ছোটগল্প- জঙ্গল সমাচার।(কৌরব)

 কভিডের রোজনামচা। মানুষে মানুষে আন্তসম্পর্কের নিরন্তর পরিবর্তনশীলতা নিয়ে ছোট্ট একটি গল্প।


জঙ্গল সমাচার।


সাদামাটা জীবন নির্বাহ করে অমিত। কখনো বোধ করেনি নিজের জীবনে আরো বেশি কিছু অর্জনের কথা। ঈশ্বরের কাছে কোনো চাহিদা নেই ওর।  বন্ধু-বান্ধবদের বেশিরভাগই পুজোপাঠ অন্য ধর্মে অভক্তি ঘেন্না  আর পাই পাই নিয়ে বেঁচে আছে। অমিত সমাজে অধিকারজীবী শ্রেনী। অফিস কাছারির বন্ধু বান্ধবরাও একই গোত্রের। অফিসে ওর পরম বান্ধব বলতে ঝাড়ুদার পিয়ন,'জারা হটকে', মেশা ওর স্বভাব।  এই নিয়ে সমগোত্রীয় বন্ধু-বান্ধবের সমালোচনা সে  বোঝে কিন্তু রা কাড়েনা। নিরন্তর ঠিক ভুল নিয়ে ভেবে চলা অমিতের অভ্যাসে। মানসিকভাবে অমিত খুবই দুর্বল। করোনা রোগ নিয়ে ওর খুব মাথাব্যথা কারন পৃথিবীর জ্ঞানীগুণীরা দু ভাগ হয়ে গেছে কোনটা যে ঠিক ক্ষুদ্র ভাবনা দিয়ে বুঝতে পারেনা অমিত।  কখনো মনে হয় লকডাউন করা ঠিক কখনো টিকাকরণ ভুল। এই অবস্থান যখন-তখন অদল বদল হয়ে যায় । আশেপাশের অনেক ঘনিষ্ঠ জন মারা যাচ্ছে দেখে সে বিষম হতাশ। অমিত তখন  ভাবে সরকার লকডাউন করে ঠিকই করেছে। আবার যখন কল-কারখানায় আসার তাগিদে, কর্মীরা, লরি বোঝাই হয়ে পিলপিল করে নেমে পড়ে রুজির গন্তব্যে, তখন সব ভাবনা কেমন গুলিয়ে যায়। 


আজ অমিত লকডাউন রোস্টার মেনে কাজে বেরিয়েছে। বাড়ি থেকে টোটোয় চড়ে হাওড়া তারপর হন্টনং, কোনরকমে পৌঁছায় সে কর্মস্থলে। অফিসে লোক কম, কাজের চাপ বেশি।  তার চেয়েও বড় চিন্তা কিভাবে সে বাড়ি যাবে।  সকাল বিকেল এই গরমে দশ বারো কিলোমিটার হাঁটা শরীরে পোষাবে না।  ট্যাক্সির অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ তাই হাপিত্যেশ দাঁড়িয়ে থাকা। নিতান্ত হতাশ হয়ে পথের দিকে তাকিয়ে অমিত মাথা চুলকাচ্ছে। গুটি গুটি পায় কোত্থেকে একটা হলদেটে রথ এসে হঠাৎ তার সামনে দাঁড়িয়েছে। মহানন্দে সে জিজ্ঞেস করে 'হাওড়া যেতে কত নেবেন?' উত্তর আসে পঞ্চাশ  টাকা। ঝপ করে দরজা খুলে শরীর এলিয়ে দেয় সে। যেন আরাম কেদারার সন্ধান পেয়েছে। রথ দ্রুতি না বাড়িয়ে হালকা চালে চলছে। চালকের চোখ চারদিক পরিক্রমায় ব্যস্ত। অমিত বিরক্ত হয়না। হঠাৎ সে বুঝতে পারে চালকের স্ক্যানারে হত দরিদ্র দুজন ধরা পড়েছে। গাড়ি গিয়ে তাদের পাশে থামে। যাদের নিয়ে ভাবনা তাদের কোনো হেলদোল নেই। ট্যাক্সি ড্রাইভার একটু চেঁচিয়ে বলে, 'কিগো যাবে?' ভিরমি খেয়ে মা মেয়ে ভাবে সারাদিন সামান্যই বিকিকিনি হয়েছে। ট্যাক্সি চড়লে লাভের গুড় পিঁপড়েয় খাবে। তাছাড়া বাপের কালে ট্যাক্সিতে চড়েছে কিনা মনে করতে পারেনা মেয়েটা। ফিসফিস করে মা বলে, 'তুই যখন জন্মে ছিলি তোর বাপ আমাদের ট্যাক্সি করে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে ছিল।' ট্যাক্সিওয়ালা ফের হেঁকে বলে জনপ্রতি দশ টাকা দিতে পারবে?' এই আকালে কুড়ি টাকায় দুজনে ট্যাক্সী চড়বে, নিজের কানকে ওরা বিশ্বাস করতে পারেনা! ঝুপঝাপ উঠে পড়ে গাড়িতে।  চালক এ্যক্সিলেটর চাপ দিয়ে স্পিড বাড়ায়। রাস্তায় পয়দল কাউকে দেখলেই ড্রাইভার গাড়ী থামিয়ে জিজ্ঞেস করে, 'হাওড়া যাবে নাকি?' এগারো নম্বরে চলা লোকজন ছাপোষা অফিস যাত্রী শ্রমিক মুটে মজুর। ট্যাক্সির কথা যারা জীবনে ভাবতেই পারে না। আবারও এমন একজনকে তুলে নেয় চালক।  কুড়ি টাকায় রফা হয়েছে। অমিত কোন প্রশ্ন করছে না। ধীরে ধীরে ট্যাক্সি হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে রেল স্টেশনের ধারে এসে দাঁড়ায়। চালক আশা করছে অমিত কুড়ি টাকা ধরাবে তাকে। অমিত যথারীতি পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বার করে ট্যাক্সি ড্রাইভারের হাতে দেয়। লজ্জিত ড্রাইভার তাকে জানায়, 'স্যার, আমি যার যেমন ক্ষমতা তার কাছ থেকে ততটা নিলাম।' অমিত মুখে কিছু না বলে চোখের ইশারায় ড্রাইভার এর বিবেচনা বোধ কে স্বীকৃতি দেয়। 

বাড়িতে ফিরে বউয়ের তত্ত্বাবধানে জামা-কাপড় কেচে পরিপাটি হয়ে জলখাবার খেয়ে অমিত বসে পড়ে টেলিভিশনের সামনে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি দেখা অমিতের নেশা। ফি দিন বাড়ি এসে একই কাজ। ভারতবর্ষের বান্ধবগড় জঙ্গলের উপর একটি সিনেমাটোগ্রাফি দেখছিল আমিত। একদল চিতল হরিণ মৌজে চরে বেড়াচ্ছে জঙ্গলময়। একটা কাঠঠোকরা ঠোঁটের পরশে কোটরে সন্তানদের খাবারের যোগান দিচ্ছে। কাজ সেরে এদিক ওদিক উঁকি ঝুঁকি মারছে মা কাঠঠোকরা। জঙ্গল পর্যবেক্ষণ করা কাঠঠোকরার স্বভাব। জঙ্গলের রাজা কে দূরে দেখা যাচ্ছে গুটি গুটি পায়ে হরিণের পাল এর দিকে এগিয়ে আসতে। খট খট খট খট, তীব্র চিৎকারে পাখিটা জানান দিতে চায় মহারাজের আগমন বার্তা। চিতলের পাল খেয়াল করেনা। গাছের ডালে চারটি ল্যেঙ্গুর বসে ছিল তারা কাঠ ঠোকরার ইংগিত বুঝতে পেরে আকাশ বাতাস কাঁপাচ্ছে। কতগুলো মাছি ভনভন করে ল্যেঙ্গুরদের বিরক্ত করছে। ওদের নজর বাঘ বাবাজির দিকে। একহাত দিয়ে মাছি তাড়াচ্ছে আর তীব্র স্বরে চিৎকার করছে গেছোর দল। রয়েল বেঙ্গল টাইগার বুঝতে পারে যে সে ল্যেঙ্গুরের চোখে বন্দী। গতি থামিয়ে সে অপেক্ষায় অনড় অচল। ততক্ষণে হনুমান গুলোর সিগন্যাল পড়তে পেরেছে  চিতলের পাল। অমিত চেয়ারে দু পা তুলে গুটিসুটি মেরে বসে। চিতলের চঞ্চলতায় বাঘ বাবাজি বুঝতে পেরেছে এখনই দৌড় শুরু করা দরকার। কিন্তু বড় লেঙ্গুরটা আগেই রেডি স্টেডি গো বলে স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে। চিতলের পাল চার পায়ে হাওয়ায় উড়ছে। না, আজকের মত বাঘ বাহাদুর কে ক্ষান্ত হতে হলো। বাঘ ছাড়া জঙ্গলের সবাই খুশি। অমিত যে অখুশি নয় সে তো বলাই বাহুল্য। 


সরকার ফরমান জারি করছে লকডাউন আবার এও বলছে আপনারা, 'প্লিজ, একে লকডাউন বলবেন না।' অমিতের হাঁসি পায়। সে ভাবে কত সহজেই লকডাউন চেপে যায় গরিবের ঘাড়ে,সরকার বাহাদুর আপন কাজে অবিচল থেকেও মানুষের বিরুপতার ভয় পায়। অমিতের নরম হৃদয় প্রভূত আনন্দ পায়। শক্তিমানের সন্ত্রস্ততা এই অনুমান অমিতের কাছে অকল্পনীয়। রবি ঠাকুর সেই কবে লিখে গেছেন "বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ। সরকারী কর্মীদের রেল কোম্পানি এখন স্পেশাল ট্রেনে ওঠার অনুমতি দিয়েছে। হাওড়া স্টেশনে ঢুকবে অমিত, ট্যাক্সি থেকে নেমেছে। একজন সার্জেন্টকে সে ট্যাক্সি চালকের ওপর চড়াও হতে দেখে। ট্যাক্সিওয়ালা প্রায় কাঁদো কাঁদো কিছুক্ষণ বাক্কালাপের পর সার্জেন্ট বলছে, 'তোকে রোজ বলছি এখানে গাড়ি দাঁড় করাবি না।'  ড্রাইভার করজোড়ে মুক্তি চাইছে।  ঠিক সেই সময়ে আর একটি ট্যাক্সিকে দূর থেকে আসতে দেখা যায়। দুই হাতে ক্র্যাচ নিয়ে ধুলামলিন এক ব্যক্তিকে জোরকদমে ট্যাক্সির দিকে যেতে দেখা যাচ্ছে। সে হাতের ইশারায় ড্রাইভারকে কিছু বলতে চাইছে। চালক বুঝতে পারে না ইঙ্গিত, সে যেন ফাঁদে পা দেবেই। এমন সময় ক্র্যাচওয়ালা এক পায়ে ভর করে ক্র্যাচ উঁচিয়ে নাড়াতে থাকে। এইবার ট্যাক্সি চালক নজরে করে তাকে। পুলিশের নজর এড়িয়ে দূরে গাড়ি দাঁড় করায় চালক। হিসেব-নিকেশ চুকিয়ে গাড়ি ছেড়ে চালক দু পা পিছিয়ে আসে। হাতের ইশারায় ডাক দেয় প্রতিবন্ধী মানুষটাকে, হয়তো সে  কিছু দিতে চাইছে। প্রতিবন্ধী মানুষটা যায়না, অবলীলায় হাতের ইশারায় চালককে চলে যেতে বলে সে। অকৃত্রিম প্রসন্নতায় অমিতের মন ভরে যায়। 


নিত্যদিন চলেছে খেটে খাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।  অমিতের কোনরকমে অফিস পৌঁছে গেলেই হলো।  বর্তমানে অমিতের সুবিধা ট্রেনে চড়ার অনুমতি মিলেছে। কিন্তু যাদের প্রয়োজন তাদের অনুমতি নেই। হাওড়া আসার পথে সে দেখে লিলুয়ায় সিকি গাড়ি খালি হয়ে যায়। যাত্রীদের পরিধান দেখে সে বুঝতে পারে সবাই রেলকর্মী নয়। প্রথম প্রথম অমিত আত্মস্থ থাকতো। খেয়াল করতো না সবকিছু। একদিন সে লক্ষ্য করে কার সেডে ট্রেন থেমে গেলে গাড়ি প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। অমিত ভাবে রেল কারসেডে এত লোক কাজ করে! চটজলদি সিট ছেড়ে উঠে বাঁদিকের ফাঁকা দরজায় হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। পিলপিল করে সাধারন মানুষ ট্রেন থেকে নেমে রেললাইনের সমান্তরাল বাঁধানো রাস্তা ধরে হাঁটছে দেখা যায়। ডাইনে তখন কর্ড লাইনের একটা ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে। বাঁ দিকের দরজা ছেড়ে অমিত ডান দিকের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। ঝুপঝাপ লোকজন নামছে কর্ডের ট্রেন থেকে। কারসেডে ট্রেন দুটি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। শান বাঁধানো রাস্তায় সারি দিয়ে চলেছে কালো কালো মাথা। একটু এগিয়ে শাখা নদীর মতো একটি দল ফুটব্রিজ উঠে যায়। একদলের গন্তব্য হাওড়া বাস স্ট্যান্ড। আর এক দল ফুটব্রিজ পেরিয়ে বাইপাসের দিকে নেমে যাচ্ছে। অমিত জঙ্গলের রাজ্যে হারিয়ে গেছে। দরজার রডটা ধরে শরীরটাকে একটু ঝুলিয়ে দিয়ে অমিত দেখতে চেষ্টা করে ড্রাইভারকে। কোথায় ড্রাইভার? এ তো কাঠঠোকরার চঞ্চু বিশিষ্ট লম্বা লেজের ল্যেঙ্গুর। ট্রেনের গেটে দোল খাচ্ছে। ট্রেন ছেড়ে দেয়।  চিতলের সারি লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে আপন গন্তব্যে। বাঙাল বাবুর ব্রিজ পেরিয়ে ট্রেন স্টেশন মুখী। অমিত ট্রেন থেকে দেখতে পায় ডোরাকাটা রয়েল বেঙ্গলের দল প্ল্যটফর্মে এদিকে ওদিকে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। ওরা জানেনা ল্যেঙ্গুর কাঠঠোকরা জঙ্গল আকাশ-বাতাস প্রকৃতি সবাই মিলে জোট বেঁধেছে। 'রয়েল বেঙ্গলের যূগ শেষ', হুররে বলে লাফিয়ে ওঠে অমিত।

Comments

  1. আমি এইগুলোর প্রত্যেকটি ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী

    ReplyDelete
  2. ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
  3. Sorkari kormira ra kaj korche tader jonno special rail , R koto amader moto gorib lok kaje na jete peye na kheye morche...

    Amio ekhon r porar time paina besi ... amio oi amader grame ekta kakar barite kather kaj kori ....ki korbo ...maa jader bari kaj korten tader onekei covid er jonno kaj bondho kore diyechen ...barite osustho babar osudh.. 😔..tar opor amar porao hochhena ..r ei online exam....sobi britha jachhhe.....amader keu guruttoi debena

    ReplyDelete
  4. বেশ, মনোগ্রাহী লেখা।

    ReplyDelete
  5. বাঃ দারুণ, আত্ম সমীক্ষা।

    ReplyDelete
  6. গত লকডাউনে যে অধিকার বোধ নিয়ে অধিকারহীন যাত্রীদের দেখত এবার সেই দৃষ্টিভঙ্গির বদল হয়েছে তাই এই কঠিণ সময়ে এক মানবিক গল্প পাওয়া গেল ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ছোটগল্প - লাল কালো ইট।।

একগুচ্ছ কবিতা

কোন সে আলোর স্বপ্ন(কথায় ধারাবাহিক)