। সম্পর্ক গুলোর জট ধীরে খুলবে।
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো।
ReplyDeleteকারন যার অভাব আজকের সামগ্রিক বাঙালী সমাজ, রাজনীতি কে ভয়ানক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে তা হল প্রকৃত মূল্য বোধের অভাব আর সেই মূল্য বোধই এই গল্পের প্রধান বিষয় উঠেছে দিলুর বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
Waiting for your next post.
তোমাদের ভালো লাগায় ধন্য হোক আমার চেষ্টা।
Deleteগল্পটা পড়ে ভালো লাগলো।আমার মতে বোনেদের নাম গুলো একটু আলাদা হলে ভালো হতো।বাণী আর বীণা আমার গুলিয়ে যাচ্ছিল।
Deleteগল্পটা পড়ে ভালো লাগলো।আমার মতে বোনেদের নামগুলো একটু আলাদা হলে ভালো হতো।বাণী আর বীণা আমার গুলিয়ে যাচ্ছিল।
ReplyDeleteতৃতীয় ও চতুর্থ পর্ব পাঠের অনুরোধ রইলো সুখী পাঠকের কাছে।
ReplyDeleteঅত্যন্ত ভাল লেখা, বাস্তব পরিস্থিতি সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। লেখা মন কে স্পর্শ করছে।
ReplyDelete